এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ভ্রমণ  শনিবারবেলা

  • তবিলদারের দুনিয়াদারি ২১ - রিও পর্ব চার

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ২১ মার্চ ২০২৬ | ৭০ বার পঠিত
  • ছবি: রমিত


    রিও -অলিম্পিকের দিনগুলি 

    ১৮৯৬ সালে আথেন্সে আধুনিক অলিম্পিকের জন্মলগ্নে অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, কুস্তি, জিমনাস্টিক,তরবারি লক্ষ্যভেদ ইত্যাদি মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ছিল দশটি ডিসিপ্লিন; খ্যাতি ও পদক অর্জনের বাসনায় চোদ্দটি দেশের শ দুয়েক ক্রীড়াবিদ গ্রিসে পৌঁছেছিলেন। অলিম্পিকের মটো- সিতিউস আলতিউস ফরতিউস (দ্রুততম উচ্চতম শক্তিশালী)। প্রাচীন অলিম্পিকে বিজয়ীর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হতো অলিভ পাতার মুকুট। 

    বাল্যকালে আমার অলিম্পিকের ছবিটি ছিল মোটামুটি দৌড় ঝাঁপ, জিমনাস্টিক, সাঁতার ইত্যাদি নিয়ে, গ্রিকো রোমান কুস্তি নামটি কৌতূহল উদ্রেক করতো। লাইভ টেলিভিশন ছিল না, আনন্দবাজার যুগান্তরে তার ছবি দেখিনি, তাই সে কুস্তি যে কি কখনো জানা হয়নি। প্রতিবার আমাদের খাতায় থাকতো একটি স্বর্ণ পদক- ভারত বিশ্বহকির অজেয় যোদ্ধা। অ্যাথলেটিকসে একমাত্র আশা উড়ন্ত শিখ মিলখা সিং আমাদের শোকসাগরে ডুবিয়ে দিয়ে ১৯৬০ সালে রোমে চারশ মিটারে চতুর্থ হয়েছিলেন। 

    পাঁচটা রিং ওলা হাওয়াই চটি অথবা জুতো দেখেছি কিন্তু আমাকে অলিম্পিক চিনিয়েছিলেন তারক চ্যাটার্জি লেনের মতি নন্দী। মনে আছে আনন্দবাজার পত্রিকায় খেলার বিভাগে পুরো দুটো পাতা জুড়ে তিনি ১৯৬৮ ও ১৯৭২ সালের অলিম্পিকের প্রায় সকল ইভেন্ট এবং সম্ভাব্য বিজেতাদের এক তালিকা পেশ করেন, সেখানে এতো যে বিষয় বিভাগ আছে, আগে কখনো জানতাম না।

    সে ছিল অ্যামেচার ক্রীড়াবিদদের যুগ। অলিভের মুকুট খারিজ হয়েছে, এখন বিজয়ী পেলেন সোনা রূপো ব্রোঞ্জের পদক যার সাম্মানিক মূল্য অসীম, আর্থিক নয়। কারো কারো মনে থাকতে পারে ছয়ের দশকে বাটার জুতোর বিজ্ঞাপনে এক মহিলাকে (ভুল হতে পারে তবে মনে হয় তাঁর প্রথম নাম ছিল অনিতা) দেখা গিয়েছিল বলে তাঁর অ্যামেচার খেতাব বিপন্ন হয়। মেক্সিকো অলিম্পিকের বিস্তৃত অ্যানালিসিসে মতি নন্দী একেবারে নাম ধরে দেখিয়ে দিয়েছিলেন মাঝারি ও দূর পাল্লার দৌড়ে কোন আফ্রিকানরা শ্বেত ইউরোপিয়ানদের আসন টলিয়ে দেবেন, এই রঙ্গমঞ্চের একছত্র রাজা রানি হবেন (যা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে)। তাঁর ফোরকাস্ট ছিল কেনিয়ার কিপচগে কিনো ১৫০০ মিটার জিতবেন: মেক্সিকো অলিম্পিকে তৎকালীন তারকা আমেরিকান জিম রায়ানকে কুড়ি মিটার পেছনে ফেলে কিনো সে রেস জেতেন, অলিম্পিকের ইতিহাসে আজ অবধি সোনা আর রূপোর মধ্যে দীর্ঘতম ব্যবধান। পরবর্তীকালে কেনিয়ায় আমাদের ব্যাঙ্কের স্পন্সরশিপের কারণে অন্ধ ম্যারাথন রানার হেনরি ওয়ানিকের সঙ্গে আলাপের সুযোগ হয়েছে, কিপচগে কিনোর গল্প শুনেছি। 

    সে যুগে সিনেমা হলে মূল ছবি শুরুর আগে এজরা মীর নিবেদিত ভারতীয় ফিল্মস ডিভিশনের ডকুমেন্টারিতে দেখেছি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, একশো দেশের মার্চপাস্ট। শেষ দিনের শেষ ইভেন্ট ছেলেদের ম্যারাথন দৌড়, যেটি শেষ হতো অলিম্পিক স্টেডিয়ামে দু চক্কর কেটে অগ্নির নিচের ভিক্টরি স্ট্যান্ডে। এই ছিল আমার অলিম্পিক। বিলেতে প্রফেশনাল অ্যান্ড জেন্টলমেন ক্রিকেটারদের ব্যবধান ঘুচে যেতে দেখলাম। তারও অনেক পরে সিওল অলিম্পিকে (১৯৮৮) প্রফেশনালদের জন্য স্টেডিয়ামের দুয়োর খুলে গেলো; স্পোর্টের জন্য ফি বা টাকা নিলে নাম বাতিল হয় না, অলিম্পিক ধন সম্পদের এক খননক্ষেত্র। প্রতিভার মূল্যায়ন হয় নাইকি, আদিদাসের অ্যানুয়াল কন্ট্রাক্ট ভ্যালু মাফিক। নতুন নতুন প্রতিযোগিতা যোগ হতে থাকে- ব্যাডমিণ্টন, তাইকোয়ানদো, বেসবল, কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত নারী পুরুষের বিচ ভলিবল, কারাটে, সার্ফিং এমনকি ট্রামপোলিন জিমনাস্টিক! তারপরে এলো দেওয়ালে চড়া (ওয়াল ক্লাইম্বিং) এমনকি প্যারিসে দেখলাম স্কেট বোর্ডিং! তবে যুক্তি তর্ক গপ্পোর অন্তিম সীমা অতিক্রম করেছে সিনক্রোনাইজড সুইমিং নামক বিচিত্র প্রতিযোগিতাটি; নাকে ক্লিপ আটকে আবহ সঙ্গীত সহ জলের নিচে এবং ওপরে যে নৃত্য পরিবেশিত হতে থাকল সেটি দ্রুততম (সিতিউস) উচ্চতম (আলতিউস) শক্তিশালী (ফরতিউস) কোনোটাই নয়; এর চেয়ে আমাদের ডাংগুলি খেলা ভালো। 

    স্পোর্টের কোন দেশ মহাদেশ নেই। সাফল্যের উচ্ছ্বাস, শেষ মুহূর্তের গোলে স্বপ্নভঙ্গ, দলে দলে রেষারেষি চলে থাকে আমাদের গ্রামের নতুন পুকুরের পাড় থেকে আলমবাজার, নরেন্দ্রনাথ বিদ্যামন্দিরের মাঠ ছাড়িয়ে রোম বা রিওর মহাঙ্গনে। অলিম্পিক শুধু হার জিতের, শক্তি শৌর্যের গল্প নয়, দেশকালের অনেক ঊর্ধ্বে মানুষের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন পরিচিতির, কান্না হাসির দোল দোলানোর পালা। অলিম্পিক নাটকের কিছুই লোক চক্ষুর আড়ালে থাকে না, জনান্তিকে বলে কিছু নেই। সব সময়ে সেখানে চোখ রাখে সারা পৃথিবী- উপস্থিত টেলিভিশন, কলমরূপী ক্যামেরা হস্তে রিপোর্টার। কলকাতায় থাকার সময়ে পড়েছি অসাধারণ রিপোরতাজ – যেমন ১৯৬৪ সালের অলিম্পিকে হাই জাম্পে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেরি ব্রুমেল ও আমেরিকার জন টমাসের - পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই! এখন টেলিভিশনের দৌলতে দেখি সেই সব নাটকের বিভিন্ন অঙ্ক, আমার স্মৃতিতে তার বেশিরভাগ অ্যাথলেটিক নিয়েই। 

    যেমন ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিক: ব্রিটিশ অ্যাথলিট ডেরেক রেডমন্ড দৌড়ুচ্ছিলেন চারশ মিটার সেমি ফাইনালে, দুশো মিটারের মাথায়  হ‍্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যায়। তবু থামলেন না, ফিনিশ লাইনে তাঁকে পৌঁছুতে হবেই, কোনমতে এক পায়ের ভরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেন, মেডিকাল সাপোর্ট ছুটে এলে তিনি তাঁদের নিরস্ত করেন। এমন সময় সিকিউরিটির রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে তাঁর বাবা জিম রেডমণ্ড ছেলের পাশে দাঁড়ালেন, ছেলেকে ধরে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চললেন, চারশ মিটারের রেসের শেষ টেপ পার হলে স্টেডিয়ামের সব মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্বর্ধনা জানান। অলিম্পিকের ইতিহাসে সেটি এক আইকনিক মুহূর্ত। জানতাম না রিওতেও এমনি কিছু অপেক্ষা করে আছে। 



    এস্তাদিও অলিম্পিকো *

    রিও ২০১৬; মারাকানা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। গ্রিসের মাউণ্ট অলিম্পিয়ার হেরা মন্দির থেকে রিলে প্রথায় বয়ে আনা প্রজ্বলিত মশাল দিয়ে অলিম্পিক পতাকার নিচে বিশাল পাত্রে অগ্নি সংযোগ করার কথা ছিল ফুটবল কিংবদন্তি পেলের। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় ম্যারাথন রানার দে লিমা সেই কাজটি মাথায় তুলে নেন। গার্ল ফ্রম ইপানিমা গানের ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিকের সঙ্গে ক্যাটওয়াকে হেঁটেছেন গিসেলে ব্যুনডশেন।
    ট্র্যাডিশন অনুযায়ী একই স্টেডিয়ামে অ্যাথলেটিকস ইভেন্ট হবার কথা কিন্তু রিওতে তার ব্যতিক্রম ঘটে। ব্রাজিলের সঙ্গে ফুটবলের এবং মারাকানার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মারাকানায় বাইশ জন মানুষ একটি বলের পিছনে ধাওয়া করেন, একশ বা চারশ মিটার দূরে বাঁধা কোন ফিতের উদ্দেশ্যে নয়! 
    অতএব রিও অলিম্পিকে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের স্থান হলো শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে, এস্তাদিও অলিম্পিকো, এঙ্গেনাও দে দেনত্রতে। 

    ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রিমিয়ার লিগ এবং কাপে রিওর যে চারটি টপ টিম খেলে তারা হল ফ্লামেঙ্গো, ফ্লুমিনেন্সে, ভাসকো দা গামা (হ্যাঁ সেই নাবিক দস্যু) এবং বোটাফাগো, যারা দশ পনেরো বছর অন্তর লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকে। এটি সেই বোটাফাগোর হোম গ্রাউনড। আগামী পনেরো দিন সেখানে অবশ্য ফুটবল নয়, অন্য নানা রকমের দৌড় ঝাঁপ চলবে। 

    দু বছর আগে মারাকানা ফুটবল মাঠে গেছি ট্যাক্সিতে, বিশ মিনিটও লাগেনি। কিন্তু এস্তাদিও অলিম্পিকো? অ্যানড্রু বললে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ধরো। কোপাকাবানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডাইনে খানিকটা হাঁটলেই মেট্রো স্টেশন সিকেরা কামপোস –অরেঞ্জ লাইন ধরে নামবে সেন্ট্রালে। সেখানে যে কেউ এস্তাদিও অলিম্পিকো যাবার ট্রেনের প্লাটফর্ম নম্বর বাতলে দেবে। তোমাদের ইভেন্ট কটা থেকে শুরু হবে জানি না, তবে সব মিলিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে সেখানে পৌঁছুতে এক ঘণ্টার কম সময় লাগবে।

    প্রথম দিনের টিকিট সান্ধ্য অনুষ্ঠানের, শুরু হবে আটটায়, চলবে প্রায় এগারোটা অবধি অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত সেদিনের সব প্রতিযোগিতার হিট বা ফাইনাল নির্ধারিত না হচ্ছে। স্টেডিয়ামে হাজার পঞ্চাশ লোক ধরে, আমাদের যুবভারতীতে তার ডবল। অনুমান করে নিতে অসুবিধে হয় না যখন পাড়ার টিম বোটাফাগো শনিবারে ফুটবল লিগের ম্যাচ খেলে তখন তিলধারণের স্থান থাকে না। কিন্তু এই অলিম্পিকে তিন দিন দুপুরে বা সন্ধ্যেয় মাঠে গিয়ে দেখেছি অত্যন্ত নাটকীয় লঙ জাম্প, পোল ভল্ট, চারশ মিটার, আটশ মিটার ফাইনাল এমনকি কিংবদন্তি স্বরূপ উসেন বোলটের একশো মিটার জয়ের এ্যাওয়ার্ড সেরিমনি - স্টেডিয়ামের অর্ধেকও ভরেনি। কারণ কী? ফুটবল ছাড়া অন্য স্পোর্টে ব্রাজিলের মানুষের অনীহা? টিকিটের দাম? আগের বার লন্ডন অলিম্পিকে মূল স্টেডিয়ামে (এখন ওয়েস্ট হ্যাম ফুটবল টিমের ঘরের মাঠ) দেখেছি অ্যাথলেটিকসের টিকিটের সরকারি দাম আকাশ ছোঁয়া কিন্তু মাঠ একেবারে ভর্তি। 

    দূরে পোল ভল্টের কলরব



    আজ এই এতদিন বাদে সে কদিন কে কতোটা লাফালেন কতো দ্রুত দৌড়ুলেন তার ফিরিস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় কিন্তু এস্তাদিও অলিম্পিকোর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে কিছু মুহূর্ত স্মরণীয় থেকে গেছে। 

    পোলভল্ট, ১৫ আগস্ট। 

    আমরা ক্রিকেট ফুটবলের খবর রাখি, পোল ভল্টের নয়। তবু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে ইউক্রেনের প্রবাদ স্বরূপ অ্যাথলিট সেরগে বুবকার নাম আমাদের হয়তো অনেকের জানা, যিনি এক দশকে ৩৫ বার পোল ভল্টের রেকর্ড ভাঙ্গেন। মাইকে ঘোষিত হলো তিনি এখানে উপস্থিত। 
    সন্ধ্যায় একটু বৃষ্টি হয়েছিল, তাই প্রতিযোগিতা কিঞ্চিৎ দেরিতে শুরু হলো। দুই খুঁটির মাঝে বার বাঁধা হয়েছিল সাড়ে পাঁচ মিটার উচ্চতায়, রণক্ষেত্রে এগারো জন। রাত এবং বারের উচ্চতা বাড়ে, সেটার সীমা টপকাতে একের পর এক অ্যাথলিট মাথা হেঁট করে ফেরেন। এ যেন মহা প্রস্থানের পথে যাত্রা। 

    থিয়াগো ব্রাজ


    ৫.৮৮ মিটার অবধি তিনজন টিকে আছেন - আমেরিকার স্যাম কেনড্রিক, লন্ডন অলিম্পিকের গোল্ড মেডালিস্ট ফ্রান্সের রেন লাভিলেনি এবং ব্রাজিলিয়ান থিয়াগো ব্রাজ দা সিলভা। জনতা মহা উল্লসিত হয়ে থিয়াগো ব্রাজের নামে উত্তাল। কিন্তু ইতিহাস এবং সমবেত জুজুৎসব তাঁর বিপক্ষে -ইতিহাসে কোন ব্রাজিলিয়ান পোলভল্টে অলিম্পিক বা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হননি এবং ফিল্ডে আছেন হালে ফ্রান্সের বিশ্বজয়ী রেনো লাভিলেনি। বার উঠলো ৫.৯৩ মিটারে, কেনড্রিকের সাধ্যে কুলল না। থিয়াগো তাঁর আগের রেকর্ড ৫.৮৫ মিটার অতিক্রম করে দ্বিতীয় প্রয়াসে সেটি পার হলেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ফ্রান্সের রেনো লাভিলেনি ৫.৯৮ মিটার (প্রত্যেক স্টেজে ০.০৫ মি উঁচু করা যায়) পার হলেন অবহেলে। অবিশ্বাস্যভাবে প্রতিযোগী থিয়াগো ব্রাজ জানালেন এটা পেরুতে তিনি চেষ্টাই করবেন না, বরং বার তোলা হোক পরের লেভেলে, অর্থাৎ ৬.০৩ মিটারে। সেখানেই ফেললেন পুরো বাজি, দ্বিতীয় প্রয়াসে দা সিলভা ৬.০৩ মিটার পেরুলেন। এমন সময়ে স্টেডিয়ামে শুরু হলো প্রবল দুয়ো, বুইং প্রায় কান পাতা যায় না। জনতা চায় থিয়াগো স্বর্ণ পদক পান কেননা লাভিলেনি সেই উচ্চতা পার হতেই চাইছেন না; বিশ্বজয়ী লাভিলেনি দু বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। সেই আওয়াজ বাড়তে থাকে লাভিলেনি এখানেই খ্যামা দিলে ব্রাজিলের স্বর্ণ পদকটি বাঁধা। স্টেডিয়ামে শোরগোল, জনতা উল্লসিত শব্দের ডেসিবেল শূন্যে উঠে গেছে। থিয়াগো বিজয়ী হয়েছেন! লাভিলেনি এবারে পাশার শেষ চাল দিলেন, বার তোলা হোক, ৬.০৮মি -সেখানেই ঠিক হবে গোল্ড মেডেল কার গলায় ঝুলবে। দেখা যাক কে পারে সেই লেভেলটি অতিক্রম করতে – বার বাঁধা হলো ৬.০৮ মিটারে। লাভিলেনি দৌড় শুরু করলেন জনতার বিধ্বংসী কলরব তুঙ্গে, উড়ন্ত লাভিলেনি প্রায় পেরিয়ে গেছেন এমন সময় জুতোর কোণায় লেগে বারটি ভূপতিত হলে স্টেডিয়ামে যে হুঙ্কার ধ্বনি উঠলো সেটি বহু দিন মনে থেকে যাবে। থিয়াগো ব্রাজ দা সিলভা এর আগে কখনো ৬মিটার পৌঁছুতে পারেননি, আজ সেটি সেই উচ্চতায় পৌঁছুলেন, নিজের দেশের মানুষের সামনে, পোলভল্টে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বজয়! কিন্তু কোথায় গেলো স্পোর্টসম্যানশিপ? যে কোন মূল্যে জিততে হবে? পোল ভল্টে ব্রাজিলের প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণ পদক কর্দমাক্ত হলো পার্টিজান ব্রাজিলিয়ান দর্শকের কারণে, তাদের সেই নির্মম ব্যারাকিঙ্গের শিকার লাভিলেনির চোখে জল। দর্শকের সেই আক্রমণ চলতেই থাকে এমনকি পরের দিন মেডাল দেওয়ার সময়েও ভিক্টরি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে লাভিলেনির চোখ অশ্রুসিক্ত। অলিম্পিকের মর্যাদা নিঃসন্দেহে চুরমার হলো সেই সন্ধ্যায়।**

    রৌপ্য পদক লাভিলেনি



    কোথায় গেল অলিম্পিকের মটো? 
    মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। 

    পরের দিন দুপুরে সান্টা তেরেসা যাবো, রিওর সবচেয়ে পুরনো পাড়া। সকাল বেলা অলস আগ্রহে টেলিভিশনে অ্যাথলেটিক দেখছি। বেলা দশটা বাজে। মাঠে নানান ইভেন্ট কিন্তু অকস্মাৎ ক্যামেরা টি ভি তে দেখা গেলো ভূপতিতা দুই অ্যাথলিটকে, ইংরেজি ধারাভাষ্য শুনে যা জানলাম তা হল এই:

    হাত বাড়ালেই বন্ধু



    পাঁচ হাজার মিটার দৌড়ের হিটে প্রায় অর্ধপথে আমেরিকান রানার অ্যাবি দা’গস্টিনোর পায়ে পা লেগে নিউজিল্যান্ডের নিকি হ্যাম্বলিন দুজনেই মাটিতে পড়ে যান। নিকির চোট লাগে তাঁর ডান কাঁধে। মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন, তাঁকে সাহায্য করার জন্য মেডিকরা ছুটে আসছেন। অ্যাবি দা’ গস্টিনো উঠে পড়ে তাঁর দৌড় কনটিনিউ করতে পারতেন, কিন্তু সামনে ধাবমানা মহিলাদের উপেক্ষা করে হাত বাড়িয়ে দিলেন নিকির দিকে, তাঁকে তুলে ধরে বললেন, কাম, উই মাস্ট ফিনিশ দিস রেস। নিকির পিছনে অ্যাবি তাঁর পাঁচ হাজার মিটার দৌড় শেষ করলেন সবার পিছনে। ফিনিশিং লাইনের টেপ পার হতেই মেডিকরা হুইল চেয়ার নিয়ে হাজির। টেলিভিশনে দেখা এক অশ্রুসজল মুহূর্ত, চেয়ারে বসা অ্যাবির হাত ধরে দাঁড়িয়ে নির্বাক নিকি। 

    হুইল চেয়ারে অ‍্যাবি র হাত ধরেছেন নিকি - নির্বাক মুহূর্ত



    অলিম্পিকের সমস্ত রুলস রেগুলেশনকে উপেক্ষা করে রিও অলিম্পিক কমিটি নিকি হ্যাম্বলিন এবং অ্যাবি দা’ গস্টিনোকে পাঁচ হাজার মিটার ফাইনালের জন্য কোয়ালিফাই ঘোষিত করেন। আলটিমেট স্পোর্টসম্যানশিপের জন্য বারন দে কুবারতিন পদক দেওয়া হয় দুজনকেই। অ্যাবি ফাইনালে দৌড়ুতে পারেননি, নিকি হ্যাম্বলিন তাঁর পারসোনাল বেস্ট সত্ত্বেও সর্বশেষ স্থান পেয়েছিলেন। সোনা ও রূপো কেনিয়ার ঘরে, ব্রোঞ্জ ইথিওপিয়ার।

    রিও অলিম্পিকে আমার আরেক স্মরণীয় মুহূর্ত - মাইকেল জর্ডানের সতেরো বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙ্গে যখন ছেলেদের চারশ মিটার দৌড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েড ফান নিকেরক ১৯৯৬ সালের পরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম স্বর্ণ পদক জিতলেন। সিকি শতাব্দী আগে জোহানেসবুর্গের এলিস স্টেডিয়ামে সহস্র কণ্ঠে গাওয়া তাদের জাতীয় সঙ্গীত এনকোসি সিকেলেলাই আফ্রিকা (গড ব্লেস আফ্রিকা) একটা শিহরন এনে দিয়েছিল, কিন্তু আজ এই প্রায় জনশূন্য এস্তাদিও অলিম্পিকোয় সে উন্মাদনাময় সঙ্গীতের ইন্সট্রুমেনটাল ভার্শন বড়োই ম্রিয়মাণ মনে হল। 





    একটা বেয়াড়া মন্তব্য করার জন্য ক্রীড়াপ্রেমী আম জনতার কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখি। 
    আমার মতে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্ট দেখার সবচেয়ে দামী আসনটি পাওয়া যায় বিনামূল্যে, ঘর হতে এক পা না ফেলেই। সেটি আপনার আমার বসার ঘরের সোফা। স্কুলের মাঠে স্পোর্টস দেখার কথা আলাদা। কিন্তু এই বিশাল মাঠে ঠিক কোথায় যে কি ঘটছে চর্ম চক্ষে তার ওপর নজর রাখা অসম্ভব। প্রায় একই সময়ে মাঠের এক কোণায় তেকোনা জালের আড়াল থেকে কেউ হাতুড়ি ছুঁড়ছেন, আরেক কোণায় চলছে পোল ভল্ট আর একই সঙ্গে মাঠে জনা পনেরো দৌড়বীর পাক দিচ্ছেন পাঁচ হাজার মিটার দৌড়ে! কোনোটাই ঠিক মত দেখা সম্ভব নয় কারণ সবটা হচ্ছে অনেক দূরে কোথাও। এই মাঠে বসে কোথায় কে কতটা লাফাল বা কতদূরে কিছু ছুঁড়লো সেটি দেখার একমাত্র উপায় চারিদিকে ঝুলন্ত শ খানেক টি ভি সেটে মনোনিবেশ করা – যেমন পোল ভল্টের পুরো ম্যাজিকটা ইংরেজি ধারাভাষ্য সহ দেখেছিলাম আমাদের বসার রো’র পিছনের প্রকাণ্ড টি ভিতে। আসল ঘটনা তখন ঘটছে অন্তত দুশ মিটার দূরে! 
     

    সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল 

    বিকেলবেলা ভালো ভাবে লক্ষ করিনি; এখন স্টেশনের বাইরে পেল্লায় ম্যাপের ওপরে সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল লেখাটা দেখে মনে হল ব্রাজিলের কেন্দ্রবিন্দু নয় সুস্থ দেহে পৌঁছুতে চাই কোপাকাবানায় আমার সহকর্মী অ্যানড্রু কাবারনাতের ছাব্বিশ নম্বর রুয়া দিয়াস দো রোখার ফ্ল্যাটে, যেটি আমাদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে সে সস্ত্রীক এই অলিম্পিকের দশ দিন লেমেতে পিসির বাড়ি গেছে। 

    স্টেশনের নাম সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল কেন? এটি রিওর চৌরঙ্গী হতে পারে কিন্তু দেশের নয়, এটি একেবারে পূর্ব উপকূলবর্তী একটি শহর! মাদ্রিদ যেমন স্পেনের প্রায় মাঝখানে, তার সল নামক চত্বরটি ভৌগোলিক মাপ কাঠিতে দেশের কেন্দ্রবিন্দু বিবেচিত হয় (জীবনের শ্রেষ্ঠ কাফে কন লেচে সেখানেই পান করেছি) তাহলে রিওর এই স্টেশনের নাম সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল কেন? তার উত্তর রেলপথ নির্মাণের মধ্যে নিহিত। ব্রাজিলের পর্তুগিজ রাজারা আপন দেশ নয়, প্রথমে মন দিয়েছিলেন সাগর পারের এই বিশাল রাজত্বে রেলওয়ে লাইন পাতার কাজে। ১৮৫৪ সালে প্রথম ট্রেন চলল (সেই বছরের আগস্ট মাসে বাংলায় হাওড়া থেকে হুগলী প্রথম ট্রেন চলেছিল)। লিসবন-পোরতো লাইন খোলার অনেক আগেই ব্রাজিলের উত্তরে রাজাদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী পেট্রোপলিস থেকে চারশ কিলোমিটার দক্ষিণে সাঁও পাউলো অবধি ট্রেন চালানোর প্রোজেক্টের নাম ছিল এস্ত্রাদা দো ফেরো সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল (সেন্ট্রাল ব্রাজিলিয়ান রেলওয়ে), হেড অফিস রিও। ১৮৮৭ সালে রিও ট্রেন স্টেশনের উদ্বোধন, রাজার নামে তার নাম - দ্বিতীয় দোম পেদ্রো। 
     

    বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম  ক্লক ফেস  সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল


    দু বছর বাদে দেশ স্বাধীন হলে পুরনো শাসকদের নাম বর্জন অভিযান শুরু। রিও শহর বা বোটাফাগো পাড়া নয়, সেই সেন্ট্রাল রেলওয়ের স্মরণে রিওর প্রধান স্টেশনের নাম দেওয়া হল - সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল! এমন ধারা নামকরণ বিরল হলেও এটি সেন্ট্রাল দো রিও বটে। সমস্ত ট্রেন বাস মেট্রো এখানে এসে মেলে। একেবারে শহরের মধ্যস্থলে বিচগুলি বাদে রিওর যাবতীয় দ্রষ্টব্য এরই আশেপাশে। কলকাতার হিসেবে মনে করুন এই স্টেশনের অবস্থান মহাকরণ, হাই কোর্ট জাদুঘর এবং এসপ্লানেডের ট্রাম গুমটির মাঝামাঝি! দু পা বাড়ালেই মিউজিয়াম, অপেরা, মেরিনা - তাই হয়তো নামটা টিকে গেছে। আমাদের দেশের কোন স্টেশনে যেমন আগে কলকাতার টিকিট পাওয়া যেতো না, তেমনই রিওর মানুষ বন্ধু আত্মীয়স্বজনকে নির্দেশ দেন সাঁও পাউলো থেকে সেন্ট্রাল দো ব্রাজিলের ট্রেন ধরবে, রিওর টিকিট মেলে না। অ্যানড্রুর কাছে শুনেছি রিওর লোকে বলেন, এই একটু সেন্ট্রালে যাচ্ছি বা সেন্ট্রাল দিয়ে যাচ্ছি, ঐখানে চলে এসো! আমাদের সময়ে এসপ্লানেড এমনি একটা সেন্টার পয়েন্ট ছিল, যেমন একদিন মেট্রো সিনেমার সামনে বা ট্রাম গুমটির ঘড়ির তলায় তার জন্য অপেক্ষা করেছি, মিটিং পয়েন্ট! শোনা যায় এককালে এই সেন্ট্রালের আরেকটা চেহারা ছিল – সদর কোর্টের সামনের বটতলার মতো, নানা রকমের কর্মকাণ্ডে লোকজনের জমায়েত, ব্যবসা, খাবার স্টল এমনকি ফুটপাথে বসে টাইপিস্টরা নিরক্ষর মানুষজনের হয়ে দরখাস্ত লিখে দিতেন। সেন্ট্রাল স্টেশন (সেন্ট্রাল দো ব্রাজিল, ১৯৯৮)) নামের একটি অসাধারণ ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে - এমনি একজন টাইপিস্ট, ডোরাকে, নিয়ে যিনি একদিন এক মহিলার হয়ে তাঁর ছেলের নিরুদ্দেশ পিতার উদ্দেশে চিঠি লিখতে গিয়ে তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আজ অবধি সবচেয়ে সফল ব্রাজিলিয়ান এই ছবি দেশি বিদেশি বহু অ্যাওয়ার্ড জেতে, মূল চরিত্রের অভিনেত্রী ফারনান্দা মনতেনেগ্রো আজ অবধি একমাত্র ব্রাজিলিয়ান যিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। ইউ টিউবে বিনামূল্যে দেখতে পারেন। 

    আপাতত পত্নী ও কন্যা সহ এই সুনসান চত্বরে দাঁড়িয়ে সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতন দু বছর আগে শোনা পাউলা গনসালভেসের সতর্কবাণী মনে পড়ে গেল- রিও এক অনিরাপদ খতরনাক শহর, প্রতিপদে সতর্কতা বাঞ্ছনীয়, পথি ওয়ালেট বিবর্জিত, পকেট থেকে মোবাইল বের করলেই সেটি ছিনতাই হবে। যদিও বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে পাউলা কথিত দুঃসমাচার ইন্দ্রনীল এবং আমার কাছে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে, এই মূল্যবান তথ্য রোদিকাকে জানাবার সাহস হয়নি। তার লজিক হবে একবার বেঁচে গেছি বলে পরের বারও রক্ষে পাবো এমন কী গ্যারান্টি আছে? 



    মেট্রো বন্ধ, আমরা এই নির্জন জনস্থান থেকে কীভাবে আপন শয্যায় পৌঁছুব মায়া সে প্রশ্ন করল, বললাম চিন্তার কোন কারণ নেই; এত বলি তাই করলাম যা আধুনিক দুনিয়ার যে কোন রাস্তায় দাঁড়িয়ে সকল ভদ্রলোক দিবারাত্র করে থাকেন - বিনি পয়সার ওয়াই ফাই নয়, দেশের ভোডাফোনের মহার্ঘ ডেটা ব্যবহার করত: মোবাইল যোগে উবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস। আমার প্রায় মুখোমুখি দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক তাঁর ফোনের দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মাথায় নরওয়ের ফ্ল্যাগওলা টুপি। চোখ তুলে বললেন, উবার? আমি বেশ খানিকক্ষণ আগেই অর্ডার করেছি, আসছে না, কোন মেসেজ অবধি পাঠাচ্ছে না! এই অযাচিত মার্কেট ইনফরমেশন মায়া বা তার মায়ের মনে কোন আস্থার সঞ্চার করল না। এমতাবস্থায় যা হয়ে থাকে, এদিক ওদিক থেকে দুজন এসে ভাঙ্গা ইংরেজিতে বললেন, এই যে, কোথায় যাবেন? কোপাকাবানা? মিটারে নয়, একটা দাম ধরে দেবেন। পাউলা এই প্রলোভনে পা দিতে সর্বদা বারণ করেছিল, আজ এটি উপেক্ষা করা সমীচীন মনে করলাম না। 

    আপাতত, বিশ্বাসে মিলয়ে উবার এই ঋষি বাক্য স্মরণ করে আমরা তিনজনে বিশাল স্টেশন এলাকার শোভা দেখতে থাকি। মায়াকে বললাম ‘বিগ বেন দেখেছো, এবার তার ভাইকে দেখো; বহুতল উঁচু স্টেশন টাওয়ারের মাথায় যে বিশাল ঘড়ি, তার ক্লক ফেস লন্ডনের বিগ বেনের চেয়ে সামান্য ছোট, দুনিয়ার দু নম্বরে।’ বলেই মনে হলো সেদিকে না তাকালে ভালো হতো। সে ঘড়ির বিশাল বড়ো হাতটি নির্মম ভাবে বলে দেয় রাত্রি কী দ্রুতগতিতে গড়িয়ে চলেছে! আগস্ট মাস, দক্ষিণ গোলার্ধে শীত কাল, সোয়েটার পরে লোক হাঁটে, কিন্তু মাঝ রাতেও রিওর তাপমান আমাদের পক্ষে আরামদায়ক প্রায় কুড়ি ডিগ্রি। উবারের দেখা নেই। হঠাৎ উচ্চ কলরবে কাঁধে নানান দেশের পতাকা ও মাথায় ফ্ল্যাগ বসানো টুপি পড়ে এক দঙ্গল লোক উদিত হলেন। আমরা পোলভল্ট নাটকের শেষে নিলটন সানতোস স্টেডিয়ামে থেকে বেরিয়েছি। বোঝা গেলো তাঁরা শেষ ইভেন্ট অবধি দেখে ফেরার ট্রেন ধরেছেন। একেই কি বলে গুষ্ঠি সুখ, দেয়ার ইজ সেফটি ইন নাম্বার? এক বলিলেন বহু হইব – আমরা মাত্র চারজন ছিলাম, এখন এই প্রাঙ্গণ একেবারে লোকে লোকারণ্য। এবার এই জন সমুদায় মোবাইল হাতে উবার দেবতার তর্পণে দাঁড়ালেন; এর আগে বা পরে কোন নির্জন রাত্রিতে এতো মানুষকে একই ব্রতে ব্রতী হতে দেখিনি! 

    আর্লি বার্ডের সুবিধেটা পাওয়া গেল- - নরওয়েজিয়ান ভদ্রলোক এবং আমাদের দুটি উবার বাহন হাজির হতেই বাকি হা পিত্যেশিদের দিকে হাত নেড়ে গুড লাক বলে রিওর সামাজিক সুরক্ষা ও মানুষের প্রতি আস্থা অবিচল রেখে আমরা আপন আপন গাড়িতে উঠলাম।

    পরিশিষ্ট 

    *অলিম্পিক শেষ হলে দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার পেলের পাশাপাশি পর পর দুবার বিশ্বকাপ বিজয়ী ব্রাজিলিয়ান অমর একাদশের লেফট ব্যাকের স্মরণে এস্তাদিও অলিম্পিকোর নাম দেওয়া হয়েছে নিলটন সানতোস স্টেডিয়াম। সানতোস বোটাফাগোর জুনিয়র টিমে খেলা শুরু করেন ১৪ বছর বয়েসে, সাতশোর বেশি ম্যাচ খেলেছেন বোটাফাগোর জার্সি গায়ে, আমাদের চুনি গোস্বামীর মতোই কখনো টিম বদল করেননি। 

    **লাভিলেনি আর কখনো ৬.০৩ মিটার পার হতে পারেননি, কোন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণ পদক জেতেননি। টোকিও অলিম্পিকে থিয়াগো ব্রাজ ব্রোঞ্জ মেডাল পান, লাভিলেনি অষ্টম।

     



     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ২১ মার্চ ২০২৬ | ৭০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন