কাজললতায় জোছনা লুকাই ---
হারায় নিরুদ্দেশে ।
মওলা তোমার চাঁদের উঠান
হাসলো পথের শেষে !
গাঁ-গঞ্জে, ছোট বড় সব শহরেই বিকেল হয়।বিকেলগুলির রূপ খানিক আলাদা হলেও মোটামুটি একই ধাঁচের। মোটামুটিভাবে ইস্কুল- কলেজ, আপিস- কাছারি ছুটির পর বড় মাঠগুলিতে বড় ছেলেরা, ছোটখাটো মাঠগুলিতে ছোট ছেলেপিলেরা খেলে । কিশোরীরা দল বেঁধে এদিক সেদিক। পুরুষরা গুলতানি করে চা দোকানের বেঞ্চে বা রোয়াকে, মেয়েরা উঠোনে,বা জলের ঠিকানায়। দিলদারেও তাইই হত।
নেড়ি আমাদের চেয়ে একটু ছোট ছিল। নেড়িকে মনে করতে গেলেই ওর ন্যাড়া মাথা, কালোকেলো রোগা চেহারাটা এগিয়ে আসতো । তাই চুল গজানোর পরও ও নেড়িই রয়ে গেল। আমরা খেলার সময় ওকে সব সময় নিতে চাইতামনা। ওর নাক থেকে শিকনি ঝরতো। আমরা বলতাম বাছুরের ঠ্যাং! আমরা ওকে খ্যাপাতাম। ও কাঁদতো। আমরা খুব মজা পেতাম। হাততালি দিয়ে ওর সামনে ঘুরে ঘুরে আরো ক্ষেপাতাম। ও ফোঁপাতে থাকতো। আমাদের উল্লাস বেড়ে যেত। এমন সময় কখন জানি এসে দাঁড়াতো ওর মা সাবিত্রী।
সাবিত্রীকে আমরা সবাই কেন জানি ডরাতাম। ছোটখাটো চেহারার সাবিত্রীর চকচকে কালো চুল টানটান করে খোঁপা বাঁধা থাকতো সব সময়। মুখখানা ছোট্ট, সে মুখে কোনো কিছুর বাড়াবাড়ি ছিলনা। রং চটে যাওয়া শাড়িটি পরিস্কার, আঁচল টানটান করে ঘুরিয়ে কোমরে বাঁধা।সবসময় কাজ করততো,তাই। সে সামন্ত বাড়ির নানান কাজের লোকদের একজন। ঘস ঘস করে মস্ত বঁটিতে মোটা মোটা খড়ের আঁটি এক্কেবারে প্রায় গুঁড়ো গুঁড়ো করে কেটে ফেলতে পারতে সে। গরুর জাবনার মস্ত গোল রিং এর মত পাত্রটা ভরে উঠত কি তাড়াতাড়ি! জল তুলতো সে কুঁয়ো থেকে। সাঁঝাল দিত গোয়ালে। গাই দোয়াতো সক্কাল বেলা, একটা ছোট্ট রং চটা কবেকার ক্রিমের কৌটোতে একটু সর্ষের তেল রাখতো সে,আহা গাভীগুলি ব্যথা না পায়! বাছুরটিকে আদর করে সরিয়ে নিয়ে যেত কত মমতায়! বালতি করে দুধ ভরে সে নিয়ে গিয়ে রাখতো সামন্তদের রান্নাঘরের সিঁড়িতে। সামন্তদের বড় ছেলের বউ পাঁচটা হাতের কাজ সারতে সারতে,গপ্প করতে করতে, হাসতে হাসতে কাঁসার ঘটি ভরা জল ঢেলে দিত সে বালতিতে, গেরস্থালির সহজ ধারায়। পড়ন্ত হলেও জমিদার তারা, দেশ বাড়ী থেকে ধান আর এটাসেটা আসতো। তবে উপার্জনের অন্য রাস্তাও খোলা রাখা দরকার। তাই দুধ বেচত। নেড়িকে ওদের উঠোনে বসে কানা উঁচু এলুমিনিয়ামের থালায় নিজে নিজে ভাত খেতে দেখা যেত। ক্যাটক্যাটে গোলাপি, সবুজ প্লাস্টিকের চুড়ি পরা ছোট ছোট হাত দিয়ে ভাত মেখে খেত, রুটি গুড় ও খেতো। দুধ খেতো কিনা জানিনা। দেখিনি। সাবিত্রী ঘুঁটে দিত, বেচতও। তাতেও সামন্ত বউ এর ভাগ ছিল। গরু যার গোবর তার, ঘুঁটে দেবার পাঁচিলটিও; সুতরাং ঘুঁটেতেও তার অধিকার আছে বৈকি! সেই পয়সা সে আঁচলে বেঁধে রাখতো। তারপর কোথায় রাখতো জানিনা।
আমরা সাবিত্রী সত্যবানের গল্প জানতাম। বৌ হয়ে যাওয়া মেয়েদের 'সাবিত্রী সমানেসু' বলে ডাক দিয়ে পয়লা বৈশাখে, বিজয়ার চিঠি আসতোতো! সাবিত্রীর নিশ্চই সত্যবান থাকবে। কিন্তু নেড়ি বলতো ওর বাবা নেই। আমরা আশ্চর্য হতাম। ওকে খোঁচাতাম। ওর চোখের জলের সাথে শিকনি মাখামাখি হয়ে যেত। ঠিক তখনই ছায়ার মত এসে আবারো দাঁড়াতো সাবিত্রী।কোনো কথা বলতনা। কিন্তু ওকে দেখলেই আমরা কেমন গুটিয়ে যেতাম। নেড়ি, মোট কথা,আমাদের দলের কেউ ছিলনা। আবার নেড়িকে না দেখতে পেলে দলীয় কাজ গুলো পানসে ঠেকত। মানে সে সামনে থাকলেও দোষী, আবার না থাকলেও দোষী --- এমন একটা ব্যাপার।
সামন্ত বাড়িতে পুরুষ, নারী, মা আর তার ছা সহ বেশ কিছু কাজের ও অকাজের মানুষ ছিল। অকাজের মানুষরা কেন ছিল বলতে পারবোনা। মাঝ বয়সী পাকা চুলের মা আর তার ফুলহাতা চেক শার্ট পরা , চুলের সামনে টেরি বাগানো ছেলেকে তেমন কোনো কাজ করতে দেখতামনা, একটু আধটু মাতব্বরি ছাড়া। ধরা যাক তারা হল ফুলিদি আর তার ছেলে বসন্ত। তারা দুজনেই বেশ ধলা, কটার দিকে। ফুলিদি বেলার দিকে ফুরফুরে থান আর পানে রাঙা ঠোঁট নিয়ে, কোকড়ানো কাঁচা পাকা চুল উড়িয়ে পাড়া বেড়াতে বেরোত। লোকের রান্নাঘরের জানালায় মুখ বাড়িয়ে সুর খেলিয়ে জিজ্ঞেস করত :কী রানছোগো বৌমারা....? বউমারা এই ডাক টিকে ভয় পেত। কারণ সেই রান্নাটিকে বেইজ্জত করতে তার জুড়ি ছিলনা! ব্যঞ্জনের নামটি উচ্চারণ করে, সেই একই সুর খেলিয়ে থু..থু... থু..... উ..উ....বলে দুলকি চালে পেছন ঘুরে অন্য বাড়ির দিকে রওয়ানা হত। সে নিজে দুবেলা কি খেত তার জবাব সিধা মিলতনা। তাকে কখনও কখনও তসরের চাদর জড়িয়ে বুড়ো সামন্ত কর্তার আকাশী স্কুটারের পিছনে বসে পিতলের ডালি সাপটে ধরে পুজো দিতে যেতে দেখা যেত । সেদিন সামন্ত বুড়ি তার জ্যাবড়া সিদুর পরা মাথা বারান্দার খড়খড়ি থেকে বার করে ভারী কান পাশা নেড়ে নেড়ে কাকে যেন শাপ শাপান্ত করত! সবাই দাঁত বের করে বলত, ওর নাকি মাথার দোষ আছে। শীতের সাঁঝেও মাথা ভিজিয়ে চান করে! এই 'সবাই ' সামন্ত বাড়িতে ভাত খেতো। সাবিত্রী তখন তাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে যেত,কথা বলতনা কোনো। আর কেউ যাওয়ার সাহস ও করতোনা! সামন্ত বউ ও না।
বুড়ি সামন্ত গিন্নীর জন্য কারো কারো হয়তো করুণা ছিলো গোপনে। ফুলুদিকে নিয়ে বউ ঝিদের ভয় আর বিরক্তি দুটোই ছিল। ওদিকে আবার কাদার মাকে তারা ঢেলে খোলাখুলি করুণা করত। কাদার মা আর কাদা সারাদিন ধরেই জল তোলা বিচালী কাটা হরেক কাজ নিয়ে জন্তুর মত নির্বাক খেটে যেত।কাদা গরুর বাগালি করতো, চাষ বাড়ী থেকে আসা ধানের বস্তা পিঠে করে নামাতো। সে প্রায়শই গামছা পরে থাকত,ওর মা ব্লাউজ পরতোনা। ওরা কুচকুচে কালো ছিল। এছাড়া ছড়িয়ে থাকা মুনিশ কামিনরা ছিল। আর ছিল সাবিত্রী, সবার থেকে আলাদা।
সাবিত্রী কবে থেকে ও বাড়িতে থাকতে শুরু করেছে আমরা জানবো কেমন করে? সাবিত্রীর বাড়ী কোথায়, কে আছে না আছে ,ওর বরের কি খবর ---- তা নিয়ে গিন্নীদের আড্ডায় কানাঘুষ হলেও কেউই ঠিকঠাক কিছু বলতে পারতোনা। কেউ বলতো বরকে সাপে কেটেছে, কলার ভেলায় সে ভেসে গেছে, কেউ বলতো বিবাগী হয়েছে , কেউ বলতো আবার অন্য কথা --- বুড়ো কর্তার কাছে নাকি টাকা ধারতো, শোধ দিতে পারেনি তো তাই বউ কে দিয়ে দিয়েছে! সাবিত্রী গল্প করতোনা। সাবিত্রী হাসতনা। সাবিত্রী সব প্রশ্নের জবাব দিতোনা। সাবিত্রী তাই একটি মূর্তিমান অস্বস্তি ছিল। তবে পৌষপার্বণ এর সময় যখন দল বেঁধে সাঁওতাল মেয়েরা মাথায় চপচপে তেল মেখে , খোঁপায় ফুল গুঁজে, উঁচু করে ঘুরিয়ে পরা শাড়িটির আঁচলে শীতের বাতাসের পাল তুলে সে পাড়া দিয়ে মেলার দিকে ভেসে যেত --- তখন সাবিত্রীর মুখ হাসি হাসি দেখাতো। দু একটা কথাও বুঝি বলতো তাদের সাথে খুব আস্তে। তাকে তখন তেমন ভয় লাগতোনা। নেড়িকে সেদিন পাটপাট করে চুল আঁচড়ে পুঁতির মালা পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত মায়ের হাত ধরে। ওটুকুই। তারা কোথাও যেতনা। আমরা মামাবাড়ি যেতাম, পিসিবাড়ি যেতাম। অনেকে সমুদ্র পাহাড় মন্দির দেখতে যেত। আমরা গল্প শুনতাম। নেড়ি ও হয়তো শুনত। সাবিত্রী এসে দাঁড়াতো মাঝে মাঝে সেই আধশোয়া হতে হতেও দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো অশ্বত্থ গাছ এর তলায়, তার ঝুরি মুঠো করে ধরে। চুপচাপ।
সব শহরের মত দিলদারেও সন্ধ্যে নামতো মাঠের পারে- বনের ধারে- দোকানে বাজারে- বাড়িতে- অলিতে গলিতে। শীতের দিনে ধোঁয়া ধোঁয়া, গরমে ফুরফুরে, আলো ভাঙ্গা,বর্ষায় জুবুজুবু। সাবিত্রী তখন মাটির উনুনে রুটি সেঁকতো,পাশে নেড়ি বসে থাকতো। আমরা বাড়িতে পড়তে বসতাম,জানার কথা নয়,তবে মাঝে মধ্যে বাড়তি দুধের কথা বলতে বা অন্য কাজে যাওয়াতো পড়তোই ওই সময়। রাতে আর সামন্ত বউ হেঁসেলে ঢুকতো না। নেড়িকে একটা গরম রুটি দেওয়া হত দেখেছি। একটা স্লেট, ছেঁড়া একটা দুটো বই কি থাকতো? বোধ হয় দেখেছি। তাহলে সাবিত্রী কি পড়া জানত? কে জানে! একটেরে শান বাঁধানো রান্নাঘরের চারপাশে জোনাকি জ্বলতো, ঝিঁঝিঁ ডাকতো,গোবর, মাটি, খড় মেশানো গন্ধ উঠত। কখনও বা ঋতু ভেদে ছাতিম,কামিনী হাসনুহানা।আগুনের আঁচে সাবিত্রীর মুখটা পোড়ামাটির ঠাকুরের মত লাগতো। সরাসরি ছবি ,রং,গন্ধ আমাদের টানতো তখন বেশি, যুক্তিবুদ্ধি কাজে লাগানোর সময় তখনও আসেনি।
তবে বেবি বিশ্বাসকে কেন বেগম মেরী বিশ্বাস বলে ডাকা হয় তা খানিকটা বুঝতাম। সে মন দিয়েছিল রেল শহরের চীনে রেস্তোরাঁর এক ইঙ্গভারতীয় বাজনদারকে। টুকটুকে ফর্সা সে ছেলেকে তামা রঙের মেয়ে বিয়ে করে ফেললে শহর ছাড়িয়ে, বনের ধারে কোনো মন্দিরে গিয়ে। তারপর রেল শহরের চার্চেও বেশ বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে বিয়ে হলো ।বলা বাহুল্য , সে বাড়ি ছাড়া হয়েছিল তখনই। তবে পাঁচ বোন, এক ভাইয়ের টানাটানি সংসার তাকে মানেওনি, আবার পুরো ছাড়েও নি। সে বোঝা ছিলনা কোনো কালেই, আপন খেয়ালে, আপন শর্তে চলতো শুধু। এদের চট করে মেনে নেওয়া মুস্কিল, কিন্তু একেবারে ফেলে দিতেও ভরসা হয়না, কখন কি কাজে এসে যায়!
রেল শহরে সেই আলো আঁধারির রেস্তোরাঁতে বেবিও কাজ নিয়েছিল। তারপর ভালো লাগেনি। সে রোদ্দুর পছন্দ করত। পথে ঘাটে ঘুরতে ভালবাসত। তাই সে কাজ ছেড়ে সে ডিম পাউরুটি চা বেচতে থাকলো দিলদারের বাস স্ট্যান্ড এ। রেল শহরে নানা ভাষা নানা জাতের সে লড়াইতে টাকা বেশি কিন্তু সম্পর্কের ওম নেই, নিষ্ঠুরতা বেশি, আনন্দ কম। পরে পরীক্ষা দিয়ে দিলদারের ভূমি রাজস্ব আপিসে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীর একটা কাজ জুটিয়ে ফেললে সে । ঘুরে বেড়াতে তার যেহেতু আপত্তি ছিলনা, উৎসাহই ছিল, তাই জমি জমা, মাপজোক, ফিতে ধরা, ফাইল তোলা, নানান কাজে আমিনদের সাথে তাকে পাঠানো হত। হিলহিলে চেহারার আমুদে বেবির পা বুঝি মাটিতে বসত করতোনা, সে ভেসে যেত হেথায় সেথায়, দিলদার পথে ঘাটে। সহজেই লোকের সাথে আলাপ জমাতে পারত, তাদের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতে পারত। বৌ ঝিদের সাথে ভাব জমিয়ে ঝামেলার কাজ সহজে মিটিয়ে আসতে পারত। তারপর একদিন তার রাঙা স্বামী যখন ভাগ্য ফেরাতে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে মনস্থ করলো, তখন বেবী হাসিমুখে সে স্বামীকে বাই বাই করে দিল।
বছর গড়াতে না গড়াতে কানাঘুষো শোনা গেল বেবী আর গলায় যীশু ঝোলায়না। বেবিকে বেইলি লাইব্রেরির মাঠে প্রায়ই, খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও , বিকেলে হাওয়া খেতে দেখা গেছে। লাইব্রেরীর পিছনে সিনেমা হল। তারপর একদিন সে অরোরা টকিজ এর টিকিট চেকার কাম আশার মোক্তারকে বিয়ে করলো। এরপর বেবিকে আর বিকেলে আপিস ছুটির পর তেমন হাঁটতে দেখা যেতনা। সারাদিন এমনিই আপিসের চক্করে ঘুরে বেড়ানোর পর সে মোক্তারের সংসারটিতে মন দিতে যেত। সেখানে মোক্তারের মা হারা দুটি ছেলেমেয়ে ছিল।
সামন্তদের প্রায়ই জমিজিরেত নিয়ে কাজিয়া লাগতো।বুড়ো সামন্তর আরেক ভাই থাকতো রেল স্টেশনের ওপারে সুতো কলের দিকে। সে মাঝে মাঝেই বসত বাড়ির ভাগ নিয়ে ঝামেলা করতে আসতো। দেশ গাঁয়ের চাষ বাড়িতে দুই ভাইএরই অনুগত চাষা মুনিশের অভাব ছিলনা। লাঠি, তীর- ধনুক, বল্লমসহ তারা হাজির হত।সামন্ত আর তাদের শরিকদের মস্ত থামওয়ালা ভাঙাচোরা বাড়িগুলি এক পাশে নিয়ে যে মস্ত মাঠখানা, মাঝে বুড়ো অশ্বত্থ, তার দুই পাশে দুই জুজুধান পক্ষ হুংকার ছাড়তো। মহিলা মহলে কান্নার রোল উঠত। পাড়ার লোক দাঁড়িয়ে পড়ত। ছেলেপুলেরা ইস্কুল কামাই দিত। ইস্কুলের গেটে বসা পেয়ারা শসা আচার আর আইসক্রিমওয়ালা মাঠের ধারেই সেদিনের ব্যবসা সারতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ হতনা। কেউ পুলিশে খবর দিয়ে দিত।পরদিন জমি মাপমাপির কাজ শুরু হত মহা ধুমধাম করে। বেগম মেরীর অপেক্ষা করত সবাই। হ্যাঁ। বেবীর আপিসের খাতায় বেবী বিশ্বাস থাকলেও সব্বার কাছে সে বেগম মেরী। তাকে ভরসা করত লোকে। একটু ভালোও বাসতো হয়তো। কেউ কেউ হয়তো তাকে ঠিক গিলতে বা ফেলতে পারতোনা।
মাপজোক এর ফাঁকেই হয়তো, যখন সবাই একটু জিরিয়ে নিত,তখন রঙ্গীন বেগম মেরীর সাথে নির্জন সাবিত্রীর আলাপ হয়ে থাকবে। হয়তো এক গেলাস জল বা দুটো নাড়ু এগিয়ে দিতে গিয়ে। কেমন করে তারা কাছাকাছি এলো সেটি রহস্য। হয়তো বিপরীত চরিত্র বলেই। বেগম মেরী তারপর থেকে মাঝে মাঝেই কাজ ছাড়াও দেখা করে যেত সাবিত্রীর সঙ্গে। নেড়ীকে আদর করত। হয়তো এক ঠোঙা লজেন্স ,বা বিস্কুট এক প্যাকেট। চাইলে নেড়ি আমাদের দিত। একদিন বলল সে ইস্কুলে ভর্তি হবে। বেগম মেরীর সাথে নাকি ওর মায়ের কথা হয়েছে।
সাবিত্রীকে মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে বেরোতে দেখা যেতে লাগলো বেগম মেরীর সাথে। বসন্ত এ নিয়ে টিটকারী ছুঁড়তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সাবিত্রী উত্তর করতোনা। ওরা চান্দু শাহর মাজারে যেত। ওখানে গিয়ে বসে থাকতো। বাবা মনস্কামনা পূর্ণ করেন। সাবিত্রীর মনস্কামনা কী ছিল আমরাতো জানিনা। তবে নিজের সঙ্গে নিজে, কিম্বা পছন্দের সই এর সাথে একটু নিরিবিলিতে কাটানোর ভদ্র সুযোগ সেখানে ছিল। আঁচলে বাঁধা সামান্য সিকি আধুলি সেখানে বাবার থানে দিতে সঙ্কোচ হতনা হয়তো। সঙ্কোচ হতনা পাঁচ দশ পয়সার রাঙা ঘোড়া বেঁধে দিয়ে আসতেও। বাবা অভাবী লোকের বেঁধে দিয়ে যাওয়া ঢিল ও নাকি গ্রহণ করেন। হাত পেতে শুকনো বোদে নিতে,বা শুক্রবার খিচুড়ি র পাতে বসতে তার আর বাধো বাধো ঠেকত না। আসলে ভক্তির চোখ ধাঁধানো ঝলকানি ছিলনা বলেই হয়তো মনের কথা বাইরে আনার ছায়াময় ভরসা ছিল চান্দু শাহ মাজার। নেড়িকে নিয়ে সে যেতে থাকলো সেখানে। বেগম মেরী ছাড়া তার উপস্থিতি আর কেউ খেয়ালে রাখতো কিনা জানিনা।
ফাগুন চৈত্রে একেকদিন দিলদারে বড্ড হাওয়া ছাড়ে, শুকনো পাতা হাওয়ার ঘূর্ণিতে উড়তে থাকে। লোকের বাড়ির উঠোনে, ছাদে মেলা কাপড়গুলি ফর ফর করে যেন দড়ি ছিঁড়ে উড়ে যেতে চায় । বিকেলের দিকে রোদ নেমে এলেও হাওয়ার দাপট কমেনা। এমন দিন বুঝি হাহাকারের দিন, এমন দিন বুঝি বিষন্ন অতীতকে ছুঁড়ে ফেলার সাহসের দিন। চান্দু শাহ এমনই একদিনে দেহ রেখেছিলেন দিলদার বাজারে। কবে যে তিনি এসেছিলেন কেউ বলতে পারেনা। তবে খুব বুড়ো মানুষেরা তাঁর রওন সহন এর কথা, গানের কথা বলতে পারে। শিশুর মত মানুষটিকে বুকে ঠাঁই দিয়েছিল দিলদার। আপন মনে গান গাইতেন আর নাচতেন ঘুরে ঘুরে। যে যা দিত খুশী মনে নিতেন। বুড়োমানুষেরা গল্প বলে সেই দিনটির যেদিন তাঁর উরস হলো প্রাণের মওলার সাথে। সাধারণ গোরস্থানে দাফন করতে চায়নি তাঁকে তারা। তাই কপিশার কোল ঘেঁষে জেলেপাড়ার পশ্চিম কোনায় তিনি মাটি পেলেন। জমি দিল দত্তরা। তারা গন্ধ বণিক হলেও কিছুটা চাষ জমিতো ছিল কপিশার কোলে!
দত্তরাই কেন জমি দিলে চান্দু শাহ র জন্য? দিয়েছিল এটাই কথা। উল্টো দিকে জেলেদের সরস্বতী মন্দির। অদ্ভুত দর্শন কাঠ নাকি ভেসে এসেছিল কপিশার জলে, ধরা পড়েছিল মাছের জালে। সে জেলে তারপর স্বপন পেয়েছিল মা সরস্বতীর। তারপর তারা তাঁর মন্দির গড়ল। সেখানে সেই কাঠ দিয়ে বানানো মূর্তির পুজো করতে থাকলো নিজেদের রীতি রিওয়াজে। কেন সে দৈব কাষ্ঠ জেলের জালে উঠলো গিয়ে, মুখুজ্জেদের পবিত্র ফুল ভাসানো খিড়কি পুকুর থেকে উঠলোনা? জেলেই কেন স্বপন পেলে , সত্য পুরুতের পূর্ব পুরুষ পেলেনা --- সেসব জবাবও আমরা দিতে পারবনা। যা ঘটেছিল বা শুনেছি সেটুকুই বলতে পারি; এদিক সেদিক করে পছন্দমত অন্য গপ্প বানাই ক্যামনে? সে নাকি প্রায় দুশ বছর আগের কথা। দত্তদের টাকা ছিল,তারাই মূল দেখভালের দায়িত্ব নিল সে মাজারের। নফরকে খাদেম বসালে। ভক্তরা আসতে থাকলো ।
সাবিত্রী যখন বেগম মেরীর সাথে সেখানে যাওয়া শুরু করলে তখন খাদেম হয়ে বসেছে তার ছেলে ওসমান। ঝাঁকড়া চুলগুলি তার খোলা থাকে চানের পরে। গলায় তার সুর। বাড়ী বাড়ী গিয়ে চামর দুলিয়ে মুশকিল আসান গাওয়ার সময় তার চারপাশে ভিড় করতাম আমরা। ঝোলায় পয়সা ফেললে সেকি সুন্দর করে হাসত। আমরা আর কত টুকুই দিতে পারতাম তাকে! সে আবার মাঝে মাঝেই গেয়ে উঠতো :কেমনে চিনিব তোমারে...!
তার সুরমা পরা চোখ দুটো জলে ভরে উঠত। কোন অচেনা মানুষকে চিনবার জন্য তার এই কান্না, না চিনলেই বা ক্ষতি কী ? এ জবাব কেউ কাউকে দিতে পারেনা । আমরা বুঝব কেমন করে? তখন?
চান্দু শাহর উরসের দিনের মতোই আর এক উথালপাথাল বাতাস দিনের শেষে সেদিন চাঁদ উঠলো।সেই চাঁদ মাঝ আকাশের থেকে পশ্চিম দিকে পা বাড়াতে তবে চন্দ্রাহত ছেলে ছোকরা বুঝি বাড়ী ঢুকলো। রাত এগোলো তার মতো। হঠাৎ ই হাওয়ায় ভর করে এক চিৎকার উঠলো সামন্ত বাড়ির থেকে। তারপর চুপচাপ। ছড়ানো ছিটানো তাদের বাড়ির সিং দুয়ার এর দরজা ভাঙ্গাচোরা । লাথি মেরে তার আরো কতকটা খসিয়ে দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এল সাবিত্রী, হাতে মস্ত সেই বঁটিখানা --- খোলা ---যা নিয়ে সে নিমেষে গামলা ভরা বিচালি কেটে ফেলে! বঁটির আগায় কী একটু রক্ত? পেছনে নেড়ি ঘুম চোখে না বোঝা আতঙ্কে ! বুড়ো সামন্ত কর্তার হাতেও রক্ত। ফুলিদির নিষ্কর্মা ছেলে বসন্ত হঠাৎই খুব কাজের হয়ে উঠে সব্বাইকে হাত পা নেড়ে বোঝাতে থাকে কী করে সাবিত্রীর ঘরে লোক ঢুকেছিল, আর কী ভাবেই বা বুড়ো কর্তা ঠিক টের পেয়ে সাবিত্রীর ঘরে ঢুকে তাকে ধরে ফেলেছিল! চোরে হাত ইয়াব্বড় ছুরিতেই নাকি হাত কেটে গেছে তাঁর। ভাগ্যিস উনি ঠিক সেই সময়েই কলঘর যাবার জন্য নেমেছিলেন! বুড়ি সামন্ত গিন্নী অবশ্য যথারীতি উঠে পড়ে মুখ বাড়িয়ে শাপ শাপান্ত করতে লাগলো। তাকে কেউ ধমক দিলো। সাবিত্রী ঠোঁট টিপে চুপ করে রইলো। কিচ্ছুটি বার হলোনা তার মুখ দিয়ে।
পরদিন বেগম মেরী এল। নেড়ি নাকি বোর্ডিং এ যাবে।শহর শেষে পাহাড় তলায় সেই অনাথ মেয়েদের বোর্ডিংএ সে লেখা পড়া আর হাতের কাজ শিখবে। কেমন করে ছোট্ট নেড়ি মাকে ছাড়া থাকবে? আমরা নেড়ির জন্য কষ্ট পেতে শুরু করলাম। নেড়িকে আমাদেরই কেউ বলে এমন করে আগে ভাবিনি। তারপর কোনো এক রবিবারের সকালে নেড়িকে সত্যি রেখে আসলো সাবিত্রী বোর্ডিংএ। তার চোখ দুটি লাল হয়েছিল। তারপর একটা ছোট থলিতে জিনিসপত্র নিয়ে সে একদিন রওনা হলো বেগম মেরীর সাথে। বুড়ো কর্তা উপর থেকে ঝুঁকে রইলো,বাঁধানো দাঁতের পাটি খুলে রাখা তাকে থুত্থড়ে বুড়ো লাগছিল,চোখ দুটি কেমন ঘোলা ঘোলা, তলার ভেজা মতো ঠোঁটটা যেন ঝুলে পড়ে চিবুক ছুঁয়েছিল।
আমাদের বিকেলের মাঠ কেমন যেন ফাঁকা লাগতে লাগলো। একটা কষ্ট, একটা যেন লজ্জা আমাদের জড়িয়ে ধরলো। ছুটোছুটি খেলা থেমে গেল। কেমন বোকা বোকা লাগতে লাগলো নিজেদের। রাত্রে বিছানায় শুয়ে নেড়ির কথা আরও বেশি করে মনে পড়তে লাগলো। ওসমান চামর দোলাতে এসে নেড়ির খোঁজ করলে আমরা জবাব দিলাম। ওসমানের মুখে যেন মেঘ ঘনালো। আমাদের আবার লজ্জা লাগলো। কেন লাগলো তারও উত্তর মিললনা। তারপর আর ওসমানকে দেখিনি।ওদিকে বেগম মেরীর আসাও কমতে লাগলো, কর্তাদের রক্তের তেজ কমতে থাকায় কাজিয়া কমতে লাগলো।পরের প্রজন্ম ঢিলাঢালা।
যেমন দিন কাটে কাটতে লাগলো। দিন গড়ালো রাত এলো বছর ঘুরল। সামন্ত বুড়ী সমস্ত জ্বালা নেভালে চিতার আগুনে। বুড়ো কর্তাকে হাত, পা, মাথা কাঁপা রোগে ধরলো। সে ঘর বন্দী হলো। সামন্ত গিন্নীর দুধ দোয়ানো, ঘুঁটে দেওয়া আর নানান খিদমতের কাজে বিজলি, বাসন্তী, বালিকা নাম্নীরা এলো গেল। তাদের কাজের ফাঁকি ধরে গাল দিতে দিতে সাবিত্রীর জন্য আফশোষ উঠে এল। আমরা শুনলাম বেগম মেরী তাকে দিন কয়েক আশ্রয় দেবার পর আর অন্য জায়গায় কাজ জুটিয়ে দিয়েছে।আমাদের আর খোঁজ নেওয়া হয়নি সে জায়গার।
আমরা ইস্কুল শেষ করলাম, কেউ কলেজে ঢুকল, কেউ বিয়ে করলো,কারোর বিয়ে হয়ে গেল, কেউ বাপের ব্যবসায় নেমে পড়ল। কলেজের শেষ বেলায় সাংস্কৃতিক উৎসবে আমাদের অনেকেই যখন হর্তাকর্তা ,তখন কেউ নয়না মুর্মুকে নিয়ে এলো ইউনিয়ন রুমে। সে সে বছরে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। ভীতু নরম শ্যামলা মেয়ের গা থেকে ইস্কুলের গন্ধ মোছেনি। সে নাকি গান গাইবে। মস্ত বড় স্টেজ, মাঠ ভর্তি সিটি আর হুল্লোড় ও মেয়ে সামলাবে কী করে! যে এনেছিল সে ভরসা দিলো।কাওয়ালির রাতভোর আসরে প্রথমটা নাকি ঐ সামলায় নামজাদা কাওয়ালরা ওঠার আগে! সে নিজে কাওয়াল নয়, কিন্তু আসর বশে আনতে পারে নিজের ঢং এ। কেমন করে? পরীক্ষা দিতে রাজি নয়না মুর্মু। কাঁধের ঝোলা ব্যাগের ভিতর থেকে বেরোয় একতারা। উদারা--মুদারা --তারা হয়ে আবারও নেমে আসে নাভী কুণ্ডলীতে:
কেমনে চিনিব তোমারে---- !
নয়না ফ্রী স্টুডেন্টশিপ এ পড়ে। মা হাসপাতালে আয়ার কাজ করে। আমাদের সাথে সাথে সে এখন ঘোরে ।তারপরএকদিন তার বাড়িতে গেলাম আমরা। তার বাড়িতে নিরিবিলি নাকি বেশি।
চান্দু শাহের মাজার আমরা চিনিনা? তারই পাশে তাদের খোলার চালের ডেরা। সামনে উঠোনে লাউ মাচা। পিছনে পুকুরখানার পাশে লাল টুকটুকে জবা,সন্ধ্যা মালতী, কামিনী। এ ডেরা আমরা মনে করতে পারিনা। যেন গত জন্মের কথা। আগে ভাট ফুলে ছাওয়া ছিল এই জায়গা। শেষ কবে গিয়েছিলাম মাজারে মনে করতে পারিনা। কিন্তু তার মাকে চিনতে ভুল হলোনা! নয়না আমাদের চেনেনি তো কি? তার মা আমাদের চেনেনি তো কি? তার দরকার ও কি খুব ছিল? আমরা তাদের কেই বা ! সাবিত্রী সেই একই রকম ঋজু ,শুধু মুখের রেখায় অনেক নরম, চোখে তার হাসি। ঘরের কোনে সেই একতারা, যা বাজিয়ে নয়না গান গেয়েছে। তার ঝুমুরও ঝুলছে দেয়ালে। নয়না নাকি বাপের কাছেই গান শিখেছে। বাপ এখন মাজারে । ফিরে আসবে ঘরে রাতে। তবে মুশকিল আসানের পুরনো চামর আর সেই ঝোলাখানা ঠিক চিনে ফেলেছি আমরা। সবিত্রী ঠিক সত্যবান পেয়ে গেছে! তাকে ও নেড়ীকে চিনে আমাদের কোনো লুকোনো, অজানা লজ্জা আর গ্লানি মিটল বুঝি? খুশীর উদযাপনে একটা বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হল।
অনন্ত সময়ের কত টুকুই বা আর একটি মানব জীবনের জন্য বরাদ্দ থাকে? সেই সময়টুকু বুঝি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে হয়। অতীত সবসময়ই কি ঠিক শিক্ষা দেয়? সে কি হতাশ করেনা? সময়কে কেবল কম- বেশি- আগে-পিছের নিরিখে কে বাঁধলে ? কে বাদ দিলে তার থেকে সুস্বাদের,উপভোগের শর্তটিকে ?কে ভয় দেখালে ভবিষ্যৎ নিয়ে? ওসমানরা, বেগম মেরীরা বুঝি নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিল সেই নির্মিত ভয় থেকে। সাবিত্রীরাও সেই স্বাদ নিশ্চই পেয়েছিল। নয়তো নানান ঢংএর মরণের হাত থেকে জীবনকে কি ছিনিয়ে আনতে পারত?
তখন বেগম মেরীর খবর কী ? সেতো ইচ্ছে ডানায় ভর করে, রুপোলি চুলগুলি উড়িয়ে তখনও উড়ে বেড়াচ্ছে সারা দিলদারের আকাশ জুড়ে। তাকেতো চেনার কোনো শেষ নেই! সে মুর্শিদ শুধু উড়িয়ে দেয় আমাদের! তারপর উধাও হয়!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।