

অলংকরণ: রমিত
বাংলার নির্বাচন শেষ হয়েছে। ভয় আউট ভরসা ইন, এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এই ভয় আউট করতে গিয়ে অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সেই ৩০ লক্ষ মানুষ এখন দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন কী করে তাদের নাম আবারও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নাগরিকত্বের পরীক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে বিশেষ নির্বাচনী সংশোধনী শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও একই কথা কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন যা বলেছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাকেই ধ্রুব সত্য মনে করে বলেছিল যে ঠিক আছে এবার না হয় কিছু মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না কিন্তু ভবিষ্যতে তারা নিশ্চিত পারবেন। ভোটাধিকারের সঙ্গে নাগরিকত্বের কোন সংযোগ নেই। অথচ নির্বাচনের পরে দেখা গেল রেশন থেকে শুরু করে যে কোন সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য ওই ভোটার তালিকায় নাম আছে নাকি সেটাকেই মান্যতা দেওয়া হচ্ছে। কিসের যে ভরসা এল আর কিসের যে ভয় আউট হলো তাই বোঝা যাচ্ছে না।
এবার আবার নতুন ভাবে ভয় আত্মপ্রকাশ করছে। শুরু হয়েছে জনগণনা। ১৯৫১ সাল থেকে যবে থেকে জনগণনা হচ্ছে কোনদিনই নাগরিকত্বের সঙ্গে এই প্রক্রিয়াকে যুক্ত করা হয়নি। এবারও হওয়ার কথা ছিল না কিন্তু দেখা গেল হঠাৎ করে এবার জনগণনায় ছয়টি নতুন প্রশ্ন যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই যে ছয়টি প্রশ্ন রাখা হয়েছে নতুন করে তার মধ্যে কিন্তু নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ছায়া দেখা যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কিন্তু আকস্মিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ এই বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। জনগণনা রাষ্ট্রের নাগরিক কে গণনা করার কাজ, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা দেখার জন্যই জনমাননা করা হয় প্রতি ১০ বছর অন্তর। জনগণনা কখনোই নাগরিকত্ব যাচাই করার প্রক্রিয়া নয়। অথচ যে প্রশ্নগুলো নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আধার, পাসপোর্ট এর নম্বর, ভোটার তালিকায় নাম আছে নাকি, জন্মস্থান বংশ পরিচয় এই সমস্ত জানতে চাওয়া হয়েছে। এই সমস্ত প্রশ্নের গোলকধাঁধায় যদি মানুষকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তখন কিছু "দিমাগী নকশাল" তো প্রশ্ন তুলবেই। প্রশ্ন উঠবে এই প্রক্রিয়াগুলোর শেষ কোথায়? আজ ভোটার তালিকা সংশোধন কাল জনগণনা পরশু নাগরিকপঞ্জি অর্থাৎ এনআরসি - তাহলে কি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন একটা জায়গায় চলে যাচ্ছে যেখানে প্রতিদিন একজন নাগরিককে প্রমাণ দিতে হবে তিনি এই দেশের নাগরিক কিনা?
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় নাগরিকদের এই সংক্রান্ত উদ্বেগের কিন্তু কোন রাজনৈতিক উত্তর এখন অব্দি পাওয়া যায়নি। বরং সরকারি ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা ক্রমশ বাড়ছে এবং সন্দেহ তত ঘনীভূত হচ্ছে যে জনগণনার আড়ালে রাষ্ট্র অনেক বেশি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে। সেখানেও প্রশ্ন উঠছে কেন? যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে সুস্থিতি দেওয়া, যে রাষ্ট্র বারংবার নাগরিকদের তথ্য নিয়ে সঠিক সুরক্ষিত অবস্থায় রাখতে পারেনি সেই রাষ্ট্র যদি কোন নাগরিকের থেকে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নাম্বার চান, কিংবা কোথায় কোভিড ভ্যাকসিন নিয়েছেন সেই তথ্য চান তাহলে বলতে হবে রাষ্ট্রের অন্য কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
জনগণনা যদি নিছক পরিসংখ্যান সংগ্রহের প্রক্রিয়া হয় তার সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের তো কোনো সম্পর্কই নেই। এই কথাটি সরকারকে স্পষ্ট ব্যর্থহীন ভাষায় আইনি নিশ্চয়তা সহ বলতে হবে। যে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে অস্তিত্বহীনতা পরিচয়হীনতা সংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি করে সেই রাষ্ট্রকে কোন "দিমাগী নকশাল" যদি এইরকম প্রশ্ন করে তাহলে সেই প্রশ্নকর্তাকেই কাঠগড়ায় তুললে সন্দেহ আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। আর সেখানেই গণতন্ত্রের আসল বিপদ। নাগরিকত্ব কোন সরকারি দপ্তরের দয়ার দান নয় তেমনি ভোটাধিকার কোন পরীক্ষার খাতাও নয় যে প্রত্যেকটি নাগরিককে তা প্রতিদিন দিয়ে যেতে হবে। গরিব চাষী, পরিযায়ী শ্রমিক, উদ্বাস্তু পরিবার কিংবা সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ অথবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষজন যাদের বহু প্রজন্মের জীবনের কাগজপত্র হয় সংরক্ষিত হয়নি অথবা কোন দুর্ঘটনায় খোয়া গেছে, তাদের কাছে "নথি দেখান" এই কথাটি ভয়ংকর আতঙ্কের।
সাম্প্রতিককালে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে আধারের সঙ্গে নামের তফাৎ থাকার কারণে অন্তত ১০ লক্ষ মহিলার নাম প্রাপকদের তালিকা থেকে বাদ গেছে। এই নামের তফাৎ কিন্তু নিজের ভুলের কারণে হয়নি এই বানান ভুল কিন্তু নিজের দোষে হয়নি তা সত্ত্বেও এই মহিলাদের নাম বাদ যাওয়া একজন মহিলাকে কতটা উদ্বেগের মধ্যে রাখতে পারে, তার আন্দাজ হয়তো প্রশাসনের কর্তাদের নেই। কোন ব্যক্তির কোন নথির অভাব যদি সেই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে তবে এই রাষ্ট্রে সবচেয়ে দুর্বলতম মানুষটি সর্বপ্রথম বিপন্ন হবেন। আর যারা এই অসুবিধা গুলো বুঝতে চাইবেন না তারা ভাববেন এতে অসুবিধা কোথায়? শহরের কিছু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হয়তো আলমারি খুলে তার নথি বার করে দেখিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু নদী ভাঙ্গনে ঘররানো মানুষ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নথি ছাড়াই জীবন অতিবাহিত করা শ্রমিক কিংবা ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বারবার ঠিকানা বদলানো পরিবার কী করবে? রাষ্ট্র কি তাহলে তাকে গণ্য করবে না নাগরিক বলে তাকে জনগণনায় অন্তর্ভুক্ত করবে না? যদি না করে তাহলে এই জনগণনা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে জনগণনার উদ্দেশ্যই সাধিত হবে না।
গণতন্ত্রের শক্তি নাগরিককে ভয় দেখিয়ে নয় নাগরিকের আস্থা অর্জন করে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা। অথচ বারবার তাকেই বলা হবে, পরিচয় দিন প্রমাণ করুন আপনি এই দেশের নাগরিক। তাহলে কি গণতন্ত্রের উপর আস্থা কোনো নাগরিকের থাকবে কোন ব্যক্তির থাকবে? তাই প্রশ্নটা কটা ঘর কটা তথ্য বা কিছু-নথির নয় প্রশ্নটা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের আশ্বাসের। জনগণনা তথ্যের সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাই ভোটাধিকার থেকে ছাটাই বা এনআরসির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই এটা শুধু বলে দিলেই হবে না। আইনি নিশ্চয়তা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া সংসদ ও জনসমক্ষে এই সমস্ত বিষয়গুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নাগরিকের ঘাড়ে সন্দেহের বোঝা চাপিয়ে কোন রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারেনা। শক্তিশালী রাষ্ট্র সেটাই যে তার নাগরিককে বারবার যে তার নাগরিকের উপর আস্থা রাখে। একদিকে বলা হবে ২০৪৭ সালে " বিকশিত ভারত" হবে আর অন্যদিকে সেই বিকশিত ভারতে কাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে তা নিয়েই প্রশ্ন থাকবে তাহলে তো বলতে হবে গোড়ায় গলদ আছে। যে ভয় রাষ্ট্র আজকে জনগণনার জন্যও তার নাগরিকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে সেই ভয় না কাটলে এই জনগণনায় কোন লাভ নেই। নাগরিকত্ব কোন অন্তহীন পরীক্ষা নয়। জনগণনার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোন যোগাযোগ নেই এই কথাগুলো রাজনৈতিক পরিষদ থেকে এবং প্রশাসনিক জায়গা থেকে চোরের সঙ্গে বলতে হবে। এই সংক্রান্ত নীরবতা যত দীর্ঘ হবে, এই সংক্রান্ত সংশয় যত গভীর হবে, তত দেশের নানান কোনা থেকে আওয়াজ উঠবে দরজয় কড়া নাড়ছে জনগণনা নাকি তার আড়ালে নাগরিকত্বের আরো একটি পরীক্ষা? ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের পোস্ট সরকারের আদেশ অনুযায়ী নামিয়ে দেওয়া হলেও প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাবে। অন্ধ ভক্ত ছাড়া অনেকেই কিন্তু এই প্রশ্ন করবেন।