
অলংকরণ: রমিত
কিছুদিন আগে নিবিড় সংশোধনের ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাদ যাওয়া এবং এডজুডিকেশনে থাকা নামের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি লেখা লিখেছিলাম। এর পরে এডজুডিকেশনে থাকা নামের থেকে ২৭ লাখ নাম বাদ যায় এবং সেই তালিকাও প্রকাশিত হয়। প্রথম রাউন্ডে নির্বাসন কমিশন সেই সব সব নাম বাদ দেয় যারা ২০০২ সালের নথিতে তাদের বা তাদের বাবা-মা’র নাম দেখাতে পারে নি বা নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্দিষ্ট নথিগুলি দেখাতে পারে নি। এই নিয়ম অন্য রাজ্যের জন্যও প্রযোজ্য। এর পরে নির্বাচন কমিশন লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি সংক্রান্ত আইন আনে যা শুধু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়। সুতরাং আমাদের কাছে এখন দু ধরণের নাম বাদের তথ্য আছে – প্রথম রাউন্ড যা এডজুডিকেশনের আগের এবং দ্বিতীয় রাউন্ড যা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি সংক্রান্ত এডজুডিকেশনের পরের। আমি এবার এই দু ধরণের বাতিল নামের সংখ্যার সঙ্গে যে বিধানসভা আসনে নাম বাদ গেছে তার কোন জনগোষ্ঠীগত সম্পর্ক াছে কিনা পর্যালোচনা করে দেখব।
মূল কিছু সমস্যা আগের লেখার মতই থেকে যাবে। অর্থাৎ, রিগ্রেশন বিধানসভা লেভেলে। সব আসনের সব ডেটা নেই। যাঁরা আমার আগের লেখাটি পড়েছেন তাঁরা আমি কোন বিধানসভা আসনের ক্ষেত্রে মুসলিম জনসংখ্যার যে এস্টিমেট ব্যবহার করেছি তা জানেন। তাও এখানে একবার বলে দিই।
তাই সাসউইন্ডের ডেটায় রিগ্রেশন ২১৬ টি অবসারভেশন, শুভাশিসদের ক্ষেত্রে ২৩৬। আমি অন্য ডেটার ক্ষেত্রে SHRUG ব্যবহার করেছি। সেখানেও কিছু ডেটা নেই। এছাড়া আমি এটা বলতে পারি না যে কৃষি শ্রমিক বা মুসলিম বা তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষেরা বাদ পড়ছেন কিনা। আমি শুধু জানি এই ধরণের মানুষ যে বিধানসভা আসলে বেশি আছেন সেখানে নাম বেশি বাদ যাচ্ছে কিনা। এছাড়া ডেটা অনেক পুরোন – ২০১১ এর জনগণনা থেকে আসছে বেশিরভাগ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভেরিয়েবলের তথ্য। একমাত্র রাফায়েল সাসউইন্ডের যে মুসলিম জনসংখ্যার এসটিমেট তা ২০২১ এর। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এই বিশ্লেষণের একটা মানে আছে কারণ ভারতে আন্তঃরাজ্য এমনকি আন্তঃজেলা মাইগ্রেশনও খুব কম। মাইগ্রেশন যা হয় তা জেলার ভেতরে গ্রাম থেকে শহরে হয়। তাই ১৫-১৬ বছরে একটি বিধানসভা কেন্দ্রের জনগোষ্ঠীগত বিন্যাস পালটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর বাংলাদেশ থেকে হওয়া বেআইনি অনুপ্রবেশ যে একটি সযত্নে লালিত মিথ তা নিয়ে আমি আগেও আলোচনা করেছি, এবারে আর নতুন করে করতে চাই না। সবচেয়ে বড় কথা যদি পুরোন ডাটা একদম অপ্রাসঙ্গিক হত তাহলে রিগ্রেশনে আমরা কোন স্ট্যাটিসক্যাল সিগনিফিক্যান্স পেতাম না। সেটা পাচ্ছি মানে কোন একটা প্রক্রিয়া তো চলছে যা পুরোন ডেটার সঙ্গে ভোট বাতিলের প্যাটার্নকে মিলিয়ে দেয়। প্রথমে সাসউইন্ড এবং শুভাশিসদের বাদ যাওয়া ডেটা বিধানসভা ভিত্তিক ম্যাপে প্লট করে দেখাই।
Constituencies not covered in Dey et. al, (marked in red)
Data not covered in Susewind (marked in red)
এবার আসা যাক আমাদের রিগ্রেশন রেজাল্টে। এখানে মোট চারটে কলাম আছে। ডিপেন্ডেন্ট ভেরিইয়েবল দুটিঃ প্রথম রাউন্ডের বাদ যাওয়া ভোটারের হার এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে বাদ যাওয়া ভোটারের হার। আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভেরিয়েবলেও একটির ক্ষেত্রে দুরকম ডেটা আছে – মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত। সেখানে আমরা দুটি এস্টিমেশন ব্যবহার করেছি। এখানে দেখুন একটা বেশ ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন আছে। দুটি এস্টিমেটেরই প্রথম রাউন্ডে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এরকম আসনে কম নাম বেশি বাদ গেছিল এবং যেখানে তফসিলিজাতি ভুক্ত মানুষ বেশি থাকেন এরকম আসনে বেশি নাম বাদ গেছিল। কোএফিশিয়েন্টের মান কম কিন্তু স্ট্যাটিস্টিকালি সিগনিফিক্যান্ট। প্রথম রাউন্ডে আর কোন কিছুই সিগনিফিক্যান্ট নয়।
এবার দ্বিতীয় রাউন্ডে আসুন। এটা হচ্ছে এডজুডিকেশন পরবর্তী ২৭ লাখ। এখানে কিন্তু মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের কোয়েফিশিয়েন্টের চিহ্ন উলটে গেছে – অর্থাৎ মুসলিম প্রধান আসন থেকে নাম বাদ যাচ্ছে বেশি। সাসউইন্ডের এস্টিমেট নিলে সিগনিফিক্যান্ট নয়, শুভাশিসদের এস্টিমেট নিলে সিগনিফিক্যান্ট। SC অনুপাতের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় রাউন্ডে কোয়েফিশেন্ট আর সিগনিফিক্যান্ট রইল না। কোন আসনে দারিদ্রের একটা মাপ বুঝতে ২০১১ এর হিসেবে ওই আসনে কৃষি শ্রমিকদের অনুপাত নেওয়া হয়েছিল। প্রথম রাউন্ডে তার কোয়েফিশেন্ট নেগেটিভ হলেও সিগনিফিক্যান্ট নয়, দ্বিতীয় রাউন্ডে কিন্তু সিগনিক্যান্ট। এই ফল আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে। আমার ধারণা ছিল কৃষি শ্রমিক বেশি হলে নাম বাদ যাবে যেহেতু তারা দরিদ্র। যেরকম সাক্ষর লোকেদের অনুপাতের ক্ষেত্রে হয়েছে – দ্বিতীয় পর্বে সাক্ষর মানুষের অনুপাত বেশি যেখানে নাম বাদও কম সেখানে। এটা মনে রাখতে হবে আমরা এটা জানি না কৃষি শ্রমিক বা নিরক্ষরদের নাম বাদ গেছে কিনা। আমরা শুধু বলতে পারি যে আসনে এই ধরণের লোক বেশি সেখানে নাম বাদ বেশি কিনা। একটা সম্ভাবনা হল কৃষি শ্রমিকরা দরিদ্র হলেও তারা মাইগ্রেশন কম করেন। তা তাঁদের কাগজ থাকলে হারাবার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া যে জায়গায় কৃষি শ্রমিক বেশি সেখানে তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেও সংগঠনও মজবুত। তাঁরা হয়ত এ ব্যাপারে সাহায্য করে থাকতে পারেন।
লেখা শেষ করব R2 এর কথা বলে। R2 বস্তুত আমার দেওয়া ভেরিয়েবল গুলি মোট নাম বাতিলের কত শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে তা বলে। নাম বাদ যদি স্বাভাবিক মৃত্যু বা স্থানান্তরণের কারণে বাদ যেত তাহলে জনগোষ্ঠীর বিন্যাসগত ভেরিয়বল দিয়ে তা বিশেষ ব্যাখ্যা করতে পারার কথা না যদি না আপনি বিশ্বাস করেন কোন বিশেষ জনগোষ্ঠীর লোক বেশি মাইগ্রেট করে বা মারা যায় কম বয়েসে। প্রথম রাউন্ডের ক্ষেত্রে দেখুন R2 প্রায় ৮৬% অর্থাৎ ৮৬% ভেরিয়েশন এই সামান্য কয়েকটি চলক ব্যাখ্যা করতে পারে। দ্বিতীয় রাউন্ডে কিন্তু সেটা নেমে আসে ৪৮%-৪৯%। সেটাও কম নয়, কিন্তু আগের থেকে কম। এর একটা সম্ভাবনা দ্বিতীয় পর্বে গিয়ে নাম বাদ দেওয়ার পদ্ধতিটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট ভিত্তিক নয়, বরং ব্যক্তির বৈশিষ্ট ভিত্তিক। যদি এই সম্ভাবনা সত্যি হয় তাহলে বিষয়টি বিশেষ চিন্তার। কিন্তু ব্যক্তি লেভেলে আরো ডেটা না পেলে এর থেকে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।