দেখা না দেখায় মেশাঃ পর্ব ১২
শূন্য এ বুকে
আচ্ছা, একটা কথা জিগাই। ছাত থেকে নিচে খানিকক্ষণ তাকাতে তাকাতে আপনাদের মনে হয় না যে লাফ দিই? খানিকক্ষণ শূন্যে ভাসতে ভাসতে মাটিতে আছড়ে পড়ি? হয় না? আপনাদের হয় না বুঝি? আমার হয়। মানে আগে খুব হত। যখন বয়স কম।
কোলকাতার ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। ছোটবেলায় বারান্দার রেলিংয়ে বুক লাগিয়ে নিচের লোকজনকে পুতুলের মত লাগত। কিছু না হোক বেঁটে তো বটেই।
না, অন্য অনেক বাচ্চার মত কারও মাথায় জল ঢেলে দেওয়া, বা বাড়ির জুতোগুলো নিচে আছড়ে ফেলার মতন ইচ্ছে কোন দিন হয় নি।
কিন্তু উঁচু থেকে দেখতে দেখতে নিচে লাফিয়ে পড়া? তার একটা আকর্ষণ আছে, অমোঘ সে প্রলোভন।
ছাদের পাঁচিলে উঠে বসে নিচে তাকিয়ে দেখেছেন কখনও? দেখবেন একটু পরে ঘোর লেগে যাবে।
মনে হবে নিচে থেকে কেউ আয় আয় বলে হাতছানি দিচ্ছে।
প্রথম যৌবনে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তার সঙ্গে একটু, যাকে বলে ভাব ভালবাসা? হ্যাঁ, সেটাও হয়েছিল বইকি।
না হয়ে যাবে কোথায়! সেই যে বলে আগুন আর ঘি কাছাকাছি রাখলে। মহিলা বয়সে সামান্য বড় ছিল।
তাতে কী, সেক্ষপীরের বৌ আট বছরের বড়, রবার্ট লুই স্টিভেন্সনের উনি দশ বছরের।
কিন্তু এটা পঞ্চাশ বছর আগের ভারত, তায় আমাদের জাত মেলে নি। আর আমি তখনও ছাত্র, বাপের হোটেলে খাচ্ছি।
যা বলছিলাম, সেই নারীর ছোটবেলা কেটেছে আন্দামানে, বাবার চাকরির সূত্রে। মিশনারি স্কুলে পড়তে রোজ স্টিমারে করে সমুদ্রের খাঁড়ি পেরিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের মূল পাড়ায় যেতে হত।
তখন স্টিমারের রেলিং ঘেরা ওপেন ডেকে দাঁড়িয়ে নীল জল আর তার ঢেউ দেখতে দেখতে ওর মনে হত --ঝাঁপ দিই, ঝাঁপ দিই, দিই ঝাঁপ?
সে রেলিং এর উপর দিয়ে ঝুঁকতে শুরু করত।
একবার ওর তিন বছরের বড় দিদি দেখতে পেয়ে ওকে টেনে সরিয়ে আনল। বাড়িতে নালিশ করে মার খাওয়ালো।
স্টিমারে যাতায়াতের সময় ওকে একটু চোখে চোখে রাখত।
কিন্তু সে খেলাটা বদলে নিল।
রোজ জলের মধ্যে দশ নয়া পয়সা ছূঁড়ে ফেলত। ক’দিন পরে ফের বাবার কাছে চেয়ে নিত।
পাঁচ বছর পরে তার সঙ্গে আবার দেখা। বিবাহিত, বাপের বাড়ি এসেছে। কোলে সাতমাসের বাচ্চা।
আমাকে বলল—দুপুরের দিকে আয়, অনেক গল্প জমে আছে।
আশকথা পাশকথার পর জিজ্ঞেস করলাম—সেই খেলাটা মনে আছে? সেই যে জলে ঝাঁপ? এখনও ইচ্ছে করে? নাকি ইচ্ছেটাই মরে গেছে?
কেমন একরকম করে হাসল, অদ্ভূত ছায়া ছায়া হাসি। আমাকে বিদ্রূপের চোখে দেখে বলল—আগে তোর কথা বল। ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া?
--আমিও খেলাটা অনেকদিন বদলে নিয়েছি।
--কেন?
--আরে বাবা মা মিলে মিশনের হোস্টেলে দিয়েছিল। ক্লাস সেভেনে আমরা তখন প্যারাশ্যুট প্যারাশ্যুট খেলতে শিখেছি।
--সে আবার কী?
-- একটা বড় রুমালের চার কোণে সুতো দিয়ে বেঁধে সেটা একটা বড় চাবির গোছার সংগে বেঁধে নিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে শূন্যে ছুঁড়ে দিলে সেটা ঢিল পড়ার মতন ঢিপ করে পড়ে না।
বরং রুমালটা প্যারাশ্যুটের মতন খুলে ফেঁপে ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে আসে। শুধু চাবির গোছাটা ছুঁড়লে এক সেকেন্ডে মাটিতে আছড়ে পড়বে। আর এটা প্রায় দশ সেকেন্ড ধরে ভাসে।
--সেই পালক ও গিনির পরীক্ষার মত? কিন্তু ও দুটো তো একসঙ্গে পড়ত। গুল দিচ্ছিস না তো?
--মাইরি না, বিশ্বাস কর, তোমায় ছুঁয়ে বলছি।
ছূঁতে গিয়ে হাত ভুল জায়গায় লেগে গেল। ওর চোখ বড় বড়।
নিঃশ্বাস ফেলে বলল—এবার মার খাবি।
আমি সরি সরি, ইচ্ছে করে নয় --এইসব বলে পালাতে যাচ্ছি, কিন্তু ও হাত ধরে খাটে বসিয়ে দেয়।
--ন্যাকামি ছাড়। ওরকম হয়ে যায়। আগে তোর খেলাটা বল। বড় হয়েও কি ছাত থেকে রুমাল দিয়ে প্যারাশ্যুট ওড়াস?
--না না। দুই বন্ধু ভাবলাম যদি রুমাল চাবির ওজন নিয়ে দশ সেকেন্ড হাওয়ায় ভাসতে পারে তাহলে একটা বিছানার চাদর কেটে ওরকম বানিয়ে যদি আমরা ছাদ থেকে লাফ দিই
তাহলে কি হাওয়ায় ভাসতে পারব না? মাত্র দশ সেকেন্ড?
সব তৈরি, উৎসাহের চোটে বিছানার চাদর কেটে আদ্দেক করেছি। কিন্তু কথাটা ছড়িয়ে পড়ল। মহারাজ জানতে পেরে ওনার রুমে ডেকে বেত দিয়ে পেটালেন।
ব্যস্ মহাকাশ অভিযানের ওখানেই ইতি।
ও হেসে ওঠে, হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে ওর চোখে জল আসে। বুকের আঁচল খসে পড়ে।
আমার চোখে পড়ে দুধে ভরা পুরন্ত বুক, ব্লাউজের খানিকটা ভেজা। চোখ ফিরিয়ে নিই।
এই সময় বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। হয়ত হাসির শব্দে, হয়ত খিদে পেয়েছে। আমি উঠে পড়ি।
আরেকদিন আসব বলে বেরিয়ে যাই। আর কোনও দিন যাইনি।
কিন্তু যে কথাটা ওকে বলা হয় নি তাহল --আমিও খেলাটা বদলে নিয়েছিলাম। স্বপ্নে ছাদ থেকে লাফ দিতাম।
আর মাটি ছুটে আসত, আছড়ে পড়ে মাথা চৌচির হওয়ার মুহুর্তে ঘুম ভেঙে যেত।
একদিন টের পেলাম—এই খেলাটা সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ আমি যেদিন চাই সেদিনই স্বপ্নে ঝাঁপ দিতে পারি। খালি একটা ট্রিকস্ দরকার।
ঘুমোনোর সময় পাশ ফিরে একদিকে কাত হয়ে শুলে চলবে না। শুতে হবে পুরোপুরি চিৎ হয়ে।
তারপর ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে গোড়ালি ফাঁসিয়ে লক্ করে দিতে হবে। তাহলে প্রথম প্রহরেই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার স্বপ্ন।
ওইভাবে শুলে একটা পায়ে রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যাকে বলে ঝিঁঝি ধরে যায়। ব্যস অচেতন মন পায়ে সাড় আনার চেষ্টা করে, লক্ ছাড়াতে যায়।
আর আপনি স্বপ্নে ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
আপনি টের পান মাধ্যাকর্ষণের টানে প্রবল বেগে ছুটে আসছে পৃথিবী। আপনি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে অণু পরমাণু হয়ে যাবেন। এটাই আপনার নিয়তি। কিস্যু করার নেই।
কিন্তু ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠে বুঝলেন। আপনি বেঁচে আছেন এবংর নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন। আর মাধ্যাকর্ষণ-টর্ষণ আসলে দুটো পায়ের লক খুলে যাওয়া।
আমার জীবনে রীমা আসার পর আর ওই স্বপ্ন দেখি নি। মানে ইচ্ছেই হয় নি আর কি।
তাহলে এতক্ষণ ভাট বকলাম কেন? কারণ কাল রাতে বহু দশক পরে আবার সেই স্বপ্ন! মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসেছি।
আর একটা কারণ, কেউ বিচ্ছিরি করে হাসছিল। চমকে উঠেছিলাম –হাসিটা থানার দ্বিতীয় অফিসার হালদারবাবুর মত।
একটু পরে বুঝলাম টেবিল থেকে অ্যাপল হোমপডের সিরি হাসছে। কিন্তু মোহিনী কোথায় গেল? কেন ওকে ধমকে থামাচ্ছে না?
হাতঘড়ি দেখলাম—রাত তিনটে সতেরো। তাহলে এখন মোহিনীর বিশ্রামের , থুড়ি চার্জিং এর সময়।
স্বপ্নটা দেখলাম কেন? কাল রাতে খাওয়ার পর একটা ঘটনা ঘটেছে। তাতে আমার জীবন আবার কোনদিকে বাঁক নেবে বোঝা দায়।
গত দুটো বছরে আমার জীবনে তিনটে এমন ঘটনা ঘটেছে যে আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি।
এক, রীমার হঠাৎ চলে যাওয়া। দুই, আমার ঘরে মোহিনীর আগমন। তিন, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুপ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কছেদ, বরাবরের মত।
প্রথম দুটো আপনারা জানেন। তৃতীয়টা সদ্য ঘটেছে। সেটাই বলি।
সেই যে থানার ওসি এবং দ্বিতীয় অফিসার হালদার একদিন সকালে এসে মোহিনীর অস্তিত্ব নিয়ে আমাকে এবং খোদ মোহিনীকে নানারকম জেরা করে ফেরত গেলেন তারপর একমাস কেটে গেছে। থানা থেকে আর কোন খবর আসেনি।
কিন্তু গতকাল সুপ্রিয় এসেছিল বিকেলে, হাতে একটা ভোদকার বোতল। এসেই হৈ চৈ শুরু করে দিল। কী ব্যাপার?
অন্য একটা কাজে নিউ টাউনে এসে আমাদের সেই থানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। কী মনে হোল, ভেতরে গিয়ে হালদার বাবুর সাথে দেখা।
হালদার খাতির করে বসিয়ে চা খাওয়ালেন । জানালেন আমাদের চেনা ওসি মিঃ সিনহা বদলি হয়ে গেছে। এখন থানার চার্জে মিঃ হালদার স্বয়ং।
সুপ্রিয় কংগ্রাচুলেট করে আসল কথায় এল। জানতে চাইল যে ওর বন্ধু সমাদ্দারের বিরুদ্ধে সন্দেহের ভিত্তিতে দুটো অভিযোগের তদন্ত হচ্ছিল। সেগুলোর কী অবস্থা?
হ্যাঁ, আমার বিরুদ্ধে দুটো অভিযোগ।
এক, সরকারি মর্গ থেকে বেওয়ারিস লাশ গায়েব করা এবং স্ত্রীর সন্দেহজনক মৃত্যু হলে শ্মশানে স্ত্রীর মৃতদেহের বদলে ওই লাশকে দাহ করা।
দুই, বাড়িতে এক অজ্ঞাতকুলশীল অল্পবয়েসি মেয়েকে এনে স্থায়ী ভাবে নিজের বাড়িতে রাখা। সে নাকি মানুষ নয়, রোবো!
হালদার হাসিমুখে জানালেন যে ওসি ভদ্রলোক বদলি হওয়ার এক সপ্তাহ আগে দুটো অভিযোগের তদন্ত রিপোর্ট হায়ার অথরিটির কাছে জমা করে গেছেন।
দুটোতেই উনি মিঃ সমাদ্দারকে ক্লীন চিট দিয়েছেন। আগের ড্রাইভার এবং পরে প্রতিবেশিদের অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই।
তাই সুপ্রিয় সব কাজ ফেলে আমার এখানে চলে এসেছে ভাল খবরটা দিতে এবং সেলিব্রেট করতে।
আমি আবেগে ভেসে যাই—সুপ্রিয়কে জড়িয়ে ধরি। ধরা গলায় বলি—থ্যাংকস্! অনেক দিন হল আমার বাড়িতে কেউ কোন ভাল খবর নিয়ে আসেনি।
মোহিনীকে কফি বানাতে বলব ভাবলাম, কিন্তু ও দেখি রান্নাঘরে কিছু করছে। ঠিক আছে, একটু পরে বলব’খন।
ওমা, ও দেখি একটা ট্রেতে কফি, চিপস্ আর বিস্কিট সাজিয়ে নিয়ে আসছে। সুপ্রিয় খুব খুশি। আমিও। কাল মেঘ কেটে গেছে।
কিন্তু কফিতে চুমুক দিতে দিতে একটা কথা আমাকে খোঁচাতে লাগল। আমি কি মোহিনীকে কফি আনতে কম্যান্ড দিয়েছিলাম?
ওর জন্যে নির্ধারিত ট্যাগ ওয়ার্ড “শোন মোহিনী” বলে? না তো! কখন দিলাম? তাহলে ও কি থট রীডিং জানে? ওর প্রোগ্র্যামিং এ কি এটাও আছে?
তা না হলে—তা না হলে- ? তবে কি ওর মধ্যে কোন ইন্টেলিজেন্স বা নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে?
কেন হচ্ছে? কীভাবে? কোন নিউরো- বিগ ব্যাং?
মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। থানাপুলিশের ঝামেলা চুকে গেছে। সুপ্রিয় খুব ভাল মুডে। কথাবার্তার ফাঁকে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিল। উকিলি বুদ্ধির তারিফ করল।
দুই পুলিশ অফিসারকে বাড়িতে ডেকে মোহিনীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়ার প্যাঁচ ওই কষে ছিল—মানতেই হবে।
একটু পরে সুপ্রিয় জানালো যে কালকে ওর গিন্নি বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসছেন। কাজেই ভোদকার পুরো বোতলটা এখানেই শেষ করলে ভাল হয়।
ওর গিন্নি একটু বেম্মোজ্ঞানী টাইপ। রীমার কোন শুচিবাই ছিল না। তবে কোন বিষয়ের বাড়াবাড়ি ওর পছন্দ নয়। আমাকে বলত—সংযম হল শিল্পের চাবিকাঠি।
আমি বললাম –তাহলে রাতটা এখানেই থেকে যা। কাল সকালে চা-নাস্তা করে নিজের বাড়িতে যাস। গিন্নি আসছেন, ওনার অনারে কিছু বাজার করবি তো?
অন্ততঃ একবেলার খাবার ‘আহারে বাঙালি’ আউটলেট থেকে আনিয়ে নিস। যাতে বৌকে এসেই হেঁসেলে না ঢুকতে হয়।
--ঠিক বলেছিস।
তারপর কী মনে করে বলল—তোর কী! তুই তো বেশ আছিস। কোন ঝুটঝামেলা নেই। রান্নাবান্না কাজের মাসি—সব দায়িত্ব একাহাতে সামলাচ্ছেন শ্রীমতী মোহিনী দেবী।
সুপ্রিয় কি আজ একটু বেশি খেয়ে ফেলেছে? কথার যেন সুর তাল ঠিক নেই; তাল কাটছে।
আমি একটু হাসলাম। কিন্তু সুপ্রিয় থামছে না। বলল—ও হ্যাঁ, আরেকটা কাজ, বলতে ভুলে গেছি--সিকিউরিটির ডিউটি! ওটা তো ইউনিক।
ওর গেলাস খালি হয়ে গেছে। ইশারা করছে আরেক পেগ নেবে। আমি বললাম—এবার একটা ছোট নে।
ও হাসল—আরে আমার কিছু হয় নি। ভয় পাস না।
--ভয়ের কথা নয়, পুরো বোতলটা কেন শেষ করবি? আমার ফ্রিজে তুলে রাখি। পরে যে দিন আসবি-- ।
--ধ্যাৎ কিপটেমি করিস না। পরের কথা পরে। সেদিন তুই আনাবি। এখন--।
আমি কথা না বাড়িয়ে ঢালতে যাচ্ছি, সুপ্রিয় বাধা দেয়। বলে –আজ শেষ পেগ মোহিনী দেবীর হাতে।
কী মোহিনী, ঢেলে দিতে আপত্তি আছে?
মোহিনীর চেহারায় কোন বিকার নেই। পুতুলের মত ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকায়।
--ও হো, ও তো তোর কথায় চলে। বেশ, তুইই বল। নে, ‘শোন মোহিনী’ বলে শুরু কর।
আমার অস্বস্তি বেড়ে চলেছে। তবু কথা না বাড়িয়ে মোহিনীকে বলি রান্নাঘর থেকে ধোয়া ভাল কাঁচের গ্লাস এনে সুপ্রিয় বাবুকে এক পেগ বানিয়ে দিতে।
আর সুপ্রিয়কে বলি—এই শেষ কিন্তু। এরপর আমরা শুতে যাব। মোহিনী তোকে পেগ দিয়ে আমাদের বিছানা পাততে যাবে।
সুপ্রিয় কেমন করে তাকিয়ে মিটিমটি হাসছিল। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় কোন বিপদ সংকেত পাঠাচ্ছিল। কিন্তু আমি বুঝতে ভুল করলাম।
সুপ্রিয় আবার বলল—গৃহিণী সচিব সখী তো হয়ে গেছে, বাকি আছে প্রিয়শিষ্যা ও ললিত কলার ব্যাপারটা। সময়ে ওটাও হবে বুঝতে পারছি।
আমি কিছু বলার আগে মোহিনী গেলাস নিয়ে আসে। সুপ্রিয়ের সামনে রাখে।
তারপর চলে যাচ্ছিল, কিন্তু সুপ্রিয় বাধা দিয়ে বলে, ‘একটা গেলাস কেন? আরেকটা নিয়ে এস’।
মোহিনী আমার দিকে তাকায়, ও কি বুঝতে পেরেছে যে আমি আর খাব না? কিন্তু কী করে বুঝল?
সুপ্রিয় নাছোড়বান্দা।
--তোর জন্যে বলছি না। মোহিনী আমার সঙ্গে বসে এক পেগ খাবে, ছোটা পেগ।
--তোর কি মাথা খারাপ, ও খায় না তা জানিস তো!
--আরে একদিন খেলে কী হবে? বলছি তো, এক ছোটা সা!
--শোন, তোর নেশা হয়েছে। আর এক পেগও নয়। যা তা বকছিস। মোহিনী কিছুই খায় না, খাবার চা জল কিস্যু না। তারপরেও তুই--?
--বিশ্বাস করি না। ওর অমন ফিগার! কিছু না খেলে মেন্টেন হতে পারে? বেশ, ওকেই জিজ্ঞেস করি, যদি ও হ্যাঁ বলে।
--আমি জিজ্ঞেস করছি—শোন মোহিনী, তুমি আমার বন্ধুকে বলে দাও তুমি কী খাও আর কী কী খাও না।
মোহিনীর চোখের পাতা ফরফর করে।
--সুপ্রিয় স্যার, আমি কোন কিছু খাই না। আমার প্রোগ্রামে যে ম্যান্ডেট আছে তাতে আপনাদের মত কিছু খাওয়ার কথা নেই।
আমার শরীরে আপনাদের মত পাকস্থলী নেই, কিডনি নেই, লিভার নেই।
সুপ্রিয় আমার দিকে তাকায়। ওর চোখ ঘোলাটে।
--এসব তোর কাজ। ও তোর শেখানো বাঁধাবুলি বলছে। যেই তুই “শোন মোহিনী” বলে পাঞ্চ লাইন দিলি , ও কোড বুঝে এইসব বলছে। এটা ওর মনের কথা নয়।
--আরে পাগল! ওর মন মস্তিষ্ক এসব কিছু নেই, যা আছে তা কিছু কোড।
--তাই নাকি! তাহলে ও কী করে নিজের থেকে কফি আর স্ন্যাকস নিয়ে এল? ভাবছিস আমি খেয়াল করি নি?
দেখ, শুকনো মরা ডালেও অনেক সময় পাতা গজায়, বৃষ্টির জল পড়ে—
--উফ্ মাথাটা গেছে। শোন মোহিনী, আমাদের দু’জনের বিছানা করে দাও। হ্যাঁ, আমার ঘরে। ফোল্ডিং খাটে আমি শোব। যাও।
কিন্তু এরপর যা হল আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। মোহিনী যাবার উপক্রম করতেই সুপ্রিয় ওর হাত ধরে টানল।
--এত তাড়াতাড়ি! আমার কথাটাও শুনে যাও।
মোহিনী আমার দিকে তাকাল। আমি বুঝতে পারলাম না কী করা উচিত।
কিন্তু সুপ্রিয় হাত ধরে আর একবার টানতেই মোহিনীর হাতের চড় সপাটে পড়ল ওর গালে।
স্টিলের হাত, সুপ্রিয় ছিটকে পড়েছে মাটিতে। ওর গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ ফুটে উঠেছে। চামড়া ফেটে একটু একটু করে রক্ত বেরোচ্ছে।
মোহিনীর চেহারায় কোন তাপ-উত্তাপ নেই।
আমি ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটিয়ে সুপ্রিয়কে টেনে তুলি, চেয়ারে বসিয়ে দিই।
মোহিনীকে বলি, “শোন মোহিনী, যাও তুলো আর বেটাডাইন নিয়ে এস, চটপট”।
খানিকক্ষণ পরে সুপ্রিয় মুখ তুলল।
--তুই! তুই ওকে দিয়ে মার খাওয়ালি? কেন?
--আমি কিচ্ছু করি নি।
--বাজে কথা, তোর ইনস্ট্রাকশনে এটা কোডে বলা হয়েছে। তারপরই ও আমাকে মারল। কেন করলি?
ইতিমধ্যে মোহিনী ফিরে এসে সুপ্রিয়ের গালে তুলো দিয়ে ওষূধ লাগাতে শুরু করল। সুপ্রিয় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় ওর হাত ধরে সামান্য চাপ দিতেই সুপ্রিয় শান্ত হয়ে গেল।
ইস্পাতকঠিন হাতের চড় খেয়ে ওর নেশা উপে গেছে।
নাঃ, ব্যাপারটা এখানে শেষ করা দরকার।
আমি মোহিনীকে জিজ্ঞেস করি, “শোন মোহিনী। আমার বন্ধু সুপ্রিয়কে মারলে কেন? আমি তো খালি বলেছিলাম এখান থেকে সরে গিয়ে বিছানা করতে।
কাউকে মারার কথা বলেছি কি”?
মোহিনীর চোখের পাতা নড়েনি।
--না সমাদ্দার স্যার। এটা আমার আত্মরক্ষার ম্যান্ডেট। আমার শরীরে কেউ হাত লাগালে প্রথমে তার মনের ভাব বুঝি। পরের ধাপে হাত চালাই। তার পরের ধাপে ইলেকট্রিক শক দিয়ে অবশ করি।
সুপ্রিয়ের গলা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।
--শোন, তুই ওকে আমার কাছে মাপ চাইতে বল। ও তোর কথা শোনে। আমার গায়ে হাত তুলেছে। ও একবার সরি বলুক, ক্ষমা করে দেব।
মোহিনী আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
আমি আস্তে আস্তে মাথা নাড়ি। না, আমি সেটা বলতে পারব না।
--কী হল? বল। বলে দে আমার বন্ধুকে চড় মারার জন্যে ক্ষমা চাও, সরি বল মোহিনী।
--না, আমি পারব না। ওর একটা সম্মান আছে।
--তুই পাগল, না আমি পাগল! ও একটা যন্ত্র, একটা খেলনা। ওর স-ম্মা-ন আছে? আর আমি তোর বুজুম ফ্রেন্ড, সেই ন্যাংটো বয়েস থেকে। আমার সম্মান নেই?
একটা পোষা যন্ত্রকে দিয়ে মার খাওয়ালি? তোর ঘরে!
তারপর ও উঠে দাঁড়িয়ে একটা চেয়ারকে লাথি মারে।
--এবার বল চেয়ারকে অপমান করেছি, মোলেস্ট করেছি। বল আমার শাস্তি পাওয়া উচিত। কী, চুপ করে গেলি তো?
ঠিক; চেয়ারের যেমন কোন মান-অপমান হয় না, তেমনই মোহিনীরও হয় না, হতে পারে না। সম্মান শুধু লিভিং বিয়িং এর হয়।
একটা পোষা কুকুর বিড়ালেরও যে সম্মান প্রাপ্য সেটাও মোহিনী পেতে পারে না।
আমার মুখ দিয়ে খানিকক্ষণ কথা বেরোয় না। ভিতরে ভিতরে একটা রাগ, নাকি ব্লাড প্রেশার বাড়ছে! মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নেই।
--শোন সুপ্রিয়। তুই যেটা করলি সেটা অসভ্যতা। চেয়ারের অনুভূতি নেই, আমার আছে। আমার বাড়িতে ঢুকে আমার চেয়ারকে লাথি মারা মানে আমাকে অপমান করা। সেটা বুঝিস? মোহিনীর জন্যেও সেই একই কথা।
--অ! তাহলে চেয়ারকে লাথি মারার জন্যেও আমার চড় খাওয়া উচিত? কে মারবে, চেয়ার তো নয়; তাহলে তুই? তোর অপমান হয়েছে বললি না?
তাহলে মার! এটাই বা বাকি থাকে কেন?
--সুপ্রিয়, তোর নেশা কেটে গেছে। তুই এখন গাড়ি চালাতে পারবি। বাড়ি যা। কয়েকদিন পরে কথা বলব।
সুপ্রিয় উঠে পড়ে। বলে—যাচ্ছি, বরাবরের মত। আর কখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিস না। তোর নম্বর আজকেই ডিলিট করে দেব।
কারণ, তুই হচ্ছিস একনম্বরের স্বার্থপর, নিমকহারাম!
--এসব কী বলছিস, নিমকহারাম?
--তুই জানিস না, এখনও জেলের বাইরে আছিস শুধু আমার দয়াতে ।
--মানে?
--ভেবেছিলাম কোনদিন এটা বলব না। আমি তোর মত ছোটলোক নই, কিন্তু আজ বলতে হচ্ছে।
শোন, সরকারি হাসপাতালের মর্গ থেকে বডি গায়েব করে ক’দিন পরে বৌয়ের ডেডবডি বলে গড়িয়ার শ্মশানে জ্বালিয়ে দেওয়ার ফাইল এখনও ক্লোজ হয় নি।
খালি ওসি’র তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। সেখানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আমার স্টেটমেন্টকে।
আমি বলেছি যে শ্মশানে আমি হাজির ছিলাম। বডিটা রীমা সমাদ্দারের, কোন বাসি মড়ার নয়।
কিন্তু তুই জানিস ওটা সত্যি নয়।
আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।
--এর মধ্যে মিথ্যে কোনটা? তুই শ্মশানে হাজির ছিলি সেটা তো সত্যি। আর নিজে দেখেছিস যে রীমার দাহকাজ হল। তাহলে?
--খেয়াল কর। গড়িয়ার সরকারি শ্মশানটা গড়িয়ায় নয়, বোড়াল গ্রামে। অনেক গলিঘুঁচি দিয়ে যেতে হয়। আমার খুঁজেপেতে পৌঁছুতে দেরি হয়ে গেছল। যখন হাজির হলাম তখন বডি ফার্নেসে ঢুকে গেছে। কাজেই টেকনিক্যালি হাজির থাকলেও মৃতার চেহারাটা দেখা হয় নি।
--তাহলে মিথ্যে স্টেটমেন্ট দিলি কেন?
--মিথ্যে দিইনি। তোর কথা বিশ্বাস করেছিলাম। ছোটবেলার বন্ধুকে কেন অবিশ্বাস করব। শ্মশানের রেজিস্টারে সাইনও করেছি।
তবে ভবিষ্যতে কোন আদালত যদি সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলে জেরা করে, এফিডেবিট দিতে বলে—তখন কী হবে জানি না।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।