

তবে গুহা দেখার আগে আরও কিছু অত্যাশ্চর্য জিনিসের কথা বলে নিই। মৌলিন্নং থেকে বেরিয়ে খুব সকালে প্রথমে আমরা সেখানেই গিয়েছিলাম। জিনিসটা হল জীবন্ত সেতু। মানে বনের গাছ কেটে তার কাঠ দিয়ে বানানো সেতু নয়। নদীর ওপরে রীতিমত জ্যান্ত গাছের ঝুরি পাকিয়ে বানানো ঝুলন্ত সেতু। যদিও অনেকটা হেঁটে যেতে হয়, সিঁড়িও প্রচুর। তবে কষ্ট না করলে কী আর কেষ্ট মেলে? কেষ্ট যা দেখলাম আমি তাজ্জব। খাসি পাহাড়ের মানুষের আবিষ্কার এই প্রাচীন প্রযুক্তি। বেশ কায়দা করে রাখা বাঁশ অথবা সুপুরি গাছের ফাঁপা নলের মধ্যে দিয়ে রবার গাছের ঝুরি এগিয়ে চলে। নদীর এপারের ঝুরি ওপাশে, ওপারের ঝুরি এপাশে যুগ যুগ ধরে মোটা হয়। স্থানীয় মানুষ মাঝে মাঝেই নতুন ঝুরি চালনা করে সেতু পোক্ত করে, আর মরা ঝুরি বাদ দিয়ে দেয়। কিছু কিছু ঝুরি আবার বাঁশ বা সুপুরির নলের চারপাশ দিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়া হয়। এবারে ঐ বাঁশ, বা সুপুরির নল যখন পচেও যাবে, ঝুরিগুলো যেহেতু জ্যান্ত, সেগুলো থেকে যাবে। তবে শুধু এই প্রযুক্তির কথাটুকু বললেই সবকিছু বোঝানো যাবেনা। এতটা কষ্টকর ট্রেকিঙের পর পুরস্কারের তুলনা নেই। ঘন সবুজে ঢাকা এক ছায়া ঘেরা পাহাড়ি বনপথ। মাথার ওপরে মায়াঘেরা বিশালাকায় সব বৃক্ষ। পাহাড়ের মাঝে দুরন্ত জলস্রোত। সেই সজীব ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়িয়ে সবুজ বন, শ্যাওলা রঙা অনচ্ছ পাহাড়ি নদী, বড় বড় পাতার ছাতার ফাঁকে ছেঁড়া ছেঁড়া নীল আকাশ, ঠান্ডা ভেজা বাতাসের স্পর্শ, আর নিঝুম বনে বয়ে যাওয়া জলের মৃদু আর মিষ্টি শব্দ - সব মিলিয়ে বেশ একটা আদিম পরিবেশ। মনে হয়, যেন আমি সভ্য পৃথিবীর কেউ নই, সেই আদ্যিকালের গুহাবাসিনীই আছি। আমার স্থান কাল জ্ঞান কিছু মূহুর্তের জন্য যেন থমকে গিয়েছিল সেতুর মাঝামাঝি এসে। সহযাত্রীর ঠেলায় চমকে উঠলাম। এই সেতু তো ধাতব নয়, এ যে গাছের শরীর। বেশি লোক একবারে পারাপার হতে পারেননা, সীমা নির্দিষ্ট করা আছে। আমরা নদীতে নেমে গেলে, পরের অপেক্ষমাণ যাত্রীরা সুযোগ পাবেন। ছেলেমেয়েদের খুব উৎসাহ, তাদের পায়ের জোরও বেশি, তারা অনেক আগেই নীচে জলের কাছে নেমে পড়েছে। আমাকে ডাকছে। আমি খুব সাবধানে নামতে লাগলাম। কাছাকাছি যেতেই নজরে এল, এখানেও অজস্র পট হোল রয়েছে। কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে আবার ফেরার পালা - আবার সেই দীর্ঘ পথ। মাঝে মাঝে জিরিয়ে নেবার জন্য কিছু বাঁশের বেঞ্চ আছে বটে, তবে সেগুলো নড়বড়ে। পাহাড়ি পথে চওড়া পাথর খুঁজে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিয়ে ফিরছি, এবার চারপাশে দেখালাম, এই ঝুরি প্রযুক্তি শুধু যে সেতু বানানোর কাজে লাগানো হয়েছে তা নয়, ঝুরি দিয়ে বেশ মই বানিয়ে উঁচু গাছে মাচা তৈরি হয়েছে। কিছু ছেলেমেয়ের ইচ্ছে ছিল একবার চড়ে, কিন্তু সারাদিনে অনেক জায়গা ঘোরার আছে, এখানে বেশি সময় নষ্ট করা যাবেনা, তাই কড়া চোখে তাদের নিরস্ত করা গেল। সামনে চোখ পাকালেও মনে মনে হাসি, বশে না রাখতে পারলে এরা মাচায় ওঠা, নামা, ঝোলা, দোল খাওয়া করেই বেলা কাটিয়ে দিতে পারে। খেলা ধুলোর সুযোগ পায়না তো আজকাল, ফিল্ডে এলে ভিতরের চাপা পড়া গেছো জিনগুলো সব প্রকট হয়ে যায়। ডুয়ার্সের রিসর্টে একবার সন্ধেবেলা একটি ছেলেকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। তাকে দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু সে সমানে মোবাইলে মেসেজ করে যাচ্ছে যেন সবাইকে দেখতে পাচ্ছে, যেমন - আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরোনা, তোমরা আমাকে পাবেনা, তবে আমি সব দেখতে পাচ্ছি। কারোর নাম করে লিখছে, রেলিঙের ধারে অত ঝুঁকোনা, পড়ে যাবে - ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষে বেগতিক দেখে হোটেল মালিক বড় একটা সার্চ লাইট নিয়ে খুঁজতে বেরোলেন - তাঁর বক্তব্য আমার হোটেলে কোথায় এমন লুকোনোর জায়গা আছে যা আমি জানিনা। শেষমেশ কেউ পেলনা, ছেলেটি নিজেই হোটেল ক্যাম্পাসের ভেতরে একটা বেঁটে আমগাছ থেকে নেমে এল, এতক্ষণ ওখান থেকেই সব নজর রাখছিল। পাগলা দাশু তো আর সুকুমার রায় এমনি এমনি লেখেননি, এরকম চরিত্র সব যুগেই একটা করে থাকে। শুধু বাকসোর ভেতর চিরকুটে কাঁচকলা খাও আর বেশি কৌতূহল ভালো নয় - এসব লেখার যুগ আর নেই। এখন মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে। একালের দাশুরা তাই দিয়েই কাজ চালাচ্ছে।
আমরা পৌঁছে গেছি মৌসমাই গুহার সামনে। সামনে কিছুটা প্রশস্ত জায়গা, ধারে ধারে কয়েকটি দোকান। গুহায় ঢোকার টিকিট ট্রাভেল এজেন্ট কেটে নিয়ে এলেন, এই একটা সুবিধে, ঝাড়া হাত পা থাকতে পারি। আমরা ধীরে সুস্থে পরপর লাইনে দাঁড়ালাম। চুনাপাথরের গুহা অভিযান খুবই থ্রিলিং হয়, অন্তত যে প্রথম দেখছে, তার জন্য তো বটেই। আমি অবশ্য এর আগেই দেখেছি কয়েকবার। অনার্স পড়ার সময়ে দেখেছি জটাশঙ্কর আর চাকরি সূত্রে দু দুবার বোড়া কেভস। ১৯৯০-৯১ সাল নাগাদ কলেজ থেকে ফিল্ডে গিয়েছিলাম পাঁচমাড়ি হিল স্টেশনে। পাঁচমাড়ি হল মধ্য ভারতে সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর রানী - কুইন অফ সাতপুরা। নিয়ে গিয়েছিলেন জয়িতা সেন, আর জয়শ্রী রায়চৌধুরী। জয়িতাদি আজ আর নেই, আর জয়শ্রীদি ডিরেক্টর অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। আজও ভাবলে স্বপ্নের মত লাগে। ব্রেবোর্নে তখন আমরা অনার্স থার্ড ইয়ার। সেই প্রথম হাতে কলমে প্রকৃতিকে স্পর্শ করার, অনুভূতি - ভোলা যায়না। জটাশঙ্কর গুহায় প্রথম আমি সচক্ষে স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাকমাইট দেখলাম। আসলে চুনাপাথরের গুহা তো, ভিতরের দিক দিয়ে জলধারা বইছে। চুনজল