এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  ইতিহাস

  • বাংলার স্বায়ত্ব প্রবণতা ও স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্খা - সুলতানি সময়ের প্রেক্ষাপটে (প্রথম পর্ব)

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ইতিহাস | ২২ মার্চ ২০২৬ | ১২৩ বার পঠিত
  • ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনায় বঙ্গ অঞ্চল সেনবংশীয় কর্তৃত্বের অধীন থাকলেও তা কোনও সমন্বিত কেন্দ্রীভূত শাসন-যন্ত্র ছিল না। লক্ষ্মণসেনের সময় (শাসনকাল আনু. ১১৭৮–১২০৬) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মূলত পশ্চিম ও মধ্য বঙ্গের নগর-নিবিড় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল; পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় ভূস্বামী, সামন্ত ও আঞ্চলিক প্রধানদের শক্তি প্রবল ছিল। অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে একটি রাজবংশীয় ধারাবাহিকতা থাকলেও অন্তর্গত কাঠামো ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট—বরেন্দ্র, রাঢ়, বঙ্গ, সমতট প্রভৃতি আঞ্চলিক এককগুলির ঐতিহাসিক স্মৃতি তখনও সক্রিয়।

    এই প্রেক্ষাপটে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি-এর নদীয়া অভিযান কেবল সামরিক ঘটনা নয়; এটি এক ইতিমধ্যেই শিথিল রাজনৈতিক কাঠামোর উপর আকস্মিক আঘাত। মিনহাজ-উস-সিরাজ (তবাকাত-ই-নাসিরি) বর্ণনা করেন যে বখতিয়ার অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে নদীয়া আক্রমণ করেন এবং লক্ষ্মণসেন পূর্বদিকে সরে যান।
    কিন্তু এই বর্ণনাকে সমগ্র বঙ্গ-অধিকার হিসেবে গ্রহণ করা অনুচিত।
    ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়নে দেখা যায়—
    • বখতিয়ারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ মূলত গৌড়-লখনৌতি অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
    • বিক্রমপুর (পূর্ববঙ্গ) সহ বহু অঞ্চল সেন-অবশিষ্ট বা স্থানীয় হিন্দু ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।
    • দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চলে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক পুনর্গঠন অবিলম্বে ঘটেনি।

    অতএব, ১২০৪ খ্রিস্টাব্দকে বঙ্গের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর হিসেবে দেখা যাবে না; বরং এটি এক প্রক্রিয়ার সূচনা।
    বখতিয়ার রাজধানী স্থাপন করেন লখনৌতিতে। এখান থেকে তিনি তিব্বত-অভিযান (আনু. ১২০৬) পরিচালনা করেন—যা ব্যর্থ হয় এবং প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হন। ১২০৬ সালেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এই অল্পসময়ে তিনি কোনও স্থায়ী প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেননি।বঙ্গের নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতি—গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী, জলাভূমি, বর্ষাকালীন বন্যা—উত্তর ভারতের অশ্বারোহী-কেন্দ্রিক সামরিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে সামরিক বিজয় দ্রুত হলেও প্রশাসনিক স্থায়িত্ব অনিশ্চিত ছিল।

