

ঝাড়বাগদায় ফিল্ড করার সময় আমরা ছিলাম মুকুটমণিপুর বাঁধ-এর কাছে। এই জায়গাটায় যতবার আসি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে, মন্দও লাগে। কংসাবতী নদীর ওপর তৈরি বিশাল জলাধারের নীলচে বিস্তার, দূরে মুকুটের মতো জেগে থাকা পরেশনাথ পাহাড়—সব মিলিয়ে যেন শান্ত সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতি হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা। গত শতকের পাঁচের দশকে জলাধার তৈরির সময় বিশাল বনভূমি, গ্রাম ও মানুষের বসতি জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল।
বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নির্মিত এই বাঁধ ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মাটির বাঁধ। মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক জেলাগুলিতে সেচের জল পৌঁছে দেওয়া। আজও বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এই জলাধারের জলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলাধারে পলি জমে এর গভীরতা ও প্রকৃত ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কারণ গতিশীল নদীর জল পলি বয়ে নিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। কিন্তু সেই দুরন্ত জলকে ধরে রেখে যদি শান্ত অবস্থায় রাখা হয় তবে জলের সঙ্গে বয়ে আসা বালি, পলি, কাদা সব কিছু জলাধারের মেঝেতে থিতিয়ে পড়ে। আবার বর্ষাকালে পলিতে ভারি আর ঘোলা হয়ে যাওয়া সেচের জল যখন খাল দিয়ে কৃষিজমির দিকে বয়ে যায়, তখন খালগুলোর মেঝেতেও কিছু কিছু জমা হতে থাকে। প্রায় সাত দশক ধরে পলি জমতে জমতে এই মুহূর্তে পুরো সেচের জল সরবরাহের ব্যবস্থাপনাটাই ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ জল ধারণ ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে প্রয়োজনমতো জল কৃষিজমিতে পৌঁছাতে পারছে না। পাশাপাশি কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছা জলাধারের বাস্তুতন্ত্রের ওপরেও প্রভাব ফেলছে।
আসলে এই সংকট শুধু মুকুটমণিপুরের নয়। ভারতের অধিকাংশ বড় বাঁধই আজ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। সারা দেশ জুড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াতে মাছের প্রজনন ও পরিযান ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় মাছের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে জলের বাস্তুতন্ত্র তো নষ্ট হয়, তার সঙ্গে এলাকার মানুষের সহজ, সস্তা পুষ্টির পথটাও বন্ধ হয়। সার্বিক চিকিৎসা খরচ বাড়ে, আর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বনভূমি ধ্বংস, বিপুল মানুষের বাস্তুচ্যুতি। আর একটা খুব বড় বিপদ হল পুরোনো বাঁধের নিরাপত্তার ঝুঁকি— ভারতবর্ষের অধিকাংশ নদী বাঁধের বয়স অর্ধ শতাব্দীর বেশি, কয়েকটা শতবর্ষও পেরিয়ে গেছে। এমনিতেই ভারতে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু থাকার জন্য সারা বছরের বৃষ্টি মাত্র চার মাসের মধ্যে ঝরে পড়ে। বৃষ্টি আবার সারা দেশে সমান ভাবে বন্টিত নয়। সেখানে কম বেশি আছে। কোথায় কম কোথায় বেশি তার একটা সাধারণ নকশা আছে বটে, তবে সেই অনুযায়ী যে চলবেই এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বর্ষার এই চারটে মাস আবার রোজ বৃষ্টি হয়না। মাঝে মাঝে বেশ কিছু দিনের ড্রাই স্পেল চলে। ঝড়, নিম্ন চাপ, সব মিলিয়ে দেখা যায় মুষলধারে বর্ষণের অধিকাংশ মোটামুটি দুশো ঘন্টার মধ্যে সীমিত। মৌসুমী বায়ুর এই অনিশ্চিত প্রকৃতির জন্য এমনিতেই দেশে খরা বন্যা পাশাপাশি চলে। এদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য বাতাস গরম, যত গরম তত প্রসারিত, যত বায়ু কণাগুলো ফাঁকা ফাঁকা, তত সেই সেই ফাঁকে জলীয় বাষ্প উঠে বসে পড়ছে। যত বাষ্প তত শ্রাবণ ধারার জোর। যত বর্ষার তোড়, তত পাহাড়ী নদী পাড় ভেঙে দামাল। চারপাশের ক্যাচমেন্টের এই ভয়াবহ জলস্রোত যখন বুড়ো বাঁধে আছড়ায়, বাঁধ থরথর করে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই বাঁধগুলো যেন টাইম বোমা। কেউ জানেনা, কোন অসতর্ক মুহূর্তে এরা ভেঙে পড়ে চারপাশ ধ্বংশ করে দেবে।
তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে— ভারত জুড়ে এত বড় বাঁধ তৈরি না করেও কি জলসংকটের সমাধান করা যেত? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিকল্প পথ ছিল। দক্ষিণ ভারতে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল একাধিক পুকুর নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থা। আমাদের বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, পুরুলিয়ার রাজারাও এমন অসংখ্য পুকুর তৈরি করে জলের সংকট মিটিয়েছেন। সেখানে ছোট ছোট কৃত্রিম জলাধারে বর্ষার জল ধরে রাখা হত। একেকটি জলাধার আবার খাল দিয়ে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত থাকত, ফলে অতিরিক্ত জল ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে যেত। এতে একদিকে সেচের জল পাওয়া যেত, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলও পুনরায় পূরণ হত। সবচেয়ে বড় কথা, একটি বিশাল বাঁধের মতো বিপুল বনভূমি বা গ্রাম ডুবে যেত না।
রাজস্থানে আবার প্রচলিত ছিল জোহাড় ব্যবস্থা—ছোট মাটির বাঁধ বা জলধারণ কাঠামো, যা বৃষ্টির জল আটকে রাখত। মরু অঞ্চলে অল্প বৃষ্টির জল যাতে নষ্ট না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে সেই জল মাটির নীচে ঢুকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বাড়াত। এছাড়া ধাপ কাটা কুয়ো, বা খাদিনের মতো স্থানীয় জলসংরক্ষণ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে জলসংকট মোকাবিলায় সাহায্য করেছে।
এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাগুলোর মূল দর্শন ছিল—“স্থানীয় জল নিজের জায়গাতেই ধরে রাখা”। অর্থাৎ এক বিশাল প্রকল্পের ওপর পুরো অঞ্চলকে নির্ভরশীল না করে ছোট ছোট বিকেন্দ্রীভূত জলব্যবস্থা তৈরি করা। এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়, মানুষের বাস্তুচ্যুতিও তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।
সায়েন্স কলেজে টোপোশীটে (ভূসংস্থানিক মানচিত্র) নদীর ম্যাপ বোঝাতে গিয়ে সুভাষ রঞ্জন বসু স্যার আমাদের বাঁধের আর জলাধারের সিম্বল চিনিয়ে দিতেন। নদীর খাত রেখার ওপরে আড়াআড়ি সোজা দাঁড়ি হল বাঁধ, উল্টোনো থার্ড ব্র্যাকেটের মত নকশা আর তার মাঝে ডবল লাইন যদি থাকে, আর সেই লাইন যদি মাঠ ঘাট পেরিয়ে চলে তবে পাকা বাঁধের ওপরে রাস্তা। সোজা দাঁড়ির পিছনে মানে নদী যেদিকে গেছে তার উলটো পিঠে যদি হাতের পাতার মত নকশা থাকে তবে সেটাই জলাধার। এতো আর চৌকো বা গোল করে কাটা পুকুর নয়, যে একটা নির্দিষ্ট আকৃতি থাকবে। উঁচু নিচু ভূমিতে জল আটকে রাখা। তাই জল উঁচুতে বেশি ছড়াতে পারেনা, নিচু জায়গায় ছড়িয়ে যায়। বিহগ দৃষ্টিতে আঙুলের মত লাগে।
স্যার বলতেন গড় পড়তা মানুষ চায় অমর হতে। দেশের সরকারও ব্যতিক্রম নয়। তাই তারা বিজ্ঞানীদের কথা শোনেনা। আরও বড়, আরও বেশি, আরও উঁচু কীর্তির পিছনে ছোটে। প্রকৃতিও তুল্য মূল্য দাম বুঝে নেয়, আর সেইমত প্রতিশোধ নেয়। ছোট ছোট অনেক গুলি বাঁধ, মানুষ আর প্রকৃতি বাঁচিয়ে ডিজাইন, বার বার পরীক্ষা, ভুল সংশোধন - সেকি মুখের কথা, কত সময়ের ব্যাপার, পাঁচ বছরে কুলোয়না। কোন মুখে সরকার পরের বার ভোট চাইবে? তাই চটজলদি ব্যবস্থা হয়। আর শান্তি কল্যাণের চাইতে যশোলাভের নীল নকশা প্রধান হয়ে ওঠে। সেদিন তো আর জেরক্স, স্মার্ট ফোন, স্ক্যান - এসব ছিলনা। স্যার যা বলতেন তাই আমরা প্রাণপণে খাতায় লিখতাম, পরীক্ষা পাশের জন্য। স্যার বলতেন, আরও একটা বড় ব্যাপার আছে বড় বাঁধ তৈরির পিছনে। আমরা উৎসুক হতাম, আরও একটা পয়েন্টের জন্য। স্যার হেসে বলতেন, বড় বাঁধ, প্রকান্ড কীর্তি, সুবিশাল বাজেট। দশ বিশ এদিক ওদিক - কথা শেষ হতনা। নাঃ ওই পয়েন্টটার যতই গুরুত্ব থাকুক, ওটা খাতায় লেখা যেতনা।
মুকুটমণিপুরের নীল জলের দিগন্তে কোথাও মেঘের ছায়া, কোথাও রুপোলি রোদ চিক চিক করে। সেদিকে তাকিয়ে আমার স্যারের কথা মনে পড়ে। যেকোন এমন বাঁধের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শোনা - ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন’ - গানটার কথা মনে পড়ে। সেই যে শেষের দিকে আছে না - আজও যদি কোন গাঁয়ে দেখো - ভাঙা কুটিরের সারি, জেনো - সে গাঁয়েরও বধূর আশা স্বপনেরও সমাধি। ভারতের নানা রাজ্যে, পাহাড়ে, মালভূমিতে, রাঢ় ভূমিতে কম বাঁধ তো দেখলামনা এ জীবনে। সব জায়গাতেই নদীর উৎসে ক্যাচমেন্ট এলাকার সবুজ বন, শ্যামল চাষের ক্ষেত, ছায়া সুনিবিড় গ্রাম, সরল আদিবাসী মানুষের স্বপ্ন দিয়ে গড়া ঘর বলি দিয়ে নিচের সমভূমির দিকে কম্যান্ড এলাকার সুবিধে করা হয়েছে। কারণ সেদিকে রয়েছে শহুরে ধনী কনজিউমার।
মাঠে ময়দানে ঘুরতে ঘুরতে এদেশ আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমার মায়ের ভীষণ চায়ের নেশা ছিল। গ্যাস্ট্রিক আলসার হবার পরেও চায়ের সঙ্গে নো কম্প্রোমাইজ। সেই থেকে চায়ের প্রতি আমার একটা বিরূপ মনোভাব ছিল। চাকরি জীবনের প্রথম দিকে কচি উৎসাহী দিদিমণি হয়ে যখন নর্থ বেঙ্গলের অফিসগুলো চষে বেড়াচ্ছি, তখন অনেক সময়ে স্থানীয় মানুষ বলেছেন, বসুন, চা আনাই। আমি স্বভাব মত বলে ফেলেছি - না না আমি চা খাইনা। এই কথাটা কলকাতায় বলা কিছুই নয়, কিন্তু উত্তরবঙ্গে ভয়ঙ্কর। মুহূর্তে ওখানকার মানুষের চোয়াল কঠিন হয়ে যায়। আমাকে শুনতে হল, হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, কলকাতার লোক, চা আপনারা খাবেন কেন? খেলে যে আমরা বেঁচে যাবো। আপনারা কোক পেপসি খান। চমকে উঠেছিলাম। চা সেন্টিমেন্ট ওখানে জাতিসত্তার সূচক। আবার যখন বালুচরী শাড়ি নিয়ে ডক্টরেট করতে শুরু করেছি, সায়েন্স কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রথম একাকী সার্ভে শুরু করেছিলাম ম্যাডক্স স্কোয়ারে খাদি মেলায়। এ জেলা, ও জেলা - নানা স্টল ঘুরতে ঘুরতে মুর্শিদাবাদের একটা বড় স্টলে থিতু হলুম। মধ্য বয়সী বেশ সম্ভ্রান্ত উদ্যোগপতির সঙ্গে নানা বিষয়ে যখন আলোচনায় মত্ত, তিনি বললেন দাঁড়ান দুটো চা দিতে বলি। সেই এক গেরো - চা আমি খাইনা। বলতে বলতে দু ভাঁড় দুধ চা রেডি। ভদ্রলোক থমকে গেলেন। সম্ভবত ভেবেছিলেন তিনি ধর্মে মুসলমান বলে আমি তাঁর সঙ্গে চা খাবোনা। কিন্তু অত নিচু মানুষ আমি নই। চায়ের ভাঁড়টা তাঁর হাত থেকেই নিয়ে খেলাম। অনেকেই ভাবতে পারেন, হচ্ছিল বাঁধের কথা, হঠাৎ চা এল কেন? আসলে যা বলতে চাইছি, সেটা হল, - যেখানে সম্ভব, নিজের তুচ্ছ পছন্দটা শিকেয় তুলে একটু মানিয়ে নিলে পাশের মানুষটাকে আরও বড় বড় দুঃখ পাওয়ার হাত থেকে বাঁচানো যায়, নিজেরও পাপের বোঝা কমে। এই সহজ কথাটা দেশের সরকারগুলোরও বোঝা দরকার।
পরিবেশ বিদ্যার চর্চা যাঁরা করেন, তাঁদের কাছে একটা কথা শুনেছি। পরিবেশ বাঁচাতে গ্রীন টেকনোলজি বলে যেসব প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে সেগুলি আয়ত্ত করে চাকরি করতে গেলে মামুলি ইস্কুল কলেজ পাশ দিলে হয়না। অনেক উচ্চতর সূক্ষ্ম বিদ্যার তালিম প্রয়োজন। উঠতি ছেলেমেয়েদের সেই তালিম পেতে গেলে অনেক অনেক টাকা খরচ। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলি উচ্চ শিক্ষা ও সংলগ্ন গবেষণা থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। তাই সাধারণ বাবা মায়ের পক্ষে সন্তানের জন্য সেই উচ্চতর তালিম কেনা দুঃসাধ্য। লোকসংখ্যার অনুপাতে সম্পদ যে কম, সেটা পেশাদার ভাবে না বুঝলেও সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারে ছেলেমেয়েদের সামনে দিনটা খুবই কঠিন। কিছু একটা ব্যবস্থা করে যেতে না পারলে বেচারারা খেতে পাবেনা, বাবা মায়েদের থেকেও গরীব হবে। এই অবস্থায়, একদল লোক এসে যদি বলে, বৃষ্টি অরণ্য কেটে মাটির তলার তেল বের করে তোমার সন্তানকে চাকরি দেবো, অথবা বলে ওপেন কাস্ট কয়লাখনি যেগুলো দুষ্টু লোক দূষণের নাম করে বন্ধ করে দিয়েছে - সবগুলো খুলে দেবো, তোমার সন্তান আবার মজুর হতে পারবে - লোকে অন্ধ বিশ্বাসে তাদের বেছে নেয়। কেউ যখন অতীতের গল্প শোনায়, খেটে খাওয়া মানুষের বাপ ঠাকুর্দার স্মৃতি ভেসে আসে, অবচেতনে কোথাও কমফর্টেবল মনে হয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চিতের ভয়টা তারা সাময়িক ভুলে থাকতে পারে। এই ভাবে বিশ্বজুড়ে একধরণের পরিবেশ বিরোধী বৈশ্য তন্ত্র চলছে। বাণিজ্য হোক না হোক, বাণিজ্যিক ভাবনা যখন বড় হয়ে ওঠে, তার হাত ধরে আমি তুমির প্রতিযোগিতাও বাড়ে। সবাই জানে জ্বালানী তেল চিরকাল থাকবেনা, ওটা বাঁচাতে হবে। কিন্তু তার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার পাবার জন্য আমি তেলের খনিতেই বোম মারি। তেল জ্বলে, নীল আকাশ আরও কালো হয়। অশান্তির আগুন আমাকেও পোড়ায়, আমি যদি না পাই, তবে তুমি পাবে কেন?
আমার তিনবার নেট পাশ করা ছেলেটা বাইকে করে বাড়ি বাড়ি জিনিস পৌঁছে দেয়। ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার তালিকায় তার নাম ওঠেনা, জায়গা খালি নেই। অধ্যাপিকা হবে - এমন স্বপ্ন দেখা মেয়েটা আমাকে গলায় টাই বাঁধা ছবি পাঠায়, আমি লাইক দিই। আমি জানি লোনের প্রস্তাব নিয়ে ও অজানা মানুষকে ফোন করে গালি খেয়ে মরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে উদারবাদের পতনের কারণ পরিবেশ, মানে পরিবেশের রিসোর্স ক্রাইসিস।
তবে ছোট ছোট বিপরীত চিত্র কি নেই? না থাকলে ঝাড়বাগদা থাকতো? কিংবা এই মুকুটমণিপুর? প্রথমেই একটা কথা বলেছিলাম, মুকুটমণিপুরের বাঁধ হল মাটির বাঁধ। লোহা সিমেন্ট এত কিছু থাকতে এত বড় বাঁধ মাটি দিয়ে তৈরি হল - এতো শুনেই অবাক লাগে। এরকম বোকামি সম্ভব? কিন্তু না বোকামি নয় - কারণ সিদ্ধান্তের পিছনে ছিলেন প্রবাদ প্রতিম বিধান রায়। সিমেন্ট-লোহা ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরির পেছনে প্রধান কারণ ছিল নদী উপত্যকার বিশাল বিস্তার আর অর্থনৈতিক সাশ্রয়। কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থলের প্রায় ১১ কিলোমিটার চওড়া উপত্যকায় কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হতো। এই প্রকল্পে স্থানীয় লাল ও এঁটেল মাটির জলধারণ ক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়েছিল। মাটির বাঁধের সবচেয়ে বড় সুবিধে হলো এটা সস্তা, কারণ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার হয়; নরম মাটিতেও সহজে নির্মাণযোগ্য; এবং নমনীয় প্রকৃতির হওয়ায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী। সিমেন্টের মত ফেটে যায়না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় এই বাঁধ অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। আশা তো করতেই পারি সদ্য স্বাধীন দেশে স্যারের বলা শেষ পয়েন্টটার অস্তিত্ব ছিলনা।
তবে অনেকগুলো ছোট ছোট বাঁধ না করে, দানব জলাধারে সবুজ বন ডুবিয়ে মারা হল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের খামে। ঐ সময়ে নদী ব্যবস্থাপনায় সরকার ও প্রকৌশলীরা প্রধানত "বৃহৎ বাঁধ" (Big Dams) এবং নদীতীরবর্তী কৃত্রিম বাঁধের দেওয়াল তোলার (Embankments) মতো কঠিন প্রকৌশল কাঠামোর ওপর নির্ভর করতেন। তখন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখে ছোট ছোট অনেকগুলো বাঁধ নির্মাণ বা অববাহিকাভিত্তিক (Watershed management) নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিক ও সমন্বিত ধারণাগুলি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং জাতীয়তাবাদী মনোভাব নিয়ে ১৯৫০-এর দশকে ভারতের দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) এবং হিরাকুদ বাঁধের মতো বৃহদাকার প্রকল্পগুলো নির্মিত হয়েছিল। ভারত একা নয়, আমেরিকার টেনেসি ভ্যালি বাঁধ বহুমুখী পরিকল্পনাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের আমলে তৈরি হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। মিশরের নীলনদে আসোয়ান বাঁধ তৈরি হয়েছে ১৯৬০-৭০ এর মধ্যে। তখন বন্যা খরা এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে চালু ছিল বৃহৎ প্রকৌশল প্যারাডাইম। এবারে এই ব্যবস্থার খারাপ দিকগুলো পরিস্ফুট হতে হতে নয়ের দশক চলে আসে। কাজেই এখানে বিধান রায়ের ভূমিকা ছিলনা। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যুগের হাতে বন্দী।
বাণিজ্য চলছে, সে তো চলতেই হবে। পিছনে পিছনে চলে মানবতা আর কল্যাণকামী ভাবনা। আমি আশাবাদী এক পথিক - তাই লিখে চলি নদী - বন - পাথরের কাহিনী - বাসযোগ্য পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভৌগোলিকদের জন্য।
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ৩০ মে ২০২৬ ২১:২৪740931