এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বৈঠকি আড্ডায় আবার ৩২ 

    হীরেন সিংহরায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৯ জুলাই ২০২৫ | ৭৩৮ বার পঠিত
  • বৈঠকি আড্ডায় আবার ৩২

    পূর্ব -পশ্চিম ১০

    সেদিনের ফুল বিতান / হোয়ের হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ারস গন

    গরমকালে ইউরোপের বহু দেশের বারো থেকে ষোলো বছরের ছেলে মেয়েরা আরেক দেশের স্কুলে সাত বা দশ দিনের ভ্রমণে যায়, এর নাম এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। মূল্য উদ্দেশ্য ভাষা শিক্ষা এবং তার প্র্যাকটিস ; এই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে প্রীতি ও শুভেচ্ছা সম্প্রসারন। মনে আছে যে কোন বছরের জুলাই মাসে ফ্রাঙ্কফুর্টের নিকটবর্তী দিতসেনবাখ শহরের পথে ঘাটে কেবলই ফরাসি ভাষা শোনা যেতো; আলসাসের কোন শহর থেকে আসতো তারা দলে দলে। নিঃসন্দেহে পরের মাসে জার্মান বালক বালিকারা আলসাসের সেই শহর উত্তাল করে তুলত। এই প্রক্রিয়ায় কতোটা ভাষা শিক্ষা হয় আমার সন্দেহ আছে ( আমার নিজের ছেলে মেয়েদের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম দেখেই মন্তব্য করছি)। মায়ার স্কুল উওকিং হাই থেকে একদল গিয়েছিল লাইপৎসিগ, পরের মাসে জনা বিশেক জার্মান ছেলে মেয়ে আবির্ভূত হল আমাদের শান্ত গ্রামে। মায়া তার নবলদ্ধ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাদের দুই তত্ত্বাবধায়ককে সন্ধ্যেবেলা পাড়ার অ্যাংকর পাবে নিয়ে গেছি, ভাষার কারণে আলাপ জমে যেতে সময় লাগে নি।। অত্যন্ত কুণ্ঠার সঙ্গে যে ইংলিশ বিয়ার অফার করলাম, তাঁরা একান্ত উদারতায় তারই বাহবা করলেন। ইয়ানের বয়েস তিরিশ এবং পেটার পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। দুজনেই একাধিক পুরুষে লাইপৎসিগের বাসিন্দা। তাঁদের দাদু দিদিমা ও ঠাকুরদা ঠাকুমা একই শহরের আদি বাসিন্দা, যাকে হামবুর্গের কথ্য ভাষায় বলে ওয়াশএখটার ( ধোপে টেকা ) খাঁটি,লাইপৎসিগার।

    সালটা ২০১৫, দু দেশের পুনর্মিলনের ( ভিডারফেরআইনিগুং) সিলভার জুবিলি চলছে। এঁরা কেমন বুঝছেন সে প্রশ্নটা করার আগে ১৯৯৩ সালে লাইপৎসিগের এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের গল্পটা শোনালাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, পরিবর্তনের আগে আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিস ছিল সস্তা, বিলাসিতার বস্তু ছিল দামি। এখনা হয়েছে তার উলটো। তা ইতিমধ্যে আরও বিশ বছর কাটল, এখন কেমন দেখছেন ?



    আমাদের বাগানে লাইপৎসিগ স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক সমবেত
    ইয়ান বললেন, পরিবর্তনের সময়ে ( ভেনডে ) আমার বয়েস নিতান্ত কম; বাবা মায়ের কাছে শুনেছি – ২৫ বছর ধরে এক কিলো রুটির দাম ছিল ৭০ ফেনিগ, মাইনেও বদলায় নি ! সেই সিস্টেমের লাভ আমাদের বাবা মা পেয়েছেন। আমি ইকনমিসট নই, স্কুলে ইংরেজি আর অন্য টিচার অ্যাবসেন্ট হলে ভূগোল পড়াই। তাই রুটির দাম পঁচিশ বছর একই জায়গায় টিকে থাকাটা অর্থনীতি সঙ্গত কিনা জানি না।!



    ইংরেজির শিক্ষক ইয়ান

    পেটার আর্টের শিক্ষক, ইয়ানের চেয়ে বয়েসে অনেকটাই বড়ো, কমিউনিস্ট সময়কাল দেখেছেন। এতক্ষণ শুনছিলেন, এবার বললেন, আপনি লাইপৎসিগ গেছেন বললেন, সে বোধহয় কুড়ি বছর আগে। তখন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ছ লক্ষ এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে চার লক্ষে। ড্রেসডেনেও তাই, সেখানে কিছু টুরিস্ট যান ফ্রাউয়েন কিরখে,সেম্পার ওপার দেখতে। যদি আরেকটু ভেতরে যান, লাইপৎসিগের মতো নিঝুম পাড়া ( টোটে ভোনগেবিটে ) দেখবেন ! এশিয়া আফ্রিকার কথা জানি না, ইউরোপে এমন কোন বড়ো শহর দেখেছেন কি যেখানে বাসিন্দার সংখ্যা কমে গেছে বছরে বছরে ?

