২৯শে মার্চ এই সময় পত্রিকায় অনির্বাণদা, অর্থাৎ, অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়, চমৎকার একটি প্রবন্ধ লিখেছে, শিরোনাম "ভারতীয় গণতন্ত্র শুধুমাত্র সচ্ছ্ল মানুষদের জন্য?"। অনির্বাণদার মূল প্রতিপাদ্যর সাথে আমি একমত, এবং সেটা এই যে, "কোনও চক্রান্ত না থাকলেও নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়বে গরীবের", এবং সেটাই পড়ছে।
আমি একমত কারণ আমাদের বা অন্যদের বিশ্লেষণেও এই এক-ই কথা ধরা পড়েছে বারংবার, যে এই এস-আই-আর প্রক্রিয়া আসলেই আমাদের যাবতীয় কাঠামোগত বৈষম্যকে আরও একটু বাড়িয়েই তুলবে, সুবিধাবঞ্চিত, উপায়হীন, ভাগ্যতাড়িত মানুষকে আরও একটু ঠেলে দেবে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। নিবিড় সংশোধনীর অন্তিম মূল্য কী তবে আরও বেশি অসাম্য? আরও বিভেদ?
কিন্তু এই যে বহু বহু মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি কোপে হারাবেন তাদের সংবিধান-স্বীকৃত অধিকার, তারা কারা, এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কোনদিকে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের উপর তাদের আস্থা? এই সব প্রশ্নের আংশিক উত্তর আছে লোকনীতি-সিএসডিএসের ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের সমীক্ষায়। সার্ভের কভারেজ মাঝারি বলেই মনে হয় — অসম, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ এবং দিল্লি — এই ছয়টি রাজ্যের ৩,০৫৪ জন নাগরিক। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৫.৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৪.৫ শতাংশ মহিলা, এবং ০.১ শতাংশ অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয়ের।
সমীক্ষাটি দীর্ঘ, কিন্তু মূল বার্তাটি বেশ স্পষ্ট, মোদ্দা কথায়, এস-আই-আরের ফলে ভোটাধিকার হারানোর বিপদ সবার সমান নয়। সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক অংশটি, দরিদ্র, বৃদ্ধ, নিরক্ষর, পরিযায়ী, অথবা গ্রামীণ ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এবং, বিগত কয়েকটি বছরে কমিশনের প্রতি জনআস্থা ভয়াবহভাবে কমে গেছে, যে কমার হার সব রাজ্যে সমান নয়। পুরো সমীক্ষার তথ্য আমার হাতে নেই। আমি শুধু হাতে পাচ্ছি, লোকনীতির সাইটে প্রকাশিত এক-একটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার, এবং দ্য হিন্দু পত্রিকায় দুটি রিপোর্ট। এর মধ্যে কয়েকটি বেছে নিয়েছি আমি, যদিও সবকটিই প্রণিধানযোগ্য।
নথিপত্রের অভাব: সংখ্যায় বাস্তবতা
আধার কার্ড কী নাগরিকত্বের অথবা ভোটাধিকারের প্রমাণ? অর্থাৎ, শুধু আধার থাকলেই কাউকে ভোটাধিকার দেওয়া হবে? এইটি এস-আই-আর প্রক্রিয়ার অন্যতম বিতর্কিত প্রশ্ন, এবং এই যে বিপুল জটিলতা, এর কারণ হয়তো এই যে আধার প্রক্রিয়ার মাঝপথে যোগ হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির নথি হিসেবে এবং সেটাও বিতর্কিতভাবে। আধার ও অন্যান্য নথি কাদের আছে, কাদের নেই, সেই প্রশ্নে যাওয়ার আগে একবার চট করে ঘটনাক্রম দেখে নিলে সুবিধে হবে পরম্পরা বুঝতে। যাকে বলে প্রথমে আসুন ক্রোনোলজি সামঝিয়ে।
বিহারের এস-আই-আর প্রক্রিয়ায় ইসিআইয়ের মূল তালিকায় ১১টি নথি ছিল, আধার তার মধ্যে ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) আধারকে ১২তম নথি হিসেবে গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয় ইসিআইকে। কিন্তু ইসিআই স্পষ্ট করে জানায়, আধার শুধু পরিচয় পত্র, নাগরিকত্ব বা ডোমিসাইলের প্রমাণ নয়। এবার আসুন পশ্চিমবঙ্গে। নভেম্বর ২০২৫ থেকে আধার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২টি নথির একটি, কিন্তু দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের আয়ুষী করের তদন্ত অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে ১২টি নথির একটি হলেও, বাস্তবতা একেবারেই অন্য গপ্পো। শুনানি শুরুর পরে সিইও মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন যে আনম্যাপড ভোটারদের আধারের পাশাপাশি তালিকার আরেকটি নথিও দিতে হবে। এই নির্দেশ লিখিত ছিল না, সোজাসুজি বলবৎ করা হল সফটওয়্যারে। ই-আর-ও-রা দেখলেন শুধু আধার আপলোড করার অপশনটিই সফটওয়্যার থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পরে নাকি সেই ফিচার আবার ফিরে আসে। অর্থাৎ আধারের গ্রহণযোগ্যতা প্রক্রিয়া চলাকালীন কমপক্ষে একবার কার্যত বাতিল করা হয়েছিল লিখিত আদেশ ছাড়াই, software toggle-এর মাধ্যমে।
নির্বাচন কমিশন বা শীর্ষ আদালত আধারকে নথি হিসেবে মান্যতা দিতে যে নারাজ বা নিমরাজি, সেইটা বোধহয় মোটামুটি পরিষ্কার। এই যেমন ২৭শে নভেম্বরের একটি খবরে পড়ছি, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চের প্রশ্ন, "কিছু সুযোগসুবিধা পাওয়ার জন্যই আধার তৈরি করা হয়েছে। শুধুমাত্র র্যাশনের জন্য একজন ব্যক্তিকে আধার দেওয়া হয়েছে বলেই তাঁকে ভোটার বলে গণ্য করা হবে?"
যাই হোক, এবার কথা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত? নথি কী সব শ্রেণির কাছে সমানভাবে আছে, বা থাকে?
লোকনীতির সমীক্ষা বলছে, প্রায় সবার কাছেই আধার কার্ড আছে, এই সমীক্ষার উত্তরদাতাদের ৯৯.২ শতাংশর কাছে। কিন্তু সরকারি জন্মশংসাপত্রের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। মাত্র ৩৪ শতাংশ জানিয়েছেন যে তাদের কাছে সরকার-স্বীকৃত জন্মশংসাপত্র আছে, আর ৫১.৬ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের কাছে এরকম কোনো নথিই নেই। যাদের কাছে জন্মশংসাপত্র নেই, তাদের মধ্যেও আবার ৭২.৮ শতাংশ বলেছেন এটি কখনও তৈরিই হয়নি। পারিবারিক স্তরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। মাত্র ১৮.৫ শতাংশ পরিবারে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সকল সদস্যের কাছে জন্মশংসাপত্র আছে। প্রায় অর্ধেক পরিবারে (৪৯.৪%) কেবল কয়েকজন সদস্যের কাছে এটি আছে, এবং ২৩.৯ শতাংশ পরিবারে কারো কাছেই নেই। জাতিভিত্তিক বৈষম্যও প্রকট। পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সাধারণ শ্রেণির প্রায় পাঁচজনের একজনের (২২%) পাসপোর্ট থাকলেও তফশিলি জাতি (SC) ও তফশিলি উপজাতির (ST) মধ্যে এই হার যথাক্রমে মাত্র ৫ ও ৪ শতাংশ। সরকারি জন্মশংসাপত্র আছে তফশিলি জাতির মাত্র ২৫ শতাংশের কাছে, আদিবাসীদের ১৩ শতাংশের কাছে, সাধারণ শ্রেণির ৪০ শতাংশের তুলনায়। অর্থনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র: নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে এই হার মাত্র ২৩ শতাংশ, যেখানে উচ্চবিত্তের ৫৩ শতাংশ।

ছবি ১। অর্থনৈতিক শ্রেণি অনুযায়ী সরকারি জন্মশংসাপত্রের প্রাপ্যতা।
ভোটার তালিকা যাচাইয়ের জন্য জন্মশংসাপত্র, মাধ্যমিক সার্টিফিকেটসহ নির্দিষ্ট নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই প্রশ্নে উত্তরদাতারা বিভক্ত। ৪৩ শতাংশ মনে করেন এটি যুক্তিসঙ্গত নয়, ৩৫.১ শতাংশ সম্মত, এবং ২১.৯ শতাংশ নিশ্চিত নন। এই প্রক্রিয়া কঠিন হবে কিনা? এই প্রশ্নে ৩৭.৬ শতাংশ বলেছেন "অত্যন্ত কঠিন" এবং আরও ৩১.৯ শতাংশ বলেছেন "কিছুটা কঠিন"। অর্থাৎ সত্তর শতাংশের কাছাকাছি উত্তরদাতা মনে করেন এই প্রক্রিয়া তাদের পক্ষে সহজ হবে না।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কারা? এই প্রশ্নে উত্তরদাতারা বৃদ্ধ (৪২.৩%), নিরক্ষর (৪১.৫%), দরিদ্র (৪০.৫%), গ্রামীণ জনগণ (২৬.৪%) এবং পরিযায়ীদের (২২.২%) সবচেয়ে বেশি বিপন্ন বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ, বিচারাধীন হওয়ার ঝুঁকি যে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অংশের সবচেয়ে বেশি, এ কথা সবাই জানেন, এবং নথিপত্রের এই সংকট কোনো ব্যক্তিবিশেষের অবহেলার ফল নয়, বরং কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন।

ছবি ২। জন্মশংসাপত্র বাধ্যতামূলক হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
এর সঙ্গেই দেখুন, আমাদের বিশ্লেষণ। নিরক্ষরতার এবং সংখ্যালঘু জনঘনত্বের হারের সাথে কীভাবে বিচারাধীন হার বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে। যদিও, এর পরেও ভোটের ব্যবধানের সাথেও আন্তঃসম্পর্ক থেকে যাচ্ছে, তবে সে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য আলোচনা।

ছবি ৩। পশ্চিমবঙ্গে নিরক্ষরতার হার ও বিচারাধীন হারের সম্পর্ক।
অনাস্থা?
এ তো গেল, কাদের উপর কোপ পড়বে, তার কিছু পূর্বাভাষ। সমীক্ষার আরেকটি অন্যতম অস্বস্তিকর প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ কী তবে ভরসা হারিয়ে ফেলবেন নির্বাচন কমিশনের উপর? এর উত্তরটাও রীতিমত উদ্বেগজনক, এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা তার-ই ফল কি না এ প্রশ্নও থেকেই যায়।
উত্তরগুলো এইরকম। লোকনীতির সমীক্ষার মাত্র ২৭.২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তারা কমিশনের প্রতি "অত্যন্ত আস্থাশীল" যে সকল যোগ্য ভোটার তালিকায় থাকবেন। ১৬.২ শতাংশের "বিশেষ আস্থা নেই" এবং ৯.২ শতাংশের "কোনো আস্থাই নেই"। "কমিশনকে সামগ্রিকভাবে কতটা বিশ্বাস করেন?" এই প্রশ্নে ২৮.৬ শতাংশ "অনেকটাই বিশ্বাস করেন", ৩৭.৪ শতাংশ "কিছুটা বিশ্বাস করেন", কিন্তু ১২.৮ শতাংশ "বিশেষ বিশ্বাস করেন না" এবং ৯ শতাংশ "মোটেই বিশ্বাস করেন না"। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৬.৬ শতাংশ উত্তরদাতা নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্ব সম্পর্কে আদৌ অবহিত নন।

ছবি ৪। নির্বাচন কমিশনের প্রতি উচ্চ আস্থা: রাজ্যভিত্তিক তুলনা (২০১৯–২০২৫)।
রাজ্যভিত্তিক তথ্য আরও বিস্ময়কর এবং তীক্ষ্ণ, তবে মনে রাখতে হবে যে লোকনীতির সমীক্ষার স্যাম্পল সাইজ বিশেষ বড় না হওয়ায়, রাজ্যের ক্ষেত্রে ছবিটা সত্যের কতটা কাছাকাছি সেটা নিয়ে সামান্য সন্দিহান থাকা যেতেই পারে। যাইহোক, সমীক্ষায় বলছে, উত্তরপ্রদেশে ২০১৯ সালে যেখানে ৫৬ শতাংশ মানুষ কমিশনের প্রতি উচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে ২০২৫-এ তা নেমে এসেছে ২১ শতাংশে। পশ্চিমবঙ্গে, ২০২৫ সালে, মানে এই নরকযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগে ততোটা কমেনি। ৪৮% থেকে ৪২%, খুব বেশি কমেনি। ২০২৬ বা তার পরে করলে এই শতাংশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেইটা দেখার ব্যাপার।
ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও ইভিএম বিতর্ক
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৮২.৪ শতাংশ উত্তরদাতা ভোট দিতে পেরেছেন। যারা ভোট দিতে পেরেছেন তাদের মধ্যে ৭.৯ শতাংশ কোনো না কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা ছিল ভোটার তালিকায় নাম খুঁজে না পাওয়া (৩২.৩%) এবং ইভিএম ত্রুটি (২৫.৩%)। ইভিএম-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও উত্তরদাতারা বিভক্ত। ৩৫.৭ শতাংশ পুরোপুরি বিশ্বাস করেন যে ইভিএম সঠিকভাবে ভোট নথিভুক্ত করে, কিন্তু ১০.২ শতাংশ মোটেই বিশ্বাস করেন না। ৫৩ শতাংশ মনে করেন কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের চাপে কাজ করছে।
শেষ প্রশ্ন। এস-আই-আর কি জাল, ভুয়ো ভোটার সাফ করে দেবে? কী বলছে লোকনীতির সমীক্ষা? ৪৯.৬ শতাংশ মনে করেন এটি ভুয়া ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের সরাতে সাহায্য করবে। কিন্তু প্রায় সমান সংখ্যক (৪৪.৭ শতাংশ) উদ্বিগ্ন যে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটাররাও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন।
এই প্রশ্নটিই দিয়ে আমাদের যতি বা ইতি টানা উচিত এই লেখার।
নথিপত্রের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে নাগরিকের উপর চাপিয়ে দিলে, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই এই নথিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে কি গণতন্ত্র সুরক্ষিত? দরিদ্র, বয়স্ক, নিরক্ষর ও প্রান্তিক মানুষদের ভোটাধিকার রক্ষা করা কী গণতন্ত্রের কাজ নয়? সুস্থ নির্বাচনী ব্যবস্থার মাপকাঠি নয়?
তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে লেখা আরিস্তোতলিয়ান (মতান্তরে সিউডো-আরিস্তোততলিয়ান) প্রায় ৯০০টি জীবন/দর্শন সংক্রান্ত প্রশ্ন-সম্বলিত একটি কোশ্চেন ব্যাঙ্ক পাওয়া যায়, যার নাম প্রব্লেমাতা। সেই প্রব্লেমাতায়, সেই কবেকালে, আরিস্তোতল বলছেন, "better to acquit a 'wrong-doer' than to condemn an innocent person"... রাশিবিজ্ঞানের পরিভাষায় যে কোনো পরীক্ষণযোগ্য প্রস্তাবনা, অর্থাৎ হাইপোথিসিস টেস্টিং-এর দুইরকম ভুল হতে পারে, এদের পারিভাষিক নাম, টাইপ ওয়ান এবং টাইপ টু এরর। আমরা যদি এই এক-ই কাঠামোয় নির্বাচনী এস-আই-আর-কে দেখি, তবে বলা যায়, যে একজন প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অ্যালগোরিদমের ভুলে বাদ যান, তাহলে সে আমাদের টাইপ ওয়ান, আর যদি ভুয়ো ভোটার ধরা না পড়ে, তাহলে সে আমাদের টাইপ টু এরর। এই দুটোর মধ্যে কোন ভুলটি নিয়ে আমাদের বেশি চিন্তার দরকার — এর উত্তর আছে ঐ আরিস্তোতলের বইতে, এর উত্তর আছে সভ্য দেশের আইনি পরিভাষায়, "ইনোসেন্ট আনটিল প্রুভেন গিলটি", অর্থাৎ, আইনের বা ন্যায়ের মূল লক্ষ্য এই হওয়া উচিত যেন কোনো নির্দোষ লোক শাস্তি না পান, কোনো প্রকৃত নাগরিক ভোটাধিকার বঞ্চিত না হন, কোনো নীরোগ মানুষের উপর অকারণে রোগের চিকিৎসা না হয়।
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাবানেদের এই টাইপ ওয়ান ও টু এররের সম্যক ধারণা আছে কী না, থাকলেও ঐ ব্ল্যাক-বক্স অ্যালগোরিদম তা আদৌ মানে কি না, এইসব প্রশ্ন সহজ হলেও, উত্তর অজানা।
তথ্যসূত্র:
১) সুহাস পালশিকর, সঞ্জয় কুমার, সন্দীপ শাস্ত্রী ও কৃষাণ সিনহা। "How document deficits may risk disenfranchising the poor, eroding trust in the Election Commission।" The Hindu, ১৭ আগস্ট ২০২৫।
২) লোকনীতি-সিএসডিএস, "Documentation and Trust in the Voter Verification Process Study 2025।"
৩) আয়ুষী কর। "How ECI Tailored the Voter Registration in West Bengal 'As it Deemed Fit'।" The Reporters' Collective, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। https://www.reporters-collective.in/trc/voter-registration-in-wb-as-it-deemed-fit
পরিশিষ্ট - প্রবন্ধে উল্লিখিত বিভিন্ন তথ্যের সারণী
বিঃদ্রঃ সংখ্যাগুলি শতকরা হারে, পূর্ণাঙ্কে। একাধিক উত্তর প্রদানের সুযোগ ছিল। সূত্র: The Hindu / লোকনীতি-সিএসডিএস।
Table 1: জাতিভিত্তিক নথিপত্রের প্রাপ্যতা
| নথি | তফশিলি জাতি (SC) | তফশিলি উপজাতি (ST) | অন্যান্য অনগ্রসর জাতি (OBC) | সাধারণ |
| আধার কার্ড | ৯৮ | ৯৯ | ১০০ | ৯৯ |
| প্যান কার্ড | ৫৮ | ৮৩ | ৭৯ | ৯০ |
| পাসপোর্ট | ৫ | ৪ | ১৬ | ২২ |
| দশম শ্রেণির সার্টিফিকেট | ৪৬ | ৫১ | ৬৪ | ৭২ |
| ডোমিসাইল সার্টিফিকেট | ৪৮ | ৪৪ | ৫৪ | ৫৬ |
| জাতি সার্টিফিকেট | ৫৮ | ৮০ | ৬১ | ৩২ |
| NRC নথি | ৯৫ | ৯৯ | ৯৬ | ৯৫ |
| বন অধিকার সার্টিফিকেট | ৭ | ৯ | ৯ | ৬ |
| পারিবারিক নিবন্ধন সার্টিফিকেট | ৩৩ | ২৬ | ৩৩ | ২৮ |
| জমি/বাড়ি বরাদ্দ সার্টিফিকেট | ৩১ | ৫৯ | ৪১ | ৫১ |
| সরকারি পরিচয়পত্র বা পেনশন অর্ডার | ২৮ | ৪৩ | ৩৭ | ৪২ |
| ১৯৮৭ সালের আগে ইস্যু হওয়া সরকারি পরিচয়পত্র | ৯ | ৭ | ৯ | ১৬ |
Table 5: অর্থনৈতিক শ্রেণিভিত্তিক নথিপত্রের প্রাপ্যতা
| নথি | দরিদ্র | নিম্নবিত্ত | মধ্যবিত্ত | উচ্চবিত্ত |
| আধার কার্ড | ৯৯ | ১০০ | ৯৯ | ১০০ |
| প্যান কার্ড | ৬৬ | ৮০ | ৮৯ | ৯৫ |
| পাসপোর্ট | ৪ | ১০ | ২১ | ৪৭ |
| দশম শ্রেণির সার্টিফিকেট | ৩৯ | ৬১ | ৭৯ | ৯১ |
| ডোমিসাইল সার্টিফিকেট | ৩৫ | ৫২ | ৬২ | ৭৪ |
| জাতি সার্টিফিকেট | ৪১ | ৫০ | ৫৩ | ৬১ |
| NRC নথি | ৯৮ | ৯৪ | ৯৬ | ৮৮ |
| বন অধিকার সার্টিফিকেট | ৯ | ৭ | ৭ | ৩ |
| পারিবারিক নিবন্ধন সার্টিফিকেট | ২৪ | ৩২ | ৩২ | ৪০ |
| জমি/বাড়ি বরাদ্দ সার্টিফিকেট | ৪২ | ৪৩ | ৪৭ | ৪৩ |
| সরকারি পরিচয়পত্র বা পেনশন অর্ডার | ৩৬ | ৩৫ | ৪৩ | ৪৪ |
| ১৯৮৭ সালের আগে ইস্যু হওয়া সরকারি পরিচয়পত্র | ৭ | ১৩ | ১৬ | ১৮ |
Table 6: অর্থনৈতিক শ্রেণিভিত্তিক জন্মশংসাপত্রের প্রাপ্যতা
| জন্মশংসাপত্র | দরিদ্র | নিম্নবিত্ত | মধ্যবিত্ত | উচ্চবিত্ত |
| হ্যাঁ, আছে | ২৩ | ৩০ | ৪৩ | ৫৩ |
| আছে, কিন্তু সরকারি কর্তৃপক্ষ থেকে নয় | ১১ | ১২ | ১২ | ৭ |
| না, নেই | ৬১ | ৫৫ | ৪৩ | ৪০ |
Table 7: অর্থনৈতিক শ্রেণি অনুযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে পরিবারের সদস্যদের জন্মশংসাপত্রের প্রাপ্যতা
| পরিবারের ১৮+ বয়সী সদস্যদের জন্মশংসাপত্র | দরিদ্র | নিম্নবিত্ত | মধ্যবিত্ত | উচ্চবিত্ত |
| হ্যাঁ, সবার আছে | ১২ | ১৬ | ২২ | ৩৩ |
| হ্যাঁ, কিন্তু কেবল কয়েকজনের | ৪৪ | ৪৯ | ৫৫ | ৫৩ |
| কারোর নেই | ৩৫ | ২৬ | ১৭ | ১০ |
Table 11: জন্মশংসাপত্র বাধ্যতামূলক হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কারা
| শ্রেণি | শতকরা হার |
| নিরক্ষর | ৪২ |
| বৃদ্ধ | ৪২ |
| দরিদ্র | ৪১ |
| গ্রামীণ জনগণ | ২৬ |
| পরিযায়ী | ২২ |
| মুসলিম | ১৫ |
| তফশিলি জাতি | ৮ |
| তরুণ ভোটার | ৭ |
| তফশিলি উপজাতি | ৭ |
| অন্যান্য অনগ্রসর জাতি | ৭ |
| কেউ না | ৩ |
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।