
বর্তমানে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটা দুটো আলাদা অর্থে ব্যবহার করা হয়। ‘লৌহ যবনিকা’র[১] পশ্চিমে এর মানে করা হয় – প্রাপ্তবয়স্ক সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতেই চূড়ান্ত ক্ষমতা। পূর্বদিকে এর অর্থ – নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে ঘোষণা করা বিশেষ একদল অল্পসংখ্যক মানুষের স্বৈরতন্ত্র। শুধুই ভাষাগত বিচার করলে একই শব্দের এই দু-রকম মানে হয়তো খুবই চিত্তাকর্ষক, কিন্তু দুঃখের কথা – এই অর্থদুটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উত্তেজনা জগতকে আরেকটি বিরাট যুদ্ধের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শব্দের আলাদা মানে হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেসব ইতালীয় আমায় ভদ্রভাবে সম্বোধন করেন, তাঁরা ডাকেন “The Egregious Sir Russell”, ইংরেজ কানে যা একটু বেশিই ঠিক বলে মনে হয় [২] । একসময় ‘orgy’ আর ‘theory’ শব্দদুটির অর্থ একই ছিল – ‘দৈব নেশা/ঘোর/ভর’; ভাখোস যখন প্রধান দেবতা ছিলেন, তখন এর সঙ্গে পাতি নেশার তেমন তফাৎ করা হত না। ভাগ্য ভালো, এইসব অদ্ভুতুড়ে ভাষার গোলমালগুলির কারণে সশস্ত্র যুদ্ধ বাধেনি।
এটুকু বলতেই হবে – ‘গণতন্ত্র’ শব্দটিকে রাশিয়া যে অর্থে বর্তমানে ব্যবহার করছে, তার সঙ্গে শব্দটির আগের সমস্ত ব্যবহারের তফাৎ বিরাট, আর এই ব্যবহার কেবল ইয়ল্টা আর পটসড্যামের প্রস্তাবগুলি পালন না করতে পারার ব্যর্থতাকে ঢাকার এক চেষ্টামাত্র [৩]। তথাকথিত ‘স্যাটেলাইট রাষ্ট্র;গুলিতে গণতান্ত্রিক সরকার স্থাপনের কথা হয়েছিল, কিন্তু রাশিয়া ঠিক করে – এগুলিতে স্বৈরতন্ত্র চালু করে তাকে ‘গণতন্ত্র’ নাম দেবে। দুঃখের ব্যাপার, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির সমর্থনে এই অতি সহজ কায়দাটি শেষপর্যন্ত সফল হয়।
তবে এ কথা স্বীকার করে নেয়া উচিত – পশ্চিমে যাকে ‘গণতন্ত্র’ বলা হয়, সেটাও আসলে শব্দটার অর্থ ছিল না।
গণতন্ত্র শব্দটি আর তা যা বোঝায় – দুইই তৈরি করেছিল গ্রিকরা। যদ্দূর জানা যায়, তাদের আগে কেউই এ জিনিসের কথা ভেবে ওঠেনি [৪]। রাজতন্ত্র ছিল, অভিজাততন্ত্রও ছিল, কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা কখনো কেউ ভাবেনি, যেখানে সরকারের নীতি-নির্ধারণে প্রতিটি নাগরিকের বক্তব্য থাকবে। তবে গ্রিকদের বানানো সবচেয়ে কড়া গণতন্ত্র কিন্তু কিছুক্ষেত্রে সীমিত ছিল – সরকার গঠনে নারী ও ক্রীতদাসদের কোনো অংশ ছিল না। প্লেটোর মনে হয়েছিল – মেয়েদের প্রতিনিধিত্ব না থাকাটা অন্যায়, কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর বিশেষ সমর্থক ছিল না।
প্রাচীন গ্রিসের যেসবখানে গণতন্ত্র টিকেছিল, সেসব জায়গায়, সরকারে ব্যক্তির ক্ষমতা, যে কোনো আধুনিক গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি ছিল। ব্যক্তি চাইলে প্রতিটি প্রস্তাবিত আইনে ভোট দিতে পারতো, নাগরিকদের মধ্যে থেকেই বিচারকদের বাছা হত, আর জনমতের পথে প্রতিবন্ধক হওয়ার উপযুক্ত কোনো শক্তিশালী আমলাতন্ত্র ছিল না। নেহাত নগর-রাষ্ট্র বলেই এমন ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পেরেছিল, কারণ এতে ধরে নেওয়া যেত – যে কোনো নাগরিক চাইলে প্রতিটি বিষয়ে এক জায়গায় একত্রিত হয়ে ভোট দিতে পারবে। এ জিনিস আধুনিক সমাজে সম্ভব না।
এই ব্যবস্থা যে খুব সফল হয়েছিল, এমনটা বলা যায় না। রাজতন্ত্রের প্রতিবাদে গড়ে ওঠে অভিজাততন্ত্র, আর সেই অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে তৈরি হয় গণতন্ত্র। অধিকাংশ গ্রিক নগর-রাষ্ট্রে অভিজাততন্ত্রকে সরিয়ে গণতন্ত্রের উদ্ভব হলেও, যেন প্রায় নিয়ম করে সে একসময় স্বৈরতন্ত্রকে জায়গা করে দেয়। গ্রিকদের বোধ অনুযায়ী একজন স্বৈরাচারী মানে কিন্তু খারাপ শাসক নয়; নেহাতই এক সাধারণ ব্যক্তি, যে জোর খাটিয়ে বা জনতার পছন্দে রাজার ক্ষমতা পেয়েছে – জন্মসূত্রে নয়। সাধারণত এই লোকটি অভিজাত ও ধনীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকে জনতার চোখের মণি করে তুলতো, তারপর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেলে ঘোষণা করতো – তার শত্রুরা তাকে হত্যা করার চক্রান্ত করছে, আর প্রাণে বাঁচতে তার কিছু রক্ষীবাহিনী দরকার। একবার সেই বাহিনী পেয়ে গেলে তারপর শুধু সেই বাহিনীর আনুগত্য নিশ্চিত করাটুকুই তার কাজ, জনগণের কথা আর কেউ মনে রাখতো না।
এই ধরনের সমস্যা থেকে গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার কোনো পদ্ধতি গ্রিকরা আবিষ্কার করতে পারেনি। গণতন্ত্র তাও টিকেছিল আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট-এর সময়াবধি, যিনি পারস্য অভিযানের আগে গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলিকে চুক্তিবদ্ধ করে গণতন্ত্রবাদীদের দমন করতে বাধ্য করেছিলেন।
একটু বড় পরিসরে রোমও ঠিক এই গ্রিক অভিজ্ঞতাটির পুনরাভিনয় করে। অভিজাত ও জনসাধারণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঝামেলা চলে। জুলিয়াস সিজ়ার গণতন্ত্রের নায়ক হিসেবে ক্ষমতা অর্জন করেন, আর একটু থিতু হয়েই সেই গণতন্ত্রটিকেই তিনি শিকেয় তোলেন। তাঁর পরে বহুযুগের জন্যে গণতন্ত্র পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যায়। একাদশ শতকে লম্বার্ডিতে শুরু হওয়া বাণিজ্যিক উন্নতির সঙ্গে খুব ধীরগতিতে ক্রমশ আবার গণতন্ত্র মাথা তুলেছিল আর উত্তরের দিকে হান্সে নগরগুলির মতো বাণিজ্যের পীঠস্থানগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে [৫]।
আধুনিক উদারপন্থা শুরু হয় মিলান শহরে, আর্চবিশপ আর সম্রাটের সঙ্গে শহরের গোলমালের সময়। খুবই সীমিত পরিসরের গণতন্ত্র ছিল এটি – মূলত সামন্তপ্রভু ও খ্রিস্টীয় মিশনের কর্তাব্যক্তিদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেই এর শুরু আর শেষ। তবে, চিন্তার স্বাধীনতা আর রাজনৈতিক জল্পনার পুনরুত্থানে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এ কথা ঠিক – এই গণতন্ত্রগুলি কোনোটিই বেশিদিন টেকেনি। ভেনিসে এর জায়গা নেয় বনেদিয়ানা, মিলান ও ফ্লোরেন্সে ধনতন্ত্র। তবে এসব লোক ঠিক কতটা ঘৃণ্য কাজ করে পার পেতে পারে, তার সর্বদাই একটা সীমা নির্দিষ্ট ছিল, কারণ ক্ষমতার প্রতি এদের কোনো ঐতিহ্যগত দাবি ছিল না – খুব খারাপ ব্যবহার করলে সোজা নির্বাসনে পাঠানো হত।
ইতোমধ্যে, আল্পসের উত্তরে বেশ কিছু দেশে এক নতুন প্রতিষ্ঠানের শুরু হয় – প্রতিনিধিদের সরকার। আমাদের কাছে হয়তো গণতন্ত্রের এ এক আবশ্যিক অংশ, কিন্তু পুরাকালের লোকজন কখনোই এর কথা ভাবেনি, আর মধ্যযুগে—এর ঊষাকালে—এ ব্যবস্থা খুব একটা গণতান্ত্রিকও ছিল না। এর বিরাট গুণ ছিল – এক বৃহৎ নির্বাচনী কেন্দ্র এর মারফৎ পরোক্ষভাবে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে পারতো, আর সে কারণে বৃহদাকার আধুনিক রাষ্ট্রের ভিতরের অঞ্চলগুলির মধ্যে রাজনৈতিক দায়িত্ব বাটোয়ারা করা সম্ভব হয়েছিল, যে বাটোয়ারা কিনা অতীতে কেবল নগররাষ্ট্রের ভিতরেই করা যেত।
আমাদের কাছে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার আর গণতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ মনে হলেও, এমন যে হতেই হবে – তার কোনো কারণ নেই, কেননা, নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ করে রাখা সম্ভব। আমাদের স্কটিশ বেরাদরেরা হাউস অব লর্ডসে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠান, কিন্তু তাকে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না। কিন্তু, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ছাড়া এমন কোনো প্রক্রিয়া খুঁজে বের করা প্রায় কার্যত অসম্ভব, যার ফলে ভৌগোলিকভাবে আয়তনে বড় কোনো রাষ্ট্রের কোনো সাধারণ নাগরিক সরকারি নীতি নির্ধারণে অংশ নিতে পারেন।
প্রতিনিধিদের রাজত্ব গণতন্ত্রের জন্যে কিছু এমন বিপদ নিয়ে আসে, প্রাচীনকালের স্বৈরতন্ত্রের বিপদগুলির থেকে যার ধরন আলাদা। এমন হতেই পারে – নিজেদের অস্তিত্ব যে সংখ্যাগুরু জনমতের দান, সে কথা ভুলে প্রতিনিধিদের বিধানসভা নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতা ঘোষণা করলো। প্রথম চার্লসের সঙ্গে লড়াইয়ে ‘দীর্ঘমেয়াদি পার্লামেন্ট’ প্রথমেই আইন জারি করে – পার্লামেন্টের নিজের অনুমতি ছাড়া তাকে ভেঙে দেওয়া যাবে না [৬]। অতএব, যারা তাদের নির্বাচিত করে ক্ষমতায় এনেছে, তাদের সমর্থন সম্পূর্ণ হারানোর পরেও এই লোকসভা সংবিধান মেনেই অনির্দিষ্টকালের জন্যে টিকে থাকতে পারতো। ক্রমওয়েল যে অসাংবিধানিক কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, এটা তার একটা কারণ – সংবিধান মেনে কোনোভাবেই তাঁর পক্ষে এই দীর্ঘমেয়াদি লোকসভা উৎখাত করা সম্ভব ছিল না।
নিজেকে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে প্রকাশ করা রুশো মনে করেন – শব্দটির যে প্রাচীন অর্থে প্রতিটি নাগরিক প্রতিটি আইন প্রণয়নে ভোট দিতে পারে, কেবল সেই ক্ষেত্রেই শব্দটিকে প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত। ক্ষমতা যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের হাতে, রুশো তাকে বলছেন, “নির্বাচিত অভিজাততন্ত্র”। প্রাচীন অর্থে গণতন্ত্র যে ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের মতো দেশে প্রয়োগ করা অসম্ভব – সেই সহজ কথাটা রুশোও স্বীকার করছেন। তিনি বলছেন, তাঁর নিজের শহর জেনিভা-র বাইরে, এইরকম এক প্রতিষ্ঠান আমাদের খুঁতে ভরা পৃথিবীতে প্রয়োগ করার পক্ষে যেন একটু বেশিই নিখুঁত। যেরকম সরকারকে তাঁর ভালো বলে মনে হয়, তেমনটি শুধু জেনিভাতেই নাকি প্রয়োগ করা সম্ভব। এ কথা মাথায় রাখলে, ভাবতে আশ্চর্য লাগে – তাঁর বইগুলি এত আলোড়ন তৈরি করলো কী করে?
আধুনিক অর্থে গণতন্ত্রের তত্ত্ব রুশোর উদ্ভাবন নয়, সে জিনিস তৈরি হয়েছিল ক্রমওয়েলের সৈন্যবাহিনীতে। এরা স্বদেশে ব্যর্থ হলেও, অতলান্তিকের ওপারে নিজেদের মতবাদ বহন করে নিয়ে যায়, আর কিছুদিন সুপ্ত থাকার পর অবশেষে জন্ম দেয় মার্কিন গণতন্ত্রের। আমেরিকার সাফল্যই ফ্রান্সে গণতন্ত্রের প্রসারের পিছনে মূলত দায়ী, আর একটু পরোক্ষভাবে ইংল্যান্ডেও।
কোনো গণতন্ত্রের চরিত্র নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – ঠিক কোন শক্তিগুলিকে সে নিজের শত্রু বলে মনে করে। মার্কিন গণতন্ত্র প্রথমে প্রধানত ইংল্যান্ডের বিরোধিতাই করতো। ১৭৮৯ সালে ফরাসী গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু ছিল বড় জায়গীরদাররা। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্দ্ধে ইংরেজ গণতন্ত্র মধ্যবিত্তের হাতে ক্ষমতা জড়ো করতে ব্যস্ত ছিল কিন্তু তারপর, বেতনভোগীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে, আর সে সময় বড় সংস্থার মালিকদের শত্রু বলে মনে করতো।
অ্যান্ড্রু জ্যাকসন যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, মার্কিন গণতন্ত্র তখন এক বড়সড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। তাঁর আগে অবধি প্রেসিডেন্ট হতেন পরিশীলিত ও কৃষ্টিসম্পন্ন ভদ্দরলোকেরা, যাঁদের অধিকাংশই সমাজে জমিমালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে থাকতেন। অভিবাসী ও অগ্রণী (pioneer)-দের পক্ষ নিয়ে অ্যান্ড্রু জ্যাকসন এই ভদ্রলোকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। সংস্কৃতি ব্যাপারটা ওঁর পোষাত না, আর শিক্ষিত লোকজন যা বোঝে, তা তাঁকে ধাঁধায় ফেলতো বলে তিনি শিক্ষিতদেরও সন্দেহের চোখে দেখতেন। সংস্কৃতির প্রতি এই বিরূপতা সেই তখন থেকেই মার্কিন গণতন্ত্রে বিদ্যমান, আর তার ফলে নিজভূমের বিশেষজ্ঞদের পূর্ণ ব্যবহার করতে আমেরিকাকে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়।
বর্তমানে এই গোলমাল বেশ বড় আকার নিয়েছে, কিন্তু তা থেকে এ কথা বলা যায় না, যে, সংস্কৃতির প্রতি এই বিরূপতা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ। ইংল্যান্ডে কিন্তু এ জিনিস কখনো ছিল না, আর—ফরাসী বিপ্লবের ভয়ঙ্করতম দিনগুলি বাদে—ফ্রান্সেও মোটামুটি অনুপস্থিত। প্রথমদিকে আধুনিক রাশিয়ায় সংস্কৃতি-বিরোধিতার বড়সড় প্রভাব ছিল, আর মনে হয়, নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে ভুল বোঝানোর সময় সোভিয়েত সরকার এটিকে একটা অজুহাত হিসেবে খাড়া করে।
প্রতিটি আধুনিক গণতন্ত্রকে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তার একটি হল – বিশেষজ্ঞদের সঠিক ব্যবহার করা। অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক বিষয় থাকে, যা সাধারণ জনতার পক্ষে বোঝা অসম্ভব। এসবের মধ্যে যে অর্থনীতি একটি, তা সহজেই বোঝা যায়। জ্যাকসন ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’-কে উঠিয়ে দেন, যার মোদ্দা কারণ ছিল তিনি ব্যাংকিং ব্যাপারটা বিশেষ বুঝতেন না। সমস্যাটা হল – যখন বিশেষজ্ঞের মতামত দরকার, তখন তা যেন লুকিয়ে মুষ্টিমেয় লোকের প্রস্তাবের সমর্থনে না হয়ে, জনপ্রিয় প্রস্তাবের পক্ষে যায় – তা নিশ্চিত করা দরকার। এর একটা ভালো উদাহরণ হল ইংল্যান্ডের ট্রেড ইউনিয়ন আইনের প্রস্তাব। ১৮৬৭ সালে শহুরে খেটে খাওয়া মানুষেরা ভোটটা জোগাড় করেছিল, আর তারপর থেকে, ট্রেড ইউনিয়নের লোকজনের স্বার্থ যে লঙ্ঘিত হচ্ছে না – সে কথা তাদের বোঝানো অবশ্য-প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারংবার এমন হয়েছে, যে, আপাতদৃষ্টিতে কোনো আইনকে দেখে মনে হয়েছে তা ট্রেড ইউনিয়নের স্বার্থ সুরক্ষিত করে, অথচ হাউস অব লর্ডস তার বিচারকের ভূমিকায় বসে দেখেছে – আইনটিকে যা মনে করা হয়েছিল, তা আসলে নয়। এর ফলে কিছু সময় নষ্ট হয়েছে শুধু, কারণ আইনের সংশোধনকে পাশ করাতে শ্রমজীবীদের ভোট সংখ্যায় যথেষ্ট। কিন্তু এর থেকে বোঝা যায় – জনমতকে দাবিয়ে রাখার ক্ষমতা আইন-বিশেষজ্ঞদের ঠিক কতখানি।
জ্যাকসনের সময়ের আমেরিকায় যখন মানুষ এই বিপদের আঁচ পেল, তারা ঠিক করে –যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচারকরা (federal judge) না হলেও, প্রদেশের বিচারকরা (state judge) যদি পদে বসতে চান, তবে তাঁদের নির্বাচিত হয়েই আসতে হবে। কিন্তু এই চিকিৎসাটি রোগটির চেয়েও ভয়ঙ্কর বলে প্রমাণিত হল। এর ফলে যে রাজনৈতিক প্রভু নিজের পছন্দের প্রার্থীদের নির্বাচনে জিতিয়ে পদে বসাতে পারলেন, তাঁর ক্ষমতা বাড়লো, আর নানা মামলায়—আইন মোতাবেক নয়—নিজের পছন্দমতো রায় পাবেন – এ ব্যাপারেও তিনি মোটের ওপর নিশ্চিত হতে পারলেন। সত্যি বলতে, এই রাজনৈতিক প্রভুটির অবস্থানের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের স্বৈরাচারীদের খুব একটা পার্থক্য থাকলো না। তবে, একটা খুব দরকারি পার্থক্য ছিল। যত অন্যায়ই হোক, সশস্ত্র বিপ্লব বা হত্যা না করেই, সম্পূর্ণ সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই তার শোধন করা সম্ভব ছিল।
লাতিন আমেরিকাও গণতন্ত্রের তত্ত্বকে আপন করেছে, কিন্তু সেখানে এ ব্যবস্থা এত সুচারুরূপে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি, আর তার ফলে গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপ থেকে অনেক স্বৈরাচারীই মাথা তুলেছে।
একটি বিষয়ে অধিকাংশ গণতন্ত্রই ব্যর্থ, আর তা হল পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ। পুলিশবাহিনী যদি দুর্নীতিবাজ ও নিঃসংকোচ হয় আর বিচারকেরা যদি তাদের অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করেন, তবে জনসাধারণ হঠাৎ আবিষ্কার করে – তাদের ভালোমন্দের কর্তা হয়ে বসেছে এক ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান, যাদের কেবল আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার আছে বলেই তারা দুর্দম ভক্ষক হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। আমার মতে অনেক দেশেই এই সমস্যাটা ভালো করে বিচার করে দেখা হয় না। ভালো ব্যাপার, ইংল্যান্ডে হয়, আর অধিকাংশ ইংরেজ, পুলিশকে নিজের বন্ধু বলে মনে করে। কিন্তু অনেক দেশেই পুলিশ, আতঙ্কের অন্য নাম – পুলিশ এমন এক ব্যক্তি, যে, নিজের অপছন্দের বা রাজনৈতিকভাবে পুলিশ-প্রশাসনের অপছন্দের যে কোনো ব্যক্তিকে যে কোনো মুহূর্তে ভয়ানক বিপদে ফেলতে পারে।
আজ যারা স্যাটেলাইট রাষ্ট্র, কম্যুনিস্টরা যখন তাদের দখল নিচ্ছিল, তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল পুলিশের দখল নেওয়া। একবার তা হয়ে গেলেই, ষড়যন্ত্র বা অন্য কোনো অপরাধে নিজেদের শত্রুদের দোষী সাব্যস্ত করে বাকি সকলকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে তোলা যায়।
b | 14.139.***.*** | ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৫739972