

নামাঙ্কন: রমিত
চার্লস রোলস-হেনরি রয়েস
একদিকে দেওয়াল জোড়া ওক কাঠের প্যানেল, অন্যদিকে বিশাল আয়না, মেঝের কার্পেটে হাঁটু ডুবে যায়। ঘরের মাঝখানে টেবিল ঘিরে বসে আছেন সাত জন প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁদের সামনে একটি চেয়ারে আসীন এই গাড়ি কোম্পানির চিফ ডিজাইনিং এঞ্জিনিয়ার। তিনি নবীনতম এঞ্জিনের গুণবত্তা ব্যাখ্যান শেষে বললেন, ‘আমাদের এঞ্জিনের বৈশিষ্ট্য তার নীরব নৈপুণ্য। এবার এমনকি একশো দশ মাইল স্পিডে চালালেও ঘড়ির কাঁটার টিক টিক বাদে আর কোন যান্ত্রিক শব্দ শোনা যাবে না।’
ঘর জোড়া নৈঃশব্দ ভেঙ্গে পক্বকেশ এক বোর্ড ডিরেক্টর বললেন, ‘আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো গাড়ি বানাই একশো বছর ধরে, কারো শান্তি বিঘ্নিত না করে, মানুষের হাতে তৈরি ইঞ্জিন কাজ করে চলে নীরবে। ওই ঘড়ির আওয়াজটা বন্ধ করা যায় না?’
গাড়ির নাম রোলস-রয়েস সেখানে কিছু বদলায় না সহজে কিন্তু এবার, একশ বছর বাদে হাতে গড়া সুইস ঘড়ির বদলে এলো ইলেক্ট্রনিক ঘড়ি সে নিখুঁত সময় দেবে নিঃশব্দে।

চার্লি রোলস ও হেনরি রয়েস
হেনরি রয়েসের জন্ম ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডের পিটারবরার কাছে অলওয়ালটনে। অভাবের সংসার; মা বাড়ি বাড়ি কাজ করেছেন, বাবা জেমস কল থেকে কলে কাজ খুঁজেছেন, পেয়েছেন, হারিয়েছেন। জেমস একদিন তিন মেয়েকে তাদের মায়ের কাছে রেখে ভাগ্যের সন্ধানে দুই ছেলেকে নিয়ে লন্ডন গেলেন, আটা কলে মজদুরি করলেন। হেনরি রয়েসের আট বছর বয়েস, সবে স্কুলের মুখ দেখেছে, বাবা মারা গেলেন। প্রায় অনাথ হেনরি, ক্ল্যাপহ্যাম স্টেশনের বাইরে খবর কাগজ ফিরি করে, ঠাণ্ডায় কুকুরকে জড়িয়ে ঘুমোয় কিছু উষ্ণতার সন্ধানে। এক সহৃদয়া কাকিমার অর্থ সাহায্যে গ্রেট নর্দার্ন রেলওয়েতে অ্যাপ্রেনটিসের কাজ জুটল, রাতে সিটি গিলডে অঙ্ক, ইঞ্জিনিয়ারিং শেখেন। প্রাথমিক স্কুল পাশ করেননি, কিন্তু যন্ত্রপাতি যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। কাজ পেলেন ম্যাক্সিন- ওয়েষ্টন নামের এক ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম তৈরির কোম্পানিতে, সত্বর পেটেন্ট নিলেন বেয়নেট স্টাইল বালবের (যা ইংল্যান্ডে আজও চালু)। হাতে দু পয়সা এলো, বন্ধু ক্লেয়ারমন্ট এবং হেনরি মিলে মোট সত্তর পাউন্ড নিয়ে ম্যানচেস্টারে বিজলি বালব, ডায়নামো, ইলেকট্রিক ক্রেনের ব্যবসা খুললেন। তিরিশ বছর বয়েসে যে ডাইনামোর পেটেন্ট নিয়েছিলেন, তার অভাবনীয় বিক্রি থেকে এলো জীবনে প্রথম সাচ্ছল্য। অতঃপর বিয়ে এবং প্রথম গাড়ি, ফরাসি। চার চাকায় চড়ার প্রথম চমক কাটলে হেনরি লক্ষ করলেন গাড়ি যত না চলে শব্দ করে তার চেয়ে বেশি। তিতিবিরক্ত হয়ে গাড়ির কলকবজা খুলে একটি ইঞ্জিন বানালেন নিজের হাতে। এবার ট্রায়াল। ক্লেয়ারমন্ট বললে, হেনরি, গাড়ি বেশ বানালে, এ চলবে তো? হেনরি বললেন, নির্ঘাত চলবে। এই গাড়ি চালিয়ে শুক্কুরবার আমি এখান থেকে বাড়ি যাবো। পনেরো মাইল রাস্তা। এক কাজ করো এই হুলমের কুক স্ট্রিট থেকে তুমি আমার পেছনে পেছনে ওই ফরাসি দেকভিল চালিয়ে এসো। আমার গাড়ি যদি থেমে যায়, আমাকে তুলে নেবে; মনে হয় না তার প্রয়োজন হবে।
অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন তখন অনেক দূরে, বিপদে পড়লে দমকল ভরসা, তারা বিপন্ন মানুষকে বড়জোর হাসপাতাল নয় বাড়ি পৌঁছে দেয়, গাড়ি সারায় না। ক্লেয়ারমন্ট অবাক হয়ে দেখলেন হেনরির গাড়ি দিব্যি পৌঁছুল নুটসফোর্ডে, বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড়! হেনরির নিজের হাতে বানানো গাড়ি থেমে যায়নি। নতুন কিছু তিনি আবিষ্কার করেননি, যা পেয়েছেন তারই ওপরে খোদকারি করে বানালেন এমন গাড়ি যা চলে মসৃণ ভাবে। যে আমলে গাড়ি ছিল খাটারা, যার বিকট শব্দে পথচারী সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতো সেই সময়ে হেনরির গাড়ি চলল, গাড়লের মতো না কেশে, লোককে জানান না দিয়ে! হেনরি আনলেন দশ হর্স পাওয়ার টু সিলিন্ডার সাইলেন্ট গাড়ি। ভবিষ্যতের রোলস-রয়েসের জন্ম হলো, সেদিন এপ্রিল ফুলস ডে, শুক্রবার, পয়লা এপ্রিল ১৯০৪।
হুলমের হেনরি রয়েসকে চেনে কে? এ গাড়ি বেচবে কে?
