এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • প্রধানমন্ত্রী যখন ফাসী চায়

    লতিফুর রহমান প্রামানিক লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ মে ২০২৬ | ৩০ বার পঠিত
  • রামিসার জন্য এখনো লজ্জিত বাংলাদেশ। গতকাল একটা বিষয় নিয়ে কিছুটা খটকা লাগলো আমার কাছে। আইনজীবী বিধায় স্বভাবগত ভাবে আইনের বিষয়গুলো মাথায় আসে। কারণ এর সাথে আইনী প্রশ্ন আর রাস্ট্রের অধিকর্তা অর্থাৎ রাজার আদেশ সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। হেড অব দা স্টেট বলতে প্রধানমন্ত্রীকেই আমরা বর্তমান গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বুঝতে পারি। সেক্ষেত্রে আইনের রক্ষক ও প্রজাদের রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্ব, ও কল্যান তাহার উপর অর্পিত। আমরা যদি সংবিধানের দিকে খেয়াল করি তাহলে দেখবো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কি কি সপথ নিয়েছেন,

    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় তফসিল (ফরম-২) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে রাষ্ট্রপতির কাছে দুটি পৃথক শপথ নিতে হয়। একটি হলো 'পদের শপথ' এবং অন্যটি হলো 'গোপনীয়তার শপথ'।

    ​"আমি ................................................. সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইন-অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী-পদের কর্তব্য সততা, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব;

    ​আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব;

    ​আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা-বিধান করিব;

    ​এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।"

    এবার তাহলে বিচার করতে সুবিধা হলো, রাস্ট্রের সকল নাগরিকদের উপর তার দায়িত্ব আর আইনানুগ বিচার করার কত পবিত্র আর মহান ভার। মানুষ রক্তমাংসের সকলেই হয় কিন্তু ক্ষমতা বা দায়িত্ব মানুষকে ও তার বিবেক কে নিয়ন্ত্রণ করে। যারা করতে পারে তারাই উচ্চ মানের শাসক হিসেবে জগতে উজ্জ্বল হয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করার সুভ সুচনা করার যে সপথ নিয়েছেন তার প্রশংসা খোদ রামিসার বাবার মুখে শুনি, তিনি যখন বলেন, এমন মানুষ আমি আর দেখিনি যিনি ট্রাফিক সিগনাল মেনে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী সেখানেই মহিমান্বিত। পাশাপাশি তার কর্মের সমালোচনা করার অবাধ সুবিধা দিয়ে রেখেছেন যা প্রধানমন্ত্রীকে আরও ভালো কিছু করার জন্য আগ্রহী করে দিচ্ছে। এবার মুল বক্তব্য তে আসি। যে রাস্ট্র আর রাজার শাসন নিয়ে বলছিলাম।

    রাজার আদেশই আইন” (The King's word is law) — রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই ধারণার সাথে নির্দিষ্ট কোনো একক ব্যক্তির নাম জড়ানোর চেয়ে, এটি মূলত চরম রাজতন্ত্র (Absolute Monarchy) এবং রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বের (Divine Right of Kings) মূল ভিত্তি।

    প্রধানমন্ত্রী রামিসার বাসায় গিয়ে দুটো দৃস্টান্ত গড়েছেন, এক মানুষ হিসেবে আর দুই হলো রাস্ট্রপ্রধান হিসেবে। আমরা যদি মানুষ হিসেবে তারেক রহমান কে বিচার করি তাহলে রামিসার বাসায় যাওয়া, আপ্লুত হওয়া, উপযুক্ত শাস্তি চাওয়া এমনকি মৃত্যুদন্ড চাওয়াও অনায্য নয়। একজন রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে সারা বাংলাদেশ যেভাবে কষ্ট পেয়েছে সেহিসেবে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর আবেগও সমান।

    কিন্তু রাস্ট্রপ্রধান বা রাজা হিসাবে তারেক রহমান কিন্তু আলাদা স্বত্বা। আমার খটকা লাগলো সেখানে। আমরা যখন পাবলিক প্লেসে জনসভায় তারেক রহমান কে বক্তব্য দিতে দেখি তখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তা জাতীর জন্য বার্তা দেয়। তার দেয়া দেওয়া প্রতিটি কথাই তখন রাজার আইন। আর রাজার আইন পালন করতে তার সরকারের সকল অংগ বাধ্যগত। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আইন কানুন, আদালতে এখন আলোচনা চলছে যদি ও সরকার বারবার বলছে, বিচার বিভাগের উপর সরকারের হস্তক্ষেপ নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আদেশ বা নির্দেশ পালন না করার নজির আমাদের দেশে অপ্রতুল। অপরাধী এবং বিচারপ্রাথী সমান অধিকার ভোগ করতে না পারলে বিচার কলুষিত হয়, প্রশ্ন দেখা দেয়। বর্তমান সরকারের নতুন বাংলাদেশ গঠনের এই যাত্রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়াই প্রধান লক্ষ্য হোক সেটা নাগরিক হিসেবে আমারও দাবী। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বা ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড (যেমন—আদালতের কাছে নির্দেশ বা দাবি হিসেবে) চাইতে পারেন না। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ (যার প্রধান প্রধানমন্ত্রী) থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো মামলায় অপরাধীর কী শাস্তি হবে—তা সম্পূর্ণ অপরাধের ধরন, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে আদালত (বিচারক) নির্ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের কোনো মন্ত্রী আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি দাবি বা নির্দেশ করতে পারেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে উনি যা পারেন তা আলোচনা আগেই শেষ করেছি।

    আইনি পরিভাষায় 'সাবজুডিস' (Sub-judice) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি একটি ল্যাটিন শব্দ, যার সরল অর্থ হলো "বিচারাধীন" বা "আদালতের বিবেচনাধীন" (Under judicial consideration)।

    যখন কোনো মামলা দেশের কোনো আদালতে দায়ের করা হয় এবং সেই মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো প্রকাশ পায়নি—তখন ওই মামলার বিষয়বস্তু বা উপাদানগুলোকে 'সাবজুডিস বিষয়' বলা হয়। বিচারাধীন মামলার গুণাগুণ (Merits) নিয়ে খোলামেলা বিতর্ক করা।

    ​আসামি আসলেই অপরাধী কি না, তা নিয়ে গণমাধ্যমে নিশ্চিত রায় দিয়ে দেওয়া।

    ​মামলার কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা প্রমাণ নিয়ে জনসমক্ষে এমন বিশ্লেষণ করা, যা আদালতে উপস্থাপনের আগেই বিতর্ক তৈরি করে। আইনের ছাত্র হিসাবে এই শব্দটা আমরা হরহামেশা ব্যবহার করে থাকি। কাজেই শুধু প্রধানমন্ত্রী একা নন আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের ও তাহা মান্য করা আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১৯ কোটির বাংলাদেশ এ একটা আপীল আদালত। সেখানে বর্তমানে ২০১৭/১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে, রামিশার মামলার রায় পেতে পেতে ২০৪০ অব্দি অপেক্ষা করলেও অবাক হব না। শুধু রামিশা নয় প্রতিটি খুনের উপযুক্ত বিচার হোক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কখনো কখনো রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে নিজেকে জারী রাখুক আবার প্রধানমন্ত্রী বা রাজা হিসাবে আইনের রক্ষক হয়ে সকল নাগরিকদের প্রজার আইনের শাসন নিশ্চিত করুক আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সেটাই প্রত্যাশা করি। আগামীর নতুন বাংলাদেশ বিকশিত হোক। আমিন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন