ম্যাপ পয়েন্টিং
আমাদের ভূগোলের ম্যাপ পয়েন্টিং শিখিয়েছিলেন মানসীদি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ভূগোল বিষয়ে তাঁর হাতেই মানুষ হয়েছি। এমন নেশা ধরিয়ে দিলেন, মানচিত্র চর্চা এ জীবনে ছাড়তে পারলামনা। ম্যাপ বই তো ছিলই। তিনি আমাদের একটা লম্বা সাদা খাতা করাতেন। তার নাম ম্যাপ খাতা। যে ক্লাসে সিলেবাসে যে দেশ বা মহাদেশ থাকত, ম্যাপ খাতায় তার সীমানার প্রতিটি খাঁজ মুখস্থ করে খাতার পাতায় আঁকতে হত। আজ যখন ক্লাসে পড়াতে গিয়ে বোর্ডে ম্যাপ আঁকি, মানসীদির কথা মনে পড়ে। লম্বা ছিপছিপে কাঁধে আঁচল টানা, কপালে লাল টিপ দিদি ম্যাপ আঁকছেন। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের অনায়াস বিচরণে ফুটে উঠছে নিখুঁত মানচিত্র। আমার ক্লাসে আমিও আঁকি, কিন্তু মনে হয়, আঁকাটা ঠিক দিদির মতো নিখুঁত হয়না।
একদিন সন্ধ্যায় চলভাষে প্রতিবেশিনীর গলা ভেসে আসে, বৌদি কাল মেয়ের ভূগোল পরীক্ষা। ম্যাপ পয়েন্টিংটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছেনা। একটু দেখিয়ে দেবেন? বললাম, নিশ্চয়ই। মেয়েকে পাঠিয়ে দাও। অতঃপর ম্যাপ হাতে চিন্তিত মুখে বালিকার প্রবেশ।
বলি, সাব্বাশ। সপ্তাহ খানেক পরে চলভাষে বালিকার গলা ভেসে আসে। আন্টি, এবারে ম্যাপ পয়েন্টিং এ ফুল মার্কস। অভিনন্দন জানিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকি। সেই কবে গ্রীক দার্শনিক এরাটস্থেনীস শুধু ভৌগোলিক নীরিক্ষণের দ্বারা পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয় করেছিলেন, কোনো প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই। তারপরে দুহাজার বছরে হয়তো যন্ত্রের আতিশয্যে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমেছে। কিন্তু মনের ধার বেড়েছে বই কমেনি। বাচ্ছারা খুবই বুদ্ধিমান। শুধু একটু ধরিয়ে দেওয়ার লোক চাই।
মনে পুরোনো দিনের কথা আসে। আমার কন্যা স্কুলে যাবে। তার ভবিষ্যত ভালো হবে, অনেক আশা নিয়ে বেসরকারী ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তাকে ভর্তি করেছি। পড়ানোর অনেক খরচ। সকালে খুব তাড়াহুড়োয় স্কুল ব্যাগে বই গোছাতে বসি। রুটিনে আজ ভূগোল আছে দেখে স্কুল অ্যাটলাসটা ব্যাগে পুরে দিই। মেয়ে খুব বিরক্ত হয়। মা, তুমি দেখছ ব্যাগটা এত ভারি, কাঁধ, পিঠ ফেটে যায়, এর মধ্যে এত মোটা ফালতু ম্যাপ বইটা ঢুকিয়েছ? তাকে বৃথাই বোঝাই ভূগোল ক্লাসে লাগবে বাবু। মা তোমাকে নিয়ে পারা যায়না, আমাদের ম্যাপ ফ্যাপ লাগেনা। ক্লাসে ম্যাপ দেখিয়ে পড়ানো হয়না। ব্যাগ থেকে টান মেরে বইটা বার করে দিয়ে মেয়ে স্কুল বাসে উঠে যায়। জানলা দিয়ে হাওয়া আসে, খাটের ওপর ম্যাপ বই এর পাতা ওড়ে। বুকের ভিতর মোচড় দেয়। স্বরূপপ্রাণাজী, মানসীদি আপনারা কোথায়? আকাশ থেকে দেখছেন? গতকাল আমি কলেজের ক্লাসে ম্যাপ আঁকা ঠিক হয়নি বলে, স্টুডেন্টদের খুব বকাবকি করেছি। আমি ভুল করেছি, ভীষণ ভুল করেছি। ওদের কলেজের লেভেলে তুলে আনতে গেলে, আমাকে স্কুলের পড়া থেকে শুরু করতে হবে।
মানচিত্রবিদ্যার অ আ ক খ
স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে ছেলেমেয়েরা আমার ভূগোল অনার্সের ক্লাসে ভর্তি হয়। কলেজের আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের তুলনায় তাদের মুখগুলি বেশ কচি। বালিকা বিদ্যালয় পেরিয়ে আসা মেয়েরা কোএডুকেশন কলেজে কী জানি কি হবে, ভেবে আলাদা বেঞ্চে একটু জড়োসড়ো হয়ে বসে। কলেজে স্কুলের থেকে স্বাধীনতা বেশি, তাই ভেবে কোনো ছেলের চোখে দুষ্টুমি ঝিকিয়ে ওঠে। কেউ আবার চশমা আঁটা সিরিয়াস। কেউ বা আগে থাকতেই ভেবে বসে আছে, কলেজে লেখাপড়া কিছুই হবেনা। বাংলা মিডিয়ামের স্টুডেন্ট ভাবে অনার্সের সব বই কি ইংরেজি? একবার ভর্তির সময়ে এক অভিভাবিকা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ম্যাডাম, আমার ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম। এ কলেজে বাংলায় পড়ানো হবেনা তো? আজ এত বছরের অভিজ্ঞতায় মুখের দিকে তাকালে ছাত্রছাত্রীদের মন পড়তে পারি। নানা সংশয়ে ভরা মুখগুলোকে প্রথম ক্লাসে হেসে জিজ্ঞেস করি,
প্রশ্ন শুনে কোনো চোখে কৌতুক খেলা করে, কোনো চোখ আকাশ পাতাল এক করে ভাবতে বসে। নিজেই উত্তর দিই,
- Only geographers are map makers and the rest of the world is map user. শ্রেণী কক্ষে পলকে খেলে যায় বিস্ময়ের ঢেউ। তবে হ্যাঁ আজ এই স্যাটেলাইট টেকনোলজি আর সফ্টওয়্যার বিস্ফোরণের যুগে মহাকাশ বিজ্ঞানী আর সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররাও মানচিত্র নির্মাণে হাত লাগিয়েছেন। তবে সেখানে এক ধরণের অসুবিধা আছে। নশো কিলোমিটার ওপর থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ আমাদের চেনা ক্যামেরার মতো ছবি তুলতে পারেনা বরং নানাধরণের ডিজিটাল সিগন্যাল পাঠায়। ল্যাবরেটরিতে সেই সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে তার ওপরে কৃত্রিম রং চাপানো হয়। নদীর জল আর পাকা রাস্তা থেকে আলো বা সূর্যের অন্য তড়িৎ চুম্বকীয় রশ্মির প্রতিফলন তো আর এক হবেনা। তাই ল্যান্ডস্কেপ অনুযায়ী সিগন্যাল আলাদা হবেই। তার ওপর নির্ভর করে কম্পিউটার রং গুলোও চাপায় আলাদা আলাদা। এইভাবে একরকমের ইমেজ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ, যে এইসব কৃৎকৌশল জানেনা, তার মনে হবে এযেন, নানা রঙের ছোপ দেওয়া হিজিবিজি কাগজ। কিন্তু পৃথিবীর প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ধরণের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে ফাইনাল মানচিত্রীকরণ আর তার সঠিক ব্যাখ্যা করে তথ্য বিশ্লেষণ, এ কৌশল ভৌগোলিক ছাড়া পৃথিবীতে আর কারোর জানা নেই। শ্রেণীকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের চোখে অজান্তে গর্ব ফুটে ওঠে। কিন্তু এবারে প্রশ্ন হল মানচিত্র একই সঙ্গে হতে হবে সহজ, সর্বজনবোধ্য, নির্ভুল ও দৃষ্টিনন্দন। আবার তাকে ছাপানো বই, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার সব মাধ্যমে ইউজার ফ্রেন্ডলিও হতেই হবে।
কূটতর্ক
পর পর ক্লাসে মানচিত্রবিদ্যার কূট তর্কের অবতারণা হয়। মহাভারতে আছে দ্রৌপদী পূর্বজন্মে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ গুণে গুণান্বিত পতি চেয়েছিলেন, তাই তাঁকে পঞ্চপতি বরণ করে নিতে হয়। কারণ একক মানুষ পঞ্চশ্রেষ্ঠগুণের অধিকারী হতে পারেনা। মহাকাব্য শুধু তো গল্প নয়। বাস্তবের রূপক। মানচিত্রও সর্বদিকে নির্ভুল হতে পারেনা। যেমন ধরা যাক যদি নিরক্ষরেখাকে মাঝখানে রেখে চৌকো আকৃতির বিশ্ব মানচিত্র আঁকি, তাহলে নিরক্ষীয় অঞ্চল ভালো দেখায় বটে, কিন্তু দুই মেরু অঞ্চল দুই সীমানায় বেঢপ হয়ে দাঁড়ায়। আবার উত্তর মেরুকে কেন্দ্রে রেখে গোলাকার মানচিত্র অঙ্কন করলে সেটা নিরক্ষরেখাতেই শেষ হয়ে যায়। কারণ বাকি দক্ষিণ গোলার্ধের বেড় যেহেতু নিরক্ষরেখার থেকে ছোট সে অংশটা আড়ালে থেকে যায়। পরিস্থিতি আর উদ্দেশ্য বিচার করে যে অংশটা দরকার সেটা ঠিক রেখে বাকি অংশের ভুল মেনে নিতে হয়। যেমন সড়ক মানচিত্র আঁকতে গেলে দৈর্ঘ্যটা ভুল হলে চলেনা। কিন্তু সেটা ঠিক রাখতে গেলে দেশের আয়তন উনিশ বিশ হয়ে যেতে পারে। আবার ধরা যাক ভারতবর্ষের আকৃতি বরফির মতো। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি দেশটা একটা লংকার মতোই লম্বাটে। স্পেন দেশটা অনেকটা যেন বর্গক্ষেত্রের মতো। এমন ধারা আলাদা আকৃতির সঠিক অঙ্কনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক কষতে হয়। অঙ্ক কষার ঝামেলা কি কম! বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এমন একটা জ্যামিতিক আকৃতির খোঁজ পাওয়া যায়না, যার সঙ্গে পৃথিবীর আকৃতি সঠিক ভাবে মিলে যায়। পৃথিবী গোল বটে, কিন্তু মেরুতে চাপা, বিষুবরেখা বরাবর ফোলা। মেরু ব্যাস, নিরক্ষীয় ব্যাসের থেকে ছোট। তাহলে কি উপগোলক? না তাও নয়। কোথাও পাহাড় তো কোথাও গভীর সমুদ্র খাত। গড় সমুদ্র পৃষ্ঠও চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণ, জোয়ার ভাঁটা, কোরিওলিস বল প্রভৃতি কারণে সর্বত্র এক নয়। শেষ পর্যন্ত মেনে নিতেই হয় পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতো। তাই কোন মানচিত্রের জন্য কোন অঙ্ক কষতে হবে তা বুঝতে গেলে, জানতে হয় অভিক্ষেপ শাস্ত্র (Theory of Map Projection)।
মানচিত্র সজ্জা
মানচিত্র তো কেবলমাত্র দেশ বা মহাদেশের সীমান্ত সূচীত করেনা। সেখানকার ভূপ্রকৃতি, নদনদী, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, জনবসতি, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, পরিকাঠামো, পরিষেবা সব কিছু দেখায়। দেখানোর জন্য দরকার হয় সর্বজনগ্রাহ্য রং আর চিহ্নের ব্যবহার। যেমন নিয়মমতো কৃষিক্ষেত্রে হলুদ, জলে নীল আর জনবসতিতে লাল রং ব্যবহার হয়। আমি আমার ইচ্ছে হলেই এগুলো অদল বদল করতে পারিনা। আর শুধু এঁকে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায়না। হেডিং, স্থান নাম, চিত্রসূচী অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ, স্কেলের অনুপাত সব কিছু আইন মোতাবেক লিখে দিতে হয়। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাছবিচার না করে সব তথ্য দেখায় যে মানচিত্র তা হল টোপোগ্রাফিকাল ম্যাপ। আবার বাকিগুলো বাদ দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে মানচিত্র বানালে, তা হয় বিষয় ভিত্তিক মানচিত্র বা থিম্যাটিক ম্যাপ।
ক্ষুদ্রতম মানচিত্র একক
তবে মানচিত্রে দেখাব ভাবলেই সব জিনিস দেখানো যায়না। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যেমন ধরা যাক, কোনো ম্যাপের স্কেল হল এক সেন্টিমিটারে পাঁচশ মিটার। অর্থাৎ কিনা কাগজে এক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ভূপৃষ্ঠে পাঁচশ মিটারের সমতুল্য। তবে হিসেব অনুযায়ী কাগজে এক মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ভূপৃষ্ঠে পঞ্চাশ মিটারের সমতুল্য হবে। এবারে মানচিত্রের উপরে যদি একটি বিন্দু অঙ্কন করি, তার ক্ষেত্রফল কমবেশি এক স্কোয়ার মিলিমিটার হয়ে দাঁড়ায়। হিসেব মোতাবেক ভূপৃষ্ঠে ঐ পরিমাণ এলাকার মাপ হয় পঞ্চাশ মিটার গুণিতক পঞ্চাশ মিটার, অর্থাৎ কিনা ঐ নির্দিষ্ট ম্যাপটিতে এক বিন্দু পরিমাণ এলাকার মাপ ভূপৃষ্ঠে আড়াই হাজার স্কোয়ার মিটার হয়ে দাঁড়ায়। তার অর্থ হল ঐ ম্যাপে আড়াই হাজার স্কোয়ার মিটারের থেকে ছোট কোনো বস্তু এঁকে দেখানো যায়না। সেই কারণেই একটা A4 সাইজের কাগজে যদি ভারতের ম্যাপ আঁকি, তবে সেখানে একটি পৃথক নদী আঁকা সম্ভব, কিন্তু একটি পৃথক নলকূপ আঁকা সম্ভব নয়। প্রতিটি মানচিত্র নির্মাণে এই ক্ষুদ্রতম মানচিত্র একক নির্ণয় করতে হয়।
জরিপ
মানচিত্রে যে এতরকম বিষয়ের সঙ্কুলান করা হয়, সেগুলো যাতে ঠিক ঠিক জায়গায় বসে, তার জন্য নির্ভুল অবস্থান নির্ণয়ের দরকার হয়। অবস্থান নির্ণয় করতে গেলে নানাবিধ যন্ত্রপাতি সহযোগে জরিপ কাজের দরকার। ইংরেজ আমলে সারা ভারতবর্ষ জরিপ করে টোপোগ্রাফিকাল মানচিত্র অঙ্কন করা হয়েছিল। সেই মহা জরিপকার্যের নাম হল Great Triangulation Survey বা সংক্ষেপে GTS । এই জরিপ সমাধা করার জন্য বেশ কিছু ইটের টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল। এখনো তার কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। ছোটবেলায় খড়দহ পেরিয়ে পানিহাটিতে বড়মামার বাড়ি যেতাম। পথের উপর এমন টাওয়ার দেখেছি। লোকে বলতো সুখচর গীর্জা। কলকাতায় চিড়িয়া মোড়ের কাছে বি টি রোডের ওপরেও একটা এমন টাওয়ার আছে। এগুলো দেখলেই চেনা যায়, কারণ ৭৫ ফুট উঁচু চৌকো থাম তো আর চট করে দেখা যায়না, আবার আজকের ঘিঞ্জি রাস্তার ওপরে ওগুলো কেমন যেন বিসদৃশ। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে এই থামগুলোর সাহায্যে আমাদের দেশের মাটির কতইনা মাপজোখ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে জি টি এস এর দু'শ বছর পূর্ণ হল। এই উপলক্ষ্যে ভারত ও ব্রিটেনের সহযোগিতায় বেশ কিছু মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান, সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। আলিপুরের জাতীয় গ্রন্থাগারের ভাষা ভবনে এই জি টি এস টাওয়ারগুলি নিয়ে একটি চমৎকার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক এসেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ আর সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ ছিলেন যৌথ দায়িত্বে। দু'শ বছর আগেকার সেই instrumental survey - এর যন্ত্র বসানোর একটা বড় তেপায়া স্ট্যান্ড ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে, যে কেউ ইচ্ছে হলে দেখে আসতে পারে।
রিমোট সেন্সিং জিওগ্রাফিকাল ইনফর্মেশন সিস্টেম (GIS)
আজকাল কিন্তু বেশিরভাগ মানচিত্রই আগেকার মত কাগজের ওপরে হাতে ধরে আঁকা হয়না। প্রাথমিক মানচিত্র স্ক্যান করে কম্পিউটারে সফ্ট কপি বানানো হয়। ঐ ডিজিটাল ম্যাপ ছোট ছোট পিক্সেল দিয়ে তৈরি। অমন ম্যাপকে আমরা বলি রাস্টার ম্যাপ। এবারে জি আই এস সফ্টওয়্যারের সাহায্যে ডিজিটাইজ করে সেটিকে ভেক্টর ম্যাপে পরিণত করা হয়। এই ভেক্টর ম্যাপের মধ্যে যেকোনো ধরণের প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক তথ্য যুক্ত করা সম্ভব। যুক্ত করার পরে পছন্দমতো যে কোনো রকম মানচিত্র কম্পিউটারে তৈরি করা যায়, দরকারে প্রিন্ট আউটও বার করা যেতে পারে। এই পুরো ব্যবস্থাটি কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই উপগ্রহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানচিত্র আঁকার কৌশলকে বলে রিমোট সেন্সিং। কিন্তু এই শব্দটার অর্থ কী? মানুষের আছে পঞ্চ ইন্দ্রিয়। এর মধ্যে ত্বক আর জিভ যে কোন জিনিষকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার সম্পর্কে তথ্য আহরণ করে। এরা হল সেন্সার। কিন্তু নাক কান আর চোখ? খবর জানতে গেলে তারা দূর থেকেই জেনে নেয়, ওসব ছুঁয়ে টুয়ে দেখার ব্যাপার নেই - তাই এরা হল গিয়ে রিমোট সেন্সার। ম্যাপ আঁকতে গেলে মাটিতে নেমে মাপার ফিতে, মেসারিং স্টাফ, তেপায়া স্ট্যান্ড, লেভেলিং যন্ত্র, হেন তেন, চৌষট্টি জিনিষ ঘাড়ে নিয়ে নামতে হয়। মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে কাজ হয়, একে বলে সার্ভে। কিন্তু বাবা স্যাটেলাইটের ছবি দিয়ে যদি কাজ সেরে নিই, তাহলে তো দূর থেকেই চটপট কাজ হয়ে গেলো। তাই এ হল রিমোট সেন্সিং সার্ভে। এই রিমোট সেন্সিং আর জিওগ্রাফিকাল ইনফর্মেশন সিস্টেম (GIS) আজ মানচিত্রবিদ্যার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারতবর্ষের সেনাবাহিনী থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রতিটি সেক্টর এই সিস্টেমের অংশ।
নিজে মানচিত্র তৈরি
ওপরের কথাগুলো শুনে মনে হতে পারে, মানচিত্র নির্মাণ একটা ভীষণ কঠিন আর ভজকট ব্যাপার। কিন্তু আজও যখন অভিযান হয়, দুর্গম প্রদেশে না থাকে কম্পিউটার, না থাকে ইন্টারনেট সংযোগ অথবা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ। চাঁদের পাহাড়ে শঙ্করকে মনে পড়ে? সঙ্গী আলভারেজকে হারিয়ে তাকে নিজের মানচিত্র বানিয়ে, দিক ঠিক করে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়েছিল। ভূগোল অনার্সের ক্লাসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের ফিল্ড সার্ভেতে যেতে হয়। সেবার অন্ধ্রপ্রদেশের আরাকু উপত্যকায় গিয়ে কি সমস্যা! গ্রামে গেছি প্রশ্নপত্র বানিয়ে, গ্রামবাসীদের সাক্ষাৎকার নিতে। প্রশ্নের সঙ্গে আছে সম্ভাব্য উত্তর তালিকা। যিনি যেমন উত্তর দেবেন, সেই অনুযায়ী ডেটা টেবিল বানানো হবে। তার ওপরে ভিত্তি করে বারগ্রাফ, পাইগ্রাফ ইত্যাদি নানা লেখচিত্র আঁকা হবে। সেই লেখচিত্র বসানো হবে গ্রামের মানচিত্রের ওপরে। এমনভাবে তৈরি হবে আমাদের নিজেদের তৈরি থিম্যাটিক ম্যাপ। কিন্তু গোল বেঁধেছে যে মানচিত্রটা এখানে আসার আগে গ্রামের বলে যোগাড় করা হয়েছিল, সেটার সঙ্গে গ্রামের মিল পাওয়া যাচ্ছেনা। স্থানীয় লোককে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সুরাহা মিলছেনা। অথচ ম্যাপ না হলে রিপোর্ট সম্পূর্ণ হবেনা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল কুছ পরোয়া নেই। ম্যাপ আমরা নিজেরাই বানিয়ে নেব। চারজন ছাত্রছাত্রী আর আমি পাঁচজনের দল বানিয়ে গ্রামের পথে রওনা হলাম ম্যাপ মেকিং অভিযানে। পাহাড়তলির ছোট গ্রাম। কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছি। দুজনকে কাজ দিলাম রাস্তার দুধারের ভূমির ব্যবহার বা land use দেখে আঁকার। তৃতীয়জনকে আগে দশ পা হাঁটিয়ে দেখে নিলাম কত মিটার হচ্ছে। তার কাজ হল প্রতিটি ভূমির ব্যবহার যেখানে বদল হচ্ছে সেখানে গুণে গুণে কত পা হল সেটা বলা, যাতে লিখে রাখা যায়। চতুর্থজনের কাজ হল পথের প্রতিটা বাঁকে কম্পাস দিয়ে রিডিং নেওয়া, আর কৌণিক পরিমাপটা লিখে রাখা। এমনভাবে চলে তিন ঘন্টায় আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে এলাম। হোটেলে ফিরে ঘন্টা দেড়েকের প্রচেষ্টায় আরাকুর গ্রামের চমৎকার ম্যাপ তৈরি হয়ে গেল। নিজের দলের হাতে তৈরি ম্যাপ দেখে স্টুডেন্টদের সে কি আনন্দ!
কর্কটক্রান্তি
একবার জেনারেল কোর্সের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি গ্রামে মাটির পুতুলের ওপরে সার্ভে করতে গিয়েছিলাম। সমীক্ষা, জরিপ সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পরে ওদের নিয়ে মায়াপুর বেড়াতে গেলাম। প্রধান সড়কের উপর একপাশে দেখি এক বিবর্ণ সিমেন্টের ফলক। নিজেরাই ধুলো ঝেড়ে পড়ে নিই, তাতে লেখা, এই স্থান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা বিস্তৃত রয়েছে। মানে আমরা এখন কর্কটক্রান্তির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। পুরো দল আনন্দে আত্মহারা। স্থানীয় মানুষের চোখে বিস্ময়, এক বাস ভর্তি উন্মাদ একটা ময়লা হয়ে যাওয়া সিমেন্টের ফলকের চারপাশে নাচানাচি করছে। জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছে। হায়রে আমার স্বদেশ। গ্রিনিচে মূলমধ্যরেখার ওপরে পা দেওয়ার জন্য পর্যটকদের ডলার গুণতে হয়। আর এদেশে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত রয়েছে কর্কটক্রান্তি রেখা। আসলে প্রকৃতি সব অমূল্য জিনিস আমাদের এত বেশি বেশি দিয়েছেন, আমরা সব মূল্যহীন করে ফেলি। মনীষীরাও সব সময় ত্যাগ তিতিক্ষা শিখিয়ে গেছেন। তাই দেশের সরকারও সামান্য পয়সা রোজগারের ফিকিরকে গুরুত্ব দেননা। বছর দুয়েক আগে আবার ও পথে গিয়েছিলাম ছাত্রছাত্রী নিয়ে। এবারে দেখলাম গুগল ম্যাপে জায়গাটার লোকেশন দেখাচ্ছে। গিয়ে দেখি বন বাদাড়ের মাঝে কাত হয়ে পড়ে আছে ফিনফিনে টিনের ফলক। সিমেন্টের ফলকটি উধাও। হয়তো রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে ওটি বলি হয়েছে। আমাদের মত পাগল দিওয়ানা ছাড়া আর কারোর পক্ষে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
মানচিত্র নির্মাণে এক একটি কূটতর্ক এক একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ, যার সমাধান করতে করতে সংশয়ী ছাত্র ছাত্রীরা হয়ে ওঠে সহযোদ্ধা। ছেলে কি মেয়ে, বাংলা না ইংলিশ মিডিয়াম সব পরিচয় ভেসে যায়। উচ্চ শিক্ষার যুক্তিজালের ধারালো ছুরিতে শান দিয়ে দিয়ে কচি মুখগুলো এতোদিনে ঝলমলিয়ে ওঠে। এক শিক্ষক দিবসে তারা উপহার দেয় বর্গাকৃতি রাংতা মোড়া বাক্স। খুলে দেখি থার্মোকলের এক সুন্দর ভারতবর্ষ। আহা, চোখে জল আসে, আমার কুঁড়ি ফোটা ভূবিজ্ঞানীদের নিজের হাতে তৈরি। এযে কোহিনূরের থেকেও দামী।
একবার ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো আমাদের এক কর্মশালায় ডেকেছিলেন। অনুষ্ঠান নিউ টাউনের রবীন্দ্র তীর্থে। ভালো ফাইল, পেন উপহার পেলাম। দুপুরে এলাহি খাওয়া দাওয়া। সবকিছু সরকারী খরচে। অফিসারেরা জানালেন শিক্ষকদের এমন খাতির যত্ন তাঁরা করছেন মানচিত্রবিদ্যা সম্পর্কে কিছু সরকারী প্রকল্প যাতে আমরা ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিই। শুনে একই সঙ্গে চমৎকৃত ও কৌতূহলী হই। প্রোজেক্টরের কৌশলে সামনের পর্দায় ফুটে ওঠে কিছু অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎ। কল্পনা করা যাক, আমি বেশ দিল্লি গেছি। কুতুবমিনার বেড়াতে যাব, কিন্তু রাস্তা চিনিনা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অন করে ফোনটাকে সোজা করে ধরে ঘুরে গেলাম এক পাক। আমার ঘোরার সাথে সাথে ইসরোর কৃত্রিম উপগ্রহ গুলো ফোন ক্যামেরার সাহায্যে বুঝে নিল আমি কোথায় আছি। এবারে ফোনের স্ক্রিনে চলে আসবে কার্টুন চরিত্র, যে আমাকে গন্তব্যে পৌঁছনো পর্যন্ত আঙুল দিয়ে দেখাবে কোন দিকে যাব। আর কোথা থেকে বাস বা ট্যাক্সি ধরব, কোথায় খাব, কোথায় ওষুধ বা অন্যকিছু দরকারী জিনিস কিনব সে সবও বলে দেবে। আবার ধরা যাক, আমি ভ্রমণ পিয়াসী, এদিকে অসুস্থতার কারণে বেরোনোর উপায় নেই। বন্ধুরা মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারী প্রাসাদ দেখতে যাচ্ছে। আমার ভীষণ মন খারাপ। তখনও মুস্কিল আসান হবে ইসরো। কি করে? খাটে শুয়ে শুয়ে সোজা ঢুকে পড়ব ইসরোর ওয়েবসাইটে। বলব আমাকে হাজার দুয়ারী ঘোরাও। কার্টুন গাইড আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে রওনা দেবে। হাজার দুয়ারীর গেট দিয়ে ঢুকে প্রতিটি অলিগলি দেখাবে, তার সম্পর্কে তথ্য, ইতিহাস সব জানাবে। বন্ধুরা চোখে দেখে হয়তো অনেক কিছুই মিস করবে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল ট্যুরে আমি সব জেনে যাব। কোনো আপশোষ থাকবেনা। আবার এমনও হতে পারে - পশ্চিম বঙ্গের মাছ-ধরা ডিঙ্গি সমুদ্রে ভুল করে বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে গেলো। তারপর দুই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাকানি চোবানি। এগুলো এড়াতে এমন ব্যবস্থা হতে পারে, নিজের দেশের সীমানায় পৌঁছনোর কিছু আগে থেকেই মৎস্যজীবীদের ফোনে বিপদ সঙ্কেত বেজে উঠবে। এইসব প্রকল্পই মানচিত্রবিদ্যার চরম উৎকর্ষের নিদর্শন। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের দরকার কেন? এই বিশাল ভারতবর্ষে আছে হাজার দুয়ারীর মতো লাখো জায়গা যেখানে মানুষ বেড়াতে যেতে চায়, অথবা রাস্তা খোঁজে। গুটিকয়েক বিজ্ঞানীর পক্ষে এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করা দুর্ঘট। এছাড়াও চাই অভিনব কিছু আইডিয়া, যা আগে কেউ ভাবতে পারেনি। এজন্য ভারত সরকার চান নবীন প্রজন্ম এই কাজে এগিয়ে আসুক।
চুপি চুপি আরও দুটো খবর জানিয়ে রাখি। প্রথমতঃ ইসরোর ভুবন প্রোগ্রাম আর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ব বিভাগের ইউ. এস. জি. এস. আর্থ এক্সপ্লোরে অ্যাকাউন্ট করলে সারা পৃথিবীর উপগ্রহ চিত্র খুলে যায়। সেখান থেকে যেকোনো স্থানের মানচিত্র সম্বন্ধে ধারণা করা সম্ভব। ঐ উপগ্রহ চিত্র এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ সেখান থেকে আমি আমার গ্রামের বাড়ির তিন শিবের মন্দির পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছি।
দ্বিতীয়তঃ মাপজোকের জন্য দৈর্ঘ্য মাপার রুলার, দিক নির্ণয়ের কম্পাস, কোনো কিছু অনুভূমিক কিনা বোঝার জন্য স্পিরিট লেভেল, ভূপৃষ্ঠের নতি বোঝার জন্য ক্লাইনোমিটার, কোনো স্থানে শব্দের প্রাবল্য মাপার নয়েজ মিটার, উচ্চতা মাপার অল্টিমিটার এত কিছু নিয়ে ঘোরা তো অসুবিধে। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর ও প্রয়োজন হয়। তাই আমি গুগল প্লে স্টার থেকে মুঠোফোনে এই সব অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে নিয়েছি। এখন দরকার মতো অ্যাপের আইকনে ট্যাপ করলেই মুঠোফোনটা ঐসব যন্ত্রের মতো আচরণ করে, রিডিং ও দেয়। তাই ইচ্ছেমতো স্থানীয় মানচিত্র তৈরি করা এখন খুবই সহজ।
তাহলে কি ভাবছেন গো পাঠক বন্ধুরা? মানচিত্রবিদ্যা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া তো করাই যায়, তাই না?