

অলংকরণ: রমিত
বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের মত প্রাথমিক শক্তি সম্পদ অসমভাবে বণ্টিত এবং বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। যেসব দেশ এই শক্তি সম্পদে সমৃদ্ধ নয়, তারা প্রায়শই আমদানির উপর নির্ভরশীল এবং সেই কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকির ব্যাপারে এদের সংবেদনশীল থাকতে হয়।
বিগত শতাব্দী এবং গত কয়েক দশকে তৈলসম্পদ ও জিডিপির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে কিভাবে তেলের মালিকানা ও ব্যবহার একটি দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাকে চালিত করেছে এবং অতীতে কীভাবে নতুন উৎসের বিকাশ, দেশের উন্নতির এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় এই দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জ্বালানি শক্তির উৎস হিসেবে তেল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি প্রধান বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, অনেক ক্ষেত্রে কয়লার বিকল্প হিসেবে। উনিশ শতকের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে তেল আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহারও শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, শক্তি সম্পদ হিসেবে জ্বালানী তেলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন ছিল ব্রিটেনে উইনস্টন চার্চিলের সেই সিদ্ধান্ত, যেখানে তিনি নৌবাহিনীতে কয়লার পরিবর্তে তেলকে জ্বালানি শক্তির জন্যে ব্যবহার করা স্থির করেন।
ব্রিটেনের ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত ছিল বেশ কঠিন, চ্যালেঞ্জিং — কারণ, ইউনাইটেড কিংডমের সীমানার মধ্যে তখন প্রচুর খনিজ কয়লা মজুদ থাকলেও, সেই সময় দেশের নিজস্ব কোনো তেলের উৎপাদন বা যোগান ছিল না। চার্চিলের চেয়ে বেশি তীব্রভাবে এই বিষয়টি আর কেউ অনুভব করেননি, তিনি নিজেই এই আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তটিকে ‘...সমস্যার সাগরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার’ (Akin to “Arms against a sea of trouble”) সমতুল্য বলে বর্ণনা করেছিলেন। এইভাবে, সামরিক কার্যকলাপের প্রধান এনার্জি সোর্স হিসেবে তেল কয়লাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই ঘরোয়া আলো এবং তাপের ক্ষেত্রে তেল ততদিনে বহুল ব্যবহৃত; তবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার গুরুত্ব তখনও বজায় রয়েছে।
শক্তির উৎস হিসেবে, যেমনভাবে বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত ব্রিটেন থেকে, তেমনি তেলের উপর বিশ্বের বর্তমান নির্ভরতার সূত্রপাত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রাথমিকভাবে খনিজ তেল 'রক' বা 'সেনেকা' অয়েল নামে পরিচিত ছিল, যা উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকায় ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল বেশ কিছুকাল ধরে। ১৮৫৪ সালে, জর্জ বিসেল, বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন সিলিম্যান জুনিয়রকে নিযুক্ত করেন রক অয়েলকে প্রচলিত তিমির তেল বা উদ্ভিজ্জ চর্বির একটি বিকল্প এবং আর্থিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা সে বিষয়ে গবেষণা করতে। এরপর ১৮৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে যা ঘটে, তাকে প্রায় গোল্ড রাশ বা স্বর্ণ সন্ধানের উন্মাদনার সাথে তুলনা করা হয়, এবং এর পরে আসে বিশ্বে নানা শক্তির উত্থান-পতনের একটি পর্যায়।
উনিশ শতকের শেষের দিকে আমেরিকায় রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি, তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে, নতুন এক আলোক জ্বালানির বাণিজ্যকে সুদৃঢ় করছিল, আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই। এই জ্বালানি এমন এক ধরনের আলো তৈরি করত, যা দিনের আলোর মত স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও উজ্জ্বল ছিল; এই আলোকে দিনের আলোর সমতুল্য বলে মনে করা হতো। আর তাই প্রাকৃতিক খনিজ তেলকে 'যুগের আলো' হিসেবে উল্লেখ করা হতো।
দেশে সস্তা ও প্রচুর পরিমাণে তেলের সরবরাহ এবং দ্রুত বিকশিত প্রযুক্তির কারণে, বিংশ শতকের অগ্রগতির সাথে সাথে আমেরিকা বাণিজ্যিক এবং দৈনন্দিন ব্যবহার, উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে শক্তির উৎস হিসেবে তেলের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এবং এই সময়ে আলোর ব্যবহারে তেলের প্রাধান্য ক্রমশ কমতে থাকে, কারণ অন্যান্য শিল্পগুলো জ্বালানি তেলের ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহারের সুবিধা নিতে শুরু করে। অটোমোবাইল শিল্পের দ্রুত বিকাশ, যা ১৯২০-র দশক থেকে ১৯৬০-র দশক পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতার কারণে সহজতর হয়েছিল। স্থল এবং সমুদ্র পরিবহনে তেলই প্রধান জ্বালানি হয়ে ওঠে, এবং আকাশপথে পরিবহনের জন্য বিশ্বে এটিই ছিল একমাত্র জ্বালানি।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, মাঝেমধ্যে রাশিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে ওঠা সত্ত্বেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র বিশ্বে তেল উৎপাদনে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ১৯২৫ সালে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসত মার্কিন তেলক্ষেত্রগুলো থেকে, এবং যদিও এই অপ্রতিরোধ্য আধিপত্যের অবসান ঘটতে শুরু করেছিল, তবু ১৯৫০ সালেও তারা বিশ্বের মোট তেলের ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করেছিল। এছাড়া ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তেল শিল্পে আধিপত্য বিস্তারকারী সাতটি তেল কোম্পানি অথবা 'সেভেন সিস্টার্স'—এর মধ্যে পাঁচটিই ছিল আমেরিকান।
তেলের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল, কারণ যারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত, তারাই সরাসরি ও সহজলভ্যতার ফলে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করার অবস্থানে থাকত। ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাত্ত্বিকভাবে এবং কখনও কখনও বাস্তবেও, যারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত, তারাই তাদের শত্রুদের এই অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার অবস্থানে থাকত। সুতরাং, এই ধারণার পেছনে অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক উভয় যুক্তিই রয়েছে যে, বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে যে মার্কিন আধিপত্য শুরু হয়, তা আসলে বিশ্বের প্রধানতম শক্তি সম্পদের প্রচুর সরবরাহ এবং সহজলভ্যতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
পরবর্তীতে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বড় আকারের তেলক্ষেত্র আবিষ্কার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী উৎপাদকের অবস্থানকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু দিনের শেষে সমস্ত আবিস্কারগুলি ইতিমধ্যেই এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ‘সেভেন সিস্টার্স’ কম্পানিগুলি এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর মূলধন এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের উপরেই নির্ভরশীল ছিল, তাদের দেশের এই সম্পদকে সফলভাবে কাজে লাগানোর জন্য। “সেভেন সিস্টার্স” কম্পানিগুলির প্রত্যেকটি ছিল Vertically Integrated কোম্পানি; অর্থাৎ কূপ থেকে পাম্প পর্যন্ত শক্তি উৎপাদনের সমস্ত পর্যায় এরাই নিয়ন্ত্রণ করত। OPEC (Organization of the Petroleum Exporting Countries) যুগের আগে, এই কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বে মজুদ তেল ভান্ডারের ৮০% অধিকার এবং বিশ্বব্যপী তেলের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত।
মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিস্কারের পরবর্তী পর্যায়ে, শুরুর দিকে, আরব শাসক রাজবংশ এবং তেল কোম্পানিগুলির মধ্যে একাধিক চুক্তি ও জোট স্থাপিত হয়েছিল—যার শর্তগুলো মূলত আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (IOCs) জন্যই বেশি সুবিধাজনক ছিল। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রথমে, ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা হয়, যা মূলত পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন OPEC এর তত্ত্বাবধানে, যার প্রধান ছিল সৌদি আরব, ঘটেছিল।
বিশ্বের ইতিহাসে তেল রাজস্ব বা আইওসি থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির উপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, তথাকথিত “Rentier” রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে। এই দেশগুলি তাদের জনগণের উপর কর আরোপ না করে, বহিরাগত গ্রাহকদের (এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কম্পানি) কাছে দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন তেল বা খনিজ) ভাড়া দিয়ে, জাতীয় আয়ের সম্পূর্ণ বা একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্জন করে।সৌদি আরব বা ইরাকের মতো এই রেন্টিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো এক্সটারনাল ইনকাম, যা প্রায়শই উচ্চ সরকারি ব্যয়, সীমিত জবাবদিহিতা ইত্যাদির ফলে এই দেশগুলিতে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামোর জন্ম দেয়।
বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে তেলকে একটি 'স্ট্র্যাটেজিক' বা কৌশলগত সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে। প্রথম কারণটি হলো, সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য বিকল্প শক্তির উৎসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও তেল সারা বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, এটি কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল একটি সম্পদ। সেহেতু এটি বিশ্বের সমস্ত পণ্য বাজারের মধ্যে সবচেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিনিধিত্ব করে।
একটা সময় পর্যন্ত পশ্চিমের দেশগুলি বা উন্নত দেশগুলি বিশ্বে তেল সম্পদের একাধারে প্রধান কনজিউমার বা ভোক্তা ছিল এবং এর মধ্যে আমেরিকা ছিল প্রধান উৎপাদনকারী দেশ। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং OECD (Organization for Economic Cooperation and Development) দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাসের ফলে, তেল উৎপাদনের কেন্দ্রগুলো কনজিউমারের কেন্দ্র থেকে ভৌগোলিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে তেল ও তৈলজাতীয় পণ্যগুলির ট্রানজিট—অর্থাৎ বাণিজ্যিক পথ, নৌপথ এবং পাইপলাইনের প্রবেশাধিকার ও প্রতিরক্ষা—বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেকটি মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে।
শক্তির উৎস হিসেবে তেল যখন থেকে পশ্চিমী জীবনধারা বা সাধারণভাবে 'আধুনিক' জীবনের একটি ক্রমবর্ধমান মৌলিক অংশ হয়ে উঠতে থাকল, তখনই কৌশলগত সম্পদ হিসেবে এর অবস্থান, বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতি এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেল। মার্কিন উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো অন্যত্র নতুন মজুদ ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ায়, তেল বাণিজ্যের আন্তর্জাতিকীকরণ সম্পূর্ণ হল।
জ্বালানি শক্তি, বা বিশেষভাবে তেল, এবং এর প্রাপ্তি বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির জাতীয় নিরাপত্তার একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল। বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে দেখলে, তেল বাণিজ্যকে একটি “জিরো সাম” গেমের অংশ হিসেবে ধরা এবং এর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি রাষ্ট্রশক্তির হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, এরকম একটি বিশ্বাসকে আধার করে, দেশের সরকারগুলি এই কৌশলগত সম্পদের বাণিজ্যে প্রবেশাধিকারকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা, তাদের সরকারী কর্তব্য ও নীতি বলে মনে করতে থাকে। এমনকি তার জন্য যদি সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হয় তাও এই ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলি তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার হিসেবে ব্যবহারে পিছপা হয়না। স্পষ্টতই, এই কৌশল সুসজ্জিত উন্নত দেশগুলোর জন্য বেশি কার্যকর ছিল।
সুতরাং, তেল শিল্প এবং উদ্বৃত্ত সম্পদের ক্ষমতার জাতীয় নীতি রক্ষার পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক তেল কম্পানিগুলি নিজ নিজ দেশের সরকারি সমর্থনও পেয়ে এসেছে সরাসরি, বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, যখন উৎপাদক দেশগুলি আগের মত আর কম্পানির দেওয়া শর্তে তেল দিতে আর চাইছিল না।
বিদেশে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রতি সক্রিয় রাজনৈতিক বিরোধিতার এই পদ্ধতিকে, সম্ভবত কিছুটা বিদ্রূপাত্মকভাবে, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতি জনসমর্থন বলা হয়। এর একটি চরম উদাহরণ হলো ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা। মোসাদেগের প্রশাসন ১৯৫১ সালের বসন্তে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (AIOC)-কে জাতীয়করণ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের তেল বর্জন করে।
তবে, মোসাদ্দেগ ইরানে অভ্যন্তরে জনপ্রিয় ছিলেন এবং তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দ্বারা সংগঠিত, অর্থায়িত ও পরিচালিত একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। অনুরূপ এক প্রচেষ্টায়, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ১৯৫৬ সালে মিশরের জাতীয়করণ পরিকল্পনা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ‘সুয়েজ ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত।এরকমও আরো অনেক দেশে আমেরিকা ও পশ্চিমের দেশগুলির একইরকম হস্তক্ষেপ দেখা যায়, উৎপাদক কেন্দ্রগুলিতে আন্তর্জাতিক অয়েল কম্পানিগুলির মাধ্যমে তেল সম্পদে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যে। ২০২৫ শে ভেনিজুয়েলাতে আমেরিকার কর্মকাণ্ডও সাম্প্রতিককালের এইরকমই একটি উদাহরণ হিসেবে ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর 'নতুন আন্তর্জাতিক জ্বালানি শক্তি ব্যবস্থায়', যেখানে রাষ্ট্রগুলি জ্বালানি শক্তি উদ্বৃত্ত (এনার্জি সারপ্লাস) এবং জ্বালানি শক্তি ঘাটতি (এনার্জি ডেফিসিট), এই দুই ভাগে বিভক্ত, সেখানে এনার্জি সংক্রান্ত বিতর্কগুলো আবারও সম্পদের অধিকার এবং এর সাথে সম্পর্কিত ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলিকে সামনে এনে দিচ্ছে। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে ভোগ ও উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যে ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তা গত দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দূরত্ব বর্তমান ট্রানজিট রুটগুলোর ওপর, এছাড়া রপ্তানিকারক দেশ, ট্রানজিট রাষ্ট্র ও চূড়ান্ত বাজারের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অনেক জ্বালানি রপ্তানিকারক রাষ্ট্রই “Transit avoidance” বা ট্রানজিট কে এড়িয়ে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে তাদের তেল বাণিজ্যের নীতি নির্ধারণ করতে চাইছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্য ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা এড়ানোর রাশিয়ার আকাঙ্ক্ষা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘর্ষের সুত্রপাতের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।
ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল এখনো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য, এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান জ্বালানি পণ্য। যদিও এই বাণিজ্যে গত শতাব্দী থেকে ক্রমাগত জিওপলিটিক্যাল শিফট দেখা গেছে, উৎপাদন ও ভোগের কেন্দ্রগুলো ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং চাহিদার পরিবর্তনও সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান দেখায় যে বিশ্বের মজুদ তেল ভাণ্ডারের(কানাডার স্যান্ড অয়েল বাদ দিলে ৪.৭%) এবং গ্যাসের (১০.৩%, যার প্রায় অর্ধেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে)খুব সামান্য অংশই এখন OECD দেশগুলোর মধ্যে অবস্থিত, অন্যদিকে চাহিদা মূলত OECD দেশগুলি, চীন এবং ভারতেই কেন্দ্রীভূত। সরবরাহ ও চাহিদার এই পরিবর্তনশীল ধারা, অন্যান্য ফলাফলের পাশাপাশি, বিদ্যমান পরিবহন নেটওয়ার্কের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, কারণ ক্রমবর্ধমান হারে তেল ও গ্যাস আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিকভাবে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়ছে।
তেল, গ্যাস এবং কয়লার মজুদের ভৌগোলিক বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা জাতি-রাষ্ট্রে বিভক্ত এক বিশ্বে বাস করি, এবং রাশিয়া ও চীনের মতো বিভিন্ন NON- OECD দেশগুলি, জ্বালানি ক্ষেত্রে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর জোর দিয়ে আসছে। সার্বভৌমত্বের অধিকার, দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব এনার্জি সোর্স এবং প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে তা বেছে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধতা দেয়, বিশেষ করে যেহেতু তাদের পছন্দগুলো তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক চাহিদা ও লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে। চীন ও রাশিয়ার মতো যারা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের জন্য একটি অধিকতর কেন্দ্রীয় ভূমিকার পক্ষে ছিল, তাদের অনেকেরই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার রয়েছে। আদর্শগতভাবে বলতে গেলে, এরা অনেকেই বিশ্বাস করে যে দেশের সম্পদ রক্ষা ও বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে নিরাপদ এবং সর্বোত্তম উপায়।
এই দেশগুলির উত্থানের ফলে, তেল ও গ্যাসের বাজারে NOC (National Oil Companies) বা জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোর আধিপত্য শুরু হয়। এই কম্পানিরা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং কখনও কখনও রাষ্ট্র দ্বারাই পরিচালিত হয়। এরা প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও পাইপলাইনসহ আরও বিভিন্ন ধরনের সম্পদের অধিকারী, রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অধীন কম্পানির পরিচালন ব্যবস্থা হওয়ার সুবাদে। পুরনো আমলের 'সেভেন সিস্টার্স'-এর বদলে এখন যে সব কম্পানির আধিপত্য তেলের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী তার বেশীরভাগই NOC। সৌদি আরামকো (সৌদি আরব), জেএসসি গ্যাজপ্রম (রাশিয়া), সিএনপিসি (চীন), এনআইওসি (ইরান), পিডিভিএসএ (ভেনেজুয়েলা), পেট্রোব্রাস (ব্রাজিল) এবং পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া), হল কিছু উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক স্তরের জাতীয় তেল কম্পানি, এবং বিশ্বের তেল ও গ্যাসের মজুদ ভান্ডারের প্রায় ৮০% এই জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোর (NOC) মালিকানাধীন। এর বাইরে বাদবাকি মজুদ ভান্ডার আছে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) দখলে। এক্সনমোবিল, বিপি, এবং রয়্যালডাচ শেল ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণরূপে বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন এবং তারা বিশ্ববাজারে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করে, মুনাফা করে। তারা যে দেশে উৎপাদন করে সেখানকার সরকারের নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য হলেও তাদের নীতি ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে উৎপাদক দেশগুলির কোনো দখল নেই।
আজকের প্রধান রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো (NOC) এবং বেশ কিছু বৃহৎ স্বাধীন কোম্পানি (যেমন ভারতের বেসরকারী রিলায়েন্স এবং সরকারী ওএনজিসি) গুলি সাধারণভাবে মেজর ডাইভারসিফায়েড বা বহুমুখী কোম্পানি, যাদের তেল অনুসন্ধান, উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহন এবং বিপণনের মতো ভারটিকালি ইন্টিগ্রেটেড কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৬ শে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো, পেট্রোচায়না এবং সিনোপেক বিশ্বের শীর্ষ তিনটি সর্বোচ্চ রাজস্ব অর্জনকারী তেল ও গ্যাস কোম্পানি।তেল শুধু পণ্য হিসেবেই দামী বা আন্তর্জাতিক স্তরের নয়, এর বাণিজ্য যেসব সংস্থার অধীন, সেগুলিও বিশ্বের অন্যতম দামী ও বিপুল মুনাফাকারী কম্পানি।
| Choke Point | Share of India’s Crude | Share of LNG/LPG | Primary Source Region |
|---|---|---|---|
| Strait of Hormuz | 30% | 60% / 90 % | UAE, Saudi, Qatar |
| Suez Canal / Red Sea Route (Bab-el-Mandeb) | 5-10% | LowRussia (West), North Africa | |
| Strait of Malacca | 15-20% | LowRussia (East) | |
| Cape of Good Hope | 30-40% (currently) | 10-15% | USA, West Africa, and now Russian oil is being diverted |