টুপটুপিয়ে গুহার ছাদ থেকে পড়ছে। যুগ যুগ ধরে গুহার মেঝেতে চুন জমা হয়ে হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। লম্বা লম্বা সেই সব চুনের ঢিপিকেই শিবজ্ঞানে পুজো করা হয়। এই শিবলিঙ্গগুলি আসলে স্ট্যালাকমাইট। ভেতরটা খুব ঠান্ডা আর ভেজা ভেজা - আজও যেন মনে পড়লে সেই আর্দ্র শীতল বাতাস মনকে দোলা দিয়ে যায়। গুহার ছাদ যত এগোই, নিচু হয়ে আসে, শেষে হামাগুড়ি দিতে হয়। কিন্তু পথের শেষে দেখেছিলাম এক আশ্চর্য অবয়ব। বড় একটা চ্যাপ্টা পাথরের মাথার ওপরে চুনজল পড়ে, আবার সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। অবাক হয়ে দেখেছিলাম চ্যাপ্টা পাথরের মাথা থেকে যেন পাকানো চুনের দড়ি সব ঝুলছে। মানে মাথা থেকে চুন জমে জমে লম্বা হয়ে ঝুলে আছে। এই ঝুলন্ত ফর্মেশনটাই হল স্ট্যালাকটাইট। সব মিলিয়ে রূপটা হয়েছে যেন একটা বিশাল সাপের ফণা। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ এই প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি ফণাকে শেষনাগ কল্পনা করে পুজো করেন।
চুনাপাথরের গুহা সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে। যাই হোক, আমরা ঢুকে পড়লাম মৌসমাই গুহার ভেতর। অসংখ্য স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাকমাইটের স্তম্ভের ভেতর দিয়ে সংকীর্ণ পথ। ঢোকার সময়ে সোজা চলা যায়, কিন্তু কিছুটা এগোলেই ছাদ নিচু হয়ে আসে। মাথা ঝোঁকাতে ঝোঁকাতে কোথাও কোথাও প্রায় হামাগুড়ি দেবার পরিস্থিতি হয়ে যায়, কোথাও আবার নিচু একটা পাঁচিল টপকানোর কায়দায় নিজেকে বাঁচিয়ে এগিয়ে চলতে হয়। ভেতরে বিদ্যুৎবাতি আছে বটে, তবে সাধাসিধে ব্যবস্থা, যেটুকু নাহলে নয় সেটুকুই। অন্ধ্রপ্রদেশের বোরা কেভসের মত নানা রঙের আলোর ঝর্নার সাজনগোজন এখানে নেই। আর ওভাবে সাজানোর মত অত প্রশস্ত জায়গাও নেই। গুহার পথ সরু আর লম্বা। একদিক দিয়ে ঢুকে পড়লে পুরো পথ উজিয়ে অন্য মুখে বেরোনো যাবে। অর্ধেক পথ গিয়ে আর যাবনা বললে হবেনা। ফিরে আসার সুযোগ নেই। তবে সাধারণ পর্যটকেরা যেটুকু পথ গুহার ভেতরে পাড়ি দিতে পারেন, আসলে কিন্তু গুহাটা তার চেয়ে অনেক অনেক বড় এবং নানা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ দপ্তর সেসব পথ বন্ধ করে রেখেছেন, খুব সম্ভবত আমাদেরই নিরাপত্তার জন্য। সারা ভারত জুড়েই আছে নানা অরিজিনের গুহা পথ - সবই যে চুনাপাথরের তা নয় মোটেই, তবে সাধারণের জন্য সেসব বন্ধ করা আছে।
মৌসমাই গুহায় ঐ চলার পথেই দেখে নিতে হয় গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হওয়া নানান ভাস্কর্য। কিছু কিছু অবয়ব বেশ স্পষ্ট। চুনাপাথরের গায়ে জলধারার আঁকিবুকি দেখে কখনও মনে হয় বুঝি বা দেবদেবী,কখনও বা কোন হিংস্র প্রাণীর চিত্র। তবে গুহার দেওয়ালে যদি সুন্দর, অথবা অদ্ভুত শামুক, ঝিনুকের ছবি থাকে, তাহলে একটু দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখতে হবে, মানে দেখা উচিত। কারণ ঐগুলো শুধু প্রকৃতির খেয়াল নয় - ওই প্রাণীগুলো সত্যিই একদিন বেঁচে ছিল এই পৃথিবীর বুকে, আর আজ জীবাশ্ম বা ফসিল হয়ে পাহাড়ের কন্দরে অনন্ত শয্যায় শয়ান। যাই হোক গুহার অন্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পড়লাম একেবারে সবুজ পাহাড়ের কোলে। সেখান থেকে আরো বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আবার আর একটি গুহা আছে। সবাই যায়না সেদিকে। সদ্যই নাকি ওটা খুলে দেওটয়া হয়েছে সাধারণ পর্যটকদের জন্য। আমরা শুনেই লাফিয়ে উঠে সেই গুহার উদ্দেশে হাঁটা দিলাম। তবে সেখানে ঢুকে সবার আক্কেল গুড়ুম। আগেরটার চাইতে এই গুহাটা আরও বেশি গভীর এবং এখান দিয়ে চলা বেশ কঠিন। আর সর্পিল বলে বাতাস চলাচলে বাধা আছে। কিছুটা জায়গা বেশ বিপজ্জনক, কারণ পা দেবার মত মেঝে নেই, অনেক গভীর থেকে উঠে আসা স্ট্যালাকমাইটের মাথায় মাথায় পা দিয়ে ফাঁকা জায়গা টপকে যেতে হয়। এসব জায়গায় আমি বেশি কিছু নিজেকে নিয়ে ভাবিনা। চোখ বুজে চলে যাই ছেলেমেয়েদের ভরসায়। কারণ এইসব ক্ষেত্রে ওরাই আমার অভিভাবক। আমি পড়ি মরি যাই হয়ে যাক, ওরা আমাকে টেনে বের করবেই। তবে দুই ছাত্রীর হাঁপানি ছিল, এবং ভেতরে তাদের যথেষ্ট শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। আমার নিজের তেমন কোন সমস্যা হয়নি। চুনাপাথরের গুহা অনেক দেখেছি, তবে এত অপরিসর, সর্পিল, গভীর গুহায় আগে ঢুকিনি, এ একেবারে দস্তুরমত টম সইয়ারের বিপজ্জনক অভিযানের মত। পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে যাদের হাঁপানি আছে তাদের কখনই ঢুকতে দিতাম না। ভিতরে অনেক জিরিয়ে, ধীরে ধীরে চলে তারা অবশেষে বেরিয়ে এল। আর কী! এক দুরন্ত অভিজ্ঞতা আর অনেকটা মুগ্ধতা সঙ্গে নিয়ে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল। এবারের গন্তব্য শিলং। তবে শিলঙের পথে অস্ত রবির শেষ রাগ মিলিয়ে যেতে না যেতে সাঁঝের আঁধার আরও গাঢ় করে আকাশে ভেসে এল কালচে ধূসর মেঘের সারি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সোঁদা সোঁদা হিম হিম হাওয়া, সব কাচ বন্ধ করে, বাসের ভিতর সোয়েটারটা আরও একটু আঁকড়ে, সকলে একটু গা ঘেঁষে ঘেঁষে বসি। বাসের হেডলাইটে যতটুকু দেখা যায়, তার বাইরে কেবলই শূন্য। মাঝে মাঝে বাঁকের মুখে আলো যখন খাদের দিকে পড়ে, তখন সকালের ঝলমলে পাহাড়ি বনপথ কেমন যেন রহস্যময়, আদিম মনে হয়, অজান্তেই গা ছমছম করে।
রাতের দিকে আমরা পৌঁছলাম শিলং শহরে। প্রথম দেখায় আলোর মালায় ঝিলিমিলি ঝাঁ চকচকে নগর বলেই মনে হল। গাড়ির হর্ন, ট্রাফিক জ্যাম, শপিং মল, পশ্চিমি খাবারের বড় বড় রেস্তোঁরা, সব কিছুই বেশ জ্বলজ্বলে। সকলেই বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য টুকিটাকি জিনিস বাজার করতে লাগলো। আমি তাক বুঝে কিনে ফেললাম কাঠের তৈরি একটা ছোট্ট গাছ বাড়ি আর ছোট ছোট কাঠের টুকরো জুড়ে বানানো একটা জম্পেশ কাঠবিড়ালি। এই আমার একটা শখ। যেখানেই যাই, সেখানকার পুতুল বা খেলনা সংগ্রহ করি, সেগুলো দিয়ে প্রতি বছর বাড়িতে ঝুলন সাজাই। পরের দিন ফেরা - বেশি সময় ছিলনা হাতে। সকালে কুয়াশা ঘেরা উমিয়াম লেক, চিড়িয়াখানা দেখে এবারের মত যাত্রায় ইতি হল। উমিয়াম নদীর ওপরে বাঁধ দিয়ে মানুষ তৈরি করেছে এই বিশাল হ্রদ। যদিও এটি প্রাকৃতিক জলাশয় নয়, তবু এর সৌন্দর্য মন ভোলায়। উমিয়াম লেকের চারপাশে এক নব বিবাহিত খাসি দম্পতি আর তাদের আত্মীয়-বন্ধু-বাজনদারের মিলিত শোভাযাত্রাও দেখলাম তারিয়ে তারিয়ে। কুয়াশা ঘেরা পরিবেশে বধূটির সাদা গাউন আর ওড়না আলাদা করা যাচ্ছিলনা মোটে। চারিপাশে আবছা সবুজ পাহাড়ের সারি যেন পাইনের পাতার ওড়না জড়িয়ে রেখেছে গায়ে। এক নিস্তব্ধ শান্ত পরিবেশ, ভেজা ভেজা শীতল বাতাসে মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসে। ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া সেই হ্রদে সাজানো শিকারাগুলি মন্দাক্রান্তা সুরে ভাসে। যেন কোন তাড়া নেই কোথাও। আমি যে আসলে প্রকৃতিরই অংশ তা প্রকৃতির কাছে এসে অনুভব করি বারবার।
যে কোন হিল স্টেশনে এলেই মনটা খালি দার্জিলিং এর সঙ্গে তুলনা করতে থাকে। বল্লরীদি বলত দার্জিলিং এর চারপাশ সুন্দর, কিন্তু শিলং নিজে বেশি সুন্দরী। চারপাশে তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে মনে হল কথাটা ভুল নয়। শিলং বড় বেশ প্রশস্ত শহর, ঝাঁ চকচকে। দার্জিলিংয়ে যেমন একটা শার্প বৈপরীত্য চোখে পড়ে - মলিন পাহাড়ি বস্তির একটু পাশেই ঝিলিমিলি হোটেল, রেস্তোরাঁ, শিলংয়ে কিন্তু একনজরে তেমন চোখে পড়েনা। সাধারণ বসতি আছে তো বটেই, সহাবস্থান নেই। মেঘালয়ের এদিকে খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেশি। উমিয়াম লেকে তেমন বিবাহ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়েছিলাম। আবার রাস্তার ওপরে দুটি অল্পবয়সী বিদেশি ছেলেমেয়ে যীশুর বাণী সম্বলিত পুস্তিকা আর পোস্টার বিলি করছে। আমরা যেচে গিয়ে আলাপ করলাম। ফ্রান্স থেকে এসেছে দুজনেই গীর্জার কাজ নিয়ে। এমন করে ওরা ডিউটি অনুযায়ী নানা দেশে ঘোরে। কোথাও কোন সমস্যা নেই। আমরা গিয়েছিলাম একবিংশ শতকের কুড়ির দশকের একেবারে ঊষা লগ্নে। কোনধরণের মেরুকরণের আঁচ পাইনি। খুবই আনন্দে কেটেছিল মেঘালয়ের দিনগুলি। সঙ্গে ছিল স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীদের সার্ভে টীম। কিন্তু কাছাকাছি সময়ে যখন স্নাতক ছেলেমেয়েদের নিয়ে উড়িষ্যার দারিংবাড়ি গেলাম, তখন ফিল্ড খুব ভালো হয়েছিল, তবে জাতি বৈরিতার সামান্য একটু আঁশটে গন্ধ নাকে এসেছিল। বলছি গল্পটা।
………..