    তথ্য বলে বার্লিন দেওয়াল ভাঙ্গার পরে ২৫ বছরে পূর্ব জার্মানির পাঁচটি প্রদেশের মোট জনসংখ্যা এক কোটি ষাট লক্ষ থেকে কমে হয়েছে এক কোটি কুড়ি লক্ষ। আগামী দশ বছরে কমতে পারে আরও ১৫% অর্থাৎ দাঁড়াবে এক কোটির কাছাকাছি। পেটার বললেন লাইপৎসিগের বৃদ্ধাশ্রমে শিশুর ক্রন্দন বা পাড়ার ছেলেদের হট্টগোল ক্বচিৎ শোনা যায়।

    আমাদের যুবা বয়েসে শোনা পিট সিগারের ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী সেই গানটি মনে পড়ল - হোয়ের হ্যাভ অল দি ফ্লাওয়ারস গন। মারলেনে দিতরিখ সে গানকে আপন কণ্ঠে এবং জার্মান ভাষায় অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন

    জাগ মির ভো ডি ব্লুমেন জিনড / ভো জিনড জি গেব্লিবেন

    বলো সেই ফুল গুলি কোথায় / আজ কোথায় আছে তারা

    এ জমি লইব কিনে

    বাল্যকালে ঝরিয়া শহরে আমলাপাড়ায় ফেরিওলা দেখেছি, ঠেলাগাড়িতে নানা জিনিস সাজিয়ে হরি মন্দিরের মাঠের সামনে দাঁড়াত – সাড়ে ছে আনা, সাড়ে ছে আনা, জো ভি লেগা, সিরফ সাড়ে ছে আনা।

    পোল্যান্ডের স্লোনিম গ্রাম থেকে আসা ইহুদি যুবক মিখায়েল মার্কস এবং ইয়র্কশায়ারের স্কিপটনের এক হিসেব রক্ষক টমাস স্পেন্সার মিলে লীডস শহরের ফুটপাথে প্রথম যে স্টল খোলেন তার স্লোগান ছিল – দাম জিজ্ঞেস করবেন না, সবই এক পেনি (ডোনট আস্ক দি প্রাইস, ইট ইজ এ পেনি )।

    ঝরিয়ার সেই ঠেলাওলার ব্যবসা কতোটা সফল হয়েছিল জানি না তবে তার এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের প্রারম্ভিক বিজনেস মডেল ছিল এক।

    ১৯৯০ সালে জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামক আড়াইশো বিলিয়ন ডলারের জাতীয় আয় সম্পন্ন একটি দেশের যাবতীয় ব্যবসা, জমি জিরেত বিক্রির ভারপ্রাপ্ত, তৎকালীন বিশ্বের বিশালতম বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ত্রয়হানডের অনুচ্চারিত মটো ছিল, মাল বেচ সস্তায় তবে প্রভুর আদেশ মতন। আমাদের সেই দু বিঘা জমির ছন্দে

    বাবু কহিলেন
    বুঝেছ উপেন এ জমি লইব কিনে

    সেই মেলায় একটা গোটা দেশ বিক্রি হলো, টুকরো টুকরো করে । চার হাজার লোকের অফিসে নির্ধারিত হলো দশ হাজার প্রতিষ্ঠান, পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের কাজ, বহু লক্ষ একর জমি জায়গার ভবিষ্যৎ মালিকানা। ছিল না কোন আপিল আদালত, ট্রাইবুনাল, কোন জবাবদিহির দায়িত্ব। বেসরকারিকরনের নামে পশ্চিমের পুঁজিপতিরা কিনলেন কিছু, মেরামত করলেন কিছু, বন্ধ হলো বাকি দোকান,কল কারখানা।

    পশ্চিম জার্মান সরকার যেদিন ঘোষণা করলেন পাশাপাশি দুই অর্থনীতির সহাবস্থান নয় ( পরবর্তী কালে চিনে যেমন ওয়ান কান্ট্রি টু সিস্টেমস দেখা গেছে ) দু দেশকে এক হতে হবে একই শর্তে, যা স্থির হবে রাজধানী বন শহরে। দুয়োরের আগল খুলে যাওয়ার পরে পূর্ব জার্মানি চেয়েছিল গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক রিফরম, তাঁদের মতন করে। তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হলোঃ সত্তর শতাংশের বেশি নাগরিক যারা এই পশ্চিমি স্টাইলের দেশ তৈরির হুকুমে সম্মতি ভোট দিয়েছিলেন তাঁরা দিগন্তে কোন দুঃস্বপ্নের ইঙ্গিত দেখতে পান নি।
    ত্রয়হানড নামক ট্রাস্ট দফতর তখন সেলস লিস্টের জাবদা খাতা বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি সারা বছর হরলালকার সেল লেগে থাকতো - প্রি পূজা সেল, পূজা সেল, পোস্ট পূজা সেল ! ত্রয়হানডের প্রাত্যহিক সেল চলল বছরের পর বছর। তাদের সঙ্কলিত ফাইলগুলিকে পাশাপাশি রাখলে তার দৈর্ঘ্য হবে দুশ কিলোমিটার,যার প্রায় অর্ধেক আজও প্রকাশিত হয় নি। তুলনামূলক ভাবে, চল্লিশ বছরে এক কোটি ষাট লক্ষ মানুষের ওপরে খবরদারি করে তৈরি পূর্ব জার্মান গোয়েন্দা এজেন্সি স্তাসির ফাইলের দৈর্ঘ্য পৌঁছেছিল ১৮০ কিলোমিটারে; নতুন জার্মান সরকার যার সামগ্রিক প্রকাশ আজও নিষিদ্ধ রেখেছেন।

    কিভাবে এই মহতী সেল যজ্ঞ আয়োজিত এবং পালিত হয়েছিল তার গল্প অনেক।

    যেমন থুরিঙ্গিয়ার পটাশ ( জার্মানে কালি ) মাইন, বিশফেরোডে।



    বিশফেরোডে মাইন

    জার্মানিতে পটাশের খনি আবিষ্কৃত হয়েছিল উনবিংশ শতকে। প্রথমদিকে তারাই দুনিয়ার মার্কেট লিডার। চাষের মাঠে দেবার সার বানাতে পটাশ লাগে, তার প্রয়োগ বহুবিধ। ১৯৪৫/৪৬ সালে দেশ ভাগ হবার সময়ে কয়েকটি খনি পড়ল পশ্চিমের ভাগে। পশ্চিম জার্মানির কাসেলের কালি উনড জালতস হয়ে দাঁড়ায় একটি বিশাল মনোপলি। পাঁচটি খনি পূর্ব জার্মানিতে, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান থুরিঙ্গিয়ার বিশফেরোডে। হাজার দুয়েক লোক কাজ করেন। সেই খনি থেকে পটাশ রপ্তানি হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যেমন নরডিক দেশগুলিতে, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়ায়। বেসরকারিকরণের ব্যাপারে খোঁজ খবর শুরু হতেই বিশফেরোডের সেলস হেড অতি উৎসাহের সঙ্গে তাঁদের বিদেশি খদ্দেরের তালিকা পেশ করলেন ত্রয়হানডের কাছে ; জানালেন যিনিই অধিগ্রহণ করুন না কেন, তাঁর পয়সা মার যাবে না, আপন শক্তিতে টিকে থাকার ক্ষমতা আছে বিশফেরোডের। খানিক বিবেচনার পরে ত্রয়হানড জানালেন, পটাশের ব্যবসায় লাভ নেই, রাশিয়ানরা প্রচুর উৎপাদন করছে, বাজারে সারপ্লাস, বিশফেরোডে খনি বন্ধ করা হবে। সে খবর পেয়ে ইওহানেস পাইনে নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী ত্রয়হানডকে বললেন, আমি এ খনি কিনতে রাজি, আমার হাতে যথেষ্ট পটাশ সাপ্লাই কনট্র্যাক্ট আছে, চিন এবং ভারতে ডিমান্ড রয়েছে, আমি নিজে ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি চালাচ্ছি বহু বছর, অভিজ্ঞতা আছে। ত্রয়হানড তার সিদ্ধান্তে অটল। এমন সময়ে জার্মান লোকসভা, বুন্দেসটাগের প্রেসিডেন্ট রিটা জুসমুথ ফোনে ইওহানেস পাইনেকে জানালেন আপনি বিশফেরোডে কিনতে যাবেন না, তাহলে আপনার সমস্ত ব্যাঙ্কের ক্রেডিট লাইন বন্ধ হবে। পাইনে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, আমার কোন বাকি বকেয়া নেই, সুদ দিই, ধার শোধ করি ; আমাকে নিয়ে কোন ব্যাঙ্কের কোন রকম সমস্যা আছে বলে তো জানি না। দু দিন বাদে ইওহানেস পাইনে তিনটি ব্যাঙ্ক থেকে একই সুরের টেলিফোন কল পেলেন – আপনার সমস্ত ক্রেডিট লিমিট বাতিল হল, দু সপ্তাহের মধ্যে শোধ করুন ।

    ৯ই এপ্রিল, ১৯৯৩ বিশফেরোডের একচল্লিশ জন শ্রমিক অনশনে বসলেন। তাদের প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে কথা বলতে বনে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে বাধ্য হলেন, প্রভূত ভোটে শেষ নির্বাচনে বিজয়ী ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেউ বা তার নেতা চ্যান্সেলর হেলমুট কোল দেখা অবধি করলেন না। হেনকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী কারেল ফান মিয়েরত বললেন, বিশফেরোডেকে তার পছন্দমত বেসরকারিকরণের একটা সুযোগ দেওয়া হোক। সেটা সম্ভব নয় ; ত্রয়হানড জানাল পশ্চিম জার্মানির কালি উনড জালতস পূর্ব জার্মানির তিনটে খনি কিনে নেবে, আর তারা যেগুলো চায় না যেমন বিশফেরোডে বন্ধ করা হবে। অন্য কোন প্রাইভেট সংস্থা বিশফেরোডে অধিগ্রহণ করে পটাশ বেচলে সেটা হবে কালি উনড জালতসের ব্যবসায়ের অনাবশ্যক প্রতিযোগিতা, সেটা অনুমোদনের অযোগ্য।


    এই কারখানা আমরা দখল করেছি
    আর নয় ট্রয়হানড

    একটি অস্ট্রেলিয়ান সংস্থাকে বিশফেরোডে খনিকে জলপ্লাবিত করে তাকে সিল করে দেওয়ার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে। মাইন বিশেষজ্ঞদের মতে মাটির তলায় যে পটাশ থেকে গেলো তার বাজারি মূল্য অন্তত চার বিলিয়ন ইউরো। পটাশের বাজার হয়েছে ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, উন্নয়নশীল দেশ গুলিতে তার চাহিদা বিশাল। এমনকি জার্মান সরকার সেই সব দেশগুলিকে শর্তাধীন ঋণ দিচ্ছে – তাঁদের পটাশ কিনতে হবে কাসেলের কালি উনড জালতস নামক প্রতিষ্ঠান থেকে। সকল লাভ পাচ্ছে পশ্চিমের কালি উনড জালতস, বিশফেরোডের খনি বন্ধ করায় কমেছে প্রতিযোগিতা। মুনাফা বাড়ল বহু গুণ।



    অনশন ধর্মঘটীরা জীবনে প্রথম বেকার ভাতার লাইনে দাঁড়ালেন।

    ক্যামেরা জগতে কার্ল তসাইস ( Carl Zeiss ) কোম্পানির নাম সকলের জানা। ভাইমারে জন্মেছিলেন কার্ল তসাইস, অপটিকাল লেন্স নিয়ে গবেষণা করে যখন তিনি কোম্পানি ও কারখানা খুলতে চাইলেন, ভাইমার সরকার বললেন আপনি এ বিষয়ে কতোটা কি বোঝেন তার পরীক্ষা দিন আগে ! স্টার্ট আপ কথাটা সেকালের সরকারের জানা ছিল না !

    সে পরীক্ষায় পাশ করে অদূরবর্তী ইয়েনা শহরে ( হাইকের গল্পে ইয়েনার কথা বলেছি ) তাঁর জগত বিখ্যাত ল্যাবরেটরি ও কারখানা স্থাপন ও বাণিজ্যিক বিশ্ববিজয় করেন অবিলম্বে। তাঁর মৃত্যুর ষাট বছর বাদে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দেশভাগের পরে ইয়েনার কারখানার এক অংশ চলে আসে পশ্চিম জার্মানিতে সোয়েবিয়াতে স্টুটগারটের কাছে ওবারকখেনে; পরের চল্লিশ বছর দু দেশের কার্ল তসাইস প্রায় একই নামে তাদের লেন্স, মাইক্রোস্কোপ বেচেছে সারা বিশ্বে। পূর্ব জার্মানির কার্ল তসাইস ইয়েনার খ্যাতি বিপুল, তাদের সেলস অর্ডার বুক ভর্তি কিন্তু ১৯৯০ সালে ওবারকখেনের কার্ল তসাইস কিনে নিলেন কার্ল তসাইস ইয়েনার তাবৎ জমিজমা কারখানা, কোন টেন্ডার হয় নি। কেনার অব্যবহিত পরেই ক্রেতাদের জানানো হয়েছে কার্ল তসাইস ইয়েনার সঙ্গে যাদের যে ক্রয় চুক্তি ছিল সেটিকে বাতিল বিবেচনা করে তাঁরা যেন ওবারকখেন থেকে তাদের লেন্স কেনেন। ইয়েনার আলাদা ভাবে টিকে থাকার কোন সম্ভাবনা রইল না। তারা স্টুটগারটের একটি ডিভিশনে পরিণত হল।

    দেশের সম্পত্তি বেচার কাজ প্রায় সাঙ্গ হল ( জমি জিরেৎ বিক্রির কাজ অবশ্য শেষ হয় নি ৩৫ বছরে)- দেশের এক তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ – ফ্যাক্টরি বাড়ি ঘর ডিনামাইট দিয়ে ওড়ানো হলো ; মাত্র ৪৫ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটানোর শাস্তি হিসেবে পুব দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন খুলে নিয়ে গিয়েছিল দেশের অর্ধেক কল কারখানা। পুনর্নির্মিত কারখানার এক বিরাট অংশ ভাঙল পশ্চিমের নির্দেশে।

    মাত্র এক তৃতীয়াংশের বেসরকারিকরণ হল যার সিংহভাগ গেছে পশ্চিম জার্মানির পুঁজিপতিদের কবলে, ঠিক কি দামে এবং কত ভরতুকির বিনিময়ে সে তথ্য জানা যাবে না কোনদিন। অর্থমন্ত্রী থেও ভাইগেল অন রেকর্ড তাই বলেছেন।

    কিছুর দখল নিলেন স্থানীয় পৌরসভা, কিছু ফিরে গেলো পুরনো মালিকের হাতে ( ম্যানেজমেন্ট বাই আউট )। কাজ হারালেন বিশ লক্ষের বেশি মানুষ। নতুন ব্যবস্থায় মাত্র ১১% এর মালিকানা ফিরল পূর্ব জার্মান নাগরিকদের হাতে ( তুলনায় রোমানিয়াতে বেসরকারিকরণের পরে অন্তত ৪১% প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পেয়েছেন আপন দেশের নাগরিক )।

    দেশের সম্পত্তির বিক্রিবাটা শুরু হবার অনেক আগে পূর্ব জার্মানির নেতা হান্স মদরো পশ্চিম জার্মানির সরকারের কাছে ১৫ বিলিয়ন ডি মার্ক সহায়তা চেয়েছিলেন – এই সাহায্য পেলে তাঁরা অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করতে পারেন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী থেও ভাইগেল বলেছিলেন একটি ফুটো পয়সাও নয়। ত্রয়হানড জানিয়েছিল জাতীয় সম্পত্তির বেসরকারিকরণ সম্পূর্ণ হলে যে প্রভূত আয় হবে তা পূর্ব জার্মানির নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে ( সেই মুফতে পনেরো লাখ পাবার প্রতিশ্রুতি)।

    দশ বছর বাদে ত্রয়হানডের নাম এমনই কর্দমাক্ত যে সরকার তার এমন উত্তরসূরি সৃষ্টি করলেন যার নামটা এমনকি জার্মানদের কানেও অত্যন্ত জটিল ; সেটি পরিচিত হল কেবলমাত্র আদ্যক্ষর দিয়ে - বি ভি এস ( বুন্দেসআনস্টালট ফুয়ের ফেরআইনিগুঙ্গসবেডিঙটে জনডারআউফগাবেন – পুনর্মিলন সংক্রান্ত বিশেষ দায়িত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ) যে নামেই ডাকা হোক না কেন, কাজটা একই !

    আজ অবধি ত্রয়হানড এবং তার উত্তরসুরী বি ভি এস করদাতাদের অর্থে বেসরকারিকরণের খাতে ক্রেতাদের সাকুল্যে ২৭০ বিলিয়ন ইউরো ভরতুকি দিয়েছে।

    হান্স মদরো চেয়েছিলেন পনেরো বিলিয়ন ডি মার্ক, সাড়ে সাত বিলিয়ন ইউরো।

    ত্রয়হানড বন্ধ হলে মানুষজন অন্যত্র কাজ খুঁজেছেন। স্পিগেলে পড়লাম বার্লিনের এক অডিট সংস্থার পারসোনেল দফতরে প্রাক্তন ত্রয়হানড কর্মীর ইন্টারভিউ
     
    • আপনারা কোম্পানি বেসরকারিকরণের সময়ে তার ভ্যালুয়েশন কি ভাবে করতেন?
    • সেটা করার মতো লোকবল, সময় বা সাধ্য কোনটাই আমাদের ছিল না। আমাদের একমাত্র লক্ষ ছিল কত তাড়াতাড়ি কোন কোম্পানি বিক্রি করা যায়। তার ওপরে আমাদের বোনাস নির্ধারিত হতো।

    রাষ্ট্রসংঘের ডাটা অনুযায়ী ১৯৮৯ সালের তুলনায় পরের দশ বছরে পূর্ব জার্মানির সামগ্রিক উৎপাদন ৪৭% কমে যায়।

    পুরনো চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্ড বলেছিলেন যা একসঙ্গে জন্মেছে তা বেড়ে উঠবে একই সঙ্গে- মাঝে হল একচল্লিশ বছরের ছাড়াছাড়ি , হাঁড়ি বাড়ি আলাদা। তারপর ধনী পরিবারের সঙ্গে গরিব আত্মীয়ের সাক্ষাৎ ও মিলন। ফরাসি বিপ্লবের মন্ত্র ধার করে বলা যায় লিবারতে, ফ্রাতারনিতে পাওয়া গেল কিন্তু ইগালিতে কোথায় ?

    অঙ্ক মিলিয়ে ইগালিতে না এসে থাকুক, বদলেছে তো অনেক কিছুই। নিজেই দেখলাম দশ বছর আগে পরে কতোটা বদলাল ইয়েনার কাছে হাইকের স্টাডরোডা শহরে। ১৯৭৯ থেকে ২০১৫ এই ছত্রিশ বছরে বার্লিনের বিবর্তন দেখলাম। কাঁটাতারের বেড়ার ওপারের জনশূন্য পটসডামার প্লাতস আজকে একটি বিশাল রাউনড আবাউট, গোল চক্কর। পূর্ব বার্লিনের তুলনায় পুরনো পশ্চিম বার্লিনকে ধূসর মনে হয়। ড্রেসডেনের ভাঙ্গা ফ্রাউয়েনকিরখে আজ ফিরেছে পুরনো জেল্লায়, এমনকি তার মাথার ওপরে সোনার কলসটি অবধি ( যেটি দান করেছেন ইস্ট লন্ডনের এক স্বর্ণকার, তাঁর আপন দেশের বমার হ্যারিসের অন্যায় বোমা বর্ষণের অপরাধবোধে )। তার মূল্য অবশ্যই চুকোতে হয়েছে, সেটি মানবিক মূল্য, হিউম্যান কস্ট। সস্তার রুটি, কাপড়া, মকান আর মেলে না কিন্তু স্বাধীনতা আছে ভোটের, ভ্রমণের। প্রয়োজন থাকুক না থাকুক মেলে অনেক কিছুই , এমনকি ৫৮ রকমের দই।

    আজকের ৫০০ জন টপ ধনী জার্মানের তালিকার মাত্র ২১ জন পূর্ব জার্মান, তাদের ১৪ জন বার্লিনের অধিবাসী । সাড়ে তিন দশক বাদে পূর্ব জার্মানদের বার্ষিক আয় পশ্চিমের ৭৫%। পশ্চিমে গড়ে একটি পরিবারের মোট বাড়ি জমি মিলিয়ে সঞ্চয়ের পরিমাণ আড়াই লক্ষ ইউরো ধরা হয়, পূর্বে তার অর্ধেকের কম। সেখানে অন্তত ২৫% মানুষ দারিদ্র্য সীমার কাছকাছি বাস করেন। জার্মান স্টক এক্সচেঞ্জের বৃহৎ ৩০টি নাম পশ্চিম জার্মানির। বুন্দেসলিগায় একটিও পূর্ব জার্মান দল খেলার অধিকার পায় নি।

    আমি জানি আপনাদের জার্মানি ভ্রমণের তালিকায় লাইপৎসিগ, ড্রেসডেন, মাইসেনের অনবদ্য পোরসেলান প্রদর্শনী, গোয়েথের ভাইমার কখনো স্থান পাবে না। জেনে আশ্বস্ত হতে পারেন নব্বুই শতাংশ পশ্চিম জার্মান কখনো পুবে আসেন নি, আসেন না। পুবের মানুষ যান হামবুর্গ, কলোন, মিউনিক। কাঠের দরোজা খুললেও মনের দুয়োর কি খুলেছে? বাঙ্গাল ঘটির বিবাহ ? ওয়েসি ( পশ্চিম ) / ওসি (পূর্ব) দম্পতির সংখ্যা গড়ে দশের মধ্যে এক।

    নাৎসি অতীতের সঙ্গে বোঝাপড়া শেষে যারা বানিয়েছিলেন কালিমামুক্ত নতুন দেশ তাঁদের পুনরায় মোকাবিলা করতে হলো আরেক অতীতের সঙ্গে। পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তিন বারের পট পরিবর্তন – নাৎসি শাসন, কাস্তে হাতুড়ি, মুক্ত বাজার ! তিন বার প্রবঞ্চিত? যারা এবারে ভেবেছিলেন এই সেই সব পেয়েছির দেশ, কয়েক বছর কাটলে তাঁরাই প্রশ্ন করলেন, কি পেয়েছি ?

    কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন লিখেছেন ডি মার্কের লোভে দেশটা বিকিয়ে গেল। আমরা সচ্ছল থেকে গরিব হলাম, কিন্তু দোকানে কলা পাওয়া যাচ্ছে, কখনো কখনো আনারস। হেলমুট কোলের বিস্তীর্ণ পুষ্পক্ষেত্র ( ব্লুহেনডে লানডশাফট ) কথাটাও সত্যি হল - যেখানে একদিন শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল সেখানকার ফাঁকা মাঠ, অনেক ফুল ফুটছে। লিবারালাইজেশনের সঠিক অর্থ এতদিনে বোঝা গেল- পশ্চিম পেলো সস্তার কল কারখানা আর সস্তার শ্রমিক। আমাদের শুষে খেয়ে নিয়ে তারা বললে ওটা এক অন্ধকার জার্মানি, যেমন আমরা শুনতাম আফ্রিকা এক অন্ধকার মহাদেশ।

    নাকের বদলে নরুন ?

    সাজানো বাগান

    ইকনমিকসের ক্লাসে পাদ্রি টমাস রবার্ট ম্যালথাসের থিওরি পড়তে হয়েছিল –খাদ্য উৎপাদন বাড়ে পাটিগণিতের হারে- ১,২,৩, ৪ আর জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে ৪, ১৬,৬৪ ইত্যাদি। বার্লিন ওয়াল পতনের পর থেকে পঁচিশ বছরে পূর্ব জার্মান জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে প্রতি বছর। ২০৩০ নাগাদ সেই সংখ্যা এক কোটি ষাট লক্ষ থেকে কমে এক কোটিতে দাঁড়াবে এই অনুমান করা হচ্ছে। কোন সামরিক সংঘর্ষ (বিশ্বযুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ ) - বাদে কেবলমাত্র উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আইরিশ আলু দুর্ভিক্ষের সময়ে ইউরোপে এমন হারে জনসংখ্যা হ্রাস হতে দেখা গেছে।

    এঁরা যাচ্ছেন কোথায় ? পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার – হাইকের এক ছেলে, মারকুস থাকে নুরেমবের্গে তার কাছে শুনি স্টাডরোডা থেকে পাড়া শুদ্ধ লোক এখন সেই মুখো। যেখানে সে জন্মেছে সে শহরে উন্নতি অবশ্যই হয়েছে, রাস্তা ঘাট সাফ সুতরো পিতসেরিয়া, কাফে নেরো, প্লাস্টিকের টালির চাল, জানলায় দু প্রস্থ কাঁচ কিন্তু ভবিষ্যৎ সেখানে নেই। দশ বছর আগে লাইপৎসিগের পেটার যেমনটি দেখেছিলেন।

    এটাও সমান সত্য যে পশ্চিম জার্মানিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যদিও পজিটিভ তবে অতি সামান্য হারে ০.৬%। স্কিলড পারসনেলের বিরাট চাহিদা। পুবের মানুষ গিয়ে সেগুলো পূর্ণ করতে পারে না, অতএব প্রয়োজন বিশাল সংখ্যায় ইমিগ্রেশন, কিন্তু রাম শ্যাম যদু মধু নয়, বেছে বেছে চুনকে। অথচ পুবের এই শূন্যপুরীতে যখন বার্লিন সরকার সিরিয়ান আফগান শরণার্থী পাঠান তার প্রতিবাদ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয় – আপনার ভাত জোটে না তায় শঙ্করাকে ডাক? পাঁচটি প্রদেশ ও বার্লিন শাসন করেছে সেনটার রাইট ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাট অথবা কেন্দ্র হতে একটু বাঁয়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল। দু দলই এদিক ওদিক সামলে, আমেরিকা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে মানিয়ে তবলায় ঠেকা দিয়েছেন। সাঁকো এঁরা নাড়াবেন না। সেটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানির রাজনৈতিক কবচ, কেন না মাথার ওপরে সব সময়ে ঝুলে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছাপ, স্টিগমা। চলো নিয়মমতে, একই গতে।

    ১৯৫৬ সালে পশ্চিম জার্মানিতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়। ১৯৯০ সালের পরে গোটা পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শব্দটা গ্রহণযোগ্য ( জালোনফেহিগ ) রইল না, কাস্তে হাতুড়ি অদৃশ্য হয়েছে সকল দেশের পতাকা হতে। তবে নামেই হোক, বাঁ দিকে হাঁটার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। পুরনো পূর্ব জার্মানির শাসক দল এস ই ডি ( সমাজতান্ত্রিক ঐক্য দল ) ভেঙ্গে একাধিক দল হয়েছিল, এখন, এই ২০০৭ সালে তারা মিলে মিশে হয়েছে ডি লিংকে, সোজা সাপটা বামপন্থী দল। নামে কি এসে যায় ডি লিংকে ক্রমশ ভোট এবং আসন অধিকার করে চলেছে, এককালের কিং মেকার ফ্রি ডেমোক্র্যাট দল উড়ে গেছে ঝরা পাতার মতো।

    ২০১২ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মাইনের অনতিদূরের স্পা শহর বাদ নাউহাইমে যে প্রতিবাদী দলটি আত্মপ্রকাশ করল তাদের ম্যানিফেস্টোর মূল শব্দ – বিকল্প ( আলটারনাটিভে )। সেনটার রাইট ও সেনটার লেফট, তাদের ধামাধরা ফ্রি ডেমোক্র্যাট, ইউটোপিয়ান গ্রিন পার্টি -এই ক্লান্তিকর অকর্মণ্য মাঝারিয়ানার বিরুদ্ধে এক সশব্দ বিক্ষোভ- তাদের নাম আলটারনাটিভে ফুয়ের ডয়েচলানড, জার্মানির জন্য এক বিকল্প। মধ্য পন্থার বাঁধ ভেঙ্গে কিছু সত্যি কথা কটুভাবে বলার সময় এখন – সেনটার রাইট, লেফট ড্রিল করে কোন লাভ নেই। জনতার অস্থিরতাকে ভাষা দিয়েছে আলটারনাটিভে ফুয়ের ডয়েচলানড, এ এফ ডি। এঁরা বার্লিনের পার্লামেন্ট করিডোরে ফিসফিস করে কথা বলেন না, যা বলার উচ্চস্বরে সোজাসুজি বলেন। পশ্চিম জার্মানির মানুষের কাছে সে সুর কর্কশ শোনায় কারণ তাঁরা দীর্ঘদিন মধ্যপন্থার ছায়ায় সুখ সুবিধে পেয়েছেন গতে বাঁধা জীবন সেখানে এ এফ ডি জনপ্রিয় নয়। কিন্তু পুবের মানুষ মুক্ত রাজনীতি অর্থনীতির যে পরিচয় পেলেন সেটাই কি তাঁরা চেয়েছিলেন ? কেউ কি জানতে চেয়েছে ? এ এফ ডি এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়, এবার কেউ তাদের কথা শুনছেন।

    ১৯৯০ সালের প্রথম মুক্ত জার্মান নির্বাচনে সেনটার রাইট সি ডি ইউ (ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রাটিক ইউনিয়ন ) ৬০% ভোট পেয়েছিল, তারা এখন কোনমতে ২৮% পায়, এস পি ডি ( সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ) দলের অস্তিত্ব সঙ্কট। বার্লিন পার্লামেন্টে দু দলীয় পার্লামেন্ট পদ্ধতির মূলে আঘাত করেছে এ এফ ডি। তাকে অস্বীকার করতে অন্য দলগুলি আজ ব্যস্ত, ‘ ওরা নিও নাৎসি আর যার সঙ্গেই হোক, ওদের সঙ্গে কখনো সরকার গঠন করব না ‘।


    জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল

    এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনে কোন দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায় নি, দুটি প্রধান দল ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাট (২৯%) এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (১৬%) মিলেও নয়! এটি সম্পূর্ণ অকল্পনীয়, পশ্চিম জার্মানির ইতিহাসে এই প্রথম দুটি বৃহৎ পার্টি মিলে সরকার গঠন করতে অসমর্থ হয়ে বাবা বাছা করে গ্রিন পার্টিকে কোলে টানতে বাধ্য হয়। এ এফ ডি ২১% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল কিন্তু তারা ব্রাত্য, তারা যে বড়ো বেশি ডাইনে হাঁটে !

    ৯২ বছর আগে জার্মানিতে কোন দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায় নি, অগত্যা নাৎসি পার্টিকে নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়।

    বাকিটা সকলের জানা।



    এ এফ ডির পতাকা - সবার আগে আমার দেশ / নিচে কোনায় 'ইউরোপ নতুন করে ভাবো '

    উপসংহার



    আরটারন-পেছনে স্কুল কখনো শিশুদের কলতানে মুখরিত ছিল


    পুরোহিতের অভাবে গ্রামে পুজো আচ্চার সঙ্কট হতে দেখে আমার প্রপিতামহ ভগবান সিংহ দূরের কোথাও থেকে এনে এক ঘর বামুন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পদুমায়। জার্মান সরকারের সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভেলের ( জার্মান তরঙ্গ) সাম্প্রতিক খবরাখবর পড়ে মনে হল পূর্ব জার্মানির শহর ও গ্রামে মানুষ প্রতিষ্ঠার ধুম পড়েছে।



    গুবেন

    জার্মান পোলিশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি ছোট্ট শহর গুবেন। দয়াময়ী আঙ্গেলা মেরকেলের সময়ে কিছু বহিরাগত শরণার্থীদের এখানে ঠাই দেওয়া হয়েছিল। বছর পনেরো আগে কোন অজ্ঞাত আততায়ীর ছুরিকাঘাতে একজন আলজেরিয়ান যুবকের মৃত্যুর পরে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের প্রয়াস বন্ধ হয়ে যায়।

    কমিউনিস্ট জার্মানিতে গুবেন শহরের খ্যাতি ছিল টেকসটাইল এবং সিনথেটিক ফাইবার বানানোয়, ১৯৯০ সালে জনসংখ্যা ৩৫ হাজার।। নন প্রফিটেবল বিবেচনায় ত্রয়হানড সে সব ধান্দা বন্ধ করেছেন, শহর উজোড় করে চলে গেছেন অর্ধেক নাগরিক, বর্তমানে ১৬ হাজারের বাস; শয়ে শয়ে অ্যাপার্টমেনট ব্লক খালি পড়ে আছে। গুবেনপৌরসভা এখানে মানুষ প্রতিষ্ঠার একটি স্কিম খাড়া করেছেন ; দুনিয়ার যে কোন দেশের ( অবশ্যই ভিসা সমেত ) লোক গুবেন শহরে এসে বিনা ভাড়ায় একটি হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে এক মাস বাস ও চাকরির খোঁজ করতে পারেন – কাজের অভাব হবে না। সালামি বানানোর কোম্পানি বি ফি (BiFi) এবং কানাডিয়ান লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদক রকটেক সেখানে কাজকর্ম শুরু করেছে, তারা লোক খুঁজছে। গত কয়েক মাসে মিশর, বেলারুশ, ব্রাসিল এমনকি বেলজিয়াম থেকে চল্লিশটি দরখাস্ত জমা পড়েছে।



    নদীর ওপারে ভুতুড়ে নিশব্দতায় খালি পড়ে আছে অজস্র অ্যাপারটমেনট ব্লক - ফ্রাঙ্কফুর্ট আন ডের ওডার

    আমি পশ্চিম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের পুরনো বাসিন্দা। চিঠি পত্রে, কাজে কর্মে সর্বদা লিখতে হয়েছে মাইন নদীর তীরবর্তী, ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মাইন ( Frankfurt am Main অথবা Frankfurt /Main) নচেৎ পোস্ট অফিসের ডাক হরকরার বিভ্রান্তির সম্ভাবনা ; পূর্ব জার্মানিতে আরেকটি ফ্রাঙ্কফুর্ট আছে। তার সঠিক নাম ফ্রাঙ্কফুর্ট আন ডের ওডার, সেই ওডার নদীর ওপারে পোল্যান্ড। এখানেও গল্প সেই একই, একদা সম্পন্ন শহরের ব্যবসার ঝাঁপ বন্ধ । তিরিশ শতাংশ বেকারি। বিগত তিরিশ বছরে ফ্রাঙ্কফুর্টের জনসংখ্যা ৯০ হাজার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজারে। পূর্বের আরও অনেক শহরের মতো ফ্রাঙ্কফুর্ট নগর পৌরসভা দেশি বিদেশিদের প্রলুদ্ধ করতে চাইছেন, সেমি কন্ডাক্টর টেকনোলজি ব্যবসার সূত্রপাত হয়েছে কিন্তু এখানে আসতে কেউ রাজি নন। তাই সম্ভাব্য কর্মীদের প্ররোচিত করার জন্য পৌরসভা প্রথমে নিশুল্ক তারপরে সস্তার আবাসের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দু কামরার ফ্ল্যাটের ভাড়া আমাদের টাকায় মাসে বিশ হাজার।

    সেই আগের দিনের মতো ? সরকার রোটি কাপড়ার সন্ধান দেবেন, মকান মিলবে সস্তায়?

    পরিশিষ্ট

    সূত্র:

    জার্মান সাপ্তাহিক স্পিগেল, সংবাদসংস্থা ডয়েচে ভেলে আর্কাইভ

    এছাড়া ইউ টিউবে প্রাপ্তব্য –

    মিটেল ডয়েচে রুনডফুঙ্ক ( MDR) ডকুমেন্টারি – বিশফেরোডে, ত্রয়হানড ত্রাউমা
    ইনভেসটিগেটিং ইস্ট জার্মানি (ওলাফ ) – একটি অসাধারণ ডকুমেন্টারি সিরিজ

    কিছু ব্যক্তিগত কথোপকথন


    একটি স্বীকারোক্তি

    গত ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মান জাতীয় নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থী দল এ এফ ডির অভাবনীয় উত্থান দেখে ইপ্সিতা পাল ভৌমিক বলেছিলেন, এ নিয়ে কিছু লিখুন। দেশটার সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিবিড় পরিচয়ের কারণে লিখতে গিয়ে নিছক পরিসংখ্যানের চর্চা নয়, কোন ভূরাজনীতিক মতামত নয়, নিজেরই পাঁচটা পুরনো কথা চলে এলো, তার সঙ্গে যোগ হল কিছু দেখা, শোনা, জানা গল্প। মনে হয় গত তিন মাসের দশটি পর্বে কোথাও ঠিক পৌঁছুনো গেলো না, এই সুপরিণত বয়েসের যা ধর্ম!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১৯ জুলাই ২০২৫ | ৭৩৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Debanjan | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ১৯ জুলাই ২০২৫ ০০:১২732555
  • লিখতে থাকুন দাদা l ভালো হচ্ছে l AfD কি কখনো পূর্ব জার্মানীকে বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে ? যদি এরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি না রাখতে পারে ভোটারদের কাছে তাহলে এরা কি করবে ? ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুগে পূর্ব জার্মানীকে আলাদা রাষ্ট্র গঠন না করে কি AfD মানুষকে সুরক্ষা ফিরিয়ে আনতে পারবে ? বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি আর জার্মান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কি সেটি আদৌ সম্ভব ? কি বলেন দাদা ?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন