শাপলা আর শাহবাগ, এই দ্বন্দ্ব শাপলার জন্ম থেকেই ছিল, আছে, থাকবেই। কিংবা এর শুরু হয়ত শাপলার জন্ম থেকে না। জন্ম আরও আগে। শাপলা চত্বর মুভমেন্ট শুধু আগের সেই দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা। ৫ মে ২০১৩ সালে কী হয়েছিল? এর আগে পরের কাহিনী কী? আজকে এগুলা দেখছি নানাজনে নানা রকমে বর্ণনা করছে। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক প্রধানকে দেখলাম বেশ মধুর ভাষায় শাপলাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। তাত্ত্বিক নানা শব্দ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছে তখনের সব দোষ আসলে লীগেরই।
আমি শাহবাগের একেবারে ফুট সোলজার ধরণের কর্মী ছিলাম। কেউ আমাকে ধরে নিয়ে যায় নাই, আমি গিয়ে কোন দল, গ্রুপের সাথে যুক্ত হই নাই। ৫ ফেব্রুয়ারি যে আন্দোলনের শুরু তার দুই একদিন পরে শাহবাগ যাই, গিয়ে আর ফিরি নাই। রাতদিন ওইখানেই পড়ে ছিলাম। এসএম হলে এক বন্ধু থাকত, ওর কাছে গিয়ে একটু ঘুমানো, দুপুরের খাওয়া দাওয়া, গোসল করে আবার আমি শাহবাগে। আমার বন্ধু বান্ধবও কেউ ছিল না আমার সাথে। যে দুই একজন আসত, তারা এসে সমর্থন জানিয়ে, কিছুক্ষণ থেকে, আমাকে উৎসাহ দিয়ে চলে যেত। আমি খুব বেশি রাজনীতি বুঝি নাই, লীগ বিএনপি বুঝি নাই। আমি সত্যটা বুঝার চেষ্টা করেছি। যে সত্য আমি বুঝেছি তা হচ্ছে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ আমাকে করতেই হবে না হলে আমি কোনদিনই আর নিজের কাছেও জবাবদিহি করতে পারব না।
আমার মত আরও কয়েক লাখ লোক ছিল তখন শাহবাগে। ভুল বলছি না, সংখ্যাটা লাখই। তারা কেন গিয়েছিল? হুট করেই কাদের মোল্লা ভি চিহ্নই এর পিছনের কারণ? ওইটা ছিল স্ফুলিঙ্গ। বারুদ জমা হয়েছিল আরও বহু আগে থেকেই। সেখানেই আসলে শাপলার গল্প। কেউ কেউ বলে ২০০১ সালের নির্বাচন, জামাতকে সাথে নিয়ে বিএনপির সরকার গঠন। নিজামি, মুজাহিদির মত টপ লেবেলের রাজাকারদের মন্ত্রী বানানো, জাতীয় পতাকা গাড়িতে তাদের চলাফেরা, এগুলা অনেকেই ট্রিগার করে। আমার ক্ষেত্রে এইটা আরও একটু আগেই হয়। শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে ৯০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তৈরি গণ আদালতের জন্য দেশদ্রোহী মামলা দেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। আমি তখন না বুঝলেও যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে একাত্তরের দিনগুলি পড়ি, যখন রুমিকে আমার নায়ক মনে হচ্ছিল তখন আমি জানি যে এই কিংবদন্তীকে দেশদ্রোহীর মামলা দিয়েছিল বিএনপি সরকার! আমার পথ তখনই তৈরি হয়ে যায়। এরপরে রাজাকারদের মন্ত্রী বানানো, তাদের আস্ফালন এগুলাও কাজ করে। ১৩ সালে শাহবাগে যে বিস্ফোরণ তার পিছনে এগুলা কাজ করেছে। জমা হয়েছে মানুষের মনে ক্ষোভ। তরুণ একটা প্রজন্ম তৈরি হইছিল যারা যে কোন মূল্যে রাজাকারদের বিচার করতে চায়। ২০০৮ সালে লীগ তরুণদের এই পালসটা বুঝতে পারে ভালো করে। তারা নির্বাচনী ইশতিহারে যুক্ত করে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এই দাবিকে।
এই যে তরুণ একটা প্রজন্ম তারা আবার এক হচ্ছিল নিজের অজান্তেই। ইন্টারনেট চলে আসছে তখন মানুষের হাতের কাছে। ব্লগ হয়ে উঠে সেই সময় যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ব্লগে জমে উঠে তর্ক বিতর্ক। এবং এই মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পন্থিদের শক্তি ছিল দুর্দান্ত। পরবর্তীতে জামাত শিবিরের লোকজনও হাজির হয়। তখন আরও জমে উঠে ব্লগের তর্ক। এখানে আরও একটা বিষয় বলা দরকার। এই ক্ষেত্রে লীগের লোকজনের সাথে বামেরাও যোগ দেয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তখন সবাই এক। তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই বিশাল অনলাইন যোদ্ধারা তৈরি হয়েই ছিল, নিজেরাও জানে না কিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল তারা। এরপরেও আসে ৫ ফেব্রুয়ারি।
শাহবাগ আন্দোলনের শুরুতে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ভিড়তে দেওয়া হত না। কিন্তু শেষে দেওয়া হয়। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে যেহেতু লীগের লোকজনই ছিল বেশি তাই এইটা হওয়ারই ছিল। বিএনপি তখনও জামাত প্রেমে মশগুল। পুরো একটা প্রজন্ম বিরোধী হয়ে যাচ্ছে তা তারা বুঝে নাই বা বুঝতে চায় নাই। শুরু হল জঘন্য রাজনীতির খেলা। আমার দেশ পত্রিকা ছাপায় দিল শাহবাগে বেলেল্লাপানা হচ্ছে, রাস্তাঘাটে কনডম পড়ে আছে, এখানে বসে রাতদিন ইসলামের নামে, রসুলের নামে কুৎসা গাওয়া হয়। এরা সবাই নাস্তিক! নাস্তিক যে ব্লগাররা ছিল তাদের আগের লেখা খুঁজে এনে হাজির করল তারা। শাপলার সূচনা হল এই সময়।
যে বিএনপি রাজাকাদের ত্যাগ করে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করবে বলে ভাবছি আমরা সেই বিএনপি আমার দেশ পত্রিকায় ইমান আনল। খালেদা জিয়া বলে দিল এগুলা সব নাস্তিক! এই সময়ে আমার দেশ পত্রিকা টানা যে পরিমাণ মিথ্যাচার করেছে তা যে কোন পত্রিকার ইতিহাসে মিথ্যাচার করার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। এবার মঞ্চে হাজির হল হেফাজতে ইসলাম। তারা ইসলামকে হেফাজত করবে! চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার শফি হুজুর নানান বক্তব্য দিলেন। ৬ এপ্রিল ঢাকা জনসমাবেশ করতে ঢাকা রওনা দিলেন। সারাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসার ছাত্র ঢাকার পথে রওনা হল। এর আগে (মার্চে) একজন ব্লগারকে কোপানো হয়ে গেছে। আমরা শাহবাগে জানাজা পড়ছিলাম। মানে আমার দেশ পত্রিকার ফলাফল আসা শুরু হয়েছে ততদিনে।
৬ এপ্রিল সকাল থেকেই আমরা সজাগ। হেফাজত শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। তখন গণজাগরণ মঞ্চের রমরমা অবস্থা নাই। বিভক্তির বিষ তখন ঢুকে গেছে পুরো দমে। নাস্তিক আস্তিক তর্ক তো আছেই, আরও আছে নানা মতবাদের প্রশ্ন, আছে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব। এরপরেও আমরা একটা অংশ সেখানেই থেকে গেছিলাম। হেফাজতকে মোকাবেলা করতে হবে দেখে তখন অনেকেই আবার ফিরে আসছিল মঞ্চে।
সেদিন কিছুক্ষণ পরে পরেই শুনি এই যে আসতেছে হেফাজতে ইসলাম শাহবাগের দিকে। আমি কোনদিন মিটিং মিছিলে যাই নাই। মারামারি করার ছেলে আমি না। জীবনে দুই একবার মারামারির যে ঘটনা তা হচ্ছে আমিই মার খেয়ে বাড়ি ফিরেছি! সেই আমি বসে আছি রাস্তায়। রোড ডিভাইডারের মধ্যে গাছ লাগানো ছিল, কাছের সাথে বাঁশ দিয়ে খুঁটি দেওয়া ছিল। আমি দৌড়ে এগুলা একটা বাঁশ নিলাম, আমার সাথে আরেকজন, আমরা দুইজন একটা বাঁশ ভেঙে দুই টুকরা করে নিলাম। একবার হেঁটে মৎস্য ভবনের দিকে যাই, আবার হেঁটে শাহবাগ আসি। এসে বসে থাকি, উত্তেজনায় টগবগ করে রক্ত ফুটছে। আবার টিএসসির দিকে যাই। আবার শাহাবাগ। এই চলল সারাদিন। মঞ্চে কে কী বলছে তা ঠিকমত শুনিইও নাই। পুরো বিষয়টা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। বিকালের দিকে পাকা খবর আসল তারা আগানো শুরু করছে এদিকে।এক সাংবাদিক মোটর সাইকেলে করে এসে খবর দিল এইটা। তারা এদিকে আসতেছে। পুলিশ সামনে আমরা পিছনে। আমরাও আগানো শুরু করলাম। মৎস্য ভবনের দিক থেকে আসতেছে। আমরা আগাচ্ছি। পুলিশ সামনে থেকে কিছু টিয়ার শেল মারল। হুট করেই কী হল জানি না, সবাই দৌড় দিল, মানে আক্রমণ! পুলিশকে অতিক্রম করে আমরা রমনা পার্কে ঢুকে গেলাম। হেফাজতের কর্মীরা শেষ মুহূর্তে সাহস হারায়। তারা শাহবাগে না এসে কাকরাইলের দিকে চলে যেতে চাচ্ছিল সম্ভবত। আমাদের শুরু ধাওয়া দেওয়া। এখন অনেকেই বলে যে ওরা আসলে আক্রমণ করতে আসে নাই, এদিক দিয়ে চলে যেতে চাচ্ছিল! মানে যুক্তির কোন আগামাথা নাই আর কী! এখানে, এই শাহবাগকে ঘিরেই ওদের এই আন্দোলন, এর উপর দিয়ে ওরা চলে যাওয়ার জন্য আসতেছিল? সারাদিন তাণ্ডব চালিয়ে এখন এই পথে বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিল ওরা?
আমি এলোপাথাড়ি দৌড় দিয়ে রমনার এমাথা ওমাথা কাওকে নাগালে পেলাম না। সবাই আমার চেয়ে ফাস্ট! আর যারা দৌড়ানই খাচ্ছে তারা যথারীতি আরও ফাস্ট! প্রচুর টুপি পাঞ্জাবি দৌড়াচ্ছে এইটাই দেখতে পেলাম। ফিরলাম আবার শাহবাগে। হেফাজত আগে থেকেই ১৩ দফা দিয়েছিল। প্রায় শরিয়া আইনের মত ছিল ব্যাপার। ১৩ দফা নিয়েই তারা ঢাকা আসে। সেইদিন সমাবেশ করে তারা ৫ মে আবার আসবে এই ঘোষণা দিয়ে যায়।
৫ মে মূলত তাণ্ডব চালায় হেফাজত। ঢাকার প্রবেশ মুখ গুলো দখল নেয়। হেফাজতে ইসলামের আড়ালে সরকার পতনের নকশা নিয়ে বিএনপি জামাত হাজির হল মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। পুরো মতিঝিল এলাকায় তাণ্ডব চালায় এই কোমলমতি মাদ্রাসার ছাত্ররা। কোরান শরিফের আগুনে পুড়া ছবি দেখছি আমরা। গাছ কেটে, দোকান ভেঙ্গে, আগুন দিয়ে বীভৎস একটা পরিস্থিতি তৈরি করে। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি থেকে রাস্তায় পড়ে থাকা আমরা একটা সিঙ্গেল মানুষের কোন ক্ষতি জেনেবুঝে করছি এমন কেউ বলতে পারবে না। আমি অন্তত এমন কিছু দেখি নাই। ৫ মে আমরা শাহবাগেই থাকি। সারাদিন উৎকণ্ঠায় ছিলাম। মতিঝিল আগুনে পুড়ছে খবর পাচ্ছিলাম। পুলিশ মৎস্য ভবনের সামনেই ব্যারিকেড দিয়েছিল সম্ভবত। ওরা এদিকে আসেনি।
শাপলা চত্বরে বসে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় হেফাজত। দাবি মানা না হলে তারা ফিরবে না, সেখানেই অবস্থান করবে, এমন ছিল তাদের বক্তব্য। যথারীতি এর পিছনে জামাত বিএনপির হাত ছিল। পরে আমরা জানছি সেই সময় তারা কে কোন মন্ত্রণালয় নিবে এইটাও ঠিক করে ফেলেছিল! মানে নিশ্চিত সরকার পতন হতে যাচ্ছে, তারা নিয়ে নিবে ক্ষমতা। এই সময় আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ সংবাদ সম্মেলন করে একটা ঐতিহাসিক বক্তব্য দেন। আজকে যারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলছে তারাও সেদিন সৈয়দ আশরাফের ওই বক্তবেকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে এগুলা কোন আল্টিমেটাম সরকার পাত্তা দিচ্ছে না। বলছেন হেফাজতের পিছনে জামাতের শক্তি, রাজাকারদের শক্তি আছ তা তারা জানেন। শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাবেশ শেষ করে ঢাকা ছাড়তে বলেন তিনি। তাদের প্রতি এই এই শান্তিপূর্ণ আহবান যেন দুর্বলতা না মনে করেন তাও সতর্ক করে দেন তার বক্তব্যে। সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকা ত্যাগ করতে হবে না হলে সরকার ব্যবস্থা নিবে। হেফাজতের নেতারা সেই কথা শুনেনি। তারা অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপরের কাহিনীই হচ্ছে শাপলা খালি করার কাহিনী। এর যে কত রকমের গল্প আছে। হাজার হাজার মানুষ মারছে, কেউ লক্ষ লক্ষ বলে ফেলে। আজকে অনেকেই দেখি বলতে চায় তখন নাকি খবর প্রকাশ করতে দেয় নাই। সরকার তাই খবর বের হয় নাই। বিবিসির সাবির মুস্তাফা, যিনি বিবিসি বাংলার প্রধান ২০০১-২০২৩ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। তিনি চ্যানেল আইয়ে একটা সাক্ষাৎকার দেন। এখন যদিও তাঁকেও দালাল ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। তবুও তার কথা এখন বলছি কারণ তার কথায় যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয়েছে। তার কথার সত্যতা আমি নিজেই পরীক্ষা করে দেখেছি। মানে তখন যখন আমি মতিঝিলে আবার যাই দুই একদিন পরে তখনও আমার কাছে এই প্রশ্ন গুলো এসেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে যা দাবি করা হচ্ছে তা অসম্ভব। সাবির মুস্তফা বলেছেন, - "ঐ রাতে আমাদের সংবাদদাতা কাদির কল্লোল শাপলা চত্ত্বরে ছিলেন রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত। এবং আমি লন্ডন থেকে সার্বক্ষণিক তার সাথে টেলফোনে যোগাযোগ রাখছিলাম। কারণ, আমি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে, বিশেষ করে টুইটারে আমি দেখছিলাম যে, অনেকে পোষ্ট করছে যে, ১০০ মারা গেছে, ২০০ মারা গেছে, ৫০০ মারা গেছে, লাশ নিয়ে যাচ্ছে, রাস্তা ধুয়ে ফেলছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তো, আমি তাকে বারবার ফোন করে বলছিলাম যে, আপনি কী দেখছেন? খেয়াল রাখেন, এরকম রিপোর্ট আসছে। আপনি কিছু দেখছেন কি না এরকম? তো, সে বললো যে না, এখানে কোন লাইফ ফায়ারিং হয় নি। এবং এখানে কেউ, কোন কেউ মারা গেছে বলে আমি দেখি নি। কোন দেওয়ালে কোন গুলির চিহ্ন নেই, রাস্তায় কোন রক্তের চিহ্ন নেই। আমিতো এখানে পুলিশ অভিযানের শুরুর আগে থেকেই আছি এখানে। সো, সরেজমিনে যে ছিল আমাদের রিপোর্টার, এবং কাদের কল্লোল একমাত্র না, আরও অনেক রিপোর্টার ছিল ওখানে, টিভি ক্যামেরা ছিল। কেউ কিন্তু ঐ শাপলা চত্ত্বরে রাত ১২টার অভিযানে কোন মৃত্যু দেখে নি। কিন্তু দেদার বলা হচ্ছে শাপলা চত্ত্বর গণহত্যা। সো, এখন আমরা কী করবো? আমরা বিবিসি, আমরা যেটা যাচাই করেছি, যেটা সরেজমিনে দেখেছি, আমাদের রিপোর্টার, আমরা সেটাই রিপোর্ট করেছি। সো, এটা নিয়ে যেই যাই বলুক না কেন; যে পরবর্তীতে বলুক যে, বিবিসি বাংলা সঠিক চিত্র দেয় নি, বা বিবিসি বাংলা গণহত্যা ধামাচাপা দিয়েছেন, আই ডোন্ট কেয়ার। কারণ, আমরা জানি যে, শাপলা চত্ত্বরে কী হয়েছে সেদিন।" এরপরে তিনি বলেন যে যদি প্রচুর মানুষ মারা গেছে এইটা সত্য হয় তাহলে সেই অনুযায়ী গুলি হওয়ার কথা। সেই গুলির ছাপ কই? এইটা আমি যখন পরে শাপলা চত্বরে যাই তখন আমিও খেয়াল করছিলাম। যে পরিমাণ মানুষ মারা গেছে বলে প্রচার করা হয়েছে তার সিকি ভাগ মারতে যে গুলি করার কথা তাতে আশেপাশের যত অফিস, বিল্ডিং আছে স ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার কথা। দেওয়ালে গুলির চিহ্ন কই? আমি সেই সময় ঘুরেঘুরে বুঝার চেষ্টা করেছিলাম। এই উত্তর তখনও পাই নাই এখনও পাই নাই। কিন্তু এখন নতুন করে এই জিনিস সামনে আনা হচ্ছে। রাজনীতির নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হবে এখন এই জিনিস।
হেফাজতের শাপলা চত্বর কাণ্ড যে সামনে আসবে আবার তা অনুমেয় ছিল। তাই আশ্চর্য হই নাই। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে সেদিন মানে ৫ মে ২০১৩ সালে রাতে ৩২ জনের মৃত্যু হইছে। এখন চার্জশিট দিবে, মামলা হবে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আরও বেশ কিছু মন্ত্রীদেরকে হয়ত জড়ানো হবে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিও হয়ত ফাঁসবে কিছু। এইটা হওয়ারই ছিল।
সেদিন এই মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে যারা আবোলতাবোল বুঝ দিয়ে ঢাকায় এনেছিল, ক্ষমতার মোহে যারা এই বাচ্চাদেরকে বলি দিতে দ্বিধা করেনি, তাদের বিচার কেউ করবে না? বিএনপি এত বড় দল, তাদের কোন কর্মী শাপালায় ছিল? তারা অপেক্ষা করতেছিল কখন সরকার পতন হয় আর কখন তারা ক্ষমতার ভাগ পায় তার। সেদিন শাপলার পরাজয় আর শাহবাগের জয় নতুন এক বীজ বপন করেছিল। জয়ীরা আত্ম অহংকারে সব ভুলে গেছিল। আর শাপলা আবার প্রস্তুত হচ্ছিল। লীগ পেয়েছিল তার বিনা ভোটে নির্বাচন করার শক্তি, সেও ক্ষমতার দাপটে ভুলে যায় সব। হেফাজতে ইসলামকে যা চাইছে তাই দিয়েছে। এতই ভয় পাইল তাদেরকে যে সব কিছুই মেনে নিলো সরকার। ব্লগার মারা হতে থাকল, সরকার হেফাজতের সুরেই কথা বলতে থাকল। মাদ্রাসার ছাত্রদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পথ খুলে দিল। কওমি জননী পদবি নিয়ে যাদের মন জুগাতে চেয়েছিল তারা ছিল শাপলা, শাপলা শেষ পর্যন্ত তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে থেমেছে। কিংবা বলা চলে শাপলার যুগেই আমরা চলছি এখন। যারা সেই সময় পথে নেমেছিল প্রগতির প্রশ্নে তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে যে পথে হেঁটেছিল সেই পথ গিয়ে শেষ হয়েছে শাপলা চত্বরে। আমরা সেদিন ভেবেছিলাম আমরা জয়ী হয়েছি কিন্তু আসলে খেলা তখন শেষ হয় নাই! দ্বিতীয়ার্ধে ডজন ডজন গোল খেয়ে মাথা চুলকাচ্ছি আমরা। আরেকটা ম্যাচের জন্য তৈরি হব, নতুন খেলোয়াড় কই? আমরা যেমন দীর্ঘদিন থেকে তৈরি হয়েছিলাম একটা লক্ষে। নতুন খেলোয়াড়রাও তৈরি হয়েছে, তবে লক্ষ ভিন্ন, তারা পামির কোলা খাইতে চায়, আফগানিস্থানের স্বপ্ন দেখে দিনে দুপুরে। এরা আমাদের খেলোয়াড় না। কাজেই আমাদের নতুন খেলোয়াড় যতক্ষণ পর্যন্ত না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত চুপচাপ গ্যালারিতে বসে থাকা ছাড়া আর কী বা করার আছে?
তবে এইটাও ঠিক বাংলাদেশে সব সময়ই শাপলা শাহবাগের দ্বন্দ্ব থাকবে। আজও কেউ একটু সংস্কৃতমনা হলে, কোন মেয়ে একটু সাহসী হলে তাকে শাহবাগি ট্যাগ দেওয়া হয়। টিপ পরেছে? শাহবাগি নিশ্চিত! পয়লা বৈশাখ নিয়া মাতামাতি? রমনা বটমূলে যায়? ছায়ানটে যায়? নিশ্চিত শাহবাগি। তারা এইটা বুঝে না এইটা বলে আসলে শাহবাগকেই শক্তিশালী করছে তারা। তাই কেউ শাপলার মন জুগাতে প্রাণপণে অস্বীকার করে নিজের পরিচয়। কেউ গর্ব করে বলে সে শাহবাগি। এখন হাজার ইনকিলাব মঞ্চ, কয়েকশ হাদি এসে চিল্লাফাল্লা করলেও এই জিনিস আর পরিবর্তন হবে না। শাহবাগ এই কারণেই টিকে যাবে। এই কারণেই আবার জাগরণ হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।