এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ভ্রমণ  শনিবারবেলা

  • তবিলদারের দুনিয়াদারি - শহর থেকে শহরে - পর্ব ৪ - অসলো

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ০৫ এপ্রিল ২০২৫ | ৯৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)

  • উশলো / অসলো

    বিশ্ববিদ্যালয়ের পালা শেষ, পরীক্ষার ফলাফল জানা হয়ে গেছে। তাতে মুশকিল বাড়ে, কি করেন বা করো তার উত্তর দেওয়া যায় না, অজুহাত ফুরিয়ে গেছে। একেবারে সার্টিফায়েড বেকার।

    আমার দাদা তখন জামশেদপুরে টিন প্লেট কোম্পানিতে, গোলমুরিতে থাকেন । কলকাতা ঘুরে যাবার সময় বলে গেলেন, কিছুই তো করছিস না, কদিন জামশেদপুর ঘুরে যা। ভালো একটা ক্রিকেট ম্যাচ আছে।

    কীনান স্টেডিয়ামে ইস্ট জোন বনাম ওয়েস্ট জোন দলীপ ট্রফি ম্যাচ; ওয়েস্ট জোন স্টার প্লেয়ারে ‘ ভর্তি - ওয়াদেকার, গাভাসকার, সোলকার ইত্যাদি কার সেদলে মৌজুদ। যদিও অসম সমর তবু আমাদের ছিলেন অম্বর রায় সুব্রত গুহ। আমাদের টিকেট দারুণ জায়গায়, প্লেয়ারস প্যাভিলিয়নের ওপরে সেখানে খেলার তিন দিনে প্রতিবেশী জুটল জনা কয়েক সর্দারজি। অবিলম্বে তাঁদের আড্ডায় সামিল হয়ে গেছি, কত যে গল্প শোনা গেল। কথায় কথায় এক সর্দার বললেন, ইয়াদ রখনা জ্যাদাতর সর্দার জোকস জলন্ধর লুধিয়ানা মে বনতে হ্যাঁয়। এই এক মজার ব্যাপার, স্বাস্থ্যবান মানুষেরা নিজেদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেন। একটি নতুন রসিকতা শিখলাম - পথ চলতি সর্দারকে একজন জিজ্ঞেস করেছেন, কটা বাজে। তিনি ঘড়ি দেখে বললেন, আটটা। তবে দিন না রাত বলতে পারবো না। আমি এখানে নতুন এসেছি। 

    এককালে টিপিকাল সর্দারজি জোক ভেবে হেসেছিলাম। নরডিকে প্রথম সফরে, অসলো শহরে সেটি নতুন অর্থ এনে দিয়েছিল হোটেলের ঘরের পর্দা টানা হয় নি বাইরে ঝল মলে আলো, দেরি হল নাকি উঠতে? ঘড়িতে পাঁচটা বাজে! উত্তর ইউরোপের সঙ্গে যতো পরিচয় বেড়েছে, কীনান স্টেডিয়ামের সেই দিনটার কথা মনে করেছি – এ মোটে হাসি ঠাট্টার কথা নয়, গল্পের সর্দার কি নরওয়ে সুইডেন ফিনল্যান্ডের কথা বলছিলেন? এই উত্তরে গ্রীষ্মকালে সূর্যদেব দেখা দেন ভোর চারটেয়, অনেক গড়িমসি করে অস্তে যান দশটা নাগাদ। কাজেই টুয়েন্টি ফোর আওয়ার হাত ঘড়ি ক্লক থাকলেও বলা শক্ত এটা দিন আটটা, না রাত আটটা। উলটোটাও তেমনই কঠিন- ব্রেকফাস্টের পরে অফিস যাবো স্টাভাঙ্গারে; ট্যাক্সিতে উঠে দেখি বাইরে ঠা ঠা করছে চাঁদের আলো, ঘড়িতে নটা, দিন না রাত? আর্কটিক সার্কেল পেরুলে ঘড়ির সময়ের সঙ্গে আকাশকে মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ট্রমসোয় দু মাস সূর্যের মুখ দেখা যায় না।

    সিটি হল ও নোবেল শান্তি পুরস্কার

    অসলোর নিকটস্থ বিমান বন্দর ছিল ফরনেবু; সে এতো কাছে যে প্লেন থেকে নেমে হোটেলে চেক ইন করতে এক ঘণ্টাও লাগতো না (এখন সেটা পঞ্চাশ কিলো মিটার দূরের গারদেরমোয়েনে)। ফরনেবুতে নামার আগে প্লেন যখন অসলো ফিওরডের ওপরে শেষ চক্কর কাটছে, চোখে পড়তো ইট গাঁথা বিশাল চিমনির আকারের চৌকো দুটি স্তম্ভ; সেটি অসলো টাউন হল, শহরের ল্যান্ডমার্ক – একদিকে প্রাচীন অসলো দুর্গ, অন্যদিকে একেবারে আধুনিক অকার ব্রুগে – লন্ডনের ক্যানারি হোয়ারফের বা হামবুর্গের মতন একটি বিশাল ডকল্যান্ড রি ডেভেলপমেন্ট। দিন রাত্তির গমগম করছে অকার ব্রুগে।

    অসলো দুর্গ
     


    পাঁচশ বছর যারা নরওয়ে শাসন করেছেন সেই ডেনিশ ও সুইডিশ রাজন্যবর্গ নরওয়েকে চাষি ও মেছুরের দেশ বলে অবহেলা করতেন – এখনো সেটা হয়তো বদলায় নি। আমার সুইডিশ সহকর্মী ইওহান শোঘ্রেনকে ( আক্ষরিক অর্থে সবুজ সমুদ্র) বলতে শুনেছি তেলের পয়সায় বড়লোক হয়েছে বটে আদতে ওরা চাষা ভুষো।

    উত্তর সাগরের তলায় খনিজ তেলের বিপুল সম্ভার খুঁজে পেয়ে হঠাৎ বড়লোক হয়ে যাবার আগেও নরওয়েকে সাহিত্য জগতের মানুষ চিনতেন, নুট হামসুনের ( Knut Hamsun ) হাঙ্গার এবং হেনরিক ইবসেনের অজস্র নাটক পড়েননি বা দেখেননি এমন শিক্ষিত মানুষ হয়তো বিরল। কিন্তু আজকের অসলো শহরকে একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠানের কারণে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আনার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব একজন সুইডিশ আবিষ্কারকের প্রাপ্য।

    ইতালিয়ান বৈজ্ঞানিক আসকানিনো সবরেরো নাইট্রো গ্লিসারিন নামক বিস্ফোরক পদার্থের বিধ্বংসী শক্তির বিষয়ে অবগত ছিলেন কিন্তু একে পোষ মানিয়ে সঠিক ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে পারেননি। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং ততজনিত প্রাণহানির পরে আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল সেটিকে নিরাপদ প্রতিপন্ন করে তাকে সেটি বাক্স বন্দি ও দেশে দেশে রপ্তানি দ্বারা প্রভূত অর্থ উপার্জন করলেন – এর নাম ডিনামাইট। শেষ বয়েসে তিনি একদিন খবরের কাগজে পড়লেন কে বা কারা তাঁকে ‘মৃত্যুর ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়েছে। নোবেল স্থির করলেন তাঁর অর্জিত বেশির ভাগ ধন সম্পত্তি (সাত মিলিয়ন ডলার,আজকের হিসেবে অনেক বিলিয়ন) তিনি তুলে দেবেন সুইডিশ নোবেল ইনসটিটিউটের হাতে। এই অর্থের সুদ হতে ইনসটিটিউট প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সফল মানুষদের সম্মানে দান করবেন চারটি পুরষ্কার, তার চয়ন ও প্রদানের দায়িত্ব নেবে সুইডিশ নোবেল সংস্থা। কিন্তু এই সঙ্গে তিনি আরেকটি ক্লজ জুড়ে দিলেন- বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলে শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছেন এমন মানুষকে সম্বর্ধিত করার জন্য দেওয়া হবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার, তার প্রাপক নির্বাচন করবেন নরওয়ের পার্লামেন্ট দ্বারা বেছে নেওয়া পাঁচ জনের একটি কমিটি। মনে রাখা দরকার সময়টা উনবিংশ শতকের শেষ দশক, নরওয়ে তখন সুইডেনের অধীনে একটি অঙ্গরাজ্য মাত্র; তাঁদের পার্লামেন্ট আছে বটে কিন্তু সুইডেনের রাজা থাকেন তার মাথার ওপরে। কেন যে আলফ্রেড নোবেল তাঁর নামাঙ্কিত এবং ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কারের সঙ্গে অসলো তথা নরওয়েকে জুড়ে দিলেন তার কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নরওয়ে সে সময়ে মাঝারি আয়ের ছোট দেশ, ইউরোপে তার স্থান অনেকেরই পিছনে, এমনকি ১৯৩৬ সালে রোমানিয়ার পেছনে। অসলোর জনসংখ্যা আমাদের শ্যামবাজার আর বরানগরের মাঝে গুঁজে দেওয়া যায়।

    ১৯০০ সালে শান্তি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শুরু হয় অসলোর নোবেল ইন্সিটিউটে তারপরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। কালে কালে এই অনুষ্ঠানটি এক বিশাল আকার ধারণ করে। ইউনিভারসিটির হলে স্থান অকুলান দেখে ১৯৮৯ সাল থেকে এটি নতুন পৌরসভার বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, প্রতি বছরের দশই ডিসেম্বর তারিখে; সেটা সপ্তাহের যে কোন দিন হোক না কেন, এমনকি রবিবার হলেও। দুনিয়ার আর কোন প্রাইজ বছরের ঠিক একটি নির্ধারিত দিনে দেওয়া হয় বলে আমার জানা নেই।

    অসলোর নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলফ্রেড নোবেলের ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি। তাঁর প্রথম প্রেম, এক ফারমাসির সুইডিশ কম্পাউন্ডার, সে মেয়েটি অত্যন্ত অল্প বয়েসে মারা যায়। তার অনেক বছর পরে ভিয়েনায় থাকাকালীন নোবেল খবরের কগজে বিজ্ঞাপন দিলেন “এক বয়স্ক ভদ্রমহোদয় তাঁর পারসোনাল সেক্রেটারির পদে একজন, উচ্চ শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মহিলা চান।” যিনি জবাব দিলেন এবং যাকে দেখেই আলফ্রেড নোবেলের পছন্দ হল তাঁর নাম ব্যরথা কিন্সকি, তেত্রিশ বছর বয়েস, অসাধারণ সুন্দরী, এক অ্যারিষ্টক্রেটিক পরিবারের কন্যা; তবে সে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ তাই তিনি এক কাজটি নিতে চান। তাঁর প্রেমে পড়তে বিলম্ব করেন নি আলফ্রেড নোবেল, একদিন তিনি বেরথাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর হৃদয়ে কি কারো স্থান হতে পারে? এর উত্তরটা পেতে দেরি হয় নি, ব্যবসার কাজে কোথাও গিয়েছিলেন আলফ্রেড নোবেল, ফিরে এসে ব্যরথার চিঠি পেলেন- ব্যরথা তাঁর হৃদয়েশ্বরের কাছে চলে গেছেন, তিনি প্রাগের আরেক দরিদ্র অ্যারিষ্টক্র্যাট আর্থার ফন সুটনের।

    নোবেল বিয়ে করেন নি। মাত্র তেষট্টি বছর বয়েসে ভগ্নহৃদয় আলফ্রেড নোবেল মারা গেলেন তাঁর সান রেমোর ভিলায়, পাশে ছিলেন ফরাসি ডাক্তার,ইতালিয়ান পরিচারক। যদিও আলফ্রেড নোবেল পাঁচটা ভাষা জানতেন কিন্তু শেষদিকে কেবল সুইডিশটা বুঝতেন। দীর্ঘ একাকী জীবনে তাঁর শঙ্কা ছিল “ মৃত্যুর সময়ে কোন বন্ধু পরিজনের হাত হয়তো আমার চোখের পাতা দুটোকে বুজিয়ে দেবে না,” - সেটাই সত্যি হল।

    ইতিহাসের আরেক রঙ্গ বাকি ছিল।

    আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর সাত বছর বাদে, ১৯০৫ সালে, নরওয়ে স্বাধীন হল। সে বছর নরওয়েজিয়ান পার্লামেন্টের পাঁচজন সদস্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যাকে মনোনীত করলেন তাঁর নাম ব্যরথা ফন সুটনের! আরথারের সঙ্গে বিয়ের পরে প্রথমে যান জর্জিয়া, সেখানেও দারিদ্র্য তাঁদের তাড়া করে। পরে গেলেন ভিয়েনা। ব্যরথা লক্ষ করেন গোটা ইউরোপ যেন কোন এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অস্ট্রিয়া জার্মানি অস্ত্র সজ্জায় ব্যস্ত, বারুদের স্তূপ তৈরি। ক্রমশ সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রবল প্রতিবাদ করে শান্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্যরথা, লিখেছিলেন যুদ্ধ বিরোধী এক অসামান্য বেস্ট সেলার, অস্ত্র নামাও ( ডি ওয়াফেন নিদার ), প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জার্মান শান্তি সমিতি; সেই বাণী নিয়ে আমেরিকা গিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ ভাষণে তিনি নোবেলের উল্লেখ করেননি কিন্তু ব্যরথা বললেন, আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন এই যে ইউরোপ কি যুদ্ধ ও ধ্বংসের পথে যাবে, না এই বিপদকে এড়িয়ে শান্তি ও আইনের অধিকার সুনিশ্চিত করে অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটাবে “।

    ব্যরথা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন ২১শে জুন ১৯১৪। ঠিক সাত দিন পরে সারায়েভোর মিলিয়াকা নদীর ওপর ল্যাটিন ব্রিজের পাশে সারবিয়ান সংগ্রামী গাভ্রিলো প্রিঞ্চিপের গুলিতে নিহত হবেন পত্নী সহ অস্ট্রিয়ান যুবরাজ ফ্রান্তস ফারদিনান্দ - একমাস বাদে শুরু হবে প্রথম মহাযুদ্ধ। 

    অসলো সিটি হল তৈরি হয়েছে প্রায় বিশ বছর ধরে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সে কাজকে আরও বিলম্বিত করে। স্থপতিরা চেয়েছিলেন অসলোর ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে –ত্রয়দশ শতকের অসলো দুর্গের (অকারসহুস) প্রাচীরে যে ইট ব্যবহৃত হয়েছিল তার মাপের সঙ্গে মিলিয়ে সিটি হলের ইটের সাইজ নির্ধারিত হয়।

    প্রসঙ্গত এই অকারসহুস দুর্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের সঙ্গে সহযোগিতা করার অপরাধে নরওয়ের মীরজাফর, ভিদকুন কিসলিঙ্গের ( Quisling) মৃত্যু হয় ফায়ারিং স্কোয়াডের হাতে। নরওয়ের প্রায় দুশ বছরের ইতিহাসে একমাত্র প্রাণদণ্ড।

    কিসলিঙ্গের মৃত্যুস্থল




    সিটি হলের প্রধান লবি বিশাল, তিরিশ মিটার উঁচু, মারবেলের দেওয়ালে অমর চিত্রকথার মত নরওয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের, যুদ্ধের নানান কাহিনি আঁকা। সে সময়ে পৌর সভার মিটিং না থাকলে নোবেল প্রাইজ বিজেতার পোডিয়াম দেখতে পারেন যেখানে মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যানডেলা মারটিন লুথার কিং একদিন দাঁড়িয়েছেন। প্রবেশ দক্ষিণা লাগে না। সকাল নটা থেকে বিকেল চারটে, শনিবার বাদে প্রত্যহ খোলা, কি শীতে কি গ্রীষ্মে। ঘণ্টা খানেকের টুর।

    সিটি হল, অসলো
     


    ভিগেলানড পার্ক

    অসলো যাচ্ছি, প্লেন টিকিট করে দেবে ভন লি, হোটেল স্থির করবে সিটি ব্যাঙ্ক। আমার সেক্রেটারি মারিয়া লালি বললে, সিটি সেন্টারে হোটেল বুক করে দেব। অসলো শহর আর তার সেন্টার যে মারবেল আর্চ থেকে নাইটসব্রিজের মাঝে বসিয়ে দেওয়া যায় সে কথা ম্যানচেষ্টার শহরে পালিতা এই ইংরেজ তনয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করাই বৃথা। টরদেনশিলডস গাতানে সিটি ব্যাঙ্ক অফিস, ডেন নরসকে ব্যাঙ্ক, রাজপ্রাসাদ, পার্লামেন্ট, জাতীয় থিয়েটার, অসলো ফিওরড সবই হাঁটা পথ, একেবারে সমতল । কনটিনেনটাল ( ইন্টার কনটিনেনটাল নয় ) হোটেলে উঠতাম, একদিকে ইবসেনের স্ট্যাচু অন্যদিকে অসলো ফিওরড।

    তবে অসলোর একটি প্রধান দ্রষ্টব্য সিটি সেন্টার থেকে অন্তত মাইল পাঁচেক দূরে, গাড়িতে দশ মিনিট, ট্রামে যেতে আধ ঘণ্টা লাগে। সেটি না দেখে বাড়ি ফিরলে সবজান্তা বন্ধুজনের সমূহ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হবে।

    তার নাম ভিগেলানড পার্ক।

    অসলো শহরে তৃতীয় শতাব্দীর কোন গ্রিক আর্চের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা নেই। তবে আশি একর জমি জুড়ে এই পার্কে আছে একজন মাত্র স্থপতির তৈরি দুশোর বেশি স্ট্যাচু, সেগুলি সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন –কোথাও বাবা মায়ের কোলে শিশু, কোথাও তাদের ছুড়ে দিচ্ছেন আকাশের দিকে, নৃত্যরত নর নারী, এক ঝরনার মাঝে কুড়ি জন, একটি মনোলিথের ওপরে একশ মূর্তি নিয়ে হুইল অফ লাইফ, সবই ব্রোঞ্জের। স্থপতি গুস্তাভ ভিগেলানড তাঁদের রেখেছেন নির্বস্ত্র। তিনি বলেছিলেন বস্ত্র কোন একটা সময়ের নির্দেশ দেয়, কালকে সেখানে বেঁধে রাখে। তাঁর স্থাপত্য দেশ কালের মাপের ঊর্ধ্বে। এখানেও কোন এন্ট্রি ফি নেই, দুয়ারে প্রহরী নেই,যেমন খুশি যখন খুশি আসবেন যাবেন।

    আনতোনিও গাউদির অসাধারণ শিল্পশৈলীতে ভরে আছে বারসেলোনা; পার্ক গুয়েলকে আলোকিত করে রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেটি কোন ভাস্কর্য প্রদর্শনী নয় সেখানে মিলে মিশে গেছে স্থাপত্য, চিত্রকলা এবং ভাস্কর্য। বিতর্ক হতে পারে জেনেও বলি অসলোর ভিগেলানড পার্ক আমার দেখা কোন ভাস্করের একক বৃহত্তম প্রদর্শনী, আশি একর জমি জুড়ে দুশোর বেশি স্ট্যাচুতে ছেয়ে রেখেছেন গুস্তাভ ভিগেলানড।

    আমার কর্ম কালে ক্রিস্টিয়ানিয়া ব্যাঙ্কের অফিসে যেতে হতো। ক্রিস্টিয়ানিয়া অসলোর পুরনো নাম। অরিজিনাল অসলো শহর অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় ১৬২৪ সালে। তৎকালীন ডেনিশ রাজা চতুর্থ ক্রিস্টিয়ান নতুন শহর নির্মাণ করলেন, কাঠের বাড়ি বাতিল হলো এবং রাস্তা তৈরি হলো সোজা সুজি গ্রিড মাফিক, ইউরোপের বহু প্রাচীন শহরের মতন একে বেঁকে নয়, একেবারে নিউ ইয়র্কের স্ট্রিট /এভিনিউ স্টাইলে। ডেনিশ রাজার নামে শহরের নাম ক্রিস্টিয়ানিয়া; নরওয়ের স্বাধীনতার পরে পৌরসভায় মাত্র ২৮জন পৌর পিতা নাম ওয়াপ্সির দরখাস্ত করে অসলোর পুরনো নামটিকে নতুন জীবন দেন।

    ক্রিস্টিয়ানিয়া ব্যাঙ্কের (অনেক বেচা কেনার পরে এখন নরডেয়া ব্যাঙ্ক) অফিস ছিল ১৮ নম্বর মিডেলথুনস গাতান। সেখানে আমার বাণিজ্য সহযোগী ফিলিপ কায়ে প্রথম দিনেই আমাকে বলেছিলেন পরের মিটিঙের দেরি থাকলে আমাদের অফিসে থেকে বেরিয়ে ভিগেলানড পার্কটা ঘুরে যাবেন, দূর দূর দেশ থেকে মানুষজন অসলোয় আসেন যা দেখতে, সেটা প্রায় আমার জানলা থেকে দেখা যায়! ফিলিপের সুপরামর্শের সম্যক উপযোগ করেছিলাম; রথ দেখা কলা বেচার প্রকৃষ্ট উদাহরণ!

    রাজভাষা / রাজবাড়ি

    নরওয়ের রাজাদের ইতিহাস বারশ বছরের, কোন বিশেষ রাজবংশের নয়। রাজা কখনো নির্বাচিত হয়েছেন গ্রাম পঞ্চায়েত ও পৌর সভার কাউন্সিলর দ্বারা কখনো পুরুষানুক্রমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর খেলনার বায়না শুরু করার হাজার বছর আগেই ভাইকিং নাও বেয়ে তাঁরা গ্রিনল্যান্ডে আইসল্যান্ড দখল করেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজা চতুর্থ ওলাফের মৃত্যুর পরে কোন পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় তাঁর মা নরওয়ে সুইডেন ডেনমার্ক এই তিন স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশের মধ্যে একটি পারসোনাল ইউনিয়ন গঠন করেন ( যেখানে একাধিক রাজন্য একত্র হয়ে এক ধরণের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেন কিন্তু এঁদের মধ্যে একজন রাজা বসেন সবার ওপরে, শেষ উদাহরণ অস্ট্রিয়া /হাঙ্গেরি)। প্রকৃত ক্ষমতা রইল ডেনমার্কের রাজার হাতে এক সময়ে সুইডেন আপন রাস্তায় চলে গেলে পরের চারশ বছর ডেনমার্ক একাই হলো নরওয়ের প্রভু তারা তারা নরওয়েকে একটি সুবা বা প্রদেশের মতো শাসন করেছে। এই রাজত্বে নরওয়ে হারাল তার চাষা ভুষো, মেছুরের ভাষা – ডেনিশ হল রাজভাষা, জন্ম নিলো এক মিশ্রিত জুবান যার নাম ডানো নরওয়েজিয়ান। নরওয়ের অমর নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের পুতুল খেলা বা গণশত্রু নরওয়েজিয়ানে নয়, সেই মিশ্রিত ভাষায় লেখা। নেপলিওনিক যুদ্ধে ডেনমার্কের পরাজয়ের পরে সুইডেন আবার নরওয়ের প্রভু হল কিন্তু তাদের রাজা কার্ল ইওহান এলেন ডেনমার্ক থেকে, তাঁর ধমনিতে যথারীতি জার্মান রাজরক্ত, হাজার বছর যাবত যেটা ইউরোপিয়ান রাজাদের উপবীত।

    অসলো শহরের মাঝখান ( Sentrum) দিয়ে উত্তর দক্ষিণ বরাবর যে সিধে রাস্তাটি চলে গেছে তার নাম কার্ল ইওহান গাতে। রাজার নাম কার্ল ইওহান, পথের নাম কার্ল ইওহান গাতে ( ইংরেজি Gate, এসেছে ভাইকিং/নরস্ক শব্দ গাতে থেকে তার অর্থ পথ যদিও ইংরেজিতে মানেটা বদলে যায়। ভাইকিংরা তাদের লুণ্ঠন এবং জমিদারি চালানোর সময়ে ইংরেজকে দিয়ে গেছে অজস্র শব্দ – Egg, Husband, Window, Sky এমনকি সর্বনাম যেমন they, them)। নরওয়ের স্বাধীনতার দাবি উচ্চগ্রামে উঠলে এক সময়ে ‘তোমাদের সংসার তোমরা বোঝো’ বলে দেশের ভার ছেড়ে দিয়ে সুইডিশরা স্টকহলম প্রস্থান করলেন। ইংল্যান্ডের মতো নরওয়ের রাজা কনস্টিটিউশনাল মনার্ক, বিশেষ দিনে রংচঙে ইউনিফরম পরে প্যারেডে বেরুনো আর মন্ত্রীসভার নির্দেশমতো কাগজে সই করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই।

    দূরে রাজবাড়ি



    ডেনিশরা চলে গেছে একশ বছর আগে। সেটা আমাদের হিসেবে সাধু ভাষা আর তার পাশাপাশি বেরগেন স্টাভাঙ্গারের মানুষ বলেছে গ্রাম্য ভাষা, একে অপরের সম্পূর্ণ অচেনা নয়, মানে ওই চিনি চিনি করি চিনিতে না পারি! হামসুন ইবসেন সে ভাষায় লেখেন নি। কিন্তু পুরনো রাজার ভাষা কেন মেনে নেবে স্বাধীন দেশ নরওয়ে? রাজা মন্ত্রিদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন – সামনে তিনটে উপায়; ডেনিশ হোক দেশের ভাষা অথবা নরওয়ের কথ্য ভাষাকে মার্জিত করে নতুন ভাষা তৈরি হোক, নু নরস্ক অন্যথা প্রচলিত ডেনিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মিশিয়ে সৃষ্টি হোক এক সম্মিলিত ভাষা ডেনিশকে রাখার প্রস্তাব সত্তর নাকচ হয়, নু নরস্ক ঘটন করতে সুনীতি চাটুজ্জের প্রয়োজন। স্বাধীনতার পরের পঞ্চাশ বছর এই নিয়ে কাজ হল; আজ নরওয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত মুখের ভাষার সঙ্গে বইয়ের ভাষা বা সাধুভাষা মিলিয়ে হাজির হয়েছে আজকের নরওয়েজিয়ান যার নাম বোকমল ধরে নিন শান্তিপুরি ও আমাদের বীরভূমের গেঁয়ো শব্দাবলী একাসনে বসেছে – গুরুচণ্ডা৯ আর কাকে বলে! 

    পিগম্যালিয়ন পড়া ও মাই ফেয়ার লেডি দেখা ইস্তক ভাষাচর্চা আমার অবসর বিনোদনের প্রকৃষ্ট উপায়। নয়ের দশকে সিটি ব্যাঙ্কের অসলো ষ্টকহলম হেলসিঙ্কি কোপেনহাগেন শাখার কতিপয় মানুষ বছরে একবার একত্রিত হতেন চারটের কন একটি দেশে। ফিনিশরা এখানে একঘরে, ইংরেজি তাঁদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা কিন্তু সেখানে লক্ষ করেছি নরওয়ে সুইডেন ডেনমার্কের লোকেরা আমরা মোটে বুঝি না এমন ভাষায় কথা বলছে! আড়ালে আবডালে অবশ্য তির্যক মন্তব্য শোনা যায়, ডেনিশদের উচ্চারণ সবচেয়ে খারাপ, যেন মুখে আলু ভরে কথা বলে! এটা অবশ্য তিনটে দেশের লোকেই মানে যে নরওয়েজিয়ান সবচেয়ে বোধগম্য। ডেনিশের সঙ্গে আপন ভাষার মাধুরী মিশায়ে সৃষ্ট আজকের নরওয়েজিয়ান হয়তো দিবে আর নিবের চমৎকার উদাহরণ।

    অসলো রাজবাড়ী নিতান্ত অর্বাচীন, মাত্র দেড়শ বছর তার বয়েস, সেখানে দর্শনীয় মারবেল হল, দেওয়াল ও সিলিঙ্গের চিত্রকলা আমার কাছে বেশি মনোরম মনে হয়েছে বিশাল জানলা থেকে দূরে অসলো বন্দর, সিধে স্টরটিং (পার্লামেন্ট) জানলায় দাঁড়ালে রাজা হয়তো দূরবীন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে উঁকি দিতে পারেন! অসলো শহরটা যে কতো ছোটো সেটা মালুম হয় এখানে দাঁড়ালে। বলতেই হয়, ইতালি ফ্রান্স জার্মানিতে গণ্ডা গণ্ডা জমিদারবাড়ি একে অনায়াসে হার মানায়। তবে ওই যে আমার গুরু মুজতবা আলী বলে গেছেন না চিড়িয়াখানায় বাঘ সিংহী দেখা হয়ে গেলে খটাশটাও দেখে নেওয়া ভালো? 

    স্টরটিং (পার্লামেন্ট)



    আমজনতার জন্য বাকিংহাম প্যালেস খোলা থাকে জুলাই -সেপ্টেম্বর, চেঞ্জিং অফ গার্ডস প্রত্যহ বেলা এগারোটায়, দক্ষিণা আমাদের টাকায় ৪,২০০। অসলো রাজবাড়ি জুন থেকে আগস্ট দু মাস খোলা, চেঞ্জিং অফ গারডস বেলা দেড়টায় ( সেটা আফিস কাছারির লাঞ্চ আওয়ার )। প্রবেশ দক্ষিণা ১৬০০ টাকা নিতান্ত ভদ্র মাপের অতি উৎসাহীদের জন্য। 

    ইংল্যান্ডের রাজার পেছনে আছে ৪৭ জনের লাইন অফ সাকসেশন, এ মারা গেলে সে রাজা হবে এবং সেই কারণে আমাদের মতন অবোধ কর দাতারা কয়েকশ লোকের ভরন পোষণের খরচা জুগিয়ে যাচ্ছি তাই খরচা বেশি।

    তুলনায় নরওয়ের সাকসেশন লাইনে আছেন মাত্র আট জন। তাদের উল্লাস বিলাসের কেচ্ছা খুব একটা শোনা যায় না। বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স হাকন কয়েক বছর আগে ক্রিস্টিয়ানসানডের একটি বিবাহ বিচ্ছিন্ন মহিলা মেতে-মারিতকে বিয়ে করে সাড়া জাগিয়েছিলেন। মেতে মারিতের প্রাক্তন স্বামী ড্রাগ সংক্রান্ত অপরাধে জেলে ছিলেন। সেই বিবাহ হতে তাঁর একটি পুত্র আছে, সে অবশ্য সাকসেশনের লাইনে জায়গা পাবে না। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্সের প্রেম ও বিবাহকে মেনে নিয়েছেন রাজ পরিবার। খবর কাগজে এই স্ক্যানডাল নিয়ে বিক্রি বাড়ানোর সুযোগ দেন নি, যে রকম ব্রিটিশ রাজ পরিবারে আমরা নিয়মিত দেখে থাকি।

    বিগডে

    ভাইকিং স্টাইল  বোটে



    মা বলতেন নদীর কূলে বাস, বিপদ বারোমাস। তিন দিকে সমুদ্র নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে নরওয়ে – কখনো শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রির নিচে নেমে যায় থার্মোমিটারের পারা, জমে যায় ফিওরডের জল, এ গ্রাম থকে সে গ্রামে যাবার পথে পাহাড়ের বাধা, দিগন্ত ছেয়ে যায় সাদা তুলোর মতো তুষারের ঝড়ে অদম্য শৌর্যে সমুদ্র শাসন করেছেন এ দেশের মানুষ। 

    সেই সব মানুষের স্মরণে অসলো ফিওরডের পশ্চিম কোনায় বিগডে ( Bygdøy) উপদ্বীপে আছে কয়েকটি মিউজিয়াম সেখানে স্থলপথে যাওয়া যায়, ন্যাশনাল থিয়েটারের সামনে থেক ট্রাম যায় বিগডে, বিশ মিনিটের যাত্রা তবে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, যাবেন জলপথে, ভাইকিং স্টাইল বোট পাওয়া যায় অসলো সিটি হলের সামনের মেরিনায়।

    তেরশ বছর আগে একশো ফুট লম্বা ষোল ফুট চওড়া কাঠের পাটার সঙ্গে পাটা জুড়ে পশমের পাল তুলে ভাইকিংরা বেরিয়েছিলেন তাঁদের লং শিপ নিয়ে হানা দিলেন ব্রিটেনে, শক্তিশালী স্ক্যান্দিনেভিয়ান মাল্লারা তিন বা চার দিনে পৌঁছুতেন তাঁদের গন্তব্য স্থলে, খাওয়া দাওয়া সহ প্রাকৃতিক কর্ম সেই নৌকোয়। মিউজিয়ামে হাজার বছরের পুরনো ভাইকিং জাহাজ দেখবেন, মনে হয় পালে হাওয়া লাগলে এখুনি বেরিয়ে পড়ে অসলো ফিওরডে! 

    ভাইকিং লং শিপ
     


    প্রথম চলল লুণ্ঠনের পালা। তারপরে একদিন তাঁরা খানিক স্থিতু হয়ে বসে জমিদারি করলেন। রোমানদের পরে তাঁরাই ব্রিটেনের দ্বিতীয় ঔপনিবেশিক।
    আমরা স্কুলের বইতে রাজা ক্যানিউটের গল্প পড়েছি, যিনি পারিষদদের খোশামুদিতে ক্লান্ত হয়ে বলেছিলেন, তোমরা যদি মনে কর আমার আজ্ঞায় দুনিয়া চলে তাহলে সমুদ্রের ঢেউ কে বলি থেমে যেতে? তারা তো থামে না!

    ক্যানিউট যে ভাইকিং ছিলেন সেটা আমাদের স্কুল বইতে লেখা থাকত না। ব্রিটেন যে দফায় দফায় বিদেশি শক্তি দ্বারা অধিকৃত হয়েছে সেটা এঁরা মানতে নারাজ।

    ছিন্ন পাতার তরণী সাজায়ে

    কাঁটাকলে অর্থনীতি পড়ি তখন, আনন্দবাজারে খবর: থর হাইয়ারডাল (কাগজে অবিশ্যি লেখা হতো হেয়ারডাল) নামের একজন নরওয়েজিয়ান মানুষ পাঁচটি বিভিন্ন দেশের মানুষকে নিয়ে আফ্রিকার লেক চাদে গজানো খাগড়ার বা পাপিরাসের লতা পাতা দিয়ে বানানো নৌকো ‘ রা’ ( মিশরিয় সূর্য ও জীবন দেবতার নামে ) নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেবেন মরক্কো থেকে বারবাডোজ। তিনি প্রমাণ করতে চান পাল তোলা পেরেক মারা কাঠের জাহাজের ও সেনর কলাম্বাসের অভিযানের অনেক আগে এই রুটে নৌ চলাচল ছিল, তার টেকনোলজি ছিল সহজ। মহাসমুদ্র কোন দুর্গম বাধা নয়।

    বাইশ বছর বয়েসে হাইয়ারডাল গিয়েছিলেন পলিনেসিয়ার ফাতু হিভা। সেখানে প্রকৃতির মধ্যে দিন কাটানোর সময় তাঁর মনে হয়েছিল এ অঞ্চলের মানুষ পুবের এশিয়া থেকে নয়, পশ্চিমের পেরু থেকে এসেছিলেন, বালসা কাঠের ভেলায়। ১৯৪৭ সালে বলিভিয়ার লেক টিটিকাকা অঞ্চলের বালসা কাঠ বেঁধে ভেলায় পাল জুড়ে কনটিকি (ইনকা দেবতা ) নামের নৌকোয় পেরু থেকে চার হাজার মাইল পেরিয়ে পলিনেসিয়া পৌঁছে হায়ারডাল প্রমাণ করেছিলেন পলিনেসিয়ায় মানুষ দক্ষিণ আমেরিকার থেকে এসেছিলেন।



     

    কন-টিকি


    ইন্টারনেট নেই, রেডিওতে নীলিমা সান্যাল এ বিষয়ে কিছু বলেন না। আনন্দবাজার ভরসা। ঠিকমত খবর এলো মরক্কো থেকে যাত্রার দু মাস বাদে রা ডুবে গেছে। অদম্য হায়ারডাল আবার বানালেন এবার পিরামিডের দেওয়ালে খচিত পাপিরাসের বোট অনুযায়ী। রা টু মরক্কোর সাফি থেকে বারবাডোজ পৌঁছুল ঠিক দু মাস বাদে। প্রমাণ হল পাপিরাসের বোট কেবল ফারাওদের নীল নদের নৌকা বিলাসের নয় মহা সমুদ্র পারাপারের জন্যও সমান কর্মক্ষম। 
    রা টু সযত্নে রক্ষিত আছে কন-টিকির পাশে। 

    রা ২



    বরানগরের কুঠি ঘাট থেকে খেয়া নৌকোয় ওপারে যাবো। আমার স্কুলের বন্ধু সতু বললে নৌকোর যা অবস্থা দেখছি, মাঝ গঙ্গায় কাঠ গুলো খুলে যাবে না তো? রা এবং কন-টিকির পাশে দাঁড়িয়ে খুব লজ্জা পেয়েছিলাম - এঁরা বালসা কাঠ, হোগলা পাতার নৌকোয় সাগর পাড়ি দিয়েছেন।

    মেরু বিজয়ের কেতন

    আমুন্ডসেনের ফ্রাম

    কুড়ি বছরের যুবক জর্জ ম্যালোরিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি ওই ভয়ঙ্কর পর্বত এভারেস্ট চড়তে এতো উৎসুক কেন? ম্যালোরি বলেছিলেন, বিকজ ইট ইজ দেয়ার।

    বাল্যকাল থেকে রোয়ালড আমুন্ডসেনের ইচ্ছে ছিল তিনি একদিন উত্তর মেরুর ট্রু নর্থে পা রাখবেন যেখানে কোন মানুষ তখনও পৌঁছয় নি। সেটার সুযোগ পেলেন না। ১৯১১ সালে কিছু উদ্যোগী লোকের অর্থ সাহায্যে পাঁচ জন নরওয়েজিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রাম ( Fram) জাহাজে গেলেন দক্ষিণ মেরু অভিযানে, সেটা আরও বিপদসংকুল শেষ মনুষ্য বসতি, নিউজিল্যান্ড ছাড়িয়ে নোঙর ফেললেন বে অফ হোয়েলসে, আন্টার্কটিকার বন্দর সে অবধি জাহাজ যেতো (এখন তার অস্তিত্ব নেই) এবার পদব্রজে তুষার মরুভূমি অতিক্রম করে সাউথ পোল যাত্রা সঙ্গে যাবে কে? স্লেজ এবং চল্লিশটি কুকুর নিয়ে দক্ষিণ মেরুতে সদ্য স্বাধীন নরওয়ের পতাকা তুললেন ১৪ ডিসেম্বর ১৯১১। আমরা স্কুল পাঠ্য বইতে পড়েছি ঠিক সেই সময় সেখানে হাজির হয় প্রভূত ধনে সজ্জিত রবার্ট স্কটের জাহাজ টেরা নোভা – অভিযানের ইতিহাসে হয়তো সবচেয়ে রোমহর্ষক প্রতিযোগিতা, কে আগে পৌঁছুবে দক্ষিণ মেরুতে। স্কট বাহিনী এনেছিলেন মোটর চালিত স্লেজ ও টাট্টু ঘোড়া; বিবিধ কারণে তাঁদের গতি বিলম্বিত হয়েছিল, এক মাস বাদে ১৮ জানুয়ারি ১৯১২ রবার্ট স্কট দক্ষিণ মেরু বিন্দুতে পৌঁছে দেখলেন হাওয়ায় উড়ছে নরওয়ের পতাকা। তাঁদের দল বেস ক্যাম্পে জীবিত ফিরতে পারেন নি।

    বিগডের এই মিউজিয়ামে পাশাপাশি মঞ্চে দে ভাইকিং লং শিপ, হাইয়ারডালের কন-টিকি,রা, আমুনডসেনের ফ্রাম।
    সব কথা থেমে যায়।

    অসলো ফিওরড
     

    অসলো ফিওরড ম্যাজিকাল, একদিকে শহর অন্য দিকে ছোট ছোট দ্বীপ, অকার ব্রুগের জেটি থেকে সেখানে যাওয়া যায় বিভিন্ন আকৃতির জলযানে। চমৎকার উজ্জ্বল দিনে নৌকো চলে যায় লিনডোয়া, হোভেদয়া, ভিটরে। প্রতি গ্রীষ্মে কখনো গেছি সিটি ব্যাঙ্কের কাস্টমার ইভেন্টে কখনো বা অন্য ব্যাঙ্কের আয়োজিত অনুষ্ঠানে। ১৯৯৩ থেকে ২২ বছর অন্তত একটি দিন বাঁধা ছিল। এই তো আর কদিন বাদেই দিন দীর্ঘ হতে থাকবে, একটা দিনে দুটো দিন যেন ঠাসা হয়ে যায়। অফিস ছুটি হয় তিনটেয়, সূর্য তখন মধ্য গগনে, আরও সাত ঘণ্টা আলো, ডাঙ্গায় কল্য কাকলি, ফিওরডের জলে ভাসে নানান নৌকো, অকারসহুস দুর্গের পাশে বাঁধা আছে বিশাল ক্রুজ শিপ সে যেন ছাড়িয়ে যায় দুর্গকে। আহা কি প্রসন্ন উদার ছিল সেই সব দিন।

    মনে থেকে যাবে। মনে রেখে দেবো।

    পুনশ্চঃ

    থর হাইয়ারডেলের জলাতঙ্ক ছিল বাল্যাবস্থায় দু বার প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন তিনি মহাসমুদ্র পার হলেন কাঠের ভেলায়।

    দক্ষিণ মেরু পৌঁছে আমুনডসেন বলেছিলেন, উত্তর মেরু পৌঁছানো ছিল আমার স্বপ্ন, এখন দাঁড়িয়ে আছি দক্ষিণ মেরু বিন্দুতে। এর চেয়ে অদ্ভুত কোন ঘটনা কি ঘটতে পারে?

    বিধাতা আরেক স্ক্রিনপ্লে লিখে রেখেছিলেন। দক্ষিণ মেরুতে পদার্পণের ডের দশক বাদে একটি ইন্টারভিউতে আমুনডসেন বলেছিলেন, যদি জানতে উত্তর মেরু কি অপরূপ! আমার যেন সেখানেই মৃত্যু হয়। পরের বছর একটি রেসকিউ মিশনে উত্তর মেরুর ওপরে তাঁর প্লেন ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর বয়েস ৫৬। 

     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ০৫ এপ্রিল ২০২৫ | ৯৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    কবিতা - Suvankar Gain
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন