

মানভূমের রূপকথা
মেঘালয়ের পরে দারিংবাড়িতে গিয়ে আমার খুব বড় একটা শিক্ষা হল জীবনে। মেঘালয়ের প্রকৃতি ব্যবহার, আর তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ভার খাসি উপজাতির মানুষের হাতেই আছে। তাই সেখানে পথে ঘাটে প্রতিটি জলের কলে আলো ঠিকরোয়, শৌচাগারের প্রতিটি ফ্ল্যাশ ঠিক ঠিক কাজ করে। সব কিছু ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন। আর দারিংবাড়িতে ঠিক উলটো, কন্ধ উপজাতির মানুষকে সেখানে দূরে ঠেলে প্রকৃতির সম্পদ শোষণ করছে সমতলের মানুষ। বন পাহাড়,পশু পাখির সঙ্গে তাদের আত্মিক যোগাযোগ নেই, ভালোবাসা নেই। তাই পর্যটকদের জন্য কোন ব্যবস্থাপনা দূরস্থান, পথ ঘাট থেকে শুরু করে হাসপাতালের শৌচাগার পর্যন্ত ভয়াবহ অপরিচ্ছন্ন। আমাদের মাঝারি দামী হোটেলের ফিল্টারের জলটুকু অবধি দূষিত ছিল। অবশ্য ভারতবর্ষে এ জিনিস তেমন অস্বাভাবিক নয়। মেঘালয় নিজেই ব্যাতিক্রম। এসব কারণে খরচ বাড়ছে জেনেও আজকাল ছেলেমেয়েদের জন্য আমরা কুড়ি লিটার করে মিনারেল জল কিনে দিই। নিজেরাও খাই, যদিও জানি এই বোতলের জল তৈরি হয় লক্ষ লক্ষ গ্যালন মাটির তলার জল নষ্ট করে। এর জন্য দেশের নানা প্রান্তে খরা বাড়ছে, চাষীরা সেচের জল না পেয়ে ফসল ফলাতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। ঐ বোতলে স্বাস্থ্য নয়, চাষীর রক্ত আর অর্থনীতির কঙ্কাল মিশে আছে। উপরি পাওনা খালি বোতলের প্লাস্টিক দূষণ। তাছাড়া জলের টাকার বেশিটাই দেশে না থেকে বিদেশী পকেট গরম করে। কিন্তু করব টা কী? পরের নাড়ি ছেঁড়া ধনকে ফিল্ডে নিয়ে গিয়ে অসুস্থ তো করতে পারিনা। দশ বছর আগেও পরিস্থিতি কিন্তু এতটা খারাপ ছিলনা। আমরা যখন ছাত্রী, তখন জল কেনার ধারণাও ছিলনা। স্টেশন থেকে, হোটেল থেকে ওয়াটার বটলে জল ভরে তাতে ক্লোরিন দেওয়া জীবাণুনাশক কয়েক ফোঁটা দিয়ে দিতাম। কিন্তু ছেলেমেয়েরা আর তাদের বাবা মায়েরাও আজকাল কেনা জলেই বেশি ভরসা করেন।
আর বাইরে গেলে শৌচাগারের সমস্যা থাকবেই। আতুপুতু মনোভাব বা কথায় কথায় নাক সিঁটকোনো থাকলে আর ভূগোল পড়া চলেনা। তবে শৌচাগারের সমস্যাটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, যখন আমরা সড়ক পথে যাতায়াত করি। বড় রাস্তাগুলোতে পেট্রোল পাম্প অনেকটাই বাঁচিয়ে দেয়। বনে পাহাড়ে আড়াল খোঁজা সম্ভব। কিন্তু মুশকিল হয়, যখন এই দুটোর মাঝামাঝি কোন জায়গা দিয়ে লম্বা সময় ধরে গাড়ি চলে। তবে আজকাল সুবিধেও হয়েছে কিছু কিছু বিষয়ে। ভাঁজ করা কাগজের ফানেলগুলো মেয়েদের পক্ষে একরকম আশীর্বাদ। পিরিওড নিয়ে মেয়েদের ট্যাবুও আজকাল অনেক কমে গেছে। আগে যেমন পথেঘাটে হঠাৎ পিরিওড শুরু হলে গেলে মেয়েরা ভীতু ভীতু চোখে আমাদের কাছে আসতো, এখন আর সেযুগ নেই। বেশিরভাগই পিরিওড কাপ ব্যবহার করে। কালেভদ্রে সমস্যা হলে তারা আমাদের জানায় বটে, তবে সাহায্য তেমন চায়না। প্যাড না থাকলে ছেলেরাই চট করে সাইকেল টাইকেল ভাড়া করে ঝাঁ করে নিয়ে চলে আসে। আমার ভালো লাগে আত্মবিশ্বাসী এই প্রজন্মকে দেখে। আমি নিজেই একবার বুড়ো বয়সে হঠাৎ খুব বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার পেরি মেনোপজ চলছে, চারমাস পিরিওড বন্ধ। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, শিয়ালদা স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার পনের মিনিট আগে পিরিওড স্টার্ট হয়ে গেল, ভয়াবহ ব্লিডিং। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন যে এরকম হলেই সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বন্ধ হবার ওষুধ চালু করতে হবে। অথচ সেটা যে লাগতে পারে কথাটাই ভাবিনি। আমরা কেউই জানতামনা যে এতবড় শিয়ালদা স্টেশনে কোন ওষুধের দোকান নেই। হায়রে ভারতবর্ষ!
ট্রেন ছেড়ে দিল। আমাদের ফার্স্ট এড বক্স, ওষুধের পুঁটলি সবই সঙ্গে যায়, কিন্তু আমার যেটা লাগবে সেটা তো নেই। ট্রেন চলছে, আমার ছাত্রছাত্রীরা ট্রেনের পিএনআর (PNR) নম্বর, ট্রেনের নম্বর, বার্থ নম্বর সব লিখে টুইট করে চলেছে। কারণ আমি শুয়ে পড়লে ওদের সমূহ বিপদ। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসে বলল, ম্যাম, রেল কর্তৃপক্ষ ডাক্তার চাইলে পাঠাবে, ওষুধ পাঠাবেনা। সহকর্মী মধুসূদন বলল, রাতটা কাটিয়ে দিন শারদাদি, গন্তব্যে পৌঁছে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। এছাড়া উপায়ও কিছু ছিলনা। পরদিন জীপের রাস্তায় যেইনা ওষুধের দোকান পড়েছে, মধুসূদন এক ছুটে গিয়ে ওষুধটা কিনে নিয়ে চলে এল। বাকি ফিল্ড একেবারে মাখন মসৃণ। ভূগোল পড়া তো কেবল বইতে মুখ গুঁজে বসে থাকা নয়, একসঙ্গে থাকা, খাওয়া, একসাথে যেকোন সমস্যার মোকাবিলা করা - সঙ্কোচ নয় সহযোগিতা, স্বার্থপরতা নয়, আদান-প্রদানে যৌথযাপন। এর জন্য আসল যেটা দরকার সেটা হল সাহস আর সংবেদনশীলতা। সব সময়ে মনে হয়, যদি কলেজের পাঁচিলের বাইরের সমাজটা সত্যি সত্যিই এমনভাবে চলতে পারতো?
