

অলংকরণ: রমিত
গণতন্ত্রের সঙ্গে যখন দলীয় রাজনীতি এসে মেলে (যেখানে গণতন্ত্রের জোর বেশি, সেই সবখানেই এ-ই হয়), তখন গণতন্ত্রের একটা সুবিধা বোধহয় বাকিগুলোর থেকে চোখে পড়ে অনেক বেশি; সেটা হল – দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা মনে করে সরকারে সব পাজির পা-ঝাড়ারা বসে রয়েছে। এ ধারণার ভিত অধিকাংশ সময়েই শক্তপোক্ত, কিন্তু প্রভাবশালী জনতার অধিকাংশকে এই ধারণায় বিশ্বাস করাতে কেবল গণতন্ত্রই পারে।
গণতন্ত্রের এক মৌলিক বিশেষত্ব হল – তথ্য-উপাত্তের সত্যতা নিয়ে যখন গোলমাল বাধে, তখন যে কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সত্য অনুসন্ধান করতে পারা উচিত, আর তাতে যেন বিশেষ বেগ পেতে না হয়। পশ্চিমে মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়েছে, যে, এই নিয়মটি আদতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দাবি করে। নেহাত পছন্দ নয় বলেই কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য চেপে দিতে পারে না।
কিন্তু, দরকারি হলেও, প্রেসের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়। ভয়ানক ভুল বক্তব্যগুলিকে দ্রুত বদলাতে পারার সুযোগ থাকা দরকার। এ কাজে মামলা-মোকদ্দমার পদ্ধতিটি একেবারেই বেমানান – কিছুটা, মামলার পদ্ধতিটি খুব ধীর বলে, কিছুটা, খুবই খরচসাপেক্ষ বলে, আর কিছুটা – কিছু ক্ষেত্রে মোকদ্দমার রাস্তাটা নেওয়াই যায় না বলে।
ধরা যাক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো এক দক্ষিণপন্থী রিপাবলিকান বলেছেন – বহু খ্যাতনামা ডেমোক্রাট নাকি ক্রেমলিনের (রাশিয়ার) অর্থসাহায্য নিয়ে তাদের পকেটে চলে গেছেন। যতক্ষণ না তিনি কোনো বিশেষ নাম নিচ্ছেন, ততক্ষণ কোর্ট-কাছারির প্রশ্নই ওঠে না। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার পক্ষে হানিকর – এমন যে কোনো বক্তব্য নিয়ে সরাসরি বিচারের জন্যে এক আলাদা বিচারকমণ্ডলী থাকা দরকার; আর যদি দেখা যায় অমন বক্তব্য ধোপেই টেকে না, তবে যে সংবাদমাধ্যম বক্তব্যটি ছেপেছে, এই বিচারের রায়টিকেও একই গুরুত্ব দিয়ে ছাপতে তাদের আইনত বাধ্য থাকা উচিত। এইটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ – তথ্যের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, ভুল তথ্য ঠিক করার স্বাধীনতাও ঠিক ততটাই।
সরকার-ভজনা হল মূর্তিপূজার আধুনিক রূপ, আর এর বিপদ সাঙ্ঘাতিক। এখনো পর্যন্ত এর সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক হিসেবে পাওয়া গেছে – দ্বিপাক্ষিক (two-party) ব্যবস্থা। আমি রুজ়ভেল্টের সময় আমেরিকায় থাকতাম। সেখানে যতজনের সঙ্গে মিশেছি, অধিকাংশের মতে লোকটি এক ভয়ঙ্কর উন্মাদ। আমি তাদের সঙ্গে একমত না হলেও, সরকারের মাথা-র সম্পর্কে লোকের এমন ধারণা – এ আমার খুবই স্বাস্থ্যকর এক অভ্যেস বলে মনে হয়েছিল।
স্বাধীনতা একমাত্র টিকতে পারে, যখন দুই পক্ষের প্রভাবশালী মানুষজনের মধ্যে একটা ঠিকঠাক কার্যকরী মতপার্থক্য থাকে। পশ্চিমে এই বিরোধ শুরু হয়েছিল সন্ত অ্যাম্ব্রোজ় (Ambrose)-এর সময়, চার্চ ও রাষ্ট্রের বিরোধের মধ্যে দিয়ে [১৬]। বর্তমানে, ইংল্যান্ডে এটি রক্ষণশীল ও সমাজবাদীদের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে আর ওদিকে, আমেরিকায়, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রাটদের বিভেদের মাধ্যমে টিকে আছে। প্রাশ্যা (Prussia)-র রাজকোষের বেতনভোগী স্তাবক হয়ে হেগেল যে ‘রাষ্ট্রই ঈশ্বরের পরিধেয়’ (State as the Garment of God) – এই তত্ত্ব কপচেছিলেন, গণতন্ত্র জোরদার হলে তেমন রাষ্ট্র-ভজনা মোটেই সম্ভব না [১৭]।
স্বাধীনতাকে সমর্থন করার সঙ্গে সরকার ঠিক কেমন ধরনের – তার কোন আপাত সম্পর্ক না থাকলেও, আমার মনে হয় – গণতন্ত্রে এই অনুভূতি যতটা তীব্রভাবে দেখা যায়, স্বৈরতন্ত্রে ততটা যায় না। এ কথা বিশ্বাস করি ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বহু আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলেই আমার মনে হয়।
এই ক্ষেত্রে সেই ঊনবিংশ শতক থেকেই আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এই পশ্চাদপসরণের কারণ হল ভয়, আর সেই ভয় অযৌক্তিক না হলেও, যে বিপদের ভয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করে তার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।
উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় কোন ধরনের বিদেশীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে – তা নির্ধারণ করে অশিক্ষিত পুলিশ, যাদের ধারণা – সব ইউরোপীয় বিজ্ঞানীই আসলে চর, আর তারা সুযোগ পেলেই বুদ্ধিমান আমেরিকানদের আবিষ্কার করা গোপন পারমাণবিক তথ্যগুলি বোকা রাশিয়ানগুলোর হাতে তুলে দেবে। ফলাফল? আমেরিকায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-সম্মেলনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর যে মার্কিন বিজ্ঞানীদের বিদেশভ্রমণ বারণ, তাঁরা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি না জেনে পিছিয়ে পড়ছেন। একজন মার্কিন নাগরিকের রাজনীতি যদি প্রতিক্রিয়াশীল না হয়, তবে তাকে নিউক্লীয় ফিজ়িক্সে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হয় না, আর এর ফলে, যদি পরের যুদ্ধটি হয়, তাতে মার্কিন কারিগরি দক্ষতা কমতে বাধ্য।
এইটে গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত আরও বিস্তৃত এক সমস্যার কথা তুলে ধরে। ঐতিহাসিকভাবে, গণতন্ত্র এক প্রবচনের ওপর নির্ভর করে – সব মানুষই সমান। কিন্তু এ প্রবচন সত্যি হলে, তাকে একটু সাবধানে বোঝা জরুরি। সব মানুষ মোটেই গাণিতিক পারদর্শিতায় নিউটনের বা সঙ্গীত-প্রতিভায় বেটোভেন-এর সমান নয়। ‘সব মানুষ সমান’ কথাটা আসলে বোঝায় – কোনো দুটি মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য না থাকাটাই সুবিচার। খুব জটিল কোনো বিষয়ে যে কোনো দুটি মানুষের মতামতের গুরুত্ব সমান – এমন বোঝালে, কথাটা আর সত্য নয়। অথচ, কথাটাকে এই পরের সম্পূর্ণ ভুল অর্থে ব্যবহার করলে, একজন সাধারণ ভোটারও নির্ণয় করতে পারে – বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কী থাকবে বা থাকবে না।
মার্কিন রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সরকারি রাজস্ব থেকে শিক্ষকদের বেতন হয়, আর সাধারণ করদাতা ভেবে বসে – যে যে বিষয় তার পছন্দ নয়, তা নিয়ে তার আপত্তি জানানোর অধিকার আছে। তার মাথায় ঢোকে না – যে লোক কোনো বিষয় অধ্যয়ন করতে সারাটা জীবন দিয়েছে, সে সম্ভবত ওই বিষয়ে, বিষয়টি নিয়ে কখনোই পড়াশুনো না করা লোকটির থেকে বেশি জানে। যখন এইরকম সব সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের অজুহাতে সংগত বলে মনে করা হয়, তখন সে গণতন্ত্র হাস্যকর।
গণতন্ত্র যে সর্বদা, সর্বত্র সেরা শাসনতন্ত্র – এমনটা আমি মনে করি না। আমি মনে করি না – সভ্যতা যাদের একটুও ছোঁয়নি, তেমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর সফল চালনা সম্ভব। যে জনগোষ্ঠীর এক অংশ, অপর অংশের প্রতি মৌলিক ঘৃণা পোষণ করে, সেখানেও গণতন্ত্র কাজ করতে পারে বলে আমি মনে করি না। গণতন্ত্রে জনতার সঙ্গে সরকারের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত যে দেওয়া-নেওয়া চলে – তা নিয়ে যে সব দেশের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই, সেখানে দুম করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে প্রতিটি আপোসকে যদি নীতি-র বিসর্জন বলে মনে করা হয়, তবে তাদের বিপরীতমুখী চাহিদাগুলির মধ্যবিন্দুকে কেন্দ্র করে দর কষাকষি অসম্ভব।
এই কারণেই, দুনিয়ার সব কোণে ঝটিতি গণতন্ত্র চালু করা উচিত নয় আমার মতে। তবে গণতন্ত্র-বিরোধীদের সুরে এতক্ষণ গাওয়ার পর, যেখানে এর প্রয়োগ সম্ভব – সেখানে গণতন্ত্রের পক্ষ নিয়ে আমায় জোর গলায় তার গুণগান গাইতেই হবে। তাই, এতক্ষণ যা বলেছি, এবার সংক্ষেপে তার পুনরাবৃত্তি করবো।
গণতন্ত্রের পক্ষে প্রথম ও সবচেয়ে জোরালো যুক্তি – মানুষের স্বার্থপরতা। একদল মানুষ যখন অন্য এক দলের ওপর কর্তৃত্বের অধিকার পায়, তখন তারা অধীনস্থ দলটির সঙ্গে প্রায় নিশ্চিতভাবেই অন্যায় আচরণ করে। সাদা চামড়ার মানুষ কালো চামড়ার মানুষদের সঙ্গে, অভিজাতরা চাষভুষোদের সঙ্গে, পুরুষ নারীর সঙ্গে – অন্যায়ই করেছে। খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে, অল্প সময়ের জন্যে ছাড়া এমন উদাহরণ পাওয়া যায় না – যেখানে ছড়ি ঘোরানো দলটি অন্য দলের সঙ্গে সহিষ্ণু, মানবিক আচরণ করে।
এ কথা অতীতের জন্যে যতটা সত্য – বর্তমানে তার চেয়ে বেশি না হলেও, কম নয়। স্তালিনের সরকার লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে কার্যত ক্রীতদাসদের অবস্থায় রেখেছিল, আর বিরোধিতার গুঞ্জনটুকু শুনতে পেলেও তাকে বজ্রকঠিন হাতে দমন করতো। হিটলারের কুকীর্তি এতটাই নারকীয়, যে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। আমার কাছে গণতন্ত্র দামী, কারণ যেখানে গণতন্ত্র চলে, সেখানে এমন নীচতা বিরল।
গণতন্ত্রের দ্বিতীয় বড় গুণ হল, এতে মতবিরোধের নিষ্পত্তি করার এক সম্ভাব্য রাস্তা পাওয়া যায়। গণতন্ত্র না থাকলে – জনগোষ্ঠীর কোনো বড় অংশ অসন্তুষ্ট হলে, বিদ্রোহ ছাড়া তাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না। অভিযোগের প্রতিকার করার এক আইনি রাস্তা বাতলায় গণতন্ত্র, আর আইনের প্রতি যেমন সম্ভ্রম তৈরি করতে পারে, তেমনটি কোনো স্বৈরতন্ত্রে সম্ভব না।
১৯৪৪ সালে হিটলারকে হত্যা করার ছকটির কথা ধরা যাক। জার্মানির কিছু সেরা ব্যক্তিত্ব এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে ছিলেন, আর তাঁদের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয়। ওই একই সময়ে, চার্চিলকে হত্যা করার জন্যে কেউ ছক কষছে – এমনটা ভাবাও যেত না। এমনটা যে অকল্পনীয় ছিল, তার কারণ – ইংল্যান্ডের গণতন্ত্র।
যদিও গণতন্ত্র স্বাধীনতার অস্তিত্ব নিশ্চিত করে না—যেমনটা আমরা আগেই দেখলাম, এ-ও ঠিক, যে, গণতন্ত্র না থাকলে স্বাধীনতা কখনোই নিরাপদ নয়। স্বৈরতন্ত্রের পাওয়া এমন স্বাধীনতাগুলি তখনকার একনায়কের তাৎক্ষণিক মেজাজের ওপর নির্ভর করে, আর রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে পারে। আইনই হোক বা সরকার – এদের বদলানোর এক স্বীকৃত, সুশৃঙ্খল পদ্ধতি না থাকলে স্বাধীনতা কখনোই নিরাপদ নয়।
স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের মধ্যে যদি আমায় বাছতে বললে, সে কাজ আমার পক্ষে খুব কঠিন, কারণ – স্বাধীনতা ছাড়া নৈতিক বা বৌদ্ধিক প্রগতির কথা ভাবাও অসম্ভব। সৌভাগ্যের কথা – এমন কোনো বাছাই আমাদের এখনই করতে হচ্ছে না।
এই মুহূর্তে, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতার জিম্মাদার হল পশ্চিমা দেশগুলি। দুটির কোনোটিতেই তারা কোনোভাবেই নিখুঁত না হলেও, বাকিদের থেকে ভালো; আর যে যেখানে সেরা, তাকেই আরো ধারালো করলে তবেই মানবজাতি এগোতে পারে।
মানবজাতির প্রগতির জন্যে কী কী বাঁচিয়ে রাখা দরকার – মনে হয় সে ব্যাপারে আমরা, পশ্চিমা দেশগুলি, যথেষ্ট খেয়াল রাখি না। শুধু গ্রিক-রোমান ঐতিহ্য বা খ্রিষ্টধর্মের প্রতি নয়, আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত – গত চার শতকে আমরা যা তৈরি করেছি তার প্রতি: কুসংস্কারের জায়গায় বিজ্ঞানকে নিয়ে আসা; সারা পৃথিবী জুড়ে দারিদ্র্য নির্মূল করার পদ্ধতি উদ্ভাবন; একসময় গোটা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করতো যেসব মহামারী, তাদেরকেও রোধ করতে পারে – এমন চিকিৎসাবিজ্ঞান; আর সর্বোপরি—যদিও নিখুঁতভাবে এখনো পারিনি—যাঁরা ধ্বংসের বদলে সৃষ্টির পক্ষ নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
মানবজাতির প্রগতি অতীতে যে ধীরগতিতে হত, তার এক বড় কারণ – যারা প্রগতির পক্ষে কথা বলতো, তারা শাস্তি পেত। আধুনিক পশ্চিমা দেশগুলিতে এ কথা আর আগের মতো সত্য নয়। আর গত চার শতকের প্রগতি যা হার, মানব-ইতিহাসে তা তুলনাহীন।
কোনো এক অজ্ঞতা-উপাসক স্বৈরাচারীর জন্যে এই প্রগতিকে রুদ্ধ করা কি উচিত? আমি মানি না। কিন্তু এমন ঘটার আশঙ্কাটি সত্য। বিপদ শুধু বা মূলত যুদ্ধে সামরিক পরাজয়ের নয়; বিপদ আধ্যাত্মিক পরাজয়ের। ভয়টা এই, যে, জীবন-মরণ বাজি রাখা যুদ্ধে, মানুষ জয়-পরাজয় ছাড়া আর সবই ভুলে যাবে।
ঠিক এই কারণেই, পশ্চিমে যদি আজ যুদ্ধ বাধে, যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে হবে – যুদ্ধ সফল হোক বা না হোক (হাইড্রোজেন বোমার আবিষ্কারের পর আর ‘সফল’ যুদ্ধ বলে কিছু নেই), ভয়ানক ক্ষয়ক্ষতি তো হবেই, বাকি মানবজাতির থেকে পশ্চিম যে ক-টি বিষয়ে এগিয়ে, সেগুলিও থমকে যাবে। হয়তো যথেষ্ট ধৈর্য ধরলে একটা সময় আসবে, যখন লৌহ-যবনিকার অন্য পারের দেশগুলি তাদের প্রশাসনকে আরো উদারপন্থী করে তুলবে (স্তালিনের মৃত্যুর পর এ কাজ অনেকটাই হয়েছে)।
যারা পশ্চিমী সভ্যতার শাসনতন্ত্র আপন করতে সবচেয়ে গররাজি, এমনকি তাদের কাছেও যাতে এর ভালো গুণগুলি প্রতিভাত হয় – তেমনভাবে আচরণ করার দায়িত্ব আমাদেরই। এই পদ্ধতিটি ধীর, ধৈর্যশীল আর এতে কোনো নাটকীয়তা নেই। অনেকে হয়তো এতে বীরত্বের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাবেন না। এমন অনেক মানুষ আছেন, কোথাও অশুভ দেখলেই যাঁরা—দরকারে সামরিক শক্তি নিয়ে—ধর্মযুদ্ধে যাওয়ার পণ করে বসেন। তাঁরা ভুলে যান – ক্রুসেড চলতে থাকলে একসময় ধর্মযোদ্ধারাও ভুলে যায় – তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল; মনে থাকে শুধুমাত্র যুদ্ধবিজয়ের ইচ্ছেটুকু।
কম্যুনিস্ট শাসনের অন্যায়গুলি বুঝতে পারলেও, নিজেদের লড়াই-ক্ষ্যাপা বানালে আমরা ভুল করবো। লৌহ-যবনিকার পূর্বে অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হবে – এমন সম্ভাবনাটিকে অনিশ্চিত মনে হলেও, সম্ভাবনাটি আছে, আর যতক্ষণ সেই সম্ভাবনা আছে, মনে রাখা দরকার – এই বিহ্বল পৃথিবী আমাদের যতগুলি পথ দেখায়, তার মধ্যে এইটিই সেরা।