ইতোমধ্যে খেয়াল করে দেখলাম আমায় সবাই 'দময়ন্তীজিই' বলে ডাকে। সিনিয়ার তাশিকেও যেমন তাশিজি বলে ডাকে। বয়সজনিত সম্মান। তাশিজি আমাকে আর অঞ্জলিকে এককাপ করে হট চকোলেট বানিয়ে খাইয়ে দিল। আর জুনিয়ার তাশি বারেবারে বলল সকালে উঠেই যেন ওদের দরজায় নক করি, ওদের রুমের গিজার চালু আছে, ও বালতি ভরে আমাদের রুমে পৌঁছে দেবে। এইসব অকাতর ভালবাসার ওমে ভরে ওঠে শীতার্ত রাত। ফুরিয়ে যায় ২৪শে। ২৫শের দিনটা বড় রংদার ঝলমলে ছিল। বলব সেসব কালকে। ... ...
একটা পিজ্জাকে ছয় টুকরো করে দিতে হবে। বাই ডিফল্ট আট টুকরো আসে দেখলাম। না তাতে হবে না ছয়ই চাই। তিনকাপ হট চকোলেট বানিয়ে ৯টা গ্লাসে ভাগ করে দিতে হবে। এদিকে সাড়ে আটটার পরে আর পিজ্জার অর্ডার নেওয়া সম্ভব হয় না। তাঁদের দলের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির আটটা চল্লিশে মনে হয়েছে একটা মেক্সিকান পিজ্জা খেয়ে দেখা যাক। না শুনতে রাজী নন। বলছেন 'তুমি কিচেনে গিয়ে বলো না, ওরা ঠিক বানিয়ে দেবে।' ... ...
শনিবার বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম বাসস্ট্যান্ড। তখনই দেমুলের বাস ছাড়ছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ছেড়ে সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ দেমুল পৌঁছায়। পরেরদিন ভোর সাতটায় আবার ওখান থেকে ছেড়ে কাজা পৌঁছায়। কাজেই বাসে যেতে গেলে অন্তত দুটো রাত থাকতেই হবে। সে তো এখন সম্ভব না। মন্যিয়া বলল গাড়ির ব্যবস্থা করবে। এবং করতে পারল না শেষ পর্যন্ত। আমি দেখলাম সকাল সাড়ে সাতটার বাসে তাবো চলে গেলে দুপুর তিনটের মধ্যে ফেরত আসা যাবে। ... ...
যাঁরা মেরামতি কাজ করছিলেন জোর করে চা খাইয়ে দিলেন। নাহলে নাকি গুরুজি রাগ করবেন। বিস্কুটও ছিল রাখা। আর ছিল নুনছাড়া মাখনের ব্লক। শুনলাম দর্শকদের প্রত্যেককে ধরে খাওয়াবার চেষ্টা করেন এঁরা। মনাস্টারির ঠিক পেছনেই পাহাড়ের মাথায় সোনালী রঙের মস্ত একখানা বুদ্ধমূর্তি বসানো, অনেকটা লাংজার বুদ্ধমূর্তির মত দেখতে। সামনে রেলিং দিয়ে ঘেরা। ওখান থেকে কাজা শহর আর স্পিতিনদীর অসাধরণ ভিউ পাওয়া যায় শুনেছি। কিন্তু এই পাহাড়টায় হেঁটে ওঠার মত এতটা অ্যাক্লেমেটাইজড এখনো হই নি। সামনের সপ্তাহে এসে উপরে উঠতে হবে। এই মনাস্টারির চত্বরে লোকে স্টার গেজিঙের জন্য আসে। ... ...
কাজার কুকুরগুলো ভারী অমায়িক। গাবলু গুবলু ঝাপুঝুপু লোমভরা হাসি হাসি চোখের প্রায় বাছুরের সাইজের কুকুরগুলো সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায় আর সন্ধ্যে হলে উঠে চেনা অচেনা যাকেই পায় হাসিহাসি মুখে ল্যাজ নেড়ে পথ আটকায়। সকালেও দু'একটা আটকায় বটে তবে সে দু'একটাই। সন্ধ্যেবেলায় চার পাঁচটা করে প্রতি বাঁকের মুখে থাকে। প্রধান দাবী আদর, সাথে কিছু খাবার দাবার হলে খুবই ভাল। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে একপাও এগোন যাবে না। পর্যাপ্ত আদর না পাওয়া পর্যন্ত প্যান্ট কামড়ে ধরে আটকে রাখে। এদের চেহারা দেখে বুঝি এখানে কেউ গায়ে গরমজল ঢেলে দেয় না, আধলা ইঁট ছোঁড়ে না। তাই মানুষের প্রতি এদের অগাধ বিশ্বাস আর দাবী। ... ...
চিলুবিলু করছে। ইগা হাসিমুখে অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। একজন আবার খাবার দাবার ছাড়াও সোয়েট টিশার্ট নিতে চায়। অতএব তাকে ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা, রান্নাঘরে তাশি জুনিয়ারকে অর্ডার বোঝানো আবার এনে সার্ভ করা, বিলিং করা, সে যাকে বলে পুঁদিচ্চেরি অবস্থা। ইগার অন্য কাজে থাকার কথা, আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছাই নি দেখে ও এসে গেছে সামলাতে। আমাকে ঝড়ের বেগে বুঝিয়ে চলে গেল। তারপর একঘন্টা হাবুডুবু হাবুডুবু। অ্যাপটায় বিলিঙে এমন হাবুডুবু খাচ্ছিলাম যে একদল পোলিশ পর্যটক মেনু দেখে দেখে পকেট থেকে ক্যাশ গুণে গুণে কাউন্টারে রেখে বাই বলে হাওয়া। ... ...
রুমমেটরা দুজনই জেনজি। মন্যিয়া দিল্লি শ্রুতি ব্যাঙ্গালোরের। ওখানেই প্রাতরাশের ব্যবস্থা। সেসব সেরে মন্যিয়ার সাথে চললাম সল ক্যাফেতে। আজ আমার কেটি শুরু হবে, তবে কোন চাপ নেই যতটুকু পারব ততটুকুই করব। আজ আমার মূল দায়িত্ব প্রচুর জল খাওয়া আর যথেষ্ট বিশ্রাম নেওয়া। ক্যাফেটা কাজা মার্কেটের একদম কোণার দিকে ছোট্ট কিউট এন্ড কোজি। তিব্বতী স্টাইলে সাজানো। লাদাখের মত স্পিতিতেও তিব্বতী প্রভাব খুব বেশী। হবারই কথা অবশ্য। আগে তিব্বতেরই অংশ ছিল। ... ...
বাস থেকে নেমেই হল আসল মজাটা। প্রথম মজা পেছনের চেম্বারে রাখা ক্যামেরা ল্যাপটপের ব্যাগ আর স্যুটকেশ ধুলোয় স্নান করে উঠেছে। তাদের পরে দেখব আগে থাকার জায়গায় পৌঁছাই। তা কাল মানে ১৪ তারিখ থেকে ১লা অক্টোবর পর্যন্ত কাজা মার্কেটে একটা ক্যাফেতে ভলান্টিয়ার হিসাবে কাজ করবো, ওরাই থাকার ব্যবস্থা করেছে মার্কেটের মধ্যেই এক জায়গায়। আমি একদিন আগে পৌঁছাচ্ছি বলে স্পিতি ডায়ারিজ নামে একটা হোস্টেলে ফিমেল ডর্ম বুক করেছিলাম। ... ...
এই বছর নিজেকে একটা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, বহুদিন তো লোকজনকে ধরেবেঁধে এনে কাজ করিয়েছি। এবারে লোকের হুকুমমত কাজ করতে কেমন লাগে সেইটে দেখতে চাই। নিজের ভেতরে গজানো ইগোর গাছে কতশত ডালপালা ধরেছে, টোকা পড়লে তারা ফ্যাঁশ করে ওঠে কিনা এইটাই দেখতে চাই। এই বছরই কেন? সে আছে একটা কারণ, পরে কমুঅনে। ... ...
তা খাড়াই বলে খাড়াই… আমার অনভ্যস্ত ঠ্যাঙ আর তারচেয়েও বেশী অনভ্যস্ত হৃৎপিন্ড একটা করে বাঁক ঘুরলেই এমন দুমদুমাদুম করে লাফাতে থাকে যে কোথাও পাঁচমিনিট কোথাও আরো বেশী জিরিয়ে নিই। অনেক জায়গাতেই রাস্তা এত সরু যে জিরোতে গেলে ওই পাশের পাথরে ভর দিয়ে হেলে অন্যদের পাশ দিতে হয়। ওঠার লোক সব চলে গেলেও অনেকে নামছেন। ট্যুরিস্টই মূলত, একদিন বা দুদিন কাটিয়ে কিম্বা আরো উপরে ট্রেক করে ফিরছেন। সকলেই উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন ‘'বাস আ গ্যয়ে, অউর থোড়া হি যানা হ্যায়’’ এবং আমি চড়ছি তো চড়ছিই। ... ...