কিছু কিছু বই থাকে যার আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে ওঠে, কিছু কিছু বই থেকে যায় আড়ালে, পাঠক যখন তাদের খুঁজে নেয়, সেই নিবিড় পাঠে আলো ছড়িয়ে যায় পাতায় পাতায়, জানা হয়ে যায় ইতিহাসের অচেনা কিছু বাঁক, কিছু অল্প চেনা ভাবনা। সে রকম একটি বই নিয়ে শুরু হয়েছিল আলোক পাঠ সিরিজের পথচলা। বেশ কিছুদিনের বিরতির পর আবার আলো ভাগ করে নেওয়ার পালা। এবারের আলোক পাঠে পর পর আসবে বেশ কিছু বিদেশি বইয়ের কথা। প্রথম পর্বে জর্জ মিকেশ এর হাউ টু বি অ্যান এলিয়েন।
ছবি: রমিত
How to be an Alien
A Handbook for Beginners and Advanced Pupils
George Mikes
ভূমিকা
জর্জ (ইওরজ) মিকেশের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছিলেন প্রয়াত নিখিল সরকার, শ্রী পান্থ নামে যিনি আপামর বাঙালির কাছে পরিচিত। দাদার বন্ধু শান্তিদার (ভৌমিক) সৌজন্যে ক্লাস টেনে পাঠরতা তাঁর ভাগ্নিকে পড়ানোর কাজটি জোটে। মায়ের সংসারে থাকি তখন। ধান বেচা, বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে হাত সাফাই করে বাজে খরচার টাকা জোগাড় করতাম; শান্তিদার কল্যাণে এই আমার প্রথম আইনি উপার্জন। নিখিল বাবু আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, তাঁর বাড়িওলা ছিলেন শৈলজা নন্দ মুখোপাধ্যায়, তাঁর সদানন্দ চেহারাটি আজও মনে ভাসে। এ বাড়িতে আগত অনেক সাহিত্যিক সাংবাদিকের সঙ্গে নিখিল বাবু আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। বাড়িতে বইয়ের স্তূপ, তাঁর অধ্যয়ন ও মেধার কোন পরিসীমা ছিল না শুধু যে কোন বইয়ের রেফারেন্স দিতেন তাই নয়, বইয়ের গাদা থেকে পাতা খুলে দেখাতেন। মনে হয়েছে সত্যজিৎ রায় হয়তো তাঁরই আদলে সিধু জ্যাঠার রূপ দিয়েছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে, পাপুর মৃত্যুর পরে ‘পাপুর ছবি সঙ্গে ছড়া’ বইটির প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম; পাপুর একটি স্কেচের ওপরে সত্যজিৎ রায় তার পরিচিতি লিখে দেন। বিশ্ব সাহিত্যের অনেক অজানা রত্নের খোঁজ দিয়েছিলেন, যেমন হেনরি ইউল ও আরথার বারনেলের ১৮৮৬ সালে প্রথম প্রকাশিত বই হবসন জবসন। ভাষা ও শব্দের ইতিহাস মিলে এক আশ্চর্য নেশায় আচ্ছন্ন হবার জোগাড়, যেমন শিক্ষিত ইংরেজ কখনো বলবেন না ফোন, বলবেন টেলিফোন। মনে আছে নিখিল বাবু বলেছিলেন, ফিচার পড়ুন, উৎসাহিত করেছিলেন ফিচার লেখায়। তাঁর সাহচর্যে এবং একান্ত উৎসাহে দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ে আপাত অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে আমার ক্লান্তিহীন আগ্রহের সূচনা, যা আমি আজও সযত্নে লালন পালন করে চলেছি।
একদিন আমার হাতে একটি ছোট্ট চটি মতন বই তুলে দিয়ে বললেন, হবসন জবসনে ইংরেজি শব্দের খেলা খানিক চিনলেন, এবার যদি ইংরেজকে খুব হালকা ও ঘরোয়া ভাবে জানতে চান, মিকেশের বইটা পড়ুন, সঙ্গে আছে নিকোলাস বেন্টলির দুর্দান্ত সব স্কেচ। মনে আছে বলে দিয়েছিলেন মিকেস নয়, মিকেশ, হাঙ্গেরিয়ানে এস এর উচ্চারণ শ! ইনি হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক, ব্রিটেন থেকে হিটলার চেম্বারলেনের মিউনিক মিটিং কভার করতে দু সপ্তাহের জন্যে বুদাপেস্ট থেকে লন্ডনে এসেছিলেন। আর দেশে ফেরেননি।
হ্যাঁ, পড়ার সময় আধ ঘণ্টা!
উদগ্র কৌতূহলে যেদিন এই বই পড়েছি, তখন ভাবিনি একদিন আমার জীবন তরণী ইংরেজের ঘাটে এসে নোঙর ফেলবে, এ দেশ এবং জাতের সঙ্গে ওঠা বসা চলতেই থাকবে। চল্লিশটা বছর কেটে গেল, জর্জ মিকেশকে এবং তাঁর চোখ দিয়ে ইংরেজকে বারবার নতুন ভাবে আবিষ্কার করে চলেছি। মিকেশ আমার সঙ্গ ছাড়েননি, তাঁকে ছাড়া যায় না! হাউ টু বি অ্যান এলিয়েন আজও সমানভাবে সাময়িক, রেলেভ্যান্ট।
হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যে হাঙ্গেরির শিকলস শহরে এক ইহুদি পরিবারে মিকেশের জন্ম হয় ১৯১২ সালে (বাল্যাবস্থায় ধর্মান্তরিত) বাবা চেয়েছিলেন পুত্র তাঁর মতো ওকালতি করুক। জর্জ আইন পড়লেন কিন্তু সাংবাদিকতার পেশা বেছে নিলেন। বুদাপেস্টের রেগেল (হাঙ্গেরিয়ানে ইও রেগেলট মানে সুপ্রভাত) পত্রিকায় সাময়িক প্রসঙ্গের ওপরে কলাম লিখতেন। ইউরোপের পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ, হিটলার দালাদিয়ে এবং চেম্বারলেনের মিটিং হবে মিউনিকে সেপ্টেম্বর মাসে। কি জানি কী হয় অবস্থা। পত্রিকার সম্পাদক একদিন জর্জকে ডেকে বললেন আপনার ইংরেজিতে বেশ দখল আছে জানি, আপনি লন্ডন যান, সেখান থেকে অন দি স্পট খবর পাঠাবেন, মিউনিক কনফারেন্সের শেষে বুদাপেস্ট ফিরবেন। জর্জ সম্মত হয়ে যখন বাক্স প্যাঁটরা বাঁধছেন, সকাল আটটার খবর (নিওলক ওরা উইসাগ) কাগজ জানালে তারা মিকেশের খরচার ভাগ নিতে রাজি আছে যদি তিনি ইংল্যান্ডের ওপরে একটা সাপ্তাহিক ফিচার লেখেন। ছাব্বিশ বছরের জর্জ এলেন নতুন দেশে, মিউনিকের বাদ বিসম্বাদের বিলিতি ভার্শন পাঠালেন হাঙ্গেরিয়ানে। একদিন চেম্বারলেন লন্ডনের ক্রয়ডন এয়ারপোর্টে নেমে হাতের একটা কাগজ উঁচু করে ধরে সমবেত জনতাকে বললেন, এটি এই কালের শান্তির বাণী, পিস ইন আওয়ার টাইম। হিটলার আপাতত শান্ত হলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই স্বরূপে প্রকট হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া দখল করলেন।
মিকেশ আর ফিরলেন না। যুদ্ধ শুরু হলে বিবিসির হাঙ্গেরিয়ান বিভাগের ভার নিলেন, একদিন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেন, এবার লিখতে শুরু করলেন ইংরেজিতে; বিষয় ইংরেজ! লেখার প্রতি ছত্রে লুকিয়ে আছে কৌতুক।
সব লেখারই একটা ট্রিগার থাকে, মিকেশের ট্রিগার সম্ভবত একটি বিবাহ প্রস্তাব।
এক ইংরেজ মহিলা তাঁকে বললেন, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?
মিকেশ: না, আমার মা চাইবেন না আমি কোন বিদেশিকে বিয়ে করি।
মহিলা: আমি বিদেশি? কি বোকার মত কথা! আমি ইংরেজ। বিদেশি
হলে তুমি, তোমার মাও বিদেশি।
মিকেশ: সেকি? এমনকি বুদাপেস্টেও?
মহিলা : সর্বত্র। ভূগোলের ওপরে কিছু নির্ভর করে না যা ইংল্যান্ডে
খাটে সেটা হাঙ্গেরি কেন, উত্তর বোরনিও বা ভেনেজুয়েলাতে
সমান সত্য।
ইংল্যান্ডে বসবাস, উঁচু মহলে ওঠাবসার ফলে মিকেশ নিজেকে ইংরেজ ভাবতে শুরু করেছিলেন। এবার বুঝলেন ইংল্যান্ডে বিদেশি বিদেশিই থেকে যায়। কোন লর্ডের বাড়িতে আমন্ত্রিত হলেও এই তকমা থেকে তার মুক্তি নেই! সে রয়ে থেকে যাবে বিদেশি, এলিয়েন। অতএব তার উচিত এলিয়েনের চোখ দিয়ে, একটু তফাৎ থেকে ইংরেজকে দেখা, বোঝা, কখনো বা তার কপি করা। বলা বাহুল্য এই বইটির অজস্র বক্রোক্তি এবং নির্মল হাস্যরস ছাপিয়ে যায় দেশ ও কালকে; তার দুটি চমৎকার উদাহরণ তিনি দিয়েছেন-
১৯৬০ সালে রোমানিয়ান রেডিও হাউ টু বি অ্যান এলিয়েনের কটাক্ষকে ইংরেজ বিরোধী প্রোপাগান্ডা হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে একটি পুরো সিরিজ প্রচার করে।
সেই বছর ব্রিটিশ সরকারের তথ্য বিভাগ বইটির পোলিশ অনুবাদের অনুমতি চায় মিকেশের কাছে। তিনি অত্যন্ত অবাক হয়ে বলেন এ বইতে আমি যে আপনাদের চূড়ান্ত ব্যঙ্গ করেছি! সরকারি অফিসার বলেন, আমরা চাই আমাদের বন্ধুরা আমাদের এমনি চোখে যেন দেখেন, হালকা হাসি মুখে!
মিকেশের স্থানীয় ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের স্ত্রী এই বই পড়ে হেসেছিলেন, স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে বলেন, পড়ো, কোয়াইট অ্যামিউজিং! তাঁর স্বামী একাসনে বসে পুরো বইটি পড়া শেষে সেটিকে ফায়ারপ্লেসে নিক্ষেপ করে বলেন, ডাউনরাইট ইমপারটিনেন্স!
মিকেশ বলেন সেদিন বুঝলাম আমার এ লেখা সার্থক! ইংরেজ নিজেকে নিয়ে হাসতে জানে।
মিকেশের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বুদাপেস্টে একই স্কুলে পড়তেন আন্দ্রে ডয়েচ। যুদ্ধের পরে লন্ডনে এসে একটি প্রকাশনা সংস্থায় যোগ দেন। পুরনো পরিচয়ের জোরে মিকেশ তাঁকে পাণ্ডুলিপিটি পড়তে অনুরোধ করেন। বেণীর সঙ্গে মাথা, আন্দ্রে জোগাড় করলেন নিকোলাস বেন্টলিকে, যিনি আঁকলেন অসাধারণ সব স্কেচ। তাদের নিয়ে মিকেশের সকল ব্যঙ্গ কৌতুক ঠাট্টা ইয়ার্কিকে মাথায় তুলে ইংরেজ দলে দলে এই বই কিনলো। আশি পাতার বই; কুড়ি বছরের মধ্যে চব্বিশটি সংস্করণ ছাপা হল (আমার সংগ্রহে আছে ১৯৬৬ সালের পেঙ্গুইন সংস্করণ)। সে বইয়ের তিন লক্ষ কপি কিনে ইংরেজ প্রমাণ করল আর কিছু না থাকুক তার সেন্স অফ হিউমর আছে!
অনুবাদে গাজন (পঠন) নষ্ট। তবু এই অসামান্য ক্লাসিকের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করানোর জন্য কয়েকটি পরিচ্ছেদের দুর্বল তর্জমা পেশ করার লোভ এড়াতে পারলাম না।
নবীন আগন্তুকের প্রতি সাবধান বাণী
মনে রাখবেন, কথা প্রসঙ্গে যখন কেউ বলেন ইংল্যান্ড, তিনি বোঝান গ্রেট ব্রিটেন বা ইউনাইটেড কিংডম, ইংল্যান্ড মানে কখনোই শুধু ইংল্যান্ড নয়!*
রবিবারের দিন ইউরোপের দরিদ্রতম মানুষ দাড়ি কামিয়ে তার সবচেয়ে যত্নে রাখা একমাত্র ভদ্র জামা বা সুটটি পরে পাড়ার মোড়ে দাঁড়ায়, কফি হাউসে আড্ডা দেয়। মোটর মেকানিক হোক আর সম্মানিত লর্ড হোক, ইংরেজ সেদিন দাড়ি কামায় না, ফেলে দেওয়ার যোগ্য লঝঝর পোশাক পরে দুঃখী দুঃখী ভাবে রাস্তায় হাঁটে।
ইউরোপের আড্ডায় আবহাওয়া নিয়ে কেউ গপ্প ফাঁদে না। ইংল্যান্ডে আপনি যদি দিনে অন্তত দুশো বার না বলেন, কি সুন্দর দিন, ইট ইজ এ লাভলি ডে, ইংরেজ মনে করবে আপনি নিতান্ত বোরিং, ডাল।
ইউরোপে মেলে ভালো খাবার, ইংল্যান্ডে পাবেন ভালো টেবল ম্যানারস।
বুদাপেস্টের আন্দ্রাসি স্ট্রিটের কফি হাউসে আপনি অনায়াসে প্লেটো, টমাস মান কোট করে বাকতাল্লা মারতে পারেন। ইংল্যান্ডে গ্রিক বা ল্যাটিন ভাষায় কোন বিদেশি গুণীজনের উদ্ধৃতি দেওয়াটা আপনার লোক দেখানো বিজ্ঞতা জাহির করার চেষ্টা বলে পরিগণিত হয়, আহা ইনি কতো জানেন!
ইংরেজ সবচেয়ে আহত হয় যখন তাকে কেউ বলে আপনার সেন্স অফ হিউমর নেই।
ইউরোপের মানুষ হয় সত্যি বলে অথবা মিথ্যে বলে। ইংল্যান্ডের লোক কখনো মিথ্যে বলেন না কিন্তু সত্যি কথাটা বলার দুঃসাহস কখনো দেখান না।
ইউরোপে আমরা মনে করি জীবন একটা খেলা। ইংরেজ জানে ক্রিকেট একটা খেলা।
আবহাওয়া
আচরণ নির্দেশিকা
সংলাপ সূত্র : ভালো আবহাওয়া
প্রথম জন: চমৎকার দিন, তাই না?
দ্বিতীয়: ভারি সুন্দর, তাই না?
প্রথম: কি দারুণ, ঝকঝকে দিন
দ্বিতীয়: বেশ গরমও পড়েছে, তাই না?
প্রথম: আমার খুবই ভালো লাগছে, তাই না?
সংলাপ সূত্র : খারাপ আবহাওয়া
প্রথম জন: কি বিশ্রী দিন, তাই না?
দ্বিতীয়: কি খারাপ দিনটা, তাই না?
প্রথম: আর এই বৃষ্টি, একেবারে অসহ্য!
দ্বিতীয়: সহ্য করা যায় না, আপনি কি বলেন?
প্রথম: ভাবা যায়, জুলাই মাসে এমন আবহাওয়া?
দ্বিতীয়: এমনি একটা বিশ্রী জুলাই মাসের দিন মনে পড়ছে, সালটা হবে ১৯৫৬।
প্রথম: ঠিক, আমারও মনে পড়ছে।
দ্বিতীয়: না কি ১৯৬৪?
প্রথম: ঠিক তাই।
ইংরেজ সমাজ বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। যদি বিশ্বাস না হয়, রেডিওতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুনুন –
আগামী কাল সকালে ঠাণ্ডা পড়বে, সঙ্গে কুয়াশা, দুপুর থেকে একটানা বৃষ্টি, তার মাঝে মাঝে সামান্য রোদের আভাস।
চাষিদের জন্য পূর্বাভাস
চমৎকার দিন, বেশ কয়েক ঘণ্টা রোদ্দুর।
(আমার নোট – আরেকটি শ্রেণি আছে। ইংল্যান্ডের জাহাজের মাল্লাদের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাষ সম্প্রচারিত হয়, তার নাম শিপিং ফোরকাস্ট; কেন যে বি বি সি রেডিওতে টেস্ট ম্যাচ স্পেশ্যালের মাঝে সেটি শোনানো হয়!)
ভাষা
ইংল্যান্ডে পৌঁছে মিকেশ ভেবেছিলেন তিনি ইংরেজিটা জানেন (আমারও একই ভ্রান্তি ছিল), তাঁর ভুল ভাঙতে এক ঘণ্টা লাগে। এক সপ্তাহ বাদে তিনি মনে করেন মোটামুটি কাজ চালানোর উপযুক্ত ইংরেজি তাঁর আয়ত্তে এসেছে। সাত বছর বাদে বুঝলেন সঠিক ইংরেজি ভাষার ব্যবহার তাঁর ইহজন্মের কাজ নয়, তবে একমাত্র আশার কথা এই যে কারো ইংরেজি সঠিক নয়।
আপনি কতো গুলো শব্দ বা ইডিয়ম জানেন সেটা প্রমাণ করে রাজা উজির মারতে পারেন না। আপনাকে জানতে হবে কোন শব্দটা কোন খানে জুতসই, যেমন ‘নাইস’। আপনি এর সতেরোটা প্রতিশব্দ হয়ত জানেন কিন্তু এই একটা বিশেষণ আপনার কাজ চালিয়ে দেবে – আবহাওয়া নাইস, মিস্টার অমুক নাইস, রেস্তোরাঁ নাইস, খাবার নাইস।
পরবর্তী সোপান – আপনার অ্যাকসেন্ট
আপনি বিদেশি, আপনার অ্যাকসেন্ট বিদেশি। কিন্তু কিছু বিদেশি কায়দা করে তার সঙ্গে অন্য কিছু মিশিয়ে দেয় যেমন পোলিশ অ্যাকসেন্ট। তবে চিন্তার কারণ নেই মুখে পাইপ গুঁজে অস্ফুট স্বরে আপনি যেদিন বলেন ইজনট ইট? তখন জানবেন আপনি পাস করে গেছেন।
কেউ কেউ অক্সফোর্ড বা মেফেয়ার অ্যাকসেন্ট নকল করেন কিন্তু মিকেশ মনে করেন সে চেষ্টা না করাই ভালো, গলায় বেজায় চাপ পড়ে।
শক্ত গ্রিক বা ল্যাটিন শব্দ ব্যবহার করবেন না। মিকেশের এক রাশিয়ান বন্ধু ক্লাবের চেয়ারে বসে বলেছে, আমার ভীষণ নোটালজিয়া হয়েছে (ঘাড়ে বা কাঁধে চুলকানি)
শশব্যস্ত হয়ে পাঁচজন ইংরেজ বলে উঠেছেন, সেকি, নিঝনি নভগরদে ফিরে যেতে চাও?
দুটি উপদেশ
ইংরেজি বলার চেয়ে লেখা ঢের ভালো। লিখিত ইংরেজির কোন অ্যাকসেন্ট নেই।
বাসে বা কোন পাবলিক জায়গায় স্বচ্ছন্দে জার্মান বা হাঙ্গেরিয়ানে বিড়বিড় করুন, কখনো ইংরেজিতে নয়।
মিকেশের ভাষার দম্ভ সেদিন ভাঙল যেদিন এক ভদ্রমহিলা তাঁকে বললেন, ইউ স্পিক এ মোস্ট একসেলেন্ট অ্যাকসেন্ট, উইথআউট স্লাইটেস্ট ইংলিশ।
বাজার দোকান ডাক্তার
যে কোন ইউরোপিয়ান শহরের প্রতি পাড়ায় না হোক পাশের পাড়ায় বইয়ের দোকান, ডাক্তার, উকিল পাবেন। লন্ডনে বই পাবেন চেয়ারিং ক্রস রোডে, ডাক্তার হার্লে স্ট্রিটে, দরজি স্যাভিল রোতে, উকিল লিঙ্কনস ইনে।
নগর পরিকল্পনা
মনে রাখবেন ইংল্যান্ডের শহরগুলির প্রাথমিক উদ্দেশ্য সকল বিদেশিকে ভুল পথে চালিত করা।
এক। ইংরেজ নিরিবিলিতে থাকতে চায়। সে চায় না রাস্তার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যাক তাই কোন রাস্তা সিধে বানানো হয় না, কয়েক গজ গিয়েই সেটি মোক্ষম বাঁক নেয়।
দুই। ইউরোপের রাস্তায় একদিকের বাড়ির জোড়া নম্বর, অন্য ফুটপাথে বেজোড়। ইংল্যান্ডে নম্বর সিস্টেম সেই ভাবেই শুরু হয় কিন্তু মাঝে মাঝেই ফুটপাথ বদল করে ফেলে, জোড়ের পাশেই জ্বলজ্বল করে বেজোড়।
তিন। ইউরোপে কয়েক মাইল লম্বা একটানা রাস্তার একটাই নাম হয় (আমার নোট - পোল্যান্ডের উচ শহরে দেখেছি পিওত্রকোওস্কা, পাঁচ কিলোমিটার সোজা রাস্তা)। ইংল্যান্ডে একটি সিধে রাস্তার নাম পরিবর্তিত হতেই থাকে – যেমন হাই হোবোরন, বেজওয়াটার, নটিং হিল, হল্যান্ড পার্ক।
চার। ইউরোপে রাস্তার নাম হয় র্যু, স্ত্রাসে, এভিনিউ, স্ত্রাদা। ইংল্যান্ডের পথ একনামে সাড়া দেয় না। এক কিলোমিটারের মধ্যে পাবেন বেলসাইজ রোড, বেলসাইজ গার্ডেনস, বেলসাইজ গ্রিন, বেলসাইজ সার্কাস, বেলসাইজ আরকেড, বেলসাইজ হিথ।
চালাকি বর্জনীয়
ক্লেভার কথাটা ইংরেজি অভিধানে অবশ্যই আছে, যার মানে দক্ষ বুদ্ধিমান ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আপনার বুদ্ধিমত্তা দেখানোটা ব্যাড ম্যানারস। আপনি জোর গলায় কখনোই বলতে পারেন না দুইয়ে দুইয়ে চার হয়। সেটা একপেশে শোনাবে। ইংল্যান্ড গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে মানুষের স্বতন্ত্র ভাবনা চিন্তাকে সম্মান দিতে হয়।
এই ধরুন ক্লাবের জানলায় দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে এক ইউরোপিয়ান বললেন, দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন উটরেখট যেখানে ১১ই এপ্রিল ১৭১৩ সালে স্প্যানিশ উত্তরাধিকারের শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল।
এ ধরনের জ্ঞানীর মতন কথাবার্তা বলবেন না কোন সভ্য ইংরেজ। তিনি জানলার বাইরের সেই একই দৃশ্য দেখে দু ঘণ্টা চুপ করে ভাববেন কীভাবে তাঁর ঠিক কি বলা উচিত। আরও আধ ঘণ্টা বাদে তিনি বলবেন, ইটস প্রিটি, ইজনট ইট?
বর্বর হবার উপায়
ইউরোপে অসভ্য বর্বরের তকমা পাওয়া অত্যন্ত সহজ – যাকে দেখতে পারি না তাকে আমার পছন্দমত কোন জানোয়ারের নাম দিতে পারি। সে যাই মনে করুক, সেটা তার সমস্যা। বুদাপেস্টের এক নামকরা সফল জুয়াড়ি খুব বিচ্ছিরি ছবিও আঁকতেন। একজন তাঁর মুখের ওপরে বললেন, সারা রাত খেলে তাসের জুয়াতে যে টাকা কামান সেটা এই ফালতু ছবি আঁকাতে নষ্ট করেন কেন?
ইউরোপে কেউ একটা আষাঢ়ে গল্প শোনালে তাকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গুল দিও না, এটা হতেই পারে না।
ইংরেজ মোটে তা করবে না, মন দিয়ে সেই আষাঢ়ে গল্পটি শুনে ধীরে সুস্থে বলবে, আচ্ছা তাই বুঝি? অথবা, ইট ইজ অ্যান অ্যানউজুয়াল স্টোরি!
মিকেশ তাঁর অতি দুর্বল ইংরেজি ভাষার ভরসায় ট্রান্সলেটরের কাজের জন্য দরখাস্ত করেছেন। জবাব পেলেন, আপনার ইংরেজির দখলটা একটু বিচিত্র (আনইউজুয়াল) মনে হচ্ছে। মিকেশ লিখেছেন বুদাপেস্টে এমন ঘটলে ইন্টারভিউয়ার তাঁর সেক্রেটারিকে বলতেন, ইয়ানা, এই ভদ্রলোকের পেছনে লাথি মেরে সিঁড়ি দিয়ে ঠেলে ফেলে দাও।
ইংরেজ কদাচ সেটি করে না, তার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তির উদাহরণ
আই অ্যাম অ্যাফ্রেড
আই আম সরি বাট
উই আর নট অ্যামিউজড
জাতীয় আসক্তি
ইংরেজের জাতীয় আসক্তির নাম লাইনে দাঁড়ানো, কিউইং।
ইউরোপে বাস স্টপের আশে পাশে দশজন গজল্লা করেন, সিগারেট ফোঁকেন। বাস এলেই পড়ি কি মরি করে বাসের দিকে ছোটেন, ভাগ্যবান কিছু বাসে উঠে পড়েন, দুর্ভাগাদের জন্য অ্যাম্বুলেনস আসে।
ইংল্যান্ডের বাস স্টপে একজন মানুষ থাকলেও তিনি লাইন দিয়ে দাঁড়ান, কিউ অফ ওয়ান।
লেসটার স্কোয়ারে সিনেমা হলে দেখবেন – এখানে দু পাউন্ডের টিকিটের জন্য লাইন দিন, ওখানে তিন পাউন্ডের ইত্যাদি।
উইকএন্ডে ইংরেজ কিউ দিয়ে বাসে চড়ে রিচমন্ড যায়, বোটের জন্য লাইনে দাঁড়ায়, চায়ের জন্য আরেকবার, বাচ্চাদের আইসক্রিমের জন্য একবার। শুধু লাইনে দাঁড়ানোর আনন্দে আরও বার কয়েক লাইন দিয়ে বাস স্টপে কিউ দিয়ে বলে কি দারুণ কাটল দিনটা।
সেক্স
কন্টিনেন্টাল পিপল হ্যাভ সেক্স লাইফ। দি ইংলিশ হ্যাভ হট ওয়াটার বটল।
সুপরামর্শ
বন্ধুর সঙ্গে দু মাইল হাঁটবেন নিঃশব্দে।
কুকুরের সঙ্গে হাঁটলে কথা বলতেই থাকবেন।
হৃদয় এবং মিতভাষণ (সোল অ্যান্ড আন্ডার স্টেটমেন্ট)
বিদেশির আছে হৃদয়, ইংরেজের আছে মিতভাষণ, আণ্ডার স্টেটমেন্ট
টি
চা একটি উৎকৃষ্ট পানীয়। একদা ছিল।
বিপদ ঘটল যখন কিছু ইংরেজ বৈজ্ঞানিক তাঁদের যাবতীয় বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে এই সহজ সরল পানীয়টির সর্বনাশ সাধনে ব্রতী হলেন। তাঁরা প্রমাণ করে ছাড়লেন পানীয়টি নিট অথবা লেবু, রাম, চিনি সহ পান না করে এতে ঠাণ্ডা দুধ মেশালে অভীষ্ট লাভ হয়। অতঃপর সেটি একটি বর্ণ বিহীন গরম জলে পরিণত হয়েছে যা আজ ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পানীয়।
কিছু পরিস্থিতিতে এই পানীয়কে প্রত্যাখ্যান করাটা অত্যন্ত রূঢ় আচার বিবেচিত হতে পারে। কারো বাড়িতে আপনি অতিথি হয়ে গেছেন, আপনার হস্টেস ভোর পাঁচটায় ধূমায়িত কাপ নিয়ে আপনার দরোজায় কড়া নাড়লেন। তাঁকে আপনি কিছুতেই বলতে পারেন না, ‘হে হৃদয়হীনা, দূর হন, আমি ঘুমুতে চাই। আপনাকে এখুনি গুলি করে মারতে ইচ্ছে করছে’। আপনি বলবেন, ‘আপনার এই কষ্ট সাধনের জন্য অজস্র ধন্যবাদ। ভোর পাঁচটায় চা পেয়ে আমার যে কি ভালো লাগলো।’
চা আসতেই থাকে, ব্রেকফাস্টে চা, এগারোটার সময়ে লাইব্রেরিতে চা, লাঞ্চের পরে চা, চায়ের সময়ে চা, ডিনারের পরে চা, রাত এগারোটার সময়ে আরেকবার চা।
নিম্নলিখিত কারণে আপনি কখনো চা প্রত্যখ্যান করতে পারেন না
১) চা ঠাণ্ডা
২) চা গরম
৩) আপনি ক্লান্ত
৪) চা প্রদায়িনী যদি মনে করেন আপনি ক্লান্ত
৫) আপনি এখুনি বেরুচ্ছেন
৬) আপনি এখুনি ফিরলেন
৭) অনেকক্ষণ যাবত আপনি চা পান করেননি
৮) আপনি এইমাত্র এক কাপ চা পান করেছেন
দরাদরি বনাম আপোষ (বারগেনিং অ্যান্ড কমপ্রোমাইজ)
আপোষ ইংরেজের বড়ো গুণ।
ইউরোপের বাজারে মুদি এক গোছা মুলোর দাম চাইল ১৪ ক্রাউন ফ্রাঁ দিনার দ্রাখমা বা আর কিছু, খদ্দের বললে দু ক্রাউন ফ্রাঁ দিনার বা দ্রাখমা। খানিক দরাদরি চলল; ইতিমধ্যে মুদি আপনার কাউনটার অফার শুনে মূর্ছা গেছেন প্রায়। শেষ অবধি ৬ ক্রাউন ফ্রাঁ দিনার দ্রাখমায় সউদা হলো। এটি ইংরেজের হারগিজ নাপসন্দ আচরণ। ধরুন ব্রিটিশ ডক কর্মীরা দিনের মাইনে চার শিলিং (মিকেশের আমলে পাউনড শিলিং পেন্স ছিল) বাড়ানোর দাবী জানিয়েছে; কর্তৃপক্ষ পত্রপাঠ সে আবেদন নাকচ করে বললেন কেস ক্লোজড। তারা হত্যে দিয়ে বসে রইল না, ডকের সামনে ঝাণ্ডা তুলে কাজ করতে থাকল। তিন সপ্তাহ বাদে বড়ো সায়েব বেরিয়ে এসে বললেন আচ্ছা, দিনের মাইনে দু শিলিং বাড়িয়ে দিচ্ছি। ডক কর্মীরা হই হই করে পাবে গেলো।
দরাদরি করাটা নিম্ন রুচির পরিচয়। আপোষ উচ্চতম হিউম্যান ভারচু।
সরকারি আমলা
ইংরেজ আমলা ও ইউরোপিয়ান আমলার মধ্যে বেজায় ফারাক।
ইউরোপের সরকারি আমলার আচরণ মিলিটারির মতন। তারা ছোট মাপের জেনারাল, যে কোন কাজের সুরাহা সমাধান কেবলই পিছিয়ে দেয়, হুকুম করে কঠোর স্বরে, তাদের কথা যেন বন্দুকের গুলি- র্যাটাটাট। এই জেনারালরা যুদ্ধ করেন না, আপনার জরুরি ডকুমেন্ট হারিয়ে গভীর তৃপ্তি অনুভব করেন। তাঁদের মতে মনুষ্য জাতির শ্রেষ্ঠ লক্ষ আমলা তন্ত্র। মুশকিল হল কিছু গোঁয়ার গোবিন্দ মানুষ আর্তি আবেদন নিয়ে হাজির হন, তাঁদের ঠাণ্ডা অন্ধকার অপেক্ষা গৃহে বসিয়ে রাখা হয়, অফিসের ভেতরে যাবার আদেশ পেলে সেখানে গিয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন, আমলারা সব সময়ে উচ্চ কণ্ঠে কথা বলেন। কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পরে আবেদনকারীকে বলা হয় পাঁচশ গজ দূরের কোন বাড়ির পাঁচ তলায় যেতে, এই দুর্ভাগা সেখানে গেলে তাঁকে একজন জানান এটা ভুল ঠিকানা, যেতে হবে মাইল খানেক দূরে যে সরকারি অফিস তার বেসমেন্টে; সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন আসলে তাঁকে যেতে হবে প্রথম যে অফিসে গিয়েছিলেন সেইখানে। এবার সেখানে গেলেই ধমকানি খাবেন, পাঁচ তলার অফিসে কেন যাননি ইত্যাদি। আবেদনকারীর পাগল হতে বাকি, এবার তিনি স্থানীয় পাগলা গারদে ভর্তির জন্য দরখাস্ত করতে চান। তখন তাঁকে জানানো সেটা এখানে নয়, তাঁকে যেতে হবে এক মাইল দূরের সেই বাড়িটার পাঁচ তলায়।
(আমার নোট – একটুও বাড়ানো নয়! নিজের জার্মান বন্ধুদের গল্প থেকে জানি মিকেশের বর্ণনার সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা মিলে যায় হুবহু!)।
ইংরেজ আমলা মিলিটারি কায়দায় চলেন না, তাঁর স্টাইল হল কোম্পানি সিইও-র মতন, স্মুথ, ভদ্র, কেতা দুরুস্ত। কথা বলেন ধীরে, আপনার বক্তব্য শোনেন মনোযোগ দিয়ে। এবার আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন তাহলে সিভিল সার্ভিসের যে মূল উদ্দেশ্য- কোন কাজ না করে বিনা বাধায় টেবিলে পা তুলে আগাথা ক্রিস্টির নভেল পড়া -সেটি কীভাবে সাধিত হতে পারে?
বহু শতাব্দীর ব্রিটিশ আমলা ট্র্যাডিশন তৈরিই হয়েছিল এই শুভ বাসনায়, তবে তার ধাপ গুলি এইরূপ-
এক। পাবলিকের প্রতি সমস্ত আদেশের, ডিরেকটিভের কোন অর্থ উদ্ধার যেন সম্ভব না হয়।
দুই। অফিশিয়াল চিঠি এমন ভাষায় লেখা হবে যে গ্রিসে ডেলফি মন্দিরের গম্ভীর প্রতিধ্বনিকে খুবই পরিষ্কার, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার শোনাবে।
তিন। আমলারা কোন সিদ্ধান্ত নেন না, তাঁরা কেবল বিবেচনা করেন (দে কনসিডার – ইয়েস মিনিস্টার দেখুন)
চার। সরকারি আমলা জনসাধারণের সেবায় নিবেদিত প্রাণ। তবে যখনই তাঁদের খোঁজ পড়ে তাঁরা হয় মিটিঙে বা লাঞ্চে, নয় বাইরে থাকেন। কোন কোন আমলা আরও এক কাঠি সরেস – তাঁরা লাঞ্চের পরে সিধে চায়ে যাবার তরিকা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।
ইউরোপিয়ান আমলার মতন এদের কোন মতেই বুলি বলা যাবে না, এঁরা তর্জন গর্জন করেন না। সুর তোলেন না উঁচু গ্রামে। এঁরা জনগণের ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। বিনয়ের পরাকাষ্ঠা। কোন একজন তাঁর ভিসার কাল কেটে যাবার বহুদিন থেকে গিয়েছিলেন; ইংরেজ আমলা তাঁকে এই চিঠি লেখেন
প্রিয় মহাশয়
রাষ্ট্র বিভাগের উপ সহায়ক আপনাকে সাদর সম্ভাষণ নিবেদন করিতেছেন। আপনার বিষয়টির পুনর্বিবেচনা করিতে অক্ষম হইবার কারণে আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তিনি জানাইতে চান আপনি যেন আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগ করেন, অন্যথায় আপনাকে বলপূর্বক বহিষ্কৃত করা হইবে।
ইতি
আপনার একান্ত অনুগত সেবক
যদি আপনি স্বাভাবিক হন
কোন বিদেশি মানুষ সঠিক ভিসা সহ নতুন দেশে এসে আইন কানুন না ভেঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু কাল বসবাস করলে সাধারণত তার সে দেশের নাগরিকত্ব অর্জনের অধিকার জন্মায়। এটি তার দ্বিতীয় নাগরিকত্ব হতে পারে অথবা আগেরটি বাতিল করে সে নতুন পাসপোর্ট নিতে পারে (যেমন ভারতীয়দের দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদিত নয়)। এ পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু ইংল্যান্ডে যোগ হয় আরেকটি অতিরিক্ত স্টেপ; ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাবার আগে আপনাকে ন্যাচারালাইজড হতে হবে। মানে এতদিন আপনি বুদ্ধি বিবেচনা সম্পন্ন জগতে বিচরণরত ব্যক্তি ছিলেন না; অক্সফোরড ডিকশনারি মানলে আপনি শুভ বুদ্ধি হীন ব্যক্তি বিশেষ। পাসপোর্ট দিয়ে ইংরেজ আপনাকে নিজেদের সমাজে তুলতে পারে না। বছর দুয়েক সময় নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে হবে (আমার নোট - কোন অজ্ঞাত কারণে আমাকে এই ধাপটি পার হতে হয়নি)। এটি কেবলমাত্র সময় নষ্ট করার একটি স্টেপ বলে মনে হতে পারে কিন্তু আপনি যখন ন্যাচারালাইজড হবেন তখন কিছু আইন মানা অতি আবশ্যক
১) ব্রেকফাস্টে পরিজ খাবেন এবং সকলকে জানাবেন আপনি পরিজ খেতে ভালবাসেন।
২) আপনার নিজের দেশের পরিচিতজন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে কেবলমাত্র ইংরেজিতে বাক্যালাপ করবেন। কোন বিদেশি ভাষা বা তার চর্চা রাখা অত্যন্ত আনইংলিশ।
৩) আপনার বইয়ের শেলফ থেকে বিদেশি ভাষার এমনকি ইংরেজিতে অনুদিত বিদেশি বই নির্বাসনে পাঠাবেন। দস্তয়েভস্কির জায়গায় রাখেবন কনসাইজ ভলিউম অফ ইংলিশ বার্ডস।
৪) নতুন দেশবাসী ভাই বেরাদরের সঙ্গে বাক্যালাপে প্রথম পুরুষ বহু বচন (ফার্স্ট পারসন প্লুরাল) ব্যবহার করবেন; আই নয়, উই।
ক্ষেত্র বিশেষে সাবধানতা অবলম্বন করুন। একজন সদ্য ইংরেজ বনে যাওয়া ন্যাচারালাইড ব্রিটিশ তাঁর সহযোগীর সঙ্গে কথা বলতে বার বার ‘উই ইংলিশমেন’ বলে চলেছেন। তাঁকে থামিয়ে সেই ভদ্রলোক বললেন, সরি, আমি ওয়েলশ!
যুদ্ধের সময়ে সেই একই ভদ্রলোক ক্লাবে বসে রেডিও শুনছিলেন। জানা গেল জাপানিরা বাইশটি প্লেন ধ্বংস করেছে।
তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাদের প্লেন, আমাদের?
ইংলিশ হোস্টেস ঠাণ্ডা গলায় বললেন, না, আমাদের।
হাউ টু বি অ্যান এলিয়েনের অভাবনীয় সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রকাশক আন্দ্রে ডয়েচ একদিন মিকেশকে বলেন এমনি আরেকটি বই লিখুন! ইংরেজ এবং ইংল্যান্ডকে নিয়ে মিকেশের পরের দুটি বই- হাউ টু বি ডেকাডেন্ট এবং হাউ টু বি পুওর, সেখানে মিকেশের ব্যঙ্গ আরও ব্যাপক, তীক্ষ্ণ! তিনটি বই জুড়ে যে ওমনিবাস তার নাম হাউ টু বি এ ব্রিট; ইংরেজ সেটিও সানন্দে মাথায় তুলে নিয়েছে।
পুনশ্চ:
সিটি এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে আমার দফতরের সহকর্মী কুরস্কের নাতালিয়া সকোলোভা, ইজমিরের গুরকান এনসারি, পাটনার বিবেক সিনহা সহ আরও অনেককে তাদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের খবর পেয়ে গ্যাঁটের পয়সায় কিনে এক কপি হাউ টু বি অ্যান এলিয়েন উপহার দিয়েছি।
বারবার নিখিল বাবুর কথা মনে হয়েছে, তাঁর মতন করে মিকেশকে সাধ্যমত বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছি জানলে তিনি কি খুশি হতেন।
প্রথম সংস্করণ ১৯৪৬ আন্দ্রে ডয়েচ
২৪তম সংস্করণ ১৯৬৬ পেঙ্গুইন
পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮৮ (স্কেচ ২২ পাতা)
পুনশ্চ
দুই
*গ্রেট ব্রিটেন বলতে বোঝায় ইংল্যান্ড স্কটল্যান্ড ওয়েলস; এদের সঙ্গে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড জুড়লে তার নাম হয় ইউনাইটেড কিংডম।
পুনশ্চ
তিন
বইটির সূচনায় আমেরিকান কবি ও ঔপন্যাসিক অ্যালিস মিলারের দুটি লাইন তুলে দিয়েছেন মিকেশ -
এ দেশে যা দেখেছি তার অনেক কিছুই পছন্দ করিনি, ক্ষমা করেছি অনেক কিছু। কিন্তু যে পৃথিবীতে ইংল্যান্ডের অস্তিত্বই নেই, সেখানে আমি বাঁচতে চাই না।
অ্যালিস ডুর মিলার (১৮৭৪-১৯৪২)
হোয়াইট ক্লিফস

প্রচ্ছদ

ব্যাক কভার

রবিবারের ইংরেজ
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।