এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  রাজনীতি

  • নেতাজি, সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ ও কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলনঃ কিছু মিথ ভাঙা

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ২৭৩ বার পঠিত
  • নেতাজি ও সাভারকর
    নেতাজি ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে এলগিন রোডে একমাস ধরে নজরবন্দী থাকার পর আচমকা গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে জার্মানি পালিয়ে যান।

    সাভারকরের সংগে কবে শেষ দেখা?
    ২২শে জুন ১৯৪০; নেতাজি নিজে বোম্বাইয়ের দাদারে সাভারকর ভবনে গিয়ে ওনার সংগে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।

    গল্প একঃ নেতাজি নাকি সাভারকরের নির্দেশে জার্মানি গিয়েছিলেন।
    তথ্যসূত্রঃ ধনঞ্জয় কীরের লেখা সাভারকরের প্রথম জীবনী, ‘Veer Savarkar’ p. 260. Popular Prakashan, Bombay, 1966. এই জীবনীর প্রথম সংস্করণ সাভারকরের জীবিত থাকার সময় লেখা।

    সেদিন কী কথা হয়েছিল তা রয়ে গেছে সুভাষের লেখায় ও বেতার বার্তায়।
    জার্মানি যাবার পর ওই সাক্ষাতকার নিয়ে সুভাষ লিখেছেন, ‘ দেখা গেল সাভারকর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে অবহিত নন। ওঁর একটাই চিন্তা—কী করে হিন্দুদের ভারতের ব্রিটিশ ফৌজে ঢুকিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়’।
    তথ্যসূত্রঃ নেতাজির নিজের বই, “The Indian Struggle”, pp-34.

    সুভাষ চন্দ্র সেই সময়ে জিন্নার সঙ্গে দেখা করেও একই রকম হতাশ হয়েছিলেন। দেখলেন জিন্নারও একটাই চিন্তা – কী করে আলাদা একটা পাকিস্তান বানানো যায়।

    তাই সুভাষ চন্দ্রের ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা ফুটে বেরোল জার্মানী থেকে অগাস্ট ১৯৪২ এর বেতার ঘোষণায়। প্রথমে উনি বললেন যে ভারত ছোড়ো আন্দোলন সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছে।ওই আন্দোলন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে।
    তারপর উনি জিন্নাহ্‌ এবং সাভারকরকে একাসনে বসিয়ে প্রকারান্তরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল বললেন।

    ওনার নিজের কথায়ঃ
    “I would request Mr Jinnah, Mr Savarkar and all those leaders who still think of a compromise with the British to realize once and for all that in the world of tomorrow there will be no British Empire. ------- The supporters of British Imperialism will naturally become non-entities in a free India.
    তথ্যসূত্রঃ Bose, Testament of Subhash Bose, pp 21-24. Also quoted in Vaibhav Purandare’s Savarkar. Pp—272.
     

    নেতাজির রাজনীতি নিয়ে সাভারকর কী ভাবতেন?
    ১৯৩৯ সালে পুণের জনসভায় সাভারকর সমালোচনা করলেন তিনজনের-- গান্ধীইজম, বোসইজম, রয়ইজম। আরও বললেন—ফরোয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। কারণ, “Bose did not differ very much from Mahatma Gandhi, except that he went further to woo the Muslims”.
    তথ্যসূত্রঃ Bombay Chronicle, 4th August, 1939. Also quoted in Vaibhav Purandare’s Savarkar. Pp—257.
    নেতাজির কথা অনেকখানি ফলে গেল।

    বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ভারতীয় জনগণের কাছে, বিশেষ করে হিন্দুদের কাছে, কংগ্রেস অধিক গ্রহণযোগ্য হল। হিন্দু মহাসভা নয়। ফলে ১৯৪৫ সালের শেষে ও ১৯৪৬ সালের গোড়ায় কেন্দ্রীয় সভা (সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলি—আজকের পার্লিয়ামেন্টের সমতুল্য) ও প্রাদেশিক সভায় হিন্দু মহাসভার অধিকাংশ প্রার্থীদের জামানত জব্দ হল। কেন্দ্রীয় সভায় হিন্দু মহাসভা একটা সীটও পেল না।
    শ্যামাপ্রসাদ একজন আনকোরা কংগ্রেসির কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হলেন। তথ্যসূত্রঃ Purandare, “Savarkar, The True Story of The Father of Hindutva”, p. 292 এবং অন্যান্য।

    কিন্তু বঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদের ভাবমূর্তি অত্যন্ত উজ্বল। তাই কেন্দ্রীয় সভার নির্বাচনে পরাজিত হলেও প্রাদেশিক নির্বাচনে (আজকের বিধানসভা) কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে উনি দাঁড়ালে সমস্ত দল ঠিক করল ওনার বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়া হবে না। উনি নির্বিরোধ নির্বাচিত হলেন।

    একটু পিছিয়ে যাই।

    হিটলার ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ তারিখে পোল্যান্ড আক্রমণ করায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল।
    অক্টোবর মাসে কংগ্রেস তার সদস্য মন্ত্রীদের দেশের সমস্ত প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দিল।

    সাভারকর কী করলেন?
    তিনি অক্টোবর ৯, ১৯৩৯ তারিখে ভারতের বড়লাট বা ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো’র সঙ্গে বোম্বেতে দেখা করলেন এবং তাঁকে জাপানের বিরুদ্ধে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।

    লিনলিথগো তখন ব্রিটিশ ভারতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি অফ স্টেট লর্ড জেটল্যান্ডকে রিপোর্ট করলেনঃ
    সাভারকর বলেছেন যে হিজ ম্যাজেস্টি’জ গভর্নমেন্টকে এখন অতি অবশ্যই হিন্দুদের উপর নির্ভর করে তাদের সমর্থন নিয়ে কাজ করতে হবে। --- আমি জানি যে উনি একসময় বিপ্লবী ছিলেন। কিন্তু হিন্দুইজম এবং ব্রিটেন এখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আগের শত্রুতা অপ্রাসংগিক হয়ে গেছে।
    India Office (IO) MSS EMF 125/8 1939, Letters to the Secretary of India. Margia Casleri’s paper in Economic and Political Weekly, January 22, 2000, p-226.

    কারণ, সুভাষচন্দ্র এবং রাসবিহারী বসুর বিপরীতে সাভারকর বিশ্বাস করেননি যে বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বে।

    ১৯৪০ সালে হিন্দু মহাসভার ২২তম অধিবেশনে (মাদুরাই) সভাপতির অভিভাষণে তিনি যুক্তি দিলেনঃ
    It is altogether improbable that England will be defeated in this war, so disastrously as to get compelled to hand over her Indian Empire, lock, stock and barrel into the German hands”.
    (ভি ডি সাভারকর, “সমগ্র সাভারকর বাঙ্ময়ঃ হিন্দু রাষ্ট্র দর্শন, খন্ড ৬, প্রকাশক মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দুসভা, পুণা, ১৯৬৩, পৃঃ ৪১৯। )

    আরও বললেন যে এখন বৃটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চিন্তা অবাস্তব। হিন্দু মহাসভা এসবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।
    “Not only on moral grounds but on the grounds of practical politics, we are compelled not to concern ourselves on behalf of the Hindu Mahasabha organisation with any programme involving armed resistance, under the present circumstances”. (ঐ পৃঃ ৪২১)

    তাহলে কী করা উচিত?
    এই সুযোগে হিন্দুদের এক মিনিট দেরি না করে ব্রিটিশ ফৌজে যোগ দেয়া উচিত যাতে তাদের Militarization and industrialization সম্ভব হয়। ( ঐ, পৃঃ ৪২৭)

    হিন্দু মিলিটারাইজেশন বোর্ড গঠন হবার পর সাভারকর দলের ক্যাডারদের উৎসাহের সঙ্গে জানালেন যে কাজ হচ্ছে। বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে ব্রিটিশ ফৌজের রিক্রুটিং কমিশনার এবং অন্যান্য অফিসারেরা হিন্দু মহাসভা দ্বারা স্থাপিত হিন্দু মিলিটারাইজেশন বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। (ভি ডি সাভারকর, “সমগ্র সাভারকর বাঙ্ময়ঃ হিন্দু রাষ্ট্র দর্শন, খন্ড ৬, প্রকাশক মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দুসভা, পুণা, ১৯৬৩, পৃঃ ৩৫৪।)

    হিন্দু মহাসভা জেনারেল ওয়াভেলের অধীনে ডিফেন্স কমিটিতে যুক্ত হল। কালিকর এবং যমনাদাস মেহতার নিযুক্তিতে সাভারকর সন্তোষ প্রকাশ করে ভাইসরয় এবং জেনারেল ওয়াভেলকে জুলাই ১৮, ১৯৪১ তারিখে টেলিগ্রাম পাঠালেন।(ঐ, পৃঃ ৪৫১।)

    ওদিকে জানুয়ারি ১৯৪১শে নেতাজি সুভাষ কোলকাতা থেকে গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে এপ্রিল নাগাদ জার্মানি পৌঁছে গেছেন।
    একবছর পরে অগাস্ট ১৯৪২ তারিখে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে দেশজুড়ে ‘ভারত ছোড়ো’ আন্দোলন শুরু হল। পরের মাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করলেন।
    স্পষ্টতঃ বৃটিশ সাম্রাজ্যের আসন্ন ধ্বংসের ব্যাপারে সাভারকর আশ্বস্ত ছিলেন না।

    হিন্দু মহাসভা মুসলিম মন্ত্রীসভায় যোগ দিল! কেন?
    অক্টোবর ১৯৩৯শে প্রাদেশিক আইনসভাগুলো থেকে কংগ্রেস বিধায়করা পদত্যাগ করলে হিন্দু মহাসভা পাকিস্তান সমর্থক মুসলিম মন্ত্রীসভায় যোগ দিল।
    মানে, মুসলিম মেজরিটি অঞ্চলে আইনানুযায়ী ওদেরই বেশি প্রধিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে অবিভাজিত বাঙলা, সিন্ধ এবং উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সরকার গঠনে, দল আলাদা হলেও, মুসলিম সমুদায়ের অহম ভূমিকা ছিল।

    যেমন, বঙ্গে কৃষক প্রজা দলের ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা, সিন্ধে মুসলীম লিগের হিদায়েতুল্লার এবং সীমান্ত প্রদেশে লীগেরই অওরংগজেব খানের। সাভারকর নিজের দলের লোকদের ওইসব মন্ত্রীসভায় অল্পসংখ্যক হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার যুক্তিতে যোগ দিতে বললেন

    এরপর কংগ্রেসি ও অন্যান্য সমালোচকের চোখে মহাসভার বিধায়কেরা অনেক ব্যঙ্গবিদ্রূপের লক্ষ্য হয়ে উঠলেন। কারণ, সিন্ধ প্রাদেশিক সভা মার্চ ১৯৪৩শে পাকিস্তানের পক্ষে প্রস্তাব পাশ করল। মহাসভার বিধায়কেরা প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু পদত্যাগ করলেন না। কারণ, এটাই ছিল সাভারকরের নির্দেশ। Purandare, “Savarkar, The True Story of The Father of Hindutva”, p. 277

    সাভারকর কানপুরে হিন্দু মহাসভার ২৪তম অধিবেশনে অধ্যক্ষের ভাষণে বললেন—প্র্যাকটিক্যাল পলিটিক্সে কিছু যুক্তিযুক্ত আপোষ করেই এগোতে হয়। তাই সিন্ধ প্রদেশে আমরা মুসলিম লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংযুক্ত সরকারে যোগ দিয়েছি। ---- বঙ্গে শ্রীফজলুল হকের মন্ত্রীসভায় আমাদের ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যোগ দিয়েছেন। এক বছরের বেশি সময় এই মন্ত্রীসভা দুই সম্প্রদায়ের হিতে ভাল কাজ করছে। ( সাভারকর, সমগ্র রচনাসংগ্রহ, হিন্দু মহাসভা, পুণা, ১৯৬৩, পৃঃ ৪৭৯-৪৮০।)

    সাভারকর হিন্দু মহাসভার কর্মীদের জন্য বিশেষ নির্দেশ জারি করে বললেন— ব্রিটেনের শত্রু জাপানের আক্রমণের বিরুদ্ধে সরকারকে সাহায্য করতে হবে। অতএব, হিন্দু মহাসভার কর্মীরা বিশেষ করে বাংলা এবং আসামের হিন্দুদের জাগ্রত করে বলুক, ওরা যেন এক মিনিটও দেরি না করে ব্রিটিশ মিলিটারিতে যোগ দেয়। (সাভারকর, সমগ্র সাভারকর বাঙ্ময়ঃ হিন্দু রাষ্ট্র দর্শন, খন্ড ৬, পুণা, ১৯৬৩, পৃঃ ৪৬০)।

    বড় ব্যাপার হল যে অনেক হিন্দু মহাসভার সদস্যরাও সাভারকরের ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের বিরোধিতা এবং হিন্দু যুবকদের দলে দলে ফৌজে যোগ দেওয়ার আহ্বান নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল।

    সাভারকরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এন সি চ্যাটার্জি এ’ ব্যাপারে আরেক সাথী বি এস মুঞ্জেকে লিখলেন,’ সমস্ত হিন্দু জনতা গান্ধীজির এবং তাঁর আন্দোলনের সাথে রয়েছে। কেউ যদি এর বিরোধিতা করে তবে সে বরাবরের মত শেষ হয়ে যাবে এবং রাজনীতির আঙিনা থেকে বিতাড়িত হবে। বীর সাভারকরের (বিয়াল্লিশের আন্দোলনের বিরোধিতা করে) দুর্ভাগ্যজনক বক্তব্যটি বাংলায় আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে’। Guha, Ramchandra “Gandhi p. 684-85

    রাসবিহারী বসু মার্চ, ১৯৪২শে ( কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন শুরুর চারমাস আগে) টোকিও থেকে এক চিঠি লিখে সাভারকরকে অনুরোধ করলেন যাতে উনি বৃটিশের এই দুর্বল সময়ে ওদের সমর্থন না করেন, শত প্রলোভন এমনকি স্বাধীনতার আশ্বাসেও বিশ্বাস না করেন।-- দেশের সব অনিষ্টের মূল ব্রিটিশ শক্তিকে ধ্বংস করতে জাপানের সংগে হাত মেলালে কেমন হয় ? Rath & Chatterjee, “Rasbehari Bose”, p. 171-74.

    এই চিঠি লিখিত দস্তাবেজ। এবার সাভারকরের দস্তাবেজঃ “Not only on moral grounds but on the grounds of practical politics, we are compelled not to concern ourselves on behalf of the Hindu Mahasabha organisation with any programme involving armed resistance, under the present circumstances”. সাভারকর, হিন্দু রাষ্ট্রদর্শন, খন্ড ৬, পৃঃ ৪২১।

    এর পরেও গল্পকথাকে বিশ্বাস করবেন যে নেতাজি সাভারকরের নির্দেশ আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন?

    ইদানীংকালে সাভারকরের জীবনী নিয়ে একটি সিনেমা রিলিজ হওয়ার সময় চরিত্রটির অভিনেতা রণদীপ হুডা তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে দাবি করলেন যে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের প্রেরণা ছিলেন সাভারকর।

    তৎক্ষণাৎ নেতাজির প্রপৌত্র তথা ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাক্তন সাংসদ চন্দ্র কুমার বোস খন্ডন করে বললেন—ভুল। নেতাজির স্পিরিচুয়াল গুরু ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ এবং রাজনৈতিক গুরু ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। Hindustan Times, May 30, 2023.
     

    আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্রিগ্রেডগুলোর নাম দেখুনঃ সুভাষ ব্রিগ্রেড, গান্ধী ব্রিগ্রেড, আজাদ ব্রিগ্রেড এবং নেহেরু ব্রিগ্রেড। কোন সাভারকর ব্রিগ্রেড নেই!
     

    দ্বিতীয় গল্পঃ সাভারকরের ব্রিটিশ ফৌজে হিন্দুরিক্রুটমেন্টের ফলেই নাকি আজাদ হিন্দ ফৌজে এত এত ভারতীয় সৈনিক যোগ দিয়েছিল।

    দেখা যাক, আজাদ হিন্দ ফৌজ কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
    দু’দফায়। প্রথমবার ১৯৪২ সালে মালয় এবং সিংগাপুরের যুদ্ধবন্দী এবং পরে ১৯৪৩ সালে মালয়, সিংগাপুর, বার্মা ও থাইল্যান্ডের প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে। এই সব যুদ্ধবন্দীরা অনেক আগেই বৃটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির অংশ হিসেবে যুদ্ধে গিয়ে বন্দী হয়েছিল।

    সাভারকরের প্রতিনিধিরা জেনারেল ওয়াভেলের অধীনে যুদ্ধ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হল জুলাই ১৯৪১। রিক্রুট হয়ে ট্রেনিং করে যুদ্ধে গেছে অনেক পরে। ওদের ব্যবহার করা হয়েছিল বার্মায় ও মণিপুরে জাপানি ফৌজ এবং নেতাজির বাহিনীকে ঠেকাতে।
    ওরা জাপানি ফৌজ ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে মণিপুরের যুদ্ধে পরাস্ত করে এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের প্রতি নির্মম ছিল। McLynn Frank (2011), The Burma Campaign: Disaster into Triumph 1942 -45. Pp. 295-96.

    আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে সবচেয়ে অথেন্টিক বই মানা হয়ঃ Peter Ward Fay: The Forgotten Army. এছাড় আরো গবেষণা আছে। যেমন Lebra, Joyce C. অনুজ ধর ও চন্দ্রচুড় ঘোষের বই।
    এগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে অগাস্ট ৪২ এর আন্দোলনের পর মালয় পেনিনসুলাতেও জনগণের চিন্তায় প্রভাব পড়ে। ফলে দ্বিতীয় দফায় ১৯৪৩ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের রিক্রুটমেন্ট বেড়ে যায়।

    প্রতিষ্ঠাতা কম্যান্ডার হলেন জেনারেল মোহন সিং। এছাড়া যাদের উপরে প্রচারের আলোক পড়েছেঃ
    ক্যাপ্টেন প্রেম সায়গল, কর্নেল শওকত মালিক। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। ইনি সার্জন। দুই দশক পরে কানপুরে সিপিএম দলে যোগ দেন।

    ব্রিগ্রেড কম্যান্ডারদের নাম দেখুনঃ
    সুভাষ ব্রিগ্রেডঃ শাহ নওয়াজ খান (১/১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট);
    গান্ধী ব্রিগ্রেডঃ ইনায়েত জান কিয়ানি(৫/২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট);
    আজাদ ব্রিগ্রেডঃ গুলজারা সিং;
    নেহরু ব্রিগ্রেডঃ গুরুবকশ সিং ধিল্লোঁ (১/১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট) ;

    এছাড়া ছিল বাহাদুর গ্রুপ (স্পেশ্যাল সার্ভিস/ গেরিলা বা কম্যান্ডো ইউনিট)ঃ কর্নেল বুরহানুদ্দিন ও মেজর ফতে খান।
    আজাদ হিন্দ ফৌজের মটোঃ ইত্তেফাক, ইতমাদ অউর কুরবানি (হিন্দুস্তানি ভাষা), বাংলায় একতা, বিশ্বাস এবং আত্মত্যাগ।
    মার্চিং সংঃ “কদম কদম বঢ়ায়ে জা, খুশিসে গীত গায়ে যা!
    ইয়ে জিন্দগি হ্যায় কৌম কী, তো কৌম পে লুটায়ে যা।

    নেতাজির সেক্রেটারিঃ আবিদ হাসান সাফ্রানি, যিনি ‘জয় হিন্দ’ শ্লোগান জনপ্রিয় করেহিলেন।
    নেতাজির ড্রাইভার এবং বডিগার্ডঃ কর্নেল নিজামুদ্দিন, যিনি বার্মার জঙ্গলে ১৯৪৩ সালে নেতাজিকে একটি অ্যামবুশ থেকে বাঁচাতে নিজের শরীরে তিনটি বুলেট নিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন অপারেশন করে সেগুলো বের করেন।

    নেতাজির এডিসিঃ লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাবিবুর রহমান খান, নেতাজির বিশ্বস্ত মিলিটারি সেক্রেটারি।

    কোথায় সাভারকরের হিন্দু মহাসভার প্রভাব?
    খেয়াল করুন, তখন সাভারকর নেতাজির তীব্র সয়ালোচনা করেছিলেন সংস্কৃতের বদলে হিন্দুস্তানি বা উর্দু মিশ্রিত হিন্দিকে স্বাধীন ভারতে রাষ্ট্রভাষা হবে বলায়।
    নেতাজি নিজের বিশ্বাসে অটল। ওঁর মটো এবং মার্চিং সং দেখুন। হিন্দু কেন, কোন ধর্মের কথা নেই।
     

    বেয়াল্লিশের কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন এবং হিন্দু মহাসভা, শ্যামাপ্রসাদ ও সুভাষ চন্দ্র
    খানিকটা শ্যামাপ্রসাদের “লিভস্‌ ফ্রম আ ডায়েরি”( ১৯৩৯-৪৬), ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত, থেকে শোনা যাক।
    শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সাভারকরের নেতৃত্ব মেনে হিন্দু মহাসভায় যোগদান করে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে কোলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের নবগঠিত ফরওয়ার্ড ব্লকের সাহায্য চাইতে গেলেন। সুভাষকে অনুরোধ করলেন হিন্দুত্বের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে।

    সুভাষ এবং শরৎ বোস রাজি হলেন না। উলটে সুভাষ তাঁকে বললেন, খানিকটা ইয়ার্কির সুরে বটে -এমন কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে অগ্রসর হলে, ‘জন্মানোর আগেই সেটা কী করে ভেঙে দিতে হয়, দরকার হলে বলপ্রয়োগ করে, সেটা তিনি (সুভাষ) দেখবেন”।
    Dr. Shyamaprasad Mukherjee, ‘Leaves from a Diary’, P. 32, Oxford University Press, Calcutta. 1993.

    তাঁরা টাউন হলে একটা সভা ডেকেছিলেন। কিন্তু “ শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার, শ্রীমতী লীলা রায়, নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী এবং আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে সুভাষের ভাড়া করা দালালেরা সেটা ভেঙে দেয়”। পাথর লেগে হিন্দু মহাসভার নেতা *নির্মল চন্দ্র চ্য্যাটার্জির মাথা ফেটে গেছল। Dr. Shyamaprasad Mukherjee, ‘Leaves from a Diary’, P. 35, Oxford University Press, Calcutta. 1993.
    *উনি ছিলেন পরবর্তী কালে সংসদের স্পীকার এবং সিপিএম সাংসদ সোমনাথ চ্যাটার্জির বাবা। স্বাধীন ভারতে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে কয়েকবার সাংসদ হয়েছিলেন।

    এই সময়ের ঘটনাগুলোর খুঁটিনাটি বিবরণের জন্য চন্দ্রচুড় ঘোষের “বোসঃ দ্য আন্‌টোল্ড স্টোরি অফ অ্যান ইনকনভেনিয়েন্ট ন্যাশনালিস্ট’ এবং ডঃ শ্যামাপ্রসাদের ‘লীভস্‌ ফ্রম আ ডায়েরি দেখা যেতে পারে।

    বঙ্গে প্রভাব বাড়ানোর লড়াইয়ে সাভারকরের হিন্দু মহাসভা এবং সুভাষচন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই লাগল। কোলকাতা কর্পোরেশনের ইলেকশনের ফল বেরোল ২৯শে মার্চ, ১৯৪০ তারিখে। শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা ১৫টি সীটে বিজয়ী হল। সুভাষচন্দ্রের কংগ্রেস পেল ২১টি। মুসলিম লীগ ১৮টি।
    শেষে সুভাষ করপোরেশন পরিচালনায় মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট বাঁধায় শ্যামাপ্রসাদরা সুভাষকে সরাসরি “হিন্দুবিরোধী” এবং “দেশবিরোধী” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালালেন।

    কারণ, মেয়র মুসলিম লীগের, ডেপুটি মেয়র সুভাষের দলের এবং সুভাষ নিজে করপোরেশনের অল্ডারম্যান।
    শ্যামাপ্রসাদের সমর্থক কোলকাতার ইংরেজি দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা তার ১৯ এপ্রিল এবং ২৬ এপ্রিল, ১৯৪০ এর সম্পাদকীয়তে সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেসের দলত্যাগী এবং নিজের স্বার্থে হিন্দুহিত এবং দেশহিতের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলল। Ghosh, Chandrachud “Bose: The Untold Story of an Inconvenient Nationalist”, digital version, p. 497.

    শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরিতে সুভাষকে ক্ষমতালোভী, ষড়যন্ত্রকারী এবং ‘ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিঃ হাইড’এর মত (আর এল স্টিভেনসনের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র) ঘৃণ্য বললেন। Dr. Shyamaprasad Mukherjee, ‘Leaves from a Diary’, P. 53-54, Oxford University Press, Calcutta. 1993.

    সুভাষ তাঁর রাজনৈতিক সাপ্তাহিক ফরওয়ার্ড ব্লকে লিখলেন “ হিন্দু মহাসভা সাম্প্রদায়িক বিভেদকে জোর দিয়ে সমস্ত মুসলমানকে এক সঙ্গে লেবেল লাগিয়ে ভারতীয় জাতিসত্তার আদর্শের অনেক ক্ষতি করছে। আমরা শ্রীয়ুক্ত সাভারকরকে খুশি করতে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের ভারতের জন্য ত্যাগকে অবহেলা করতে পারব না”। সুভাষ চন্দ্র বসু, সাপ্তাহিক ফরওয়ার্ড ব্লক’, ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৩৯।

    এরপর সুভাষ তাঁর Forward Block (4th May, 1940) পত্রিকায় লিখলেন:
    “As a reaction to this, the Indian National Congress has put into its constitution a clause to the effect that no member of a communal organisation like Hindu Mahasabha and Muslim League can be a member of an elective committee of Congress”.
    সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যঃ ‘এইজন্যেই কংগ্রেস তাদের দলীয় সংবিধানে একটি ধারা যুক্ত করেছে যাতে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক দলের কোন সদস্য কংগ্রেসের কোন নির্বাচিত সমিতির সদস্য হতে পারবে না’।
    ঠিক তার এক সপ্তাহ পরে ( ১২ই মে, ১৯৪০) ঝাড়গ্রামের জনসভায় উনি আরও আক্রামক ভঙ্গিতে বললেন যে হিন্দু মহাসভা ধর্মের আড় নিয়ে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ঢুকে তাকে অপবিত্র করেছে। প্রত্যেক হিন্দুর কর্তব্য এদের নিন্দে করা।”। আনন্দবাজার পত্রিকা, মে ১৪, ১৯৪০, পৃঃ ৭।
    এই বক্তব্যের পুরো রিপোর্ট সুভাষ সমর্থক আনন্দবাজার পত্রিকায়, ১৪ই মে, ১৯৪০ তারিখে প্রকশিত হল।

    কংগ্রেস প্রদেশের সমস্ত মন্ত্রীসভা থেকে তার প্রতিনিধিদের পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দিল।

    পরে যখন সুভাষ জাপানে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছেন এবং কংগ্রেসের কুইট ইণ্ডিয়া আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় ইংরেজ সরকার শরৎ বোসকে গ্রেফতার করেছে তখন সাভারকরের নির্দেশে হিন্দু মহাসভার নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখ্যার্জি ফজলুল হকের কোয়ালিশন মিনিস্ট্রিতে উপ-মুখ্মন্ত্রী এবং বিত্তমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিলেন।
    জুলাই ১৯৪২ নাগাদ শ্যামাপ্রসাদের মনে হল ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের আশংকা জাপানীরা বাংলা দখল করে নেবে, তাই তারা পোড়া মাটিনীতি অবলম্বন করে খাদ্যশস্য কিনে গুদামজাত করছে যাতে জাপানীদের হাতে কোন রসদ না পৌঁছয়।
    শ্যামাপ্রসাদের দাবি জাপানীদের আটকাতে ব্রিটিশ ফৌজের অধীনে একটি বেঙ্গল আর্মি গঠন করা হোক। Mukherjee, Dr Shyamaprasad “Leaves from a Diary”, p. 70
    ক্রিপস মিশনের দৌত্য ব্যর্থ হলে কংগ্রেস গান্ধীজির নেতৃত্বে ‘ভারত ছোড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিল। শ্যামাপ্রসাদের খবর ব্রিটিশ সরকার দমন নিপীড়নের জন্য তৈরি হয়েছিল। প্রস্তাব পাশের পরের দিন ভোরেই গান্ধীজি, নেহরু, প্যাটেল, আজাদ সমেত কংগ্রেসের সমস্ত শীর্ষ স্থানীয় নেতারা বন্দী হয়ে প্রায় তিনবছরের মত কারাগারে কাটালেন।
    নেহরু, প্যাটেল ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতারা আহমেদনগর কেল্লায় প্রায় তিন বছর বন্দী ছিলেন। গান্ধীজি স্ত্রীর মৃত্যু ও ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে পৌনে দু’বছরের মাথায় ছাড়া পেলেন।
     
     

    কিন্তু জনতার রোষ গোটা দেশে ফেটে পড়ল। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেড়েই চলল।
    পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি হল, কিন্তু আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ল।
    হিন্দু মহাসভার অখিল ভারতীয় সম্মেলনে শ্যামাপ্রসাদ এবং অনেকে, মুখ্যতঃ বাংলার, খোলাখুলি এই আন্দোলনে যোগ দেবার পক্ষে বললেন। শ্যামাপ্রসাদের মতে এটি ১৯৫৮ সালের সিপাহী মহাবিদ্রোহের পরে সবচেয়ে বড় অভ্যুত্থান। কিন্তু সাভারকর এটা কংগ্রেসের আন্দোলন বলে কোন মতেই রাজি হলেন না। Mukherjee, Dr Shyamaprasad “Leaves from a Diary”, p. 76-77
    নভেম্বর ১৯৪২ তারিখে শ্যামাপ্রসাদের মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ স্বীকৃত হল। কয়েকদিন পরে উনি কানপুরে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার অধিবেশনে যোগ দিতে গেলেন। সেখানে ব্রিটিশ সরকারের উপর স্বাধীনতার জন্য চাপ সৃষ্টির উদ্দেশে কিছু ডায়রেক্ট অ্যাকশনের প্রস্তাব এল। কিন্তু সাভারকর এবং মুঞ্জের তীব্র বিরোধিতায় সেটা কোন কাজে এল না। Mukherjee, Dr Shyamaprasad “Leaves from a Diary”, p. 86
    ডিসেম্বর ১৯৪৪ নাগাদ সাভারকর হিন্দু মহাসভার বিলাসপুর অধিবেশনে সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে সঁপে দিলেন।
    Mukherjee, Dr Shyamaprasad “Leaves from a Diary”, p. 96
    কয়েকটা জিনিস দেখুনঃ
    এক, আর কারও সার্টিফিকেটের দরকার নেই। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের মতে এটি ১৯৫৮ সালের সিপাহী মহাবিদ্রোহের পরে সবচেয়ে বড় অভ্যুত্থান।
    দুই, শ্যামাপ্রসাদ বারবার বলছেন হিন্দু মহাসভার উচিত এই আন্দোলনে যোগ দেয়া। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে নেমে পড়া।
    তিন, ফল যেমন নেতাজি বলেছেন তাই হল। ভারতের জনতার চোখে হিন্দু মহাসভা অপাংক্তেয় হয়ে গেল। জনমানসে হিন্দুদের প্রতিনিধি হল কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় সভার নির্বাচনে হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিদের জামানত জব্দ হল।
    চার, ইংরেজ সরকারও হিন্দু মহাসভাকে গুরুত্ব দেয়া বন্ধ করল।
    শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরিতে খেদ ফুটে উঠলোঃ
    আগে সব গোল টেবিল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ভাইসরয় লিনলিথগো কংগ্রেস, মুসলিম লীগের সঙ্গে হিন্দু মহাসভাকেও ডাকতেন। কিন্তু জুন ১৯৪৫ থেকে হাওয়া পালটে গেল। হিন্দু মহাসভা আর ভাইসরয়ের (বড়লাটের) ডাক পেল না।
    শ্যামাপ্রসাদ কিন্তু চাইতেন অন্ততঃ বঙ্গে এই দুই দল যেন মিলে মিশে থাকে। শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি, পৃঃ ১১১
    পাঁচ, ভাগলপুর এবং অন্যান্য অধিবেশন থেকেই শ্যামাপ্রসাদের মনে হত সংগঠন বেশ মজবুত হয়েছে। এবার খোলাখুলি আন্দোলনে নামা দরকার। কিন্তু প্রত্যেকবারই সাভারকর বাধা দিয়েছেন, নাকচ করে দিয়েছেন।
    উনি হয়তো ভাবতেন কোনরকমে একটা সরকার দাঁড় করাতে পারলে বেশি কাজ হবে। ঐ, পৃঃ ১০৭।
    ইন্ডিয়া অফিসের রাজনৈতিক বিভাগের প্রধান জন পার্সিভাল গিবসন ১ অগাস্ট, ১৯৪৪ তারিখে অফিসের কার্যবিবরণীতে লিখছেন—ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেক্রেটারি অফ স্টেট লিওপোল্ড এস আমেরি সাভারকরের ২৬ জুলাই তারিখে পাঠানো টেলিগ্রামের প্রাপ্তিস্বীকার করার প্রয়োজন মনে করছেন না। Nicholas Mansargh, “The Transfer of Power 1942-47”, London, Vol. 4, p. 1223.
    ইতিহাসের এমনই কুটিল গতি যে নেতাজি ও সাভারকর দুজনেই এক অর্থে ভুল প্রমাণিত।
    সুভাষ ভাবতেন জাপান হারতে পারে না। সাভারকর ভাবতেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংস হতে পারে না।
    *বঙ্গভঙ্গের আগে তিনটি প্রস্তাব এবং তাদের গতি নিয়ে এলেবেলে চমৎকার লিখেছেন। কাজেই এখানেই দাঁড়ি টানলাম।



     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • এলেবেলে | ১৪ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৪১748190
  • এই চমৎকার লেখাটায় দুটো তথ্যগত ভুল আছে।
     
    ১. "অক্টোবর ১৯৩৯শে প্রাদেশিক আইনসভাগুলো থেকে কংগ্রেস বিধায়করা পদত্যাগ করলে হিন্দু মহাসভা পাকিস্তান সমর্থক মুসলিম মন্ত্রীসভায় যোগ দিল।
    মানে, মুসলিম মেজরিটি অঞ্চলে আইনানুযায়ী ওদেরই বেশি প্রধিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে অবিভাজিত বাঙলা..."
     
    ২. "শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সাভারকরের নেতৃত্ব মেনে হিন্দু মহাসভায় যোগদান করে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে কোলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের নবগঠিত ফরওয়ার্ড ব্লকের সাহায্য চাইতে গেলেন। সুভাষকে অনুরোধ করলেন হিন্দুত্বের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে।
    সুভাষ এবং শরৎ বোস রাজি হলেন না। উলটে সুভাষ তাঁকে বললেন, খানিকটা ইয়ার্কির সুরে বটে -এমন কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে অগ্রসর হলে, ‘জন্মানোর আগেই সেটা কী করে ভেঙে দিতে হয়, দরকার হলে বলপ্রয়োগ করে, সেটা তিনি (সুভাষ) দেখবেন”।" - পুরো ভুল নয়, আংশিক ভুল। শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরিতে আরও কিছু রসদ আছে।
     
    কিন্তু কাল যেহেতু গুরুজনেরা পোলিটিক্যাল কারেক্টনেসের হদ্দমুদ্দকেই আলোচনার প্রার্থিত স্ট্যান্ডার্ড সাব্যস্ত করেছেন, তখন এই চণ্ডাল আর সেসব গুরুবাক্যকে অমান্য করার সাহস দেখাচ্ছে না।
     
    কেবল এইটির আগামাথা কিছুই বুঝতে পারিনি - "বঙ্গভঙ্গের আগে তিনটি প্রস্তাব এবং তাদের গতি নিয়ে এলেবেলে চমৎকার লিখেছেন।"
     
    বাবু, হামি গরিব আদমি আছে।
  • . | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:০৯748191
  • . | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:১০748192
  • . | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:১০748193
  • . | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:১২748194
  • একটা লিংক দুবার পোস্ট হয়েছে ভুল করে।
    এই ভিডিও দুটি বছর পাঁচ আগের।
  • Ranjan Roy | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:৩৮748195
  • সে কী এলেবেলে!
     
    কিছুদিন আগে আপনি বঙ্গভঙ্গের আগে তিনটি প্রস্তাব নিয়ে বিশদ লেখেন নি?
    সমগ্র বঙ্গ পাকিস্তানে যোগ দেবে? নাকি ভারত পাজিস্তান থেকে আলাদা বঙ্গ রাজ্য হবে? নাকি মুসলিম প্রধান অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানে যাবে আর হিন্দু প্রধান ভারতে?
     
    ২ আর আমার তথ্যে আংশিক ভুলটা প্লীজ দেখিয়ে দিয়ে আমার এবং সবার উপকার করুন। নইলে অভিশাপ দেব।
    ঘোর কলিযুগ! ব্রাহ্মণের অভিশাপ ফলে না, কায়স্থের ফলে। কে কী বলছে সে দিকে কান দেবেন না। নিজের যা আস্থা সে হিসেবে কাজ করেযান।
    আমাদের দীপকে দেখুন। অভিজিত দীপকে নয়, আমাদের দীপ।
    উনি অবিচলিত।
  • এলেবেলে | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১৬748196
  • ১. হিন্দু মহাসভা অন্য দুটি প্রদেশে মুসলিম লিগের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলায় দেয়নি। ডিফেন্স কাউন্সিলে যোগদানের 'অপরাধ'-এ ১৯৪১-এর ১১ ডিসেম্বর, ফজলুল হককে লিগের সমস্ত পদ থেকে অপসারিত করা হয়। এর ফলে ১০ ডিসেম্বর শেষ হয় প্রজা-লিগ মন্ত্রিসভার মেয়াদ। ঠিক তার পরের দিন হকের নেতৃত্বে তৈরি হয় প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি। এই নতুন রাজনৈতিক দলটিকে প্রত্যক্ষ সমর্থন করেন শরৎ বসুর ২৮ জন, জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের ১৪ জন, তফশিলিদের ১২ জন এবং কেপিপি-র ১৯ জন সদস্য। পরোক্ষ সমর্থন দেন কিরণশঙ্করের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের ২৫ জন সদস্য। অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ যে মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন, তার বিরোধী পক্ষে ছিল মুসলিম লিগ। ফলে তারা মন্ত্রিসভাটিকে ব্যঙ্গ করে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা বলত।
     
    ২. সুভাষ ও শরৎ - দুজনেই শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভার সঙ্গে কোয়ালিশনে প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছিলেন। আপনি ডায়েরির ৩২ পাতাটি উদ্ধৃত করেছেন। অথচ তার পরের পাতাতেই আছে - A Selection Board was formed, Subhas, Sarat Bose and Rajendra Ch. Dev representing Subhas’s Congress, and S. N. Banerjee, Sanat Kumar Roychaudhuri and myself representing the Hindu Sabha.
     
    কিন্তু এই আঁতাতটি কোনও আদর্শগত কারণে ভাঙেনি। সমস্যাটা হয়েছিল দুই ব্যক্তি সুধীর রায়চৌধুরী এবং বিধুভূষণ সরকারকে ঘিরে। সুভাষ যেমন প্রথম ব্যক্তিটিকে সমর্থন করলেও শ্যামাপ্রসাদ তা করেননি, ঠিক তেমনই শেষোক্ত ব্যক্তিটিকে নিয়ে দুজনের তীব্র মতভেদের কারণে তাঁদের আঁতাত ভেঙে যায়।
     
    আর ফরওয়ার্ড পত্রিকায় হিন্দু মহাসভা সম্পর্কে কী কী ভালো কথা ছাপার অক্ষরে লেখা হয়েছিল, তার নমুনাও আমার কাছে আছে। কিন্তু বাহুল্য বোধে সেসবের উল্লেখ করলাম না।
  • এলেবেলে | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১৮748197
  • ঠিক তার পরের দিন হকের নেতৃত্বে তৈরি হয় শপথ নেয় প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি।
  • Ranjan Roy | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ২৩:১৮748200
  • এলেবেলে
    অনেক ধন্যবাদ।
  • সত্যেন্দু সান্যাল | ১৫ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫১748201
  • @এলেবেলে এবং @Ranjan Roy
     
    গুরুসন্ধান এ গিয়ে "বঙ্গভঙ্গের আগে তিনটি প্রস্তাব" টাইপ করে এলেবলে লিখিত কিছু চার পৃষ্ঠার আর্কাইভে খুঁজে পেলাম না। শ্রী এলেবেলে অথবা রঞ্জন রায় মহাশয় যদি সঠিক লিঙ্কের সন্ধান দেন তো উতসাহী পাঠক হিসেবে উপকৃত হৈব।
    ধন্যবাদান্তে
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন