

সুইটি বিবি, ৩৩ বছর বয়স। তাঁর দুই সন্তান, একজন কুরবান যার বয়স ৬ এবং ১২ বছরের ইমরান সহ আজ প্রায় ৮ মাস হয়ে গেল বাংলাদেশের জেলে আছে। সুইটি বিবি দিল্লিতে ময়লা কুড়োনোর কাজ করতেন। তাঁদের ৩ জনকে দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করেছে। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বাংলাদেশের জেলে পচতে হচ্ছে। বীরভূমের মুরারাইয়ের বাসিন্দা সুইটি বিবির আরও এক প্রতিবেশী সোনালি খাতুনকে মানবিকতার খাতিরে দেশে ফেরানো হলেও, সুইটি বিবি জানেন না তাঁর কপালে আর কতদিন এই কষ্ট আছে। তিনি আর দিনও গোনাও ছেড়ে দিয়েছেন। কলকাতা হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত মামলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে রীতিমত ধমক দিয়েছিল সোনালি খাতুন মামলায়।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রশ্ন করেছিল, কোন এক্তিয়ারে ১৮ জুন, সুনালি খাতুন, তার স্বামী দানিশ এবং তাদের আট বছরের ছেলে, বীরভূমের পাইকার গ্রামের বাসিন্দা, সুইটি এবং তার দুই ছেলে, যারা বীরভূমের ধিতোরা গ্রামের বাসিন্দা, তাদের সাথে দিল্লি পুলিশ এই আচরণ করেছিল। যথারীতি কোনও উত্তর দিতে পারেনি, কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় চলা দিল্লি পুলিশ। অনেক টালবাহানার পরে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এর মধ্যে পতাকা বৈঠকের পর গর্ভবতী সোনালিকে তার ছেলেসহ ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়, কিন্তু দলের বাকি সদস্যদের সেখানেই থাকতে হয়। এরপর, সোনালি বাংলায় সন্তান প্রসব করেন।
শুধু সোনালি বিবি বা সুইটি বিবি নন, আমরা কী করে ভুলে যাব মালদহের পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখের কথা, যাকে রাজস্থান থেকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল পে লোডার করে। তাঁর ও একই অপরাধ, তিনিও বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক, তিনিও বাংলার বাসিন্দা, তিনিও বাংলায় কথা বলতেন। যদিও ভারত রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের কোনও নির্দিষ্ট নথি নেই, তা সত্ত্বেও আমির শেখ কিন্তু তাঁর কাছে থাকা সমস্ত পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলেন। তাঁর ভোটার পরিচয়পত্র, আধার, রেশন কার্ড দেখানো সত্ত্বেও রাজস্থান সরকারের পুলিশ আমিরকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেয়, আর তাঁরাও আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে আমিরকে বাংলাদেশে ছুঁড়ে ফেলে। একটা সভ্য দেশে এই ধরনের শাস্তি সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত কিংবা কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে করেনি। একবারও জিজ্ঞেস করেনি, কী ভাবে বোঝা গেল আমির বাংলাদেশী? বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী এই ভাষ্যটা কে ঠিক করে দিল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি পারেন সমস্ত বাংলাভাষীকে বাংলাদেশী দাগিয়ে দিতে? ভোটার তালিকায় যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলছে বাংলা সহ ১২টি রাজ্যে সেখানেও শুধুমাত্র বাংলায় কেন বাংলাদেশী খোঁজার হিড়িক? কেন মুসলমান মানেই বাংলাদেশী এই ভাষ্যটা দাঁড় করানো হল, সেই প্রশ্ন তো আজকেই করার দিন, কারণ আজকে আজকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
এই রকম ‘বাংলাদেশী’ তকমা দিয়ে বাংলায় কথা বলা অত্যাচারিত মানুষদের সংখ্যা যদি হিসেব করা যায়, তাহলে খাতার পাতা শেষ হয়ে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু উদাহরণ দেখলেই বোঝা যাবে সমস্যাটা কতটা গভীর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ২০ বছর বয়সী বাঙালি অভিবাসী শ্রমিক জুয়েল রানাকে বাংলাদেশি হওয়ার অভিযোগে ওড়িশার সম্বলপুরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হামলায় আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ছাত্রকে বাংলা বলার জন্য কিছু হিন্দিভাষী ব্যবসায়ীরা "বাংলাদেশী" বলে অভিহিত করে কলকাতায় আক্রমণ করেছিল। এই বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, পশ্চিমবঙ্গের তিনজন বাঙালি অভিবাসী শ্রমিককে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য বাংলাদেশী বলে সন্দেহ করার পরে মহারাষ্ট্রে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে, ওড়িশার জাজপুর, কেন্দ্রপাদা, জগৎসিংহপুর এবং সম্বলপুর জেলা জুড়ে একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে বাংলাভাষী কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, লাঞ্ছিত করা হয়েছিল এবং বাংলাদেশি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলি বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও সহিংসতার নমুনা হিসেবে প্রতিফলিত করে, প্রায়শই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে, ভাষাগত পক্ষপাত এবং অবৈধ অভিবাসনের মিথ্যা সন্দেহের দ্বারা উস্কে দেওয়া হয়। যদিও সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায় না, গত দুই বছরে এই ধরনের হামলায় কমপক্ষে ১০ জন আহত বা নিহত হয়েছে, আরও অনেক ঘটনা সম্ভবত রিপোর্ট করা হয়নি।
যখন দেশের নানান প্রান্তে বাংলায় কথা বলার জন্যে বাংলাদেশী বলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, যখন বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্যে বাঙালী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার চলছে, তখন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিস আরও বড় একটা ঘোষণা করেছেন, যা আরও ভয়ঙ্কর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নাকি এবার থেকে বাংলাদেশী চেনা হবে, সেইরকম প্রযুক্তি তাঁরা আনতে চলেছেন। বাংলায় কথা বললে, সেই ভাষার কথা এবং স্বর-নিক্ষেপকে বিশ্লেষণ করা হবে, তার মধ্যে দিয়েই নাকি চেনা যাবে কে ভারতীয় বাঙালি আর কে বাংলাদেশী। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে না গিয়েও বলা যায় প্রতিটি মানুষকে এই যে সন্দেহের তালিকায় রাখা, প্রতিটি মানুষকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ভাবা এবং সেই ভাবনাকে সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই আসলে ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট। ঠিক এই ভাবনাই জাড়িত করে দেওয়া হয়েছিল নাজি জার্মানিতে। ইহুদিদের খাওয়া পরা এবং পাশের মানুষকে ইহুদী ভাবার যে ধারণা সেটাই ফ্যাসিবাদ। এই প্রক্রিয়ায় সেই সময়ে সাহায্য করেছিল, বহুজাতিক সংস্থা আইবিএম। তাঁদের সহযোগী সংস্থা ডেহোম্যাগের মাধ্যমে হলেরিথ পাঞ্চ কার্ড প্রযুক্তি এই কাজটা করেছিল। এই প্রযুক্তি জনগণনার তথ্য সারণীবদ্ধ করতে, ইহুদি জনসংখ্যা সনাক্তকরণ এবং নিবন্ধন করতে ব্যবহৃত হত, যা গণহত্যাকে সহজতর করেছিল। এই প্রযুক্তি, যা প্রায়শই "আইবিএম কার্ড" নামে পরিচিত, তৃতীয় রাইখে দক্ষ ডেটা প্রক্রিয়াকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আজকের ভারতেও যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলছে, বা বিভিন্ন যে পরিচয়পত্র তৈরী করে, একটা কেন্দ্রীভূত তথ্যভান্ডারে রাখা হচ্ছে। এই তালিকা যে ভবিষ্যতের গণহত্যার জন্য আগাম তালিকা নয় তা কে বলতে পারে? তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাঙালির ওপর এই আক্রমণ নিয়ে কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির কিন্তু এখনও ঘুম ভাঙেনি। তাঁরা মনেই করে না, বাঙালি ভাষার জন্য আক্রান্ত হচ্ছে, তাঁদের ধারণা শুধুমাত্র পরিযায়ী শ্রমিকেরা আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু বিষয়টা একেবারেই তা নয়। সারা দেশে বাঙালি বিদ্বেষী একটা হাওয়া তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি পর্যটকেরাও যে আক্রমণের শিকার হননি বা ভবিষ্যতে হবেন এমনটা নয়। বাঙালির খাওয়ার অভ্যেসের ওপরেও নানান জায়গায় আক্রমণ হয়েছে। অভিনেতা পরেশ রাওয়াল একবার বলেছিলেন, যে তাঁর পাশের বাড়ি থেকে মাছের গন্ধ আসে, তা তাঁর অপছন্দের। পরে অবশ্য তিনি ভুল স্বীকার করে নেন। কিন্তু তাতেও কি বিতর্কটা কমেছে?
আজকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে এটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশীদের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানিদের) ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হয়েছিল। ১৯৫২ সালে যে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন বাংলাদেশের ( তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) সালাম, রফিক, বরকত ও জব্বার। আজকে সারা দিনে অনেক সভা, সমিতি সেমিনারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা নিয়ে আলোচনা হবে, চর্চা হবে। আজকে প্রধানমন্ত্রীও শুভেচ্ছা জানাতে দ্বিধা করবেন না। ২০২২ সালে এই দিনেই প্রধানমন্ত্রী সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন নিজের মাতৃভাষায়- “आज विश्व मातृभाषा दिवस भी है। मातृभाषा में शिक्षा बच्चों के मानसिक विकास से जुड़ी है। अऩेक राज्यों में स्थानीय भाषाओं में मेडिकल और टेक्निकल एजुकेशन की पढ़ाई शुरु हो चुकी है” তাঁর কথার মানে দাঁড়ায়, একজন শিশুর মানসিক বিকাশ তখনই সম্ভব হয়, যখন সে তাঁর মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করে। তাহলে সোনালি বিবির যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো, কিংবা সুইটি বিবির দুই সন্তান ইমরান আর কুরবান যদি পরবর্তীতে নিজের মাতৃভাষায় পড়াশুনা করে, কথা বলে তাহলে কি তাঁদের বাংলাদেশী দাগিয়ে দেওয়া হবে, এই প্রশ্ন তো করতে হবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। তাহলে তাঁর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বার্তার কি কোনও মানে থাকে, নাকি সবটাই লোকদেখানো মনে হয়। তখন প্রশ্ন উঠবে ভাষা দিবসে আমাদের প্রাপ্তির ভান্ডার কি শূন্য?
অনেকের ধারণা, বাংলা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে বলেই বাংলা ভাষা তাঁর গুরুত্ব হারিয়েছে। এই বক্তব্য অনেকাংশে সত্যি হলেও পুরোটা সত্যি নয়। উচ্চবিত্তের যেমন ইংরেজি আছে, নিম্নবিত্তের জন্য তা এখন এসে ঠেকেছে হিন্দিতে। যার ফলে বাংলার বহু পরিযায়ী শ্রমিক আজকাল ভিন রাজ্যে গিয়ে হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাষার জোর তো শুধু অর্থনৈতিক জোরের মধ্যে দিয়ে আসে তেমনটা নয়, ভাষার ভিত্তি যে আসলে দুর্বল নয়, এই কথাটা ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান’ বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলকে ঐক্যমত্যে পৌছেই প্রমাণ করতে হবে। বাংলা হেরে গেছে, এই বিশ্বাসের বিপরীতে ভাষার জোর সম্পর্কে ভরসা থাকলে, তার লড়াইও জোরদার হতে পারে। শুধু সবাই মিলে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গাইলে কি এই সমস্যার সম্ভব, নাকি আরো কোনও পদক্ষেপ বাংলার মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিতে হবে তা জানা নেই, তবে দীর্ঘদিন এই অত্যাচার হলে যে অন্যরকম প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ যে হবে না, তা কিন্তু বলা যায় না।