

প্লেটোকে বুঝতে হলে—শুধু প্লেটো কেন, প্লেটোর পরবর্তী বহু দার্শনিককে বুঝতে হলেও—স্পার্টার সম্পর্কে কিছুটা জানা জরুরি। গ্রিক মননে স্পার্টার প্রভাব দো-ফলা: বাস্তবেও যেমন, কিংবদন্তিতেও তেমনই। দুইই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে, স্পার্টার সঙ্গে যুদ্ধে এথেন্সের পরাজয় হয়েছিল; অন্যদিকে প্লেটো ও তাঁর পরের অসংখ্য লেখকের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল স্পার্টার কিংবদন্তি। গল্পের এই স্পার্টাকে তার পূর্ণাঙ্গরূপে পাওয়া যায় প্লুতার্কের লেখা ল্যুকুরগস (Λυκοῦργος, ইংরেজি Lycurgus)-এর জীবনীতে; এ লেখা যে সব আদর্শের পক্ষপাতী, সেগুলোই পরবর্তীকালে রুশো, নিচা আর ন্যাশনাল সোশ্যালিজ়মের [১] মালমশলা সরবরাহ করেছে (ডা. থমাস আর্নল্ড আর ইংরেজ সরকারি ইশকুলগুলোর কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম [২])। ইতিহাসে এই কিংবদন্তির গুরুত্ব বাস্তবের স্পার্টার থেকেও বেশি; তবু, যেহেতু বাস্তবই কিংবদন্তির উৎস, তাই বাস্তবটুকু নিয়েই আমাদের শুরু করতে হবে।
পেলোপন্নেশস (Πελοπόννησος, ইংরেজি Peloponnesus) দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে ছিল লাকোনিয়া, যার রাজধানী ছিল লাকেদাইমন (Λακεδαίμων, ইংরেজি Lacedaemon) বা স্পার্টা। উত্তর দিক থেকে ডোরিয়ান আক্রমণ ও অভিবাসনের সময় স্পার্টানরা এদেশ জয় করে, তারপর অঞ্চলটির আদি অধিবাসীদের প্রকারান্তরে ভূমিদাসে পরিণত করে নিজেদের শাসকগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই ভূমিদাসেরা নিজেদের হেইলোতেস (Εἵλωτες, ইংরেজি Helot, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ: ‘হেইলোস নগরের বাসিন্দা’) বলে ডাকতো। সেই প্রাচীন পৃথিবীতে সমস্ত জমির মালিক ছিল স্পার্টানরা, অথচ আইন আর ঐতিহ্য বলতো – সে জমি নিজ হাতে চাষ করা নাকি তাদের বারণ; কারণ? চাষ করাকে যেমন নিম্নস্তরের কাজ বলে ভাবা হত, তেমনই যে কোনো সময় সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের জন্যেও তাদের ফাঁকা রাখার একটা প্রয়োজন ছিল। ভূমিদাসদের কেনাবেচা করা যেত না, তাদের ভাগ্য ওই জমির সঙ্গেই বাঁধা ছিল; জমিগুলিকে নানা অংশে ভাগ করে একেকজন স্পার্টানের দায়িত্বে বাটোয়ারা করে দেওয়া হত। ভূমিদাসদের মতো এসব জমিরও বেচাকেনা আইনে বারণ ছিল, কেবল পিতার থেকে পুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে পারতো (আইনত হস্তান্তর সম্ভব ছিল যদিও)। হেইলোতেসদের থেকে জমির মালিক নিজের জন্যে পেত ৭০ মেদিম্নি (প্রায় ১০৫ ঝুড়ি) [৩] ফসল, নিজের স্ত্রী-র জন্যে ১২ মেদিম্নি, আর বাৎসরিক ওয়াইন আর ফলমূলের কোনো এক পূর্বনির্ধারিত অংশ [ক]। এর উদ্বৃত্ত যা হত, তা হেইলোতেসদের সম্পত্তি ছিল। হেইলোতেসরাও স্পার্টানদের মতোই গ্রিক, তাই নিজেদের এই স্পার্টান-দাসত্বকে তারা তীব্র ঘৃণা করতো। সম্ভব হলেই বিদ্রোহও করতো। এই বিদ্রোহের আশঙ্কার মোকাবিলা করতে স্পার্টানদের গোপন পুলিশের দল তো ছিলই, তবে তার ওপর আরেক প্রস্থ নিশ্চিত হতে বছরে একবার তারা হেইলোতেসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতো, যাতে যুবক স্পার্টানদের হাতে আপাত-অবাধ্য কেউ কোতল হয়ে গেলে তাদের ওপর নরহত্যার আইনি বোঝা না চাপে [৪]। রাষ্ট্র চাইলে কোনো হেইলোতেসকে মুক্তি দিতেই পারতো, তবে সে অধিকার তাদের প্রভুদের হাতে ছিল না। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের মতো বিরল কিছু ক্ষেত্রে মুক্তি পেত হেইলোতেসরা।
খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের কোনো এক সময় স্পার্টানরা তাদের প্রতিবেশী দেশ মেস্সেনিয়া (Μεσσηνία, ইংরেজি Messenia) দখল করে তার অধিকাংশ বাসিন্দাকে হেইলোতেস বানায়। স্পার্টায় লেবেনস্রাউম (Lebensraum)-এর [৫] অভাব ছিল; এই নতুন ভূখণ্ড সেই অপ্রাপ্তির বোধ কিছুটা হলেও লাঘব করে।
বর্গাজমি ছিল সাধারণ স্পার্টানদের জন্যে; অভিজাতদের নিজেদের তালুক থাকতো, জনসাধারণের জন্যে নির্দিষ্ট জমির অংশ রাষ্ট্র ভাগ করে দিত।
লাকোনিয়া-র অন্যান্য অংশের স্বাধীন বাসিন্দা—যাদের পেরিওইকোই (Περίοικοι, ইংরেজি perioeci, আক্ষরিক অর্থ – যারা আশেপাশে থাকে) বলা হত—তাদের ভাগে কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বরাদ্দ ছিল না। স্পার্টার কোনো নাগরিক একটিমাত্র কাজেই আজন্ম শিক্ষালাভ করতো, সে কাজ ছিল – যুদ্ধ। রুগ্ন শিশুদের চিহ্নিত করতেন গোষ্ঠীপতিরা; কেবল ‘তেজিয়ান’ শিশুরাই বড় হওয়ার সুযোগ পেত। কুড়ি বছর বয়স অবধি সব ছেলেই একটিই বিশাল ইশকুলে প্রশিক্ষণ পেত; লক্ষ্য – তাদের শক্তপোক্ত, যন্ত্রণায় অকাতর আর শৃঙ্খলাপরায়ণ বানানো। সাংস্কৃতিক বা বিজ্ঞানশিক্ষার ন্যাকামো সেখানে ছিল না; পুরোপুরি রাষ্ট্রের অনুগত, ভালো সৈন্য বানানোই সে বিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ ছিল।
কুড়ি বছর বয়সে সত্যিকারের সেনাবাহিনীতে যোগদান শুরু হত। কুড়ি বছরের ঊর্ধ্বে যে কেউ বিয়ে করতে পারতো, কিন্তু তিরিশ অবধি পুরুষদের ‘পুরুষ আবাস’-এ এমনভাবে থাকতে হত, যেন তার নিজেরই বিবাহিত জীবন এক গোপন পরকীয়া। তিরিশে পূর্ণ নাগরিকত্ব পাওয়া যেত। সমস্ত নাগরিককেই কোনো না কোনো লঙ্গরখানার সদস্য হতে হত, বাকি সকলের সঙ্গে বসে খেতে হত, আর নিজের ভাগের জমির শস্য থেকে অনুদান দিতে হত। রাষ্ট্রের তত্ত্ব ছিল – কোনো স্পার্টানই নিদারুণ দারিদ্র্যভোগ করবে না, আবার কেউই বিশাল ধনীও হবে না। বিনামূল্যের উপহারের ব্যতিক্রম বাদ দিলে, সকলকেই নিজের জমির ফসলের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করতে হত। কেউ চাইলেও সোনা বা রুপোর মালিক হতে পারতো না, আর মুদ্রা ছিল লোহার তৈরি। স্পার্টার সরল জীবনযাত্রা প্রায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল।
স্পার্টান সমাজে নারীর অবস্থান ছিল অদ্ভুত। গ্রিসের অন্যান্য জায়গার ভদ্রঘরের নারীদের মতো তাদের মোটেই আলাদা করে রাখা হত না। মেয়েরাও ছেলেদের মতোই শারীরিক কসরতের অভ্যেস করতো; আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, ছেলেমেয়েরা তাদের ব্যায়াম আর কসরত অভ্যেস করতো নগ্ন অবস্থায়, একসাথে। লক্ষ্য ছিল - (স্যার থমাস নর্থ-এর অনুবাদে প্লুতার্কের ল্যুকুরগোস উদ্ধৃত করছি; পৃ: ১১৮)
“দৌড়, কুস্তি, লক্ষ্যভেদ আর ভার নিক্ষেপের মাধ্যমে কুমারীদের শরীর এত শক্তপোক্ত হয়, যাতে পরে তাদের সবল, যুবতী শরীর থেকে পুষ্টি নিয়ে সন্তান সহজে ভূমিষ্ঠ হয়ে বংশবিস্তার করে, যাতে তাদের ব্যায়ামপুষ্ট শরীর সহজেই প্রসববেদনা সহ্য করতে পারে... যদিও কুমারীরা নিজেদের এইভাবে উন্মুক্ত রাখতো – তাদের এই ক্রীড়া কেবল খেলাধুলোই ছিল, তাতে লালসা বা চাপল্য ছিল না।”
বিয়েতে অনিচ্ছুক পুরুষদের ‘আইনত কুখ্যাত’ করা হত, আর যুবক যুবতীরা যেখানে ব্যায়াম আর নাচগান করতো, তার পাশ দিয়ে নগ্ন অবস্থায় তাদের পায়চারি করতে বাধ্য করা হত, সে যত ঠান্ডা আবহাওয়াই থাকুক না কেন।
রাষ্ট্রের কাজে লাগে না – এমন কোনো অনুভূতি প্রকাশ করার অধিকার মেয়েদের ছিল না। তারা কাপুরুষের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে পারতো, আর সেই কাপুরুষ নিজের সন্তান হলে মায়ের কপালে প্রশংসাও জুটতো, কিন্তু সদ্যোজাত সন্তান দুর্বল হলে তার হত্যার পরে বা যুদ্ধে মৃত সন্তানের উদ্দেশে শোক প্রকাশ করার অধিকার তাদের ছিল না। অন্য গ্রিকরা তাদের শুদ্ধাচারী মনে করলেও, কোনো সন্তানহীনা বিবাহিতাকে রাষ্ট্র যদি অন্য কোনো বেশি বীর্যবান পুরুষের সান্নিধ্য খুঁজে ভবিষ্যত নাগরিক পয়দা করতে বলতো, তবে তাতে তাদের কোনো আপত্তি থাকতো না। আইনতই সন্তান জন্ম দেওয়াকে উৎসাহ দেওয়া হত। আরিস্তোতলের মতে, তিন পুত্রের পিতার যুদ্ধে যাওয়া মকুব ছিল, চার পুত্রের পিতা সব রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকেই নিস্তার পেত।
স্পার্টার সংবিধান বেশ জটিল। দুটি আলাদা পরিবার থেকে বংশপরম্পরায় দু-জন নৃপতি নির্বাচিত হতেন। যুদ্ধের সময় এঁদের কোনো না কোনো একজন সৈন্যবাহিনীকে নেতৃত্ব দিলেও, শান্তির সময়ে তাঁদের ক্ষমতা বেশ সীমিত ছিল। মোচ্ছবের সময় বাকিদের দ্বিগুণ পরিমাণ খাবার এঁদের জন্যে বরাদ্দ থাকতো আর এঁদের কেউ মারা গেলে রাষ্ট্রীয় শোকপালন হত। এঁদের ধরে তিরিশজন অভিজ্ঞ বয়স্কদের নিয়ে ‘গুরুজনদের সভা’ তৈরি হত, যার বাকি আঠশজনকে ষাটোর্ধ্ব আর অভিজাত বংশের সন্তান হতেই হত। এই সভা অপরাধের বিচার করতো আর রাজ্যসভায় উত্থাপনের জন্যে প্রস্তাব প্রস্তুত করতো। এই রাজ্যসভা তৈরি হত নাগরিকদের দিয়ে; কোনো প্রস্তাব আনার অধিকার এদের ছিল না, কেবল ‘হাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে তারা আনীত প্রস্তাব গ্রহণ বা খারিজ করতে পারতো। এই সভার অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো আইন প্রবর্তন করা যেত না; তবে, এদের সম্মতি – দরকারি হলেও, যথেষ্ট ছিল না; গুরুজন আর নগরপালদের সম্মতি ছাড়া কোনো আইনই চালু হত না।

নৃপতিদ্বয়, গুরুদের সভা আর রাজ্যসভা – এ ছাড়াও, আরও একটি চতুর্থ শাখা ছিল সরকারের, যা স্পার্টার একেবারে নিজস্ব। এঁরা ছিলেন পাঁচজন এফোর (Ephor)। গোটা জনগোষ্ঠী থেকে এঁদের বাছা হত; বাছার পদ্ধতিটি আরিস্তোতলের মতে ‘শিশুসুলভ’ আর বেরি-র মতে, জমির পরিমাণ-অনুসারে। এঁরা স্পার্টান সরকারের এক ‘গণতান্ত্রিক’ অংশ ছিলেন [খ], যাঁদের কাজ ছিল রাজাদের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতি মাসে রাজারা সংবিধান পালনের শপথ নিতেন, আর তারপর এফোর-রা রাজাদেশ পালনের শপথ নিতেন – যতক্ষণ রাজারা নিজের শপথ পালনে নিয়োজিত থাকবেন, ততক্ষণ। যখন কোনো একজন নৃপতি যুদ্ধাভিযানে বেরোতেন, দু-জন এফোর তাঁর সঙ্গে যেতেন, তাঁর আচরণের খতিয়ান রাখতে। এফোররা জনগণের সর্বোচ্চ দেওয়ানি আদালত ছিলেন, কিন্তু রাজাদের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন ফৌজদারি বিচারালয়।
সেই প্রাচীনকালে মনে করা হত – স্পার্টার সংবিধান ৮৮৫ খ্রিস্টপূর্বে প্রবর্তন করেছিলেন ল্যুকুরগস নামের এক আইনপ্রণেতা। আসলে কিন্তু স্পার্টার নিয়মকানুন ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল, ল্যুকুরগস ছিল এক পৌরাণিক চরিত্র, আদতে এক দেবতা। তার নামের মানে ছিল ‘নেকড়ে-তাড়ুয়া’, আর আর্কাদিয়ায় তার উপাসনা হত।
অন্যান্য গ্রিকদের মনে স্পার্টার প্রতি যে সম্ভ্রম ছিল, তা আজ আমাদের কাছে কিছুটা বিস্ময়কর। পরবর্তীকালে অন্য গ্রিক নগরীর থেকে স্পার্টা যতটা আলাদা হয়ে যায়, শুরুতে কিন্তু তা ছিল না; শুরুর সে দিনকালে স্পার্টাতেও এমন কবি, শিল্পী তৈরি হত, যাঁরা অন্য যে কোনো নগরীর সমকক্ষ ছিলেন। তবে আমরা স্পার্টার সংবিধানকে (যা কিনা ল্যুকুরগোস মোটেই বানাননি) যে রূপে এতক্ষণ দেখেছি, সেই চেহারায় দানা বাঁধে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে বা তারও পরে; যুদ্ধজয়ের গুরুত্বের পাশে অন্য সবকিছুই নস্যি হয়ে যায়, আর সভ্যতার ইতিহাসে গ্রিসের যা অবদান, তার লিস্টি থেকে স্পার্টার নাম উধাও হয়ে যায়। নাৎসিরা জিতলে ঠিক কেমন রাষ্ট্র বানাতে পারে, আমাদের কাছে স্পার্টা তার একটি ছোট মডেল। গ্রিকদের কিন্তু তা মনে হত না। বেরি যেমন বলছেন: [গ]

“ছন্নছাড়া যেসব জনপদের মিশ্রণে স্পার্টার প্রাকারহীন, সাদামাটা নগরী গড়ে উঠেছিল, পঞ্চম শতকের কোনো পর্যটক এথেন্স বা মিলেতোস থেকে সেখানে এসে পড়লে তাঁর হয়তো মনে হত অনেকদিন আগের কোনো যুগে ফিরে গেছেন, যেখানে তত্ত্ব আর বিত্তের ভেজাল না মেশার ফলে মানুষ অনেক বেশি সরল, সাহসী – এককথায় শ্রেয়। প্লেটোর মত কোনো দার্শনিক যখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে মাথা ঘামাতেন, স্পার্টা রাষ্ট্রটিকে তাঁর আদর্শের সবচেয়ে কাছাকাছি বলে মনে হত। এক সাধারণ গ্রিসবাসীর চোখে স্পার্টার কাঠামোয় এক ভয়ঙ্কর, সরল সৌন্দর্য ছিল – এক ডোরিয়ান শহর, যার মহিমা ডোরিয়ান মন্দিরের সমান – তার নিজের বাসার মতো আরামদায়ক না হলেও, নিঃসন্দেহে অনেক বেশি মহৎ।”
অন্য অঞ্চলের গ্রিকদের স্পার্টার প্রতি সম্ভ্রম বোধ করার আরেকটা কারণ ছিল তার স্থিতিশীলতা। বাকি সব গ্রিক নগরীতেই বিপ্লব হত, কিন্তু স্পার্টার সংবিধান শতাব্দীর পর শতাব্দী বদলায়নি – শুধু আইনের পথে ক্রমশ এফোরদের ক্ষমতা বেড়েছিল, রক্তক্ষয় ছাড়াই।

স্পার্টানদের মূল উদ্দেশ্য ছিল – এক অদম্য যোদ্ধা-জাতির সৃষ্টি করা। তাতে যে এক লম্বা সময় ধরে তারা সফল হয়েছিল – এ কথা অস্বীকার করা যায় না। ৪৮০ খ্রিপূ-র থার্মোপ্যুলে (Θερμοπύλαι, ইংরেজি Thermopylae)-র যুদ্ধে তারা কার্যত হেরে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এ যুদ্ধ ছিল তাদের বীরত্বের সেরা নমুনা। থার্মোপ্যুলে ছিল পাহাড়ের মধ্য দিয়ে এক সংকীর্ণ উপত্যকা; ধারণা ছিল – পারসিক সৈন্যবাহিনীকে এখানে রুখে দেওয়া যাবে। কিছু আধা-সামরিক সাহায্যসহ তিনশো স্পার্টান এখানে সম্মুখ সমরে গোটা পারসিক বাহিনীকে রুখে দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মধ্য দিয়ে এক ঘোরানো রাস্তা খুঁজে পায় পারসিকরা আর গ্রিক বাহিনীকে দু-দিক থেকে একইসঙ্গে আক্রমণ করে। একজন স্পার্টান সৈন্যও সেদিন প্রাণে বাঁচেনি। দু-জন অসুস্থতার কারণে ছুটিতে ছিল, চোখে জীবাণুর আক্রমণে তারা প্রায় অন্ধ হতে বসেছিল। তাদের একজন, তার অধীনস্থ হেইলোতেসদের নেতৃত্বে যুদ্ধে যাবেই বলে ঠিক করে; সেও বাঁচেনি। অন্যজন, আরিস্তোদিমোস (Ἀριστόδημος, ইংরেজি Aristodemus) ঠিক করে – সে বড় বেশিই অসুস্থ, তাই যুদ্ধে যায়নি। সে যখন স্পার্টায় ফিরে আসে, কেউ তার সঙ্গে কথা বলতো না; তাকে ‘কাপুরুষ আরিস্তোদিমোস’ বলে ডাকা শুরু হয়। এক বছর পর সে তার বেইজ্জতির বোঝা নামাতে পেরেছিল, যখন প্লাতেয়া-র যুদ্ধে সে বীরের মৃত্যু বরণ করে আর স্পার্টানরা জয়ী হয়।
যুদ্ধশেষে থার্মোপ্যুলে-র যুদ্ধক্ষেত্রে স্পার্টানরা এক স্মারক বসিয়েছিল, যাতে শুধু লেখা ছিল, “আগন্তুক, লাকেদাইমোনীয়দের সঙ্গে দেখা হলে তাদের বোলো, আমরা এখানে তাদের আদেশ মেনেই শায়িত।”
স্থলযুদ্ধে স্পার্টানরা বহুদিন নিজেদের অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করে রেখেছিল। তাদের সেরার তকমা টিকেছিল ৩৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত, যে বছর লয়েকট্রা (τὰ Λεῦκτρα, ইংরেজি Leuctra)-র যুদ্ধে তারা থিব্স-এর কাছে পরাজিত হয়। ওখানেই তাদের সামরিক গৌরবের সমাপ্তি।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে, স্পার্টার কিংবদন্তির সঙ্গে তার বাস্তব কখনোই ঠিক তাল মেলায়নি। তার সেরা যুগে বেঁচেছিলেন হেইরোদোতোস, আর কী আশ্চর্য, তাঁর মতে কোনো স্পার্টানই ঘুষ খাওয়ার লোভ সামলাতে পারতো না! অথচ, ধনীদের প্রতি বিদ্বেষ আর সহজসরল জীবনযাপন – স্পার্টান শিক্ষার মূল সুর এ-ই ছিল। আমরা জানতে পারি – স্পার্টান রমণীরা শুদ্ধাচারিণী ছিলেন, অথচ বহুবার এমন হয়েছে, যে, রাজাদের ঘোষিত উত্তরাধিকারীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এই কারণে, যে, সে তার মায়ের স্বামীর নিজের সন্তান নয়। আমরা এও জানতে পারি – স্পার্টার দেশভক্তি অক্ষয় ছিল, অথচ, প্লাতেয়া-র যুদ্ধের বিজয়ী রাজা পওসানিয়াস (Παυσᾰνῐ́ᾱς, ইংরেজি Pausanias) শেষপর্যন্ত ক্সেরেক্সিজ়ের বেতনভুক বিশ্বাসঘাতকে পর্যবসিত হন। সব বড় মাপের জ্বলন্ত উদাহরণগুলি বাদ দিলেও, স্পার্টার রীতিনীতি সর্বদাই ক্ষুদ্র ও প্রাদেশিক পরিসরের ছিল। এশিয়া মাইনর আর তার লাগোয়া দ্বীপগুলির গ্রিকদের যখন পারসিক শাসন থেকে এথেন্স মুক্তি দিচ্ছিল, স্পার্টা মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল; যতক্ষণ পেলোপন্নেশস নিরাপদ, ততক্ষণ অন্য গ্রিকদের সম্পর্কে স্পার্টার ঔদাসীন্যই বরাদ্দ ছিল। সমগ্র হেলেনিক জগতের সংগঠন তৈরি করার প্রতিটি প্রচেষ্টাকেই ব্যর্থ করেছিল স্পার্টার আঞ্চলিক বিদেশনীতি।
আরিস্তোতলের জীবন কাটে স্পার্টার পতনের পর; স্পার্টার সংবিধান নিয়ে তাঁর বর্ণনায় বেশ কড়া সমালোচনা আছে [ঘ]। অন্যদের বর্ণনার থেকে তাঁর আলোচনা এতটাই আলাদা, যে, একই জায়গা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে বিশ্বাস করা যায় না। এই যেমন,
“আইনপ্রণেতা চেয়েছিলেন, যাতে গোটা রাজ্যটি শক্তপোক্ত আর সংযমী হয়, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই ইচ্ছে তিনি বলবৎ করতে পেরেওছিলেন, কিন্তু মেয়েদের উপেক্ষা করার ফলে তারা সর্বতোভাবেই অপরিমিত এবং বিলাসব্যসনের জীবন কাটাতো। এইরকম এক রাজ্যে, বিশেষ করে নাগরিকরা যদি তাদের স্ত্রীদের অধীনে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়—যেমনটা হয় যেকোনো যুদ্ধবাজ জাতির ক্ষেত্রে—পার্থিব ধনসম্পত্তির গুরুত্ব বেজায় বেশিহয়ে ওঠে... এমনকি সাহসিকতার বিষয়েও—যা কিনা যুদ্ধ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে কোনো কাজেই লাগে না—লাকেদাইমোনীয় নারীদের প্রভাব বড়ই ক্ষতিকারক... মেয়েদের এই ছাড় দেওয়ার শুরু বহু প্রাচীনকাল থেকে, আর তার ফলে যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে, যেমন... কথিত আছে, ল্যুকুরগস যখন মেয়েদেরকে নিজের আইনের আওতায় আনতে চেয়েছিলেন, তখন তারা তার প্রতিরোধ করে, তিনিও একসময় হাল ছেড়ে দেন।”
এতেও না থেমে তিনি স্পার্টানদের লোভী বলে দাগিয়েছেন, যার কারণ হিসেবে সম্পত্তির অসম বণ্টনকে দায়ী করেছেন। যদিও বর্গাজমিগুলি বিক্রি করা যেত না, তাঁর মতে সেগুলিকে উপহার বা দান হিসেবে দেওয়া যেত। পাঁচ ভাগের দু-ভাগ জমিই মেয়েদের হাতে ছিল। এর ফলে ‘নাগরিক’দের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। কোনো একসময় তা দশ হাজারের ওপর হলেও, থিবস-এর হাতে পরাজয়ের সময় তা এক হাজারের নীচে নেমে যায়।
স্পার্টার সংবিধানের প্রতিটি দফা-কেই আরিস্তোতল সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এফোর-রা অধিকাংশ সময়েই খুবই গরীব হতেন, তাঁদের ঘুষ দেওয়া তাই সহজ ছিল; তাঁদের ক্ষমতা এতই বেশি ছিল, যে রাজাদেরকেও তাঁদের মতামত শুনতে হত – মোটের ওপর সংবিধানটি গণতন্ত্রের চেহারা নেয়। তিনি জানাচ্ছেন, এফোরদের ছাড় ছিল মাত্রাতিরিক্ত, তাদের জীবনযাপন সংবিধানের মূল সুরের সঙ্গে মিলতো না, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপানো নিয়মকানুন এতই কড়া ছিল, যে তারা লুকিয়ে বেআইনি ইন্দ্রিয়সুখের রাস্তা নিত।
স্পার্টার গৌরবের দিন অস্তাচলে যাওয়ার পর আরিস্তোতল লিখেছেন, কিন্তু তাঁর মতে, যে অশুভের কথা তিনি লিখছেন, তা প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। তাঁর লেখার সুর এতটাই নিরাবেগ আর বাস্তবধর্মী, যে, তাঁকে অবিশ্বাস করা কঠিন, আর কঠোর হাতে আইন চাপানোর কুফল কী হতে পারে – তা নিয়ে সমস্ত আধুনিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর বক্তব্য মিলেও যায়। তবুও, মানুষের মনে আরিস্তোতলের স্পার্টা টিকে থাকেনি; টিকেছে প্লুতার্কের কিংবদন্তীর স্পার্টা বা প্লেটোর ‘প্রজাতন্ত্র’-তে স্পার্টার দার্শনিক আদর্শের প্রতিচ্ছবিটি। শতকের পর শতক ধরে যুবকরা এইসব লেখা পড়ে, আর তাদের মনে ল্যুকুরগস বা দার্শনিক-রাজা হওয়ার অদম্য ইচ্ছে জ্বলে ওঠে। এর ফলে আদর্শবাদ আর ক্ষমতালিপ্সার যে মিলন ঘটে, তা যুগে যুগে পুরুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, আজও করে চলেছে।
মধ্য বা আধুনিক যুগের পাঠকের মনে স্পার্টার কিংবদন্তিটি গেঁথে দেওয়ার কাজটি করেছিলেন প্লুতার্ক। তাঁর লেখার সময়ে স্পার্টা ছিল রোম্যান্টিক অতীতের অংশ; আমাদের সময় থেকে কলম্বাস যতটা দূরের, তাঁর সঙ্গে সেই মহান অতীতের দূরত্বও ততটাই ছিল। যাঁরা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস রচনা করেন, প্লুতার্কের লেখা পড়ার সময় তাঁদের খুবই সাবধানী হওয়া দরকার, কিন্তু যাঁরা কিংবদন্তী বা পুরাণের ইতিহাস রচনা করেন, তাঁদের কাছে এ লেখার গুরুত্ব অপরিসীম। জগতের ওপর গ্রিসের প্রভাব সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে নয়; মানুষের কল্পনা, আদর্শ এবং আশা-কে প্রভাবিত করার মাধ্যমেই চিরকাল সে পৃথিবীকে প্রভাবিত করেছে। রোমের তৈরি করা সড়কগুলি আজও মোটামুটি টিকে আছে, তার আইনও বহু আধুনিক আইনসংহিতার জনক, কিন্তু তা হতে পেরেছিল রোমের সেনাবাহিনীর ক্ষমতার কারণে। গ্রিকরা, প্রশংসনীয় যোদ্ধার জাত হলেও, খুব কমই সাম্রাজ্যবিস্তার করেছিল – তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রায় পুরোটাই হত নিজেদের মধ্যেই। হেলেনীয় সংস্কৃতিকে নিকটবর্তী প্রাচ্যে ছড়ানো—যার ফলে মিশর, সিরিয়া আর এশিয়া মাইনরের ভিতরের অংশগুলির সাহিত্যের ভাষা হয় গ্রিক—তার ভার শেষ অবধি পড়েছিল আধা-বর্বর আলেক্সান্ডারের ওপর। গ্রিকদের পক্ষে এ কখনোই সম্ভব ছিল না – সামরিক শক্তির অভাবে নয়, রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবের কারণে। হেলেনীয় সংস্কৃতিকে ছড়ানোর রাজনৈতিক বাহন সর্বদাই অ-হেলেনীয় ছিল; কিন্তু এইসব অন্য দেশগুলিকে গ্রিক মনন এতই প্রভাবিত করেছিল, যে তারা তাদের বিজিত দেশের সংস্কৃতিকে অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়।
গ্রিক জনপদগুলির নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে খেয়োখেয়ি বা যুদ্ধের বৃত্তান্তগুলিকে কোনো ঐতিহাসিকই গুরুত্ব দেন না। বরং, এইসব যখন থামতো, সেই সময়টুকুর স্মৃতি মানুষ কীভাবে বহন করেছিল, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আল্পস পর্বতের গা বেয়ে ওঠার সময় সারাদিনের ঝড় আর তুষারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর পর্বতশীর্ষে চোখ-ধাঁধানো সূর্যোদয়ের স্মৃতি যেভাবে পর্বতারোহীর মনে গেঁথে যায়, এ স্মৃতি অনেকটা সেইরকম। সময়ের সঙ্গে স্মৃতি ক্রমাগত ফিকে হতে থাকার সময়, ঊষার আলোয় উদ্ভাসিত কিছু বিশেষ চূড়ার ছবি মানুষের মনে থেকে যায়, তার সঙ্গে বেঁচে থাকে এই জ্ঞানটুকু – মেঘের আড়ালেও এক মনোরম শোভা বর্তমান, আর যে কোনো সময় মেঘ সরে গিয়ে তা নজরে পড়বে। প্লেটো ছিলেন শুরুর দিকের খ্রিস্টধর্মের কাছে এমনই এক আলোকোজ্জ্বল শীর্ষ, আরিস্তোতলও তা-ই ছিলেন মধ্যযুগের চার্চের চোখে; কিন্তু নবজাগরণের পর মানুষ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় প্লুতার্কে। অষ্টাদশ শতকের ইংরেজ ও ফরাসী প্রগতিশীলদের ওপর যেমন, তেমনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতাদের ওপরও তাঁর অসামান্য প্রভাব ছিল; জার্মানির রোম্যান্টিক আন্দোলনে তো তাঁর প্রভাব ছিলই, পরোক্ষভাবে তিনি আধুনিক জার্মান চিন্তাধারাকেও (অনুবাদক: চল্লিশের দশকের) প্রভাবিত করেছেন। কিছুক্ষেত্রে সেই প্রভাব শুভ, কিছুক্ষেত্রে অশুভ; স্পার্টা বা ল্যুকুরগসের ক্ষেত্রে, এককথায়, অশুভ। ল্যুকুরগসকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই পুনরুক্তি হলেও, সংক্ষেপে এখানে বলবো।
প্লুতার্ক বলছেন – ল্যুকুরগস স্পার্টাকে আইনে বাঁধতে চেয়েছিলেন, তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষণ করতে বহু দূরদেশে ভ্রমণ করেছিলেন। ক্রিট-এর ‘সরল, কিন্তু কড়া’ কানুন তাঁর পছন্দ হয়েছিল [ঙ], কিন্তু আয়োনিয়া-র আইনের ‘অতিরঞ্জন আর অহমিকা’ তাঁর মোটে পছন্দ হয়নি; সৈন্যদলকে জনসাধারণের থেকে আলাদা করে রাখার শিক্ষা তিনি মিশর থেকে পেয়েছিলেন, আর ভ্রমণ থেকে ফিরে সেগুলিকে “স্পার্টায় প্রয়োগ করেন: বণিক, কারিগর আর শ্রমিকদের প্রত্যেককে সমাজে নিজের জায়গা করে দিয়ে তিনি এক সম্ভ্রান্ত প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন।” স্পার্টার নাগরিকদের মধ্যে জমির সমবণ্টন করার মাধ্যমে তিনি “অসচ্ছ্বলতা, ঈর্ষা, লালসা, বিলাস, বিত্তের বাড়বাড়ন্ত আর দারিদ্র্য - এ সব থেকেই নগরীটিকে মুক্ত করেছিলেন”। তিনি মুদ্রা নির্মাণের ধাতু হিসেবে সোনা ও রূপার ব্যবহার বন্ধ করে শুধু লোহা ব্যবহার করতে বলেছিলেন, যাতে “শুধু দশ মিনা-র সমান মুদ্রা একত্র করলে তা বাড়ির গোটা চিলেকোঠাটা দখল করে”। এর মাধ্যমে সকল অতিরিক্ত ও অলাভজনক বিজ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়, কারণ সেসবের কুশলীদের দেওয়ার মতো যথেষ্ট মুদ্রা-ই ছিল না; ওই একই নিয়মের ফলে তিনি সমস্ত বৈদেশিক বাণিজ্যও অসম্ভব করে তোলেন। বাগ্মী, দালাল আর জহুরিরা এই লোহার মুদ্রার কারণে স্পার্টাকে এড়িয়ে চলতো। এর পর তিনি নিয়ম করেন, সমস্ত নাগরিককে একসাথে বসে খেতে হবে, আর সকলেই একই খাবার খাবে।
অন্য সব সমাজ-সংস্কারকের মতোই, ল্যুকুরগস মনে করতেন, শিশুশিক্ষা ‘এতই গুরুত্বপূর্ণ আর দরকারি এক বিষয়, যে, তার জন্যে আইনের সংস্কার হওয়া দরকার’; সামরিক শক্তির অভিলাষী যে কোনো সমাজপতির মতোই তাঁর মূল দুশ্চিন্তা ছিল জন্মহার বৃদ্ধি। “যুবকদের সামনে নগ্ন শরীরে মেয়েরা যেসব নাটক, ক্রীড়া বা নৃত্যগীত প্রদর্শন করতো, তার মূল লক্ষ্য ছিল পুরুষদের বিবাহবন্ধনে বাঁধা: প্লেটো যেমন বলেছেন, তেমন ‘জ্যামিতিক’ কারণে নয়, পারস্পরিক পছন্দ আর তার ফলস্বরূপ প্রেমই এর কারণ”। বিয়ের পরের অন্তত প্রথম কয়েক বছর যে সেটিকে প্রায় পরকীয়ার পর্যায়ে রাখা হত, “তার ফলে উভয়পক্ষের মনেই প্রেমের আগুন জ্বলতো, একে অন্যের প্রতি কামনা জাগিয়ে রাখতো” – অন্তত প্লুতার্কের তা-ই বক্তব্য। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কোনো বৃদ্ধের যুবতী ভার্যা, কোনো যুবকের ঔরসে সন্তানবতী হলে, সেই বৃদ্ধটিকে খারাপ চোখে দেখতো না সমাজ। “স্বামীর অনুমতিসাপেক্ষে কোনো সৎ ব্যক্তি চাইলে আইনত তাঁর স্ত্রী-র সঙ্গে মিলিত হতে পারতো... আইন অনুসারেই, উপযুক্ত সন্তানলাভের আশায় উক্ত স্বামীটি তাকে সহ্য করতো, আর ওই একই উর্বর জমিতে নিজ বীজ রোপণ করতে দিত।” কোনো বোকাবোকা ঈর্ষার ব্যাপার ছিল না, কারণ, “ল্যুকুরগস চাইতেন – শিশুরা কোনো পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে, প্রজাতন্ত্রের সম্পদ হোক, আর সেই লক্ষ্যে তিনি এই এ-ও চাইতেন – যে কোনো পুরুষই পিতা না হয়ে, সবচেয়ে সৎ পুরুষরাই যেন কেবল পিতা হয়।” তিনি আরও বলছেন, এই একই নিয়ম পশুপালকরা নিজেদের পালিত পশুদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন।
কোনো শিশুর জন্ম হলে, পিতা তাকে নিয়ে আসতেন বংশের গুরুজনদের সামনে, পরীক্ষার উদ্দেশ্যে: সন্তান সুস্থ সবল হলে, পিতা তাকে বড় করার জন্যে ফিরে পেতেন; না হলে, তাকে গভীর কুয়োর জলে নিক্ষেপ করা হত। একদম প্রথম থেকে শিশুদের শক্তপোক্ত করার উদ্দেশ্যে কিছু কঠোর নিয়ম পালন করা হত; কিছুক্ষেত্রে তা ভালোই ছিল, যেমন, নবজাতককে নরম কাপড়ে পেঁচিয়ে রাখা হত না। সাত বছর বয়সে ছেলেদের বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে বোর্ডিং ইশকুলে রাখা হত; তাদের ছোট ছোট দলে বা কোম্পানিতে ভাগ করে দেওয়া হত, যার নেতৃত্ব দিত—বোধবুদ্ধি আর সাহসের ভিত্তিতে—তাদের মধ্যেই কোনো একজন। “পুঁথিগত বিদ্যার শিক্ষা ততটুকুই হত – যেটুকু না হলেই নয়, কারণ বাদবাকি সময় তাদের কাটতো কী করে আদেশ পালন করতে হয়, শারীরীক যন্ত্রণা ও কঠোর পরিশ্রম সহ্য করতে হয় আর মূলত কীভাবে রণাঙ্গনে জয়লাভ করা যায়”। অধিকাংশ সময়েই তারা নগ্ন অবস্থাতেই খেলাধুলো করতো; বারো বছর বয়সের পরও তারা চোগা-চাপকান পরতো না; তারা অধিকাংশ সময়েই ‘অভদ্র আর অপরিচ্ছন্ন’ থাকতো, আর বছরের কিছু বিশেষ দিন ছাড়া তারা কখনো স্নান করতো না। তারা ঘুমোতো কাঁটা-মেশানো খড়ের বিছানায়, তাদের চুরি করতে শেখানো হত, কিন্তু ধরা পড়লে শাস্তির ব্যবস্থাও ছিল – চুরি করার জন্যে নয়, নির্বুদ্ধিতার জন্যে।
মেয়েদের না হলেও, ছেলেদের সমকামী সম্পর্ক স্পার্টায় এক মান্য ঐতিহ্য ছিল, আর যৌবনোদ্গমের সময়ে ছেলেদের শিক্ষার এক স্বীকৃত অংশ ছিল। কোনো ছেলের আচরণের কারণে তার প্রেমিকেরও সুনাম বা দুর্নাম হত; প্লুতার্ক লিখছেন, একবার কোনো একটি ছেলে লড়াইয়ে আহত হয়ে চিৎকার করে উঠলে, তার কাপুরুষতার শাস্তি তার প্রেমিককে পেতে হয়েছিল।
এক স্পার্টানের জীবনের কোনো অংশেই খুব একটা স্বাধীনতা ছিল না।
“পূর্ণাঙ্গ পুরুষ হয়ে ওঠার পরও তাদের শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতার চর্চা চলতো। শহরের মধ্যে বাস করার সময়েও, নিজের ইচ্ছানুযায়ী নয়, পুরুষরা আইনত এমনভাবে জীবনধারণ করতে বাধ্য থাকতো, যেন সে সেনাছাউনিতে বাস করছে – যেখানে তার প্রতিটি কর্তব্য নির্দিষ্ট, ঠিক কতটা খোরপোশ নিয়ে তাকে চালাতে হবে, সেটিও নির্দিষ্ট। এককথায়, তাদের সমবেত ধারণা ছিল, যে, নিজের নয়, দেশের হয়ে কাজ করার জন্যেই তাদের জন্ম হয়েছে... ল্যুকুরগস যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আনন্দদায়ক ব্যাপারটি শহরে আমদানি করেছিলেন, সেটি হল নগরবাসীদের এক বিশাল আরাম ও অবসরের সুযোগ দেওয়া – শুধু কোনো নীচ বা ঘৃণ্য কাজ করায় তাদের বারণ ছিল। বিশাল বিত্ত অর্জন করার জন্যে উদয়াস্ত পরিশ্রমেরও অর্থ ছিল না – কারণ, পার্থিব সম্পদের তেমন কোনো গুরুত্ব বা কদর ছিল না। যুদ্ধবন্দি ক্রীতদাস—হেইলোতেসরা—প্রতি বছর স্পার্টানদের জমি চাষ করে তাদের পর্যাপ্ত লাভ এনে দিত।”
প্লুতার্ক আমাদের এক এথেনীয়র গল্প শোনাচ্ছেন, যে চরম আলস্যের কারণে বদনাম কুড়িয়েছিল। তার গল্প শুনে এক স্পার্টানের উক্তি: “ভদ্রলোকের মতো সম্ভ্রান্ত জীবন কাটিয়ে বদনাম কুড়িয়েছে, এমন কাউকে দেখাও তো দেখি!”
প্লুতার্ক বলে চলেন, ল্যুকুরগস “তাঁর নাগরিকদের এমন অভ্যেস করিয়েছিলেন, যে তারা একা বাঁচতে পারতোও না, চাইতোও না। একসঙ্গে দল বেঁধে এমনভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতো, যেন রানী মৌমাছির চারদিকে ঘিরে থাকা কর্মী মৌমাছিরা।”
বাণিজ্য ছাড়া অন্য কোনো কারণে স্পার্টানরা বিদেশভ্রমণ করতে পারতো না, বিদেশীদেরও স্পার্টায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল; ভিনদেশি আচার-ব্যবহার লাকেদাইমোনীয় চরিত্রে কালি লেপে দিতে পারে – এই ছিল ভয়।
স্পার্টানরা যখন ইচ্ছে তখন হেইলোতেসদের খুন করতে পারে – এই আইনের কথা প্লুতার্ক বর্ণনা করলেও, ল্যুকুরগস যে এমন হীন কোনো আইন প্রবর্তন করতে পারেন – এ কথা তিনি বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেছেন। “কারণ ল্যুকুরগস যে এমন নীচ আর ক্ষতিকারক আইন উদ্ভাবন বা প্রবর্তন করতে পারেন, এ আমি মানতে পারি না; ওঁর অন্য সব কাজে যে ক্ষমা আর ন্যায়বিচারের উদাহরণ তিনি রেখেছেন, তা থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উনি নম্র এবং ক্ষমাশীল চরিত্রের ছিলেন।” এই একটি ব্যাপার ছাড়া স্পার্টার সংবিধানের সব দিক নিয়েই প্লুতার্ক প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
যাঁকে নিয়ে আমাদের এই মুহূর্তের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি, সেই প্লেটো-র ওপর স্পার্টার প্রভাব আরও পরিষ্কার হবে তাঁর ‘ইউটোপিয়া’ নিয়ে আলোচনা করলে। এই কাজটি হবে পরের অধ্যায়ে।
— বার্ট্রান্ড রাসেল
A History of Western Philosophy বইটির প্যালারাম-কৃত অনুবাদ
টীকা-টিপ্পনীর ব্র্যাকেটের মধ্যে অক্ষর থাকলে তা রাসেলের আসল ফুটনোট, সংখ্যা থাকলে তা অনুবাদকের পাকামো। ফুটনোট কণ্টকিত লেখাটির জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী, তবে ছবি-ছাবা দিয়ে সেই দোষ স্খালনের একটা চেষ্টা করা হয়েছে।

একক | ৩১ মার্চ ২০২৬ ২২:৩৬739602