কিন্তু না কলেজের বাইরের সমাজ এইভাবে চলেনা। সেখানে নানা কৌম, তাদের হরেকরকম স্বার্থের সংঘাত। আদিবাসী আর উচ্চবর্গের মানুষের অদ্ভুত জটিল সম্পর্ক অনুভব করেছি বারবার মালভূমি অঞ্চলে।
কয়েকটা গল্প বলি তবে, যেগুলো আমার মনে একটু বেশিই দাগ কেটেছে।
প্রথম যে জায়গাটার কথা বলব, সেটা আমাদের এই বাংলার পুরুলিয়ার একটি বিশেষ স্থানে। জায়গাটার নাম হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। আমরাও জানতামনা আগে। আমাদের এক ছাত্র, অধুনা সহকর্মী সুমন একটা ফেসবুক রীল দেখে আমাকে প্রথম এসে বলে। শুনেই আমি ঠিক করলাম ফিল্ডটা এবার তবে ওখানেই হবে। কিন্তু নেট সার্চ করে একরকম ভেবে নিয়ে কাজের যা যা পরিকল্পনা করেছিলাম, বাস্তবে হল অন্য। ঐ যে ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, “ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন” - সেই কথাই প্রমাণ হল। অযোধ্যা পাহাড়ের প্রান্তে, লাল মাটির সেই ছোট গ্রামটির নাম হল ঝাড়বাগদা। মানুষের সঙ্গে মানুষের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের, পুরাণের সঙ্গে আধুনিক রূপকথার এমন বৈপরীত্য দেখে আমরা চমকে গিয়েছিলাম।
ঝাড়বাগদা
ব্যাপারটা বিশদে না বললে বোঝা যাবেনা। আমাদের ছাত্র সুমন অত্যন্ত কৃতী, আমাদের ভূগোল বিভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফল - এখন আমাদের কলেজে অতিথি অধ্যাপক হয়ে পড়ায়। ও যদি কিছু এসে বলে কখনও, আমরা গুরুত্ব দিতে বাধ্য হই - কারণ ওর কথার পিছনে অ্যাকাডেমিক ভাবনা চিন্তা থাকে। সুমন একদিন এসে মোবাইল খুলে আমাকে একটা ফেসবুক রীল দেখালো। পুরুলিয়ার ঊষর ভূমিতে গ্রামের মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে গত পঁচিশ বছরে গড়ে তুলেছেন তিনশো একরের এক বিশাল অরণ্য। যেমন তেমন অরণ্য নয়। আমি অনেক নামকরা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পিছনে কর্পোরেট অনুদানে গড়ে ওঠা নাম কা ওয়াস্তে বনানী দেখেছি। সেসব জায়গায় শুধু ঐ ইউক্যালিপটাস জাতীয় তাড়াতাড়ি বাড়ে - এমন সব লম্বাটে গাছ বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একধরণের গাছ (মানে পিওর স্ট্যান্ড) থাকে বলে, না হয় মাটিতে ছায়া, না আসে পাখি, কাঠবিড়ালি আর না তৈরি হয় কোন বাস্তুতন্ত্র। আর সবুজায়নের সাফল্য গাথার গল্প দামী দামী মোম কাগজে ছাপিয়ে ওরা বিলি করে। এসব কর্পোরেট ফাঁকি দেখে দেখে চোখ দুটো এখন আমাদের পচে গেছে। কিন্তু মোবাইলে বনের যে ছবি দেখলাম, সেটা ওরকম ফাঁকির বন নয়। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও দেখালাম ছবিটা। তারপর ছাত্র শিক্ষক মিলে গুগল দাদার কাছে গিয়ে সকলে খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। আজকালকার ছেলেমেয়েরা রাতে তো ঘুমোয়না। অস্বীকার করবনা, আমারও ছোটবেলা থেকে রাতে পড়া অভ্যেস। যাই হোক রাত বিরেতে ক্লাসের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে নানা খবর এসে ভিড় করতে লাগল। মোটামুটি সংক্ষেপে বলি। নতুন কয়েকটি শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটল। সেই সঙ্গে আমাদের সন্ধানী মনে এক মহান ব্যক্তির ছায়া এসে পড়ল - তিনি বিশ্বভারতীর প্রবাদ প্রতিম, জাপানি অধ্যাপক সাইজি মাকিনো। আজীবন গান্ধীবাদী এই পরিবেশবিদের প্রেরণায় গ্রামবাসীরা রুখে দাঁড়িয়েছে মরুকরণের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ আড়াই দশকের নিরলস সাধনায় আজ এক ঊষর বন্ধ্যা পাহাড় ঢেকে গেছে সবুজ অরণ্যে। সেখানে ডানা মেলেছে শত প্রজাতির পাখি, ঝোপঝাড়ের আড়ালে সংসার পেতেছে বন্যপ্রাণ। ভারত এবং বিশেষ করে বাংলার রাঙামাটির প্রতি মাকিনোর টান ছিল অসীম। ১৯৭৪ সালে তিনি যখন প্রথম ভারতে আসেন, তখন থেকেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে এই দেশের গ্রামোন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে সঁপে দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালে শান্তিনিকেতনে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি বিশ্বভারতী এবং সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে মিশে তাদের বিষাক্ত রাসায়নিক মুক্ত প্রাকৃতিক চাষবাসে উৎসাহিত করেছেন, সাধারণ মানুষের চোখে সবুজ বন ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন বুনে গেছেন। আরও জানলাম যে পাহাড়ে এই তিনশো একরের অরণ্য গড়ে উঠেছে তার নাম - মাকিনো রঘুনাথ হিল। মাকিনোকে চিনলাম, কিন্তু কে এই রঘুনাথ?
আমাদের মনে প্রশ্ন তো একটা নয়, আরও আছে। অকুস্থলে গিয়ে দেখলাম যে পাহাড়টা নিয়ে আমাদের আগ্রহ, সেটা ছোট খাটো মোনাডনক নয় মোটেই। তিন তিনটে শ্রেণী আছে এর - ভালোই দুর্গম। আমরা একটাতেই চূড়া অবধি ট্রেক করতে পেরেছিলাম। বাকিদুটোতে ওঠার সময় ছিলনা। গ্রামবাসীরা যে কেবল কিছু গাছ পুঁতে বাগান করেছেন - ব্যাপারটা অতটাও সহজ নয়। এগুলো দলমা পাহাড়েরই প্রান্ত। জঙ্গলে গভীরতা তৈরি হয়ে যাওয়ায়, আজকাল এপথে হাতিরাও ফিরে এসেছে। এদিক দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছে। ওদের এই ফিরে আসাটাই মানুষের শ্রমের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। আমাদের ভূগোলের ক্লাসে পড়ানো হয়, সামাজিক বনসৃজন। কিন্তু যখন উদাহরণ দেওয়ার প্রশ্ন আসে, সবসময়ে মেদিনীপুরের আরাবাড়ি মডেলের কথা উল্লেখ করা হয়। ঝাড়বাগদায় এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটল, আশ্চর্যের বিষয় বইতে দূরস্থান, কোন সেমিনারেও এখানকার কথা বলা হয়না। কিন্তু কারণটা কী? আরাবাড়ি আর ঝাড়বাগদা মডেল দুটো কি আলাদা?
ছেলেমেয়েরা যাবার আগে ঐ রাত্তিরেই গ্রুপে জানিয়েছিল - ‘ম্যাম, ঝাড়বাগদায় কলেজ আছে, সেখানে জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট আছে’। আমি তো আপ্লুত। আসলে ভূগোলের একটা ব্যাপার আছে। যেহেতু মাঠে ময়দানে অচেনাকে চেনা, আর অজানাকে জানাই ভূগোলের ধর্ম, তাই মোটামুটি ভৌগোলিকরা বেশিরভাগই পরস্পরকে চেনে। না চিনলেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আলাপ করে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ল লাইব্রেরি’ হলে একজামিনার্স মিটিঙে দেখি অন্যান্য সাবজেক্টের টেবিলে কী গম্ভীর মুখে সবাই আলোচনা করছেন। আর ভূগোলের মিটিং থাকলেই গম্ভীর ঘরে মাছের বাজার বসে। পরীক্ষার ব্যাপার পরে, আগে যেসব কথোপকথন শোনা যায়, সেগুলো অনেকটা এইরকম।