আরও কিছু তথ্যতিনটে জেলা, মালদা, মুর্শিদাবাদ, এবং দক্ষিণ দিনাজপুর। দুটো মুসলমান অধ্যুষিত, একটা কম, কিন্তু চিত্রটা একদমই এক। তিনটের জন্যই তিনটে লেখচিত্র রইল।

লেখচিত্রের এক্স অক্ষ, অর্থাৎ কিনা বাঁ দিক থেকে ডানদিকে আছে তৃণমূলের ২১ সালের জয়ের ব্যবধান। আর ওয়াই অক্ষ, অর্থাৎ নিচ থেকে উপরে আছে ২৬ সালের বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা। এবং একদম নির্ভুলভাবে, তিনটে জেলা জুড়ে, যেখানে যত মার্জিন বেশি সেখানে তত "বিচারাধীন"।
এর অর্থ কী? যেখানে তৃণমূল যত বেশি ভোটে জিতছে, সেখান থেকে তত বেশি ভোটার কমাও। এবার, ভোটার কমালেই যে তৃণমূলের ভোট কমবে তা তো নাও হতে পারে। অতএব সংখ্যালঘু ভোটার কমাও, সবাই জানে, ওই এলাকগুলোতে অন্তত ৭০% সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলে যায়। এক লাখ সংখ্যালঘু বাদ দিলে অন্তত সত্তর হাজার তৃণমূলের ভোট কমবে। ঠিকঠাক অনুপাতে কমাতে পারলে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায়ও তৃণমূল হারবে। এইটা হল ছক।
সংখ্যালঘু এলাকায় ছকটা সোজা। যেখানে সংখ্যালঘু কম, সেই বাকি এলাকায় এই ছক চলবেনা। সেখানে সহজ হল আরেকটা বর্গকে টার্গেট করা। মহিলা। এছাড়াও গরীব, প্রান্তিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করা যেতে পারে। সেই হিসেবটা একটু জটিল। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। বাঘা বাঘা পরিসংখ্যানবিদরা বসে আছেন ওদের আইটি সেলে। তুড়ি মেরে এই বিশ্লেষণ করে ফেলবেন।
লেখচিত্রটা ভালো করে দেখুন। পশ্চিমবঙ্গের ৫০% বিধানসভায়ও এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে তৃণমূলের জেতার আশা ক্ষীণ, সে যতই জনসমর্থন থাক না কেন। শুধু তৃণমূল কেন, মহম্মদ সেলিমও যতই জোট করে মুর্শিদাবাদ থেকে লড়ুন, জিতবেন তো নাই, জামানতও বাজেয়াপ্ত হবে, এতই নিখুঁত এই ডিজাইন। আর ওই ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন হলেন যুদ্ধের কোল্যাটারাল ড্যামেজ। তাঁরা বাংলাদেশ বা ডিটেনশন যেখানে খুশি যাবেন।
সব মিলিয়ে লক্ষ্যটা কীযে, মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে "বিচারাধীন"এর সংখ্যা এমন নিখুঁত হিসেবে তৈরি, যে, যেখানে ২০২১ এ তৃণমূলের যত ব্যবধান, সেখানে তত বিচারাধীন। সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে রাজ্যব্যাপীই এই প্রবণতাটা লক্ষ্য করা গেছে। অঙ্কের মোটামুটি হিসেবে যেকোনো বিধানসভায় ১% করে তৃণমূলের ব্যবধান বাড়লে .৫% করে "বিচারাধীন" বাড়ার প্রবণতা। এই সরলরৈখিক প্রবণতা খুব সহজ-সরল এমনি-এমনি হয়না। কোনো একটা গভীর ছক না থাকলে এ হওয়া প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কথাটা শুধু প্রবণতার নয়, কারণ এটা সংখ্যাতত্ত্বের অনুশীলন না। এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। রাজ্যজুড়ে এই "বিচারাধীন" প্রক্রিয়াটার ফলাফল ঠিক কী হতে পারে, কতগুলো সিট ওল্টাতে পারে, সেইটা হিসেব করা দরকার। তা, এর মোটামুটি একটা মাপ নেবার জন্য আমরা সহজ একটা পন্থা নিয়েছি। প্রথম তৃণমূলের জেতা আসনগুলোতে ২০২১ এর জয়ের ব্যবধান দেখেছি। তারপর সেই আসনে "বিচারাধীন"এর সংখ্যা দেখেছি। যদি বিচারাধীন এর সংখ্যা ব্যবধানের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেই আসন ওল্টাবে ধরে নিয়েছি।
এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করে রাজ্যজুড়ে আমরা কী পেয়েছি? এই পদ্ধতির হিসেবে রাজ্যজুড়ে ৫৯ টা আসন ওল্টাবে। অর্থাৎ ৫৯টা আসনে বিচারাধীনের সখ্যা তৃণমূলের মার্জিনের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বেশি ওল্টাচ্ছে মুর্শিদাবাদ, মালদা, পূর্ব বর্ধমান এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে। সমস্ত জেলাগুলোর চিত্র ছবি হিসেবে দেওয়া আছে।

এর ফলে বিধানভার ফলাফল কী হতে পারে? তৃণমূলের আসনসংখ্যা হতে পারে, ১৫৬ ( সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে সামান্য বেশি)। বিজেপির ১৩৩ (সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে সামান্য কম)। সেই ছবিও দেওয়া আছে। (খেয়াল করে দেখবেন, তৃণমূল কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারেকাছেই থাকছে, এবার দল ভেঙে সরকার গড়লে কারো কিছু বলার থাকেনা - মেটিকিউলাস ডিজাইন একেই বলে)
অবশ্য এটা প্রোজেকশন, নিখুঁত হিসেব না। এর মধ্যে পূর্বানুমান আছে, ১। ভোটের প্যাটার্ন ২১ থেকে অক্ষত আছে। ২। "বিচারাধীন"রা সবাই তৃণমূলের ভোটার। দুটোই হিসেবের স্বার্থে করা। কিন্তু খুব অকেজো পূর্বানুমান নয়। বিচরাধীনরা মুর্শিদাবাদ-মালদা-দিনাজপুরে মোটামুটিভাবে তৃণমূল ভোটার, এটা আন্দাজ করা যায়। কারণ সেখানে যাঁরা বাদ গেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠই সংখ্যালঘু। সেখানে সোজাসাপ্টা হিসেব। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণে এলে বর্ধমান ছাড়ালেই প্যাটার্ন বদলাচ্ছে, লিস্টি থেকেই দেখতে পাবেন। সেটা কী, এই নিয়ে কাজ চলছে। হলে আবার লিখব। কিন্তু কোন ছকে কাজ চলছে, এটা এই তালিকা থেকে পরিষ্কার। এবং, মনে রাখতে হবে, "বিচারাধীন" এদের তূণে একটা অস্ত্র মাত্র। এছাড়াও "বাদ" আছে, বহিরাগত ভোটার "যোগ" আছে, অনাবিষ্কৃত আরও নানা পন্থা আছে। সেগুলো এই হিসেবে ধরা হয়নি। কিন্তু সেগুলো ভুলে গেলে হবেনা।

অতএব পুরোটাই ঝুলে আছে ষাট লক্ষ বিবেচনাধীনের উপরে। সব মিলিয়ে বাদ + বিচারাধীন এক কোটি কুড়ি লাখ। বাদ যাওয়া ষাট লাখের মধ্যেও খেলা আছে। নতুন ভোটার যারা যোগ হবেন, তাঁদের মধ্যেও খেলা আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় খেলা এই বিবেচনাধীনদের নিয়ে। এই ষাট লক্ষ ভোট দিতে পারলে বিজেপি মুছে যাবে। না পারলে, ওদের হিসেবে, জিতে বেরিয়ে যাবে। কাজেই, নেতা নেত্রীরা, এই ষাট লাখকে ভোটার তালিকায় রাখা দরকার। কী করে করবেন, আদালতে ভরসা রাখবেন, রাস্তায় নামবেন, নাকি দুটোই করবেন, সে আপনারা ঠিক করুন।