এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অন্যান্য

  • অভিমুখ বদল : ডান বাম একাকার

    মালবিকা মিত্র
    অন্যান্য | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮২ বার পঠিত
  • একটা দল কোন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, আর দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে লক্ষ কোটি সমর্থক বিচার বিশ্লেষণ না করে সেই সিদ্ধান্তের অনুসারী হল, এমন সুসংগঠিত দল সিপিআইএম নয়। কিছু নেতার মস্তিষ্কে একটা কৌশল উদ্ভূত হতেই পারে -- আগে রাম পরে বাম। কিন্তু সেটা লক্ষ কোটি কর্মী সমর্থক অনুসরণ করলো। কর্মী সমর্থকরা কেউ কলুর বলদ নয়। আমার কাছে এটা বিগত পাঁচ বছরের ধাঁধা, ২০১৯ এর পর থেকেই ভাবছি যে কিভাবে সিপিএমের প্রায় ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ ভোট। বিজেপির ঘরে চলে গেল। অংকের নিয়মে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সিপিএমের ভোট যত কমেছে, বিজেপির ভোট ঠিক ততই বেড়েছে। তৃণমূলের ভোট কম বেশি একই আছে। এক থেকে দুই শতাংশ বেড়েছে।

    আবার একটা দ্বিতীয় চিন্তাও মগজে ঠাঁই নিয়েছে। রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় কায়েম থাকার ফলে কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে একটা মত তৈরি হয়। হতে বাধ্য, যেটাকে আমরা অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর বলে থাকি। সেই হিসেবে কিছু ভোট তো তৃণমূলের কমে যাবার কথা। কই কমলো না তো। আসলে খালি চোখে যেটা স্পষ্ট প্রতিভাত হচ্ছে, সেটাই সত্য নয়। আমার বিশ্বাস তৃণমূলের নিজের ভোট ১/২ শতাংশ কমেছে। আবার অন্যদিকে "আগে রাম পরে বাম" তত্ত্বকে কিছু বাম সমর্থক মানতে পারেনি। তারা বিজেপিকে প্রতিহত করতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। আবার কংগ্রেসের সাথে বামের জোটটাকে কংগ্রেস কর্মীদের একাংশ মন থেকে মানেনি। আর "আগে রাম পরে বাম" তো বহু কংগ্রেস কর্মীদের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। ফলে কিছু ভোট এদিক-ওদিক হয়েছিল। আমরা মোট সংখ্যাটা দেখে এবং শতাংশের হিসাব দেখে এই গতিপ্রকৃতিটা ধরতে পারছি না। চৌবাচ্চা থেকে কতটা জল বেরিয়েছে, আর কতটা জল ঢুকেছে, সেটা বুঝিনি বলেই সোজা চোখে দেখেছি চৌবাচ্চার জল একই আছে।

    এসব কথা বলার কারণ হলো, একটা দলের নেতৃত্ব ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। তারা রুদ্ধদ্বার কক্ষে চেয়ার টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মাটির কাছাকাছি যে জনগণ, তারা গ্রাউন্ড রিয়ালিটি থেকে পরিস্থিতি ও কর্তব্য নির্ধারণ করে। কখনো কখনো দুটোই মিলে যায়, আবার বহু সময়ে মেলে না। ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত ছিল .....not to participate, rather oppose the Quite India movement. In spite of that, a huge number of local leaders and caders of communist party and kisaan sabha participated and even took leading role in the movement. হিতেশ রঞ্জন সান্যাল, জ্ঞানেন্দ্র নাথ পান্ডে প্রমুখরা "ইন্ডিয়ান নেশন ১৯৪২" গ্রন্থে মেদিনীপুর, বালিয়া, জামশেদপুর, আমেদাবাদ, নানা অঞ্চলের ক্ষেত্র সমীক্ষা করে এই সত্য তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলনেও পার্টির উঁচু তলার সিদ্ধান্ত ও পার্টির আঞ্চলিক নেতাকর্মীদের মনোভাব সে কথাই প্রমাণ করে। একটি সজীব প্রাণবন্ত সংগঠনে এই পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। একমাত্র প্রাণহীন তাসের দেশই "চলে নিয়ম মতে"।

    প্রশ্ন তবু পিছু ছাড়ে না। কেরলে তো সিপিআইএম ক্ষমতায়, সেখানে "আগে রাম পরে বাম" এর প্রশ্ন নেই। তাহলে কেন সেখানে সিপিএমের ভোট কমলো প্রায় চার শতাংশ এবং বিজেপির ভোট বাড়লো প্রায় দুই শতাংশ। এটা আমি সাম্প্রতিক স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন নির্বাচনের তথ্য বলছি। এমনকি খোদ তিরুবনন্তপুরম কর্পোরেশনে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। এটা কিভাবে সম্ভব হল? পশ্চিমবাংলায় না হয় বোঝা গেল বামেদের ক্ষমতা লাভের আশা সুদূর পরাহত। তাই তারা বর্তমান সরকারকে সরানোর উদ্দেশ্যে ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে সমর্থন করছে। কিন্তু কেরলে তো সিপিএম ক্ষমতায় আছে। সেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেস। বিজেপি একটি তৃতীয় শক্তি। তাহলে বিজেপি কিভাবে সিপিএমের শক্তি ক্ষয় করে নিজে বৃদ্ধি পাচ্ছে? কারণ সিপিআইএম দলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে কংগ্রেস। তাই কংগ্রেসকে দুর্বল করার জন্য খুব স্বাভাবিক সমীকরণ সিপিএমের একাংশের ভোট বিজেপির ঝুলিতে চলে যাচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনেও গেছে। আরো উল্লেখযোগ্য, সারা ভারতে আরএসএসের সবচেয়ে বেশি শাখা সংগঠন ক্ষুদ্র রাজ্য, বাম শাসিত কেরলে। বিষয়টা তাই আলোচনার দাবি রাখে।

    আমার মনে হয়েছে আদর্শগত না হলেও কাঠামোগত ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি ও ফ্যাসিস্ট পার্টির একটা সাদৃশ্য আছে। আমি পাঠককে স্মরণ করতে বলবো ১৮৭০ এ জার্মানির ঐক্য সাধনের পর দ্রুত শিল্পায়ন সম্পন্ন করা এবং ১৯১৭ এর রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েতে দ্রুত শিল্পায়ন সম্পন্ন করা, এই দুইয়ের মধ্যে একটা কাঠামোগত সাদৃশ্য ছিল। ভেবে দেখুন ১৮৭০ থেকে ১৯০০ মধ্যে মাত্র ৩০ বছরে জার্মানির শিল্পায়ন আকাশ ছোঁয়া। ৩০০/ ৩৫০/ ৩৭০ শতাংশ শিল্পবৃদ্ধি, যা ছিল অস্বাভাবিক। যার ফলে ইউরোপ তথা বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেল। পরিণতিতে দেখা দিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। লেনিন জার্মানির এই মডেলকে সোভিয়েতে প্রয়োগ করলেন। লেনিনের কথায় -- It is Germany. Here we have “the last word” in modern large-scale capitalist engineering and planned organization, subordinated to 'Junker-bourgeois imperialism'. Cross out the words in colon, and in place of the ‘militarist, Junker, bourgeois, imperialist state’ put also a state, but of a different social type, of a different class content — a Soviet state, that is, a proletarian state, and you will have the sum total of the conditions necessary for socialism. অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি শ্রেণীগতভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হলেও ফ্যাসিস্ট ও সোসালিস্ট সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোটি কিন্তু সাদৃশ্যপূর্ণ। আর কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট পার্টির শ্রেণীভিত্তিটি যদি সামান্যতম ভেজাল থাকে, তাহলে ফ্যাসিস্ট আর কমিউনিস্ট এর কোন পার্থক্যই থাকে না।

    সমাজতন্ত্রে কমিউনিস্ট পার্টি মেটিরিয়াল ইন্সেন্টিভ এর পরিবর্তে মানুষকে মরাল ইন্সেন্টিভ দিয়ে কাজ করায়। সোভিয়েত পিতৃভূমিকে জীবন দিয়ে রক্ষা করা, কমিউনিস্ট আদর্শ, বিশ্ববিপ্লব, দুনিয়ার মজুর এক হও, শোষণহীন মজুর রাজ কায়েম, এই সমস্ত ইন্সেন্টিভ মন্ত্রের মত কাজ করে। লক্ষ্য করবেন ফ্যাসিস্টদের ক্ষেত্রেও উগ্র জাতীয়তাবাদ, উগ্র জাতিবিদ্বেষ, বিধর্মীর প্রতি বিদ্বেষ, আমরা ওরা র চেতনা, মানুষকে অন্ধ করে রাখে। ক্ষুধার্ত মানুষও ক্ষুধা নিবৃত্তির পরিবর্তে রাম মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের জন্য কর সেবায় যাত্রা করে। এখানে এসে কোথাও একটা জোরালো বিশ্বাস উভয়ের মধ্যেই কাজ করে। ঠিক সেই কারণেই যখন সমাজতন্ত্রে মানুষের মোহভঙ্গ হয়, তখন লেনিন স্তালিনের শুধু ভাবমূর্তি নয়, মূর্তিও ভেঙে পরে। হিটলার মুসোলিনির ক্ষেত্রেও অন্ধভক্তদের অন্ধত্ব কেটে যাওয়ার পরেই কি করুন পরিণতি ঘটেছিল একবার ভাবুন। এখানেই আমার মনে হয় দুটি মতাদর্শের কাঠামোগত সাদৃশ্য।

    এই সাদৃশ্যের কারণেই, সিদ্ধান্তগুলি কি অদ্ভুতভাবে বিপরীত মুখী হলেও, কোথায় গিয়ে তারা এক হয়ে যায়। ভাবুন না, আমরা বামপন্থীরা মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য রচনা করেছি, গেয়েছি। বলেছি ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়। আমরা আমাদের দলীয় কার্যালয়ে রক্ত পতাকা উড়িয়েছি, জাতীয় পতাকা নয়। স্বাধীনতা দিবস পালন করিনি, বরং বলেছি লালকেল্লা পর লাল নিশান, মাঙ্গ রহা হ্যায় হিন্দুস্তান। বিপরীতে অবস্থান করেও, একইভাবে আরএসএস কোনদিন ত্রিবর্ণ পতাকাকে সম্মান করেনি। তারা ভারতের এই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। তারা মনে করে এটা পশ্চিমের কাছে সাংস্কৃতিক অধীনতার নামান্তর। তারা এক গ্লোরিয়াস পাস্ট, গৌরব জনক অতীতে, মনুবাদের যুগে স্বাধীনতা খুঁজে পায়। ভিন্ন অবস্থান থেকে হলেও, মোটা দাগে যেটা দাঁড়ায়, এই স্বাধীনতা মিথ্যা।

    মালা যখন গাঁথা হয়, তার সম্পূর্ণ দুটি বিপরীত প্রান্ত থাকে। তারপর কি অদ্ভুতভাবে দুই বিপরীত প্রান্ত একবিন্দুতে মিলে গিয়ে মালাটি সম্পূর্ণ হয়। তখন আর কোনটা লাল কোনটা গেরুয়া চিহ্নিত করাই যায় না। মনে হয় এই কাঠামোগত সাদৃশ্যের কারণে অতি সহজে ২০১৯ সালে পাইকারি হারে বাম এর ভোট রামে হস্তান্তর হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তা আর ফিরে আসেনি। সেখানেই থেকে গেছে। কারণ তাদের কাছে রাম রাজ্য আর বাম রাজ্যের মধ্যে কোন ডিস কমফোর্ট জোন ছিল না। ওটাকেও কমফোর্ট জোন অনুভব করেছে। সেই কারণেই গণশক্তির প্রথম পাতায় ২০২৪ এ লোকসভা নির্বাচনের দিন ফুল পেজ মোদিজীর ছবি সহ সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। কোন অসুবিধে হয় না। সেই কারণে কেরলে আদানির সাথে ডিপ সী পোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের কৃতিত্বকে ছাপিয়ে, পাতা জোড়া নরেন্দ্র মোদির ছবি ছাপতে কোন অসুবিধে থাকে না।

    আমার ছাত্রের ব্যাখায়, এমনিতেই সাংগঠনিক কাঠামোগত দিক থেকে ফ্যাসিস্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির সাদৃশ্য বর্তমান ছিল। অতঃপর সিপিআইএম ক্ষমতাসীন হয়ে সালকিয়া প্লেনামের মাধ্যমে গণ পার্টির স্লোগান দিল। গণহারে পাটি সদস্য গৃহীত হলো। ফলে পার্টিতে বিপ্লবী আলোচনা, তত্ত্বচর্চা এসব শিকেয় উঠলো। এই কারণে বাম থেকে যে ভোট রামে গিয়েছিল তারা সেখানে ডিসকম্ফোর্ট ফিল করেনি। বরং কমফোর্ট জোনেই থেকে গেছে। লক্ষ্য আদর্শই বদলে গেছে, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সেই কবিতাটা একবার মনে করুন :-
    "মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে, তাতে ভুল নাই!
    দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ,
    চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ।"

    মা খোকাকে বলেছিলেন :-
    "দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
    দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।"
    সর্বোপরি বিজেপির সাথে লেগে আছে ক্ষমতার স্বাদ।
    একবার ভাবুন, আমরা যখন বলি আরএসএস-এর ব্রিটিশ এর দালালির নানা দৃষ্টান্তের কথা, তখন একবার ভাবি না যে, ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টি একইভাবে ভারতছাড়ো আন্দোলনকে বিরোধিতা করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ, জনযুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করে মিত্র পক্ষকে ও ব্রিটিশ কে সহযোগিতা করেছে। এমনকি জনযুদ্ধ পত্রিকার পাতায় সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে কুৎসিত ঘৃণ্য মন্তব্য ও কার্টুন আঁকা হয়েছে। সতীনাথ ভাদুড়ীর অমর উপন্যাস "জাগরী" তো এই বিশ্বাসঘাতকতার জ্বলন্ত সাক্ষী।

    একবার ভেবে দেখবেন, আরএসএস যেভাবে তাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রধান শত্রু হিসেবে গান্ধীজিকে দাঁড় করিয়েছিল এবং শেষাবধি গান্ধী হত্যায় হাত রাঙিয়েছিল, আজও গর্বের সাথে সেই দায় স্বীকার করে। ঠিক একই ভাবে সৈয়দ শাহেদুল্লাহর লেখায় লেনিনবাদির চোখে গান্ধীবাদ, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ এর লেখা, এস এ ডাঙ্গের লেখায় গান্ধীবাদের ভাবমূর্তি প্রবলভাবে সমালোচিত। গান্ধীজিকে নিয়ে কত নোংরা বাগধারা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, ঠাট্টা তামাশা, ছোট থেকে শুনে আসছি বামপন্থীদের কাছে। গান্ধীজীর রামধুন সঙ্গীতকে প্যারোডি করে গাইতে শুনেছি গণনাট্য সংঘ শিল্পীদের গলায়। এই সাদৃশ্য কি নিছক কাকতালীয়?

    ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পটভূমিতে চূড়ান্ত বিচারে হিন্দু মহাসভা এবং কমিউনিস্ট পার্টি কি একই ভূমিকা নেয় নি? শেষ অবধি তারা উভয়েই দেশভাগকে মেনে নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর ও বিশেষভাবে গান্ধীজীর হত্যার পর দেশে আরএসএসের ও হিন্দু মহাসভার অস্তিত্ব প্রায় লুপ্ত হতে চলেছিল সেই অবস্থা থেকে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ফিরে আসার প্রথম বাক বা মো ড় ছিল ১৯৭৭ এর নির্বাচন এমনকি ভিপি সিংহের সরকার গঠনের পর্বেও কমিউনিস্টদের ভূমিকা এবং বিজেপির ভূমিকা ছিল সাদৃশ্যপূর্ণ কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সেই গটবন্ধন এর ছবি আজও ইন্টারনেটে অমলিন এইখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় দুটি চরম বিপরীত মতবাদ হয়েও সাংগঠনিক কাঠামোগত সাদৃশ্য দুটি দলকে কত সহজে এক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে।

    বোধ করি জন্ম লগ্নই এই দুটি দলকে এক গ্রন্থিতে বেঁধে দিয়েছে। দুটি দলেরই শতবর্ষ পূর্ণ হল। দুটি দলের কাছেই সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ একটি কৌশল মাত্র এরা কেউ বর্তমান সংবিধানকে নীতিগতভাবে স্বীকার করে না তাদের লক্ষ্য এই কাঠামোর পরিবর্তন আর কাঠামো বলতে আইন আদালত সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা পুলিশ প্রশাসন এসব কিছু হিটলার মুসোলিনি তারাও সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসে তারপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকেই সম্পূর্ণ নির্মূল করেছিল।

    সিপিআইএম পার্টি কর্মসূচির ১১২ নম্বর প্যারাগ্রাফ লিখছে "the party will utilise all the opportunities that present themselves of bringing into existence governments pledged to carry out a modest programme of giving immediate relief to the people. The formation of such governments will give great fillip to the revolutionary movement of the working people অর্থাৎ পার্টি এই ধরনের সংসদীয় সরকারে অংশগ্রহণের সমস্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে, একটা নমনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করবে। যে কর্মসূচি কিছু আশু সমস্যা গুলির প্রশমন করতে সাহায্য করবে এবং এই সরকার শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য উদ্দীপনা সঞ্চার করবে।

    আরো বলা হলো "The party, therefore, will continue to educate the mass of the people on the need for replacing the present bourgeois-landlord state and government headed by the big bourgeoisie even while utilising all opportunities for forming such governments of a transitional character..." এমনকি পার্টি এই ধরনের সরকারের সমস্ত রকমের সুযোগকে মানুষের স্বার্থে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে কাজে লাগাবে। কিন্তু সেই সাথে, এই প্রচলিত বুর্জোয়া জমিদার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করার বিষয়ে জনগণকে প্রতিনিয়ত শিক্ষিত ও সচেতন করে যাবে।

    উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিংহের সরকার, গুজরাটে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ও পরবর্তীকালে ১৩ টি বৃহৎ রাজ্যে বিজেপির সরকার তো এই কর্মসূচিকেই অনুসরণ করছে। শুধু পার্থক্য তাদের লক্ষ্য হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তাদের লক্ষ্য হিন্দী ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। তাদের লক্ষ্য মনুস্মৃতির অনুসরণে সামাজিক বর্ণ বিভাজন ফিরিয়ে আনা। নিম্নবর্ণ ও বিধর্মীদের শূদ্র বা দাসে পরিণত করা। দেশের সংবিধানটাকেই আমূল বদলে দিতে চায়। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে গিয়ে, ছোট ছোট পদক্ষেপে তারা এগিয়ে চলেছে। আর সিপিআইএম তার কৌশলটাকেই দলের কর্মসূচি বানিয়ে ফেলে, মূল উদ্দেশ্য থেকে শত যোজন দূরে সরে গেছে, শুধু ক্ষমতায় টিঁকে থাকার স্বার্থে।

    কথার সূত্র ধরেই একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ এসে গেল, তাই বলেই ফেলি। আশা করি খুব প্রাসঙ্গিক হবে না।লেনিনের পূর্ব উদ্ধৃত রচনাতেই তিনি লিখছেন যে, "Socialism is inconceivable without large-scale capitalist engineering based on the latest discoveries of modern science. It is inconceivable without planned state organisation, which keeps tens of millions of people to the strictest observance of a unified standard in production and distribution." লক্ষ্য করুন, লেনিন আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোত্তম আবিষ্কার ও উপকরণ গুলির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যেগুলো ছাড়া সমাজতন্ত্র টিঁকে থাকতে পারবেনা। আর আধুনিক বিজ্ঞান যেহেতু সততই উন্নয়ন শীল তাহলে সমাজতন্ত্রকে ক্রমাগতই উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিক করে যেতে হবে ও উন্নত করতে হবে আর বলা হয়েছে সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সংগঠনের কথা এবং কঠোর নজরদারি ও তদারকের কথা এগুলো হলো লেনিনের কথায় সমাজতন্ত্রের লাইফ লাইন বা জীবনরেখা"

    এবার আসুন কমিউনিস্ট ইশতেহারের পাতায়, কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস লিখেছেন "The bourgeoisie cannot exist without constantly revolutionising the instrument of production." ফলে মানবিক কায়িক শ্রমটা ক্রমাগত অর্থহীন হয়ে পড়ে। উৎপাদনের উপকরণ যন্ত্রই হয়ে দাঁড়ায় শ্রমিকের শত্রু। তাছাড়া "keeps tens of millions of people to the strictest observance of a unified standard in production" এর ফলে ক্রমোচ্চ পর্যায়ে বিন্যস্ত একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। দক্ষ - অদক্ষ, বেস - হায়ারার্কি বৈষম্য, ফলতঃ বেতন বৈষম্য দেখা দেবেই। এভাবেই বিশ্ব বিপ্লব, শোষণহীন দুনিয়া ইত্যাদি মরাল ইনসেনটিভের সাথে পুরোপুরি এককেন্দ্রিক স্টেট ক্যাপিটালিজিমের কাঠামো, এই দুইয়ের বৈপরীত্য এক বকচ্ছপ হাঁসজারু সমাজতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। এই বৈপরীত্য ঘোচাতেই দেশে দেশে মেকি সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছিল।

    আমাদের এই রাজ্যেও একদা সিপিআইএম দল আওয়াজ তুলেছিল কেন্দ্রের বঞ্চনা উপেক্ষা করে রক্ত দিয়ে বক্রেশ্বর হলদিয়া গড়বো। সেই দল যখন সরাসরি টাটা সালিম জিন্দালদের ওকালতি শুরু করল নির্লজ্জ ভাবে, কৃষকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার চাষের জমি কেড়ে নিয়ে শিল্পপতির হাতে তুলে দিল, সেটা মানুষ মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের আফিম তখন আর কাজ করতে পারেনি। পরিণতিতে এই সরকারের গঙ্গা যাত্রা ছিল অনিবার্য।

    আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখি যে ২০২৬ এর নির্বাচনেও সিপিআইএম কোন মতেই তার হস্তান্তরিত ভোট বিজেপির ঘর থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বলা ভালো ফিরিয়ে আনতে আগ্রহীও নয়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • অন্যান্য | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • আমি লাল্টু বিশ্বাস, দাদা | 223.184.***.*** | ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:১৭737601
  • বাপরে কী বিশ্লেষণ! হাঁসজারুর পর এই ডিম্ভাতিও ভাবনা! মদ্দা কথা বাইনারিতেই থাকতে হবে। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন