হ্যাঁ। আমি একজন আদ্যন্ত খারাপ মানুষ। চুরি-চামারি করে সমাজের মাথা হওয়াটাকে আমি খারাপ কাজ মনেই করি না। তা, আমার কিছু অর্থ দরকার এর জন্য। এখন আপনার বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা সরানোর ইচ্ছে হলে আমার কাছে কয়েকটা বিকল্প থাকছে— ১, আমি রাতে চুপিচুপি গিয়ে আপনার ঘরে সিঁদ কাটতে পারি, অথবা ২, আপনার আস্থা অর্জন করে কাছাকাছি এসে আপনার বাড়ির আতিথেয়তার সুযোগ নিতে পারি।
প্রথম বিকল্পে ঝুঁকি বেশি, উসুল কম। প্রথমত রাতে সিঁদ কাটা বা দরজা ভাঙলে ধরা পড়ার ঝুঁকি, তায় আজকাল যত্র তত্র সিসিটিভি। দ্বিতীয়ত, আপনি কোথায় কীভাবে আপনার মূল্যবান জিনিসপত্র রেখেছেন তা সম্পূর্ণ জানা না থাকলে ওই রাতের অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। আর তাছাড়া চুরির দায়ে ধরা পড়লে একটা ছ্যা ছ্যা দাগ পড়ার বিষয়টাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
এদিকে আপনার আস্থা অর্জন করে কাছাকাছি এলে আপনিই হয়ত আমাকে দেখিয়ে দেবেন আপনার মূল্যবানতম জিনিসপত্র। আরও বন্ধুত্ব হলে আমার কাছে বাড়ির চাবিটা রেখে সপরিবার তীর্থেও যেতে পারেন। তখন ধীরে সুস্থে কাজ সেরে হাওয়া হয়ে যাওয়াটা সহজ।
এখন আপনার কাছাকাছি আসতে গেলে আপনার মতো করে কথা বলা শিখতে হবে, আপনার চিন্তা ভাবনার কাছাকাছি এসে আপনার সংশয়ের জায়গাগুলো নির্মূল করে দিতে দিতে হবে। ওদিকে রক্ষণের জায়গাগুলো দুর্বল করে যেতে হবে একই সঙ্গে। আপনার পোষা কুকুর বা দারোয়ান থাকলে তাকেও হাত করতে হবে। উপায় সহজ কিন্তু এতে আপনার পিছনে সময় দিতে হবে অঢেল।
এখন কবে আপনি তীর্থে যাবেন, বা থাইল্যান্ডে তার ভরসায় কতদিন আপনার কাছে ল্যা ল্যা করা যায়? তার বদলে আমি করলাম কি আমার স্কেল টা চট করে বাড়িয়ে দিলাম। একটা দল পাকালাম গুটিকয় আমারই মতো শয়তান নিয়ে। কিছু ধারকর্জ করতে হল বটে কিন্তু তা বহুলাংশে উসুল হবে দেখে আমার বন্ধুরাই তা দিল।
প্রথমেই প্রায় সবকটা টিভি চ্যানেল আর সংবাদপত্রের মালিক হয়ে বসলাম। হ্যাঁ, এতে বিনিয়োগও আছে অনেকটা তবে তার ওপর লাভ অনেকটাই বেশি। কয়েকটা ভোটে জিততে হল তার জন্যও মোটা একটা খরচ হল। তাও আমার মাসতুতো ভাইরা দিল। কিন্তু তারপর আমাদের ঠেকায় কে?
এইবার সেই টিভি চ্যানেলে আর সংবাদপত্রে বারংবার বলতে থাকলাম আপনার কষ্টে আমার বুক ফেটে যায়, রাতে ঘুম হয় না, আপনার দুর্দশা আমি যেমন করেই হোক দূর করব তাই দেখুন আমি আমার পরিবারকে ভাগিয়ে দিয়েছি, একাই থাকি এইসব…
এখন আর আপনি এক নন, আপনারা অনেকে আমার কাছাকাছি থাকছেন অনেকক্ষণ। আপনার দারোয়ানটির জন্য একটা মন্দির করে দিলাম, সেখানে চমৎকার ঈশ্বর কথা শোনার পর দুর্দান্ত ঘিয়ের লাড্ডু প্রসাদ পাওয়া যায়, জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবস্থাও আছে। আপনার জন্য থাকল আপনার স্বর্ণময় অতীতের আলফাল ব্যখ্যান আর বর্তমান দুর্দশার কারণ স্বরূপ আপনার কয়েক ঘর প্রতিবেশী। তারা অবস্থান অনু্যায়ী আপনার মতো স্বচ্ছল নন ও সংখ্যায় কম কাজেই মাঝে মধ্যে তাদের ওপর ক্ষেপে গিয়ে চড় চাপড় মেরে আসলে তারা কিছু একটা করতে পারবে না, বরং আমি আপনাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেব। সমাজে আপনি একটু বেশি পাত্তা পাবেন।
আমি শয়তান হতে পারি, তবে বোকা তো নই। কাজেই একেবারে আপনাকে সর্বস্বান্ত আমি করি না। নিজের দুঃখ দুর্দশার কথা মাঝে মধ্যে টুক করে বলে ফেলি আর আপনি (এখন পড়ুন আপনারা) ঝপাঝপ আনিটা সিকিটা ভরতে থাকেন ঝোলায়। কী আশ্চর্য শব্দ ওই ঝনঝনানির!!
আপনাকে ব্যস্ত রাখি, ব্যস্ত রাখতে হয় সারাক্ষণ, যদি একটু ফাঁকা পেলে আপনি একটু ভাবতে বসেন আর আমার সব পরিকল্পনা বাঞ্চাল হয়! আপনার কাজের জায়গাকে আমি দুই ভাবে ব্যবহার করি নিজের তহবিল বাড়াতে। প্রথমতঃ, আমি কাজের চাপ দিই সাঙ্ঘাতিক রকমের, এই চাপটা দেওয়ার জন্য আপনার আপিসের সবচেয়ে বড় বসকে চাপে রাখতে হয়। চিন্তা করবেন না ওটাও তো আমার কাজ বৈকি। আর তারই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজের বোঝা ঠেলার জন্য নতুন লোক নেওয়া বন্ধ করে দিই।
যারা দিনের পর দিন খেটেখুটে পড়াশোনা করছে চাকরি বাকরির আশায়, এই আপনারই বাড়ির ছোটোরা, তাদের হাতে তুলে দিলাম মোবাইল ফোন আর তার ফ্রি ডেটায় বুঁদ হয়ে রইল অনেকে। তাদেরই কয়েকজনকে চাকরিও দিয়েছি বৈকি আমার গৌরবগাথা প্রচারে ও বিপক্ষ মতামতকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। তাও কয়েকটা অতি ত্যাঁদোরকে শায়েস্তা করতে জেলে পচাচ্ছি, দেখে শিখুক বাকিরা।
এদিকে কাজের চোটে আপনার নাভিশ্বাস ওঠে। বাড়িতে সময় কম দেন বলে মুখঝামটা খান আর আপনার দুর্দশার কারণ যখন অষ্টপ্রহর টিভি আর সংবাদপত্রে প্রচারিত হতে দেখেন — আপনার বিশ্বাস না হয়ে যায়ই না!!
আমি এবার আর একটু চাপ দিই, আপনি আরও একটু টাকা দেন আমায়। না দিয়ে আপনার উপায় নেই। আপনি জেনে গেছেন আমি ছাড়া কেউ নেই যে আপনাকে এই বিপদের হাত থেকে বাঁচাবে।
বছর বারো হল। আপনি এর মধ্যে অনেকটাই ক্ষয়ে গেছেন। আর আমি আমার বন্ধুরা ততটাই ফুলে ফেঁপে লাল হয়ে গেছি। আপনার ভালো খারাপ থাকার বোধ একমাত্র আপনার সংখ্যালঘু প্রতিবেশীর আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হাড়-হাভাতে দশা।
ওদের চেয়ে ভালো আছেন এটা তো সত্যি কথা! আর মাত্তর ২১ বছরের মধ্যে যে আপনার অনন্ত স্বর্গসুখ যে অনিবার্য তা আমি কেন পৃথিবীর সবাই মানবেন।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।