এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বৈঠকি আড্ডায় ২২ 

    হীরেন সিংহরায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০২৪ | ৭৫৫ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • বৈঠকি আড্ডায় ২২

    নীল বই বিসর্জন ৩

    দেশে দেশে দুর্গ


    যখন জার্মানিতে প্রবেশের নয়, সেখানে শুধু দুই পা ফেলিয়া আবার হাওয়াই জাহাজে ওঠার ট্রানজিট ভিসার জন্য আলিপুরে জার্মান কনসুলেটে হত্যে দিচ্ছি, সেই সময়ে ইউরোপীয় সাধারণ বাজারের পাঁচটি দেশ লুকসেমবুরগের শেঙ্গেন গ্রামে বসে নির্ণয় করে ফেলেছে তাদের পারস্পরিক সীমান্তে অতো পুলিস প্রহরী পালন পোষণ করাটা নিছক অর্থের অপচয়। দুটো আলাদা চৌকি, দু বার চেকিং কেন? বারো ঘর না হোক আমাদের পাঁচ ঘর এক উঠোনের দুয়ার হোক অবারিত।

    পাঁচ ঘর এক উঠোন অবারিত অবশ্যই কিন্তু ওপাড়ার যদু মধুদের জন্যে নয়। তারা থাকুক দূরে। শেঙ্গেন চুক্তি ইউরোপীয় সাধারণ বাজারের সর্ব সম্মতি ক্রমে স্বাক্ষরিত হয় নি – এটি ছিল বেলজিয়াম নেদারল্যান্ড লুকসেমবুরগ ফ্রান্স ও জার্মানির পারস্পরিক বোঝাপড়া; এই পাঁচটি দেশের সীমানা আছে একে অপরের সঙ্গে। অন্য সদস্যরা যেমন ইতালি, গ্রিস, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

    এবার দেখা গেলো স্থল সীমান্তে দু দেশের পুলিস একই ছাউনির তলায় বসছে, পাশাপাশি টেবিলে। আগের মতন এক পালা গান সেরে নো ম্যানস ল্যান্ড পেরিয়ে আরেক দেশে গিয়ে আবার নতুন পালা গান গাইতে হচ্ছে না। হল্যান্ড বর্ডারে জার্মান পুলিস আমার পাসপোর্ট একবার দেখে পাশের ডাচ পুলিসকে বলটা ঠেলে দিয়ে আবার গল্প গুজব শুরু করে তার কমরেডদের সঙ্গে। এই যৌথ চৌকি পেরুলেই হল্যান্ড ঢুকে পড়া যায়। দু দেশেই হয়তো পুলিস ছাঁটাই হয়েছে; ছাউনি বানানোর বাঁশ তেরপল সিমেন্ট পাথর সাপ্লাই ব্যবসার সর্বনাশ।

    ফ্রাঙ্কফুর্টের বাঙালি চিরকুমার সভার একমাত্র সদস্য ও আজীবন সভাপতি প্রবীরদা (দাশগুপ্ত ) নিয়মিত নিজের গাড়িতে কাজে, বেখেয়ালে ইউরোপ চরে বেড়াতেন (ম্যাকভিটির ডাইজেস্টিভ বিস্কিটের ভক্ত ছিলেন)। তিনি একদিন বললেন, আচ্ছা সেই নো ম্যানস ল্যান্ডটা কার ভাগে পড়ল বলতো? সেটা কে হাপিশ করলে ? হল্যান্ড আর জার্মানির পাঁচশ কিলোমিটার লম্বা সরকারি সীমানা এবার সেই বরাবর পাঁচশ মিটার দিয়ে গুন করো তো ! আমাদের দেশে বেরুবাড়ি না কোথায় একটা ছিট মহল বাংলাদেশকে দেওয়া নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গিয়েছিল।

    কৌতূহলটা থেকে গেছে। কোন সঙ্গত উত্তর পাই নি ! তবে অন্যদিকে দুর্গ গড়ে উঠতে দেখলাম।

    আটের দশকের শেষ থেকে আমাদের নীল পাসপোর্টের হেনস্তা শুরু হলো ইউরোপ জুড়ে। চতুর্দিকে ভিসার কাঁটাতার। নরডিক যেতে হয় নিয়মিত, কখনো মাসে তিন চার বার। সব দেশে সিটি ব্যাঙ্ক সি ই ওদের কাকুতি মিনতি জানাতে হয়, একটা চিঠি লিখে দেবেন সার, নইলে আমার যাওয়া আটকে যাবে! সেখানেও বৈষম্য দেখা দিলো – নরওয়ে দেয় এক বছরের, সুইডেন এক মাসের, ফিনল্যান্ড সাত দিনের- তাদের বক্তব্য আবার যখন যাবেন চাইবেন, দেবো না তো বলছি না। তাতে আমার সুরাহা হয় না। বারে বারে সিনিয়র লোকেদের পদপ্রান্তে বসে চিঠি ভিক্ষা করতে হয়। মনে আরেকটা আশংকা – কোথাও কোনো কাজে যেতে হলে সিটি ব্যাঙ্ক আশা করে আমি তৎক্ষণাৎ যাবো যেমন অন্যেরা যায়। কিন্তু আমার যেতে যে দু'দিন দেরি হবে প্রভু, ভিসা লাগবে! বস বলতেই পারেন তার জন্যে কি ব্যবসা আটকে থাকবে? এ কাজটা তো তাঁরা এমন কাউকে দিতে পারেন যে বলবে, হাজির হুঁ ! এমন কেউ যার পাসপোর্ট সর্বত্র গৃহীত হয়। আমি কোথাকার শের? নো ওয়ান ইজ ইনডিসপেন্সিবল। শারল দি গল বলেন নি, পৃথিবীর সকল কবরখানায় লক্ষ লক্ষ আঁদিসপনসাবলে মানুষ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন?


    সদাশয় নরওয়ের রাজা দেন এক বৎসরের অনুমতি

    সুইডেনের রাজা বলেন এক মাসেই কর্ম সারো

    ফিনিশ ভিসা এক সপ্তাহের

    জার্মান ভিসা পাই তিন মাসের, ফরাসি এক মাসের, বেনেলুক্স কেঁদে কেটে তিন মাসের। মুশকিল হলো আগেভাগে সব ভিসার ছাপ নিয়ে রাখা যায় না। প্রতিবার কারণ দেখাতে হয়, যদিও কারণ বদলায় না – লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধ, ঐ একটিমাত্র পদ একবার গাইতে হয়, দু বার পাঁচ বার দশ বার গাইতে হয়।

    রেবেকা উইলকিনসন আমাদের সেক্রেটারি ছিল, অতি অল্প বয়েসে মারা গেছে সম্প্রতি। সেই আমার ব্রিটিশ এয়ারলাইন্সের প্রথম লয়ালটি কার্ড (এক্সিকিউতিভ ক্লাব ) করিয়ে দেয় – যতই করিবে ভ্রমণ, ততই পাইবে মুফত টিকেট! সে কার্ড কালক্রমে নীল (ব্রোঞ্জ ) থেকে সাদা (সিলভার) হয়ে শেষ অবধি সোনালি বর্ণ ধারণ করে। বর্তমানে সেই কার্ডের আয়ু আমার জীবৎকাল (লাইফ টাইম গোল্ড) অবধি সীমায়িত। রেবেকা হিসেব রাখত আমাদের গতিবিধির; কি ভাগ্যে মোবাইল ফোন ছিল না, একবার আকাশে উড়ে গেলে কোথায় কখন আছি তার হদিস রাখা অসম্ভব। তবে ১৯৯০ সালের শেষে ক্রিসমাস রিসেপশানে সে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করে সে বছরে কুল মিলিয়ে আমি ৮৯টি হাওয়াই যাত্রা করেছি এবং সংশয় প্রকাশ করে আমি হয়তো সে বছর ততবার লন্ডন আন্ডারগ্রাউনডে চড়ি নি! আমাদের জান মালের মালিক হ্যারব মায়ারস একটু বাঁকা চোখে তাকালেন – ঘুরেছো বাপু খুব, রেভেনিউ কত আনলে? তাঁকে কে বোঝাবে অন্যেরা ঘোরে বিজনেসের ধান্দায়, আমার প্রাথমিক ঘোরাঘুরি ভিসার দরবার করতে।


    এক শুভানুধ্যায়ী ব্রিটিশ সহকর্মী বললেন সাত বছর এ দেশে আছেন, ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিচ্ছেন না কেন ?

    জাতীয়তাবাদ জেগে উঠলো। তাঁকে জানালাম আমার দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিলে আমার নীল বই ফেরত দিতে হবে সিটি ব্যাঙ্ক হাউসের লাগোয়া ইন্ডিয়া হাউসে, তারপর আমার জন্মভূমিতে যেতে হলে সেই ইন্ডিয়া হাউসে ভিসার দরখাস্ত করাটা বাধ্যতামূলক। তিনি এটা জানতেন না। বললেন পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিকরা তো দুটো পাসপোর্ট রাখতে পারেন?



    অলউইচে ভারতীয় হাইকমিশন, এর ডাইনে ৩৩৬ স্ট্র্যান্ডে সিটিব্যাঙ্কের অফিস

    সেটা কেন?

    একটা থিওরি শুনেছিলাম কোন ভারতীয় কূটনীতিকের কাছে- ভারত দ্বৈত নাগরিকত্ব দিলে চোদ্দই আগস্ট ১৯৪৭ অবধি যারা অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্মেছেন কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিক তাঁদের অটোমেটিক অধিকার থাকে ভারতীয় পাসপোর্ট পাবার। এর সত্যি মিথ্যে জানি না তবে জানি ভারতীয়দের অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়াটা আইনসম্মত নয়।

    জার্মানিতে থাকার সময়ে এ নিয়ে ভাবিনি, তখন আমার বিদেশ ভ্রমণ সীমিত ছিল। উঠল বাই তো বড়জোর কলোন যাই, কোপেনহাগেন নয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে কলোন যেতে ট্রেনের টিকেট লাগে, ভিসা নয়। যখনই আমাদের দেশের লোকজনের সঙ্গে নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা হতো জুবিন মেহতার উল্লেখ করতাম। তখন প্রায় ষাট বছর বয়েস (এখন ছিয়াশি), পাকাপাকি আমেরিকার বাসিন্দা; নীল পাসপোর্ট নিয়ে দুনিয়া দাপিয়ে অর্কেস্ট্রা কনডাকট করে বেড়াচ্ছেন।

    একজন উত্তর দিলেন, জুবিন মেহতা স্বাধীন পেশার মানুষ, তাঁকে চাকরির দায়ে দাসখত লিখে দিতে হয় নি!

    শ্যাম রাখি না কুল রাখি ? একটি স্ত্রী, দুটি সন্তান একটি মর্টগেজ।

    এইরূপ বিবিধ চিন্তার মধ্যে একদিন চেয়ারিং ক্রস স্টেশনে নেমে ভূগর্ভ পথ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। সেই আধো অন্ধকার গলির দু পাশে কিছু দোকান ছিল সে আমলে, এখন আর নেই। চোখে পড়ল একটি সাইনবোর্ড তাতে লেখা ‘ ভিসা /পাসপোর্ট সেন্টার ‘ - এমন দোকান আগে দেখি নি। ঢুকে একটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাবার ব্যবস্থা করেন ?

    মেয়েটির নাম ডেবি ( ডেবোরা)। সে বললে, হ্যাঁ করি। আমার চারটে প্রশ্ন আছে এগুলোর উত্তর যদি সন্তোষজনক হয় আমি আপনার পাসপোর্ট করিয়ে দেব। প্রশ্নপত্র অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত -কবে এদেশে ঢুকেছেন, কি কাজ কতদিন যাবত করছেন, কর্মদাতার নাম ঠিকানা, স্ত্রীর নাগরিকত্ব।

    - কতদিন লাগে আর খরচা কতো ?
    - তিন সপ্তাহ ম্যাক্সিমাম, সরকারের ফি আশি পাউনড, আমাদের একশ দশ, একজন রেফারি চাই যার ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে এবং আপনাকে অন্তত পাঁচ বছর যাবত চেনেন।
    - আমি নিয়মিত কাজে কর্মে বিদেশে যাই, তিন সপ্তাহের জন্যে পাসপোর্ট জমা রাখতে পারব না।
    - চেষ্টা করব তার আগে কাজটা শেষ করতে।

    অফিসে জানালাম সামনের কিছুদিন দেশত্যাগী হতে পারব না।

    আমার রেফারি আর কে হতে পারেন ? অগ্রজ প্রতিম ভাস্করদা! হ্যারোর তেরো নম্বর ফেরিং ক্লোজের অধিবাসী ভাস্কর দত্ত যার বৈঠকখানায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।

    সে আমলে ইন্টারনেট নেই, সমস্ত সরকারি কাজ হয় চিঠি ও ফ্যাক্সের মাধ্যমে। আজকাল ব্রিটিশ নাগরিকতা অর্জন করতে হলে একটি লিখিত পরীক্ষা পাস করা আবশ্যিক। তারপরে কোন অনুমোদিত উকিলের সামনে বসে রাজার প্রতি আনুগত্যের শপথ ( ওথ অফ অ্যালিজিয়েন্স) নিতে হয় । সে সময়ে ওসব কিছুই লাগত না।

    বত্রিশ বছর কেটে গেছে আজও মনে রেখেছি ডেবি নামের সেই মেয়েটিকে – কি অসম্ভব ক্ষিপ্রতার সঙ্গে যে সে কাজটি সম্পন্ন করেছিল ! তিন সপ্তাহ পুরো হবার আগেই রেজিস্টার্ড পোস্টে বুরগুনডি বর্ণের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মার্কা / ব্রিটিশ পাসপোর্ট হাজির হলো, তার সঙ্গে আমার শেষ ভারতীয় পাসপোর্ট। দুটি পাসপোর্ট রাখার অধিকার আমার নেই ; নীল বইটি ফিরিয়ে দিতে হবে ভারতীয় দূতাবাসে।


    বুরগুনডি বর্ণের পরিচয় পত্র

    সিটি ব্যাঙ্কের ঠিকানা ৩৩৬ স্ট্র্যানড, ভারতীয় হাই কমিশনের ঠিকানা (সার হারবারট বেকারের ডিজাইন করা ১৯৩০ সালের বাড়ি ) ইন্ডিয়া হাউস, অলডউইচ- তার পরের দুটো বাড়ি যথাক্রমে বি বি সি বুশ হাউস এবং অস্ট্রেলিয়া হাউস। দুটো রাস্তার নাম আলাদা কিন্তু সিটি ব্যাঙ্ক ও ইন্ডিয়া হাউস পাশাপাশি, আমাদের জানলা থেকে ইন্ডিয়া হাউসের ভিসা প্রত্যাশীদের লাইন দেখা যায়, যেখানে ভবিষ্যতে আমাকেও দাঁড়াতে হবে।

    আপন করে নয়, নিতান্ত কাপুরুষের মতন আমাদের পাশের বাড়িতে আমার শেষ ভারতীয় পাসপোর্ট ডাকযোগে ফেরত পাঠাই। *



    শেষ নীল বই

    ইতিমধ্যে পূবের দুয়োর উন্মুক্ত।

    সিটি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ খুলেছে ওয়ারশ, প্রাগ, ব্রাতিস্লাভা, মস্কো, বুদাপেস্টে। আমাদের সহকর্মীদের লন্ডন অফিসে আসতে ভিসা লাগে! ব্যাঙ্কের কাজে ভিসা পেতে গেলে সে দেশের ব্রিটিশ এমবাসিতে সতেরোটা এবং হিথরো এয়ারপোর্টে বাড়তি চৌত্রিশটা প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। সিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে কাজ আছে জানালেই ভিসা মেলে না। কি কাজ ? সত্যি কাজ না নিছক বেড়াতে যাবেন ? চাকরি নিয়ে থেকে যাবেন নাকি ? সিটি ব্যাঙ্ক কি চিঠি দিয়েছে - আচ্ছা, আসুন না একবার ইংল্যান্ডে এই লিখেছে বুঝি ? তা লিখলে হবে না। আমন্ত্রক, আপনার হোস্টকে জানাতে হবে তিনি যে কেবল ইচ্ছুক শুধু তাই নয়, আপনার দেখভাল ও যাবতীয় খরচা পাতির দায়িত্ব বহন করার সামর্থ্যও রাখেন। অর্থাৎ আপনার হোস্ট কি কর্ম করেন, তাঁর আয় কতো সেগুলো যেন চিঠিতে লিখে দেন !

    মুশকিল হলো এই যে আমেরিকান সিটি ব্যাঙ্ক কোন ধর্মশালা নয় ; আমাদের ট্রেড ফাইনান্স বিষয়ে আলোচনা /সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য অমুক দিন থেকে অমুক দিন অবধি লন্ডনে আপনার উপস্থিতি প্রার্থনীয়, তাঁদের হোটেল খরচা ব্যাঙ্ক বহন করবে, বিভাগীয় প্রধান এটুকু লিখতে সম্মত। কিন্তু অতিথির যাবতীয় ব্যয় ভার বহন করার অঙ্গীকার দিতে ব্যাঙ্ক অপারগ - তিনি যদি কোথাও কোন বেমক্কা খরচা করে ফেলেন তার ঝক্কি সিটি ব্যাঙ্ক নেবে কেন ? যে সব দেশ থেকে এঁরা আসবেন -পোল্যান্ড চেক হাঙ্গেরি ইত্যাদি- তাদের মুদ্রা সর্বত্র গৃহীত হয় না, নন কনভারটিবল কারেনসি ! লন্ডনে চা খেয়ে তারা টেবিলে দশ ফোরিন্ত রেখে দিয়ে বিদায় নিতে পারেন না। ক্রেডিট কার্ড দূর অস্ত।

    ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাবার পরে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রোমানিয়ার দাখিলা পাওয়ার আগে অবধি এই একই সমস্যা ছিল আমাদের পরিবারে ! শ্বশুর শাশুড়িকে আমাদের গৃহে আমন্ত্রণ জানাতে হতো আমার চাকরির পজিশন, কতদিন কর্মরত, বেতনের পরিমাণ, আমার বাসস্থানটি ভাড়ার না কেনা, কটি বেডরুম তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে। তাঁদের দু জনের বয়েস ষাটের ঊর্ধ্বে, অবসর প্রাপ্ত, ইংরেজি জানেন না - কাজের সন্ধানে নিশ্চয় এ দেশে আসছেন না ! কন্যা ও জামাতা তাঁদের স্বল্পকালের জন্য ভরণ পোষণে সমর্থ তার লিখিত প্রমাণ দিতে হয়েছে বছর দশেক !

    আজ যখন শুনি ভিসা দেওয়ার আগে কলকাতার ব্রিটিশ কনসুলেট এমনি ধারা সামর্থ্যের প্রমাণ খোঁজেন আপনার হোস্টের কাছে, অবাক হই না ! এই একই ভাবে আমি এবং আমার লন্ডনের একাধিক সহযোগী এককালে আমাদের পূর্ব ইউরোপীয় কিছু সহকর্মীকে ভিসা পেতে সাহায্য করেছি, তাঁদের দেশের ব্রিটিশ এমবাসিকে ব্ল্যাংক চেক লিখে দিয়ে !

    যে ভিসার বিড়ম্বনায় আমরা ভুগেছি এককালে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়া মাত্র তা থেকে মুক্তি পেলেন পূর্ব ইউরোপের কুড়িটি দেশ। আজ সেই সব দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ, শেঙ্গেন ক্লাবের মেম্বার ! পাসপোর্ট নয়, কেবল মাত্র আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে তাঁরা ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেন বিনা বাধায়, জল স্থল বা উড়োপথে।

    গত সপ্তাহে আমরা ক্লুজ /নাপোকা (ট্রানসিলভানিয়া) গেলাম পোলিশ এয়ারলাইন্সে। ওয়ারশ এয়ারপোর্টে স্ত্রী কন্যা অন্য গেটে ( তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রোমানিয়ান ও ব্রিটিশ), আমি আরেক গেটে। ক্লুজ /নাপোকাতে পাসপোর্ট চেকিং নেই-আমরা এক শেঙ্গেন দেশ থেকে আরেক শেঙ্গেন মুলুকে এসেছি।

    আমাদের পরিবারে পাশা উলটে গেছে। রোদিকা ও মায়া সাতাশটি দেশে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পারে, পাসপোর্টে কোন ছাপ পড়ে না। আমার নবীনতম পাসপোর্ট অজস্র মোহরের জালে আকীর্ণ ।

    ব্রেকসিটের পরে ব্রিটেনের নাগরিক সেই অন্ধকার অতীতে ফিরে গিয়ে পেয়েছে, কপালে মিলছে সেই কটু দাওয়াই যেটি দিয়ে ব্রিটেন একদিন আমাদের উৎপাত করেছিল। শিগগির ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেন তিন মাসের দ্বিপাক্ষিক ভিসা চালু করবে, খরচা কতো দিতে হবে আমরা এখনও জানি না। তবে সেখানে চাকরির প্রমাণ, টেলিফোনের বিল সাবমিট করতে হবে না এই যা রক্ষে।

    ইউরোপীয় ইউনিয়নের অঙ্গন তাদের পরিবার পরিজনের জন্য খোলা – সেই উঠোন তাঁদের একান্ত নিজস্ব।

    এবার ইউরোপের সংগ্রাম বহিরাগতদের ঠেকানোর সংগ্রাম।


    হালকা নীল, আধখানা নাগরিক

    *২০০২ সাল নাগাদ ভারত সরকার পি আই ও ( পারসন অফ ইন্ডিয়ান অরিজিন ) স্কিম চালু করেন যেটি এখন ও সি আই তে ( ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া, ২০০৫ ) উন্নীত হয়েছে। আমাদের মতন দেশত্যাগীদের জন্যে এটি অসম্ভব মূল্যবান – দেশে ভোটে দাঁড়ানো বা ভোট দেওয়া বাদে কাজ করার সহ যে কোন ভারতীয় নাগরিকের প্রাপ্য বহু অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। আমার এবং পরিবারের ব্রিটিশ, আমেরিকান, রোমানিয়ান পাসপোর্টধারীদের ভারতে যেতে আজীবন কোন ভিসা লাগবে না।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০২৪ | ৭৫৫ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নো  - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন