এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  অর্থনীতি

  • অপরিশোধিত তেলের ভূ-রাজনীতি এবং ভারতীয় তেল বাণিজ্যের উপর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ সংকটের প্রভাব

    শ্রাবণী রায়
    আলোচনা | অর্থনীতি | ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • অলংকরণ: রমিত


    বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের মত প্রাথমিক শক্তি সম্পদ অসমভাবে বণ্টিত এবং বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। যেসব দেশ এই শক্তি সম্পদে সমৃদ্ধ নয়, তারা প্রায়শই আমদানির উপর নির্ভরশীল এবং সেই কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকির ব্যাপারে এদের সংবেদনশীল থাকতে হয়।

    বিগত শতাব্দী এবং গত কয়েক দশকে তৈলসম্পদ ও জিডিপির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে কিভাবে তেলের মালিকানা ও ব্যবহার একটি দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাকে চালিত করেছে এবং অতীতে কীভাবে নতুন উৎসের বিকাশ, দেশের উন্নতির এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।

    প্রথম ও দ্বিতীয় এই দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জ্বালানি শক্তির উৎস হিসেবে তেল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি প্রধান বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, অনেক ক্ষেত্রে কয়লার বিকল্প হিসেবে। উনিশ শতকের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে তেল আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহারও শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, শক্তি সম্পদ হিসেবে জ্বালানী তেলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন ছিল ব্রিটেনে উইনস্টন চার্চিলের সেই সিদ্ধান্ত, যেখানে তিনি নৌবাহিনীতে কয়লার পরিবর্তে তেলকে জ্বালানি শক্তির জন্যে ব্যবহার করা স্থির করেন।

    ব্রিটেনের ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত ছিল বেশ কঠিন, চ্যালেঞ্জিং — কারণ, ইউনাইটেড কিংডমের সীমানার মধ্যে তখন প্রচুর খনিজ কয়লা মজুদ থাকলেও, সেই সময় দেশের নিজস্ব কোনো তেলের উৎপাদন বা যোগান ছিল না। চার্চিলের চেয়ে বেশি তীব্রভাবে এই বিষয়টি আর কেউ অনুভব করেননি, তিনি নিজেই এই আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তটিকে ‘...সমস্যার সাগরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার’ (Akin to “Arms against a sea of trouble”) সমতুল্য বলে বর্ণনা করেছিলেন। এইভাবে, সামরিক কার্যকলাপের প্রধান এনার্জি সোর্স হিসেবে তেল কয়লাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই ঘরোয়া আলো এবং তাপের ক্ষেত্রে তেল ততদিনে বহুল ব্যবহৃত; তবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার গুরুত্ব তখনও বজায় রয়েছে।

    শক্তির উৎস হিসেবে, যেমনভাবে বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত ব্রিটেন থেকে, তেমনি তেলের উপর বিশ্বের বর্তমান নির্ভরতার সূত্রপাত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রাথমিকভাবে খনিজ তেল 'রক' বা 'সেনেকা' অয়েল নামে পরিচিত ছিল, যা উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকায় ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল বেশ কিছুকাল ধরে। ১৮৫৪ সালে, জর্জ বিসেল, বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন সিলিম্যান জুনিয়রকে নিযুক্ত করেন রক অয়েলকে প্রচলিত তিমির তেল বা উদ্ভিজ্জ চর্বির একটি বিকল্প এবং আর্থিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা সে বিষয়ে গবেষণা করতে। এরপর ১৮৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে যা ঘটে, তাকে প্রায় গোল্ড রাশ বা স্বর্ণ সন্ধানের উন্মাদনার সাথে তুলনা করা হয়, এবং এর পরে আসে বিশ্বে নানা শক্তির উত্থান-পতনের একটি পর্যায়।

    উনিশ শতকের শেষের দিকে আমেরিকায় রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি, তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে, নতুন এক আলোক জ্বালানির বাণিজ্যকে সুদৃঢ় করছিল, আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই। এই জ্বালানি এমন এক ধরনের আলো তৈরি করত, যা দিনের আলোর মত স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও উজ্জ্বল ছিল; এই আলোকে দিনের আলোর সমতুল্য বলে মনে করা হতো। আর তাই প্রাকৃতিক খনিজ তেলকে 'যুগের আলো' হিসেবে উল্লেখ করা হতো।

    দেশে সস্তা ও প্রচুর পরিমাণে তেলের সরবরাহ এবং দ্রুত বিকশিত প্রযুক্তির কারণে, বিংশ শতকের অগ্রগতির সাথে সাথে আমেরিকা বাণিজ্যিক এবং দৈনন্দিন ব্যবহার, উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে শক্তির উৎস হিসেবে তেলের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এবং এই সময়ে আলোর ব্যবহারে তেলের প্রাধান্য ক্রমশ কমতে থাকে, কারণ অন্যান্য শিল্পগুলো জ্বালানি তেলের ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহারের সুবিধা নিতে শুরু করে। অটোমোবাইল শিল্পের দ্রুত বিকাশ, যা ১৯২০-র দশক থেকে ১৯৬০-র দশক পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতার কারণে সহজতর হয়েছিল। স্থল এবং সমুদ্র পরিবহনে তেলই প্রধান জ্বালানি হয়ে ওঠে, এবং আকাশপথে পরিবহনের জন্য বিশ্বে এটিই ছিল একমাত্র জ্বালানি।

    বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, মাঝেমধ্যে রাশিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে ওঠা সত্ত্বেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র বিশ্বে তেল উৎপাদনে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ১৯২৫ সালে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসত মার্কিন তেলক্ষেত্রগুলো থেকে, এবং যদিও এই অপ্রতিরোধ্য আধিপত্যের অবসান ঘটতে শুরু করেছিল, তবু ১৯৫০ সালেও তারা বিশ্বের মোট তেলের ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করেছিল। এছাড়া ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তেল শিল্পে আধিপত্য বিস্তারকারী সাতটি তেল কোম্পানি অথবা 'সেভেন সিস্টার্স'—এর মধ্যে পাঁচটিই ছিল আমেরিকান।

    তেলের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল, কারণ যারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত, তারাই সরাসরি ও সহজলভ্যতার ফলে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করার অবস্থানে থাকত। ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাত্ত্বিকভাবে এবং কখনও কখনও বাস্তবেও, যারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত, তারাই তাদের শত্রুদের এই অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার অবস্থানে থাকত। সুতরাং, এই ধারণার পেছনে অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক উভয় যুক্তিই রয়েছে যে, বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে যে মার্কিন আধিপত্য শুরু হয়, তা আসলে বিশ্বের প্রধানতম শক্তি সম্পদের প্রচুর সরবরাহ এবং সহজলভ্যতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

    পরবর্তীতে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বড় আকারের তেলক্ষেত্র আবিষ্কার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী উৎপাদকের অবস্থানকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু দিনের শেষে সমস্ত আবিস্কারগুলি ইতিমধ্যেই এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ‘সেভেন সিস্টার্স’ কম্পানিগুলি এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর মূলধন এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের উপরেই নির্ভরশীল ছিল, তাদের দেশের এই সম্পদকে সফলভাবে কাজে লাগানোর জন্য। “সেভেন সিস্টার্স” কম্পানিগুলির প্রত্যেকটি ছিল Vertically Integrated কোম্পানি; অর্থাৎ কূপ থেকে পাম্প পর্যন্ত শক্তি উৎপাদনের সমস্ত পর্যায় এরাই নিয়ন্ত্রণ করত। OPEC (Organization of the Petroleum Exporting Countries) যুগের আগে, এই কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বে মজুদ তেল ভান্ডারের ৮০% অধিকার এবং বিশ্বব্যপী তেলের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত।

    মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিস্কারের পরবর্তী পর্যায়ে, শুরুর দিকে, আরব শাসক রাজবংশ এবং তেল কোম্পানিগুলির মধ্যে একাধিক চুক্তি ও জোট স্থাপিত হয়েছিল—যার শর্তগুলো মূলত আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (IOCs) জন্যই বেশি সুবিধাজনক ছিল। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রথমে, ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা হয়, যা মূলত পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন OPEC এর তত্ত্বাবধানে, যার প্রধান ছিল সৌদি আরব, ঘটেছিল।

    বিশ্বের ইতিহাসে তেল রাজস্ব বা আইওসি থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির উপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, তথাকথিত “Rentier” রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে। এই দেশগুলি তাদের জনগণের উপর কর আরোপ না করে, বহিরাগত গ্রাহকদের (এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কম্পানি) কাছে দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন তেল বা খনিজ) ভাড়া দিয়ে, জাতীয় আয়ের সম্পূর্ণ বা একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্জন করে।সৌদি আরব বা ইরাকের মতো এই রেন্টিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো এক্সটারনাল ইনকাম, যা প্রায়শই উচ্চ সরকারি ব্যয়, সীমিত জবাবদিহিতা ইত্যাদির ফলে এই দেশগুলিতে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামোর জন্ম দেয়।

    বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে তেলকে একটি 'স্ট্র্যাটেজিক' বা কৌশলগত সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে। প্রথম কারণটি হলো, সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য বিকল্প শক্তির উৎসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও তেল সারা বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, এটি কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল একটি সম্পদ। সেহেতু এটি বিশ্বের সমস্ত পণ্য বাজারের মধ্যে সবচেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিনিধিত্ব করে।

    একটা সময় পর্যন্ত পশ্চিমের দেশগুলি বা উন্নত দেশগুলি বিশ্বে তেল সম্পদের একাধারে প্রধান কনজিউমার বা ভোক্তা ছিল এবং এর মধ্যে আমেরিকা ছিল প্রধান উৎপাদনকারী দেশ। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং OECD (Organization for Economic Cooperation and Development) দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাসের ফলে, তেল উৎপাদনের কেন্দ্রগুলো কনজিউমারের কেন্দ্র থেকে ভৌগোলিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে তেল ও তৈলজাতীয় পণ্যগুলির ট্রানজিট—অর্থাৎ বাণিজ্যিক পথ, নৌপথ এবং পাইপলাইনের প্রবেশাধিকার ও প্রতিরক্ষা—বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেকটি মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে।

    শক্তির উৎস হিসেবে তেল যখন থেকে পশ্চিমী জীবনধারা বা সাধারণভাবে 'আধুনিক' জীবনের একটি ক্রমবর্ধমান মৌলিক অংশ হয়ে উঠতে থাকল, তখনই কৌশলগত সম্পদ হিসেবে এর অবস্থান, বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতি এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেল। মার্কিন উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো অন্যত্র নতুন মজুদ ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ায়, তেল বাণিজ্যের আন্তর্জাতিকীকরণ সম্পূর্ণ হল।

    জ্বালানি শক্তি, বা বিশেষভাবে তেল, এবং এর প্রাপ্তি বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির জাতীয় নিরাপত্তার একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল। বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে দেখলে, তেল বাণিজ্যকে একটি “জিরো সাম” গেমের অংশ হিসেবে ধরা এবং এর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি রাষ্ট্রশক্তির হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, এরকম একটি বিশ্বাসকে আধার করে, দেশের সরকারগুলি এই কৌশলগত সম্পদের বাণিজ্যে প্রবেশাধিকারকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা, তাদের সরকারী কর্তব্য ও নীতি বলে মনে করতে থাকে। এমনকি তার জন্য যদি সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হয় তাও এই ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলি তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার হিসেবে ব্যবহারে পিছপা হয়না। স্পষ্টতই, এই কৌশল সুসজ্জিত উন্নত দেশগুলোর জন্য বেশি কার্যকর ছিল।

    সুতরাং, তেল শিল্প এবং উদ্বৃত্ত সম্পদের ক্ষমতার জাতীয় নীতি রক্ষার পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক তেল কম্পানিগুলি নিজ নিজ দেশের সরকারি সমর্থনও পেয়ে এসেছে সরাসরি, বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, যখন উৎপাদক দেশগুলি আগের মত আর কম্পানির দেওয়া শর্তে তেল দিতে আর চাইছিল না।

    বিদেশে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রতি সক্রিয় রাজনৈতিক বিরোধিতার এই পদ্ধতিকে, সম্ভবত কিছুটা বিদ্রূপাত্মকভাবে, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতি জনসমর্থন বলা হয়। এর একটি চরম উদাহরণ হলো ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা। মোসাদেগের প্রশাসন ১৯৫১ সালের বসন্তে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (AIOC)-কে জাতীয়করণ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের তেল বর্জন করে।

    তবে, মোসাদ্দেগ ইরানে অভ্যন্তরে জনপ্রিয় ছিলেন এবং তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দ্বারা সংগঠিত, অর্থায়িত ও পরিচালিত একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। অনুরূপ এক প্রচেষ্টায়, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ১৯৫৬ সালে মিশরের জাতীয়করণ পরিকল্পনা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ‘সুয়েজ ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত।এরকমও আরো অনেক দেশে আমেরিকা ও পশ্চিমের দেশগুলির একইরকম হস্তক্ষেপ দেখা যায়, উৎপাদক কেন্দ্রগুলিতে আন্তর্জাতিক অয়েল কম্পানিগুলির মাধ্যমে তেল সম্পদে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যে। ২০২৫ শে ভেনিজুয়েলাতে আমেরিকার কর্মকাণ্ডও সাম্প্রতিককালের এইরকমই একটি উদাহরণ হিসেবে ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে।

    একবিংশ শতাব্দীর 'নতুন আন্তর্জাতিক জ্বালানি শক্তি ব্যবস্থায়', যেখানে রাষ্ট্রগুলি জ্বালানি শক্তি উদ্বৃত্ত (এনার্জি সারপ্লাস) এবং জ্বালানি শক্তি ঘাটতি (এনার্জি ডেফিসিট), এই দুই ভাগে বিভক্ত, সেখানে এনার্জি সংক্রান্ত বিতর্কগুলো আবারও সম্পদের অধিকার এবং এর সাথে সম্পর্কিত ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলিকে সামনে এনে দিচ্ছে। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে ভোগ ও উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যে ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তা গত দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দূরত্ব বর্তমান ট্রানজিট রুটগুলোর ওপর, এছাড়া রপ্তানিকারক দেশ, ট্রানজিট রাষ্ট্র ও চূড়ান্ত বাজারের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অনেক জ্বালানি রপ্তানিকারক রাষ্ট্রই “Transit avoidance” বা ট্রানজিট কে এড়িয়ে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে তাদের তেল বাণিজ্যের নীতি নির্ধারণ করতে চাইছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্য ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা এড়ানোর রাশিয়ার আকাঙ্ক্ষা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘর্ষের সুত্রপাতের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

    ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল এখনো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য, এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান জ্বালানি পণ্য। যদিও এই বাণিজ্যে গত শতাব্দী থেকে ক্রমাগত জিওপলিটিক্যাল শিফট দেখা গেছে, উৎপাদন ও ভোগের কেন্দ্রগুলো ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং চাহিদার পরিবর্তনও সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান দেখায় যে বিশ্বের মজুদ তেল ভাণ্ডারের(কানাডার স্যান্ড অয়েল বাদ দিলে ৪.৭%) এবং গ্যাসের (১০.৩%, যার প্রায় অর্ধেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে)খুব সামান্য অংশই এখন OECD দেশগুলোর মধ্যে অবস্থিত, অন্যদিকে চাহিদা মূলত OECD দেশগুলি, চীন এবং ভারতেই কেন্দ্রীভূত। সরবরাহ ও চাহিদার এই পরিবর্তনশীল ধারা, অন্যান্য ফলাফলের পাশাপাশি, বিদ্যমান পরিবহন নেটওয়ার্কের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, কারণ ক্রমবর্ধমান হারে তেল ও গ্যাস আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিকভাবে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়ছে।

    তেল, গ্যাস এবং কয়লার মজুদের ভৌগোলিক বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা জাতি-রাষ্ট্রে বিভক্ত এক বিশ্বে বাস করি, এবং রাশিয়া ও চীনের মতো বিভিন্ন NON- OECD দেশগুলি, জ্বালানি ক্ষেত্রে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর জোর দিয়ে আসছে। সার্বভৌমত্বের অধিকার, দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব এনার্জি সোর্স এবং প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে তা বেছে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধতা দেয়, বিশেষ করে যেহেতু তাদের পছন্দগুলো তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক চাহিদা ও লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে। চীন ও রাশিয়ার মতো যারা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের জন্য একটি অধিকতর কেন্দ্রীয় ভূমিকার পক্ষে ছিল, তাদের অনেকেরই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার রয়েছে। আদর্শগতভাবে বলতে গেলে, এরা অনেকেই বিশ্বাস করে যে দেশের সম্পদ রক্ষা ও বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে নিরাপদ এবং সর্বোত্তম উপায়।

    এই দেশগুলির উত্থানের ফলে, তেল ও গ্যাসের বাজারে NOC (National Oil Companies) বা জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোর আধিপত্য শুরু হয়। এই কম্পানিরা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং কখনও কখনও রাষ্ট্র দ্বারাই পরিচালিত হয়। এরা প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও পাইপলাইনসহ আরও বিভিন্ন ধরনের সম্পদের অধিকারী, রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অধীন কম্পানির পরিচালন ব্যবস্থা হওয়ার সুবাদে। পুরনো আমলের 'সেভেন সিস্টার্স'-এর বদলে এখন যে সব কম্পানির আধিপত্য তেলের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী তার বেশীরভাগই NOC। সৌদি আরামকো (সৌদি আরব), জেএসসি গ্যাজপ্রম (রাশিয়া), সিএনপিসি (চীন), এনআইওসি (ইরান), পিডিভিএসএ (ভেনেজুয়েলা), পেট্রোব্রাস (ব্রাজিল) এবং পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া), হল কিছু উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক স্তরের জাতীয় তেল কম্পানি, এবং বিশ্বের তেল ও গ্যাসের মজুদ ভান্ডারের প্রায় ৮০% এই জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোর (NOC) মালিকানাধীন। এর বাইরে বাদবাকি মজুদ ভান্ডার আছে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) দখলে। এক্সনমোবিল, বিপি, এবং রয়্যালডাচ শেল ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণরূপে বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন এবং তারা বিশ্ববাজারে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করে, মুনাফা করে। তারা যে দেশে উৎপাদন করে সেখানকার সরকারের নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য হলেও তাদের নীতি ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে উৎপাদক দেশগুলির কোনো দখল নেই।

    আজকের প্রধান রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো (NOC) এবং বেশ কিছু বৃহৎ স্বাধীন কোম্পানি (যেমন ভারতের বেসরকারী রিলায়েন্স এবং সরকারী ওএনজিসি) গুলি সাধারণভাবে মেজর ডাইভারসিফায়েড বা বহুমুখী কোম্পানি, যাদের তেল অনুসন্ধান, উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহন এবং বিপণনের মতো ভারটিকালি ইন্টিগ্রেটেড কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৬ শে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো, পেট্রোচায়না এবং সিনোপেক বিশ্বের শীর্ষ তিনটি সর্বোচ্চ রাজস্ব অর্জনকারী তেল ও গ্যাস কোম্পানি।তেল শুধু পণ্য হিসেবেই দামী বা আন্তর্জাতিক স্তরের নয়, এর বাণিজ্য যেসব সংস্থার অধীন, সেগুলিও বিশ্বের অন্যতম দামী ও বিপুল মুনাফাকারী কম্পানি।

    ভারতের জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও চাহিদা সম্পর্কিত কিছু তথ্য


    আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) একটি রিপোর্ট অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার বৃহত্তম উৎস হয়ে উঠবে। অথচ ভারতে তেল উৎপাদনের চিত্র বেশ হতাশাজনক। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খুবই কম, এবং এখনো পর্যন্ত মজুদ তৈলসম্পদের পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মজুদের মাত্র ০.৩% এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ বিশ্বের মাত্র ০.৭%। এছাড়া ২০১৮ সাল থেকে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৪% হারে হ্রাস পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম।

    চীনের পর ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক এবং ষষ্ঠ বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম পণ্যের রপ্তানিকারক।

    ২০২৪-২৫ সালে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ছিল ২৮.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ সালে এটি প্রায় ২৮.৪-২৯.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উৎপাদনের সিংহভাগ আসে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ওএনজিসি এবং গেইল-এর থেকে।

    ২০২৪-২৫ সালে মোট অপরিশোধিত তেল আমদানি ছিল ২৪৩.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং এই সময়ে রিফাইনড অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ২৬৭.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। যদিও চলতি বছরের চূড়ান্ত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি, তবে এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালে মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ ২২৫.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এই প্রবণতা থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে ভারতের আমদানি নির্ভরতা বছর প্রতি ৮৮-৮৯ % এর মত। প্রধান তেলক্ষেত্রগুলির ক্ষমতা হ্রাস এবং নতুন কোনো অনুসন্ধান না হওয়ায়, ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

    এছাড়া ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল শোধনাগার (রিফাইনারী) দেশ, যার শোধনাগার ক্ষমতা ২৫৬.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত) এবং গত বছরের হিসেব অনুযায়ী ভারত শোধন ক্ষমতার ১০৪% ব্যবহার রয়েছে।পশ্চিম এশিয়ায় পেট্রোলিয়াম পণ্যের রপ্তানিতে ভারতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতের পরিকল্পনাতে বেশ কিছু রিফাইনারি প্রকল্প রয়েছে, যার কারণে নিজেদের আভ্যন্তরীন ব্যবহার ছাড়া পরিশোধিত তৈলজাতীয় পণ্য রপ্তানীর জন্যেও ক্রুড অয়েলের চাহিদা বাড়বে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-র এই রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে তেলের চাহিদা এতটাই বাড়বে যে, ভারত বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ ভোক্তা হিসেবে চীনকে ছাড়িয়ে যাবে।মূলত জিডিপি গ্রোথ বা অর্থনীতির উন্নয়নের হারের ওপর ভিত্তি করে এই হিসেব করা হয়েছে।

    ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার হয়েছে ২৩৯.১৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় ২.১% বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট ব্যবহার ছিল ৭১.৩১ বিলিয়ন কিউবিকমিটার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ব্যবহারের (৬৭.৫১ বিলিয়ন কিউবিকমিটার) চেয়ে ৫.৬৩% বেশি। ২০২৪-২৫ সময়কালে আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৪৯.৫২% দেশীয় উৎস থেকে এবং ৫০.৪৮% আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিল।

    যদি অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য বিবেচনা করা হয়, তাহলে ২০২৫-২৬ সালে মোট রপ্তানির পরিমাণ ২৭০.৯৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং আমাদের শোধনাগারগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি ৫৬.৯৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ সালে আমদানি ছিল ২৯৪.১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং মোট রপ্তানি ছিল ৬৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

    ২০২৫-২৬ সালে এলপিজি-র ব্যবহার ছিল ৩৩.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ সালে ৩১.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন)। এর মধ্যে ২০.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ সালে ২০.৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন) এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল এবং ৫২২ মিলিয়ন মেট্রিক টন রপ্তানি করা হয়েছিল। সুতরাং, এলপিজি-র ক্ষেত্রে আমদানী নির্ভরশীলতা প্রায় ৬০-৬১%।

    উপরের তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে এই দেশ তেল ও তৈলজাতীয় পদার্থ এবং গ্যাস (LPG/LNG) আমদানি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের উপর কতটা নির্ভরশীল।

    পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা কমাতে ভারত তার আমদানির তালিকায় বৈচিত্র্য এনেছে। সরবরাহকারী নেটওয়ার্ককে ৪০টি দেশে প্রসারিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া, ঘানার মতো নতুন অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারীদের যুক্ত করা হয়েছে। দেশের এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে, ভারতীয় কোম্পানি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থাগুলো বিদেশী কোম্পানির সাথে দীর্ঘমেয়াদী তেল চুক্তি করছে এবং ওএনজিসি-বিদেশ এর মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান সম্পদও অধিগ্রহণ করছে।

    ২০২৫-২৬ সালে (মার্চ ২০২৬ অবধি)পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি এবং রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশী অপরিশোধিত তেল ভারতে এসেছে। সাধারণ ভাবে আমদানির ৭৬ শতাংশ উচ্চ সালফারযুক্ত (সাওয়ার) অপরিশোধিত তেল সৌদি আরব, ইরাক এবং রাশিয়া থেকে এসে থাকে। ২৪ শতাংশ নিম্ন সালফারযুক্ত (সুইট) অপরিশোধিত তেল আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া এবং দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে।

    তেলের বাণিজ্যে ভারত দেশ সুয়েজের পূর্বের পণ্য রপ্তানিকারকদের মধ্যে অন্যতম, যা এই অঞ্চলের মধ্যে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং আটলান্টিক অববাহিকায় রপ্তানি বাড়াতে সহায়তা করে। ২০২৩ সালে, আমরা মিডল ডিস্টিলেটস (গ্যাসঅয়েল, ডিজেল এবং কেরোসিন) রপ্তানিতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং সামগ্রিক পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ বৃহত্তম ছিলাম। ফলস্বরূপ, রাশিয়ার তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞার পর পেট্রোলিয়াম পণ্যের ইউরোপীয় চাহিদা মেটাতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

    ভারতের বেশিরভাগ সরকারি মালিকানাধীন পাবলিক সেক্টর কোম্পানিগুলির মধ্যপ্রাচ্যের সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে এবং তারা তেলের জন্য এই দেশগুলির উপর নির্ভর করে। রিলায়েন্স বা নায়ারার মতো বেসরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো যারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মধ্যে থাকেনা, রাশিয়া থেকে অনেক কম দামে তেল কিনে লাভ করেছে স্যাংশন চলাকালীন এবং সম্প্রতি যুদ্ধকালীন আমেরিকার ওয়েভারের সুযোগে।

    ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ

    মার্চ’২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের (Strategic Petroleum Reserve) মোট পরিচালন ক্ষমতা ৫.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। পূর্ণ ক্ষমতায় এটি ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৯.৫ দিন মেটাতে পারে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি) ভারতের মতো মোট আমদানিকারক (Net Importer) দেশগুলোর জন্য ৯০ দিনের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের সুপারিশ করে। ভারত বর্তমানে আইইএ-এর সহযোগী সদস্য। কিন্তু চীন সদস্য না হওয়া সত্বেও, Net Importer দেশ হিসেবে, IEA-এর নির্দেশিকা মেনে, ৯০ দিনের রিজার্ভ বজায় রাখে।

    ভারতের সামুদ্রিক তেল বাণিজ্য পথ


    বিশ্বের প্রধান তেল পথগুলো বিশ্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি পেট্রোলিয়ামের সামুদ্রিক পরিবহনে সহায়তা করে, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাপ্রবণ, কৌশলগত, ও সংকীর্ণ জলপথের উপর নির্ভরশীল। প্রধান পথগুলোর মধ্যে রয়েছে, হরমুজ প্রণালী ( প্রতিদিন ২০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল), মালাক্কা প্রণালী (প্রায় ২৯ শতাংশ পরিবহন), এবং সুয়েজ খাল/সুমেড পাইপলাইন (প্রতিদিন প্রায় ৪.৯ মিলিয়ন ব্যারেল), যা পারস্য উপসাগরের উৎপাদকদের এশীয় ও ইউরোপীয় বাজারের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ভারত জ্বালানি আমদানির জন্য সামুদ্রিক পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে সমুদ্র পথে অপরিশোধিত তেল এবং এলপিজি/এলএনজি সংগ্রহ করে।

    ভারতের জ্বালানি বাণিজ্য পথগুলোকে সেগুলোর অতিক্রমকারী নির্দিষ্ট 'সংকীর্ণ পথ' (চোকপয়েন্ট) অনুসারে শ্রেণিবদ্ধ করতে গেলে নিম্নলিখিত ক্রম অনুযায়ী করা যায়। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে, ভারত হরমুজ প্রণালীর মতো অস্থিতিশীল করিডোরগুলোর উপর নির্ভরতা কমাতে অন্য সম্ভাব্য পথের সন্ধান করার প্রয়োজন আছে।

    ১. পারস্য উপসাগরীয় পথ (হরমুজ প্রণালী) - ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি ভারতকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সৌদি আরব, কাতার এবং ইরাকের সাথে সংযুক্ত করে। আনুমানিক ৩০% অপরিশোধিত তেল, ৬০% এলএনজি এবং ৯০% এলপিজি এই পথ দিয়ে ভারতে আসে।তেলের জাহাজগুলি রাস তানুরা (সৌদি) বা মেসাইদ (কাতার)-এর মতো বন্দর থেকে আরব সাগর পেরিয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলে (জামনগর, মুন্দ্রা, দাহেজ) পৌঁছায়।

    সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা সত্ত্বেও, ভারত ইরানের সাথে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তার ট্যাঙ্কারগুলির জন্য 'নিরাপদ পথ' নিশ্চিত করেছে।

    ২. লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল পথ (বাব এল-মান্দেব) পশ্চিম আফ্রিকা, ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পাশাপাশি পশ্চিমে পরিশোধিত পণ্য পরিবহনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।এই পথটি পশ্চিম রাশিয়া (বাল্টিক ও কৃষ্ণ সাগর বন্দর) এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে তেল পরিবহনের প্রধান করিডোর। অপরিশোধিত তেল (ইউরাল গ্রেড) এবং কিছু পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এই পথ দিয়ে ভারতে আসে। ট্যাঙ্কারগুলো ভূমধ্যসাগর থেকে সুয়েজ খাল এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালী হয়ে আরব সাগরে প্রবেশ করে।
    সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে এটিও একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু জাহাজ অনেক দীর্ঘ কেপ অফ গুড হোপ পথ (আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের চারপাশ দিয়ে) হয়ে আনা হচ্ছে, যা যাত্রাপথে ১৫-২০ দিন বেশি সময় নেয় কিন্তু লোহিত সাগরের 'চোকপয়েন্ট' এড়িয়ে যায়।

    ৩. সুদূর প্রাচ্য পথ (মালাক্কা প্রণালী) - পূর্ব রাশিয়া (সোকল/ইএসপিও গ্রেড) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা তেলের জন্য ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দরগুলিতে (যেমন কোজমিনো বা ভ্লাদিভোস্তক) তেল বোঝাই করা হয়, এরপর তা জাপান সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর এবং মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। এই পথ হয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগার যেমন বিশাখাপত্তনম বা পারাদ্বীপে পৌঁছাতে ১২–২৪ দিন সময় লাগে।

    ৪. আটলান্টিক ও উত্তর আমেরিকান পথ - ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার অপরিশোধিত তেল গ্রহণ বৃদ্ধি করায় এই পথের গুরুত্ব বেড়েছে। হালকা এবং ভারী (সুইট/সাওয়ার) অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে আনা হচ্ছে। মার্কিন উপসাগরীয় উপকূল থেকে: প্রধানত কেপ অফ গুড হোপ বা সুয়েজ খাল হয়ে তেলের জাহাজ আসে। কানাডা থেকে: প্রায়শই মার্কিন উপসাগরীয় উপকূল বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল হয়ে পাঠানো হয়।

    গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথগুলোর সারসংক্ষেপ (২০২৬ সালের ঝুঁকি)




    Choke PointShare of India’s CrudeShare of LNG/LPGPrimary Source Region
    Strait of Hormuz30%60% / 90 %UAE, Saudi, Qatar
    Suez Canal / Red Sea Route (Bab-el-Mandeb) 5-10%LowRussia (West), North Africa
    Strait of Malacca15-20%LowRussia (East)
    Cape of Good Hope30-40% (currently)10-15%USA, West Africa, and now Russian oil is being diverted


    *Data is based on various news reports, not authenticated by real sources


    বাণিজ্য পথের ঝুঁকি কম করতে ভারত সম্প্রতি রাশিয়ার সহযোগিতায় আর্কটিক পথটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা নিচ্ছে। যদিও এটি এখনও ভারতের জন্য একটি উচ্চ-পরিমাণের করিডোর নয়, তবে এটি গ্রীষ্মকালে রাশিয়ান তেলের জন্য একটি সম্ভাব্য "সুয়েজ-বাইপাস" হিসেবে কাজ করতে পারে, যা কেপ অফ গুড হোপের তুলনায় পরিবহনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

    হরমুজ প্রণালী - এখন


    হরমুজ প্রণালী একটি সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে এবং সেখান থেকে আরও এগিয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করে। এটি উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মধ্যে অবস্থিত।

    এই জলপথটি এর সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এবং ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজের জন্য নির্ধারিত জাহাজ চলাচলের পথ দিয়ে চলাচল করে।
    বিশ্বব্যাপী, এই প্রণালীটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেলের পরিবহন পথ:
    • প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে।
    • এটি বিশ্বব্যাপী তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ।
    • এলএনজি চালানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে কাতার থেকে রপ্তানি, এই পথ দিয়েই যায়।



    Data source: U.S. Energy Information Administration analysis based on Vortexa tanker tracking


    ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে বর্তমানে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তরের ১০ শতাংশেরও কম। এর ফলে এই অঞ্চলের অপারেটররা বিপুল পরিমাণ উৎপাদন বন্ধ বা হ্রাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

    ২০২৫ সাল নাগাদ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং তেলজাত পণ্য চলাচল করত, যা বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ। হরমুজ প্রণালীকে এড়িয়ে তেল প্রবাহের বিকল্প পথ সীমিত।

    হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় ১ লা মার্চ থেকে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রতিদিন ৩০ কোটি ঘনমিটারের বেশি কমে গেছে। এর ফলে প্রতি সপ্তাহে ২০০ কোটি ঘনমিটারের (বিসিএম) বেশি গ্যাস সরবরাহ কমে যাচ্ছে।

    কাতারের রাস লাফান প্ল্যান্ট, যা বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকরণ কেন্দ্র, ২ রা মার্চ প্রথম হামলার পর থেকে বন্ধ রয়েছে। তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ থাকার কারণে আঞ্চলিক গ্যাস উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তেল উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত গ্যাসের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

    ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ এলপিজি আমদানি এবং ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।

    ঐতিহাসিকভাবে ভারত হরমুজ প্রণালীকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে, কারণ পশ্চিম এশিয়ার নৈকট্যের কারণে এখানে মাল পরিবহনের খরচ সবচেয়ে কম। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নতুন পরিবর্তিত পথের কথা ভাবতে হচ্ছে। পথ পরিবর্তন করলে মাল পরিবহনের খরচ ২০-৩০% বেশি হয়(বিশেষ করে কেপ অফ গুড হোপের মতো দীর্ঘ পথে), ট্রান্সপোর্ট বীমা অনেক বেড়ে যায় বলে।

    তবে ভারতের জন্য হরমুজ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। পরিবর্তিত পথ আর্থিকভাবে সম্ভবপর হবে শুধু তখনই, যখন অপরিশোধিত তেলের সিংহভাগ আসবে রাশিয়া থেকে। যদিও এটি হরমুজের গোলযোগের ঝুঁকি কমায়, কিন্তু একটি স্যাংশনড সোর্সের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে এখন যখন রাশিয়ার তেল কেনা সম্পূর্ণভাবে মার্কিন ছাড়পত্রের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও, ভারতের অধিকাংশ সরকারি সংস্থার মধ্যপ্রাচ্যের সাথে অপরিশোধিত তেলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে। নির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি এবং বিশেষায়িত পরিকাঠামোর কারণে এলএনজি/এলপিজির পথ পরিবর্তন করা খুবই মুশকিল, প্রায় অসম্ভব বলা চলে।

    সব মিলিয়ে ভারতের ভৌগলিক অবস্থান ও তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের মত আন্তর্জাতিক পণ্যসমূহের চাহিদা ও যোগান দেখলে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর সংকট না কাটলে, দেশ যে সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে, তার সেরকম কোনো বাস্তব চটজলদি সমাধান আপাতত নেই বলেই ধরে নিতে হবে, একমাত্র বিদেশনীতি ও কূটনীতির সহায়তায় নিজেদের ট্যাংকার বার করে নিয়ে আসা ছাড়া।


    তথ্যসূত্র -
    ১) ভারতের অয়েল মার্কেট আউটলুক ২০২৩ – আই ই এ
    ২) ২০২৫ অ্যানুয়াল রিপোর্ট, মিনিস্ট্রি অফ পেট্রোলিয়াম, ইন্ডিয়া
    ৩) মেরিটাইম ট্রেড রিভিউ ২০২৫ – ইউ এন
    ৪) The Global Energy Challenge - Caroline Kuzemko; Andreas Goldthau; Michael Keating


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন