এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বেগম, রানী ,কম্যান্ডার 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯৪ বার পঠিত
  • |
    undefinedThumbnail for File:Mir Qasim.jpg
    সিরাজ উদ দৌলা ও মীর কাশিম , সূত্র উইকি মিডিয়া কমন্স 
     
    পরিচ্ছেদ দুই
    পলাশী-  মন্বন্তর –লুট

    আলমগীর –শায়েস্তা খান –মুরশিদকুলি খান
    সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের সঙ্গে জঙ্গে ফেঁসে ঔরঙ্গজেব আলমগীর সুবে বাংলা নিয়ে ভাবেন । সেখান থেকে দরবারে টাকা যা আসার আসে না মোটেই  । অনেক কথা তাঁর মনে ।
    - কী কথা ?
    - শায়েস্তা খানের কথা।  
    - মামুজান ?
    - হ্যাঁ ঔরঙ্গজেবের মামুজান শায়েস্তা খান।
    - শায়েস্তা খান মারা যাচ্ছেন ষোলোশো চুরানব্বই। এর আগে তিনি দুবারে বাংলার সুবেদার হলেন। প্রথমবার ষোলোশো তেষট্টি থেকে ছিয়াত্তর আর দ্বিতীয়বার ষোলোশো আশি থেকে অষ্টাশি।
    - হঠাৎ শায়েস্তা খান কেন ?
    - বাংলায় ফিরিঙ্গীদের , সব ধরণের ফিরিঙ্গীদের সঙ্গে  মোঘল সালতানাতের ডিল , তাদের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাকে সুবাহ জন্নত উল বিলাদ -স্বর্গ  তূল্য  শান্তিময় আর সুন্দর আশ্রয়স্থল করতে শায়েস্তা খানের কথা ছাড়া আর কারই বা কথা মনে পড়বে আলমগীর বাদশাহের ?
    মামুজান শায়েস্তা খান শিবাজির বর্গি গিরি –আচমকা আক্রমণে  কোনক্রমে জান বাঁচিয়ে , বেইজ্জত হয়ে চালান হয়েছিলেন  সুবেদার হয়ে জল জঙ্গল আর পর্তুগিজ হার্মাদ আর মগ দস্যু পীড়িত সুবে বাংলায়। যাবার আগে দরবারের তরিকা মতো বাদশাহ দেখা পর্যন্ত করেন না তাঁর সঙ্গে । অথচ দেখা যাচ্ছে ষোল শো তেষট্টিতে  বাংলায়  এসে হতমান শায়েস্তা খান  ভালোই পাকড় জমিয়ে দিলেন । সবকটা  ফিরিঙ্গী শক্তিকে জব্দ করতেন তিনি ।  এর বিরুদ্ধে তাকে ব্যবহার করে  অথচ বাণিজ্যে অনুমতি দিতেন সবাইকে কারণ দিল্লী দরবারে তাঁকে টাকা পাঠাতে হবে আর ফিরিঙ্গীদের থেকে সায়ির –বাণিজ্য শুল্ক এলে টাকা বাড়বে ।
    প্রথমে  শায়েস্তা খান স্থানীয় জমিদার - সামন্তদের সাহায্য নিয়ে একবছরের মধ্যে মোঘল নৌবাহিনীর বিশাল শক্তি বৃদ্ধি করেন।  প্রায় তিনশো যুদ্ধ পোত নিয়ে তিনি বঙ্গোপসাগরের ওপর মোঘল আধিপত্য সুনিশ্চিত করতে নামলেন।  হিন্দুস্থানে উপকূলের রাজা আর দেশের ভেতরের রাজা তখন আলাদা ছিল ।সন্দ্বীপে পর্তুগিজরা কেল্লা বানিয়ে বসে আছে আর চট্টগ্রামে মূল ঘাঁটি যাদের সেই  আরাকানের মগরা তাদের বন্ধু ।ওরাই উপকূলের রাজ করে আর সুবে বাংলায় ঢুকে বল্গাহীন অত্যাচার চালায় , মেয়ে মদ্দকে তুলে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে চড়া দামে  । 
    আগে ওলন্দাজদের সাহায্য নিয়ে  পর্তুগিজদের ঘেরাবন্দি করে হুগলীর কেল্লা দখল করতে দেখা যাবে মামুজানকে । তারপর তাদেরই  সাহায্য নিয়ে আরাকানের মগদের মূল ঘাঁটি চট্টগ্রাম দখল করেন  তিনি ষোল শো ছেষট্টিতে ।সন্দ্বীপে কেল্লা শুদ্ধু  পর্তুগিজরা মোঘল নৌবাহিনীর তাঁবেতে চলে এলো । এভাবে মামুজান বঙ্গোপসাগরের ওপর মোঘল সামরিক  পাকড় জমাচ্ছেন । পর্তুগিজ , ওলন্দাজ , দিনেমার , আর্মেনীয় আর ইংরেজ সবার থেকে বাণিজ্য শুল্ক পেয়ে আরো ধনী হয়েছিল শাহী তোষাখানা এমনটাই শুধু নয় বাংলার সওদাগর , বস্ত্র – জাহাজ –ধাতু নির্মাণ সহ সব ধরণের হস্ত  শিল্পী- কারিগর , রেশম উৎপাদক, ,ছোট চাষি সবাই সেই আর্থিক সমৃদ্ধির সুবিধে পেয়েছিল । তাঁর আমলে টাকার দাম এতোই বাড়ছে যে টাকায় আট মণ চাল লভ্য আর ঢাকা শহরের শান বেড়ে গোটা জাহানের বাণিজ্য তথা কারিগর অর্থনীতির কেন্দ্র হচ্ছে তা ।   ষোল শো আটষট্টিতে শায়েস্তা খানের বদলে শাহাজাদা আজমকে বাংলায় পাঠালো দিল্লী দরবার । আবার আশিতে মামুজানকে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন আলমগীর। তখন  ইংরেজদের পাঁয়তারা মারা শুরু হয়েছে । তারা সুবে বাংলায় প্রেসিডেন্সি বসাতে চায় । সারা হিন্দুস্থানে অবাধ বাণিজ্যের অনুমতি চাইলো তারা । ইংল্যান্ডের তখত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হলায়গলায় ছিলো বরাবর । ওই মাফিয়াদের থেকে নানা সময় টাকা পয়সা পেতে দেখা গেছে বিলেতের রাজা রানীদের তথা বৃটিশ রাষ্ট্রকে  ।
    ষোলোশো সাতান্নতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তরফে অলিভার ক্রোমওয়েলের সনদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে স্থায়ী এক জয়েন্ট স্টক কর্পোরেট সংস্থায় পরিণত করে এশিয়ায় তাদের একচেটিয়া  বাণিজ্যের  শুধু নয় , রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দিলো।  তারই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনের রাজারা পার্লামেন্টের সম্মতিক্রমে বছর বছর সনদ জারি করে  তাদের  সামরিক ও অন্যান্য অধিকার বাড়িয়েই চলে। প্রেসিডেন্সি তৈরি করার গোটা মতলবটাই আসলে ঘুরপথে কলোনি বসানোর ছকবাজি।  মুম্বাই প্রেসিডেন্সি সবচেয়ে পুরোনো তারপরেরটা  হলো মাদ্রাজ। মুম্বাইয়ের দ্বীপাঞ্চলের জমি ষোলোশো একষট্টিতে পর্তুগালের রাজা কন্যাপণ হিসেবে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে দিয়েছিলেন। তাঁদের অলিখিত শর্ত ছিল ব্রিটিশরা ওখানে কেল্লা বানিয়ে ক্রমে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা  ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির  সঙ্গে যুদ্ধে তাদের সাহায্য করবে।ওই হস্তান্তর ওয়েস্টহলের চুক্তি বলে লাগু  হয়। সে জমি চার্লস দুই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে মাত্র দশ পাউন্ডের বিনিময়ে দিচ্ছেন ষোলোশো আটষট্টিতে আর ওদের থেকে পাচ্ছেন মোটা রকমের ধার। এইভাবে রাজা পর্তুগিজদের রক্ষা করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব  সপেঁ দিচ্ছেন সশস্ত্র মাফিয়াদের হাতে।
    ষোলোশো ঊনচল্লিশে দক্ষিণ ভারতে কোম্পানি মাদ্রাসপাটনাম নামের একটা গ্রাম কেনে সমুদ্রের ধারে স্থানীয় নায়েক সামন্তদের কাছ থেকে।  সেখানেই তারা সেন্ট জর্জ কেল্লা বানিয়ে ফেলল তড়িঘড়ি।  ক্রমওয়েল সনদের আগেই সেখানে প্রেসিডেন্সির গোড়াপত্তন হয়  , সনদ পাশের পর সেখানে প্রেসিডেন্সি জাঁকিয়ে বসেছিল ষোলোশো চুরাশিতে।
    ষোলোশো বিরাশিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানের কাছে তাদের প্রতিনিধি উইলিয়াম হেজেসকে পাঠালো। সাহেব শায়েস্তা খানকে ধরে পড়লেন,  বিলেত থেকে আনা বুলিয়ন - রৌপ্য  মুদ্রা , যা জমা করে এখান থেকে দামী দামী বস্ত্র , গুড় , সোরা , নীল আমদানী  হয় তার ওপর বর্ধিত কর  কমানোর জন্য। এছাড়া গোটা দেশে বাণিজ্যের জন্য দিল্লী দরবারের কাছ থেকে ফরমান আদায়ের অনুরোধ  তো ছিলই। ফরমান  নিয়ে কথাবার্তা যখন প্রায় পাকা। মামুজান তাঁর  ভাগ্নে বাদশাহকে রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন বলে মনে করছেন হেজেস , তখনই সব ভেস্তে গেলো।  শায়েস্তা খান হেজেসকে বললেন , " আপনাদের হুগলী ফ্যাক্টরির  লোকজনকে সামলান। "
    - কেন হুজুর ?
    - সব অসৎ লোক , কোনো নিয়ম মানে না।
    -সেকি হুজুর !
    - হ্যাঁ , আর কথায় কথায় কোম্পানির বিলেতের বড় কত্তার….  কী যেন নাম ?
    - মহামান্য  জোসায়া চাইল্ড।
    - মহামান্য ! তা হলে তাঁর নাম নিয়ে  এসব দুস্কর্ম হয় কী করে ?
    - জি খোঁজ নিচ্ছি।
    - কী আর খোঁজ নেবেন ! চেষ্টা করে দেখুন।
    হেজেস খোঁজ নিতে গিয়ে গালাগালি খেলেন হয়ত । আর শায়েস্তা খান বললেন ," জানতাম ! আপনারা আংরেজরা হলেন একের নম্বরের ঝগড়ুটে আর চোর -চ্যাঁচোড় প্রকৃতির। ''(the English  are a company of base quarelling people and foul dealers.’’ India , A history , John Keay , chapter From Taj to Raj : 1682 -1750,  page 392 edition 2010) ইংল্যান্ডে বসে  মারমুখী জোসায়া চাইল্ড আর ব্রিটেনের রাজা নাকি হিন্দুস্থানের মোঘল বাদশাহকে জব্দ করতে বারো জাহাজ ফৌজ পাঠাচ্ছেন কয়েকশো তোপ নিয়ে। এসব নিয়ে ব্রিটিশ সূত্রে তেমন কিছু না পাওয়া যায়না কারণ তাদের দিক থেকে  যুদ্ধটা ছিল শেষমেশ একতরফা মার খাওয়ার ।  ফরমান না পেয়ে জোসায়া চাইল্ড এরপর ইংল্যান্ডে বসে মোঘল সালতানাতের বিরুদ্ধে ঘোষণা করবেন  , " আরে  আমাদের সঙ্গে ব্যবসা না করতে পেরে ওই মোঙ্গলদের হাজারো প্রজাকে না খেয়ে মরতে হবে। '' সুরাটের এক ইংরেজ কর্তা যিনি নিরাপত্তার অভাবে মুম্বাইয়ের ব্রিটিশ কেল্লায় ঠাঁই নিয়েছিলেন,  তাঁরও নাম ছিল চাইল্ড , তিনি বড়োকত্তার সুরে সুর মিলিয়ে  ঔরঙ্গজেবকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে তিনি মোঘল এডমিরাল সিদ্দি ইয়াকুবের নৌবহরকে  নাকি ,'' পেদে উড়িয়ে দেবেন। ''Meanwhile the Child in Bombay boasted that if Aurangzeb chose to send the admiral of his fleet against him he ‘would blow him off with the wind of his bum’ India , A history , John Keay , chapter From Taj to Raj : 1682 -1750,  page 392 edition 2010)
    এইসব পায়ঁতারাবাজির ফলে যা হবার হলো আলমগীর গোটা হিন্দুস্থানের অভ্যন্তরের সবকটা ব্রিটিশ ফ্যাক্টরি বাজেয়াপ্ত করলেন,  আমির ই বহর সিদ্দি ইয়াকুবকে ময়দানে নামতে দেখা গেলো। গোটা হিন্দুস্থানের সমুদ্ররেখা বরাবর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। ব্রিটিশরা শায়েস্তা খানের ফৌজের তাড়া খেয়ে মোঘল বন্দর হুগলী  থেকে পালিয়ে কলকাতা নামক পাণ্ডববর্জিত বদ্বীপে ঠাঁই নেবে , সেখান থেকেও তাদের হটে যেতে হবে। হাওয়া ঠাণ্ডা হলে অবশ্য ষোলোশো নব্বইতে কলকাতায় তারা স্থায়ী ভাবে ফিরে  এসে ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা তৈরি করেছিল।সিদ্দি ইয়াকুব আচমকা মুম্বাই কেল্লা অবরোধ করে ফেললেন , মাদ্রাজের কেল্লাও বাদ  গেলো না। মুম্বাইতে  একবছর ভয়ঙ্কর মোঘল অবরোধে ফিরিঙ্গীরা না খেয়ে মরে ,দুর্ভিক্ষে উজাড় হয়ে যায়।  আর টিঁকতে না পেরে তারা বাদশাহের দরবারে গিয়ে নাকে খত দিয়ে মাফ চেয়ে , দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে আবার ব্যবসা করার অনুমতি পায়।  ঔরঙ্গজেব ফিরিঙ্গীদের কাছ থেকে আসতে থাকা  বাণিজ্য শুল্ক চিরতরে বন্ধ করতে চাননি আর ইতিহাসকার জন কে বলছেন ওদের সঙ্গে মারাঠাদের ঐক্য হোক এটাও তাঁর কাম্য ছিল না। এমনই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয় ইংরেজদের যে হিন্দুস্থানে বাণিজ্যের অধিকার পাওয়ার কথা তাদের আপাতত ভুলে থাকতে হয়,  যা ইংরেজরা পাবে ফারুখ শিয়রের পেটের অসুখ সারিয়ে ষোল শো সতেরোতে ।আর হ্যাঁ , মাফ করার ফরমানে যুদ্ধের উল্লেখও করছেন না আলমগীর ।
    মামুজান শায়েস্তা খান দিল্লীতে ফিরে এসেছিলেন। তিনি মারা গেছেন ঊনিশশো চুরানব্বইতে।  তাঁর বন্দোবস্তে ইংরেজদের নিয়ে বা অন্য ফিরিঙ্গী বণিকদের নিয়ে সেরকম কোনো সমস্যা নেই আলমগীরের তাদের দেওয়া বাণিজ্য শুল্ক ঠিকঠাকই আসছে সুবে বাংলা থেকে। সুবে বাংলার সমৃদ্ধি লোকের মুখে মুখে ফেরে।  মরহুম  মামুজান শায়েস্তা খানের বন্দোবস্তে ফিরিঙ্গীদের থেকে সায়ির যা আদায় হয় তার তুলনায়  খালসা জমি থেকে আদায়  যার পুরোটাই প্রাপ্য বাদশাহের,  যেন আসতেই চাচ্ছে না শাহী তোষাখানায় অথবা সুবেদার শাহাজাদা  আজিমুশ্শান সেসব পাঠাতে নাচার ? সত্যিই চিন্তার বিষয় বটে।  শাহাজাদা মোয়াজ্জমকে শাহ আলম উপাধি দিয়েও পুরোপুরি আনুগত্য আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন আলমগীর বাদশাহ। গোলকোন্ডা অবরোধের সময় শত্রুপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে কয়েদ করতে হয়েছিল মোয়াজ্জম আর তাঁর ছেলেদের ষোলোশো সাতাশিতে। তাদের মধ্যে ছিলেন মোয়াজ্জামের মেজো ছেলে এই শাহাজাদা আজিমুশ্শানও ।  ছাড়া পেয়ে ষোল শো সাতানব্বইতে বাংলার সুবেদার হলেন  আজিমুশ্শান । এখন কায়দা করে সে  সবের , কয়েদ হবার যাবতীয় গ্লানির বদলা নিচ্ছেন তিনি ? তাঁকে একদমই বিশ্বাস করতে পারছেন না বাদশাহ ।এসময় ঔরঙ্গজেবের ভ্রু কুঁচকে ওঠে বরাবর আর এখন এই বৃদ্ধ বয়েসে সালতানাতের ভবিষতের চিন্তায় আকূল বাদশাহ কী করেন ? তিনি কি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ?  দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতেই থাকবেন  পরের পর ? তার কাছে অভিযোগ  আসছিল শাহাজাদার যতেক কিত্তিকলাপের ।
    আজিমুশ্শান  নিজে থাকেন বর্ধমানে আর রাজকাজে তাঁর মতি নেই মোটেই । তিনি নিজের লাভজনক সব কারবার ফেঁদেছেন - শস্তায় কিনছেন , ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছেন ফলে জিনিসের দাম বাড়ছে   আর আম প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। ব্রিটিশ সূত্রে   শায়েস্তা খানের  আমলেও  তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসা আর ধনসম্পদ অর্জনের কথা বলে তাঁকে গালি দেওয়া হয়েছে । হয়ত তাদের বয়ানে বাড়িয়ে বলা আছে ,  সেসবের কারণ তাদের ওপর কড়া মোঘল প্রশাসনের চাপ । ফার্সি সূত্র অবশ্য একচেটিয়া ব্যক্তিগত ব্যবসা  বন্ধের ব্যপারে  শায়েস্তা খানের  প্রশাসনিক উদ্যোগের কথা বলে ।এসবের প্রতিতুলনা যিনি করে গেছেন সেই আচার্য যদুনাথও প্রশাসক হিসেবে শায়েস্তা খানের প্রশংসাই করেছেন । সব মিলিয়ে তাঁর পূর্বসূরি মীর জুমলার মতো শায়েস্তা খানও নিজের ব্যবসা থেকে প্রচুর কামিয়েছিলেন বলেই এখনকার ইতিহাসকারদের মত কিন্তু সেসময় ঔরঙ্গজেবকে কোনো হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়নি । হয়ত ক্ষমতাশালী ওইসব সুবেদারদের নিজের ব্যবসার বিষয়টা  বিরাট বিতর্কের কেন্দ্রে আসেনি বলেই কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ হয়নি । আজ্জিমুশশানের ব্যবসার ব্যাপারটা অত্যাচারের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল আর জানতে পেরে আলমগীর শাহাজাদাকে চিঠি লিখছেন নিজে ব্যবসা করা থেকে বিরত হতেঃ
    সরকারি জুলুমকে সওদা ই খাস –নিজের ব্যবসা নাম দিয়ে চালানোর কি মানে হয় ? সওদা ই আমের –সাধারণ ব্যবসার  জায়গায় সওদা ই খাস ফলানোর কোন  হক আছে ?
    কিনছে যে ফের বেচছে সেই
    কেনায় বেচায় আমরা নেই ।
    ( পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ , রজতকান্ত রায় পাতা ১২৩ ,প্রাথমিক সূত্র রিয়াজ উস সালাতিন , গোলাম হুসেন )  
    অষ্টাদশ শতকে এসে আলমগীরকে ক্ষমতাবান রাজপুরুষদের নিজের ব্যবসা করার হক নিয়ে প্রশ্ন তুলে জোরালো বিরোধিতা করতে দেখা যাচ্ছে । আর উনি বলা  মানে সেটাকে হানাফি বিচারবিধির সিরিয়াস ব্যাখ্যা বলে মানতে দেখা যাচ্ছে বাংলার মুরশিদকুলি , আলিবর্দি সহ নবাবদের ।
    কিন্তু শাহাজাদা আজিমুশশান বাদশাহের  শুনলেন না ।  চোখের চামড়া  তুলে সুবেদারের এই দুহাতে টাকা কামানোর ব্যাপারে ইতিহাসকার সুশীল চৌ ধুরির মত হলো আসলে বৃদ্ধ আমলগীরের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারের লড়াইয়ের রসদ আগাম জোগাড় করছিলেন আজিমুশশান ।
     বাদশাহ খবর করেছেন  খালসা জমির ব্যাপারেও  , সেটা আরো  জটিল , সে ব্যাপারে ঝামেলাই ঝামেলা  আর সেটা   সালতানাতের আসলি সমস্যাকে বাড়াচ্ছে । সেটা আরো গণ্ডগোলের ।
    - সালতানাতের আসলি সমস্যা  ?
    - আসলে সমস্যা সালতানাতের সীমা বাড়ায়। কর্ষিত জমি যা থেকে খাজনা আসে তার পরিমান সীমিত।
    - আর নতুন মনসবদারদের সংখ্যা বেশি।
    - ঠিক তাই। ফলে তাদের উপযুক্ত জাগীর দেওয়া যাচ্ছে না।
    - এছাড়া অনবরত  যুদ্ধের খরচ।
    - তা মেটাতে ঔরঙ্গজেবের নিজের হাতে বিপুল টাকা দরকার। না এলেই সমস্যা ।
    - সমাধান ?
    - নিজের হাতে থাকা ভালো ভালো খালসা জমির পরিমান বাড়িয়েছিলেন বাদশাহ।
    -আচ্ছা , বাংলায় উর্বর  খালসা জমি তো অনেক ছিল।
    - এইবার সমস্যাটা ধরা যাবে মনে হচ্ছে।
    - কী রকম ?
    - বাংলায় খালসা জমির পরিমান কী ছিল তা ঠিক করে গিয়েছিলেন শাহাজাদা শাহ সুজা। কিন্তু আলমগীর লক্ষ্য করছেন বাংলার খালসা জমি থেকে খারাজ –ভূমি রাজস্ব প্রায় আসেই না ।
    - তবে সে টাকা যাচ্ছিল কোথায় ?
    - তা যাচ্ছিল শুধু শাহাজাদা আজিমুশ্শান নয়  কমবেশি সব মোঘল আমীর –ওমরাহদের পকেটে ।
    - কী করে ?
    - তারা বাদশাহের নিজস্ব খালসা জমিকে তাদের নিজের নিজের জাগীরে ঢুকিয়ে , সেখানকার আয় থেকে নিজেদের খরচ খরচা মেটাচ্ছে কারণ জাগীরে ঢোকালে তাতে বাদশাহের হক থাকে না । উলটে সরকারী খরচ মেটাতে শাহী তোষাখানা থেকে ভর্তুকি দিতে হয় ।
    - তাহলে ?
    - তাহলে যা যা করতে লাগে সেসব নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন ঔরঙ্গজেব ।
    - জরিপ ?
    - হ্যাঁ শাহ সুজার আমলে শেষ জরিপ হয় ষোলোশো সাতান্নতে। ঔরঙ্গজেব ঠিক করলেন তিনি একজন , এমন একজনকে সুবে বাংলায় , জান্নত উল বিলাদ সুবে বাংলায় পাঠাবেন যিনি  নিখুঁত জরিপ করে কোনটা জাগীর আর কোনটা খালসা চিহ্নিত করবেন শুধু নয়,  ভূমি ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে শাহী তোষা খানায় ……
    - আরো টাকা পাঠাবেন ?
    - ঠিক তাই , বাংলার দেওয়ান হিসেবে তাঁর নিজের হাতে তৈরি অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক আমলা মুহম্মদ হাদিকে পাঠাতে মনস্থ করলেন বাদশাহ ।
    উনি সে সময় ছিলেন হাদরাবাদের দেওয়ান আর ইয়েলকোন্ডালের  ফৌজদার।  ওঁর  জন্ম কোথায় সে নিয়ে ভিন্নমত আছে আচার্য যদুনাথ সরকার মনে করছেন উনি দাক্ষিণাত্যের এক ব্রাহ্মণ সন্তান ছিলেন। মাসির উল উমারাতে  শাহনাওয়াজ খান আর তাঁর ছেলে আব্দুল হাই খান , বাপ-বেটায় বলছেন উনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। পরে ছোটবেলায় ওঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয় কেনেন হাজি শফি নামের এক পারসিক অভিজাত ব্যক্তি যিনি ছিলেন রাজস্ব আদায় -দেওয়ানির কাজে অভিজ্ঞ। শফি সাহেব মোঘল দরবারে নানা সময় দেওয়ানির কাজ করতেন আর মুহম্মদ হাদিকেও ছেলের মতো সেসবে শিক্ষে দিলেন।
    সতেরোশো সাল শীত আর গরম জুড়ে শাহেনশাহ ঔরঙ্গজেব আলমগীর তখন ব্যস্ত ছিলেন মারাঠাদের একের পর এক কেল্লা দখল করতে।যত না রক্তপাত হয় তাতে তার অনেক গুণ বেশি মারাঠা সর্দারদের ঘুষ দিয়ে কেনার ফন্দী ফিকির লাগে। সে জন্য অবিরত টাকা চাই। বর্ষাকালে শোলাপুরের কাছে খাওয়াসপুরে শাহী তাঁবু গাঁড়া হলো আর বাদশাহের তলবে  সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন মুহম্মদ হাদি।  দরবারে আলমগীর বসে , কাল রাতে কোমরের ব্যথাটা  টাটিয়ে ওঠায় মাঝে মধ্যে চিক দিয়ে উঠছিলেন তিনি।  হেকিমি তেল লাগিয়েও একটা আড়ষ্ট ভাব রয়ে গেছে তা বলে দরবারে বসে চিক দেবেন না বাদশাহ , কিছুতেই দেবেন না। দেওয়ান মুহম্মদ হাদি কুর্নিশ করে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বাদশাহ তাঁকে বললেন , " দেওয়ান নিশ্চয়ই জানেন সুবে বাংলা শুধু সব সুবের মধ্যে  জন্নত তুল্য নয় , তা গোটা সালতানাতের গৌরব ।‘’
    • জি হুজুর ।
    • সেই জন্নতের আওয়াম যখন বাদশাহের কাছে কেঁদে পড়ে তখন কী হয় ?
    • হুজুর তখন শাহেনশাহ ইনসাফ করবেন।
    • ঠিক তাই। আপনাকে বাংলা মূলুকের দেওয়ান করা হচ্ছে।  তৈরি হোন। সেখানে সুবেদার শাহাজাদা আজিমুশ্শান নয় আপনি বাদশাহের হুকুম তামিল করবেন।
    • সেটাই স্বাভাবিক হুজুর  কারণ মুলুক বাদশাহের।
    •  কিন্তু সবই খোদাতাল্লার সৃষ্টি -খালক এ খুদা।
    •  জি হুজুর।
    মুহম্মদ হাদি কুর্নিশ করে চলে গেলেন। বেশ কিছু মাস পর তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগরে , এখনকার ঢাকায় , দেওয়ানের দপ্তরে যোগ দিলেন সতেরোশো সালের সতেরোই নভেম্বর। ইঙ্গ –মোঘল যুদ্ধের সময় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পূব ভারতের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত হতো।  ক্রমে তারা বাংলায় তাদের ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি বসিয়ে ফেলছে ওই সতেরোশো সালেই।  একইসঙ্গে দুটোই ঘটলো সে বছর ।
     আজিমুশশানের হলো ছুঁচো গেলার অবস্থা রাজস্ব বিভাগের ওপর তাঁর আর কো নো নিয়ন্ত্রণই  রইলো না । মুহম্মদ হাদি তাঁকে সামনে হুজুর হুজুর করেন বটে কিন্তু আসলে পাত্তা দেন না । অন্য জাগীরদাররা যারা বাদশাহের জন্য নির্দিষ্ট খালসা জমির রাজস্ব হাতাচ্ছিল তারাও চাপে পড়ে গেলো । দেওয়ানের আমলারা জমি জরিপে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে । এতদিন তারা চোখ বুজে থাকত আর এখন তারা তৎপর হয়ে খালসা জমির রাজস্ব বুঝে নিচ্ছে কড়ার গণ্ডায় । আর অনুগত মুহম্মদ হাদি বাদশাহের কাছে কড়ায় গণ্ডায় হিসেব বুঝিয়ে টাকা পাঠাচ্ছেন । বাদশাহ খুশ।  করতলব খান মানে হলো যিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো বাসেন।  মুহম্মদ হাদি  সত্যিই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। আলমগীর হাদি সাহেবকে করতলব খান উপাধি দিয়ে ছিলেন বাংলায় আসার আগেই ।সুবে বাংলা থেকে আসা টাকার পরিমাণ বাড়ার পুরষ্কারস্বরূপ করতলব খানকে সতেরশো দুই সালের তেইশে ডিসেম্বর মুরশিদকুলি খান উপাধি দিলেন বাদশাহ ।
    এদিকে  আজিমুশ্শানের সঙ্গে দেওয়ানের ঠাণ্ডা লড়াই চরমে ওঠে । এরমধ্যে তাঁর প্রাণহানির চেষ্টা হলো ঢাকায় । শাহী কোষাগারের থেকে সরাসরি মাইনে পাওয়া নগদি সেপাইরা,  মাইনে না পেয়ে ক্ষেপে উঠলো । তাদের পে মাস্টার মুরশিদকুলি খান । তাই তাদের উস্কানি দিয়ে আজিমুশশান পথের কাঁটা দূর করার চেষ্টা করলেন ।মুরশিদকুলি খান নাকি রোজ সকালে  সেপাই লস্কর নিয়ে হাতিয়ারবন্দ অবস্থাতে সুবেদার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন । একদিন সকালে পথে নগদি সেপাইরা আব্দুল ওয়াহিদের নেতৃত্বে  মুরশিদকুলি খানকে ঘিরছে, দুপক্ষই  তলওয়ার বের করে ফেলেছে , সব্বার চোয়াল শক্ত  ।আব্দুল ওয়াহিদ বলছেন , “ হুজুর আপনার কাছে কোনটা বড় –আমাদের মাইনে না আপনার জান ?” মুরশিদকুলি খান বললেন ,” আমার জানের দাম চাইছ না মাইনের টাকা ? ‘’ শুনে সেখানিক ঘাবড়ে আমতা আমতা করতে থাকলো ।মুরশিদকুলি এই সুযোগ টা নিলেন , তিনি বললেন ,” যে মাইনের টাকা চাইতে আমতা আমতা করে সে নিশ্চয়ই অন্যের জানের দাম বাবদ টাকা আগেই পেয়েছে । একে জিজ্ঞেস করো আমাকে মারার জন্য এই  সুবার যিনি কর্তা সেই সুবেদার , যার হুকুমে তোমরা মাইনের টাকা পাবে , তিনি কতো টাকা অগ্রিম দিয়েছেন ।‘’ শুনে অন্য মারমুখী সেপাইরা দোটানায় পড়ে, তারা ভাবছে কার কথায় দেওয়ান সাহেবকে মারতে এলাম । মুরশিদকুল তাদের বোঝাচ্ছেন ,” সুবেদার সাহেবের কাছে চলো ।এস পার ওসপার হয়ে যাক ।‘’ সবাই তাঁর সঙ্গে আজমুশশানের কাছে গেলো ।দেওয়ান তাঁকে চেপে ধরলেন ,’’ এই সেপাইরা মাইনে পাচ্ছে না । আর আপনি ওদের সর্দারকে টাকা দিয়ে আমাকে মারতে পাঠিয়েছেন । মনে রাখবেন শাহেনশাহ আলম গীর নিজে আমাকে দেওয়ানির দায়িত্ব দিয়েছেন ,তাঁর হাত অনেক লম্বা ।যদি আমার জান যায় বাদশাহ আপনাকে ছেড়ে দেবেন না ।জানের বদলে জান যাবে ।‘’
     ঔরঙ্গজেবকে চিঠি লিখে  সব   জানালেন দেওয়ান,  অনুরোধ করলেন তাঁকে সরিয়ে দিতে।  বাদশাহ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে নিজের বেয়াড়া  নাতিকে  পাত্তা না দিতে বললেন :
    আপনার বক্তব্য আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। দেওয়ান ফৌজদার হিসেবে আপনার পুরোপুরি ক্ষমতাতাতে কারও হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। আপনার বিরুদ্ধে কারও কোনও অভিযোগই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আপনার ওপর আমার যে আস্থা এবং বিশ্বাস সে বিষয়ে আপনি সন্দেহ করছেন কেন? কোনও শয়তানের অভিসন্ধিই সফল হবে না। আল্লা আমাদের এইসব শয়তানের হাত থেকে নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন।আপনার প্রতি আমার আস্থার কথা মনে রাখবেন, আমার নির্দেশগুলি খেয়াল রাখবেন, মনে কোনও শঙ্কা রাখবেন না। আরও বেশি মন দিয়ে রাজস্ব আদায় করে যান। ( নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ , সুশীল চৌধূরী , History of Bengal,Sir Jadunath  Sarkar vol. II, p. 401-তে উদ্ধৃত  প্রাথমিক সূত্র ইনায়েতুল্লা খানের  আহকাম ই আলমগীরি )
    এর থেকে বোঝা যায় যে মুর্শিদকুলি খানের ফৌজদার হিসেবে সুবেদারের অধীনে কিছু সামরিক ক্ষমতা ছিল। তবে সেই ক্ষমতা দিয়ে ঢাকায় আজিমুশশানের নাকের ডগায় বসে নিজের সুরক্ষা বলয়  তৈরি করা তাঁর কম্ম ছিল না । জান বাঁচাতে  মুরশিদকুলি খান আলমগীর বাদশাহের অনুমতি নিয়ে মুখসুদাবাদে দপ্তর সরিয়ে নিয়ে আসেন । 
    আজিমুশশানকে বাদশাহ ছেড়ে কথা  বললেন না  । ঔরঙ্গজেব আলমগীর  তাঁর নাতিকে হুমকি দিয়েছিলেন :
    করতলব খাঁ সম্রাটের একজন পদস্থ কর্মচারী। ওর শরীরের বা সম্পত্তির যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়, তা হলে মনে রাখবে আমি তার শোধ তোমার ওপরই তুলব।( নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ , সুশীল চৌধূরী , History of Bengal,Sir Jadunath  Sarkar vol. II, p. 402-তে উদ্ধৃত প্রাথমিক সূত্র ইনায়েতুল্লা খানের  আহকাম ই আলমগীরি )
     শাস্তিস্বরূপ  আজিমুশশানকে  বিহার সুবায় বদলি হতে হচ্ছে সতেরশো তিন নাগাদ । ব্যালেন্স করার জন্য আজিমুশশানকে নিজের নামে পাটনার নাম  বদলে দেওয়ার অনুমতি দিলেন ঔরঙ্গজেব, নতুন নাম হলো আজিমাবাদ । ছেলে ফারুখ শিয়রকে ঢাকায় রেখে গিয়েছিলেন সুবেদার । কিন্তু দেখা গেলো কার্যত মুখসুদাবাদই হয়ে উঠছে সুবে বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র । বাদশাহের অনুমতি নিয়ে মুরশিদকুলি খান সতেরশো চার নাগাদ রেশমি কাপড় আর কাঁচা রেশমের পুরোনো  উৎপাদন কেন্দ্র মুখসুদাবাদের নতুন  নামকরণ করে মুর্শিদাবাদ করছেন নিজের নামানুসারে  । আজিমাবাদ নামটা ভুলে কবে আবার পাটনা হয়ে গেছে কিন্তু মুখসুদাবাদের বাদশাহী নাম মুর্শিদাবাদ রয়ে যায় শুধু সরকারি খাতায় নয় , লোকের মুখে মুখে আর তাদের মনের গভীরে ।এর কারণ হলো বাংলায় মুরশিদকুলি খানের দেওয়ানি বন্দোবস্তের গভীর প্রভাব ।
     
    মুরশিদকুলি খানের আগে বাংলায়  শক্তিশালী মোঘল কেন্দ্রের যুগে প্রশাসনিক / ভূমি বন্দোবস্ত
     
    .১ )প্রধান দুই ভাগ
     ঔরঙ্গজেবের আমলে সব সুবার মতো বাংলার প্রশাসনও নিজামত আর দেওয়ানি দুভাগে বিভক্ত ছিলো । নিজামতের প্রধান ছিলেন সুবেদার আর দেওয়ানির প্রধান ছিলেন দেওয়ান ।দুজনকেই শাহী দরবার থেকে নিযুক্ত করা হতো ।

    ২) নিজামতের ন্যস্ত দায়িত্ব
     নিজামতের কাজ ছিলো শাহী দরবার নিযুক্ত মনসবদারদের অধীন সওয়ারদের তদারকি , সামরিক কাজ পরিচালনা আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ।

    ৩) দেওয়ানির ন্যস্ত দায়িত্ব
    দেওয়ানিতে মূলত হিন্দু রাজকর্মচারীদের দিয়ে জমিদারদের কাছ থেকে মালজমির ( খালসা  বা জাগীরের জমি)  খাজনা- খারাজ  আর হাট , গঞ্জ , বাজার আর জলচৌকি (জলপথে বাহিত পণ্যের ওপর শুল্ক আদায় ও নিরাপত্তার জন্য চৌকি ব্যবস্থা ) থেকে সায়ির ( বাণিজ্য শুল্ক ) আদায় করা হতো ।

    ৪) কানুনগোর ন্যস্ত দায়িত্ব
    দেওয়ানিতে কারচুপি আর তছরূপ আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন ‘স্বাধীন বঙ্গাধিকারী কানুনগো’ ( রজকান্ত রায়ের ভাষায় )  , এখনকার অডিটর জেনারেল অফ বেঙ্গলের মতো,  যাঁর  অধীনে পরগনায় ,পরগনায় কানুনগো আর মৌজায় মৌজায় পাটোয়ারীরা দলিল আর হিসাব রাখতো।

    ৫) দুই ভাগের কাজের ধারা ও যৌথতা
    ভূমি বন্দোবস্তের ফাংশান্যাল ইউনিট ছিল মৌজা –গ্রাম যা এখনো আছে , কতগুলি মৌজা নিয়ে পরগনা , বেশ কিছু পরগনা নিয়ে এক এক সরকার আর বেশ কিছু সরকার নিয়ে সুবা ।পরগনার নিজামতের দায়িত্বে ফৌজদার আর দেওয়ানির দায়িত্বে আমিলরা  থাকতো । মোঘল প্রশাসনে আমলাতন্ত্র ছিলো একাধারে সামরিক ও অসামরিক যৌথ (paired) ফলে সুবেদার ও দেওয়ান একই লোক হতে পারতো  বা দেওয়ানরা  সুবেদারের অধীন ফৌজদার হতো  যেমন মুরশিদকুলি খান দুটোই হয়েছিলেন । ফৌজদার হতে গেলে বেশ ওজনদার মনসবদার হতে হতো । সে  জমিদারদের শায়েস্তা করতে সদা তৎপর থাকতো  , । অনেকক্ষেত্রে ফৌজদারদের  জমিদারদের সরিয়ে সরাসরি দেওয়ানির আমিল, সাজোয়ালদের  আর  খাজনা আদায়ে নিযুক্ত নানা ধরণের ঠিকেদার এজেন্ট যেমন  ওয়াদাদার , ইজারাদারদের দিয়ে সরাসরি খাজনা আদায়ের দাপট দেখাতে দেখা যেত ।

    ৬ )ক্ষমতাধরের দুই রূপ : বদলী যোগ্য ও  স্থানীয়
    মোঘল আমলে সালতানাতের ভরকেন্দ্রে ছিল ঘোড়সওয়ার বাহিনী আর তাদের পুষতো যারা সেই মনসবদাররা ।দেওয়ানির কাজে যুক্ত রাজপুরুষরাও প্রত্যেকেই ছোট বড় মনসবদার । ঔরঙ্গজেবের আমলে তারা সবাই শাহী দরবার থেকে নিযুক্ত হতো । মনসবদারদের নিয়োগ বদলীযোগ্য , তাদের র‍্যাঙ্কও পারফর্মেন্স নির্ভর , এমনকি অপসারণযোগ্য । মনসবদারি বংশানুক্রমিক নয়। সওয়ার পোষার  খরচ চালাতে তাদের হয় শাহী তহবিল থেকে মাইনে দেওয়া হ তো বা পরিমান মতো মালজমির জাগীর দেওয়া হতো দুটোই পরিবর্তন শীল । মোঘল সুবার  প্রশাসনে সরাসরি যুক্ত নিজামত, দেওয়ানি আর কানুনগোই কর্মচারীদের কেউই বংশানুক্রমিক প্রিভিলেজ পেতেন না । তবে একটা স্তর এই গতিশীল প্রশাসনের অঙ্গ ছিল সেটা কিন্তু বংশানুক্রমিক । প্রথাগত সামাজিক ক্ষমতাবানদের মাধ্যমে চতুর্বর্ণ ভিত্তিক গ্রাম সমাজকে শাসন করার জন্য পরগনায় পরগনায় একজন স্থানীয় জমিদার বা চৌধুরীদের বংশানুক্রমিক প্রিভিলেজ দিয়ে রেখেছিল এই মোঘল প্রশাসনই ।তারা  খাজনা আদায় করে আমিলদের হাতে তুলে দিতো আর পাইক নিয়োগ করে স্থানীয় স্তরে চুরি ডাকাতি আটকাতো।এই খিদমতের জন্য মালজমি আর সায়ির থেকে সংগ্রহের দশ শতাংশ পেতো  বংশ পরম্পরায়। এইভাবে মোঘল সুবা প্রশাসনে বদলী যোগ্যদের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোয়  বংশানুক্রমিক অধিকারপ্রাপ্ত চৌধুরী –জমিদার আর তাদের অধীন তালুকদাররাও ছিলো ।

    মুরশিদকুলি খানের পর   দুর্বল মোঘল কেন্দ্রের যুগে আর স্বাধীন নিজামতে (নবাবী আমলে ) প্রশাসনিক / ভূমি বন্দোবস্ত
    ১ ) ঔরঙ্গজেবের জীবিত অবস্থায় মুরশিদকুলির ভূমিকা
    মুহম্মদ হাদি বা করতল ব খান ,  পরে যাকে মুরশিদকুলি খান উপাধি দেওয়া হবে , সেই দেওয়ানকে ঔরঙ্গজেব  সুবে বাংলায় পাঠাচ্ছেন মালজমি থেকে আদায় বাবদ কেন্দ্রীয় তহবিলে প্রাপ্য টাকা বা খালসার অংশ ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে সরাসরি তাঁর কাছে পাঠাতে। একাজে অন্তরায় ছি লো জাগীরপ্রাপ্ত মনসবদাররা । তারা দুই পঞ্চমাংশ মানে চল্লিশ শতাংশের ম তো হকদার ছি লো কিন্তু হাতিয়ে নিচ্ছিল বেশি । মুরশিদকুলি খানকে পাঙ্গা নিতে হচ্ছিল নিজামতের প্রভাবশালীদের সঙ্গে যার মধ্যে বাদশাহের নাতি সুবেদার আজিমুশশানও ছিলেন । প্রথম দিকে খালসার বেশি টাকা পেয়ে শাহী দরবার  সন্তুষ্ট থাকার কথা। এর ফলে দেওয়ানির একটা কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে চলে আর তাতে ঔরঙ্গজেবের অনুমোদন ছিল। দেওয়ানি তে মূলত হিন্দু স্থানীয় রাজপুরুষরাই যুক্ত ছিলো। নিজের নাতির বিরুদ্ধে গিয়ে বাদশাহ এই রাজপুরুষদের ক্ষমতা বাড়ানোতে মুরশিদকুলিকে প্রত্যক্ষ মদত দেন। তাঁর কাছে দক্ষতাই একমাত্র মাপকাঠি। যুদ্ধের জন্য ,সে যুদ্ধের কৌশলেই  দাক্ষিণাত্যে মারাঠা সর্দারদের ঘুষ দিয়ে একের পর এক কেল্লা দখলের জন্য তাঁর চাই টাকা, প্রচুর টাকা। 

    ২ ) ঔরঙ্গজেবের পর মোঘল কেন্দ্র হলো দুর্বল আর দেওয়ানির ক্ষমতা হলো বেশি
    শেষ মেশ সতেরশো সতেরোতে আজিমুশশানের ছেলে বাদশাহ   ফারুখ শিয়র মুরশিদকুলিকে একাধারে সুবেদার আর দেওয়ান পদে নিয়োগ করলে সুবে বাংলায় মুরশিদকুলি খানের যুগ শুরু হলো।  দিল্লীর নিজেরই তালের ঠিক নেই তাই কে কাকে মনসবদার নিয়োগ করে।  এরমধ্যে বাংলার দেওয়ানি কাঠামোতে পরিবর্তন হয়ে হিন্দু রাজপুরুষদের সংখ্যাও বেড়ে গেছে।ফলে প্রথাগত মোঘল ইরানি –তুরানি –হিন্দুস্থানী সওয়ার মনসবদার কেন্দ্রিক শাসক শ্রেণীর চরিত্রও অনেকাংশে পালটেছে ।

    ৩ ) স্বাধীন নিজামত
    ঔরঙ্গজেবের  মৃত্যুর পর  থেকেই  মুরশিদকুলি দিল্লী দরবারে টাকা পাঠাতেন বটে কিন্তু স্বাধীন ভাবে নিজামতের কাজ চালাতে আরম্ভ করলেন । এই নবাবী আমল টিঁকে ছিল তাঁর যুগোপযোগী বন্দোবস্তের ভিত্তিতে। যার মূলে আছে অল্প ব্যয়ে রাজস্ব আদায়ের কাঠামো আর দেওয়ানি ভিত্তিক শাসনতন্ত্র  নির্মাণ। সেটা করতে গেলে জমির ওপর মোঘল ফৌজি -মনসবদার -সওয়ার নির্ভর সামরিক  কাঠামোর প্রত্যক্ষ দখলদারিকে কমাতে হয়।    

    ৪) মুরশিদকুলি খানের বন্দোবস্ত
    ক) প্রেক্ষাপট
    ইরফান হাবিব দেখেয়েছেন ঔরঙ্গজেবের আমলেও বাংলায় মাত্র দেড় শতাংশ জমি জরিপ হয়েছিল( Agrarian System of Mughal India ,১৯৬৩এর সংস্করণের  পাতা ৪ এর টেবিল )  যা সেসময়ে সালতানাতের গড় জরিপ ঊনপঞ্চাশ শতাংশের থেকে অনেক কম । ফলে অনেক কিছুই আন্দাজে চলে । হয়ত এর সুযোগই জাগীরদাররা নিয়ে খালসার রাজস্ব হাপিশ করছিল । এই জরিপ যা হয়েছিল তা হয় অনেক আগে  টোডর মল আর শাহ সুজার আমলে।  তাই বাদশাহের নিশ্চয়ই তাগিদ থেকে থাকবে ঢালাও জরিপের ।
    খ ) নয়া জরিপ
    বাদশাহ মারা যাবার  পর সতেরোশো বাইশে সে কাজে দম লাগিয়ে  মুরশিদকুলি জাগীরদার –মনসবদারদের ডানা ছাঁটছেন । বাংলার জলা জমিতে ঘোড়সওয়ার বাহিনী অকেজো ধরে আর খরচ কমাতে তিনি এমনকি নিজের সদরের তিন হাজার সওয়ারকে দরজা দেখিয়ে দিচ্ছেন । বেশিরভাগ জাগীর সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ওড়িশায় আর বাংলার পঁচাত্তর ভাগ মালজমি খালসার অন্তর্ভুক্ত করছেন ফলে রাজস্ব সংগ্রহের কেন্দ্রীভবন হয় । এই জমিতে সঠিক পরিমাপের রাজস্ব স্থির করে তা সংগ্রহের জন্য  ইজারাদার লাগিয়ে দেওয়া হলো। এরাই পরে জমিদার বনছে । 
    সুবে বাংলার চৌতিরিশটা সরকারে সম সংখ্যক ফৌজদার ছিল ।নবাবি আমলে সরকারগুলো ভেঙে তেরোটা পেল্লায় চাকলা সৃষ্টি হচ্ছে ।এদের মধ্যে জমিদার তালুকদারি সব স্বত্ব একত্রে ধরে বড় বড় পঁচিশ জমিদারদের অধীনে মোট পঁচিশটা ইহতমাম সৃষ্টি করা হলো । নিজামতের ফৌজি নিয়ন্ত্রণে থাকছে মাত্র দশটা এলাকা ,তারমধ্যে ঢাকার ডেপুটি সুবেদার বা নায়েব নাজিমের এলাকাটাই সবচেয়ে বড় মনসবদার শাসিত এলাকা । সরকার উঠে যেতে সেখানের নিজামতের ফৌজদার শুধু নয় দেওয়ানির আমিল বা অন্যদেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছিল ।সরাসরি রাজকর্মচারী কমিয়ে মুরশিদকুলি খরচ কমালেন , রাজস্বের আদায় মূলত জমিদারদের আউট সোর্স করে দিলেন । তাঁর দেওয়ানির অনেক দক্ষ হিন্দু আমলা জমিদার বনে যাচ্ছে ।নবাবের  ধারণা , তাঁর প্রসাদপুষ্ট এই  হিন্দুরা বেগোড়বাঁই করবে  কম ।

     ৫) ইহতমামের ক্ষমতা বৃদ্ধি
    বাংলার বেশিরভাগটাই ইহত মামের বড় বড় জমিদারদের হাতে চলে গেলো ।মূলত হিন্দু আর পাঠান এইসব জমিদাররা নবাবের আমলে ক্রমে এক একজন স্বাধীন রাজা হয়ে বসলো । তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়ে এলাকা দখল শুরু হলো।  সাত জন রাজা মহারাজা হয়ে  উঠলো গুরুত্বপূর্ণ : বর্ধমান , বিষ্ণুপুর , বীরভূম , নদীয়া ,যশোর , রাজশাহী আর দিনাজপুর । এই জমিদারদের মধ্যে আড়ে বহরে সবচেয়ে বড় রাজশাহীর –নাটোর রাজ্যের  জমিদার  রানী ভবানীর জমির একটা মাপ পাওয়া যায় ।সতেরশো সাতান্নতে রেনেলর জরিপে নাটোরের আয়তন ছিল ১২,৯০৯ বর্গ মাইল ! মুরশিদকুলি স হ অন্য নবাবরা কেউ কম কেউ বেশি তাঁদের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাবলে এদের থেকে  রাজস্ব আদায়ের জন্য মুর্শিদাবাদ  থেকে আমিল পাঠিয়ে  এদেরও ওপরে যেতেন প্রতাপের বহরে আর অত্যাচারের দাপটে । রাজস্ব অনাদায়ে অনবরত  জমিদারদের জেলে পোরা , জমিদারী দপ্তরের আমলাদের আটক করা , নানা সব অত্যাচারের কাহিনি এখনো লোকমুখে ফেরে । সবাই তটস্থ , এধার থেকে ওধার হলে  কবে নবাবরা  না খাল খিঁচে নেন ।

    ৬) রাষ্ট্রীয় ব্যাংকার জগত শেঠ
    সাধারণ পরিস্থিতিতে জমিদাররা জগত শেঠদের কাছে ধার করে হলেও সময়মতো খাজনা মিটিয়ে দিতো । সেজন্য তাদের সুদ গুনতে হতো। দিল্লী দরবারে প্রথম প্রথম নগদ টাকা পাহারা লাগিয়ে পাঠানোর হ্যাপা ছিলো । পরে জগত শেঠরা হুন্ডি কাটতো আর সেটা ভাঙিয়ে শাহী তোষাখানায় টাকা জমা পড়তো। শেঠদের টাঁকশালে মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ , বিভিন্ন চালু মুদ্রার বিনিময় হার ঠিক করা , ফিরিঙ্গীদের থেকে রুপোর বুলিয়ন জমা রেখে নবাবী সিক্কা টাকা দেওয়া ।একথায় সুবে বাংলায় টাকার যাবতীয় সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করতো হাউস অফ জগত শেঠ । তাদের কোষাগারই নবাবী কোষাগার ।সঞ্চালনের প্রতিস্তরেই তারা সুদ বাবদ টাকাও কামায় ।

    ৭) মুরশিদকুলির বন্দোবস্তের ফলাফল

    নবাবী প্রশাসনের নিজামত আর দেওয়ানির কলেবর ছোট হয়ে নবাব –জগত শেঠ –জমিদার জোট আর তাদের ঘনিষ্ঠ আঁতাতই রাজত্ব চালিয়েছিল কিছুদিন । ফলাফলে সুবে বাংলায় সওদাগরী অর্থনীতির সুসময় আসে । ঔরঙ্গজেবের বিচারে নবাবরা নিজের ব্যবসা – সওদা ই খাসে বিরত ছিল । ফলে   ছোট উৎপাদক লাভ পায় ।
    কিন্তু সামরিক কাঠামোর ফৌজদার ভিত্তি দুর্বল হতে বর্গীদের পক্ষে কিছু এলাকায় শাসন কাঠামো চুরমার করে লোকের সব্বনাশ করতে সুবিধে হয় ।
     ইংরেজরা এই আঁতাত ভেঙে  পলাশীর জঙ্গে জিতে নবাব বনে যাচ্ছে ।
     মোটের ওপর স্বাধীন নিজামতে মুরশিদকুলির বন্দোবস্তে প্রাচীন মোঘল কাঠামো আমূল বদলে গিয়েও নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসেবে মোঘল বাদশাহকে মেনে চলতে থাকে  ।পরে ওই মাফিয়ারা শেঠ –সওদাগরদের ধ্বংস করে   নয়া জমিদার শ্রেণীর ওপর নির্ভর করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আনে  ।


    জানার কোনো শেষ নাই মীরজাফরের  চেষ্টা বৃথা তাই
    যুদ্ধে ইংরেজদের হারানোর পর ঔরঙ্গজেব আলমগীর ফরমান দিয়ে হেরো ইংরেজদের বছরে তিন হাজার টাকার পেশকসের বিনিময়ে কলকাতায় ঘাঁটি গেঁড়ে সুবে বাংলায় নিঃশুল্ক ব্যবসার অনুমতি দিলেন ।  সেখানে ফিরিঙ্গিরা ষোলোশো ছিয়ানব্বইতে কেল্লা বানাচ্ছে তারপর সুতানটি , গোবিন্দপুর আর কলকাতা গ্রামের জমিদারী সত্ব পাচ্ছে। সেখানেই তারা কলকাতা প্রেসিডেন্সি বসালো অষ্টাদশ শতকের গোড়ায়।  ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এই বন্দোবস্ত বিগড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে,  ফরমান আর মানে কে। সতেরোশো সতেরোতে ফারুক শিয়রের ফরমান ইংরেজদের বাঁচাল।  তারা নিঃশুল্ক ব্যবসার অনুমতি ফিরে  পেল আর তাদের জমিদারী বেড়ে তিনের জায়গায় আট তিরিশটা গ্রামে ছড়াচ্ছে। অতিরিক্ত পাওনা হিসেবে শাহী অনুমোদিত  টাঁকশাল বসানোর সুযোগ পেয়ে বলবান হলো তারা ।মুম্বাই আর চেন্নাইয়ের মতো কলকাতাতেও ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি একবার বসে গেলে যা হয় আরকি। ফিরিঙ্গীদের জিভ লক লক করে আর অনবরত দস্তকের শর্ত –চুক্তি লঙ্ঘন করে কর ফাঁকি দিচ্ছে তারা  আর কেল্লাকে মজবুত করাও চলছে ।মুরশিদকুলি খান থেকে সিরাজ সব সব স্বাধীন নবাবদের সঙ্গে ইংরেজ মাফিয়াদের এই লক লকে  টাকা আর সামরিক শক্তি বাড়ানোর,  কলোনি বসানোর লোভের ঠোকাঠুকির শব্দ শোনা যায় । অন্যেরা সামলাতে পেরেছিলেন আর উঠতি বয়েসের সিরাজ কোতল হচ্ছেন ষড়যন্ত্রের তন্ত্র সামলাতে না পেরে ।
    - আবার শুরু করলে ?
    -মানে ?
    - জানাতে।
    - জানতে হয়।
    - আর জানার চেষ্টা বৃথা হয় না ?
    - হ্যাঁ , তাও হতে থাকে , বৃথা হতে থাকে কারণ অতীতের সব কিছু , পুরোটা অধরা থাকে।
    - কতখানি ?
    -আবার জানার চেষ্টা করছো।
    - করছি ?
    - হ্যাঁ , পরিমাপ করবে কী করে ?
    - লুটের ?
    - লুটের পরিমাপ হয় যেমন ক্লাইভের -কোম্পানির লুটের পরিমাপ হয়।
    - আবার জানাতে শুরু করলে।
    - সব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিলেক্ট কমিটির মিনিটসে লেখা থাকে।
    - সওদা ই খাসের কথা ?
    - লেখার তলায় যে লেখারা থাকে , লাইনের পরের লাইনের মধ্যে যে ফাঁক …
    - সেখানে ?
    - সব লেখা পড়া যায় আর যাদের লুট করা হলো তাদের চামড়ায় চামড়ায় লুটের দাগ …
    - সেও পড়া যায় ?
    -  কী
    - লুট আর মারের দাগের ইতিহাস ?
    পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করে মুরশিদকুলির সযতনে গড়া নবাব -শেঠ -জমিদার আঁতাত ভেঙে নিজেরা নবাব আর আমির বনতে  চেয়েছিল , তারা আসলে ভুল করে ক্লাইভকেও  সাবিত জং উপাধি পাওয়া এক মোঘল মনসবদার কল্পনা করেছিল।
    এই সাবিত জং উপাধি ক্লাইভ পেয়েছিলেন সতেরোশো একান্নতে।দ্বিতীয় কর্ণাটক যুদ্ধের অঙ্গ হিসেবে  ফরাসী সমর্থিত হায়দারাবাদের নিজামের ডেপুটি চান্দা সাহেবের ফৌজ এমন  ঘেরাবন্দির মধ্যে ফেলেছিল অর্কট কেল্লাকে যে কর্ণাটকের নিজামের প্রতিপক্ষ নবাব মুহম্মদ আলি  খান ওয়াল্লাজাহ আর তাঁর সমর্থক ইংরেজ বাহিনীর দফারফা হয় আরকি।  মাদ্রাজ ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সির গভর্নর স্যান্ডার্সের কাছে সাহায্য চেয়ে খবর পাঠাচ্ছেন ইংরেজ ফৌজের কম্যান্ডার ক্লাইভ কিন্তু তারা মাঝপথে লড়াইয়ে ফেঁসে যায় । মরিয়া হয়ে ক্লাইভ মারাঠা সর্দার মুরারি রাওয়ের সাহায্য চাইলেন ,তিনি রাজিও হলেন। এদিকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে আরো ইংরেজ ফৌজ আসার খবর আসে।  চান্দা সাহেবের ছেলে রাজা সাহেব , যিনি আর্কট ঘেরাবন্দির দায়িত্বে ছিলেন , তিনি দেখলেন ঘেরাবন্দি করতে গিয়ে নিজেই আটক হতে হয় আরকি।  তিনি ক্লাইভের কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠালে সাহেব গোঁয়ারের মতো প্রত্যাখ্যান করেন। রাজা সাহেব  একটা মরিয়া চেষ্টা করছেন আর্কটের কেল্লা দখলের , এক্ষেত্রেও ক্লাইভের একবগ্গাপনা কাজে লাগল।  তাঁর নেতৃত্বে এমন প্রতিরোধ হয় যে নিজামের পেয়ারের চান্দা সাহেবের কর্ণাটকের নবাব হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হলো।ক্লাইভের  আর ইংরেজ ফৌজের বীরত্বের গল্পগাছা ছড়িয়ে পড়ে। খুশি হয়ে  নবাব মুহম্মদ আলি  খান ওয়াল্লাজাহ ক্লাইভকে সাবিত জং উপাধি দিয়ে নিজে ইংরেজদের সাহায্যে আজন্ম নবাবী করে কাটান।
       সেরকমই একটা কিছু মতলবে পলাশীর যড়যন্ত্রী মোঘল আমিররা  , ব্যাংকার জগৎ শেঠ , সওদাগর প্রধান খোজা ওয়াজেদ আর হিন্দু জমিদাররা মুর্শিদাবাদের দরবারে ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সিরাজের বদলে মীরজাফরকে বসাতে গিয়েছিল। অনেক লড়াইয়ের সফল নেতা মীরজাফর পলাশীর যুদ্ধে কুটোটি নাড়েননি। শেষ মুহূর্তে সিরাজ তাঁকে বললেন ,'' খোদার কসম  , বাদশাহের মুলুকে  মরহুম মহব্বত জং আলিবর্দি খান বাহাদুরের ইচ্ছেয় আমি হুকুম চালাচ্ছি ।‘’  মীরজাফর চুপ ।তখন সিরাজ , উঠতি বয়সী আলিবর্দির আদরের দুলাল সিরাজ , তাঁর নবাবী তাজ মীরজাফরের পায়ে রেখে বললেন ,’’ খোদার কসম ! মরহুম দাদাজানের কাছে আপনি কোরান ছুঁয়ে কি শপথ নিয়েছিলেন সেকথা ইয়াদ করুন , আমাকে বাঁচান ! ফৌজকে হুকুম দিন ফিরিঙ্গীদের বিরুদ্ধে কুচ করতে !  ‘’ তখনো মীরজাফর চুপ , তিনি ভাবছেন আলিবর্দির জবরদস্ত নেতৃত্বের উপযুক্ত হকদার তিনি আর সে জন্য ক্লাইভ নামক সাবিত জং উপাধি পাওয়া এক ফিরিঙ্গী মোঘল মনসবদারের সঙ্গে আঁতাত করলে দোষের কি ? তিনি নিজে মহব্বত জং উপাধি নিয়ে নবাব হয়ে বসে বুঝলেন আসলে ক্লাইভের পেছনে যে দীর্ঘ ছায়াটা , সেটা আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক এক লোভে জিভ লক লক  কর্পোরেট সংস্থার , যাদের মাফিয়াগিরি করার সনদ দিয়েছে খোদ ব্রিটিশ সরকার , নইলে কলোনি বসবে কি করে ? মীরজাফর হয়ে গেলেন ক্লাইভের গাধা । হররোজ ভাঙ খেয়ে ইংরেজের লুটপাটের জন্য প্রজার আর্তনাদ না শুনতে চাওয়ার বেকার চেষ্টা করে করে,  কিছুদিনের  মধ্যে গলায় ক্যান্সারের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মরতে হয় তাঁকে । মরেছিলেন সব ষড়যন্ত্রকারী , জলে ডুবে বেঘোরে  মরেছিলেন  জগৎ শেঠ , জেল বন্দী হয়ে আত্মহত্যা  করেন  সওদাগর প্রধান খোজা ওয়াজেদ ।
    পলাশীর পর সাহেবরা যে মনসবদার, শেঠ -সওদাগর আর হিন্দু জমিদারদের জোট সিরাজকে পটকে দিতে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলালো তারাও বিন্দুমাত্র কল্পনা করতে পারেনি যে এর ফল কী ভয়াবহ হবে, এমনকি ভাবতে পারেনি ব্রিটিশরাও ।
    ইংরেজ মাফিয়ারা ক্রমে নবাবকে দেয় খাজনাকে তাদের ইনভেস্টমেন্ট ধরে সেই খাজনার পরিমাণ বহুগুণে বাড়িয়ে সেই টাকাতেই ধান চাল সুপুরি, বস্ত্র, সোরা, অন্যান্য ধাতু সহ সবকিছুর ওপর একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার কায়েম  করে গোটা আর্থিক আর সামাজিক কাঠামোকে তছনছ করে দিলো। আগে বিদেশীদের তাদের দেশ থেকে আনা রুপোর বিনিময়ে এমনকি সুরাট বন্দর আগত দেশী সওদাগরদেরও  রুপো জমা রেখে সিক্কা টাকায় বাণিজ্য করতে হতো আর সেটা নিয়ন্ত্রণ করতো জগৎ শেঠরা। সেসময় বাংলায় বত্তিরিশ রকমের মুদ্রা চালু ছিল বলছেন ইতিহাসকার সুবোধ কুমার  মুখোপাধ্যায় তাঁর  প্রাক -পলাশী বাংলা (সামাজিক ও আর্থিক জীবন ১৭০০ -১৭৫৭ ) বইতে আর সেসবের বিনিময় মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতো জগৎ শেঠরা যারা ছিল আজকের সেন্ট্রাল ব্যাংকার তুল্য। তাদের কোষাগার আর নবাবী কোষাগার এক ও অভিন্ন ছিল।পলাশীর পর ইংরেজরা তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল নবাবদের কাছ থেকে।  সেটা দিতে গিয়ে ফতুর হলেন মীর জাফর  আর বারোটা বেজে তছনছ হচ্ছে জন্নত উল বিলাদ- সুবে বাংলার সব জমিদারী আর মুরশিদকুলি খানের যাবতীয় নিজামত আর দেওয়ানির মোঘল বন্দোবস্ত ।
    তবে বুঝেছিলেন বটে মীরজাফরের জামাই মীর  কাশিম । টাকা আদায়ের তাড়ায় ভাংখোর মীরজাফরকে সরিয়ে নিজামতের দায়িত্বে  মীর কাশিমকে  বসিয়ে ইংরেজরা সব সওদা কুক্ষিগত করে দেশী সওদাগরের ওপর কর বসিয়ে ।নতুন নবাব চুপ না থেকে সব সওদাগরদের  কর থেকে অব্যাহতি দিলেন ।লেগে গেল লড়াই , মীর কাশিমকে গিরিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করে ইংরেজরা । শেষ স্বাধীন নবাব মীর কাশিম অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার শরণাপন্ন হলেন। এবার বাংলা বিহারের চাষির রক্ত শোষণে  স্ফীত এই মাফিয়ারা- মোঘল বাদশাহ শাহ আলম দুই , অযোধ্যা ,  বারাণসীর রাজা বলবন্ত সিংহ  আর বাংলার  সম্মিলিত ফৌজকে সতেরশো চৌষট্টির অক্টোবরে বক্সারের যুদ্ধে হারিয়ে দিল্লীর দরবার থেকে সুবে বাংলার দেওয়ানির অধিকার অর্জন করে। সে বছরই মীরজাফরকে আবার নিজামতের দায়িত্বে বসিয়ে-পুতুল নবাব করেন ক্লাইভ ।  কিছুদিনের মধ্যে মীরজাফর মারা গেলে  সতেরশো পঁয়ষট্টির বারোই আগস্ট মুহম্মদ রেজা খানকে দেওয়ান করে বকলমে রবার্ট ক্লাইভই হচ্ছেন আসলি দেওয়ান । এবার বাংলার পুরো রাজস্বটাই তাদের ইনভেস্টমেন্টে পরিণত হয় আর দিল্লীর দরবার বুড়ো আঙ্গুল চোষে। অন্যের রাজত্বে বসে, অন্যের রাজস্ব অপহরণ করে ইংরেজ মাফিয়ারা এরপর পলাশীর ষড়যন্ত্রে তাদের সহযোগীদেরও উৎখাত করে কর্পোরেট শোষণতন্ত্র চালু করে। যারা দরবারী ষড়যন্ত্রী ছিল আর যারা সাধারণ মানুষ তারা কেউই সিরাজকে হটিয়ে দিয়ে এই সর্বনাশ হবে তা ভাবতে পারেননি। আর সতেরশো সত্তরে  বাংলায় নেমে এলো মন্বন্তরের অভিশাপ। মারা গেলো সুবে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ।

    মরার কালের জবান হলো মা ডাক ‘
    তবে আম লোকের মার আর দাগের ইতিহাস এইসব রাজা বাদশাহের ক্যাঁচা ল আর কূটকচালির বাইরে কোথাও লেখা থাকছে ।
    মীর টাকি মীর জবানকে -কথার মহিমাকে যদি কাব্যে এনে ফেলতে পারেন , তবে জবানের সঙ্গে পদাবলী মাধুর্য মিশিয়ে  দিয়ে সমকালে  রামপ্রসাদও তাই করলেন। বাল্মীকির 'মা নিষাদ' জবান  যদি পেল্লায় রামায়ণ কাব্য বানানোর শুরুয়াত ,  তবে হয়ত  ফিরিঙ্গী অত্যাচারে মা মা ডাক ছাড়তে ছাড়তে মরতে থাকা লোকের জন্য নিজের বড় দুঃখে ওই সাধক কালী আর উমার গোটা  ধারণায়  কী একটা যেন করে দেন ।ছেলের প্রতি মায়ের টান বোষ্টমদের মধ্যে ছিল কিন্তু শাক্ত রামপ্রসাদের টান তারও বাড়া । সে টানে বিপরীত পোড়েনও আছে কারণ মায়ের প্রতি ছেলের টান বড় কম নয় ।তীব্র  রামপ্রসাদী টানাপোড়েনে বাস্তবের মারে  মরার সময়ের মা ডাককে সত্যি সত্যি ডাক ভেবে  ভয়ঙ্করী দেবী মূর্তি একেবারে ঘরের ভেতর,  ঘরের মেয়ে হেন  ঢুকে বসে থাকছে !
    সংসারে এনে মাগো করলি আমায় লোহাপেটা।
     আমি তবু কালী বলে ডাকি সাবাস্ আমার বুকের পাটা!
     পলাশীর পর সব মোঘল জমিদারী বন্দোবস্ত, সওদাগরী অর্থনীতি  হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে থাকে  আর   সতেরোশো সত্তরের মন্বন্তরে সুবে বাংলার এক কোটি লোক  মরে পড়ে পড়ে পচে । সারা জাহান অন্ধকারের ভেতর সেঁধিয়েছে , সেই  তখন সেই  তমসার  দেবীদের বাংলার ঘরে ঘরে অনাথের নাথ হয়ে দেখা গেল। এসবের  ভগীরথ কোনো এক  মদে পদ টলটল হয়ে হালিশহরের ঘাটে শ্মশান মশান করা  মহাকবি রামপ্রসাদ, বাল্মীকি রামপ্রসাদ : 
    ওরে সুরাপান করিনে আমি,
    সুধা খাই জয়কালী বলে;
    মন-মাতালে মাতাল করে,
    মদ-মাতালে মাতাল বলে
    গুরুদত্ত গুড় লয়ে, প্রবৃত্তি মশলা দিয়ে মা,
    আমার জ্ঞান-শুঁড়িতে চুয়ায় ভাঁটি,
    পান করে মোর মন-মাতালে
    মূল মন্ত্র যন্ত্র ভরা, শোধন করি বলে তারা মা ;
    রামপ্রসাদ বলে এমন সুরা খেলে চতুর্বর্গ মেলে ( কালী কীর্তন , রাগ পিলু )
    রামপ্রসাদকে নিয়ে গল্প অনেক,  তার মধ্যে একটা গল্প নবাব সিরাজউদ্দৌলাকেও  নিয়ে।  নবাব বজরায় যাচ্ছেন।  যেতে যেতে শুনলেন রামপ্রসাদ শ্যামা সংগীত গাইছেন। স্বরের বাধা ভেদ করে সুর তাঁর কানে লাগার কথা কিন্তু এক্ষেত্রে হলো উল্টোটা স্বরই নবাবের কানে লাগে। নবাবের বজরায় রামপ্রসাদকে নিয়ে আসা হচ্ছে। নবাব বললেন , ''গান গাও। '' রামপ্রসাদ বললেন , " হুজুর। " এই সম্বোধন করে তিনি ওস্তাদি সুর  লাগালেন গলায়। সেসব সিরাজের অনেক শোনা আছে কিন্তু তাঁর যে আসলে স্বরের মাদকতা প্রাণে ধরেছিলো তাই তিনি বলছেন ," নানা তুমি যে ওই কী যেন -কালী কালী বলে কিছু বলছিলে , বলছিলে না ? " রামপ্রসাদ বলেন ," জি হুজুর। ''
     - সেইসব বলতে থাকো আর গাও।
    - মাকে  ডাকছিলাম জাহাঁপনা।
    - তাই তো ! সেটাই তো করবে !
    - জি হুজুর।
    - তোমাকে কে বারণ করেছে  ইনশাল্লাহ।
    রামপ্রসাদ তার বিখ্যাত প্রসাদী  সুরে কালী সম্বোধন করেন আর তাতে  মেলেচ্ছ নবাব আর যত তাঁর  সাঙ্গপাঙ্গ ছিল সবার প্রাণে দোল লেগে গেলো। সুরেলা সম্বোধনে সবাই দুলছে। রামপ্রসাদ গেয়ে চললেন তো চললেন তাঁর গান থামায় কে !
    তবে তিনি একা  ছিলেন না একই বোষ্টম -শাক্ত পদাবলীর ভাব নিয়ে পায়ে পায়ে অসীম শক্তিধর কমলাকান্ত আসছেন ।
    জান না কি মন, পরম কারণ, কালী কেবল মেয়ে নয়।
     মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ, কখন কখন পুরুষ হয়।
    হয়ে এলোকেশী, করে লয়ে অসি, দনুজ-তনয়ে করে সভয়।
     কভু ব্রজপুরে আসি,বাজাইয়ে বাঁশী, ব্রজাঙ্গনার মন হরিয়ে লয়॥
     পলাশীর পর মোঘল হিন্দু জমিদারদের অনেকেই ফিরিঙ্গীদের লুটের বন্দোবস্তে অস্থির হয়ে কালী পুজোর ধূম  লাগিয়ে ছাড়ছেন কে না শাক্ত পদাবলী লিখছেন – বর্ধমানের রাজা মহতাব চন্দ্র বাহাদুর ।  রানী ভবানীর পালিতপুত্র নাটোরের রাজা রামকৃষ্ণ  কালী সম্বোধনের উল্লুস লাগিয়ে দিচ্ছেন।  হ্যাঁ , পুজোর ধূম তিনি কম করছেন না কিন্তু কালী সম্বোধনের মাহাত্ম্য তন্ত্র মন্ত্র আর বলির রক্তধারাকে কে ছাপিয়ে যাচ্ছে।  সম্বোধনে কিছু অন্য একটা আছে ফলত রামকৃষ্ণের ধূমধামের পুজো নয়,  তাঁর গান আজো লোকে মনে রেখেছে আর গায়ও :
    জয় কালী জয় কালী বলে যদি আমার প্রাণ যায় ,
    শিবত্ব হইব প্রাপ্ত , কাজ কি বারাণসী তায়।
    অনন্তরূপিণী কালী , কালীর অন্ত কেবা পায় ?
    কিঞ্চিৎ মাহাত্ম্য জেনে শিব পড়েছেন রাঙা পায়।
    সেসময় নাটোরের ওই রাজা, ইংরেজের স্থির করা চড়া  খাজনা আদায়ে জোরজুলুম করতে অপারগ ওই ‘অপদার্থ রাজার’  একের পর এক মহাল লাটে উঠছিল আর  সেটাকে ঔপনিবেশিকরা মিসকন্ডাক্ট বা অকর্মণ্য বেয়াড়াপনা বলছে। যত জমিদারী লাটে  ওঠে ততই রামকৃষ্ণ কালী পুজোর ধূম লাগিয়ে দেন , বলেন ,'' ,ভালোই হলো একটি একটি করে বিষয় বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে। '

    এখনো কি ব্রহ্মময়ি , হয়নি মা তোর মনের মত ?
    আকৃতি সন্তানের প্রতি বঞ্চনা কর মা কত।
    দম দিয়ে ভবে আনিলি , বিষয় বিষ খাওয়াইলি
    সংসার বিষে যত জ্বলি , দুর্গা দূর্গা বলি তত ,
    বিষয় হর মা বিষহরি মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু হত।
    জ্ঞানরত্ন দিয়েছিলি , মসিল দে তসিল করিলি ,
    হিসাব করে দেখ মা তারা , দুঃখের ফাজিল বাকি কত।
    অধ্যাপক রজতকান্ত  রায় বলছেন ,'' রাজা যেমন প্রজার ওপর মহসিল( রাজস্ব সংগ্রাহক কর্মচারী ,তহসীলদার –বঙ্গীয় শব্দকোষ )  বসিয়ে জোর করে খাজনা তহসিল ( খাজনা আদায় তহসীলদারের অধিকারের অন্তর্গত স্থান - বঙ্গীয় শব্দকোষ  )  করেন , কালী জ্ঞানরত্ন দিয়ে তেমন তা হরণ করে নিলেন -সংসার বিষে জ্ঞান হারাল। ''

      কথার শেষ না হলেও
    ইংল্যান্ডের শ্রপশাইয়ারের মফঃস্বল শহর মার্কেট ড্রয়টন থেকে মাইল দুয়েক দূরে ‘মরেটন সে ‘ গ্রামের  বাইরে স্টাইচি হল যা উচ্চারণে স্টিচ হয়ে যায় , ছিল রবার্ট ক্লাইভের বাবা রিচার্ডের এস্টেট।  নেহাতই পড়তি জমিদারী থেকে আয় বছরে পাঁচশো পাউন্ড কিন্তু উচ্চশিক্ষিত ওই পরিবারের  চাল চলন ব্যারন সুলভ।  ফলে ম্যানচেস্টারের মেয়ে স্ত্রী রেবেকাকে নিয়ে ঠাঁটবাট বজায় রাখতে রিচার্ড  সাহেবকে ওকালতি করতে হয়েছিল,  তবে তাতেও পসার তেমন জমেনি । বড়ছেলে রবার্ট ক্লাইভকে ছোটবেলা থেকেই শহরে পাঠিয়ে পড়াশোনা শিখিয়ে  পেশাদার বানানোর ইচ্ছে ছিল বাপ মায়ের ।কিন্তু হবার মধ্যে হচ্ছে এই যে ছেলে হয়ে উঠলো দুর্দান্ত একপাল ছোকরার পাণ্ডা , যাদের দোকানীদের কাছ থেকে তোলা আদায় করতে দেখা যাচ্ছে ।ইতিহাসকার পারসিভাল স্পিয়ার অবশ্য এইসব ছেলেমিকে ভবিষ্যতের বাংলা লুটের নেট প্র্যাকটিস মানতে মোটেই রাজি নন । সত্যিই তো সে জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশেষ প্রশিক্ষণ  লাগে যে !  মার্কেট ড্রয়টন থেকে লন্ডনের কেতাদুরস্ত ইস্কুলে ভর্তি হয়ে কলমপেশা আর হিসেবপত্তর শিখে বছর সতেরোর রবার্ট ক্লাইভ সতেরশো বিয়াল্লিশের শেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজে ঢুকেই লুটপাটের যা প্রশিক্ষণ পাওয়ার সব পাচ্ছেন ! পলাশীর পর মুর্শিদাবাদের কোষাগার এই সাহেবের নিজের  জন্যও উন্মুক্ত হয় আর সেসব তিনি বেশ গর্ব ভরে লিখে রেখেছেন ।
    তবে এই পাপের ভারা শেষমেশ পূর্ণ হচ্ছে । বরখাস্ত হওয়া কোম্পানির কর্মী  উইলিয়াম বোল্ট প্রমাণ সহ   নুনের ব্যবসায় নিজের অংশ বত্তিরিশ হাজার পাউন্ডে বিক্রীর অভিযোগ আনলেন  ক্লাইভের বিরুদ্ধে  , ইতিহাসকার আলেক্সান্ডার ডাও সরাসরি অভিযোগ করলেন।  সর্বোপরি মন্বন্তর কোম্পানিকেও ছাড়েনি । চাষিদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা রাজস্ব যা তারা 'ইনভেস্টমেন্ট ' বলে চালাচ্ছিল তাতে টান পড়ে।মরা চাষির দল খাজনা দেবে কেমন করে !  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নগদে টান পড়তে থাকে যার অন্যতম কারণ হিসেবে কোম্পানির স্থানীয় কত্তাদের নিজস্ব ব্যবসা আর চুরি চামারির টাকা ইংল্যান্ডে চালানকে দায়ী করা হয় ।সেই কবে বাদশাহ ঔরঙ্গজেব আলমগীর ছড়া কেটে ছিলেন না !
    কিনছে যে ফের বেচছে সেই
    কেনায় বেচায় আমরা নেই ।
    সরকারের টনক নড়ল ,  সতেরশো তিয়াত্তরে রেগুলেশন এক্ট চালু হলো। অবশেষে লণ্ডনে কোম্পানির বড় কত্তারা রাজস্ব তছরুপের অভিযোগে ক্লাইভকে দোষী সাব্যস্ত করলেন। বাংলা লুটে ফোকটে ধনী হওয়া রবার্ট ক্লাইভের শেষের দিনগুলো বড়ই বিড়ম্বনার।
    কথার শেষ না হলেও , কথা শেষ করতে লাগে । বক্সারের যুদ্ধে হেরে মীর কাশিম যদি দিল্লী পালিয়ে গিয়ে থাকেন , তবে মরে যাবার পরও তাঁর রুহ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে হাডসনের গুলি বুকে খাওয়া কম্যান্ডার মির্জা মোঘলের রুহ  আর সেপাইসালার বক্ত খানের সঙ্গে  দিল্লী থেকে লখনৌয়ের পথে সাথ দিচ্ছে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ? গদরের সময় জ্যান্ত মানুষ আর নানা সময় ফিরিঙ্গীদের খেলাপ লড়ুয়ে রুহরা মোরচাবদ্ধ হতেই পারে , পারেনা কি ?
    অতিরিক্ত সূত্র
    ) From Plassey to Partition and After A History of Modern India,  Sekhar Bandyopadhyay
    )Change in Bengal Agrarian Society c. 1760-1850 ,  Ratnalekha Ray
    ) Master of Bengal: Clive and His India,  Percival Spear
    ৪ ) India , A history , John Keay
    ৫ ) পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ , রজতকান্ত রায়
    ৬ ) নবাবি  আমলে মুর্শিদাবাদ , সুশীল চৌধূরী
    ৭ ) বাংলার আর্থিক ইতিহাস - সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়
    ৮ ) প্রাক-পলাশী বাংলাসুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • ধারাবাহিক | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন