

ছবি: রমিত
য ধ্রুবাণি পরিত্যাজং অধ্রুবাণি নিষেবতে
ধ্রুবানি তস্য নশ্যন্তি অধ্রুবং নষ্টমেব চ
Speculation tends to detach itself from really valuable objects and turns to delusive ones without a real understanding of the process involved. Lose it and then ask, how did that happen?
Charles P Kindleberger
সোনাঝুরি নদী
একটি প্রসন্ন সকাল। ছুতোর মিস্ত্রী জেমস মার্শাল কাজ করছিলেন নদীর তীরের করাত কলে। বিজলি বাতি তখনো অনেক দূরে, নদীর জলের ধারাকে কৃত্রিম ছোটো ড্যামের ভেতর দিয়ে বইয়ে দিলে তার গতিতে চলতো মিলের চাকা, সেটি ঘোরাতো কাঠ কাটার করাত। মিল মালিক জন সাটার সে সময়ে জেমসকে এর দেখাশোনার ভার দিয়েছিলেন। চাকা ঘোরানোর পরে সেই ড্যাম থেকে সঠিক জলনিকাশি হচ্ছে কিনা দেখতে গিয়ে একদিন জেমস লক্ষ করলেন জলের মধ্যে হালকা সোনালি রঙের কিছু যেন দেখা যাচ্ছে। যা চকচক করে তাই সোনা নয় সেটা জেমসও স্কুলে পড়েছেন। কিন্তু আজ ঋষি (সুনাক নন) বাক্য উপেক্ষা করে কয়েকটা টুকরোগুলো তুলে জন সাটারকে দেখালেন। গ্রিক পুরাণের রাজা মাইডাস এই সক্কালবেলা নির্জন নদী কিনারে তাঁর ছোঁয়ায় পাথরকে সোনা করে দিচ্ছেন এমন আজগুবি ভাবনাকে বরখাস্ত করে জন তা পরীক্ষায় পাঠিয়ে জানলেন এটি সোনার টুকরো। তার মানে কাছাকাছি কোনো সোনার খনি থেকে এটি বয়ে এসেছে; এটি কি নমুনা মাত্র? ট্রেলার? নাকি এবার করাতের কল বন্ধ করে সোনার দোকান খুলবেন? ইতিমধ্যেই তিরিশ মাইল দূরে জন একটি ছোট সেটলমেন্টের স্থাপনা করেছেন, তার নাম সাক্রামেন্টো।

সোনাঝুরি নদী
কলোমা, ক্যালিফোর্নিয়া, ২৪শে জানুয়ারি, ১৮৪৮
সোনার টুকরো কেবল জলে বয়ে যায় না, দেখা গেলো নদীর আশে পাশের পাথরে আঘাত করলেও স্বর্ণ পিণ্ডের দেখা মেলে। চল্লিশ চোরের কাছ থেকে চিচিং ফাঁকের মন্ত্র গোপন রাখার প্রবল প্রয়াস করেছিলেন নতুন আলিবাবা জন সাটার ও জেমস মার্শাল। তবু সে খবর ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল। পাশের জনপদ সাক্রামেন্টো শুধু নয় মার্চ মাস নাগাদ এমনকি দেড়শ মাইল দূরের শহর সান ফ্রানসিসকো হতে মানুষ জন শাবল গাইতি এবং জলে ভাসা সোনা ছাঁকবার জন্য ফুটোওলা লোহার প্যান নিয়ে হাজির হলেন সেই নদীর কূলে (বর্তমানের আমেরিকান রিভার নামে পরিচিত, র্যাফটিঙের জন্য খ্যাত)। ডিসেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট পোলক আমেরিকান কংগ্রেসকে এই খুশ খবরি দিলেন। এবার দেশ বিদেশের ভাগ্য সন্ধানী যে যেখান থেকে পারেন লোটা কম্বল নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার পাড়ি জমালেন সেই সোনাঝুরি নদীর উদ্দেশ্যে। সে আমলে ট্রেন নেই, উড়ো জাহাজ অনেক দূরে। একমাত্র বাহন ঘোড়া অথবা চরণ বাবুর গাড়ি। খনির বা সোনা ভরা নদীর কোন মালিক নেই, কারো অনুমতি বা লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। সেখানে তাঁবু গেড়ে লোহার বা টিনের প্যান নিয়ে জল ছাঁকার গণতান্ত্রিক অধিকার সকলের, সকলেই ইললিগাল ইমিগ্রান্ট, আমেরিকান পাসপোর্ট বা গ্রিন কার্ড বহু দূরে, ক্যালিফোর্নিয়া নামক স্টেটের জন্ম হয়নি। সোনা বিক্রি করলে কোন সেলস ট্যাক্স বা জি এস টি দেবার প্রশ্ন নেই। যার অদৃষ্টে যা জুটবে সেটি তারই। তবে সে সোনা সাক্রামেন্টো বা সান ফ্রানসিসকোর লক্ষ্মী বাবুকা আসলি সোনা চাঁদি কি দুকান অবধি পৌঁছে দিতে হবে। ভয় শুধু চোর ডাকাতের। থানা পুলিস নেই, রিভলভার বন্দুক যার, সোনা তার।
অয়মারম্ভ।
ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ

প্রথম সোনার টুকরো দেখা গিয়েছিল এইখানে। কলোমা
প্রথম দশ বছরে যে সোনা পাওয়া যায় তার মূল্য প্রায় তিরিশ কোটি ডলার, আজকের হিসেবে অনেকগুলো শূন্য যোগ হয়ে কিছু বিলিয়ন ডলার। সোনা ফুরোয়নি। খনির মালিকানা আজ কর্পোরেটের কিন্তু অ্যামেচার স্বর্ণ সন্ধানীরা আজও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে জল ছাঁকেন, সোনার স্বপ্ন দেখেন অবসর সময়ে র্যাফটিং করে থাকেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে এ সম্পদ যাদের পাওয়ার কথা কেবল সেই মেক্সিকানদের কপালটাই খারাপ। ইতিহাসের এক বিচিত্র প্রবঞ্চনায় সে বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্প্যানিশ আমেরিকান যুদ্ধ শেষে গুয়াদালুপে-ইদালগো চুক্তি অনুযায়ী মাত্র দেড় কোটি ডলারের বিনিময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দখলী স্বত্ব বিক্রি করে দিতে হলো আমেরিকাকে, মেক্সিকো হারাল এক গুপ্তধন। রয়ে গেল সেই তিমিরে; তিন দশক আগে সান ডিয়েগো থেকে গাড়ি চালিয়ে আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্ত পেরিয়ে এনসেনাদা, গুয়াদালুপে গিয়ে দেখেছি বাখা (লোয়ার) ক্যালিফোর্নিয়ার দরিদ্র চেহারা।
চাষ করতে, কল কারখানা খুলতে জমি লাগে, তার এন্ট্রি টিকেটের নাম মূলধন; সেটি দুনিয়ার কিছু মাত্র ধনী মানুষের অথবা সরকারের কবজায়। বাকিরা ভূমিহারা বা ভাগ চাষি অথবা শ্রমিক। গোল্ড রাশ এমন এক দিগন্ত খুলে দিলো যেখানে সিড মানি লাগে সামান্য; যে কোন আত্ম নির্ভর সুবর্ণ সন্ধানী শাবল, ফুটো ওলা টিনের পাত্র আর মা কা আশীর্বাদ নিয়েই এসে হাজির হতে পারেন নদীর ধারে। খাজনা, ভাড়া, ট্যাক্স নেই। বাস তাঁবুতে, প্রাতঃকৃত্য মাঠে, স্নান নদীতে; দিনের বেলায় কলা মুলো খাটাশ যা জোটে, সন্ধ্যেয় চকমকি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেটি পুড়িয়ে রান্না!
লটারি সবার ভাগ্যে লাগেনি, সকল সন্ধানী সোনার ভাণ্ডার লুঠ করতে পারেননি; বিপদ সহ্য করে শূন্য হাতে ফিরেছেন, কঠিন কষ্ট ভোগ করে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। চার্লি চ্যাপলিনের গোল্ড রাশ ছবিতে কাঁটা চামচ দিয়ে জুতো খাওয়ার দৃশ্যটি তার অসামান্য প্রতীক।
এই অভিযানে জেতার কৃতিত্ব এবং হেরে যাওয়ার গ্লানি একান্ত একক।
গতকাল: তোমার খোলা হাওয়া
দেড়শ বছর বাদে ক্যালিফোর্নিয়ার কলোমার প্রায় দুশো মাইল দক্ষিণ পূর্বে সিলিকন ভ্যালি নামক অঞ্চলটি ঘিরে যে নতুন ব্যবসার সূচনা হলো তাকে গোল্ড রাশের সঙ্গে তুলনা করাটা অসমীচীন হবে না। অবশ্যই এতো বছরে বদলে গেছে ব্যবসা বাণিজ্যের কেতা কায়দা, ক্যালিফোর্নিয়া এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম অঙ্গরাজ্য। তার আছে সংবিধান, স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন, স্টেট ল, বিধানসভা, গভর্নর। ব্যবসায় জুটেছে অজস্র ফ্যাঁকড়া - ব্যাল্যান্স শিট, বোর্ড মিটিং, ত্রৈমাসিক হিসেব নিকেশ, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, সরকারি তদারক তদন্ত বিভাগ। শুধু লাল নয়, নীল ও সোনালি রঙের নানান ফিতে, সেগুলি ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট কালার।
এই সময়ে কোন বাধা না মানি বলে দিগন্তে দেখা দিলেন তরুণ অশ্বারোহীর দল। তাঁরা ছুঁড়ে ফেললেন মাস্টার্স, এম বি এ ক্লাসের পাঠ্যপুস্তক, লিখতে শুরু করলেন নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার টেক্সটবুক; ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বল্প নিবেশে বিশ্বজয়ের কেতন ওড়ালেন।
ইকনমিকসের বিধান অনুযায়ী উৎপাদনের উপাদান চারটি - ল্যান্ড, লেবার,ক্যাপিটাল অরগানিজেশন।
এই ব্যবসায়ের জন্মলগ্নে দেখা গেল - বাড়ির গ্যারাজ বা ইউনিভার্সিটির হোস্টেল রুম হল ল্যান্ড, লেবার নিজের দুটি হাত, মাথার ঘাম; ক্যাপিটাল পিতা মাতার দাক্ষিণ্যের পকেট মানি বা কলেজের বৃত্তি দিয়ে কেনা অথবা স্টিভ জবসের মতন গাড়ি বেচার টাকা; অরগানিজেশন নিজেরই মেধা। টিম বার্নার্স-লি সকল কম্পিউটারকে এক অদৃশ্য তারে বেঁধে দিয়েছেন; কাউকে আর হেঁটে চলে কোন সুক, মণ্ডি, হাট বা মার্কেট প্লেস পৌঁছুতে হয় না। টেবিলের ওপরে বসানো পি সির কল্যাণে নিজের ঘরে বসেই বিশ্ব বাজারের সাড়া পাওয়া যায়, প্রকাণ্ড ওয়েরহাউস লাগে না, হাজার শ্রমিকও নয়। এই বাজারে ঢুকতে বেরুতে শুল্ক, টারিফ বা টোল লাগে না। কিসের কেনা বেচা করবো সেটা আমারই বিবেচ্য। অর্থনীতির পরিভাষায় ফ্রি এন্ট্রি, ফ্রি একজিট, খোলা বাজার, লেসে ফেয়ার, পারফেক্ট কম্পিটিশন।
খোলা হাওয়া
কলোমায় স্বর্ণ শিকারিদের আসা যাওয়া, কেনা বেচার ওপরে কোন কড়াকড়ি ছিল না। স্থানীয় শান্তি, আইন রক্ষা এবং বিচারের ভার ছিল একজনের হাতে, তাঁর সরকারি নাম লোকাল শেরিফ; তিনি কখনো সখনো ঘোড়ায় চড়ে অঞ্চল তদারক করতেন। লোকাল ট্যাক্স, মানি লনডারিং ইত্যাদি বিষয়ের পর্যবেক্ষণ তাঁর কর্ম পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহজাত বালখিল্য উচ্ছ্বাসকে রাশ মানানোর জন্য কয়েকশ বছর যাবৎ তৈরি হয়েছে হয়েছে আইন কানুন; লাল ফিতে, ব্যুরোক্রেসি, রেগুলেশন, সুপারভিশন এবং সরকারি হস্তক্ষেপের উদাহরণ অগুনতি। নদীর ধারে পাওয়া সোনার ওপরে কর দিতে হতো না; এখন ব্যক্তিগত, কর্পোরেট আয়কর, স্থানীয়, প্রাদেশিক কর দিতে হয়, জল বিজলির খরচা লাগে, হিসেবের খাতাপত্র রাখতে হয়, লোক পুষতে মাইনে লাগে। ঘোড়া নয়, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট করতে কখনো প্লেনে উড়তে হয় – এসবের খরচা আছে। সোনা খোঁজার কালে সব দিন সমান যায়নি তবে সে আপনি আর কোপনি। যেদিন কিছু পাওয়া গেল ভালো, না মিললে পেটে কিল মেরে আবার পরের দিন সেই নদীর তীরে বসে প্যান ধরা; ফাইনাসিঙ্গের একমাত্র উৎস নিজের পকেটের ক্যাশ, ক্রেডিট কার্ড নয়। অন লাইন ব্যাঙ্কিং দূর অস্ত। এদের ধার দেবে কে? একে তো গোটা দেশের কয়েকটা বড়ো শহর মিলিয়ে কিছু মাত্র ব্যাঙ্ক, তারা এই ভ্যাগাবন্ড বাউনডুলেদের রিস্ক নেবে কেন? সান ফ্রান্সিসকো সাক্রামেন্টো শহরের ব্যাঙ্ক তাদের কাউনটারে সোনা জমা দিলে তাকে নিক্তিতে ওজন করে (জলপাইগুড়ি ব্রাঞ্চে গোল্ড লোনের হিসেব করা দেখেছি) কিনবে কিন্তু ভবিষ্যতের আশায় নিবেশ করবে কি? আজ নগদ দিলাম, সোনা পেলে সুদ শুদ্ধু কাল শোধ দেবেন মশায়, এমন ধারা ভবিষ্যৎ আয়ের, যার নাম ফিউচার রিসিভেবল, আশায় টাকা লাগানোর মত মূর্খ ছিল না ব্যাঙ্ক অফ ইতালি (আজকের ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকার পিতামহ)। স্বাভাবিক, কারণ জমা টাকাটা পাবলিকের, বিশ্বাস করে আপনার আমার মতন মানুষ ধার দিয়েছেন। অত্যন্ত মেপে জুপে ঝুঁকি নেবেন তাঁরা, জেনে শুনে বিষ পান করবেন না। ফস্কা গেরোর সুযোগে কোন মোদী বা মাল্য যদি বেরিয়ে যান, সেটা অকুপেশনাল হ্যাজারড, কস্ট অফ ডুইং বিজনেস।
তাহলে এই নতুন দিগন্তের মেঠো পথ বাঁধিয়ে সদর রাস্তা বানানোর খরচা আসে কোথা হতে? যা কিছু নতুন, অজানা তাকে আবিষ্কারের, তাদের চলার পথের রসদ জোগান কারা? এককালে স্পেন পর্তুগালের রাজারা বিদেশি জমি, সোনা, দাস দখলের প্রজেক্ট ফাইনান্স করেছেন, যেমনটি করেছেন ইংল্যান্ড হল্যান্ডের রাজন্যবর্গ। সে দিন আর নেই।
ইতিহাসের আবিষ্কারকরা কখনো থেমে থাকেননি। হেনরি ফোর্ড, চার্লস গুডইয়ার আত্মীয় বন্ধুজনের কাছে হাত পেতেছেন, আলেকজান্দার গ্রাহাম বেল, স্যামুয়েল মর্স তাঁর ছাত্রদের পিতার কাছে। অলিভার ও উইলবার রাইট, মারকোনি নিজের বা পরিবারের ক্যাশবাক্স ভেঙ্গেছেন, ব্যারথা তাঁর যৌতুকের টাকা কার্ল বেন্তসের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, তোমার গাড়ির এঞ্জিন বানাও। কখনো একাধিক দূরদর্শী শিল্পপতি নিজেদের প্রয়োজনের সঙ্গে কোন আবিষ্কারের ভ্যালু প্রোপোজিশনের যোগসূত্রটি চিনে নিয়ে অকাতরে অর্থলগ্নি করেছেন - যেমন রুডলফ ডিজেলের ইন্টারনাল কমবাশন এঞ্জিনের পেছনে ক্রুপ, নিকোলা টেসলার পাশে জর্জ ওয়েসটিংহাউস। সুযোগ সন্ধানী সেন্টার ফরওয়ার্ডের মতন ইনভেস্টরও দেখা দিয়েছেন যারা পৃথিবীর পথে নতুন আলো জ্বালানো নয়, কেবল আয় দুগনি করার জন্য টাকা লাগিয়েছেন; তারা সত্যিকারের ঝুঁকি নিয়েছেন, তাকে কেবলমাত্র সাট্টা খেলা বলা হয়তো সঙ্গত হবে না। কিছু লেগে গেছে, কিছু লাগেনি। হারি জিতি নাই লাজ বলে পরের চান্সের অপেক্ষা করেছেন। এই সকল লগ্নি ছিল বিবেচিত সিদ্ধান্ত; ও পাড়ার বিশু বাবু লাগিয়েছেন বলেই নয়, কিপিং আপ উইথ জোনসেস নয়। এঁরা ছিলেন লং টার্ম ইকুইটি ইনভেস্টর, বাজারে ফোর্ড বা গুডইয়ারের শেয়ার বেচে বড়লোক হবার জন্যে মাঠে নামেননি। আই পি ও নামক মোচ্ছবটি তখন এক অজানা উল্লাস।
আজকে যাকে ডেস্কটপ বলি, টেলিভিশনের আকৃতির সেই ছোট আলোকিত বাকসোয় প্রথম ই মেল দেখেছিলাম চল্লিশ বছর আগে। আইবিএমের ঘর জোড়া বিশাল কম্পিউটার ময়দানব ইতিমধ্যে পেলো এক মানবিক রূপ, জেফ রাস্কিন/বারেল স্মিথ বানালেন, ম্যাকিনটশ আপেল ফলল, আইবিএম আনলো পিসি। সেই সব ভগীরথেরা খালটি কেটেছিলেন বলেই নদীপথে এসেছে টিম বার্নার্স-লি-র আন্তর্জাল, যে জালে জড়াতে শুরু করেছি আমরা ।

ম্যাকিনটশ ১৯৮৪
এই খোলা বাজারে ঢোকার খরচা নগণ্য কিন্তু টিকে থাকার লড়াই কঠিন- একদিন পেসাদ পাওয়া যাবে বলে ধুনির আগুন জ্বালিয়ে রাখতে তেল, কেরোসিন প্রয়োজন। ১৯৯৫ সালে নতুন টেকনোলজি কোম্পানি সেই ইন্ধনের সন্ধানে খোঁজে বেরিয়েছেন; কোথাও পাবো তারে? ব্যাঙ্কারদের ডাকলেন। তাঁরা এসে নানান ঝকঝকে স্ক্রিন ও গ্যাজেট দেখে চমকালেন না। বরং সম্যক পর্যবেক্ষণের পরে জিজ্ঞেস করলেন, আগের বছরের রেভেনিউ কতো ছিল? বুকের ওপরে ‘উই আর ইয়োর টুমরো’ লেখা টি শার্ট, জিনস ও রিবকের স্পোর্ট শু পরা স্ট্যানফোরড ড্রপ আউট যুবক সি ই ও বললেন, গত বছর কেন, আজও আয় কিছু নেই। কিন্তু জানবেন একদিন আমাদের এই বিজনেস মডেল আনবে এক অভাবনীয় রেভেনিউ স্ট্রিম। আমরা অদ্ভুত হতে পারি, কিন্তু আমরা নূতন যুগেরই দূত।
আন্তর্জালের মায়ায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেখা দিলেন আরেক আলোর পথযাত্রী; এঁরা ইন্টারনেট কোম্পানির ভবিষ্যৎ তথা বিজনেস প্ল্যান দেখলেন, আগের পাঁচ বছরের লাভ লোকসানের খতিয়ান নয়। স্টার্ট আপ কোম্পানির সঙ্গে বসে জানলেন এই প্রকল্পিত ব্যবসায়ে কতো আয় হতে পারে। দুই বা পাঁচ বছরের হরাইজন ধরে নিয়ে সেখান থেকে পাওয়া গেল একটি ম্যাজিকাল নম্বর – ভ্যালুয়েশন। আমাদের আপন অভিজ্ঞতা থেকে জানি কোম্পানির ভ্যালুয়েশন নির্ধারিত হয় অতীতের আয়, বর্তমানের গতি এবং ভবিষ্যতের আশায় যেমনটি আমরা ব্যাঙ্কের রোড শোতে সম্ভাব্য ইনভেস্টরদের সামনে তুলে ধরতাম। এবার কেশব চন্দ্র সেনের পুরনো পাটিগণিত বইটিকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করে অন্য অঙ্ক কষা হলো। ডট কম সিইও ও তাঁর সঙ্গীরা কনফারেন্স রুমের দেওয়ালে একটি ছবিটি দেখালেন - আজকা কাম কল পর ন ছোড়িয়ে, কল কা সুবহ আজহি দেখ লিজিয়ে। কারো লক্ষ্মীর ভাঁড়ার বা পিগি ব্যাঙ্ক ভেঙ্গে ১৯৯৩ সাল থেকে যে সব নতুন টেকনোলজি কোম্পানি তাদের ব্যবসা শুরু করলেন, তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন কোন বন্ধু সজ্জন বা সেই সব নিবেশক যাদের আজকাল এঞ্জেল ইনভেস্টর বলা হয়। পরম বিশ্বাসে এই আলোকপথের যাত্রী অথবা ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বললেন যদি মনে করেন এর ভ্যালু ৫০০ মিলিয়ন ডলার হয়, আমি তার সিকি ভাগের শেয়ার নেবো, একশ পঁচিশ মিলিয়ন অন লাইনে পাবেন। এই দেবদূতেরা নিঃস্বার্থ ভাবে ঈশ্বরের করুণা বর্ষণ করার মানসে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এমন মনে করার কোন কারণ নেই। এঁদের উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন আই পি ওতে কম দামে প্রচুর শেয়ার পেয়ে বেশি দামে বেচে ঐশ্বরিক শুভ কামনার মূল্য সুদে আসলে চুকিয়ে নিতে। একই কারণে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলি নিয়মিত দেবদূতের সন্ধানে গিয়েছেন, সে তীর্থযাত্রার পোশাকি নাম ফান্ডিং রাউন্ড – সেই চক্কর কাটার সময়ে তাঁরা জানাতেন, হে অন্তর্যামী, এ অবধি আপনার যা টাকা দিয়েছেন তার সবটাই প্রায় শেষ, আমাদের টিকে থাকতে গেলে আরও টাকা চাই। ততদিনে অবশ্য আরেক বাহিনী টাকার থলি নিয়ে ময়দানে নেমেছেন যাদের আমরা প্রাইভেট ইকুইটি প্রোভাইডার বলে জেনেছি; এঁরা একটু বেশি রক্ষণশীল।
একদল লোক হঠাৎ গুচ্ছের টাকা নিয়ে ক্ষ্যাপার মতন যেখানে দেখিবে ডট কম সেখানেই করিবে অর্থ বিনিয়োগ ধুয়ো তুলে মুক্তকচ্ছ হয়ে বা শার্টটা প্যান্টের ভেতরে না গুঁজেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন এমনটা ভাবা সঙ্গত নয়। এঁরা পিতৃ সূত্রে, পুকুর চুরি, মেহনত মজদুরি দ্বারা ধন অর্জন করেছেন, তার কায়দাটা জানেন বলেই না প্রাইভেট জেটে ওড়েন; এখন এই বেফিকর লগ্নির পিছনে যে রামধনুর আলো তাঁরা দেখতে শুরু করলেন তার নাম আই পি ও। যে মায়ালোক দেখে ইনভেস্টররা ডট কমে পয়সা লাগালেন, শেয়ার বাজারে সেই ছায়া তরণী বেচতে পারলে টাকা উঠে আসবে বহু গুণ। বিগত পর্বে আমরা নেটস্কেপের দৃষ্টান্ত দেখেছি; যার বার্ষিক আয় শূন্যের কাছাকাছি সেই নেটস্কেপের শেয়ার সকালবেলা বাজারে নামলো ২৮ ডলারে, বিকেলবেলায় তার দাম ৫৬ ডলার; গাছে না উঠতেই এক কাঁদি। তাহলে এ শুধু অলস মায়া নয়; এ স্বপ্ন ডট কম মালিকেরা একা দেখছেন না - আরও অনেকে তাতে আস্থা রাখেন।
সেই সাফল্য দেখে উৎসাহিত ডট কম উদ্যোক্তারা জানতে চাইলেন - ছোট গ্যারাজের ড্রইং বোর্ড থেকে এটিকে ওয়াল স্ট্রিটের ফ্লোরে নিয়ে যাওয়া যাবে কি প্রকারে? এ তাদের এবং দেবদূত ইনভেস্টরদের কাজ নয়। জীবন থেমে থাকে না, ডট কমের দেখানো মোটা পয়সার খোয়াব মাথায় তুলে নিলেন মরগান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান জাখস ও আরও অনেক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার। তাঁরা জানেন কীভাবে অলীক মায়া বেচতে হয়। কাজটা সহজ হয়নি কিন্তু তাঁরা মনে রেখেছেন প্রতি আই পি ওতে তাদের ফি মোট শেয়ার বিক্রির সাত পার্সেন্ট। ডট কমের প্রথম ইনভেস্টরদের চোখে যে আলোটি লেগেছিল সেটি আলেয়া যে নয় তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। নইলে সে শেয়ার বিক্রি হবে কেমনে? সবাই তো ঘাসে মুখ দিয়ে চলেন না। ইনভেস্টর মিটিঙে বেয়াড়া প্রশ্ন উঠবে যার কোন প্রমাণিত আয় বা সম্ভাব্য আয়ের সূত্র চোখে পড়ছে না সে যে আগামী দিনের শের তার পিছনের যুক্তি কোথায়?
আপনার আমার মত সাধারণ আমানতকারির পয়সা লাগিয়ে অলীক লোকের যাত্রাপথটি কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কাররা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু তাঁরা কি জানতেন সেই আম জনতা যারা অত্যন্ত স্বল্প সুদে সুখী হয়ে তাদের ব্যাঙ্কে অর্থ জমা করেন, যাদের টাকা সুচিন্তিত পন্থায় খাটিয়ে ব্যাঙ্কার সেই জমার পরিমাণ বৃদ্ধি করেন সেই জনতা আবার অন্য বেশ ধারণ করে এই ডট কম যজ্ঞে নিজেকে আহুতি দেবেন?
ছোটবেলায় রেডিওতে জয়ন্ত চৌধুরীর গল্পদাদুর আসর শুনেছি। গল্পদাদুরা সব দেশে সব কালেই থাকেন, তাদের বলার টেকনিক দেশকাল অনুযায়ী আলাদা হয়ে যায়। আজকে এই কোম্পানির আয় কিছু নেই, কিন্তু তার বিজনেস মডেল অনুযায়ী কাস্টমার সংখ্যা বাড়বে ঠিক এই ধারায় - এটি একটু অ্যামবিশাস মনে হচ্ছে? আচ্ছা আপনার কথা থাক আমার কথাও থাক; এই আমদানি বা ক্যাশ ফ্লোকে আমরা পুরোপুরি মেনে নিচ্ছি না, তাকে কম সম করে ধরে (discounted cash flow) পাঁচ বছরের প্রজেকশান করছি। এতেও যখন ডাল গলে না, ওয়াল স্ট্রিট ধুরন্ধরেরা বোঝালেন, ঐ ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো কল কি কাহানি। তাঁরা দেখালেন এক টার্মিনাল ভ্যালু মডেল; আজকের অঙ্ক ভুলে যান, দেখুন দশ বছর বাদে এদের রেভেনিউ কোনখানে পৌঁছুবে তার প্রাঞ্জল চিত্র।
তাঁদের মাথার ভেতরে কীর্তি নয়, খেলা করছে অন্য প্রাইসিং মডেল- ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কারস ফি সাত পার্সেণ্ট।
ইউরোপ আমেরিকায় সকালবেলার টেলিভিশনে আপনার এ দিনটি কেমন যাবে তা সঠিক বলে দেওয়ার জন্য নামাবলি পরিহিত কোন জ্যোতিষী দেখা দেন না কিন্তু ফক্স টিভির নিল ক্যাভুতো, সি এন বি সির জিম ক্রেমার কোন ভবিষ্যতদ্রষ্টার চেয়ে কিছু কম ছিলেন না। তবু উত্তর কলকাতার গলি থেকে বিলেতের রাজপথে এসে টার্মিনাল ভ্যালু মডেল দেখে অবাক হয়েছিলাম; আমরা জানি প্রফিট অ্যান্ড লস, ব্যাল্যান্স শিট একটি ব্যবসায়ের একটিমাত্র দিনের স্থিরচিত্র, পরের দিন কোন এক্সট্রা অরডিনারি আইটেম পুরো খেলাটাই বদলে দিতে পারে। কিন্তু দশ বছর বাদের একদিন আপনার লগ্নির কি হাল হবে তার ফোটো ফিনিশ এই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কাররা চক এবং ডাস্টার লুকিয়ে আজ ম্যাজিকের মত দেখিয়ে হৃদয় হরণ করে নিলেন?
তবে এঁরা স্ট্যানফোরড, হার্ভার্ডের এম বি এ, তাদের অবিশ্বাস করে কোন বান্দা? কল্পনার তেজ ঊর্ধ্বগামী - আজ আমরা জানি তখন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং অ্যানালিস্টরা ডট কমের ফিউচার ভ্যালু স্থির করেছিলেন কতবার সেই কোম্পানির নাম কেউ সার্চ বা ক্লিক করেছেন তার ওপরে। বাজারে এমনটা শোনা গেল যে কোন কোম্পানির নামের পেছনে ডট কম থাকলেই সেটা প্রমাণ করে তার ডি এন এ - সেটি আগামী দিনের উজ্জ্বল তারকা, শাইনিং স্টার।
কাঠের উনুনে বাতাস দিলেন তৎকালীন কিছু ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক অ্যানালিস্ট যারা প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন, যেমন মরগান স্ট্যানলির মেরি মিকার (বার্ষিক বেতন প্লাস বোনাস দশ মিলিয়ন ডলার), মেরিল লিঞ্চের হেনরি ব্লজেট। গোল্ডম্যান জাখসের অধিনায়ক মহামতি হ্যাঙ্ক পলসেন (ইনি অনেক পরে আমেরিকান ব্যাঙ্কিং সঙ্কটের কালে দেখা দেবেন – আমার নোবেল পুরস্কার ২০২২ পশ্য) একদিন গিয়েছিলেন ওয়েবভ্যান নামের একটি ইন্টারনেট কোম্পানির অফিসে; তাঁদের ব্যবসা অর্ডার মাফিক খদ্দেরের কাছে আলু মুলো কলা পৌঁছে দেওয়া। পলসেন দেখলেন কীভাবে প্যাক করা সবজি ভায়া কনভেয়ার বেল্ট সোজা উঠছে অপেক্ষমাণ ভ্যানে, সেখান থেকে যাবে খদ্দেরের রান্না ঘরে। তিনি অফিসে ফিরে এসে একটি আবেগময় ভাষণে বলেন, তিনি ভবিষ্যৎকে সদ্য দেখে এসেছেন, ওয়েবভ্যানের আজকের আয় শূন্য কিন্তু আগামী দিন উজ্জ্বল। এদের মতো ফার্মের পাশে না দাঁড়ালে গোল্ডম্যান একদিন ডাইনোসরে পরিণত হবে।
গোল্ডম্যান হিসেব করে ওয়েবভ্যানের বাজারি মূল্য (ভ্যালুয়েশন) আট বিলিয়ন ডলার স্থির করলেন; দেবদূতেরা চল্লিশ কোটি ডলার ইনভেস্ট করেছিলেন।
এগারো মাস বাদে ওয়েবভ্যান নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে।
আজ স্বীকার করতে বাধা নেই, একদিন ব্যাঙ্ক থেকে আমরাও ঋণের বাজারে কিছু কল্পিত নাম্বার ছড়িয়েছি যার তথ্যগত ভিত্তি ছিল দুর্বল - যাকে আমরা বলি জাস্ট পিক এ নাম্বার! তবে আমাদের বেস লাইন- পূর্ব ইউরোপে যাদের নিয়ে কাজ করেছি তাঁরা কেউ স্টার্ট আপ ছিলেন না। ১৯৯৫ সালে রোমানিয়ান জাতীয় ব্যাঙ্কের ১৫০ মিলিয়ন ডলারের এক বছরের আন্তর্জাতিক ঋণ যখন আমরা অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে একত্রিত করি, ফাইনানশিয়াল টাইমসের গ্রাহাম বোউলি ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলেন রোমানিয়া কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে আসেনি, তাদের কোন ট্র্যাক রেকর্ড নেই, কোন তুলনামূলক তথ্য (যাকে আমরা বলি কমপেয়ারেবল) পাওয়া যায় না। তাহলে এই এক বছরের ঋণের সুদের হার কী করে স্থির করলেন। সঙ্গত প্রশ্ন। তার সঠিক কেতাদুরুস্ত উত্তর দেওয়া শক্ত হয়েছিল; বলেছিলাম অনেক রিসার্চ করে। বলতে পারিনি, খানিকটা আন্দাজে, হাওয়া থেকে! *
খুব আন্দাজে ঢিল ছুঁড়িনি। রোমানিয়ান ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক দেশের হাল সামলে দাপটে বাণিজ্য করে চলেছে, তিরিশ বছরে তাদের বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ার ৫৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে ৬৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। ব্যাঙ্কের যে গভর্নরের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলাম, সেই মুগুর ইসারেস্কু আজ এতো বছর বাদেও একই পদে বহাল আছেন।
ইন্টারনেট স্টকের আগুন ছড়িয়ে গেছে সবখানে, উঠিতে বসিতে, লাঞ্চে ডিনারে ডাউ জোনস ও নাসডাকের উড়ানের চর্চা চালু। এমত সময়ে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আরেক মহামতি ফেডেরাল রিজার্ভ (আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক) চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান বললেন, শেয়ার বাজারের টাকা সেই সব কোম্পানিতে যাচ্ছে যারা শিগগির লাভের মুখ দেখবে (পড়ুন, আজকের ব্যাল্যান্স শিট দেখে সময় নষ্ট করবেন না, টাকা ঢালুন, ঐ উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙ্গিন, অচ্ছে দিন)।
তৈল ইন্ধন ঘৃত প্রস্তুত, অগ্নি সংযোজিত হলো।
এতদিন পর্যন্ত কোন অচেনা অজানা কারবারে কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করতে যে আম জনতা ইতস্তত করছিলেন তাঁরাও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের খাতায় নাম লেখালেন; রোজ সকালে বিকেলে ডাউ জোনস/ নাসডাক ইনডেক্সের ডলার সাইন দেখা শুরু করলেন। নিতান্ত তথ্যের খাতিরে বলা ভালো ১৯২৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন বা ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশের সময়ে মাত্র ৭ শতাংশ আমেরিকান সরাসরি শেয়ার কিনেছিলেন, তাতেই সেই মহা সঙ্কট। ১৯৯৪ সালে চল্লিশ শতাংশ আমেরিকান শেয়ার বাজারে সরাসরি খেলছেন, মাত্র সাত বছরের ভেতরে তাদের সংখ্যা বেড়ে হল ষাট শতাংশ বা আট কোটি। ১৯৯৪-৯৫ সালে এক বছরে মিউচুয়াল ফান্ডে ১২ বিলিয়ন ডলার জমা পড়ে, আগের পাঁচ বছরের বেশি। অর্থনীতিবিদ জন মেনারড কেইনস একেই বলেছিলেন ক্যাসিনো; সেখানে খেলা অনেক সহজ, মাঠে যেতে হয় না, ব্রোকারকে ফোন করতে হয় না; মাছের তেলে মাছ ভাজার মতন ইন্টারনেটের দৌলতে বাড়িতে বসেই ইন্টারনেটের শেয়ার কেনা বেচা করা যায়!, কিছু মানুষ কাজকর্ম ছেড়ে সারাদিন পি সি বা ডেস্কটপের সামনে বসে ডে ট্রেডিং করছেন।
একেই কি বলে ফিডিঙ ইটস ওন ফ্রেনজি?
ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন আজ এমন কিছুই নেই যেখানে তার প্রভাব পড়েনি। মুহূর্তের মধ্যে টাকা পৌঁছয় সঠিক ঠিকানায়, ঘরে বসে গ্লোবাল মিটিং চলে, কোন ডাইরেক্টরির পাতা ওলটাতে হয় না দুনিয়ার জ্ঞান একটি ক্লিকের অপেক্ষায় আছে – আমরা চিঠি লিখে সাতদিন উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকি না, এনসাইক্লপিডিয়া ব্রিটানিকার বাঁধানো ভলুমগুলি আজ মিউজিয়াম পিস, এমনকি গুগল সার্চের দিনও ফুরুল বলে, এখন কিছু জানতে চাইলেই আগে জেমিনি নিজের জ্ঞানের ডালি নিয়ে হাজির। কিন্তু ১৯৯৪ হতে ২০০১ এই সাত বছরে যে নশোর বেশি কোম্পানি ডট কমের ডানায় ভর করে শেয়ার বাজারে ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদের মধ্যে আমাজন, সিস্কো সিস্টেম, ইয়াহু, আমেরিকা অন লাইন সহ ডজন চারেক নিজের বা পরে বেনামে সফল – এঁরা প্রমাণ করেছেন এ শুধু অলস মায়া ছিল না। ফরচুন ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১৯৯৭) আন্তরিক সততার সঙ্গে জেফ বেজোস বলেছিলেন মুনাফা আজ নেই, কালও হবে না। সামনের দু বছরেও আমাজন লাভের মুখ দেখে সেটা হবে একটা দুর্ঘটনা। ছ বছর বাদে আমাজন তার বার্ষিক হিসাবে প্রথম লাভ দেখাতে সমর্থ হয়।
বহু মানুষের অর্থ নিয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে আটশর বেশি নাম। হ্যাঙ্ক পলসেনের কাজে ক্রমোন্নতি হয়েছে, গোল্ডম্যান জাখস থেকে বিদায় নিয়ে আমেরিকান সরকারের ট্রেজারি সেক্রেটারি হয়েছেন, তাঁর শেয়ার অপশন বেচে পাঁচশ মিলিয়ন ডলার পেলেন কিন্তু আমেরিকান আইন অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে যোগ দেবার প্রথম বছরে এক পয়সা আয়কর দিতে হয়নি। ফেডেরাল রিজার্ভ চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান সাব প্রাইম সঙ্কটে হাওয়া দিয়ে যথাকালে সসম্মানে অবসর গ্রহণ করে ‘এজ অফ টারবুলেন্স’ নামক সার্থকনামা একটি বই লিখে ফিরি করলেন।
চিন্তন শিবিরে বিলম্বে জ্ঞান অর্জন করে গুণী জনেরা কাঠগড়ায় প্রথম খাড়া করলেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কারদের (তাঁরা ফি পাবার লোভে অঙ্কের উলটোপালটা ফল দেখিয়েছেন) ও তাদের অ্যানালিস্টদের(যারা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের খদ্দেরদের সবচেয়ে ওঁচা স্টকটি ধরিয়ে দেবার জন্য অত্যন্ত পজিটিভ রেকমেনডেশন লিখেছেন) - অমার্জনীয় অপরাধ ডট কম স্টকের ভুল ভ্যালুয়েশন। প্রচলিত লজিককে উপেক্ষা করে অচেনা মানদণ্ডে ব্যবসায়ের হিসেব নিকেশ করা হয়েছিল।
দুসরা আসামি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট - প্রায় আঠারো বছরের তেজি বাজারে তাঁরা এতো পয়সা করেছিলেন সেটি লাগানোর জন্য ব্যস্ত, আবার গণ্ডার মারবেন; দেখেননি সেটা কোন জন্তু।
তিন নম্বরে প্রেস এবং চব্বিশ ঘণ্টা চালু টেলিভিশন - তাঁরাই এই আধিদৈবিক হাইপকে মানবিক চেহারা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন এককালে ছিল অটোবান, এখন আমাদের সামনে খুলে গেছে ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ে; আমরা যে ট্রান্সফরমেটিভ টেকনোলজির যুগে বাস করছি সেটি আমাদের জগতকে বদলে দেবে। এসেছে অনলাইনের যুগ, বেকারত্ব হবে ইতিহাস।
মা বলতেন হ্যাঁরে, অমুক লোকে বলেছে বলেই করতে হবে? তোর বুদ্ধি বিবেচনা নেই?
না। গণ উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের দিকে – সেখানেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস। দু বছর বাদে এর পুনরাবৃত্তি হবে- এনরন, কয়েক বছর পরে সাব প্রাইম ক্রাইসিস, নতুন নতুন নামে ডাকো।
এহ বাহ্য। এ সিকি শতাব্দীর পুরনো গল্প যা কেবল আমাদের মতন কিছু প্রাচীন মানুষ বটবৃক্ষের তলায় বসে স্মৃতিকণ্ডূয়ন দ্বারা যুবকদের আতঙ্কিত করে থাকেন। এ অভিযোগ মেনে নিতে পারতাম যদি না গত শনিবারের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদনটি চোখে পড়তো :
দু বছর আগে সান ফ্রানসিসকো শহরে জেক স্টাউখ ও অ্যালেক্স ম্যাকলাউড ‘সারভাল’ নামে একটি কোম্পানি স্থাপনা করেন; উদ্দেশ্য জীর্ণ পুরাতন বা লিগেসি সিস্টেমকে বর্জন করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনসের জন্য সাধারণকে সহায়তা করা। গত বছর অক্টোবর মাসে তার মূল্যায়ন হয়েছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার, ডিসেম্বরে সেটি গিয়ে দাঁড়ায় ৬০০ মিলিয়নে; এক সপ্তাহ বাদে সর্বশ্রী স্টাউখ এবং ম্যাকলাউড জানিয়েছেন সারভালের সঠিক ভ্যালুয়েশন হবে এক বিলিয়ন ডলার **
অতএব বন্ধুগন মুক্তহস্তে ইত্যাদি?
চেনা চিত্রনাট্য।
ফিরে দেখার সময় এসেছে। দিনগোনার দিন!
পুনশ্চ:
১৯৯৫ সালে নাসদাকের (দুনিয়ার ৩৫০০ কোম্পানির ষ্টক সূচক, মূলত টেক স্টক) ইনডেক্স ছিল ৭৮০। ১৯৯৯ সালে সেটি ৫০০০ ছুঁয়ে দু বছর বাদে ধরাতলে অথবা ১৫০০তে নেমে আসে। নাসদাক আবার ৫০০০ পৌঁছুবে ১৫ বছর বাদে।
একটি কেস স্টাডি
জে পি মরগান ছেড়ে সুজান প্রিচারড যোগ দিয়েছিল প্রাইসলাইন ডট কম নামক স্টার্ট আপে
বিজনেস মডেল – এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে টিকেট আগাম কিনে প্যাসেঞ্জারদের লোকসানে বিক্রি করে মার্কেট রিচ বাড়ানো।
স্থাপনা - এপ্রিল ১৯৯৭
ক্রিসমাস ১৯৯৭ – ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার মিটিং। মরগান স্ট্যানলি প্রস্তাব দিলেন আই পি ও তে শেয়ারের দাম সাত বা নয় ডলার হোক। আরও বিচার বিমর্শের পরে ভাও স্থির হল ষোলো ডলার. অফারিং পত্রে সি ই ও রিচারড ব্র্যাডক সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কে (আমেরিকান সেবি) যা লিখলেন সেটি সত্যের পরাকাষ্ঠা –
• আমরা এ অবধি লাভের মুখ দেখিনি, অনুমান করি লোকসান চলতেই থাকবে
• আমাদের বিজনেস মডেল সম্পূর্ণ নতুন; সেটি কতদূর সফল হতে পারে তার পরীক্ষা হয়নি
• এই মডেলে সাফল্যের জন্য যে ব্র্যান্ড পরিচিতি প্রয়োজন, সেটি আপাতত আমাদের আয়ত্তের বাইরে
• ব্যবসা বজায় রাখার জন্য নিরন্তর আমাদের অর্থের প্রয়োজন, সেটি সময়মত জোগাড় করা কঠিন হতে পারে
আই পি ও হলো ৩০শে মার্চ, ১৯৯৯; ইসু প্রাইস ১৬ ডলার, বিকেল অবধি উঠলো ৬৯ ডলারে, দু বছর বাদে ৯৫ ডলার। ৩১শে আগস্ট ২০০১ দাম নেমে এলো ৫.৫৩ ডলারে। অনেক হাত ঘুরে এটি আজকের বুকিং ডট কমের সঙ্গে মিশে গেছে।
ইন্টারনেট স্টকের মূল্যায়নের বিষয়ে এক সত্যদ্রষ্টার বাণী
“The powerful rally of 1995 is not bubble, a signal that valuation paradigm has changed”
David Shulman, Salomon Brothers
*Graham Bowley
সিটি বা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে স্বনামে খবর কাগজে, ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্সিং রিভিউ বা ইউরোউইকের মতন ইন্ডাস্ট্রি জার্নালে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কোন বাধা ছিল না আমার। কিন্তু ফাইনানশিয়াল টাইমসের সঙ্গে কোন প্রকারের ফর্মাল ইন্টারভিউ সিটি ব্যাঙ্ক অনুমোদন করতো না। তারা আপনার সাক্ষাৎকারের নোট নেবে, কিন্তু ঠিক কি লিখেছে তার ড্রাফট দেখাবে না, সংশোধনের পথ বন্ধ। যা বলেছেন বা বলেননি সেটাও সরাসরি ছেপে দেবে। পরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে আমাদের এক সিনিয়র অফিসার শন ওয়ালেস কোনো অসতর্ক মুহূর্তে ফাইনানশিয়াল টাইমসকে এক দিলখোলা ইন্টারভিউ দিয়ে প্রভূত বিপদে পড়েছিলেন। সেদিনই সকালবেলা অফিস যাবার পথে সি ই ও পিটার স্যান্ডস আধপাতা জোড়া সেই সাক্ষাৎকার পড়ে অত্যন্ত অপ্রসন্ন হয়ে শনকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান, চাকরি যায় যায়!
**The Fundraising tactic AI startups are using to juice valuations
By Angel Au-Yeung, Wall Street Journal Feb 22, 2026
কেবলমাত্র কৌতূহলী পাঠকের জন্য:
dot.con John Cassidy
boo hoo Ernst Malmsen
The Accidental Investment Banker Jonathan Knee
ক্রমশ