মিশন রো-তে কোল ইন্ডিয়ার অফিসের বিপরীতে হাওড়া মোটর্স এর যে প্রাচীন দোকান ও কারখানা তারই ফুটপাথে ছোলা বাটোরে নিয়ে বসতেন এক পাঞ্জাবি পরিবার। সম্ভবত বাবা ও ছেলে। অত্যন্ত বিনয়ী। খুব যত্ন করে পরিবেশন করতেন আমাদের। খাবারের মূল্য বেশ সস্তা। দুটি বাটোরের সঙ্গে একবাটি ছোলে, কেউ পরে একটা বাটোরে নিলে দাম আলাদা। তবে বাটোরেতে ছোলে মাখিয়ে খেতে গিয়ে যদি কারোর একটু কম পড়ত, তখন বাড়তি একটু ছোলে চাইলে তাঁরা সবিনয়ে তা দিতেন। যদি আমার হিসেবে বলি, তাহলে ওই অফিস পাড়ার চত্বরে এই পিতা-পুত্রের দোকানটিই প্রাচীন, অবশ্য যদি একে সেই অর্থে দোকান বলা যায় —- আসলে ফুটপাথের স্টল। এবার যদি আমরা পুবে হাঁটতে থাকি তাহলে ‘হিন্দ সিনেমা’র একটু আগে যেখানে সারা বাংলা শিক্ষক সভা বা এবিটিএ র ‘সত্যপ্রিয় ভবন’। বলে রাখা ভাল, বি এড নামক একটা শিক্ষাক্রম যা শিক্ষকদের অবশ্য করণীয় বলে একসময় মনে করা হত, আর, এখন যা স্কুলের চাকরিতে বাধ্যতামূলক —- ‘সত্যপ্রিয় ভবন’এ এবিটিএ-র পক্ষ থেকে ওই বি এড পাঠ্যক্রম পড়ানো হত খুব সামান্য অর্থমূল্যে। সেই ভবনে ঢুকবার গলির মুখে একটা সি ই এস সি র অফিস। তার সামনে বসেন তিন-চার জন খাবার বিক্রেতা। এঁদের মধ্যে একজনের কাছে পাওয়া যায় ছোলে বাটোরে। কিন্তু ইনি পঞ্জাবি নন, বাঙালি। স্বাদে যে কিছু তফাত আছে তা নয়। কিন্তু লক্ষ করার কথা এটাই যে একটা ভিন প্রদেশের খাবার আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ঢুকে পড়ছে আর তার প্রকরণ নিয়ে বাংলাভাষীরাও চমৎকার মানিয়ে নিচ্ছেন। সঠিক কোনো সমীক্ষা হয়েছে কি না আমার জানা নেই, তবে কলকাতার ফুটপাথ জুড়ে রকমারি ক্রেতার যে বিপুল সংখ্যা সেখানে এই পারস্পরিক খাদ্যাভ্যাসে ফিউশন ঘটেছে কোনো বাড়তি বিজ্ঞাপন বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আনুকূল্য ছাড়াই। বাংলার সহজিয়া লৌকিক সংস্কৃতিতে যেভাবে সমস্ত ধর্ম বর্ণ জাতি উপজাতি সম্প্রদায়ের এক উদার মিশেল আমাদের গর্ব, এটাও তার থেকে কোনো অংশে কম নয়। আজকে বহুজাতিক কন্টিনেন্টাল রেস্তোরায় শুনি নানা দেশের খাবার পাওয়া যায় বেশ চড়া দামে —-- কোথাও থাইল্যান্ড কোথাও বার্মিজ, কোথাও মালয়েশিয়া, কোথাও আরব বা ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু এসবের অনেক আগেই কলকাতার খাবার পথে শক হূনদল পাঠান মোগল একই থালায় লীন হয়ে বসে আছেন ঢের আগে থেকেই। বিষয়টা আমরা সেভাবে খেয়াল করিনি।
একই জিনিস বলা যাবে চাইনিজ খাবার নিয়েও। দশ নম্বর গণেশচন্দ্র এভিনিউ বাড়িটির পাশে আছে একটা ছোটো পেট্রোল পাম্প আর তার পিছনের একটা প্রাচীন বাড়ি। সেই বাড়ির তিনতলায় বাস করতেন এক পুরোনো চিনা পরিবার। প্রায়ান্ধকার ওই বাড়ির তেতলায় উঠলে দেখতে পাওয়া যাবে ওই চিনা পরিবারটি নিজেদের বাড়ির ভিতরেই চালান একটি রেস্টুরেন্ট। সেখানে পরিবারের কেউ কর্মী, কেউ পরিবেশক। নিজেদের বসার বা খাবার ঘরের চওড়া আয়তক্ষেত্রে তাঁরা পেতে রেখেছেন গোটা চারেক টেবিল, অতিথিদের জন্য। এঁদের কাছে গেলে এঁরা আপনাকে নিজের বাড়ির মানুষের মতো বসিয়ে যত্ন করে খাওয়াবেন। খাবারের প্রস্তুত প্রণালী একেবারে চৈনিক শাস্ত্রসম্মত, কারণ সেটা তাঁদের পারিবারিক কালচারের অঙ্গ। নতুন চাকরি পাওয়ার পর আমরা জনা পাঁচেক বন্ধু টিফিনের অবসরে একবার খেতে গিয়েছিলাম তাঁদের বসতভিটা কাম রেস্টুরেন্টে, সে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। বছর কয়েক আগে পরিবারের শেষ কর্মক্ষম সদস্যের মৃত্যুর পরে আজ সেই ঘরোয়া রেস্তোরা আজ উধাও। কিন্তু এই চিনে খাবার যখন পথের খাবার হিসেবে ভোজ্য তালিকায় এসে পড়ে তার এক মেটামরফোসিস হয়ে যায়। যে এলাকার মধ্যে আপাতত আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি সেখানে অন্তত পাঁচজন বিক্রেতা আছেন যারা পথের পরিভাষায় ‘রাইস’ ও ‘চাউ’ বানান। একজন আছেন ওই এলাকার সুবিখ্যাত ইলেক্ট্রনিক তথা কম্পিউটার শোরুম ‘সাবু কম্পিউটার’ এর সামনে। দুটো ডেকচির একটায় সিদ্ধ সাদা ভাত, অন্যটায় সিদ্ধ চাউমিন। পাশে বিভিন্ন পাত্রে মুরগির টুকরো, নানা রকম সস, ডিম, কুচিয়ে রাখা আনাজ। খদ্দের যদি ভেজ চান তাহলে রাইস বা চাউয়ে মিশবে শুধু আনাজ আর সস। ‘মিক্সড’ চাইলে মুরগির কুচি আর ডিমের মিশেল, এগ রাইস হলে কেবল ডিম সঙ্গে আনাজ। এটা যিনি বানান তিনি হিন্দিভাষী। চিনদেশের ঠিকানা তিনি জানেন বলে মনে হয় না। আর তার খদ্দেররাও ওইটুকুতেই দিব্যি সন্তুষ্ট। তাঁরা চায়না টাউনের দামি রেস্তরার খাঁটি চাইনিজের নাগাল পান না আর তেমনভাবে চানও না।
আরও যারা এই একই রেসিপি নিয়ে আপিস অঞ্চলে করে কম্মে খাচ্ছেন তাঁদের একজনকে পাওয়া যাবে মিশন রো-র ওল্ড মিশন চার্চের বিপরীতে স্টিফেন হাউসের পুবমুখী গেটের সামনে। একজন আছেন চাঁদনী চক মেট্রো স্টেশনের পাশে হিন্দুস্থান বিল্ডিং অ্যানেক্স এর সামনে, আরেকজন সেই ‘হিন্দ সিনেমা’র কাছে, বাকি জন তারই বিপরীতে। এর সব কটিতেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গিয়ে দেখেছি, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর এক এবং প্রত্যেকেই অফিসপাড়ার খদ্দেরদের রসনা তৃপ্ত করে চলেছেন একরকমের পরিবর্তিত ‘চাইনিজ’ এর আস্বাদে, আসলে যা বঙ্গীকৃত — ক্ষুৎকাতর ‘বং’-রা দিব্যি তা উদরস্থ করে নিচ্ছেন প্রফুল্লচিত্তে। এঁদের কারোরই সংগতি নেই চৈনিক শেফ রাখার। কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি, সীমিত পকেটের উপভোক্তা সস্তায় পেটভরা খাবার চান —- সেটুকু পেলেই খাবার পথ, পথিকের কাছে মরূদ্যান। এগুলো সবই নয়ের দশকের অভিজ্ঞতা, হতে পারে এখন এই সংখ্যার হেরফের ঘটেছে। তবে তা কমতির দিকে বলে মনে হয় না। আপিস পাড়ার খাবার পথে এত অগণন পথিক যে ছোটো বাণিজ্যের এই নাগরদোলায় দুলে দুলে নিজেদের সংসার যারা চালাতে পারেন তাঁরা চট করে ভিন্ন পেশায় যাবেন বলে মনে হয় না। তাছাড়া, পরের দশকগুলোয় রাজ্যের আর্থিক উন্নয়ন বা কাজের সু্যোগ এমন কিছু বাড়েনি যে যাবার পথের পাশে পাশে খাবার পথ একেবারে ‘পথিকহীন বিজনভূমি’ হয়ে যাবে, ফলে খাবার পথ আর যাবার পথে ভিড় ক্রমশ বেড়ে গেছে বলেই মনে হয়। একেবারে অসংগঠিত উদ্যোগে এখানে যে অর্থনীতি সচল থাকে বিশেষ পণ্ডিতেরা তার কতটা খোঁজ রাখেন কে জানে !
ভিন প্রদেশের খাদ্যের মধ্যে দোসা, ইডলি বা বড়া আপিস পাড়ায় বেশ জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চৌহদ্দির ভিতর দাঁড়িয়ে এখানে বরং বলা যাবে, এই খাবার তৈরির মালিকানা সেইভাবে দক্ষিণীদের হাত থেকে সরে যায়নি। হয়তো তার একটা বড় কারণ এতে এমন কিছু সিক্রেট মেথড আছে যা অ-দক্ষিণীরা অনায়াসে রপ্ত করতে পারবেন না। যেমন দোসার একরকম দোসর বাঙালি পরিবারের ‘সরুচাকলি’ নামক খাবারটি, যার তাক আর তুক এমন গোপন যে সকলের হাতে তা নির্মিত হতে পারে না। কতবার মাকে দেখেছি বেগুনের বোঁটা দিয়ে তাওয়ায় সরুচাকলির গোলা দিয়ে আর তাকে ম্যানেজ করতে পারেনি। তেমনই দোসা নামক মূল খাবারটির খুব বেশিমাত্রার রকমফের হলে তা ভোক্তাদের মনোমতো হবে না। ফলে আমরা যে এলাকার মধ্যে বিচরণ করছি সেখানে তিনজন আছেন যারা বিশুদ্ধ দক্ষিণী এবং তাঁদের দেশোয়ালি খাবার বিকিয়ে পেট চালাচ্ছেন। একটি অবশ্য পাকা দোকান, এর কথা আগেই বলেছি, ম্যাড্রাস কাফে—- মোটামুটি ‘সাবির হোটেল’ এর রাস্তায় ঢুকে ডানদিকে। যেহেতু চেয়ার টেবিল পেতে খাওয়া যায় তাই দাম একটু বেশি, তাছাড়া সেখানে কফিও পাওয়া যায়। অন্যজন অবশ্য একেবারেই পথের ওপর —- ওই ‘হিন্দুস্থান বিল্ডিং’ ডাকঘরের ঠিক বিপরীতে। দুটি মানুষ চালান স্টলটা। একজন খাবার তৈরি করেন আরেকজন হাতে হাতে এগিয়ে দেন, আবার তিনিই থালা ধুয়ে রাখেন। বিক্রিবাটা প্রচুর। ইডলি, বড়া আর দোসা, এই তিন আইটেম দুপুরবেলায় হটকেক। অন্য আরেক বিক্রেতাকে খুঁজে পেয়েছি গণেশচন্দ্র এভিনিউ আর চিত্তরঞ্জন এভিনিউএর সংযোগস্থলের চারমাথায় পুরোনো খাদি গ্রামোদ্যোগ ভবনের বিপরীতে মেট্রো স্টেশনের বেরোনোর গেটের একেবারে গায়ে। এখানেও দুজন, মোটামুটি কাজের বিভাজন একই। এখানে অফিসপাড়ার একজন পুরোনো টিফিনপ্রেমিক হিসেবে একটা কথা হয়তো বলা দরকার। এই দক্ষিণী খাবার বিষয়ে ক্রেতার একটা চয়েস যখন তৈরি হয় তখন তিনি মনে করতে থাকেন এই খাবারটা ওই প্রদেশের মানুষরাই বোধহয় ঠিকঠাক বানাতে পারবেন। এবং একেবারে ফুটপাথের খাবার দোকানের স্তরে এমন মানুষ যেহেতু বিরল নয় যারা প্রাদেশিক খাবারের গুণমান বজায় রেখেই তা তৈরি করতে পারছেন, তাই তাঁদের বিক্রিবাটায় ভাঁটা পড়ে না। কারণ কলকাতা শহরে অভিজাত বা অনভিজাত প্রচুর দক্ষিণী মানুষ এখনো থাকেন। বিপরীতপক্ষে কলকাতা শহরে এমন কোনো চিনা মানুষ নেই যারা পথে খাবারের স্টল দিতে পারেন। চায়না টাউন সমেত সারা কলকাতার চিনে রেস্তোরাঁয় হয়তো সেইসব শেফরা যুক্ত আছেন তাঁদের হাতের সুস্বাদ পেতে গেলে আমাদের অনেকটা পকেটের কড়ি খসাতে হয়। সেটা মাসে-দুমাসে একদিন চলতে পারে, প্রতিদিনের অভ্যাসে নয়। তাছাড়া, আমার এ বিষয়ে একটু ভিন্ন সংশয় আছে। যতদূর খবর নিয়ে দেখেছি, কলকাতা শহরে চিনারা যে তিনটি প্রধান জীবিকায় যুক্ত ছিলেন তার মধ্যে জুতো তৈরি ও দাঁত তোলার পেশায় তাঁরা এখন অনুপস্থিত। আরেকটা অন্ধকার পেশার সঙ্গেও একসময় চিনাদের নাম জুড়ে গিয়েছিল, তা হল আফিম ও কোকেন পাচারের পেশা। লালবাজারে যে চিনাপাড়া আছে সেটাই ছিল ওই পেশার মূল ঠেক। এটা অবশ্য প্রাক-স্বাধীনতা আমলের কথা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সত্যান্বেষী’ ব্যোমকেশ কলকাতায় তার প্রথম তদন্তে নেমেছিল এই পাড়াতেই (১৯৩৪), "সত্যান্বেষী" শিরোনামের সে গল্প আমরা সবাই পড়েছি ও ইদানিং ফিল্মও দেখেছি। সে যাই হোক, চিনা খাবারের প্রচলন কয়েক দশকে বিপুল বেড়েছে, নামী নামী ফুডচেন চিনা খাবারের বিপণি খুলেছেন, প্রতিটি শপিং মলের ফুড কোর্টে চিনে খাবারের কাউন্টার আছে। কিন্তু এত যোগ্য চিনা রাঁধুনি কি আদৌ শহরে আছেন ? জনসংখ্যার একটা সমীক্ষা রিপোর্টে দেখছি, এখন শহরে চিনা নাগরিকের সংখ্যা দুহাজারের বেশি নয়, তাঁদের মধ্যে কজন চিনা রান্নার নির্ভরযোগ্য রাঁধুনি হতে পারেন? ফলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চকচকে সব চিনা ইটিং হাউসেই যে বিশেষজ্ঞ চৈনিক রান্নার লোক আছেন তা হয়তো নয়। কারণ, এইসব রেস্তোরাঁয় গিয়ে আমরা যখন খাবার অর্ডার করি তা ওয়েটারের হাত বেয়ে চলে যায় রেস্তোরার অন্দরমহলে, সেই মহল আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। কারা সেখানে খাবার বানান ? তারা কি সব চিন দেশের প্রশিক্ষিত শেফ ? আমরা কিন্তু জানি না। যাবার পথে পথে যেসব খাবার পথের বিপণি সেখানে কিন্তু কোনো আড়াল আবডাল নেই। সবটাই সোজা সাপটা যার কোনো অন্তরমহল নেই —- এই চরিত্র লক্ষন যেন আমরা ভুলে না যাই।
পরের পর্ব ৩০ আগস্ট, রবিবার