১০ বছরে বন্ধ ৯৪ হাজার স্কুল, রিপোর্টে উদ্বেগ"
নবনীতা মণ্ডল
নয়াদিল্লি, ১০ জুলাই : সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল ছবিটা বেআব্রু হয়ে গেল নীতি আয়োগের রিপোর্টে। ২০২৬-এর ওই রিপোর্ট অনুযায়ী গত ১০ বছরে দেশে বন্ধ হয়ে গিয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার স্কুল। এই হিসাব ধরলে দিনে ২৫টি করে সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে দেশে। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে সরকারি শিক্ষার এই উদ্বেগজনক ছবি ধরা পড়েছে।
হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে, লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে। ওই রিপোর্টে বিপরীত ছবিটাও উঠে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি স্কুল গজিয়ে উঠেছে একের পর এক। ওই ১০ বছরে দেশে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা ২.৮৮ লক্ষ থেকে লাফিয়ে বেড়ে হয়েছে ৩.৩৯ লক্ষ। ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ওই রিপোর্ট অনুযায়ী মোট স্কুলের প্রেক্ষিতে ১৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ শতাংশ।
ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪-’১৫ শিক্ষাবর্ষে দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১১.০৭ লক্ষ। ২০২৪-’২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১০.১৩ লক্ষ। অর্থাৎ সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই সাধারণ ঘরের পড়ুয়ারাও চড়া ফি দিয়ে বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে আরেকটি পেরেক পোঁতা হল বলে আশঙ্কা উসকে দিচ্ছে নীতি আয়োগের রিপোর্টটি।
সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সপক্ষে পরিকাঠামোর সংযুক্তিকরণ অর্থাৎ ছোট স্কুলকে বড় স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার যুক্তি খাড়া করেছে কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি মারাত্মক। এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে গ্রামীণ এলাকায়। বিশেষ করে ছাত্রীরা ঘরের কাছের স্কুল না পেয়ে দূরবর্তী স্কুলে যেতে বাধ্য হওয়ায় মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হল, দেশে প্রায় ৭,৯৯৩টি স্কুল এখন পড়ুয়াশূন্য।
এই শূন্য-নথিভুক্ত বা জিরো এনরোলমেন্ট স্কুলের তালিকায় দেশে শীর্ষে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাম। এই ধরনের স্কুলের সংখ্যা বাংলায় ৩,৮১২। ছাত্রহীন এই স্কুলগুলো খাতা-কলমে চালু থাকায় সরকারি অর্থের অপচয় তো হচ্ছেই, বেআব্রু হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনের কঙ্কালসার চেহারাও।
রিপোর্টে স্কুলছুটের দেওয়া খতিয়ানও শিউরে ওঠার মতো। প্রাথমিক স্তরে (প্রথম থেকে পঞ্চম) স্কুলছুটের হার ০.৩ শতাংশ হলেও, নবম-দশম শ্রেণিতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, অষ্টম শ্রেণি পার করার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ পড়ুয়া। এজন্য শিক্ষার অধিকার আইনের বয়সসীমা (১৪ বছর) শেষ হয়ে যাওয়া এবং দারিদ্র্যকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু পরিকাঠামোই নয়, শিক্ষার গুণগতমান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নীতি আয়োগ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্লাস নাইনের বহু পড়ুয়া আজও শতকরা, ভগ্নাংশ বা অনুপাতের অঙ্ক বোঝে না। মুখস্থবিদ্যার দাপটে তলানিতে ঠেকেছে বাস্তব বুদ্ধি। পরিকাঠামোর হাল এমনই যে, দেশের প্রায় অর্ধেক সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে বিজ্ঞান গবেষণাগার নেই। এই সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গেও কম নয়।
উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৪০ হাজার) স্কুল বন্ধ হয়েছে। কেরল বা পুদুচেরি কিছুটা আলো দেখালেও দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারায়। জিডিপি-র ৬ শতাংশ শিক্ষাক্ষাতে বরাদ্দের দাবি ১৯৬৪ সাল থেকে উঠলেও ২০২৬ সালেও তা ৪.৬ শতাংশে থমকে আছে। নীতি আয়োগের এই রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানা চরম সংকটে পড়ে আছে।
প্রাথমিক স্তরে শেখার ঘাটতি পরবর্তী শ্রেণিতেও থেকে যাচ্ছে, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে রিপোর্টে দাবি করেছে নীতি আয়োগ।"
এই সময় পত্রিকা