আলোচনা করলেন প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক কালিদাস ঘোষ মহাশয়।
"প্রথমে ভেবেছিলাম যে, এনকাউন্টার নিয়ে কোন পোষ্ট করবো না, কারণ এতে কারো কারো গোঁসা হতে পারে | কিন্তু পরে দেখলাম মুখ বন্ধ করে রাখা মানে ঘটনাকে সমর্থন করা | তাই আজকের পোষ্টে চেষ্টা করবো একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিস অফিসার হিসাবে ঘটনার বিশ্লেষন করার |
বারুইপুরে এক ১২ বছরের কিশোরীকে ধর্ষন ও খুনের ঘটনায় পুলিস তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল | এই তিনজনের মধ্যে একজন ছিল প্রভাস মন্ডল নামে এক যুবক | প্রভাস মন্ডল আদালতের নির্দেশে পুলিস হেপাজতে ছিল | Crime reconstruction করার জন্যে গত মঙ্গলবার রাত পৌনে একটার সময় পাঁচজন পুলিস অফিসার প্রভাস মন্ডলকে নিয়ে সেই জলাশয়ের কাছে যায় যেখান থেকে কিশোরীর বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল | সেখানে পৌছনোর পর প্রভাস মন্ডল হঠাৎই এক পুলিস অফিসারের রিভলবর ছিনতাই করে গুলি চালিয়ে পালাবার চেষ্টা করে | তখন অপর একজন অফিসার দুই রাউন্ড গুলি চালালে প্রভাস গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায় | রাত সাড়ে তিনটার সময় প্রভাসকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষনা করে | এই হচ্ছে সংক্ষেপে ঘটনা |
ঘটনার বিবরণ পড়ে একজন প্রাক্তন পুলিস অফিসার হিসাবে আমার মনে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে সেইগুলো নিচে লেখার চেষ্টা করলাম | প্রথমেই যে কথাটি সবাইকে স্মরন করিয়ে দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি তা হলো পুলিস কাউকে গ্রেপ্তার করা মানেই সেই ব্যক্তি অপরাধী হয়ে যায় না | যতক্ষন পর্যন্ত না আদালত কোন অভিযুক্তকে অপরাধী বলে রায় দিচ্ছে ততক্ষণ সে নিরপারাধী |পুলিসের কাজ তদন্ত করা, বিচার করা নয় | সুতরাং প্রভাস মন্ডলকেও এই ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না | ভারতের আইন অনুযায়ী কোন অভিযুক্ত পুলিসের কাছে যতোই স্বীকারোক্তি করুক না কেন আইনে তার কানাকড়িও মূল্য নেই | সুতরাং এই ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে যে প্রভাস মন্ডল একজন অভিযুক্ত ছাড়া আর কিছু নয় | এবার আসি ঘটনার বিশ্লেষণে |
প্রথমত, যে কোন Crime reconstruction বা অপরাধের পুনর্ঘটনের সময় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা ভিডিওগ্রাফি করে রাখতে হয় যা Exhibit বা প্রামন্য নথি হিসাবে কোর্টে পেশ করতে হয় | এই ক্ষেত্রে পুলিসের সাথে ভিডিওগ্রাফি টিম ছিল কি ?
দ্বিতীয়ত রাতের অন্ধকারে ভিডিওগ্রাফি করা কি সম্ভব ?
তৃতীয়ত, পুলিস অভিযুক্ত প্রভাস মন্ডলকে নিয়ে রাত পৌনে একটার সময় থানা থেকে ঘটনাস্হলের দিকে যাত্রা করে | রাত সাড়ে তিনটার সময় গুলিবিদ্ধ অবস্হায় প্রভাসকে নিয়ে পুলিস পার্টি হাসপাতালে পৌছায় | এই দুই ঘন্টা পনেরো মিনিট পুলিস যা করেছে তার ভিডিও কী পুলিসের কাছে আছে ?
চতুর্থত, অপরাধের পুনর্ঘটনের সময় দুইজন স্হানীয় ব্যক্তিকে স্বাক্ষী হিসাবে ঘটনাস্হলে রাখতে হয় | যারা পুলিসের তৈরি করা Crime reconstruction রিপোর্টে সহি করেন এবং কোর্টে শুনানির সময় তাদের স্বাক্ষ্য দিতে হয় | এই ক্ষেত্রে কোন স্হানীয় ব্যক্তিকে স্বাক্ষী হিসাবে রাখা হয় নি কেন ?
পঞ্চমত, যদি থানা থেকে ঘটনাস্হলে পৌছনো এবং সেখান থেকে হাসপাতালে পৌছনোর জন্যে দেড় ঘন্টা সময় বাদ দিই তাহলে বাকি ৪৫ মিনিট ধরে পুলিস কী করেছিল ? এই ৪৫ নিনিটের ভিডিওগ্রাফি কি পুলিসের কাছে আছে ?
ষষ্ঠত, অফিসারদের রিভলবর সবসময় একটা কর্ডের (লেন্ ইয়ার্ড) সাহায্যে এমনভাবে কাঁধের সাথে বাঁধা থাকে যেখান থেকে কারো পক্ষে রিভলবর ছিনতাই করা একেবারে অসম্ভব | এই ক্ষেত্রে প্রভাস কী করে রিভলবর ছিনতাই করলো ? তবে কি অফিসার ইচ্ছাকৃত ভাবেই লেন ইয়ার্ড ব্যবহার করে নি ?
সপ্তমত, ঘটনাস্হল হিসাবে যে জায়গা টাকে চিহ্নিত করা হয়েছে সেটা একটা ঝোপঝাড় বেষ্ঠিত কর্দমাক্ত জায়গা | প্রভাস মন্ডলের মতো একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে ঝোপঝাড় পেরিয়ে কর্দমাক্ত জলা জমির উপর দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ছুটে পালানো সম্ভব ?
অষ্টমত, বলা হচ্ছে মোট তিন রাউন্ড গুলি চলেছিল | অথচ আশে পাশের কেউ গুলির শব্দ বা পুলিসের উপস্হিতি টের পেল না কেন ?
নবমত, পুলিসের মতে যেটা সিন্ অফ ক্রাইম বা ঘটনাস্হল সেটা পুলিসের নজরদারিতে রাখা হলো না কেন ?
দশমত, গ্যাং রেপ্ ও মার্ডারের মতো একটা ঘৃণ্য অপরাধের সাথে যুক্ত অভিযুক্তকে রাতের অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া হলো অভিযুক্তের হাতে হ্যান্ডকাফ্ ও মাজায় দড়ি ছাড়া | এই গাফিলতি কি ইচ্ছাকৃত ?
একাদশতম, সমাজ মাধ্যমে একটা ভিডিও প্রচারিত হয়েছে যেখানে দুইজন অভিযুক্তের মধ্যে বদানুবাদ হতে শোনা গেছে | এই বাদানুবাদের সময় প্রভাস রাজা নামে এক ব্যক্তির নাম বলেছিল | সেই রাজা কি গ্রেপ্তার হয়েছে ?
দ্বাদশতম, যে প্রভাসকে শান্তনু মন্ডল নামে এক বিজেপি নেতা তার বাড়ি থেকে একা ধরে নিয়ে এল, কোন রকম ভাবে প্রভাস পালাবার চেষ্টা করলো না সেই প্রভাস পুলিসের রিভলবর ছিনতাই করে এক রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করলো এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ?
সর্বশেষে, প্রভাসকে বারবার নিজেকে নির্দোষ বলতে শোনা গেছে, অথচ সে ঘটনার সাথে যুক্তদের পরিচয় জানতো | তাই প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার জন্যে প্রভাসকে সরিয়ে দেওয়া হলো না তো ?
এই এনকাউন্টারের মধ্যে যে অনেক ফাঁক ফোঁকর আছে তা সহজেই বুঝতে পারা যায় | পিএম রিপোর্ট সামনে এলে আরো পরিস্কার হবে ব্যাপারটা |
কালিদাস ঘোষ
জলপাইগুড়ী
০৯.০৭.২০২৬