সুধীরের সিভিতে আরও বড় বড় জিনিস আছে অবশ্য। তিনি বার দুই জেল খেটেছেন। একবার ফেক নিউজের জন্য। ২০০৮ সালে, তখনও সত্যযুগ আসেনি। কাজ করতেন লাইভ ইন্ডিয়া বলে একটা চ্যানেলে, বড়কর্তা হিসেবে। একটা 'স্টিং' অপারেশন করে সেই চ্যানেল। সেখানে দেখানো হয় উমা খুরানা নামের এক মহিলা স্কুলশিক্ষিকা দেহব্যবসার চক্র চালাচ্ছেন। মহিলার চাকরি যায়, হেনস্থা হতে হয়, তিনি পাল্টা মামলা করেন। সেখানে দেখা যায়, পুরোটাই ভুয়ো। যাকে দেহব্যবসা চক্রের শিকার বলে দেখানো হচ্ছিল, সে আসলে একজন সংবাদব্যবসায়ী (পুরোটাই নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে লিখলাম)। তাঁর চ্যানেলের এই কান্ডের সুধীর চৌধুরি গ্রেপ্তার হন, এবং পরে ছাড়াও পান। ... ...
ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে, শহরতলীর মুসলমান পল্লী ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে এসআইআর এর ভয়ে, সীমান্তে কোটি-কোটি লোকের ভিড়, সব এসআইআরের ভয়ে পালাচ্ছে, এর সবকটা ভিত্তিহীন। চ্যানেলে চ্যানেলে যাঁরা এই গুলবাজি করছিলেন, প্রত্যেককে চোখে চোখে রেখে কথাগুলো বলা দরকার। কারণ, দেখা যাচ্ছে, মুসলমানের মধ্যে নিখোঁজ বা স্থানান্তরিত নেই বললেই চলে। এই নিয়ে নাগাড়ে যাঁরা গুলবাজি করে চলেছেন, তাঁদের ছেড়ে দেবার মানে নেই ... ...
ন্যায়বিচার প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত মনের আনন্দে নিজের ইচ্ছেমতো উদ্ভাবন করতে পারে না। আদালত ‘সৌন্দর্য বা নৈতিকতার স্বকপোলকল্পিত আদর্শের সন্ধানে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো এক নাইট’-এর ভূমিকাও নিতে পারে না। বরং সর্বদা আদালতের প্রত্যাশা থাকে যে তারা ‘পবিত্র নীতিমালা থেকে প্রেরণা নেবে।’ [দেখুন বেঞ্জামিন কার্ডোজো, The Nature of Judicial Process]। ... ...
এটা আক্ষরিক অর্থেই আনন্দ-সংবাদ, কারণ গোদি-মিডিয়া, হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর সোসাল-মিডিয়া কীকরম ভয়ানক গাঁটছড়া বেঁধে কাজ করছে, তার প্রমাণ পেল গুরুচণ্ডালি এবং পেলাম ব্যক্তিগতভাবে আমি, গতকাল। এদের এই যৌথ গোয়ালঘরে যে আমরা সাফল্যমন্ডিত ভাবে ধোঁয়া দিতে পেরেছি, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ব্যাটারা নিজেরাই দিয়ে গেছে গতকাল। গোদি মিডিয়া নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে আসছি, ভিডিও করে আসছি। কাল ছিল "সীমান্তে বাংলাদেশীদের ভিড়" নামক গুলবাজির মুখোশ খোলার ভিডিও। সকালে উঠে দেখি অভাবনীয় ব্যাপার। ক্ষেপে গিয়ে এবিপি আনন্দ, তার মিডিয়া এজেন্টদের দিয়ে খুঁজে খুঁজে বার করেছে গুরুচণ্ডালির কোন কোন ভিডিওয় এবিপি আনন্দের ক্লিপ আছে। তারপর কপিরাইট ক্লেম করে অনেকগুলো নামিয়ে দিয়েছে। ফেসবুক এবং ইউটিউব জুড়ে। বেশি ভিউ যেগুলোর সেগুলো নামিয়েছে, সবকটা পারেনি, অত অধ্যবসায় থাকলে তো হয়েই যেত। ... ...
সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালি বানান ১৯৫৫ সালে। সিনেমাটা প্রবল সাফল্য পাওয়ার পরে অপুতেই ডুবে ছিলেন প্রায় গোটা ৫০ এর দশক। ওই দশকের শেষের দিকে কলকাতা শহরের পটভূমিতে ফেরেন। তারপর বহু সমকালীন বা অতীতের সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি দেখা যায় তাঁর সিনেমায়, কিন্তু দেশভাগ নিয়ে কখনও কিছু বলেননি বা লেখেননি। একই কথা, ধরুন মৃণাল সেন, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, এইসব মহীরূহ সম্পর্কেও। যদিও চোখের সামনে বাংলা দু-টুকরো হয়ে যেতে দেখেছিলেন এঁরা সবাই। ঋত্বিক সমেত। ঋত্বিকের লেখালিখি চলছে, সেই সময় টানা। গণনাট্য সঙ্ঘের খসড়া লিখছেন। সেই সময়ের একটা লেখায় এও লিখেছেন, যে, স্বাধীনতার আগে কলকাতা আর বোম্বে, এই দুটি ছিল চলচ্চিত্রশিল্পের প্রধান কেন্দ্র। অতীত কালে লিখেছেন, অর্থাৎ কলকাতার স্বর্গ হইতে পতনের কথা তাঁর জানা, কিন্তু তার কারণ নিয়ে একটিও কথা লেখেননি কখনও। কারণটা, বলাবাহুল্য দেশভাগ। ... ...
কী হয়েছিল ১৬ ই আগস্ট ১৯৪৬ সালে? এর এক মাস আগে পর্যন্ত দাঙ্গা হাঙ্গামার কোনো আঁচ পাওয়া যায়নি। ক্যাবিনেট মিশন তখন ভারতকে টুকরো না করার শেষ চেষ্টা করছে। একটা ঢিলেঢালা ইউনিয়নের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাব মেনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে মুসলিম লিগ অংশগ্রহণ করবে বলেছে। কিন্তু কংগ্রেস ক্রমাগত টালবাহানা করছে। শেষকালে জুলাইয়ের ১০ এ নেহরু জানালেন, যে, কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে থাকবে বটে, কিন্তু ক্যাবিনেট মিশনের একীকৃত ভারতবর্ষের পরিকল্পনা মেনে নেবার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জিন্না কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ডাক দিলেন ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডের। আর কিছু না, সেটা একটা দেশব্যাপী হরতালের ডাক। ... ...
হিন্দি ভাষাটা, তার জন্মলগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িকতা এবং আধিপত্যবাদের ধারক, বাহক এবং জনক। কারণ, হিন্দি আর উর্দু এইদুটো ভাষা আলাদা কিছু না। একই ভাষা। আমি বলছিনা, আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলছেন। আজ থেকে বহু বছর আগে ১৯৪৪ সালে "ভারতের ভাষা ও ভাষাসমস্যা"তে তিনি লিখছেন, ভারতের মুখ্য ১৫ টি ভাষাকে আসলে ১২ টিতে দাঁড় করানো যায়। "(১) হিন্দী ( বা সাধু হিন্দী অথবা নাগরী হিন্দী) এবং (২) উর্দু - এই দুইটী সত্য-সত্য হইতেছে, সম্পূর্ণরূপে বিভিন্ন দুইটী লিপির স্বারা এবং বিদেশী শব্দ আমদানী করিয়া একই ভাষাকে দুইটী আকার দেওয়া মাত্র;"। (পাতা -৮) । প্রসঙ্গত উনি শুধু ভাষাচার্য ছিলেন না, এর ৪ বছর পরে ১৯৪৮ সালে হিন্দি ভাষায় বিশেষ অবদানের জন্য সাহিত্য বাচস্পতি উপাধি লাভ করেন। ... ...
বাংলা তিনবার ভেঙেছে। প্রথম বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ সালে। প্রতিবাদে সারা বাংলা জুড়ে রাখিবন্ধন হয়েছিল সেবার। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রাস্তায় নেমেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়।—রওনা হলুম সবাই গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে। রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাত অবধি লোক দাঁড়িয়ে আছে—মেয়েরা খই ছড়াচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম—যেন একটা শোভাযাত্রা, দিনুও সঙ্গে ছিল, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল—বাংলার মাটি, বাংলার জল বাংলার বায়ু, বাংলার ফল পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান।" তারপর সেটাই একটা মিছিল হয়ে গেল। যাকেই সামনে পাওয়া যাচ্ছে, তার হাতেই বেঁধে দেওয়া হচ্ছে রাখি। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে। প্রায় অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গে কলকাতার রাজপথে হাঁটছেন রবীন্দ্রনাথ। পাথুরেঘাটা গিয়ে মিছিল যাচ্ছে, বীরু মল্লিকের আস্তাবলে গিয়ে মুসলমান সহিসদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর চললেন চিৎপুরের বড়ো মসজিদের দিকে। মসজিদে যাঁদের পাওয়া গেল, সবাইকে পরানো হল রাখি। তাঁরাও খুশি মনে হেসে রাখি পরেছিলেন সেদিন। এই ঐক্যের তাপে ইংরেজ বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব রদ করতে বাধ্য হয় একটা সময়। ... ...
সমস্ত ইতিহাসের মধ্যে এই একুশে জুলাইয়ের ইতিহাসটাই একদম স্মৃতি থেকে বলতে পারি। তখন ৯৩ সাল। এক বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়ে গেছে, দাঙ্গা-টাঙ্গাও, হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কোথায় বিজেপি? লোকে বলত, ওসব তো গোবলয়ের অসভ্য কাণ্ডকারখানা, এখানে শুধু সিপিএম-কংগ্রেস। সিপিএম তখনও ৭২-৭৭ এর কংগ্রেসি গুণ্ডামি আর ১১০০ কর্মী খুন হবার কথা নিয়ে ব্যস্ত। এখন যেমন ৩৪ বছর, তখন ছিল ৭২-৭৭। আর কংগ্রেস ভাবত, এত খুন-জখম-ধর্ষণ-টর্ষনের পরেও, এই সিপিএম ব্যাটারা জেতে কীকরে। গনিখান সোজাসাপ্টা লোক ছিলেন। ভোট-টোটের চক্করে না গিয়ে স্টেনগান হাতে নিয়ে সিপিএমকে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বলেছিলেন। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের ধারণা ছিল লোকে ভোট দিতে পারলেই তিনি জিতবেন। ওইজন্যই ৯৩ সালে বাধ্যতামূলক ভোটার কার্ডের দাবীতে মিছিল ডেকেছিলেন ২১ জুলাই। ... ...
বাঙালিকে মেরে তাড়ানো হচ্ছে গোটা গোবলয় থেকে, চারদিকে গোদি-মিডিয়া আর হিন্দুবীরদের মুখ দেখানোর জায়গা নেই, অতএব তাঁরা যেটা পারেন, সেটাই শুরু করেছেন, অর্থাৎ গুলবাজি। নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অগ্রণী সৈনিক কর্নেল সুমন দে। কীরকম গুলবাজি, একটু মন দিয়ে পড়ুন। কাল দেখলাম, হাত-পা নেড়ে, গলায় আবেগ এনে টিভিতে বললেন, "২০০৪ সালে রাজ্যসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শ্রীপ্রকাশ জয়সওয়াল বলেছিলেন, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ২০০১ এর ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত, ১ কোটি ২০লক্ষ ৫৩ হাজার, যার মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গে অর্ধেকেরও বেশি, ৫৭ লক্ষ" (সংক্ষেপিত, এবং চোখ গোলগোল করাটাও দেখানো গেলনা) । তারপর প্রচণ্ড নাটক করে এর সঙ্গে যোগ করলেন, ২০০১ এই যদি সংখ্যা এই হয়, ভাবুন এখন সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। ... ...