(দু'বছর পরে আবার কপি পেস্ট)
রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা ও শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রসঙ্গঃ পাঠ-প্রতিক্রিয়া
[স্বামী মেধসানন্দ (গণনাথ মহারাজ) বর্তমানে জাপানে রামকৃষ্ণ মিশনের শাখার প্রধান। গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার থেকে প্রকাশিত তাঁর লেখা রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা ও শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রসঙ্গ বইটি আমি একজন অনুজপ্রতিম বন্ধু এবং গুরুচণ্ডালির নীরব কিন্তু নিয়মিত পাঠকের সৌজন্যে পেয়েছি। তিনি বেলুড় বিদ্যামন্দিরের প্রাক্তন ছাত্র এবং গণনাথ মহারাজের ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসেছেন। তাঁর অনুরোধ যেন গুরু’র পাতায় এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখি।]
১
রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনার স্বরূপ
প্রথমেই স্বীকার করি, পড়া শুরু করেছিলাম একটু সংশয়ী মনোভাব নিয়ে। বইটি হয়ত অগণিত সেই সব বইয়ের একটি যাঁরা সবসময় চেরি-পিকিং করে এবং টেনে মানে করে দেখাতে চান যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে যত বাঙালী মনীষী জন্মেছেন তাঁরা সবাই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ চিন্তাধারার কাছে মাথা নুইয়েছেন।
কিন্তু খানিকক্ষণ পড়ার পরই ভুল ভেঙে যায়। এই এগারোটি প্রবন্ধের সংকলনটি একটি ব্যতিক্রমী গ্রন্থ এবং সুপাঠ্য।
রামকৃষ্ণ মিশনের একজন সন্ন্যাসীর চোখে রামকৃষ্ণ পরমহংস একজন অবতার এবং বিবেকানন্দ যুগপুরুষ হবেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু গণনাথ মহারাজের রবীন্দ্রপাঠের ব্যাপ্তি এবং গবেষকের নিষ্ঠা গোটা বইটিতে ছড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর মূল বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিহীন বা বিপরীত তথ্য এবং সাক্ষ্যকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন। তাঁর সমস্ত বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হতে হবে এমন তো নয়, কিন্তু অনেক বক্তব্য আমাদের চিন্তার খোরাক যোগায়, বিতর্ক উসকে দেয়। অনেক অজানা তথ্যের খোঁজ পাই। তাই বইটি পাঠযোগ্য।
এখানে স্বল্প পরিসরে আমি বইটির কয়েকটি প্রবন্ধপাঠের প্রতিক্রিয়া সংক্ষেপে লিখছি। যেমন, রবীন্দ্রনাথঃ অধ্যাত্মচেতনার ক্রমবিকাশ, বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী, শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত ও জীবনী, শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব এবং রবীন্দ্রনাথ ও কালী।
বইটির প্রতিপাদ্য বিষয়—রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনার স্বরূপ কী? এবং তার বিবর্তনে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব কতটুকু?
গোড়াতেই একটা কথা বলে নিই। আজকের ভারতে হিন্দুধর্মের সমস্ত ভক্ত ষড়দর্শনের মধ্যে কেবল বেদান্তের কোন-না-কোন ব্যাখ্যার( অদ্বৈত, দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অচিন্ত্যভেদাভেদ ইত্যাদি) অনুসারী। বাকি পাঁচটির স্থান কেবল বইয়ের পাতায় এবং অধ্যাপকদের কূটকচালিতে সীমাবদ্ধ। অতএব শ্রীরামকৃষ্ণ এবং রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচিন্তায় যে লসাগু তাহল উপনিষদ। কিন্তু তারপর?
আসুন, আমরা স্বামী মেধসানন্দের গবেষণাকে অনুসরণ করি। আমাদের বিষয় রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচিন্তায় শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব।
স্বাভাবিক ভাবেই এই আলোচনায় যে প্রশ্নগুলো উঠেছে তার কয়েকটি হলঃ
রবীন্দ্রনাথ কথামৃত পড়েছিলেন কিনা, পড়লে তাঁর প্রতিক্রিয়া কী? রামকৃষ্ণদেবকে অবতার হিসেবে স্বীকার করতেন কিনা? মূর্তিপুজো নিয়ে তাঁর মনোভাব কী ছিল? বলিপ্রথা এবং কালীপুজো নিয়ে তাঁর বিরাগের কারণ? শেষে দুই মহামানবের মহামিলন নিয়ে কল্পনা।
রবীন্দ্রনাথঃ অধ্যাত্মচেতনার ক্রমবিকাশ
প্রথম প্রবন্ধটির গোড়ায় ব্রাহ্ম সমাজের ‘নিরাকার’ সাধনার অপূর্ণতা এবং তার অস্তিত্বের সংকট নিয়ে কিছু কটু মন্তব্য রয়েছে। যেমন –‘ধর্মসাধনার যে প্রধান লক্ষ্য ঈশ্বরোপলব্ধি বা আত্মোপলব্দদ্ধি তা ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। আবার, সাপ্তাহিক সমবেত উপাসনা ‘অনেকটা খ্রিস্টীয় সমবেত উপাসনা পদ্ধতির অনুসারী’।
[1]লেখকের মতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে দেবেন্দ্রনাথ প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের কারণে প্রথাগত পারিবারিক হিন্দু অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেল। অথচ, ‘পরিবারের সদস্যদের সহজাত ধর্মীয় আবেগ পরিপূর্তির নূতন কোনও ধারাও সৃষ্টি হল না’
[2]।
তাই ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একধরণের ধর্মীয় অভাববোধ ছিল যা কেবল সাহিত্য, সঙ্গীত, অঙ্কন, অভিনয়ের আংশিক চর্চায় পূরণ হবার নয়।
দেখা যাচ্ছে, ‘রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক অশান্তিতে বিরক্ত হয়ে একবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় জোড়াসাঁকোতে এসে সেই দিনেই শান্তিনিকেতনে চলে যান’
[3]। দেবেন্দ্রনাথও অধ্যাত্মচর্চার জন্য জোড়াসাঁকো নয়, হয় গঙ্গাবক্ষ, না হয় হিমালয়, বা কোনও নিরালা প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা ভেবেছেন।
কারণ, ‘সেখানে সাধারণভাবে ধর্মচর্চার কোনও সুযোগ থাকার ও তাকে গ্রহণ করার উদাহরণ ছিল না বললেই হয়’।
উপরের দুটো তথ্য সত্য বটে, কিন্তু কারণ? এ নিয়ে কিঞ্চিৎ দ্বিমত পোষণ করি। যদি হিন্দু বা কোন ধর্মের আচার অনুষ্ঠান মানুষের যন্ত্রণা লাঘবের এবং মানবমনের অনন্ত জিজ্ঞাসা ও পিপাসা মেটানোর একমাত্র বিশল্যকরণী হত তাহলে বেলুড় এবং দক্ষিণেশ্বরের পরিচালনায় এত ভিন্নতা হত না।
সিস্টার নিবেদিতাকে বাগবাজারের গিয়ে আলাদা করে সংস্থা গড়তে হত না।
আসলে আমরা সবাই মানুষ। রবীন্দ্রনাথ এবং বিবেকানন্দও তাই, মহামানব হলেও মানব তো বটেন। কাজেই প্রপঞ্চময় জগতের অসম্পূর্ণতা আধিব্যাধি তাঁদেরও স্পর্শ করে।
লেখক সঠিকভাবে বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের কেন্দ্রে, তাঁর জীবনদেবতার ধারণায়, রয়েছে ঔপনিষদিক আধ্যাত্মিকতা। কিন্তু সেই অধ্যাত্ম বোধ থেমে যায়নি। ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে।
প্রতিমাপূজা রবীন্দ্রনাথ একসময়ে বলেছিলেন ‘মূর্তিপুজা সেই সময়েরই--- যখন--- ধর্ম আপন ঈশ্বরকে সঙ্কুচিত করিয়া সমস্ত মানুষকে সঙ্কুচিত করিয়াছে’
[4]। তাঁর ‘রথ ভাবে আমি দেব, পথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী’' –সুবিদিত।
তিনিই আবার ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে দুর্গাপূজার প্রকৃত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে লিখলেন—‘ যেটাকে আমরা দূর থেকে শুষ্ক হৃদয়ে সামান্য পুতুলমাত্র দেখছি সেইটে কল্পনায় মণ্ডিত হয়ে পুতুল-আকার ত্যাগ করে; তখন তার মধ্যে এমন একটি বৃহৎ ভাবের এবং প্রাণের সঞ্চার হয় যে, দেশের রসিক-অরসিক সকল লোকই তার সেই অমৃতধারায় অভিষিক্ত হয়ে ওঠে’
[5]।
অসিত কুমার হালদারের স্মৃতিকথায় রয়েছে ‘ তিনি বলে ছিলেন, আমাদের দেশের লৌকিক আনুষ্ঠানিক পূজার মধ্যেও অনন্তরূপের উপলব্ধি আছে’
[6]।
তবু লেখকের এই বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য—‘ঈশ্বরের প্রতিমা সম্বন্ধে তাঁর প্রথম যুগের প্রতিকূল মনোভাব পরবর্তিকালে অনেকটা নমনীয় হয়ে এলেও তিনি কখনও তাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন কিনা সন্দেহ’
[7]।
আমরা বর্তমান লেখাটির শেষের দিকে ‘রবীন্দ্রনাথ ও কালী’ অধ্যায়ে এনিয়ে আরও একটু বিস্তারিত আলোচনা করব।
আমার ব্যক্তিগত মত হল রবীন্দ্রনাথ রসের কান্ডারী, সৌন্দর্যেরও। এজন্যেই রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচিন্তায় , কবিতায়, গানে আরাধনার লৌকিক রূপ, বাউল সংস্কৃতি, এবং বৈষ্ণব পদাবলীর লক্ষণীয় প্রভাব। ‘প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই দেখি তাই সকলখানে’।
যেখানে ঈশ্বর আরাধনা নীরস প্রাণহীন ঔপচারিকতায় আটকে গেছে সেখানেই রবীন্দ্রনাথের মন বিরূপ। এর প্রকাশ দেখি অচলায়তনের পঞ্চক চরিত্রের ‘ওঁ তট তট, তোটয় তোটয়’ আবৃত্তিতে অনীহায়, শোনপাংশুদের প্রাচীর ভেঙে দেয়ায় আবার দর্ভকদলের “ও অকুলের কুল” আর্তিতে।
লেখক উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতিটি --- ওঁর অধ্যাত্মচিন্তার বাতাসে বৈষ্ণবসাহিত্য এবং উপনিষদ যেন নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেনের মিশ্রণ।
[8]
তবে এর সবচেয়ে সংহত প্রকাশ গোরা উপন্যাসে, পানুবাবু এবং পরেশবাবু , গোরা ও সুচরিতার বৈপরীত্যে। লেখকের বক্তব্যের যে প্রসঙ্গগুলো—পৌত্তলিক অথচ সজীব হিন্দুধর্ম, শুষ্ক নিরাকার-পূজক ব্রাহ্মধর্ম, খ্রিস্টিয় ধর্মের সঙ্গে নৈকট্য—এর সবগুলো দিক নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা এবং বিতর্ক ধরা আছে ‘গোরা’ উপন্যাসে।
আমার বিনীত মত – রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচিন্তা এবং ঈশ্বরচিন্তার স্বরূপ বিচারে তাঁর প্রবন্ধের চেয়েও ‘গোরা’ উপন্যাস এবং ‘অচলায়তন’ নাটকের আলোচনা বেশি প্রাসঙ্গিক। এটি হলে গণনাথ মহারাজের প্রথম প্রবন্ধটি বেশি দানা বাঁধত।
লেখক রবীন্দ্রনাথের গানে প্রেম এবং অধ্যাত্ম কেমন সীমান্তের বেড়া ভেঙে বারবার মিলে মিশে যায় তা লক্ষ্য করেছেন।
এখানে একটি কথা বলার। বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা (জীবাত্মা) কৃষ্ণের (পরমাত্মার) সঙ্গে মিলিত হতে অভিসারে যান।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথে তাঁর ঈশ্বর , তাঁর পরাণসখা ভক্তের জন্য কষ্ট সহ্য করে ‘সুদূর কোন নদীর পারে, গহন কোন অন্ধকারে’ ঝড়ের রাতে অভিসারে বেরোন। তাঁর দুঃখরাতের রাজা ঝড়ের রাতে তাঁর কুটিরে এসে হাজির হন। এইভাবে প্রেম এবং অধ্যাত্ম মিলেমিশে যায়। তা ইরবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মবোধ অনেকাংশে সুফী বা মরমিয়া সাধকদের কাছাকাছি। রামকৃষ্ণদেবের থেকে ভিন্ন।
বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়
এখানে গণনাথ মহারাজের দুটি বক্তব্য আমার নজর কেড়েছে।
এক, যাঁদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য যোগসাধনের পথ দিয়ে ‘আত্মসাক্ষাৎকার’ –রবীন্দ্রনাথ সে পথের পথিক নন।
দুই, রবীন্দ্রনাথের প্রহসন ধর্মী নাটক ‘চিরকুমার সভা’ নাকি পরোক্ষে সন্ন্যাসী সঙ্ঘের সমালোচনা! লেখক বলছেন যে এখানে স্বামী বিবেকানন্দের বরানগরে প্রতিষ্ঠিত গুরুভ্রাতাদের মঠের প্রতি কটাক্ষ রয়েছে।
সাক্ষ্য হিসেবে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রজীবনকথা’য়
[9] মন্তব্যটির উল্লেখ করেছেন। আরও উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাট্যপরিক্রমায় (ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, পৃঃ ৩৯৮) উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রভাতকুমারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছেন—‘
সংসারবিমুখ, স্ত্রীপরিজনশূন্য সন্ন্যাসধর্ম কবি কোনদিনই অনুমোদন করেন নাই। পুরাপুরি সন্ন্যাসজীবন অসম্পূর্ণ ও অস্বাভাবিক, আবার পুরাপুরি সংসারসর্বস্বতাও সংকীর্ণ, খণ্ড ও অসম্পূর্ণ----‘।
স্বাভাবিকভাবেই স্বামী মেধসানন্দ এতে দুঃখ পেয়েছেন। বলেছেন ‘শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘের সন্ন্যাসীদের প্লেগের সেবাকার্য এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ যে স্বামীজীর কর্মযোগের আদর্শকে অভিনন্দিত ও প্রশংসা করেছিলেন –এসবের কোন উল্লেখ উপরোক্ত দুটো বইয়ে নেই।
এই প্রসঙ্গে ওনার আরও একটি মন্তব্য—মৌলিক এবং সৃষ্টিশীল মানুষ তথা নবীন পথপ্রদর্শকদের বিরুদ্ধ সমালোচনা এবং তাঁদের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণের উদাহরণ ইতিহাসে প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন নিয়েও এসব হয়েছিল।
বৈরাগ্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি ঠিক কী?উত্তর মেধসানন্দই দিয়েছেন। ‘আমি বৈরাগ্যের নাম করে শূন্য ঝুলির সমর্থন করি না।- -- অন্তরে প্রেম বলে সত্য পদার্থটি যদি থাকে তবে তার সাধনাবুদ্ধেরয়, ভোগকে হতে হয় সংযত, সেবাকে হতে হয় খাঁটি’
[10]।
এখানে বুদ্ধদেব এবং রবীন্দ্রনাথ নিয়ে লেখকের মন্তব্যটি প্রাসংগিক।
‘যদিও বুদ্ধদেব ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না, অথচ রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসী, তবুও বুদ্ধের মানবজীবনের মূল সমস্যা ওতার সমাধান নিয়ে ‘প্র্যাকটিক্যাল’ আলোচনা, তাঁর যুক্তিনিষ্ঠা, সর্বোপরি তাঁর মহাপ্রাণতা, সর্বজীবে দয়া এবং শান্ত পুণ্য ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল’
[11]।
এবার ভক্তির পালা।
লেখক বলছেন--রবীন্দ্রনাথ হৃদয়হীন শুষ্ক আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং ভক্তির আবেগে হৃদয়বৃত্তির সাময়িক উদ্বেলতা তথা ভাবোচ্ছাস—দুটোকেই মেনে নিতে পারেননি। লেখক উদ্ধৃত করেছেনঃ
যে ভক্তি তোমারে লয়ে ধৈর্য নাহি মানে,
মুহুর্তে বিহ্বল হয় নৃত্যগীতগানে
ভাবোন্মাদমত্ততায়, সেই জ্ঞানহারা
উদ্ভ্রান্ত উচ্ছল ফেন ভক্তি মদধারা
নাহি চাহি নাথ।
[12]লেখক সঠিক ভাবেই বলছেন --অথচ শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্যের ভক্তির উচ্ছাস ছিল তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এখানে আমার দুটো কথাঃ
এক, এই জন্যেই কি শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনভাবে রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করতে পারেন নি? এ নিয়ে লেখকের গবেষণালব্ধ তথ্য আমরা পরে দেখব।
দুই, এই প্রসঙ্গে গণনাথ মহারাজ যদি রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে ’না-ঈশ্বরে’ বিশ্বাসী জ্যাঠামশায়ের সন্ন্যাসী সংঘের সমান্তরাল কর্মযোগ, ্লীলানন্দ স্বামীর ভক্তিমার্গে ভাবোচ্ছাসে শচীশের ভেসে যাওয়া এবং দামিনী ও শ্রীবিলাসের সংসারের কঠিন ভূমিতে ফিরে আসা নিয়ে একটু আলোচনা করতেন তাহলে বৈরাগ্য এবং ভক্তিমার্গ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আরও স্পষ্ট হত।
রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে আর্তের সেবাকার্যের জন্য সন্ন্যাসী হওয়া আবশ্যক নয়, দরকার তাদের যন্ত্রণাকে অনুভব করা।
লেখক বলেছেন—‘ধর্মের বহিরঙ্গ হল আচার-অনুষ্ঠান আর অন্তরঙ্গ দিক হল আধ্যাত্মিকতা। আধ্যাত্মিকতা হল এমন একটা বোধ যার দ্বারা ঈশ্বর, বিশ্বপ্রকৃতি, সকল মানুষ এবং নিজের মধ্যে বিরাজিত এক অখণ্ড সত্তাকে উপলব্ধি করা যায়’। এই চমৎকার সংজ্ঞাটির সঙ্গে বোধহয় সবাই সহমত হবেন।
তাহলে কী দাঁড়াল?
লেখকের মতে রবীন্দ্রনাথ কোনও সাম্প্রদায়িক ধর্মে বিশ্বাসী নন, তাঁর ধর্মবিশ্বাসের শাঁস হল উপনিষদ এবং মানবধর্ম। তবে তিনি উপনিষদের শুধু নিরাকার সগুণ ব্রহ্মের তত্ত্বকে গ্রহণ করেছেন; নিরাকার শুদ্ধ চৈতন্য, নির্গুণ ব্রহ্মকে নয়
[13]। লেখকের আরেকটি উক্তি—‘ভালবাসার ভাষা এক—তা সে মানবীয় প্রেম হোক বা ভগবৎ প্রেমই হোক’
[14]।
সন্ন্যাসীর মুখে এই স্বীকৃতি! শ্রীরামকৃষ্ণ যে কামিনী-কাঞ্চনত্যাগের কথা বলতেন। তাঁর চিন্তায় নারী কেবল মাতৃরূপা। তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই।
আমি লেখকের উপরোক্ত দুটো বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত এবং আপ্লুত।
রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা এবং মানবধর্মের সঙ্গে তার মেলবন্ধন নিয়ে লেখকের উপলব্ধির সঙ্গে আমার কন্ঠস্বর মিলিয়ে প্রথম দুটো অধ্যায়ের আলোচনায় দাঁড়ি টানছি।
‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’।
‘শক্তির অহংকারে, স্বার্থবুদ্ধি কিংবা মূঢ়তাবশত যখন মানুষ মানুষকে দ্বেষ করেছে, সম্প্রদায় সম্প্রদায়কে ঘৃণা করেছে, জাতি জাতির ওপর অত্যাচার করেছে, দেশ দেশকে আগ্রাসন করেছে তখন সেই মানবধর্ম নিপীড়িত হয়েছে। সে পরিস্থিতি রবীন্দ্রনাথ নীরবে মেনে নেননি’
[15]।
২ শ্রীরামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথশ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিদ্রূপ এবং সশ্রদ্ধ দু’রকমের মন্তব্যই আছে। লেখক সবগুলোকেই স্থান দিয়েছেন। এর থেকে রবীন্দ্রমানসের কিছু দিক অবশ্যই ধরা পড়ে।
রবীন্দ্রনাথের কিছু তির্যক মন্তব্য চুয়াল্লিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন—‘রূপ ও অরূপ’ প্রবন্ধ, যাতে শিক্ষিত লোকের প্রতিমা -পূজার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিমা ভক্তিকে বিশেষ রূপের বন্ধন আখ্যা দিয়ে তিনি বলছেনঃ
“ এই বন্ধন মানুষকে এতদূর পর্যন্ত বন্দী করে যে শুনা যায় শক্তি উপাসক কোনও একজন বিখ্যাত
ভক্ত মহাত্মা আলিপুর পশুশালায় সিংহকে বিশেষ করিয়া দেখিবার জন্য অতিশয় ব্যাকুলতা প্রকাশ করিয়াছিলেন। --কেননা, সিংহ মায়ের বাহন। শক্তিকে সিংহ রূপে কল্পনা করিতে দোষ নাই, কিন্তু সিংহকেই যদি শক্তিরূপে
দেখি তবে কল্পনার মহত্ত্বই চলিয়া যায়। --- যদি (কল্পনা) কোন এক জায়গায় আসিয়া বদ্ধ হয় তবে তাহা মিথ্যা, তবে তাহা মানুষের শত্রু’[16]।
মেধসানন্দ বলছেন – এই মন্তব্যের লক্ষ্য ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস। কথামৃতের চতুর্থ খণ্ডে উল্লেখ আছে যে চিড়িয়াখানায় সিংহ দেখে তাঁর উদ্দীপনা হয়েছিল।
গণনাথ মহারাজের মতে,রবীন্দ্রনাথের কটাক্ষ অযথার্থ। কারণ তিনি, ঘটনাটিকে প্রেক্ষিতের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেছেন। উনি বোঝেন নি যে ‘দেব মানব শ্রীরামকৃষ্ণের চেতনা সর্বদা ঈশ্বরচৈতন্যে নিমজ্জিত, ঈশ্বরই তাঁর একমাত্র সম্ভোগের ক্ষেত্র’
[17]।
মেধসানন্দ বলছেন—গড়ের মাঠে ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়ানো শ্বেতাঙ্গ বালককে দেখে ঠাকুরের শ্রীকৃষ্ণের উদ্দীপন, নীলবসনা বারাঙ্গনাকে দেখে তাঁর সীতার উদ্দীপন- কথামৃতের পাঠক মাত্রেই জানেন। গিরিশ্চন্দ্র রেগে গিয়েছিলেন। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত মন্তব্য অনধিকার চর্চা মাত্র।
হক কথা। কিন্তু আমি ভক্ত নই, তাই দিব্য উন্মাদনা নিয়ে কিছু বলার অধিকারী নই। আমার ভোট এবিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে।
আবার ১৯২৫ খ্রীস্টাব্দে , মানে ৬৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ভাইঝি ইন্দিরাদেবীকে লিখছেন,’মনটা কী ভাবে ভিতরে ভিতরে লেখা সম্বন্ধে হরতাল নেবার পরামর্শ করছে। টাকা ছুঁলেই রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের যে-রকম সর্বাঙ্গে আক্ষেপ উপস্থিত হত কলম ছুঁতে গেলেই আমার সেরকম হয়’।
[18]
তিন, শান্তিনিকেতনে পাঠদানের ব্যবহারের জন্য ধর্মজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাণী ও উপদেশের একটি সংকলন করা হয়েছিলে যার সম্পাদনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাতে ১১০ টি বাণী সংগৃহীত হয়েছিল মেধসানন্দ জানাচ্ছেন তাতে শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বসাকুল্যে ছয়টি বাণী স্থান পেয়েহিল। অন্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী,স্বামী বিবেকানন্দ।
চার, মেধসানন্দ মহারাজ তাঁর বইটির ১৩৬ পৃষ্ঠায় শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ছয়টি প্রশংসাবাচক উক্তি সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু তাঁর অসাধারণ মন্তব্য হল—এই উক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন এবং কোন না কোন বিশেষ উপলক্ষে দেয়া, এই মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথের মৌলিকতা অনুপস্থিত। ‘যেমন, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, গান্ধীজি এমনকি ভগিনী নিবেদিতার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন অনেক মৌলিক এবং গভীর’। (পৃঃ ১৩৭)
বরং কথামৃত পাঠে রবীন্দ্রনাথের পাঠ-প্রতিক্রিয়া এবং কালীপূজা নিয়ে চিন্তা অনুধাবন করলে দু’জনের ধর্মচিন্তার পৃষ্ঠভুমিতে উপনিষদ এবং বেদান্ত দর্শনের জমি সত্ত্বেও কেন স্বামী মেধসানন্দ কাঙ্ক্ষিত মহামিলন সম্ভব হলনা সেটা খানিকটা বোঝা যাবে।
কথামৃত ও রবীন্দ্রনাথস্বামী মেধসানন্দ জানিয়েছিলেন জনৈক যুবক ত্রিষ্টুপ মুখোপাধ্যায়, যিনি একাধারে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং রবীন্দ্র অনুরাগী, রবীন্দ্রনাথকে দুটি চিঠি লিখেছিলেন। ওনার প্রশ্নঃ রবীন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে সাক্ষাতে দেখেছেন কিনা আর কথামৃত পড়েছেন কিনা। পড়ে থাকলে কেমন লেগেছে? আর দ্বিতীয়টিতে অনুরোধ রবীন্দ্রনাথ যেন ‘পরমহংসদেব সম্বন্ধে বিস্তারিত’ লেখেন।
রবীন্দ্রনাথ দু’বারই উত্তর দিয়েছেন
[19]। প্রথমটি সংক্ষিপ্ত এবং সৌজন্যমূলক। রবীন্দ্রনাথের উত্তরগুলো থেকে আমরা যা জানতে পারিঃ
এক, ‘পরমহংসদেবকে একদিন দশমিনিটের জন্য দূর থেকে দেখেছি’।
দুই, কথামৃত পড়ে রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে ‘ কোনো কোনো অংশ মনে হল বিদেশী সাধকদের থেকে সংগৃহীত’।
দ্বিতীয়টির উত্তর থেকেঃ
এক, ‘যাঁর সঙ্গে চিত্তের সঙ্গতি ঘটেনি তাঁকে সম্যকরূপে চিনতে পারা ও বিচার করা অসম্ভব’; এবং
’আমার পথ স্বতন্ত্র, সেইজন্যে তাঁর শক্তির স্বরূপ সম্বন্ধে কিছু যদি বলতে যাই, তবে ঠিক সুর বাজবে না’।
দুই, কথামৃত ‘পড়ে মনে ধারণা হয়েছিল বানানো কথা আছে’। তার কারণ যাঁর সংলাপ ‘কথামৃতে’ লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই রামকৃষ্ণ এবং যিনি তা সংগ্রহ করেছেন সেই শ্রীম বা মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের শক্তির পার্থক্য
[20]।
মেধসানন্দ জানাচ্ছেন যে রবীন্দ্রনাথ এবং পরবর্তীকালের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী কথামৃতের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মহারাজ বলছেন কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত থাকলেও উক্ত অভিযোগ অযথার্থ। তবে ‘শ্রীম’র “
নোট রাখা ও কথামৃত লেখার মধ্যে বেশ কয়েক বৎসরের ব্যবধান ছিল। সময়ের এই ব্যবধানের ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা ও কথামৃতে বর্ণিত ঘটনার মধ্যে সামান্য হেরফের ঘটার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না”।
[21] এরপরে মেধসানন্দ সুনীল গাঙ্গুলি , সৈয়দ মুজতবা আলি এবং আরও অনেকের সাক্ষ্য পেশ করে কথামৃতের সাহিত্য মূল্য স্থাপিত করার প্রয়াস করেছেন।
আমার মতে এই প্রয়াস অদরকারি এবং মূল প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কহীন।
কারণ, কথামৃত আজ নিজের জোরেই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। কথামৃত পাঠের আনন্দ ভক্ত ছাড়াও আমার মত আরও অনেক অ-ভক্ত নিয়েছেন।
এছাড়া, রবীন্দ্রনাথের পারসেপশন তাঁর নিজস্ব। সেটা ঠিক কী ভুল এই প্রশ্ন অবান্তর। বইটির বিষয়বস্তু তো রামকৃষ্ণ দেবকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কী ‘পারসেপশন’ সেটাই তুলে ধরা, তাই না?
রবীন্দ্রনাথ ও কালীগীতবিতানে কালী নিয়ে পাঁচটি গান আছে যার চারটিই ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ গীতিনাট্যের। কিন্তু মাত্র দু’টি রবীন্দ্রনাথের রচনা, অন্য দুটি অক্ষয় চৌধুরীর। স্বামী মেধসানন্দের মতে বাল্মীকি প্রতিভায় এবং, বিসর্জন নাটকে (পঞ্চম গানটি) কালীর উপস্থিতি নেতিবাচক। প্রথমটিতে কালী দস্যুদলের আরাধ্য দেবী, পরেরটিতে রক্তপিপাসু দেবী কালীর মূর্তিকে নদীর জলে নিক্ষেপ করা হয়।
তবে রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মচিন্তা’ প্রবন্ধে শিবের রূপ এবং প্রতীকের বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় নৃত্যরূপা কালীর সামান্য বর্ণনা রয়েছে যা ইতিবাচক।
কিন্তু মহারাজের ‘পারসেপশন’ --রবীন্দ্রনাথ উপরোক্ত ইতিবাচক ‘কালী’ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না
[22] –এ’নিয়ে আমাদের মধ্যেও কোন ভিন্ন মতের অবকাশ নেই।
রোলাঁ, রবীন্দ্রনাথ এবং ‘কালী’রোমাঁ রোলাঁর বিশাল লেখাপত্রের (উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত, বিভিন্ন জীবনী এবং রাজনৈতিক লেখাপত্রের) মধ্যে আমরা কেবল তিনটি বইয়ের কথা বলি—গান্ধীজি, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দ নিয়ে। হ্যাঁ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রোলাঁ ভেবেছিলেন বিশ্বশান্তি আসবে ভারতীয় মরমীয়া ধর্মের আশ্রয়ে। বলি না যে এক দশক পরেই তাঁর বিচার এবং বিশ্বাস বদলে যাচ্ছিল এবং হিটলারের উত্থান দেখে তাঁর মনে হচ্ছিল—‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’। তাই হিটলার অধিকৃত ফ্রান্সেও গোপনে তাঁর কলম চলত ফ্যাশিস্তদের বিরুদ্ধে, লিখেছিলেন ‘আই উইল নট রেস্ট’।
তিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন, তাঁর সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার দেশ পত্রিকার রবীন্দ্রশতবর্ষপূর্তি পত্রিকায় (১৩৬৯) ‘পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার’ প্রবন্ধে লিখলেন ‘রোমাঁ রোলাঁকে দিয়েও পরমহংস ও বিবেকানন্দের জীবনকথা লেখানো হয়েছে এবং তাঁকে যে সব উপকরণ সরবরাহ করা হয় তাতে বৈজ্ঞানিক ওঐতিহাসিক পদ্ধতির বিশুদ্ধতা সর্বত্র রক্ষিত হয়নি বলেই জানি’।
মেধসানন্দ নলিনীকুমার ভদ্রের সঙ্গে সমস্বরে বলছেন—‘এই উক্তি শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, আপত্তিজনকও বটে’
[23]।
মেধসানন্দ রোলাঁর ডায়েরি উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন রোলাঁর সঙ্গে আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই কালীর এবং কালীঘাটে বলির প্রসঙ্গ তুলে আক্রমণাআত্মক হয়ে উঠলেন।
‘ক্রোধ ও বিতৃষ্ণায় কাঁপতে কাঁপতে’ তিনি এমন কথাও বললেন—‘কালীর উপাসনা যারা টিকিয়ে রাখে তারা সুস্থ, সঠিক ও সৎ মানসিকতার লোক হতে পারে না। এই বীভৎস দেবীকে ধ্বংস করতে চাইলেন ------।
‘তাঁর দেশের লোকের বিরুদ্ধে, স্তুপীকৃত কুসংস্কার তাদের পিষ্ট করছে তার বিরুদ্ধে জ্বলে উঠলেন’
[24]।
স্বামী মেধসানন্দের ইংগিত এখানে রবীন্দ্রনাথের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য বিবেকানন্দ।
কালী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিতৃষ্ণা এতই প্রবল ছিল যে লেখক অবনীন্দ্রনাথের বকলমে একবার বিসর্জন নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় অভিনয়ের সময় রবীন্দ্রনাথের অস্বাভাবিক ক্রোধের পুরো বর্ণনাটাই উদ্ধৃত করেছেন। (পৃঃ ১৯৭)
মেধসানন্দ বলছেন --সেই সময় কালীপ্রতিমা ভঙ্গ করার দৃশ্যে রবীন্দ্রনাথের চোখে-মুখে যে ভয়াল উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল তার বর্ণনা করে অবনীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছেন,”রবিকাকাকে ও-রকম উত্তেজিত হতে কখনো দেখিনি”।
আমার একটাই মন্তব্যঃ এর পরেও কি সংশয় থাকে যে কালী ও তন্ত্রসাধক শাক্ত শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ভাবনার বহু যোজন ফারাক?
মেধসানন্দ এখানে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেচেন—দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া কালীপূজা এবং তার অঙ্গ হিসেবে বলিদানের বিরুদ্ধে শুধু নয়,
এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে—যার সাহিত্যিক প্রকাশ তাঁর রাজর্ষি উপন্যাসে, যেখানে হাসি প্রশ্ন রাখছে ‘এত রক্ত কেন’ আর ব্যক্তিগত প্রকাশ রোমাঁ রোলাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার সময়।
[25] লেখক অবতারবাদ এবং তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নিয়ে একটি অধ্যায় লিখেছেন—কারণ একটাই। রবীন্দ্রনাথ অবতারবাদ না মানলেও এই বইয়ে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করা!
লেখক শিবনাথ শাস্ত্রীর স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃত করেছেন-‘শ্রীরামকৃষ্ণের কয়েকজন শিষ্য তাঁহাকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলিয়া প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। আমি এই মতবাদ কোন সময়েই মানিতে পারি নাই’
[26]।
বিমলাকান্ত রায়চৌধুরিকে লেখা পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলছেন—‘আধুনিককালে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে ভক্তেরা ভগবানের অবতার বলে ধরে নিয়েছেন, তাই বলে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুঘটনা এবং তাঁর প্রতিদিনের দেহযাত্রায় অলৌকিকত্ব আরোপ করতেই হবে এমন কোন কথা নেই।----ছেলে ভুলিয়ে যেসব ভক্তের ভক্তির উদ্রেক করতে হয় তাদের ভক্তির কোন মূল্য নেই’
[27]।
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের বিরূপ মন্তব্যও লেখক উদ্ধৃত করেছেন—‘আমাদের দেশের সাধকদের বিপদ কোথায় তা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জীবনী পড়ে বেশ স্পষ্ট বোঝা গেল।-----গোস্বামী মশায়ের জীবনী পড়ে বারবার কেবল আমার এ ই কথা মনে হতে লাগল যে তিনি স্থিতি লাভ করতে পারেননি, মত্ততা লাভ করেছিলেন’
[28]।
এরপর রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়ার যৌক্তিকতা বিচার করা এবং শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যুক্তিবাদ’ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আমার মতে অনাবশ্যক।
শুধু একটা কথা। মহারাজ বলছেন-- শ্রীরামকৃষ্ণের
যুক্তিবাদ তাঁর বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য
যথাযথ উপমা-প্রয়োগের অজস্র উদাহরণের দ্বারা প্রমাণিত।
না গণনাথ মহারাজ! মানতে পারছি না।
আমার বিনীত নিবেদন—উপমা কখনই যুক্তির স্থান নিতে পারে না, তার পরিবর্ত হতে পারে না,
যথাযথ এবং
অজস্র হলেও। উপমা , যথাযথ হলে, যুক্তিকে সহজবোধ্য করে তোলে, খানিকটা ব্যাখ্যা করে—ব্যস, ওই পর্যন্তই।
রবীন্দ্রনাথ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ দুজনেই স্বতন্ত্র, এবং স্বমহিমায় উজ্বল। একের বিরুদ্ধে অন্যের যুক্তির তুল্যমূল্য বিচার এই বইয়ের বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনাবশ্যক।
উপসংহারএতসব গবেষণার পর স্বামী মেধসানন্দ কী সিদ্ধান্তে এলেন?
“আপাতত কেবল এইটুকু বলা প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথ গুরুবাদ, অবতারবাদ, প্রতিমা, -- বিশেষত কালীর আরাধনা, সঙ্কীর্তনে নৃত্য, ভাব, সমাধি এসব কিছুর ঘোর প্রতিবাদী ছিলেন; অথচ শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে পূর্বোক্ত বিষয়গুলি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকলেও তাঁকে রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারছিলেন না”।
[29]আমার বক্তব্যঃ রবীন্দ্রনাথ, তাঁর জীবনীকার প্রভাতকুমার এবং সাহিত্যিক সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী চিন্তার এক স্বতন্ত্র ধারা, যা নিখাদ ভক্তিরসের পথিক নয়।
শেষে লেখক বলছেন—শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন কিন্তু প্রীতিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেননি। ----‘প্রফেটে’র সমকালে জন্ম নিলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তো বটেই অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন মানুষের পক্ষেও তাঁকে চেনা সবসময় সহজ হয় না।
যেমন বিদ্যাসাগরও কি ধরতে পেরেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের অসাধারণত্ব’?
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
================
[1] স্বামী মেধসানন্দ,
রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা ও শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রসঙ্গ, পৃঃ ৩
[2] ঐ, পৃঃ ৫
[3] ঐ, পৃঃ ৬
[4] ‘ধর্মের নবযুগ’, রবীন্দ্র-রচনাবলী, বিশ্বভারতী, ১৮শ খণ্ড, পৃঃ ৩৫১-৫২
[5] স্বামী মেধসানন্দ, ঐ, পৃঃ৯
[6] অসিত হালদার, ‘রবিতীর্থে’, অঞ্জনা প্রকাশনী, ১৩৬৫। পৃঃ ১২৪-১২৫।
[7] ঐ, পৃঃ ৩২
[8] ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে ১৯২৬ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি।
[9] রবীন্দ্রজীবনকথা,পৃঃ ৫৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।
[10]সূত্রঃ স্বামী সুবীরানন্দ, ‘যুগ আচার্য ও যুগ কবি’, পৃঃ ২৭-৮। সূত্রধর , কলকাতা, ২০১৬।
[11] স্বামী মেধসানন্দ, ঐ, পৃঃ ৪৮।
[12] সঞ্চয়িতা, পৃঃ ৪৩৯-৪০।
[13] স্বামী মেধসানন্দ,ঐ, পৃঃ ২৪
[14] ঐ, পৃঃ ৩১
[15] ঐ, পৃঃ ৩৪
[16] রূপ ও অরূপ, প্রবাসী, ১৩১৮। পৌষ সংখ্যা।
[17] মেধসানন্দ, ঐ, পৃঃ ৬৪।
[18] ঐ, পৃঃ ৬৬
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনএক, কয়েকজন সন্ন্যাসী শান্তিনিকেতনে এসে রবীন্দ্রনাথের সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তীর মাধ্যমে অনুরোধ করেন বাণীর জন্যে। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭৪ বছর। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিতে লেখা রামকৃষ্ণ-প্রশস্তি প্রথমে ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রবুদ্ধ ভারতে প্রকাশিত হয়। পরে এর রবীন্দ্রনাথ কৃত বাংলা অনুবাদ একযোগে প্রবাসী এবং উদ্বোধন পত্রিকায় ছাপা হয়। ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রবুদ্ধ ভারতে প্রকাশিত হয়। পরে এর রবীন্দ্রনাথ কৃত বাংলা অনুবাদ একযোগে প্রবাসী এবং উদ্বোধন পত্রিকায় ছাপা হয়।
এটি সেই বিখ্যাত “ বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা, ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা”।
শুধু তাই নয়, শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মশতবার্ষিকীতে আহুত বিশ্বধর্মসম্মেলনের চৌদ্দটি অধিবেশনের একটিতে, ( ৩রা মার্চ, ১৯৩৭) ,কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে , তিনি সভাপতিত্ব করেন। তাঁর পঁচিশ মিনিটের অভিভাষণ অত্যন্ত মনোগ্রাহী হয়। কিন্তু পরের দিন ৪ঠা মার্চ গ্র্যান্ড হোটেলে আয়োজিত সম্মেলনে (যাতে জোসেফিন ম্যাকলাউড, সরোজিনী নাইডু এবং স্বামী পরমানন্দের মত ব্যক্তিত্ব আমন্ত্রিত ছিলেন) আমন্ত্রিত হয়েও রবীন্দ্রনাথ যান নি, সিস্টার সরস্বতীর অনুরোধে মিশনের সেবাকার্যের প্রশংসা করে চার লাইনের আশীর্বাদ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
তার একবছর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৬শে রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনে রামকৃষ্ণ মিশন শান্তিনিকেতনে শ্রীরামকৃষ্ণের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন, অথচ তাতে যোগ না দিয়ে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনকে পৌরোহিত্য করতে পাঠিয়ে দেন।
দুই, সত্তর বছর বয়সে লেখা মালঞ্চ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ তিনবার শ্রীরামকৃষ্ণের উল্লেখ করেছেন। রক্তাল্পতা এবং বোনের প্রতি স্বামীর আসক্তি দেখে সন্দেহে এবং ঈর্ষায় ভুগতে থাকা নীরজা বারবার রামকৃষ্ণদেবের ছবি এবং নাম নিয়ে নিজের মনকে বোঝায়। ভাবে- সব ত্যাগ করব, বোনকে স্বামীর হাতে সমর্পণ করব।
স্বামী মেধসানন্দ নিজে এবং বইটির ভূমিকায় শান্তিনিকেতনবাসী সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রকাশক স্বামী সুপর্ণানন্দ ওই উপন্যাসে শ্রীরামকৃষ্ণের উল্লেখে মুগ্ধ।
সুপর্ণানন্দের মুগ্ধতাঃ ‘নিজে রবীন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার না বললেও ----- তাঁর
নায়িকা নীরজার মাধ্যমে (মালঞ্চ উপন্যাস দ্রষ্টব্য) শ্রীরামকৃষ্ণ চরণে প্রণাম নিবেদন করলেন’।
মেধসানন্দ লিখছেন—‘ মালঞ্চ উপন্যাসটি শুরুই হচ্ছে অসুস্থ নায়িকা নীরজা এবং তার ঘরের বর্ণনা দিয়ে—যেখানে বলা হয়েছে দেওয়ালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের ছবি। ----- নীরজা তার খুড়তুতো দেওর রমেনকে বলছেঃ যখন চোখের জলে ভিতরে ভিতরে বুক ভেসে যায় তখন ওই পরমহংসদেবের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু ওঁর বাণী তো হৃদয়ে পৌঁছায় না।--- বল দাও ঠাকুর, বল দাও, মুক্তি দাও মতিহীন অধম নারীকে’।
সবিনয়ে বলি, এই অধম পাঠক নীরজা চরিত্র ও শ্রীরামকৃষ্ণ প্রসঙ্গে উক্ত মূল্যায়নের সঙ্গে একেবারেই সহমত হতে পারেনি। যদি কবির উদ্দেশ্য প্রণাম নিবেদনই হত তাহলে শেষে মৃত্যুপথযাত্রী নীরজা ঠাকুরের আশ্রয়ে শান্তি পেল না কেন?
বরং তীব্র অসুয়া বোধে শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে উঠে বসে বোনকে বলল –“পালা পালা পালা এখনই, নইলে দিনে দিনে শেল বিঁধব তোর বুকে, শুকিয়ে ফেলব তোর রক্ত”। তারপর মরে গেল।
এতে প্রণামের বদলে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে অসুখী মানুষের প্রবৃত্তির কাছে পরমহংসের বাণীর পরাজয় সূচিত হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
[19] স্বামী মেধসানন্দ, ঐ, পৃঃ ৯০।
[20] ঐ, পৃঃ ৯৮
[21] ঐ। পৃঃ ১০০।
[22] ঐ, পৃঃ ১৮৯।
[23] ঐ, পৃঃ ১৪২
[24] ঐ, পৃঃ ১৯৫
[25] ঐ, পৃঃ ১৯৬
[26] ঐ, পৃঃ ২০৫
[27] ঐ, পৃঃ ১৪৮।
[28] ঐ, পৃঃ ১৪৩।
[29] ঐ, পৃঃ ১৩৭-৮।