সেখানেই দোতলার খোলা বারান্দায় বসে অলসচোখে রাস্তা দেখতে দেখতে খাওয়া সারা গেল। স্কুলফেরতা ছাত্রছাত্রীর দল, অফিসফেরতা মহিলা ফিরতিপথে এই রেস্টুরেন্টে ঢুকে হয় কিছু খেয়ে নিচ্ছেন নয়ত প্যাক করিয়ে। মোমো, থুকপা, চাউমিন খেয়ে পেট ঠান্ডা করে কল্পার দিকে ফেরা। দেখা যাক রওলা ক্লিফ হয় কিনা। আজকেই কল্পায় আমাদের শেষ দিন, যদি সূর্যাস্তের আগে হোটেল পৌঁছানো যায় তাহলে কৈলাসের উপরে অস্তগামী সূর্যের রঙের খেলাও দেখা হয়ে যাবে। আশায় আশায় আমনকে জিজ্ঞাসা করি, সেও আশ্বাস দেয় পৌঁছে যাবো। ... ...
মুরাঙের আগে থেকেই বরফে মোড়া পাহাড়চুড়ারা সঙ্গ নিয়েছে। কখনো ডানে কখনো বাঁয়ে কখনো সামনে হাতছানি দিয়ে চলেছে। দুইপাশ এখনো সবুজে সবুজ। কিছু পর্ণমোচি বৃক্ষের উপরের দিকের পাতায় রঙ ধরেছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ঢাল বরাবর ধাপ কেটে জুমচাষ করা। কিছু ফসল পেকে হলুদ রঙ ধরে গোটা ঢালখানা নকশাদার আসন বানিয়ে রেখেছে। নাকো (১২০১৪ ফিট) কল্পার (৯৭১১ ফিট) থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট উঁচু। ... ...
গতকাল আসার সময় ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় পথের শোভা দেখা যায় নি। আজ দিনের আলোয় দেখি অনেক আপেলগাছের পাতাতেই রঙ ধরেছে। দুপাশে হলুদ কমলা হয়ে লালচে রঙের আপেলগাছ। সাথে চিরহরিৎ পাইন ফার দেবদারু। সবুজে হলুদে কমলায় অপরূপ নকশাকাটা রাস্তার দুপাশ আর অনেক নীচে শতদ্রুর আবছা কলকল। কিন্নর কৈলাশ রেঞ্জ গম্ভীরভাবে নজর রাখছে পুরো এলাকায়। কালো সাদা মেঘেরা এসে ভীড় জমিয়েছে কৈলাশ জোরকান্দেনের মাথায় মাথায়। ... ...
কৈলাশশিখর ছেয়ে আছে গলানো প্ল্যাটিনামে, ছেয়ে আছে অন্যান্য শৃঙ্গগুলো। চাঁদের আলোর যে এত রংবদল হতে পারে, বরফশৃঙ্গে তার আলো ছায়ার এত বৈচিত্র্যময় শেড দেখা যেতে পারে তা হয়ত কল্পা না গেলে জানাই হোত না। ঠান্ডায় হাত ঠোঁট অসাড় হয়ে যাচ্ছে, তবু চোখ সরে না। এই ক্ষুদ্র অকিঞ্চিৎকর জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল এই রাত। ... ...
সিমলা থেকে কল্পা ২২৪ কিমি, একবারও না থামলে ৭ ঘন্টার যাত্রা। অন্ধকার হয়ে যাবে পৌঁছাতে পৌঁছাতে। আমরা কিছু স্যান্ডউইচ প্যাক করিয়ে নিলাম, যাতে গাড়িতেই খেয়ে নিতে পারি। পথে এক জায়গায় সিএনজি নিতে দাঁড়ানো হল, তারপর সোওজা কল্পার দিকে। ক্রমশ দূরের বরফচুড়ারা কাছে এগিয়ে আসতে থাকে, আমরা উঠে নেমে আবার উঠে এগোতে থাকি কিন্নরভূমের দিকে। ... ...
গতবারে যা যা দেখা বা করা হয় নি এবারে সেগুলো করব বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। নাহলে আর সোলো আসাই বা কেন? সেজন্য হেমিস উৎসব দেখে আসার পরেরদিন, ৬ই জুলাই প্রথমে গিয়েছিলাম পেট্রোগ্লিফের সন্ধানে। সে গল্প পরে। গিয়েছিলাম সিন্ধু জাঁসকারের সঙ্গমে, সে গল্প আগেই বলেছি। এখন বরং বলি সিন্ধুঘাট আর লেহ প্যালেসের গল্প। ... ...
নীচে নামতে নামতে একবার মনে হয় এখন যদি একটা ৬ কি ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয় তাহলে আমাদের বাঁচার কোন সম্ভাবনা তো নেইই, সহজে কেউ জানতেও পারবে না। তখনই মনে হয় হাজার বছরের বেশী এইসব পাহাড়ের ভেতরে গুহায় থেকেছেন শ্রমণরা, বাইরে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তুমূল তুষারঝড় কিছুই বিচলিত করে নি তাঁদের। এই অপূর্ব থাংকাগুলো এঁকেছেন, পুঁথি লিখেছেন, নকল করেছেন। ... ...
এই বছর থিকসে গোম্পায় আর যাই নি, তবে পেট্রোগ্লিফের খোঁজে যাবার সময় ওই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় হঠাৎই দেখা পেয়ে যাই একজোড়া মোহনচুড়া পাখির। কি যে সুন্দর দেখতে এই পাখিটাকে। এমনিই রাস্তার পাশে একটা ঝোপমত জায়গায় বসে ছিল। কি ভেবে একটা উড়াল দিল, কয়েক সেকেন্ড পরে অন্যটাও। ঠিক যেন একটা সাদাকালো জিগজ্যাগ ডোরাকাটা সিল্কের পর্দা হাওয়ায় দুলতে দুলতে উড়ে যাচ্ছে থিকসে গোম্পার ছাদের দিকে। ... ...
এই লেখাটা ছেড়ে গিয়েছিলাম প্রায় এক বছর আগে। তালেগোলে সময় গড়াতে গড়াতে আরো একবার ঘুরে আসা গেল দ্বাদশ গিরিবর্ত্মের দেশ থেকে। সেবারে লিখতে লিখতে যে সব 'হলেই হতে পারত কিন্তু হয় নি ট্যুর কন্ডাকটারের অজ্ঞান ঔদাসিন্যে' দু:খগুলো উথলে উঠছিল এবারে সেটা সম্পূর্ণ মিটিয়ে আসতে পারার তৃপ্তিতে খুশীমনে আবার হাত দিলাম লেখাটায়। গতবার আর এবারের অভিজ্ঞতা পাশাপাশিই চলবে। ... ...
হেমিস ফেস্টিভাল ২০২৫ ... ...