

ছবি: রমিত
হলং নামে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের একটি বৃক্ষ এবং সেটিকে কেন্দ্র করে একটি ঘুমপাড়ানিয়া গান (Lullaby) সুদূর মুম্বাইয়ে স্মৃতি, শৈশব, বন্ধুত্ব, যৌনতা, নারীপুরুষ সম্পর্কের এক ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে যা সমাজের কিছু বদ্ধমূল ধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে দেয়। দেহাতি সুরে গাওয়া গানটার কথাগুলি একটা মায়াজাল তৈরি করে, দর্শককে সেই গানের উৎসে চলে যেতে প্ররোচিত করে। কথাগুলি অনেকটা এরকম – তুমি একটা বাড়ি নির্মাণ করেছ/কিন্তু বৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করার তোমার কোনও ছাতা নেই/তাই তুমি গাছের তলায় যাও/বৃষ্টির ছাঁট থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কথিত আছে এই গাছ সাথের মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, বিচ্ছেদ তৈরি করে, যেভাবে কাহিনির অন্যতম চরিত্র থুয়া’র সাথে তার বন্ধু ঝুমার বিচ্ছেদ হয়েছিল। ঝুমা তখন সবে তেরো, তার বিয়ে হয় তারপর সে হারিয়ে যায়, যেভাবে গ্রাম বাংলায় বহু কিশোরী হারিয়ে যায়।
বহু বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও মুম্বাইয়ের আকাশচুম্বী অট্টালিকা, পার্ক, লোকাল ট্রেনে থুয়া ঝুমাকে খুঁজে বেড়ায়, কল্পনায় তার সাথে ফোনে কথা বলে, ভাবে সে বিবাহিত, দুই কন্যার মা, যার স্বামী আর পাঁচটা স্বামীর মতোই নিস্পৃহ, যার আচরণে স্ত্রী সম্পর্কে চূড়ান্ত অবহেলা। কিন্তু যেটা তাকে মর্মাহত করে সেটা হচ্ছে ঝুমা তাকে চিনতে পারে না, সে তাকে ভুলে গেছে। থুয়ার জীবনে আরও অনেক ক্ষত আছে যা থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হয়। বাল্যকালে সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলি সে কাটিয়েছে তার নানীর বাড়িতে, যেখানে তাকে আর তার মা’কে পৌঁছে দিয়ে বাবা চিরদিনের মতো চলে যায়; সেই বাবা যে গোলাপ ফুল অপছন্দ করতো অথচ যার পকেট থেকে তার মা খুঁজে পেয়েছিল অন্য নারীর উপহার দেওয়া ফুল। থুয়া অভিনেত্রী হতে চায়, অবসর সময়ে সে দেহ বিক্রি করে। সে নিরাসক্ত, আপাত ভাবে পাষাণহৃদয়, মুম্বাইয়ের কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাওয়া এক গ্রামীণ নারী। এখনো হলং গাছ তার ভাবনায় ডানা মেলে থাকে কিন্তু সেই উদ্ভিদ এখন বিলুপ্তপ্রায়। হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির সাথে তার শৈশবের দিনগুলিও হারিয়ে যায়।
মহানগরে পৌঁছে সে হয়ে ওঠে পুরুষের সেবাদাসী, একের পর এক পুরুষ বিশেষ করে তার ফ্ল্যাট মালিক. নিতিন তাকে উত্যক্ত করে। ইতিমধ্যে কাহিনির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শ্বেতার আবির্ভাব। তার শৈশবও কন্টকিত, অনাথ আশ্রমে সে বড় হয়েছে। শুরুতে তারা পরস্পরকে এড়িয়ে চলে, একে অন্যের প্রতি সন্দিহান, থুয়ার ঘরে পুরুষের আগমন শ্বেতার নাপসন্দ। সে কলসেন্টারে কাজ করে, ক্রেতাকে আকর্ষণ করার জন্য তাকে বাহারি নাম নিতে হয়, কন্ঠস্বরে যৌন আবেগ ঢেলে হাই, হ্যালো করতে হয়, পুঁজির আবর্তে বন্দি হয়ে ভিন্নভাবে সেও হয়ে ওঠে পুরুষের সেবাদাসী। কিন্তু সে সাবেকি, ‘পাত্র চাই’ কলমে সে নজর রাখে, যাকে পছন্দ হয় তার সাথে কাফেতে দেখা করে, শহর ঘুরতে যায়। ছোট ঘুপচি ফ্ল্যাট, যেখানে চলাফেরা সীমিত, গোপনীয়তা প্রায় অসম্ভব, সেখানে দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে দুই নারীর মধ্যেকার পাঁচিল ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। শ্বেতা থুয়ার জীবনের বাধ্যবাধকতাকে মেনে নেয়, তার অতীত সম্পর্কে জানে। অপর দিকে থুয়া শ্বেতার ‘পাত্র’ সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করে, তার বিয়ের সিদ্ধান্ত শুনে আশ্চর্য হয়, সর্বোপরি তার মধ্যে সে ঝুমার ছায়া দেখতে পায়।
ওই আবদ্ধ, ক্লস্টোফবিক পরিবেশের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা গাঢ় হয়, একজনের মানসিকতা আরেকজনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। শ্বেতা উপলব্ধি করে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিবাহ শোষণের শুধুমাত্র একটা ভিন্ন রূপ, থুয়া তাকে বোঝায় সেও হবে শুধুমাত্র একটা ‘অবজেক্ট’, যে পুরুষের নির্দেশ পালন করবে। অপর দিকে থুয়া দেহব্যবসায় অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে যা নিতিনকে হিংস্র করে তোলে। বিস্ময়কর ভাবে যৌনতার প্রতি থুয়ার এই অনীহা নিতিনের পারিবারিক জীবনে বিপন্নতা ডেকে আনে। নিতিনের স্ত্রী বিচলিত বোধ করে, কারণ যৌনকামনায় তাড়িত হয়ে নিতিন এখন তাকে বিরক্ত করে। এই ঘূর্ণীপাকের থেকে মুক্তির উপায় কি তা ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত, কোথায় পাবে তারা হলং গাছের আশ্রয় যা তাদের জীবনে প্রশান্তি বয়ে নিয়ে আসবে। সিনেমায় আমরা সামান্যমাত্র ইঙ্গিত পাই, প্রথমবার দুই পরিযায়ী নারীকে তাদের কুঠুরির বাইরে দেখি, সমুদ্রের জলে তাদের অস্থির পায়ের নড়াচড়া যেন খুশির দিনের বার্তা বয়ে আনে।
সাতাত্তর মিনিটের এই ছবিটির নাম, 'সংস অফ দ্য ফরগটেন ট্রিজ ', পরিচালক অনুপর্ণা রায়। ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবি ‘অরিজন্তি’ বিভাগে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরষ্কার পেয়েছে। ভেনিসের মঞ্চে পরিচালক প্যালেস্টাইন নিয়ে সরব হন, বলেন সেখানে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে চলেছে, প্রতিটি শিশু শান্তি, মুক্তি দাবি করে এবং গাজার শিশুরা তার ব্যতিক্রম নয়। আরও বলেন এই বক্তব্যের জন্য আমার দেশ ক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছায়ানট পরিচালিত ফিল্মোৎসবে এই ছবিটি প্রথমবার কলকাতায় দেখানো হয়। স্ক্রিনিংয়ের পরে অনুপর্ণা দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন তাঁর দিদিমার নয় বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তাঁর দাদুর বয়স ছিল তিরিশ, এবং প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সূত্রে তাঁর কন্যার বয়স ছিল তেরো। ওই দুই বালিকা/কিশোরির মধ্যে একটা বিচিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বাড়িতে আরও মেয়েরা ছিলেন এবং কয়েক বছর বাদে পুরুষহীন বাড়িতে তাঁর দিদিমাই সংসার পরিচালনা করতেন। এসবই তাঁকে প্রভাবিত করেছিল এবং তাঁর মধ্যে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে পুরুষ ছাড়াও জীবন কাটান সম্ভব। অনুপর্ণার লড়াই পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, এই বিষয়ে তাঁর ফোকাস স্থির। তিনি দেখিয়েছেন দুই নারী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেও এবং তীব্র ভাবে পরস্পরকে ভালবাসলেও তা সমকামিতাতে পর্যবসিত হয় না। পরিচালকের এই সংযম প্রশংসনীয়। ভারতীয় সিনেমায় বিশ-তিরিশ বছর আগেও তথাকথিত আর্ট ফিল্মের একটা জোরাল স্রোত ছিল। অনুপুর্ণা, পায়েল কাপাড়িয়ার ‘অল উই ইমাজিন এজ লাইট’ এবং শ্রীময়ী সিংয়ের ‘এন্ড টুওয়ার্ডস হ্যাপি অ্যালিস’ দেখলে মনে হয় সেই স্রোত ক্ষীণ হয়ে এলেও, এখনো তা তিরতির করে বয়ে চলেছে।