

অলংকরণ: রমিত
কিছুদিন আগে বাংলার রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল শোরগোল চলছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, যে নির্বাচন কমিশনের যিনি বাংলার সিইও, তাঁর দপ্তরে নাকি হাজার হাজার ফর্ম ৬ জমা পড়ছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যে এই ফর্ম ৬ দিয়ে ভিন রাজ্যের ভুয়ো ভোটার বাংলার ভোটার তালিকায় ঢোকানোর ষড়যন্ত্র চলছে। প্রাথমিকভাবে অস্বীকার করলেও পশ্চিমবঙ্গের সিইও, মনোজ আগরওয়াল মেনে নিয়েছেন যে তার দপ্তরে বেশ কিছু এই ফর্ম ৬ জমা পড়েছে। এবার অনেকেই হয়তো বিষয়টা বুঝতে পারছেন না, এই ফর্মের সঙ্গে নির্বাচনের কী সম্পর্ক, অনেকেই মনে করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ তো মাত্র ৩০০০০ এই ফর্ম ৬ নিয়ে, তা দিয়ে কি নির্বাচনকে প্রভাবিত করা সম্ভব? অনেকে ভাবছেন, এইটা নিয়ে বেশী শোরগোল করার মানেই নেই। বিজেপির কোনও বুথ স্তরে সাংগঠনিক শক্তি নেই, আর তৃণমূল কিংবা অন্যদলের বুথ স্তরের এজেন্টরা যে যেখানে শক্তিশালী, তাঁরা সহজেই ভিন রাজ্যের ভোটারদের চিনতে পারবে এবং তাঁদের ভোট দেওয়া থেকে আটকানো সম্ভব হবে। কিন্তু এইবারের বাংলার নির্বাচনের যা গতি প্রকৃতি এবং যেভাবে নির্বাচন কমিশন বকলমে কেন্দ্রের শাসকদলের হয়ে কাজ করছে, এই ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
প্রাথমিকভাবে এই ফর্ম ৬ সম্পর্কে জানা দরকার। একটা সময় অবধি যে কোনও নতুন ভোটার যিনি ভোটার তালিকায় নাম তুলতে চান, তিনি ফর্ম ৬ পূরণ করে সেই কাজটি করতে পারতেন, কিন্তু সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে বহু বয়স্ক মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়েছে এই ফর্ম ৬ পূরণ করে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ভোট চুরি সংক্রান্ত যে সাংবাদিক সম্মেলনটি করেছিলেন, সেখানে তিনি একটি উদাহরণ দেন, শকুন রানি বলে একজনের নাম নথিভুক্ত হয়েছে তাঁর বয়স ৭২। পাওয়ার পয়েন্টের সেই স্লাইডটির পাশে লেখা ছিল কী প্রমাণপত্র দাখিল করে একজন ৭২ বছরের মানুষ ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন, সেখানে ‘আধার’ এর জন্য নির্দিষ্ট বক্সে ‘টিক’ চিহ্ন দেওয়া ছিল। আসলে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনের যে ফাঁক ফোকড় আছে, সেখান দিয়েই ভিন রাজ্যের ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির ঘটনা ঘটছে।
যে সময়ে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চলছিল, সেই সময় থেকেই এই সংক্রান্ত সমস্যা যে হবে তা বোঝা যাচ্ছিল। প্রথমে যে কয়েকটি নথিকে নির্বাচন কমিশন মান্যতা দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে আধার ছিল না। পরে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যখন এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়েছিল, তখন আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে আধারকে একটি সাধারণ পরিচয়পত্র হিসেবে মেনে নিতে বলা হয়েছিল। সঙ্গে অবশ্যই কমিশন নির্দিষ্ট নথি জমা করতে হবে, বলা হয়েছিল। তারপরে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ হিসেব দেখিয়ে, তখন দেখা যায় বহু জীবিত ভোটারের নাম ঐ বাদ যাওয়ার তালিকায় আছে। স্বভাবতই কমিশন বলে তাঁদের যদি কোনও ত্রুটির কারণে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ গিয়ে থাকে, তাহলে তাঁরা ঐ ফর্ম ৬ দিয়ে আবেদন করতে পারেন, তাহলে তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় উঠে যাবে। এখান থেকেই কারচুপি শুরু হয়।
২৮ শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যায় আরও ৫ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষকে বিচারাধীন অবস্থায় রাখা হয়েছে। তখনই প্রশ্ন ওঠে এই এত লোকের নাম বিচারাধীন অবস্থায় রেখে কি নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করতে পারে। প্রশ্ন তুললেন, প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেইশি সহ প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল, কিন্তু নির্বাচন কমিশন যে কোনও কিছুই শুনতে রাজি নয়, তা বোঝা গেল কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলার নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বললো এই বিচারাধীন ভোটারদের জন্য বিচারপতি থেকে বিচারবিভাগের অন্য আধিকারিকেরা কাজ করবেন এবং দ্রুত এই ৬০ লক্ষ বিচারাধীন কেস নিস্পত্তি করা হবে। সেইমত শুনানি শুরু হল, তাঁদেরকে সহায়তা করার কথা ছিল ইআরও এবং এইআরও’দের কিন্তু দেখা গেল তাঁদের সহায়তা করছেন ঐ মাইক্রো অবসারভাররা যাঁরা লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি দেখিয়ে বাংলার ১.২০ কোটি মানুষকে শুনানিতে ডেকেছিলেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নথি এবং তথ্য যা তাঁরা আগের শুনানিতে দিয়েছিলেন, সেগুলো পরীক্ষা করে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হতে লাগল। আরও মজার বিষয় হল, মনোজ আগরওয়াল, যিনি নির্বাচন কমিশনের বাংলার সিইও, তিনি প্রাথমিকভাবে বললেন তাঁর কাছে নাকি তথ্যই নেই কত মানুষ বিচারাধীন অবস্থা থেকে মুক্তি পেলেন। পরে অবশ্য একটা গোল গোল হিসেব দিলেন, যা দেখে মনে হচ্ছে ঐ ৬০ লক্ষ মানুষের বেশীরভাগ মানুষের নামই বাদ যেতে চলেছে। আগের বাদ যাওয়া এবং শেষে বিচারাধীন অবস্থা থেকে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা যদি হিসেব করা যায় তাহলে ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ১ কোটি মানুষের নাম বাদ যেতে চলেছে, যা ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের জন্য একটা কালো দাগ ছাড়া কিছু নয়।
এইভাবে কৌশল করে, বিজেপি নেতাদের দাবি এবং অর্ডার অনুযায়ী প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম ছেঁটে ফেলা হচ্ছে অন্যদিকে, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি এবং সর্বশেষ বিহারের কায়দায় হাজার হাজার ফর্ম ৬ জমা করে অন্য রাজ্যের ভুয়ো ভোটারদের এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মের দফারফা করে হাজার হাজার ফর্ম ৭ পূরণ করে এ রাজ্যের বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে সেই বাতিলের আবেদন কোথাও কোথাও আটকানো গেলেও, বেশীরভাগ জায়গায় আটকানো গেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এই পরিস্থিতিতে অবাধ, নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠ নির্বাচন হতে পারে? পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা প্রকাশ না করেই নির্বাচন দিন ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল এক অংশের বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নিতেই যে এই কাজ করা হচ্ছে, তা আজ দিনের আলোর মত স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন গোপনে সার্কুলার জারি করে নাম প্রত্যাহারের আগের দিন পর্যন্ত হাজার হাজার ফর্ম ৬ জমা নিয়ে অন্য রাজ্যের ভুয়ো ভোটারদের ভোটার তালিকায় নাম ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। বিজেপির বিএলএ কুন্দন সিং যে সার্কুলারের উল্লেখ করে হাজার হাজার ফর্ম ৬ জমা করতে গেছিলেন, তা নির্বাচন কমিশন নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে গোপনে কুন্দন সিংদের কাছে কেন গেল? প্রশ্ন উঠছে সেইজন্যেই কি রাতারাতি সমস্ত জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের বদল করা হয়েছে? সেই জন্যেই কি প্রায় সমস্ত থানার মাথাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে? যাতে তাঁদের নির্দেশ পালনকারী বশংবদ আধিকারিকদের দিয়ে এই অনৈতিক কাজ করানো যায়? রাজ্য নির্বাচন কমিশনার ধরা পড়ে গিয়ে অবাস্তব যুক্তি দিয়ে নির্বাচনের নামে প্রহসন হচ্ছে তা সবার সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এবার অনেকে প্রশ্ন করতেই পারেন কীভাবে বাইরের রাজ্যের ভোটাররা বাংলার ভোটার তালিকায় নাম তুলছেন? অনেকে বলতেই পারেন এই বাইরের ভোটারদের তো বুথ স্তরে চিনে ফেলা যাবে, তখন আটকানো যাবে, তাঁদের জন্য বলা যায় যে শেষ মূহুর্তে ফর্ম ৬ দিয়ে যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাঁদের তো আটকানো দূর অস্ত, চিনবেনই না, আর বুথ স্তরে গণ্ডগোল করলে কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে, নির্বাচন কমিশনের রিপোল করার ব্যবস্থার কথা বলা আছে। সুপ্রিমকোর্টের আধার সংক্রান্ত যে রায় আছে তাতে স্পষ্ট বলা আছে আধার জন্মের প্রমাণপত্র নয় আধার বসবাসের প্রমাণপত্র নয়। আধার যে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় সেটা তো ইউআইডিএআই নিজেই বলে। আজকে যে ফর্ম সিক্স নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার মূলে কিন্তু সেই আধারই আছে। ফর্ম সিক্সের দুটো পার্ট আছে সেই দুটো দেখলেই গোটা বিষয়টা বোঝা যাবে। জন্মের প্রমাণপত্র এবং বসবাসস্থানের প্রমাণপত্র হিসাবে আধার কে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। তাহলে একজন মানুষ যদি হরিয়ানায় থাকেন কিংবা মধ্যপ্রদেশে থাকেন তিনি তার আধারের ঠিকানা বাড়িতে বসেই বদল করতে পারবেন পোষ্টঅপিসে না গিয়েই তা সম্ভব। সেই ব্যবস্থা ইউআইডিএআই এই মুহূর্তে চালু রেখেছে এবং সেখানে কোন পয়সাও লাগছে না, অর্থাৎ বিনামূল্যেই এটা করা যাচ্ছে।
এবার ভালো করে বিষয়টা ঠান্ডা মাথায় বুঝতে হবে। একজন ভিন রাজ্যের ভোটার তার আধার যে বসবাসস্থানে ছিল তার পরিবর্তে যদি বাংলার কোন বসবাসস্থান এর ঠিকানা দিতে পারেন এবং তার স্বপক্ষে যে কোন প্রমাণ নিশ্চয়ই তাকে কেউ না কেউ যুগিয়ে দিতে পারবেন তাহলে বসবাসস্থান পরিবর্তন হয়ে গেল। এবার তিনি যদি এই ফর্ম ৬ ভরতে পারেন তাহলে তিনি সহজেই এই রাজ্যের ভোটার হয়ে যাবেন কারণ বিএলও’ দের মাধ্যম দিয়ে এই ফর্ম সিক্স এপ্রুভ হবে না এটা হবে আরও উপরের কোনও আধিকারিকের হাত দিয়ে। এই ভাবেই ভিন রাজ্যের ভোটাররা বাংলার নির্বাচনে নাম তুলছেন এবং ভোট দেবেন, এবং আধার দেখিয়েই ভোট দেবেন। অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীরা বুঝতেও পারবেন না, ঐ ভোটার এই রাজ্যের না ভিন রাজ্যের। সেই জন্যেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি সাংবাদিক সম্মেলন করে খোলাখুলি বলছেন, বাইরের রাজ্য থেকে ট্রেনে করে ভোটাররা আসবেন এবং হাসতে হাসতে ভোট দেবেন। ঠিক বিহারে যা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে বাংলায়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও যে খুব বেশী সহায় হবে না তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
তাহলে কী করণীয়? সমস্ত বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দল এক জায়গায় এসে এই অনৈতিক বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বাতিলের আওয়াজ তুলতে হবে। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে তাঁদের নিজস্ব অহংবোধ ছেড়ে বাংলার মানুষের কথা ভেবে, একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে যে তালিকায় ভোট হয়েছে, তার থেকে শুধু মৃত ভোটারদের বাদ দিয়ে ভোট করাতে হবে। ২০২৫ সালে যে সামারি রিভিশন হয়েছে, সেই তালিকা অনুযায়ী ভোট করার দাবীকে তুলতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, এত বৈধ ভোটারকে বাদ রেখে কিংবা ভুয়ো ভোটারদের ঢুকিয়ে নির্বাচন হলে তো নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতে বাধ্য। পরে যদি দেখা যায়, ঐ ভোটাররা ভুয়ো ছিল এবং বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও সঠিক ছিল না, তখন তো নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
শেষ করা যাক কংগ্রেসের কামরু চৌধুরীর একটি অভিযোগ দিয়ে, যা তিনি তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে করেছেন। তিনি বাংলার সিইও, মনোজ আগরওয়ালের কাছে, একটি কেন্দ্রের ভোটার তালিকা চান, কিন্তু সিইও, তা দিতে অস্বীকার করেন। তাঁর কথা অনুযায়ী এখনো তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাই দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের বুথ স্তরের কর্মীরা কোনও ভোটারের নাম, কোনও ঠিকানা পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিন্ত হতে পারবেন না, তিনি ঐ অঞ্চলেরই ভোটার কি না। আসলে এই ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী আইন করে ভোট ডাকাতি, যা বিরোধীরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। এত কিছুর পরেও কি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কি বাংলার স্বার্থে দেশের জন্য এক জায়গায় আসবে?