ঠিক একমাস বাদে হেনরির সহযোগী ডিরেক্টর, আরেক হেনরি (এডমানডস) একটা খবর দিলেন। বাপের বাউণ্ডুলে গোছের একটি যুবকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে, ধন ও বিদ্যা দুইই তার প্রচুর, লন্ডনে গাড়ি বিক্রির শোরুম চালায়। ম্যানচেস্টারে আসবে শিগগির, তাকে লাঞ্চে ডাকা যাক।
ব্রিটিশ এম্পায়ারের জৌলুসের দিন; পিটার স্ট্রিটে সবেমাত্র খুলেছে মিডল্যান্ড হোটেল (আজও সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, ইন্দ্রনীল ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে দেখা করতে গেলে সেখানে রাত্রিবাস করেছি)। মে মাসের চার তারিখ মিডল্যান্ড হোটেলের লাঞ্চের টেবিলে বসলেন সমাজের দুটি আলাদা পাড়ার মানুষ- কল মজুরের ছেলে চল্লিশ বছরের হেনরি রয়েস যিনি স্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি, নিজেই লিখে গেছেন পাটিগণিতটুকু (এরিথমেটিক) জানেন, স্লাইড রুল অবধি শেখেননি, দারিদ্র্যকে চিনেছেন অর্ধেক জীবন, একমাত্র হবি মেশিন। অন্যদিকে ওয়েলসের মনমাউথশায়ারের জমিদার লর্ড লিনগ্লটকের সাতাশ বছরের সন্তান চার্লস রোলস, জন্মেছেন লন্ডনের অভিজাততম পাড়া বারক্লে স্কোয়ারে, স্কুল ইটন, অতঃপর যা স্বাভাবিক, ট্রিনিটি কলেজ কেমব্রিজ; স্পোর্টসে দারুণ সফল, কেমব্রিজ হাফ ব্লু (অক্সফোরড -কেমব্রিজ ম্যাচে খেললে পুরো ব্লু), হবি হট এয়ার বেলুন চড়া, বাইসাইকেল রেসিং, মোটর রেসিং। আঠারো বছর বয়েসে প্যারিস থেকে পিউজো ফিটন গাড়ি কিনে সেটি চালিয়ে কেমব্রিজ পৌঁছে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছেন, কেমব্রিজের প্রথম স্বতসচলশকট! গাড়ি নিয়ে মেতে পড়েছেন, বাবার কাছ থেকে সাত হাজার পাউন্ড নিয়ে বন্ধু ক্লদ জনসনের সঙ্গে সি এস আর লিমিটেড নামে গাড়ির শোরুম খুলেছেন পশ্চিম লন্ডনের ফুলহ্যামে। শুধু ইউরোপিয়ান গাড়ি নয়, ব্রিটিশ গাড়িও সেখানে রাখতে চান।

প্রথম রোলস রয়েস
বিশাল সামাজিক ব্যবধান সত্ত্বেও এক জায়গায় এই দুজনে মিল খুঁজে পেলেন – চোদ্দ বছর বয়েসে হেনরি ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেছেন, একই বয়েসে চার্লস নানান মেশিন নিয়ে হাত নোংরা করেন। ঐতিহ্য মণ্ডিত ইটনে, যেখানে স্কুলের ছেলেরা ফ্রক কোট না পরে দরোজার বাইরে পা দেয় না তাঁর নাম হয়ে যায় ডারটি চার্লি।
মিডল্যান্ড হোটেলে সেই সাক্ষাৎকারের কোন বিবরণী পাওয়া যায় না, কেউ নোট নেননি। হেনরি এডমানডস মোটামুটি রয়েসের দশ হর্স পাওয়ারের গাড়ির বর্ণনা দিয়ে রেখেছিলেন। লাঞ্চের সময়ে হেনরি রয়েস বলেছিলেন, আমার গাড়িটা একবার চালিয়ে দেখবেন? হোটেলের সামনে পার্ক করা আছে। এক ঘণ্টা বাদে সে গাড়ি চালিয়ে উচ্ছ্বসিত চার্লি রোলস হেনরির করমর্দন করে বললেন, শুধু টু সিলিন্ডার নয়, বানান চার, ছয় সিলিন্ডারের গাড়ি, আপনি বানাবেন, আমি বেচব।
বাংলায়, আপনার কাজ আর আমার হাতযশ!
বাকিটা ইতিহাস।
হেনরির প্রথম ড্রাইভের ঠিক দু বছর বাদে আড়াই লক্ষ পাউন্ড মূলধন নিয়ে পনেরোই মার্চ ১৯০৬, লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের লাগোয়া ১৪-১৫ কনডুইট স্ট্রিটে যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হল তার নাম রোলস-রয়েস লিমিটেড (আলফাবেট অনুযায়ী রোলস আসে রয়েসের আগে!)। চার্লসের বন্ধু ক্লদ জনসনের নাম কাটা গেলো; চার্লস বললেন রোলস-রয়েস-জনসন বড়ো খটমটো।
মহাযজ্ঞে উপেক্ষিত ক্ষুণ্ণ হয়েও জনসন ঠাট্টা করে বলেছেন, আমি রয়ে গেলাম রোলস আর রয়েসের মাঝখানে, হাইফেনে!
দু বছর বাদে চল্লিশ হর্স পাওয়ারের নতুন রোলস রয়েসের বিজ্ঞাপনে মাস্টার সেলসম্যান ক্লদ জনসন ট্যাগ লাইন লিখলেন – ‘সিক্স সিলিন্ডার রোলস-রয়েস - নট ওয়ান অফ দি বেস্ট বাট দি বেস্ট কার ইন দি ওয়ার্ল্ড’।
এই লাইনটি টিকে গেল।
চার্লি রোলস এক জায়গায় থিতু হবার মানুষ নন। আটলান্টিকের অন্য তীরে রাইট ভাইয়েরা প্লেন উড়িয়েছেন কয়েক বছর আগে। এবার তাঁরা ইউরোপে এলেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হাওয়াই জাহাজ বিক্রি করতে। ট্রায়াল ফ্লাইটে উঠে কয়েক মাইল উড়েই রোলস বললেন, এই খেলনাটি তাঁর চাই! কিনলেন কিন্তু বছর খানেক বাদে বোর্নমাউথে এক উড়ানে সে প্লেন ভেঙ্গে পড়লে প্রাণ হারালেন দুঃসাহসী অস্থির চার্লস রোলস। তাঁর বয়েস মাত্র তেত্রিশ।
চার্লি রোলসের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠলে হেনরি রয়েস প্রথমত এই উড়োজাহাজের ইঞ্জিনটাকে বুঝতে চাইলেন। একদিন যেমন তিনি ফরাসি দেকভিল গাড়ির বনেট খুলে ফেলে তাঁর মনের মতন করে নতুন ইঞ্জিন বানিয়েছিলেন তেমনই এবার ফরাসি রেনো কোম্পানির (রাইট ভাইয়েদের লাইসেন্স নিয়ে তাঁরা ইউরোপে কাজ করেছেন) ভি এইট ইঞ্জিন খুলে ফেলে তৈরি করলেন ঈগল ভি ১২! প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির অর্ধেক এয়ার পাওয়ার সরবরাহ করেছে রোলস রয়েস অ্যারো ইঞ্জিন, ক্রমশ এলো জেট ইঞ্জিন! আজ আপনি এয়ার বাস, বোইং, ড্রিমলাইনার যে কোন হাওয়াই জাহাজেই যখন উড়বেন, জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন তো কোথাও RR লেখা চোখে পড়ে কিনা! তখন মনে করবেন ফ্রেডেরিক হেনরি রয়েসকে।
অদম্য উৎসাহে অক্লান্ত পরিশ্রমে হেনরি বানাচ্ছেন গাড়ি, অ্যারো ইঞ্জিন (যা একদিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আকাশে ওড়াবে বোমারু জাহাজ), একদিন তাঁর শরীর এমন ভেঙ্গে পড়ল যে ডাক্তাররা, কোম্পানি ডিরেক্টররা বললেন খবরদার, কারখানার একশো মাইলের মধ্যে পা দিলেই আপনার নির্ঘাত মৃত্যু। তাদের আদেশ মেনে নিয়ে হেনরি পরের বিশ বছর তিনজন ডিজাইনার দু জন সেক্রেটারি নিয়ে নির্বাসনে গেলেন- শীতকালে ফ্রান্সের সাঁ ত্রপের ভিলা লা মিমোসা, গ্রীষ্মকালে সাসেক্সে উইটারিঙ্গের বাড়িতে। ই মেল, ফেসবুক, জুম কল ছিলো না। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় ফরাসি ও ব্রিটিশ ডাকের ভরসায় তিনি তাঁর গাড়ি ও অ্যারো এঞ্জিনের ব্যবসা চালালেন কয়েকশ মাইল দূরে বসে। নিখুঁত ভাবে বলে দিতেন কোন মেশিন কোথায় বসবে। পরে তাঁর চিঠিগুলি একত্র করে ৩০১ পাতার একটি বাঁধানো ভলিউম তৈরি হয়, যার মাত্র ছটি কপির অস্তিত্ব জানা গেছে। তালা চাবি দিয়ে গোপন দেরাজে বন্ধ থাকে, এর নাম কোম্পানি বাইবেল। প্রয়োজনে মাত্র কয়েকজন নির্দিষ্ট ডিরেক্টর সেটি খুলতে পারেন।
১৯১৮ সালে হেনরি ও বি ই (অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার) খেতাব পেয়েছিলেন, ১৯৩০ সালে সালে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে নাইটহুড প্রদান করেন। সত্তর বছর বয়েসে তিনি যখন মারা যান ততদিনে ফ্র্যাঙ্ক হুইটল জেট এঞ্জিনের পেটেন্ট নিয়ে ফেলেছেন। এদের দুজনের মধ্যে কতটা যোগাযোগ ছিল তার সরকারি তথ্য মেলে না তবে পরের কয়েক বছরের মধ্যে রোলস- রয়েসের অ্যারো ইঞ্জিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ণয়ে সাহায্য করবে।

রোলস রয়েস ফ্যান্টম
সিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে রোলস-রয়েস রিলেশনশিপ ম্যানেজার ক্রিস কথা প্রসঙ্গে একদিন বললেন আমাদের সিনিয়র আমেরিকান কলিগরা রোলস-রয়েসের অফিস ভিজিটে গেলে প্রশ্ন করেন আপনাদের গাড়ি কেমন বিক্রি হচ্ছে! তাঁরা এখনো মনে করেন রোলস -রয়েস শুধু গাড়ি বানায়! তখনই, সেই আটের দশকে তাদের বার্ষিক আয়ের মাত্র দশ শতাংশ আসে গাড়ি বিক্রি থেকে (আজ পাঁচ শতাংশের কম), বাকিটা অ্যারো ইঞ্জিন থেকে। আরেক বড়ো আয় আফটার সেলস সার্ভিস, দুনিয়ার হাজারটা এয়ারপোর্টে রোলস রয়েসের সেবক আপনার সুরক্ষার জন্য হাজির। ক্রিসের কাছেই শুনেছি আরেক গল্প -তিনি বলেছিলেন আমরা তো সিটি ব্যাঙ্কে কামরাদেরির খুব বড়াই করি, রোলস-রয়েসে সেটা চোখে দেখি, কানে শুনি। অফিসার, স্টাফ যে যত উঁচু পদেই থাকুন না কেন, তাঁদের পরিচয় কেবলমাত্র নাম ও পদবির আদ্যক্ষর দিয়ে। ক্রিসের সময়ে হেড ডিজাইনার ছিলেন গ্রাহাম হাল, তাঁর বস ফ্রিতস ফেলার- কোম্পানির আরদালি থেকে শোফার, কারখানার ফিটার, যে কেউ তাঁদের সম্বোধন করতেন জি এইচ বা এফ এফ বলে, তার আগে সার তো নয়ই, এমনকি মিস্টারও বাদ। একমাত্র প্রয়াত হেনরি রয়েসের পরিচয় এক অক্ষরে, শুধুই আর! আই বি এমে সাদা শার্ট ডার্ক সুট পরার কড়াকড়ি চালু করেছিলেন টম ওয়াটসন। হেনরি রয়েস সবাইকে সমান করে দিয়েছিলেন এই আদ্যক্ষর নাম চালু করে! ধরা যাক কেউ হয়তো নাইটহুড পেলেন, অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাব পেলেন তখন তাঁদের সহকর্মীরা যারা একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছেন একই পাবে বিয়ার পান করেছেন তাঁদের কি সার উইলিয়াম বা হনরেবল ট্রেভর বলতে হবে? ইনিশিয়াল দিয়ে ডাকলে সে ঝামেলা নেই।
স্টেট ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়াতে বিপরীত দৃষ্টান্ত দেখেছি। ২০০৮ সালে আমাদের উনিশশ বাহাত্তরের প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের ওমি (ওম প্রকাশ ভাট) ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হলো। পরের বছর তার মেয়ের বিয়েতে গেছি। ওমির অফিশিয়াল বসত, মালাবার হিলসের সবচেয়ে মূল্যবান ভুখণ্ড, বিশাল প্রাঙ্গণ নিয়ে ‘ডানেডিন’। স্কটিশ ব্যাঙ্কারদের স্মৃতি! সেখানে আমাদের ব্যাচের অনেকে হাজির যেমন শ্রীধর (আমরা একসঙ্গে ফ্রাঙ্কফুর্টে তিন বছর কাজ করেছি, পরে সে এস বি আইয়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছে); অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমাদের ব্যাচের শ্রীধর, ভারতী রাও, দেবজ্যোতি রায় সবাই ওমিকে সার বলছে! আমার চোখে বিস্ময় দেখে শ্রীধর আমাকে আড়ালে ডেকে বললে, প্রশ্ন করো না, এটাই দস্তুর। কারো পদমর্যাদা বেড়ে গেলে সেই অনুযায়ী অ্যাড্রেস করতে হবে, ভুলে যাও কবে তার সঙ্গে কোন পাবে গিয়ে মদ্যপান করেছ, কোন নষ্টামি করেছ। আরেক ধাপ এগিয়ে বলল, কেন, পোপের নির্বাচনী পরীক্ষায় সব কার্ডিনাল একত্র বসেন, তার মধ্যেই তো যে জন পোপ হবেন, তিনি সবার বস! দূর থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো সঞ্চরণরত কন্যা কর্তা ওমিকে দেখে পোপের সঙ্গে তার সাদৃশ্য খোঁজবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি! ভেবেছি তার ড্রাইভার গাড়ির দরোজা খুলে দিয়ে কোনদিন কি বলতে পারবে, গুড মর্নিং, ও বি?
জুড়ি গাড়ির যাত্রা
কলকাতার ভিনটেজ কার র্যালিতে কখনো হাজিরা দিইনি, গেলে নিশ্চয় রোলস- রয়েস দেখতে পেতাম। সাতের দশকে লাইটহাউসে ইয়েলো রোলস-রয়েস ছবিটি দেখেছিলাম। কচি লেবু রঙের গাড়িটির মালিক বদলায়, তেমনই তিন বার বদলায় গল্পের মোড়; রেক্স হ্যারিসন, শারলি ম্যাকলেন, ওমর শরিফ, জিন মরো, ইনগ্রিড বের্গমান, আলাঁ দেলঁ মিলে একেবারে অল স্টার কাস্ট। কিন্তু ছবির শেষে মনে হবে গল্পের আসল হিরো, একটি রোলস-রয়েস, ১৯৩১ সালের ফ্যানটম টু!
জার্মানিতে আমার প্রথম গাড়ি সাত বছরের পুরনো ফিয়াট মিরাফিওরি, কিনেছিলাম নগদ কড়কড়ে পাঁচশ মার্ক দিয়ে - আমাদের হিসেবে, শুনলে বিশ্বাস হবে না, তিন হাজার টাকা। তার ডিকি বন্ধ করতে হতো লকের জায়গায় একটা লোহার তার ঢুকিয়ে। কারো বাড়িতে গেলে সেই চলতি-কা-নাম গাড়িকে যতটা সম্ভব দূরে পার্ক করতাম। একদিন হেসেনের রাজধানী ভিজবাদেনের একটি পেট্রল পাম্পে গাড়িতে তেল ভরছি, পাশে এসে প্রায় নিঃশব্দে দাঁড়াল রাজ হংসের মতন সাদা রোলস রয়েস। এতো বড়ো গাড়ি কখনো চোখে দেখিনি, তখন ফোন ক্যামেরা থাকলে ধনী ও দরিদ্রের এ হেন সহাবস্থানের ছবিটি তুলে রাখা যেতো!
চালক নিজেই নেমে এসে তেলের নল লাগিয়েছেন; বোকার মতন বলে ফেললাম কি সুন্দর গাড়ি! আচ্ছা এক লিটারে এ গাড়ি কতটা চলে? অসম্ভব পরিশীলিত উচ্চারণে সুবেশ মধ্য বয়স্ক জার্মান ভদ্রলোক মাথাটি কিঞ্চিৎ ঝুঁকিয়ে বললেন, ধন্যবাদ, দুনিয়ার সেরা গাড়ি। তেল কত খায় কে জানে। (ডের বেস্টে ভাগেন ডের ভেলট! হোয়ের পাসট আউফ ডেন বেনজিন ফেরব্রাউখ)?
সিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে গাড়ি তিরিশ হাজার মাইল চলে অথবা তিন বছর বাদে নতুন গাড়ি পাওয়া যেতো। প্রথম বাহন ছিল ভলভো। বেতন ও গ্রেডের মনসবদারি বাড়লে মার্সিডিজ ২২০ অর্ডার করেছি। একদিন ফোন এলো তাদের স্টুটগার্ট অফিস থেকে। এ মাসের শেষ মঙ্গলবার গাড়িটি নিকটবর্তী জিনডেলফিঙ্গেনের কারখানায় তৈরি হবে, ইচ্ছে করলে সেদিনটা তাদের কারখানায় সেই গাড়ির নির্মাণ পর্ব নিরীক্ষণ করতে পারি, গাড়ির ফিজিকাল ডেলিভারি অবশ্য হবে তিন সপ্তাহ বাদে।
গাড়ি দিচ্ছে তাই যথেষ্ট, ব্যাঙ্ক আমাকে স্টুটগার্ট আসা যাওয়ার খরচা দেবে না, ছুটি তো নয়ই। ধন্যবাদ সহকারে এই আমন্ত্রণ প্রত্যখ্যান করতে হল।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোলস রয়েসের যে কোন মডেল, ফ্ল্যাগশিপ গাড়ি ফ্যানটম, ঘোস্ট, কালিনান (এসইউভি), ডন (কনভারটিবল) তৈরি হতে ছ মাস লাগে। ক্রেতা অনেক কিছুই কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন, যেমন তাঁর অভিরুচি। তাতে সময় ও ব্যয় দুটি বাড়ে, তবে এ গাড়ির ক্রেতারা পাই পয়সা গোনেন না। গাড়ির ভেতরটি মুড়ে দেবার জন্য বরোদার গায়েকওয়াড় পাঠিয়েছিলেন বিশেষ সিল্ক, রানি তাঁর প্রিয় লিপস্টিক, যেটি হবে গাড়ির ইনটেরিয়র কালার।

রোলস রয়েস এর ড্যাশবোর্ড
যে কোন মডেল কিনলে পাবেন চার বছরের আনলিমিটেড ওয়ার্যান্টি, মাইলেজ যাই হোক। গড়ে পনেরো বছর অথবা ১,৫০,০০০ মাইল এ গাড়ি চলে কোন রিপেয়ার ছাড়াই। দশ সিলিন্ডার, ৫২০ থেকে ৬৫০ হর্স পাওয়ার সম্বলিত আড়াই হাজার কিলোগ্রাম ওজনের গাড়িকে তার সাসপেনশন ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য চল্লিশ মাইল চালানো হয় রোলারের ওপরে, মেঠো গ্রাম্য পথে দেড়শ মাইল, তাকে ঝাঁকানো হয় অজস্রবার, বিশাল কৃত্রিম জল ধারার নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় সারা দিন, ভেতরে যেন কণামাত্র জল না ঢোকে তা চেক করার জন্য, ডাস্ট ফ্রি চেম্বারে ছ সপ্তাহ ধরে গাড়ির ওপরে পাঁচ প্রস্থ রঙের পোঁচ পড়ে। অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটি দেড় সপ্তাহ। অটোমেটিক রিগ দিয়ে গাড়ির দরোজা এক লক্ষ বার খোলা বন্ধ করে দেখা হয় সেটি নিঃশব্দে সাধিত হচ্ছে কিনা। মোট টেস্টের সংখ্যা আঠানব্বুই।
দুনিয়ার নব্বুই শতাংশ গাড়ি বানাতে গড়ে তেরো ঘণ্টা লাগে (ইনটেরিওরের কাজ বাদে)।
খুঁতওলা রোলস-রয়েস হয় না। হেনরি রয়েস একবার বলেছিলেন, তেমন গাড়ি যদি ভুল ক্রমে তৈরি হয়েও থাকে, আমাদের দরোয়ান তাকে ফ্যাক্টরি থেকে বেরুনোর অনুমতি দেবে না, দরজায় আটকে দেবে! তবু দৈবের বশে গাড়ি যদি কোথাও থেমে যায়, অকুস্থলে প্রয়োজনে হাওয়াই জাহাজে মিস্ত্রী পাঠানো হতো মেরামতির জন্য (এখন কাছাকাছি সার্ভিস সেন্টার হতে মেকানিক আসেন)।
হেনরি রয়েস এবং তাঁর সাথিরা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার; তাঁরা জানতেন যন্ত্রই আসল চালক, গাড়ির ভেতরে আসনের আবরণ লাগানো দরজির কাজ, ড্যাশবোর্ড বানাবে ছুতোর মিস্ত্রী। পরে দেখা গেলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এ গাড়ি যারা কিনবেন তাঁরা চাইলেন এর অভ্যন্তরকে নিজের মনের মতন করে সাজিয়ে নিতে। আজ যে কোন ক্রেতা বেছে নিতে পারেন কোনো গদির রং, লিনেন, আভ্যন্তরীণ কালার কম্বিনেশন, রিভলভিং বার, ফ্রিজ, ল্যাপটপের খোপ, ছাতা রাখা ও বের করার ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থা। তবে একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত আছে – ড্যাশবোর্ড, গাড়ির দরজার প্যানেলিং আখরোট কাঠের হতে হবে এবং সেটি কাটা হবে একটিমাত্র গাছের গুঁড়ি থেকে। আজ যে কোন গাড়িতে সতেরো সপ্তাহ লাগে রোলস রয়েসের ইনটেরিয়র সাজাতে। সিটে বসলে মাথার ওপরে যে কৃত্রিম আকাশ দেখেন, তার অঙ্গদকে তারায় তারায় খচিত করা, প্রতিটি আলো বসানো হয় ছুঁচ দিয়ে, যাবতীয় সেলাইয়ের কাজে ছ থেকে আট সপ্তাহ লাগে। ডাক্তার যেমন স্টেথোস্কোপ দিয়ে রুগী দেখেন, রোলস–রয়েসের দরজি, ছুতোর মিস্ত্রী গাড়িকে তেমনই সযত্নে বধু বেশে সাজান। ক্রেতার সকল আবদার বায়নাকে সমান আদর ও প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন রোলস-রয়েস।
রোলস-রয়েস ও কোয়ালিটি সমার্থক। ‘আমরা রোলস-রয়েস সার্ভিস দিয়ে থাকি’ এই বাক্যবন্ধ আজ ইংরেজি ভাষার অঙ্গ।

লা রোজা নোয়া ড্রপ টেল
প্রথম গাড়িটির দাম ছিল ৩৭৫ পাউন্ড, আজকের মাপে ষাট হাজার পাউন্ড। বর্তমান ফ্যানটম সিরিজের দাম শুরু হয় পাঁচ লক্ষ পাউন্ড থেকে, সবচেয়ে দামী গাড়ির নাম লা রোজ নোয়া (কালো গোলাপ) ড্রপ টেল, মূল্য তিন কোটি ডলার, কোন রইস আদমি সেটি অর্ডার করলে তবেই বানানো হয়, শো রুমে সাজানো থাকে না। গাড়ির মালিকের নাম ঠিকানা এক প্রাইভেট ইনফরমেশন, তবে যতদূর জানা যায় এ অবধি চারটে লা রোজ নোয়া বিক্রি হয়েছে, একটির মালিকের নাম গায়িকা বিওন্স। নিতান্ত হাঘরে ক্রেতাদের জন্য আছে এন্ট্রি লেভেল রোলস, ঘোস্ট সিরিজ, দাম মাত্র তিন লক্ষ পাউন্ড বা প্রায় চার কোটি টাকা। ট্যাক্সের কারণে ভারতবর্ষে সে গাড়ির দাম ডবল হয়ে যায় কিন্তু আজকের কোনো নুভো রিশের কাছে সে টাকা খোলামকুচি মাত্র। ফিল্ম স্টার কাজল তাঁর পতিদেব অজয় দেভগনের সঙ্গে সাত কোটি টাকার ঘোস্ট চড়েন।
হংকং এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ নয় কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে সেখানকার মানুষ রোলস-রয়েসের পুজো করেন! মাথা পিছু সবচেয়ে বেশি রোলস-রয়েস আছে সেখানে (জনসংখ্যা ৭০ লক্ষ, রোলস-রয়েস ১১০০)।
সব মডেল মিলিয়ে বছরে কুড়ি লক্ষ নতুন মার্সিডিজ পথে নামে, এমনকি তাদের সবচেয়ে মহার্ঘ্য ব্র্যান্ড মাইবাখের বার্ষিক বিক্রির সংখ্যা বারো হাজার! ইংল্যান্ডের পথে দেখিনি, গত বছর যুবভারতীতে মোহনবাগানের খেলা দেখতে গিয়ে একটা মাইবাখ চোখে পড়ল; আমার স্কুলের ছেলে আর পি জির জাঁদরেল অফিসার প্রসেনজিত জানালে সেটি সঞ্জীব গোয়েঙ্কার ব্যক্তিগত শকট।
ছ’হাজারের বেশি রোলস-রয়েস গুডউড ফ্যাক্টরির দরজা দিয়ে কোনো বছরে বেরোয় না। হেনরির মন্ত্র ছিল, এখনও সেটি মানা হয় - এ গাড়ির গৌরব তার নিপুণতায়, সেলস ফিগারে নয়। সেই প্রথম দিন থেকে যতগুলি রোলস-রয়েস গাড়ি পথে নেমেছে, তার ষাট শতাংশ এখনো চলার যোগ্য।
মনে আছে জার্মানিতে ফেরারি ডয়েচল্যান্ডের অফিসে ব্যবসার আলোচনার সময়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রতি বছর গাড়ির সেলস বাড়ানোর চাপ আসে না মারানেলোর হেড অফিস থেকে? তিনি বলেছিলেন, তাঁর গাড়ির বিক্রি কম রাখাটাই তাঁর জব টার্গেট। ফেরারি দেয় মর্যাদা প্রেস্টিজ, অটোবানে ধাবিত হবার স্বাধীনতা। ফেরারি বিরল ব্র্যান্ড, সুপার মার্কেটে শপিং করার জন্য নয়। জার্মানিতে এক বছরে আটশো ফেরারি গাড়ি বিক্রির অনুমতি ছিলো (১৯৯১)। আজ সারা দুনিয়ায় বছরে তেরো হাজারের বেশি নতুন গাড়ি রিলিজ করা হয় না, অধিক ফেরারিতে বাজার নষ্ট; যেমন হীরের বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রেখে দে বেয়ারস তার দাম উঁচু জায়গায় বেঁধে রাখেন।
জুড়ি গাড়ির আস্তাবল
রোলস রয়েস কেবল বাহন নয়। চার্লি রোলস বলেছিলেন, এ গাড়ি হবে ঐশ্বর্য, বিলাস এবং সম্ভ্রমের সমার্থক, অ্যান্ড সামথিং ব্রিটিশ!
আজ রোলস-রয়েস ব্র্যান্ডের মালিক জার্মান বি এম ডব্লিউ (বায়ারিশে মোটরেন ভেরকে), সিইও তুরস্কের মানুষ, কিন্তু তারা সেই ব্রিটিশনেস অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
রোলস রয়েসের সৃষ্টির প্রথম তিন দশকে তার ক্রেতা ও পৃষ্ঠ পোষক ছিলেন রাজন্যবর্গ। ব্রিটেনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ জর্জ থেকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন সকলেই ছিলেন রোলস রয়েসের পৃষ্ঠপোষক – শোনা যায় তাঁর গাড়ি তৈরির অগ্রগতি দেখার জন্য শিশুর মতন কৌতূহলে লুই মাউন্টব্যাটেন নিয়মিত হাজিরা দিতেন কারখানায়। ১৯১০ সালে জার নিকোলাস দুটি সেভেন সিটার অর্ডার করেন যার আপহোলস্টারি ছিল আগাগোড়া সিল্কের। জাপানের বর্তমান সম্রাটের প্রপিতামহ ইওশিহিতোর গাড়ির রং ছিল চেরি-রেড, দুই দরোজায় ওপরে সোনার জলে আঁকা চন্দ্রমল্লিকা। শ্যাম দেশের (থাইল্যান্ড) রাজা চতুর্থ রামার গাড়ি ছিল সম্পূর্ণ ক্রোমিয়াম প্লেটেড।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের বিরুদ্ধে সিনাই পেনিনসুলাতে গেরিলা লড়াই চালানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার দুটি রোলস রয়েস গাড়ি ‘লোন’ দিয়েছিলেন অতি সাধারণ ঘরের এক মানুষ টমাস এডওয়ার্ড লরেন্সকে। যুদ্ধ জেতার পরে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া একদিন বন্ধু লাওয়েল টমাসকে বলেন, জানো, অনেক টাকা থাকলে কিনতাম একটা রোলস রয়েস গাড়ি, অনেকগুলো টায়ার আর সারা জীবন চালানোর জন্য জরুরি তেল।
মাত্র এক বছর পরে ডরসেটে মোটর বাইক অ্যাক্সিডেন্টে তিনি মারা যান।
মিশরের শেষ ‘ফারাও’ রাজা ফারুকের একটি রোলস কালেকশন ছিল আলেকজান্দ্রিয়াতে। ব্রুনেইয়ের বর্তমান সুলতান হাসান আল বোলকিয়া হয়তো আরব্য রজনীর শেষ খলিফা – তাঁর আস্তাবলে পাঁচশোর বেশি রোলস রয়েস শোভা পায়।
একদিন রাজন্যবর্গের স্থান নিলেন শিল্পপতি, রাষ্ট্রনেতা, ফিল্ম, স্পোর্ট সেলিব্রিটি - জন পিয়েরপন্ট মরগান, ভ্যানডেরবিলট পরিবার, ইওসেপ ব্রজ টিটো, সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাস্তাস মিকোয়ান, ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস, এলভিস প্রেসলি, আদানি, আম্বানি, জেনিফার লোপেজ, ডেভিড বেকহ্যাম, শাকিল ও’নিল, সাইমন কাওল এবং আরও অনেকে।
ঐতিহ্যের নাম রোলস-রয়েস, সেখানে সহজে কিছু বদলায় না কিন্তু তাদের নিজেদের তথ্য অনুযায়ী, একশ বছর আগে মাত্র পাঁচ শতাংশ মালিক নিজে গাড়ি চালাতেন, আজ মাত্র পাঁচ শতাংশ গাড়ি শোফার ড্রিভন।
রোলস-রয়েসের প্রথম চার দশকের ইতিহাসের সঙ্গে আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে ভারতীয় রাজাদের গল্প।
হায়দ্রাবাদের সপ্তম নিজামের আস্তাবলে ছিল পঞ্চাশটি রোলস রয়েস; তাঁর প্রিয় গাড়িটির বডি রূপোর, পেছনের সিটটি সিংহাসনের মতন, সেটিকে ফ্ল্যাট করলে হয়ে যেত আরামদায়ক শয্যা। চল্লিশ বছরে গাড়িটি চলেছিল মোট চারশ মাইল। পাতিয়ালার মহারাজা একদা একসঙ্গে পাঁচটি রোলস অর্ডার করেন, সব সমেত তাঁর আস্তাবলে ছিল ৩৫টি। নিয়মিত ব্যবহারের গাড়িতে গোল্ড প্লেটেড ড্যাশ বোর্ড, বিশেষ সুইস ঘড়ি, মেডিসিন এবং পানীয় গেলাসের চেস্ট। শিকারের সময়ে দাঁড়িয়ে বন্দুক চালানোর জন্য রোলস-রয়েস বানিয়ে ছিলেন হুড খোলা, ফ্লাড লাইট লাগানো একটি বিশেষ গাড়ি। আরেক মহারাজা হাতির দাঁত সরবরাহ করেছিলেন তাঁর গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের জন্য। রাজ মহিষীদের ঝরোখার আড়াল থেকে বাইরের দুনিয়া দেখার সুবিধেও করে দিয়েছিল রোলস-রয়েস, প্রথম ফ্রস্টেড গ্লাস উইন্ডো!
আমাদের সময়কার কারো মনে থাকতে পারে বহু বছর আগে, আজকের সানডে সাসপেন্সের মতন গল্প পাঠের আসর বসতো বিবিসিতে। সায়েদ জাফরির কণ্ঠে শোনা একটি গল্প এই প্রসঙ্গে আজ মনে পড়ছে (লেখকের নাম মনে নেই বলে দুঃখিত) –
প্রিভি পার্স বাতিল হয়ে গেছে। এক ভারতীয় মহারাজার সংসারে আর্থিক দুর্দিন ঘনায়িত; লন্ডন টাইমসে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন - ফ্যানটম, রেথ মিলিয়ে ছটি রোলস রয়েস বিক্রি করবেন, তাঁর একান্ত অভিলাষ ক্রেতা তাঁর গাড়িগুলিকে ভালবাসবেন, তাদের সম্যক পরিচর্যা করবেন। লিভারপুলের এক ধনী ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি এলেন; ইংরেজ এজেন্ট দরাদরি করলেন না। সেটা মহারাজাকেও মানায় না।
গ্যারাজের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে মহারাজা তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় গাড়িগুলির দিকে করুণ চোখে চেয়ে লন্ডনের এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, একটা কথা জানা হয়নি। আপনার প্রভু এই গাড়িগুলি নিয়ে কি করবেন?
এজেন্ট একটু অবাক হয়ে বললেন, আই অ্যাম সিওর হি উইল ড্রাইভ দেম, ইওর ম্যাজেস্টি!
মহারাজা বিষণ্ণ মুখে বললেন, হাউ স্যাড।
পরিশিষ্ট

উঠোনে রোলস রয়েস
ব্যাঙ্কের কাজ চুকলে অখণ্ড অবসর কাটানোর জন্য একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং বুটিকের ভার নিয়েছি। অফিস ছোট ক্ষতি নেই, সিইও আখ্যা জুটল। এক পুরনো বন্ধু, লন্ডন ফরফাইটিং এর টোনি নাইটের ছেলে ক্রিস তখন আমার অফিসের সব কাজের কাজি। একদিন দরোজায় উদিত হয়ে বললে, মুশকিলে পড়া গেছে বস। দুবাইতে আমাদের এক সহযোগী সংস্থার মালিক একটা রোলস-রয়েস কিনেছেন; তার এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট বানাতে সময় লাগছে। তাঁদের অনুরোধ আমরা গাড়িটির সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। একে আমাদের অফিসের ছাদে বা কোন পার্ক হাউসে তুলে দেওয়া যায় না। আপনার বাংলোয় বড়ো ড্রাইভ আছে, সেখানে যদি কিছুদিনের জন্য রাখেন!
ক্রিসকে বলতে হল আমার মতো সামান্য মানুষের দুয়োরে রোলস-রয়েস দাঁড়িয়ে থাকলে সারে পুলিস এমনকি এমআইফাইভের নজর পড়তে পারি, পাড়া প্রতিবেশীর তির্যক দৃষ্টির কথা বাদই দিলাম। বউকে বোঝাতে হবে আমার চাকরিতে হঠাৎ উন্নতি হয়নি এবং এটি চোরি কা মাল নয়! ক্রিস বললে গাড়ির দলিল এবং পারচেজ ডকুমেন্ট রাখুন না!তবে যতদূর জানি এই রোলস- রয়েসে অনেক কাজ করানোর আছে, সেটা নতুন মালিক দুবাইতে করাবেন।
লম্বা গল্পকে ছোট করে বলি, উপরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়েছিল। গাড়িটি এলো আরেক পেল্লায় গাড়িতে চড়ে কারণ এটি অযান্ত্রিক, চলার অবস্থায় নেই। অবাক হয়ে দেখলাম চল্লিশ বছর আগে জার্মানির ভিজবাদেনে আমার প্রথম দেখা সাদা রাজহংসের মতন! তবে ভেতরে ও বাইরে কাজ বাকি। এ গাড়ি চালানোর প্রশ্ন ওঠে না আমার ইনসিউরেন্স নেই। সাদা রাজহংসটি তার গভীর চলা গোপন রেখে আমাদের উঠোনে রয়ে গেল।
আমাদের মালি ইয়ান ময়েস অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে একদিন বললে, এভাবে শুধু লক করে এ গাড়ি ড্রাইভে ফেলে রাখাটা কোন কাজের কথা নয়, একটা এক্সট্রা অ্যালার্ম লাগাবেন!
মাস দুয়েক গাড়িটি আমাদের ড্রাইভের শোভা বর্ধন করেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অভ্যাগতকে (এমনকি আমার স্কুলের সহপাঠী চিন্ময়কে) বলেছি, ও গাড়ি আমাদের নয়! কে কতটা বিশ্বাস করেছে জানি না। বাড়িতে রোলস-রয়েস আছে এই গপ্প বাজারে ছেড়ো না এমন ওয়ার্নিং দেওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়েরা মহা উৎসাহে গাড়িতে বসে নিজেদের ছবি তুলে নিয়ে পাঠিয়েছে একদিন।



সেই রোলস রয়েসে আমার মেয়ে
কৌতূহলী পাঠকের জন্য
পিটার পিউ - দি ম্যাজিক অফ এ নেম
আরভিং ওয়ালেস - দি সানডে জেনটলম্যান
মিটিংস দ্যাট মেড হিস্টরি - অ্যান্ডমিটিংস.কম