নির্বাচনের আছে আর কয়েক ঘণ্টা। মানে এখন দিনের হিসাবকে ঘণ্টায় বলাই যায়। এত কাছে আসার পরেও এখনও যখন পর্যন্ত ভোট সুষ্ঠু ভাবে হয়ে ফলাফল প্রকাশ না হচ্ছে ততক্ষণ আমি নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী না। যখন তখন এই নির্বাচন বাতিল হয়ে যেতে পারে। বাতিল হওয়ার মাল মশলা সমস্তই তৈরি আছে। তারপরেও অল্প কয়েক ঘণ্টা আগে যখন নতুন করে লীগের ভোট টানার আগে একটা টানাটানি শুরু হয়েছে তা নিয়ে একটু কথা না বললেই না।
টানাটানির মধ্যেই কারা হেফাজতে মারা গেছেন সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন। এই নিয়ে অন্তত একশজনের উপরে মারা গেলেন লীগের কর্মী কারা হেফাজতে! রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুতে মির্জা ফকরুল শোক বার্তা দিয়েছেন। তার বাড়িতে গিয়েছে। অথচ সত্য হচ্ছে এই লোকে ভুয়া মামলায় জেলেও পাঠিয়েছেন মির্জা সাহেবই! এইটাই হচ্ছে আইরনি! এই আইরনি সব জায়গায়ই হচ্ছে। আমার আসনে যে এখন পিপি, আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে সাথে নিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে লীগের কর্মীদের মামলা তুলে নেওয়া হবে, কাওকে ধরবে না পুলিশ, তিনি নিজেই এই সমস্ত মামলার ব্যবস্থা করেছেন, উচ্চ হারে চাঁদা খেয়েছেন! লীগের লোকজন এখন কী খেয়ে মাতাল হলে এদের কথায় নাচবে? সব জায়গায় একই অবস্থা।
নির্বাচনী হাওয়ায় হুট করেই লীগের ভোটের কথা মনে পড়েছে এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর। যে কথা গুলো আমরা এতদিন বলার চেষ্টা করে গেছি তা এখন সবাই মিলে বলছে। লীগ করা অপরাধ না, লীগের রাজনীতি করা কোন পাপ না। কেউ অন্যায় করলে, কেউ আইন ভঙ্গ করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। এইটা তো সবার জন্যই প্রযোজ্য। লীগ বা দল বলে তো আলদা করা নাই বাংলাদেশের আইনে। কিন্তু আমরা এই কয়েক মাসে তাই দেখছি। লীগ করলে কোন চার্জশিট লাগে না, মামলা লাগে না, এমনেই তুলে নেওয়া যায়। এই ভয়ংকর একটা সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে তা এখন ভোটের মাঠে এসে ভোট চাইলেই ভেঙ্গে যাবে? জনগণ এতই বোকা?
পরিস্থিতিটা এমন করে রাখা হয়েছে যে শুধু লীগের রাজনীতি না, বিনা প্রশ্নে কাওকে আটক করলে যদি কেউ প্রশ্ন তুলে তাহলে তাঁকেও জেলে নেওয়া হয়েছে। আপনি কোনদিন এই সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাবেন না ব্যারিস্টার সুমনের আটকের ব্যাপারে! সুমনের নাম বলবেন সমস্ত বড় বড় বুলি ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়বে। কোন যুক্তি দিয়েই ব্যাখ্যা করতে পারবেন না শাহরিয়ার কবিরের আটককে। এমন আরও অসংখ্য নমুনা আছে। কত কত সাংবাদিক আছে। কয়েকদিন আগে আনিস আলমগিরকে কেন ধরা হয়েছে তা কোন যুক্তিবাদী মানুষকে বুঝাতে পারবে সরকার? অথচ নীরবতাই হিরণ্ময় নীতিতে ছিল সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। একটা শব্দ করে নাই কেউ। এখন লীগের লোকের ভোটের কথা মনে হইছে? আর না হয় আরেকটা কাজ করতে পারে ইন্ট্রেরিম, একটা আইন তৈরি করতে পারে, যে বা যারা লীগের আমলে লীগের পক্ষে কথা বলেছে, তারা প্রত্যেকে অপরাধী। এই আইনের ধারায় এখন যাদের শুধুমাত্র লীগের সমর্থক ছিল, অন্য কোন অপরাধ নাই তাদের জেলে রাখাটা জায়েজ হবে। আর না হয় শাহরিয়ার কবির লাঠি নিয়ে মারামারি করতে গেছে, সাকিব আল হাসান বিদেশ থেকে ব্লুটুথে মানুষ মেরেছে এমন মামলা টিকবে না, আমার মত কেউ না কেউ প্রশ্ন তুলবেই। কিন্তু যদি এমন একটা আইন বানাতে পারে যেমন লীগের দোসর আইন, তাহলে ঠিক আছে। তখন সব এই আইনে জায়েজ হবে। প্রধান বিচারপতিকে আর হত্যা মামলায় আটক করতে হবে না।
একদম সাধারণ আবেগ থেকে ৩২ নাম্বার ভাঙার প্রতিবাদ করেছে মানুষ। তাকেও ট্যাগ দেওয়া হয়েছে! এবং এইটা করেছে সবাই মিলে। কেউ শক্ত করে প্রতিবাদ করেনি। তখন কারো কাছে মনে হয় নাই এইটা ভুল হচ্ছে, কারো কাছে মনে হয় নাই এইটা অন্যায় হচ্ছে। বাধা দেওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না, কেউ কেউ উৎসাহ দিয়েছে এই কাজে। এখন মনে হচ্ছে লীগের নেতাকর্মীদের বাহিরেও সাধারণ মানুষের ভোট আছে? ওইটা আপনার দরকার? এতদিন কী মনে হয়েছে? লীগ মানেই শেষ? লীগ মানেই হাজার হাজার কোটি টাকার চুরি? লীগ মানেই সব পাপিষ্ঠ? ভোটের টানে এই নীতি ভুলে গেলেন?
লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও দ্বিধা করেনি এরা। লীগের শক্তি যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ তাই মুক্তিযুদ্ধকেই শেষ করে দেও! এইটা ছিল নীতি। এই নীতিতে এতদিন সবাই সায় দিয়ে গেছে। আজকে হুট করেই মনে হচ্ছে যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করছে কেউ কেউ? একটা দল মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে লীগকে ব্যবহার করেছে। আমরা লীগের বিরোধিতা করছি মুক্তিযুদ্ধ না, এইটা ছিল যুক্তি। আরেকটা একই কাজ করেছে তাদের যুক্তি ছিল আমরা আমরা লীগকে দুর্বল করতে মুক্তিযুদ্ধকে আক্রমণ করেছে, আর না হলে আমরা তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক! ফলাফল মুক্তিযুদ্ধ শেষ! এই দেড় বছর মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক কলঙ্কজনক সময় হয়ে রইল। লীগ দাবি করত মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র তাদের হাতেই নিরাপদ, আপনারা এই ধারণাকে পোক্ত করলেন। মুক্তিযুদ্ধকে আরও ঠেলে দেওয়া হল লীগের দিকে আর এখন ভোট চাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের নামে! আশ্চর্য!
লীগকে নির্বাচন করতে দেওয়া হল না। যুক্তি তারা এতগুলো মানুষ মেরেছে, শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের দলকে স্থগিত করে রাখা হবে। কেন? এই দায়টা জনগণের ঘাড়ে দিতে ভয় পাইলেন কেন? এত মানুষ মরেছে লীগের হাতে তাহলে জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে। নির্বাচনের মাঠে গো হারা হেরে বিদায় নিবে। এবং এইভাবে বিদায় নিলে চিরতরে বিদায় হবে। যেমন মুসলিম লীগের ক্ষেত্রে হয়েছে। এখানেও তাই হত। ভয় পাইলেন কেন? জনগণ বুঝে না? সব আপনেরা বুঝেন? আর মানুষ মারার অপরাধের কথা বললে আমি যদি জামাতের নাম নেই তখন আবার বেজার হন কেন? তখন এই যুক্তি কই যায় আপনাদের? জামাত কোন শাস্তি খেটে আসছে? না মুক্তিযুদ্ধে জামাতের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ আছে আপনাদের? ঢাকায় তো শুনছি মুক্তিযুদ্ধের মার্কা দাঁড়িপাল্লা স্লোগান চলছে! তেমন কিছুই মাথায় আপনাদের?
অনেক আগে একবার আমার বন্ধুরা আমাকে রেখে কই জানি ঘুরার পরিকল্পনা করে ঘুরেতে চলে গেল। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভবও ছিল না। কিন্তু আমি মন খারাপ করলাম। কারণ আমার না-টা আমাকে করতে দেয় নাই বলে! আমি যাব না এইটা আমাকে বলতে দিবে না আমাকে? এখানেও তেমনই, জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে লীগকে এইটা জনগণকেই করতে দেন। আপনে জনগণের হয়ে কেন বলে দিচ্ছেন? এর তো দরকার ছিল না। লীগকে দৌড়ের ওপরে রেখে এখন লীগের ভোটারদেরকে সলিম বুঝ দেওয়ার যে চেষ্টা এইটা হাস্যকর।
লীগ সমর্থকেরা কেন যাবে ভোট দিতে? কোন কারণ নাই যাওয়ার। যে বিষয় গুলো লিখলাম সেগুলোর বাহিরেও যদি আমি হিসাব করি তাহলেও আপনি ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার কোন যুক্তি খুঁজে পাবেন না। এই নির্বাচনে যদি ব্যাপাক হারে ভোটার অনুপস্থিতি হয় তাহলে এইটা লীগের জন্য সুবিধা। লীগ ছাড়া নির্বাচন করলে কেমন নির্বাচন হয় দেখো! এমন কিছু বলার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয় এতে। তো লীগের সমর্থকেরা এইটা বাস্তবায়ন করতে কেন চেষ্টা করবে না? যদি দেখা যায় লীগ ছাড়াই প্রচুর ভোট কাস্টিং হয়েছে তাহলে তা লীগের জন্য বিপদজনক। লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কঠিন হয়ে যাবে তখন। এইটা একটা সহজ সরল সমীকরণ। না বুঝার তো কিছু নাই। উল্টো এইটা কাজটাতে মানে নির্বাচন থেকে লীগকে দূরে রাখায় সম্পূর্ণ বিপরীত একটা ধারণা মানুষের মনে স্থায়ী হল। লীগকে রাখে নাই কারণ লীগকে রাখলে লীগ জিতত! থাইল্যান্ডে এমন হয়েছে না? এখানেও তেমন হত কী? এই ভয়েই লীগকে বাহিরে রাখা হল?
এই প্রসঙ্গে সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হয়েছে জুলাইয়ে জনগণ এই ম্যান্ডেট দিয়েছে! এইটা একটা কথার মারপ্যাঁচ। জুলাইয়ে কেউ কোন একটা পক্ষও বলে নাই তারা মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষে। কেউ বলে নাই তারা বঙ্গবন্ধুকে এই দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। তারা বরং স্লোগান দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই! তো কীভাবে বুঝবেন জনগণের সায় ছিল আপনাদের এই নানান উপরি কাজের? জুলাই আন্দোলন জুড়ে এত এত ধোঁকাবাজি হয়েছে যে এতে জনগণের সায় আছে বলার উপায় নাই। জনগণকে বোকা বানিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লাশ, রক্ত, মৃত্যু এইসব মেনে নিতে পারেনি। সরকারের পতন হয়েছে। এখন যেটাকে জুলাই সনদ বলা হচ্ছে, তখন কেউ একজন এমন একটা সনদ ঘোষণা করে আন্দোলনের ডাক দিত, দেখতাম কয়জন তাতে সায় দেয়! দেখার আছে না? এখন আপনারা, যাদের নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠছে তারা একটা কাগজ ধরায় দিয়ে বলছেন এতে জনগণ জুলাইয়ে সায় দিয়েছে! এ কেমন কাণ্ড?
ভোট কাস্টিং নিয়েই আমার এই লেখার দ্বিতীয় ভাবনাটা বলি এবার। যে যে আসনে ভোট কাস্টিং কম হয়ে সেখানে সেখানে জামাতের প্রার্থী সুবিধা পাবে। কেন? কারণ লীগ বা বিএনপির সমর্থকেরা সমর্থন দিয়েই খালাস। এইটা নিয়ে খুব বেশি খাটা খাটনি করতে রাজি না তারা। এই দৃশ্য আমরা লীগের আমলে প্রতিনিয়ত দেখছি। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচন, লীগের যে নিজস্ব ৩০/৩৫% ভোটার আছে তারাও ভোট দিতে যাইত না। এরা গেলেও ভোটের চেহারা অন্য রকম হত। কিন্তু যাওয়ার চিন্তাই করে নাই। আমার ধারণা বিএনপির ক্ষেত্রেও তাই হবে। কেন্দ্রে গণ্ডগোল হবে, বাড়িতে কাজ আছে, ঘুমাই এমন নানা যুক্তি দিয়ে বহু ভোটার যাবে না। এইখানে বিপরীত চিত্র দেখা যাবে জামাতের ক্ষেত্রে। জামাতের ভোটার তো যাবেই, সাথে করে ওর বউ বাচ্চা, ভাই ভাইস্তা সবাইকে নিয়ে যাবে এবং ভোট নিশ্চিত করবে। তাই যত কমই ভোট পড়ুক তাতে জামাতের ভোট কমবে না। সেই ক্ষেত্রে জামাত আগায় যাবে ওই সব আসনে। এবার যেহেতু সামগ্রিক ভোটের দামও আছে, সেই অনুযায়ী উচ্চকক্ষে ( হ্যাঁ কে বিজয়ী ধরেই বললাম!) সিট পাবে, তাই এই ভোট গুলো বেশ কাজে দিবে জামতের।
এই হল কথা। জামাতের লোকজন দিয়ে পূর্ণ দেশের প্রায় প্রতিটা জেলার প্রশাসন। এমন অবস্থায় নির্বাচন কতখানি সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। প্রশ্ন থাকছেও। সেক্ষেত্রে একটা সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে আশা জনগণ দেখে আসছে এতদিন সেই আশা আপাতত আর পূরণ হচ্ছে না। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও লম্বা সময়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।