    বখতিয়ারের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতিদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহাম্মদ শিরান খলজি ও আলী মর্দান খলজির ক্ষমতালিপ্সা প্রশাসনিক অস্থিরতা বাড়ায়। এই সময় দিল্লিতে কুতুবউদ্দিন আইবক (১২০৬–১২১০) এবং পরে ইলতুৎমিশ  ক্ষমতায় আসেন। ইলতুৎমিশ দিল্লির কর্তৃত্ব সুসংহত করতে সচেষ্ট হন। বঙ্গ তখন কার্যত একটি দূরবর্তী সামরিক প্রদেশ, যেখানে দিল্লির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং স্থানীয় তুর্কি সামরিক অভিজাতরা আধা-স্বাধীনভাবে শাসন করছে। ১২২৫ খ্রিস্টাব্দে ইলতুতমিশ বঙ্গাভিযান পরিচালনা করেন। লখনৌতিতে দিল্লির কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আনু. ১২২৭ সালের মধ্যে বঙ্গ আবার দিল্লি-নিযুক্ত গভর্নরের অধীন। কিন্তু এই পুনর্গঠনও স্থায়ী সমাধান আনেনি।
    কারণ:
    ১. দিল্লি থেকে ভৌগোলিক দূরত্ব।
    ২. নদীপথ-নির্ভর সামরিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা।
    ৩. স্থানীয় ভূস্বামী ও ব্রাহ্মণ-অভিজাত শ্রেণির স্থায়ী সামাজিক প্রভাব।
    ৪. তুর্কি সামরিক নেতাদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
    অতএব, বঙ্গ দিল্লির সাম্রাজ্যিক কাঠামোর অংশ হলেও তার অভ্যন্তরে আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি টিকে থাকে।বখতিয়ারের অভিযানের পর সেন রাজবংশের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষীণ হলেও হিন্দু ভূস্বামী-সামন্তশ্রেণি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি।
    বরং দেখা যায়—
    • পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুর অঞ্চলে সেন-উত্তর হিন্দু প্রধানরা কিছুদিন কর্তৃত্ব বজায় রাখেন।
    • স্থানীয় ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ অভিজাতরা রাজস্ব-সংগ্রহ ও ভূমি-প্রশাসনে ভূমিকা পালন করতে থাকেন।
    • ব্রাহ্মণ্যিক স্মৃতি-আচার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে।
    অর্থাৎ, সামরিক শাসন পরিবর্তিত হলেও সামাজিক-অর্থনৈতিক স্তরে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।এই সময়কার ইতিহাস আমাদের তিনটি মৌলিক বিষয় নির্দেশ করে—
    প্রথমত, বঙ্গকে দিল্লির নিয়ন্ত্রণে আনতে বারবার সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছে।
    দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সামরিক-অভিজাতরাই দ্রুত প্রাদেশিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
    তৃতীয়ত, সামাজিক স্তরে পূর্ববর্তী অভিজাত কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকায় কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যিক আধিপত্য কখনও সম্পূর্ণ সর্বগ্রাসী হয়নি।
    অতএব, ১২০৪–১২২৭ সময়কালকে কেবল ‘বিজয়’ ও ‘অধীনতা’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটি ছিল একটি সীমান্ত বাণিজ্যসমৃদ্ধ  ভূমিতে সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রচেষ্টা, যার অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে তুঘরিলের বিদ্রোহ, বালবনের অভিযান এবং শেষ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহী সময়ের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। বখতিয়ার খলজির অভিযান বঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত বটেই, কিন্তু তা কোনও সমাপ্তি নয়—বরং দীর্ঘ রূপান্তর-প্রক্রিয়ার সূচনা। ১২০৪ থেকে ১২২৭—এই সময়ে বঙ্গ দিল্লির সাম্রাজ্যিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হলেও তার ভূগোল, সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং প্রাদেশিক সামরিক শক্তির কারণে এক অস্থির, অর্ধ-স্বায়ত্ত অঞ্চল হিসেবেই রয়ে যায়।এই অন্তর্গত দ্বৈততা—সাম্রাজ্যিক অধীনতা ও প্রাদেশিক শক্তির সমান্তরাল উপস্থিতি—পরবর্তী একশো বছরে আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

    ইলতুৎমিশের বঙ্গাভিযানের মাধ্যমে আনুমানিক ১২২৫–১২২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বঙ্গ পুনরায় দিল্লিভিত্তিক সাম্রাজ্যিক শাসনের অন্তর্ভুক্ত হলেও এই পুনর্গঠন কোনওভাবেই স্থায়ী বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। Iltutmish লখনৌতি বা গৌড়কে কেন্দ্র করে বঙ্গকে একটি সাম্রাজ্যিক প্রদেশ হিসেবে পুনর্গঠিত করেন এবং সেখানে সামরিক গভর্নর নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু এই প্রশাসনিক পুনর্গঠন ছিল মূলত সামরিক আনুগত্যের উপর নির্ভরশীল; বঙ্গের বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার, গঙ্গা–পদ্মা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জটিল নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতি, এবং স্থানীয় ভূস্বামী ও অভিজাত গোষ্ঠীর সামাজিক ভিত্তি দিল্লির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণকে শুরু থেকেই সীমিত করে দেয়। ফলে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দের পর বঙ্গের ইতিহাস মূলত এমন এক সাম্রাজ্য-প্রদেশের ইতিহাস, যেখানে দিল্লির প্রতিনিধিরা নামমাত্র সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব বহন করলেও বাস্তবে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ক্ষমতাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে থাকেন।
    ইলতুৎমিশের শাসনকালেই বঙ্গের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে লখনৌতি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। গঙ্গার উপত্যকায় অবস্থিত এই নগর উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল, পশ্চিমের রাঢ় এবং পূর্বদিকে পদ্মা অববাহিকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি কৌশলগত কেন্দ্র ছিল। এখান থেকেই দিল্লি-নিযুক্ত গভর্নররা রাজস্ব সংগ্রহ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করতেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের ক্ষমতা প্রধানত পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল; পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ নদীবহুল অঞ্চল—বিশেষত বিক্রমপুর, সমতট ও মেঘনা অববাহিকার অংশ—দীর্ঘ সময় ধরে আংশিক স্বায়ত্ত আঞ্চলিক প্রধানদের প্রভাবাধীন ছিল। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা বঙ্গকে দিল্লির সাম্রাজ্যিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করলেও একে কখনও সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের অধীন আনতে দেয়নি।

    ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে দিল্লির রাজনীতিতে যে দীর্ঘ অস্থিরতার সূচনা হয় তা বঙ্গের পরিস্থিতিকে আরও পরিবর্তিত করে। সিংহাসনে ধারাবাহিকভাবে কয়েকজন স্বল্পস্থায়ী শাসকের আবির্ভাব ঘটে—তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজিয়া সুলতানা এবং পরবর্তী পর্যায়ে নাসির মাহমুদ। এই সময় জুড়ে দিল্লির বাস্তব ক্ষমতা প্রায়শই শক্তিশালী সামরিক অভিজাতদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, ফলে দূরবর্তী প্রদেশগুলির উপর নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। বঙ্গের মতো সীমান্তপ্রদেশে এই পরিস্থিতি গভর্নরদের হাতে অধিক স্বাধীনতা এনে দেয়। দিল্লির নির্দেশ পালন করা হলেও বাস্তবে তারা নিজস্ব সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির উপর নির্ভর করে শাসন পরিচালনা করতে শুরু করেন।
    ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বঙ্গের গভর্নরদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তুঘরাল খান। তাঁর শাসনকালে বঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামো একদিকে দিল্লির আনুগত্য বজায় রাখলেও অন্যদিকে আঞ্চলিক সামরিক উদ্যোগের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তুঘরাল কামরূপ অঞ্চলের দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এই ধরনের অভিযান অনেক সময় দিল্লির প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হতো, যা নির্দেশ করে যে বঙ্গের গভর্নররা ক্রমশ নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। একই সময়ে তিরহুত ও উত্তর বিহারের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সীমান্ত রাজনীতিও লখনৌতি-ভিত্তিক প্রশাসনের অংশ হয়ে ওঠে।

    এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পেছনে বঙ্গের সামাজিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেন-পরবর্তী যুগে হিন্দু ভূস্বামী, ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ অভিজাত শ্রেণি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; বরং তারা গ্রামীণ সমাজ ও ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক সমাজ, রাঢ় অঞ্চলের ভূস্বামী গোষ্ঠী এবং বিক্রমপুরের আঞ্চলিক প্রধানরা অনেক ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যিক প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অবস্থান করত। ফলে দিল্লি-নিযুক্ত গভর্নরদের প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবে এই স্থানীয় শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না। এই সহাবস্থানই বঙ্গের রাজনৈতিক কাঠামোকে বহুকেন্দ্রিক করে তোলে—যেখানে সাম্রাজ্যিক প্রতিনিধির পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

    ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন গিয়াসউদ্দিন বলবন, যিনি সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর কেন্দ্রীভূত নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকালে সীমান্তপ্রদেশগুলিতে বিদ্রোহ দমন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বঙ্গের ভৌগোলিক দূরত্ব এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর কারণে এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বরং এই সময়ে বঙ্গের গভর্নররা সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেন। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি দেখা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে, যখন লখনৌতির গভর্নর তুঘরাল  ক্রমশ দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে মুক্ত করার পথে অগ্রসর হন। প্রথমদিকে তিনি সাম্রাজ্যিক প্রতিনিধিরূপেই শাসন পরিচালনা করলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব সামরিক শক্তি সংগঠিত করেন এবং প্রাদেশিক ক্ষমতাকে দৃঢ় করেন। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তিনি কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দিল্লির সুলতানের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। এই বিদ্রোহ কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং ১২২৭ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বঙ্গের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যে স্বায়ত্ত প্রবণতা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল তারই একটি সুস্পষ্ট পরিণতি।

    বালবনের অভিযানের পর বঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠিত হলেও এর অন্তর্গত রাজনৈতিক প্রবণতা মৌলিকভাবে অপরিবর্তিত থাকে। ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহী গভর্নর তুঘরাল কে দমন করে দিল্লির সুলতান বলবন লখনৌতি (গৌড়) অঞ্চলে সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর পুত্র বুগরা খান কে বঙ্গের শাসক নিযুক্ত করেন। বুগরা খানের শাসনকাল বঙ্গের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী অধ্যায়, কারণ তিনি দিল্লির আনুগত্য বজায় রাখলেও ক্রমশ লখনৌতি-কেন্দ্রিক একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে শুরু করেন। তাঁর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রধানত বরেন্দ্র অঞ্চল—করতোয়া, মহানন্দা ও গঙ্গার মধ্যবর্তী উর্বর সমভূমি—এবং পশ্চিম রাঢ় অঞ্চলের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু পূর্বদিকে পদ্মা–মেঘনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ নদীজাল, বিশেষত বিক্রমপুর ও সমতট অঞ্চল, লখনৌতি প্রশাসনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে আংশিক স্বায়ত্ত অবস্থায় ছিল। ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে বালবনের মৃত্যুর পর দিল্লির সিংহাসন নিয়ে যখন সংকট দেখা দেয়, তখন বুগরা খানকে রাজধানীতে এসে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বঙ্গেই অবস্থান করেন। এই সিদ্ধান্ত প্রাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবোধের এক প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি নির্দেশ করে যে লখনৌতি-ভিত্তিক প্রশাসন ইতিমধ্যেই নিজস্ব আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছিল।

    ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে খলজি বংশের উত্থানের পর বঙ্গের সঙ্গে সাম্রাজ্যিক সম্পর্ক একটি নতুন রূপ লাভ করে। নতুন সুলতান জালালুদ্দিন খলজি সীমান্তপ্রদেশগুলিতে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতার নীতি গ্রহণ করেন। এই সময় লখনৌতিতে বালবনের পুত্র বুগরা খানের উত্তরাধিকার সূত্রে শাসন বজায় থাকলেও বঙ্গ কার্যত দিল্লির প্রত্যক্ষ নজরদারি থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান করছিল। বুগরা খানের পুত্র কাইকুবাদ যদিও দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তবু বঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামো লখনৌতি-কেন্দ্রিক প্রাদেশিক শক্তির উপর নির্ভরশীল রয়ে যায়। এই সময় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিজ উৎপাদন এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীপথের নিয়ন্ত্রণ লখনৌতির গভর্নরদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের সাতগাঁও বন্দর আরব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, যার ফলে প্রাদেশিক প্রশাসন ক্রমশ আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

    পরবর্তী সময়ে সিংহাসনে আরোহণকারী আলাউদ্দিন খলজি সাম্রাজ্যকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেন এবং প্রশাসনিক সংস্কার প্রবর্তন করেন। তাঁর শাসনকালে দিল্লির সাম্রাজ্যিক মনোযোগ প্রধানত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও দাক্ষিণাত্যের দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল—গুজরাট, মালওয়া ও দাক্ষিণাত্যের অভিযানে বিপুল সামরিক শক্তি ব্যয়িত হয়। এর ফলে বঙ্গের মতো দূরবর্তী প্রদেশে প্রত্যক্ষ নজরদারি তুলনামূলকভাবে শিথিল হয়ে পড়ে। এই সময় লখনৌতি অঞ্চলের শাসনভার বিভিন্ন তুর্কি সামরিক অভিজাতের হাতে ন্যস্ত ছিল, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জাফর খান এবং পরবর্তী পর্যায়ে নাসিরউদ্দিন নুসরাত খান। এই গভর্নররা সাম্রাজ্যিক প্রতিনিধিরূপে শাসন করলেও বাস্তবে তাদের প্রশাসন ক্রমশ আঞ্চলিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। লখনৌতির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মূলত উত্তর-পশ্চিম বঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল এবং গঙ্গা অববাহিকার উপর সীমাবদ্ধ ছিল; পূর্বদিকে পদ্মা–মেঘনা অববাহিকার অঞ্চলগুলি—বিশেষত বিক্রমপুর ও সোনারগাঁও—স্থানীয় শক্তিকেন্দ্রের প্রভাবাধীন ছিল।

    এই সময় বঙ্গের রাজনৈতিক কাঠামোকে একটি বহুকেন্দ্রিক শক্তি-ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা যায়। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল ছিল লখনৌতি প্রশাসনের প্রধান ভিত্তি, যেখানে কৃষিজ উৎপাদন থেকে বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব ছিল। পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল—বিশেষত অজয় ও দামোদর নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল—স্থানীয় ভূস্বামী ও সামরিক অভিজাতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, যারা প্রায়শই সাম্রাজ্যিক প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে রাজস্ব প্রদান করত। অপরদিকে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর, সমতট ও মেঘনা অববাহিকার বিস্তৃত অঞ্চল নদী ও জলাভূমিতে পরিপূর্ণ হওয়ায় সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনীর পক্ষে সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন ছিল। এই অঞ্চলে স্থানীয় হিন্দু ভূস্বামী ও আঞ্চলিক প্রধানরা তাদের সামাজিক প্রভাব বজায় রাখে এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। ফলে লখনৌতি-ভিত্তিক গভর্নরদের ক্ষমতা কার্যত এই স্থানীয় শক্তির সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল ছিল।

    খলজি যুগের বঙ্গ তাই একদিকে সাম্রাজ্যিক প্রশাসনের অংশ, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের ক্ষেত্র। লখনৌতি, বরেন্দ্র ও রাঢ় অঞ্চলে দিল্লি-নিযুক্ত গভর্নরদের কর্তৃত্ব থাকলেও পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার বিস্তৃত অঞ্চল স্থানীয় শক্তিকেন্দ্রের প্রভাবাধীন ছিল। সাম্রাজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে এই দূরত্ব, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং বহুকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামো বঙ্গের প্রশাসনকে ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সত্তায় রূপান্তরিত করে। এই প্রক্রিয়াই চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যখন দিল্লির তুঘলক শাসনের সময় সাম্রাজ্যিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল—লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও—ক্রমশ পৃথক ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে, যার শেষ পরিণতি ছিল পরবর্তী সময়ে ইলিয়াস শাহ র অধীনে একটি স্বাধীন বঙ্গ সুলতানির উত্থান।

    কামরূপ ও উত্তর-পূর্ব বঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে যে “ভূঁইয়া” বা আঞ্চলিক ভূস্বামী-প্রধানদের শক্তি দেখা যায়, তাও সমসাময়িক বঙ্গীয় রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। “ভূঁইয়া” শব্দটি মূলত ভূমি-অধিকারী বা সামরিক ভূস্বামী বোঝাতে ব্যবহৃত হতো এবং মধ্যযুগীয় বঙ্গ ও অসম উভয় অঞ্চলে এটি একটি রাজনৈতিক উপাধি হিসেবে প্রচলিত ছিল। ভূঁইয়া শব্দটির উৎস সংস্কৃত ভূমি থেকে, যার অর্থ ভূমি বা জমি, এবং এই উপাধিধারীরা সাধারণত বহু গ্রাম বা একটি আঞ্চলিক ভূখণ্ডের উপর সামরিক ও রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন।
    ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচীন কামরূপ রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের পর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্য ও পশ্চিম অংশে—বিশেষত বর্তমান কামরূপ, দরং, নগাঁও এবং শোণিতপুর অঞ্চলে—একাধিক ক্ষুদ্র ভূস্বামী প্রধানের উদ্ভব ঘটে। এই প্রধানদের সম্মিলিত শক্তিকেই ঐতিহাসিকভাবে “বারো ভূঁইয়া” বা ভূঁইয়া সংঘ বলা হয়। “বারো” শব্দটি প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নির্দেশ করে না; বরং বহু স্বাধীন প্রধানের একটি আলগা সামরিক জোট বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই ভূঁইয়া প্রধানরা সাধারণত ব্রহ্মপুত্রের উত্তর ও দক্ষিণ তীরের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত এবং প্রত্যেকে কয়েকটি গ্রাম বা আঞ্চলিক একক—যাকে চাকলা  বলা হতো—এর উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখত। এই ভূঁইয়া শক্তিগুলি মূলত প্রাচীন কামরূপীয় রাজনৈতিক কাঠামোর ভাঙনের পর অবশিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির উত্তরসূরি ছিল। যখন পশ্চিমে কামতা রাজ্য (যার রাজধানী পরে কামতাপুরে স্থানান্তরিত হয়) এবং পূর্বদিকে আহোম, চুটিয়া ও কাছাড়ি শক্তির উত্থান ঘটে, তখন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যভাগে ভূঁইয়া প্রধানরা একটি রাজনৈতিক “বাফার অঞ্চল” তৈরি করে। তাদের শাসন কোনও একক রাজতন্ত্র ছিল না; বরং এটি ছিল একাধিক স্বাধীন প্রধানের আলগা কনফেডারেসি, যারা বাহ্যিক আক্রমণের সময় একত্রিত হতো কিন্তু শান্তিকালে নিজ নিজ অঞ্চলে স্বতন্ত্র শাসন বজায় রাখত।

    বঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভূঁইয়া শক্তির তাৎপর্য ছিল সীমান্ত রাজনীতিতে। লখনৌতি-ভিত্তিক বঙ্গীয় শাসন—যা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লি সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল—উত্তর-পূর্ব দিকে সরাসরি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনি। কামরূপ অঞ্চলে এই ভূঁইয়া প্রধানরা কার্যত এক ধরনের মধ্যবর্তী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে কাজ করত, যারা কখনও কামতা রাজ্যের সঙ্গে, কখনও অন্য স্থানীয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখত এবং বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বকে সেই অঞ্চলে প্রবেশ করতে বাধা দিত। ফলে বঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি একটি বহুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠে, যেখানে স্থানীয় ভূঁইয়া শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে আঞ্চলিক স্বায়ত্ততার ধারাকে বজায় রাখে। 
    এই প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে কামতা, কোচ এবং আহোম শক্তির উত্থানের পূর্বে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার এই ভূঁইয়া কনফেডারেসিগুলিই ছিল অঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। বঙ্গের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ সবসময় ঘটেনি, কিন্তু সীমান্তবর্তী এই বিকেন্দ্রীভূত শক্তির উপস্থিতি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে গৌড় বা লখনৌতি-ভিত্তিক প্রশাসনের ক্ষমতা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গভীরে প্রসারিত হতে পারেনি। এই ভূঁইয়া কাঠামো তাই বঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যযুগীয় সীমান্ত রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হয়—যা বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক শক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক স্বায়ত্ত প্রবণতার আরেকটি শক্তিশালী উদাহরণ।

    চতুর্দশ শতাব্দীর তুঘলক যুগে বঙ্গ ও দিল্লি সাম্রাজ্যের সম্পর্ক একাধিক সামরিক সংঘর্ষ, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান আত্মনির্ভরতার মধ্য দিয়ে গঠিত হয়। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠা করেন গিয়াসউদ্দিন তুঘলক। তাঁর শাসনকালে পূর্বভারতের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা দেখা গেলেও বঙ্গ বাস্তবে একটি অস্থির প্রান্তিক প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। লখনৌতি (গৌড়) ছিল দিল্লি-নিযুক্ত গভর্নরদের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র, কিন্তু পদ্মা–গঙ্গা অববাহিকার বাইরে পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত ঢিলেঢালা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও অঞ্চলের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ঘিয়াসউদ্দিন তুঘলক স্বয়ং পূর্বভারতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং বাহাদুর শাহকে বন্দি করেন, কিন্তু এই সামরিক সাফল্য বঙ্গকে দীর্ঘমেয়াদে দিল্লির নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়নি।

    ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন মোহাম্মদ বিন তুঘলক। তাঁর শাসনকালে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি অত্যন্ত বৃহৎ হয়ে ওঠে এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে প্রশাসনিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। বঙ্গেও সেই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ লখনৌতির শাসক  দিল্লির আনুগত্য ত্যাগ করে স্বাধীন শাসনের ঘোষণা দেন। একই সময়ে পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও অঞ্চলে ক্ষমতায় আসেন ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ, যিনি মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতগাঁও অঞ্চলেও পৃথক ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। ফলে চতুর্দশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের শেষভাগে বঙ্গ কার্যত তিনটি প্রধান রাজনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়ে—লখনৌতি, সোনারগাঁও এবং সাতগাঁও—যা দিল্লি সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ক্রমশ স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হচ্ছিল।

    এই বহুকেন্দ্রিক পরিস্থিতির মধ্যেই আবির্ভূত হন সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, তিনি প্রথমে লখনৌতির ক্ষমতা দখল করেন (১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ) এবং পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে সাতগাঁও ও সোনারগাঁও উভয় অঞ্চলকে নিজের অধীনে এনে সমগ্র বঙ্গকে একত্রিত করেন। এই একীকরণের ফলে বঙ্গ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সুলতানি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা দিল্লির জন্য সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বঙ্গের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক সূত্র—বিশেষত শামস-ই-সিরাজ আফিফের তারিখ-ই-ফিরোজশাহী—অনুসারে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ বঙ্গ আক্রমণ করেন এবং গৌড় অঞ্চলে অগ্রসর হন। ইলিয়াস শাহ সমতলভূমিতে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে একটি শক্তিশালী দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন, যা ইতিহাসে একডালা দুর্গ নামে পরিচিত। এই দুর্গটি ছিল প্রাকৃতিক জলাভূমি, নদী ও পরিখাবেষ্টিত প্রতিরক্ষামূলক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত, ফলে দিল্লির বৃহৎ সেনাবাহিনীর পক্ষে দীর্ঘ অবরোধ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে দীর্ঘ অবরোধ সত্ত্বেও দুর্গটি দখল করা সম্ভব হয়নি এবং বর্ষাকাল ও রসদসংকটের কারণে ফিরোজ শাহ প্রত্যাবর্তন করেন।

    ১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ আবারও বঙ্গাভিযান পরিচালনা করেন, তখন বঙ্গের সুলতান ছিলেন ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দর শাহ আবারও বঙ্গীয় বাহিনী একডালা দুর্গকে প্রতিরক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং দিল্লির সেনাবাহিনী দীর্ঘ অবরোধ সত্ত্বেও কার্যকর সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারে না। পরিণামে এক ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে দিল্লি কার্যত বঙ্গের স্বাধীন অবস্থান মেনে নিতে বাধ্য হয়। একডালা দুর্গের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে—কিছু গবেষক এটি উত্তরবঙ্গের পান্ডুয়া–গৌড় অঞ্চলের নিকটে স্থাপন করেন, অন্যরা নদীবাহিত পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির কারণে এর অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন—কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি বঙ্গের প্রতিরক্ষামূলক সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
    এই সমগ্র তুঘলক যুগের ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করে যে বঙ্গ কেবল একটি দূরবর্তী সাম্রাজ্যিক প্রদেশ ছিল না; বরং এটি ছিল এমন একটি অঞ্চল যেখানে স্থানীয় সামরিক শক্তি, নদীবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অভিজাতদের সমন্বয়ে এক স্বতন্ত্র ক্ষমতাকাঠামো গড়ে উঠছিল। লখনৌতি, সোনারগাঁও ও সাতগাঁওয়ের বহুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং একডালা দুর্গকে ঘিরে সংঘটিত প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত দিল্লি সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বকে কার্যত সীমাবদ্ধ করে দেয় এবং চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বঙ্গকে একটি স্বাধীন সুলতানি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

    ইলিয়াস শাহী যুগে বঙ্গের আঞ্চলিক ক্ষমতার দৃঢ়তার  গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে পান্ডুয়ায় নির্মিত আদিনা মসজিদ। এই বিশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন বঙ্গের সুলতান সিকান্দার শাহ, প্রায় ১৩৭৩–১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। স্থাপত্যগত দিক থেকে এটি তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ ছিল এবং এর নির্মাণ কেবল ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বঙ্গের স্বাধীন সুলতানি ক্ষমতার একটি প্রতীকী ঘোষণা হিসেবেও বিবেচিত হয়। দিল্লি সাম্রাজ্যের স্থাপত্যরীতির প্রভাব থাকলেও আদিনা মসজিদের পরিসর, পরিকল্পনা এবং নির্মাণব্যাপ্তি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে বঙ্গীয় সুলতানরা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছিলেন। বিশেষত তুঘলক শাসকদের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বঙ্গের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশকে স্থাপত্যের মাধ্যমে দৃশ্যমান করার প্রয়াস এই নির্মাণে প্রতিফলিত হয়। ফলে আদিনা মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; বরং চতুর্দশ শতকের বঙ্গীয় সুলতানি ক্ষমতার স্বায়ত্তচেতনা এবং দিল্লি-কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে..
    (চলবে – পরবর্তী পর্বে সুলতানি উত্তর এবং মুঘল পর্বে বঙ্গের স্বায়ত্বচেতনার আলোচনা হবে)

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২২ মার্চ ২০২৬ | ১২৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন