

এবার পুণ্যভূমি।
সাভারকর বলছেন –হিন্দু হওয়ার তিনটি শর্ত; এক পিতৃভূমি, একই রক্তের বন্ধন এবং একই পূণ্যভূমি। খালি প্রথম দুটো যথেষ্ট নয়।
যেমন কাশ্মীরের কোন কোন মুসলমান সম্প্রদায় এবং দক্ষিণের কিছু ক্রীশ্চান সম্প্রদায় পুরুষানুক্রমে হিন্দুস্থানকে পিতৃভূমি মানে এবং বিয়েশাদির ব্যাপারে জাতপাতের বন্ধন মেনে চলে। তাই ওদের শিরায় একই হিন্দুরক্ত বহমান। তবুও তারা হিন্দু হতে পারে না। কারণ ধর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওদের পুণ্যভূমি পরিবর্তিত হয়ে গেছে, আর সেটা এখন যথাক্রমে আরব এবং প্যালেস্টাইন।
কাজেই এখানে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হতে পারে। তাই পিতৃভূ এবং পূণ্যভূ এক হওয়া প্রয়োজন।
শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈনদের পিতৃভূ এবং পুণ্যভূ এক—হিন্দুস্থান। মুসলিম ও ক্রীশ্চানদের দুই ভূমি আলাদা। তাই দেশ আক্রান্ত হলে ওদের থেকে বিপদ হতে পারে। সুতরাং সাভারকরের হিন্দুরাষ্ট্রে মুসলিম ও ক্রীশ্চনদের স্থান নেই। চন্দ্রনাথ বসুর ‘হিন্দুত্ব’এর সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল!
পুণ্যভূমির ব্যাখ্যা
সাভারকর স্পষ্ট করছেন যে পূণ্যভূমির অর্থ একটি জাতির নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে উপজিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, এবং মানসিক গঠনে সেই উত্তরাধিকারকে বহন করা। তাই শুধু ধর্ম নয়, ভাষা এবং ইতিহাস এর অন্যতম অঙ্গ। সেই সংস্কৃতিকেই উনি বলছেন ‘হিন্দুত্ব’। এর মুখ্য অঙ্গ হল ইতিহাস, তাতে বেদ এবং পুরাণকথাও সামিল। শুধু তাই নয়, বৈদিক সভ্যতা থেকে শুরু। এবং একই আইন-কানুন, আচার -অনুষ্ঠান, রীতি-রেওয়াজও এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
এই কারণে উনি সংস্কৃতকে দেবভাষা বলে সর্বোচ্চ স্থান দিতে চান এবং উর্দূকে বহিষ্কৃত করতে চান।
রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী সব তাঁর কাছে ইতিহাসের উপাদান মাত্র নয়, বরং জীবন্ত ইতিহাস। এবং মারাঠা পেশোয়ারাজের মধ্যে উনি দেখতে পান বহিরাগত আক্রমণকারী ম্লেচ্ছদের বিরুদ্ধে শেষ সফল প্রতিরোধ।
সীতা-সাবিত্রী-দময়ন্তীর মধ্যে যে একনিষ্ঠা ও পবিত্রতা (chastity), তাই তাঁর কাছে হিন্দুনারীর আদর্শ। যখন কোন হিন্দু প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চুম্বন করে তখন তার চেতনায় থাকে ‘গোকুলের সেই স্বর্গীয় রাখালে’র প্রতি রাধার প্রেমের অনুভব।
দুটো কথা
সাভারকর সম্ভবতঃ সচেতন ছিলেন যে তাঁর হিন্দু ও হিন্দুত্বের ধারণায় তিনটি পূর্বশর্তের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অংশ হল পিতৃভূমি এবং রক্তধারার শর্ত, তাই জোর দিয়েছেন পূণ্যভূমির পর।
পিতৃভূমিঃ
বৈদিক সাহিত্যে বা কোন ভারতীয় সাহিত্যে দেশ বা রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে পিতৃভূমি শব্দ নেই-- আছে মাতৃভূমি, দেশমাতৃকা, ভারতমাতা। অর্থাৎ আমাদের ঐতিহ্যে দেশ বা দেশের মাটি হল মায়ের সমান।
সাভারকর এই Fatherland শব্দটি আমদানী করেছেন ইউরোপ থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও স্তালিনের বক্তৃতা দেখুন, বা শলোকভের উপন্যাস They Fought For Our Fatherland’।
ওঁর নিজের কানে কি ভারতের সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের আলোচনায় ওই Fatherland শব্দটি বেখাপ্পা লাগে নি?
আর সিন্ধু থেকে হিন্দু খুঁজতে গিয়ে বেদ এবং বিষ্ণুপুরাণে এর ভিত্তি না পেয়ে আশ্রয় করলেন ভবিষ্যপুরাণ, যার ঐতিহাসিকতা সন্দেহের বাইরে নয়। নিজেই গুলিয়ে ফেললেন যে সংস্কৃতের ‘স’ থেকে প্রাকৃত ‘হ’ হয়েছে, নাকি উল্টোটা?
তাই ভবিষ্যপুরাণের শ্লোকেও সপ্তহিন্দুকে বদলে হপ্তহিন্দু লিখে ফেললেন। শেষে দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যপুরাণের সাক্ষ্যও তাঁর নিজের মতের বিরুদ্ধে—যাবনিক ভাষায় স থেকে হ হয়। তাহলে বাইরে থেকে আসা যবন বা ম্লেচ্ছদের জিভে সিন্ধু বদলে হিন্দু হয়েছে মতটাই জোর পেয়ে গেল।
আর ‘স্বার্থের সংঘাত’? বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে আমরা দেখি পূণ্যভূমি এবং পিতৃভূমির সংঘাত হলে মানুষ রাষ্ট্রকেই প্রাথমিকতা দেয়, পূণ্যভূমিকে নয়।
ইরাক-ইরানের যুদ্ধ, ইউরোপের লড়াইগুলো, রুশ এবং পোল্যাণ্ড বা ইউক্রেনের সংঘাত এর সাক্ষী। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউকে’র নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সুনক, যাঁর পিতৃভূ এবং পূণ্যভূ সব ভারত, রক্তধারা এবং বৈবাহিক সম্পর্কেও তিনি ভারতের সঙ্গে যুক্ত।
রক্তের বিশুদ্ধতাঃ
নিজেই শেষে বলছেন যে বিশ্বে কোন জাতির মধ্যেই অবিমিশ্র বিশুদ্ধ রক্ত নেই। অথচ একটু গা-জোয়ারি ঢঙে শেষ করছেন এই বলে যে একমাত্র হিন্দুজাতির মধ্যেই তুলনামূলক বা আপেক্ষিক ভাবে রক্তের বিশুদ্ধতা রয়েছে।
আজকের কোন নৃতাত্ত্বিক মানবেন কি যে পাঞ্জাব এবং সিন্ধ প্রান্তের জনগোষ্ঠী, দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় এবং আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যাণ্ডের জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই রক্তের ধারা বইছে?
বাঙালীদের দেখুন। নীহাররঞ্জন রায়ের গবেষণা দেখিয়েছে যে তাতে প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড এবং ভোট-মঙ্গোল জনগোষ্ঠীর রক্তের সংমিশ্রণ রয়েছে।
কে হিন্দু, আর কে হিন্দু নয়ঃ
এবার দেখা যাক, পিতৃভূমি, রক্তের বন্ধন এবং পূণ্যভূমির তিন শর্ত মেনে সাভারকর ভারতে কাদের হিন্দু বলছেন এবং কাকে কাকে বাতিল করছেন।
যারা ভারতের নাগরিক শুধু নয়, একই সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে তারা সবাই হিন্দু, ধর্ম যাই হোক। অতএব হিন্দুধর্মের অনুগামী যত সম্প্রদায়, সনাতনী, আর্যসমাজী, নাথ সম্প্রদায়, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, ব্রাহ্মমত এমন কি নাস্তিক ও চার্বাকপন্থী সবাই হিন্দু। একই মাপদণ্ডে শিখ, জৈন, বৌদ্ধ সবাই সাংস্কৃতিক হিন্দু।
কারণ, তারা তিনটে পরীক্ষাতেই পাশ করেছে। হিন্দুস্থান তাদের পিতৃভূমি, বিবাহাদি মোটামুটি নিজেদের সম্প্রাদায়ের মধ্যেই হয়—অতএব ধরে নেওয়া যায় একই রক্তধারা প্রবাহমান। আর এদের ধর্ম বা সম্প্রদায় আলাদা হলেও প্রবর্তক বা গুরু হিন্দুস্থানেই জন্মেছেন।
অতএব, এঁদের পিতৃভূমি ও পূণ্যভূমি এক এবং অভিন্ন।
এইজন্যেই হিন্দুস্থানে বংশানুক্রমে বসবাস করেও যে যাঁরা ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান এবং ক্রীশ্চান হয়েছেন তাঁরা হিন্দু নন। যদিও তাঁদের পিতৃভূমি হিন্দুদের সঙ্গে অভিন্ন, রক্তধারার ক্ষেত্রেও তাই। আচার আচরণ ঐতিহ্যও অনেকটা হিন্দুদের সঙ্গে মেলে, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের পূণ্যভূমি হিন্দুস্থানে নয়, আরব মরু ও প্যালেস্তাইনে।
কিন্তু কোন বিদেশী এবং অন্য ধর্মের লোক যদি হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন? তাহলেও হবে না। তিনি ধার্মিক হিন্দু হতে পারেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে হিন্দুত্ব নেই। কারণ, তাঁর পিতৃভূ এবং পূণ্যভূ আলাদা, রক্তধারা আলাদা।
মেয়েদের ক্ষেত্রে? যদি কোন বিদেশি নারী হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন এবং হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করেন, তাহলে তিনি হিন্দু। কারণ, বিয়ের পর তাঁর স্বামীর দেশ, সমাজ সব তাঁরই হয়ে যায়। স্পষ্টতঃ সাভারকর নারীর স্বতন্ত্র সত্তায় বিশ্বাসী নন। পতিনিষ্ঠা এবং পতির জন্যে ত্যাগ ও সতীত্বই তাঁর মতে হিন্দু নারীর আদর্শ, এ নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা হতে পারে।
ওপরের নিয়মে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলেন সিস্টার নিবেদিতা। তাঁর পিতৃভূমি ও পূণ্যভূমি আলাদা, রক্তধারাও। এবং তিনি কোন হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করেন নি।
কিন্তু তিনি হিন্দু আদর্শ ও সংস্কৃতিকে এমন নিবিড় ভাবে গ্রহণ করেছেন যে সব technicality অবান্তর এবং অনাবশ্যক হয়ে গেছে। ‘for she had adopted our culture and come to adore our land as her Holyland’. She felt she was a Hindu and that is, apart from all technicalities the real and most important test’।
তবে সাভারকর মনে করেন এরকম একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ সেই বহুপ্রচলিত ইংরেজি প্রবাদ অনুযায়ী মূল নিয়মের যথার্থতাই প্রমাণিত করে।
আবার উনি বলছেন যে বৈদিক যুগেও এমন লোকজন বা জনগোষ্ঠী ছিল যারা বৈদিক ধর্মের অনুগামী ছিল না, যেমন ঋগবেদে বর্ণিত ‘পণি, দাস ও ব্রাত্য’ (The Panees, the Dasas, the Vratyas)। যদিও এরা সাভারকরের মতে ‘racially and nationally they were conscious of being a people by themselves’।
দেখাই যাচ্ছে, যে এখানে তিনটের মধ্যে দুটো শর্ত সিদ্ধ হচ্ছে, তৃতীয়টি নয়। কাজেই এরা নিঃসন্দেহে, সাভারকরের মতে, হিন্দু নয়।
তাই বোধহয়, হিন্দুত্ব বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৪২) থেকে সামনের মলাটের ভেতরে ঋগবেদের শ্লোক ৮-২৪-২৭ মুদ্রিত হয়ে চলেছে যার অর্থঃ
“আমাদের সপ্তসিন্ধুকে সম্পদশালী কে করেছে? তুমিই হে প্রভু। এখন আমাদের শত্রু দাসেদের ধ্বংস করতে তোমার বজ্র হানো”!
উল্লেখযোগ্য যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রয়াত প্রাণপুরুষ গুরুজী গোলওয়ালকর তাঁর We or Our Nationhood Defined (1939) এবং Bunch of Thoughts (1966) বইয়ে একই চিন্তার প্রতিধ্বনি করেছেন। একই যুক্তিতে হিন্দুজাতির এবং রাষ্ট্রের তিন শত্রুকে চিহ্নিত করেছেন—মুসলিম, ক্রীশ্চান এবং কমিউনিস্ট। এই তিন গোষ্ঠীর পিতৃভূমি ভারত হলেও পূণ্যভূমি আলাদা যে!
তত্ত্বকথা এবং ইতিহাসচর্চার শেষে উনি বলছেন যে হিন্দুস্থানে বাস না করেও বিদেশে থেকে বা বিদেশি বাবা-মার সন্তান হয়েও যদি কেউ হিন্দুস্থানকে পিতৃভূ এবং পূণ্যভূ মনে করে আমাদের দেশকে ভালবাসে তাহলে সে অবশ্যই হিন্দু।
দেখাই যাচ্ছে, সাভারকর পিতৃভূ এবং রক্তের বন্ধনকে তাঁর তত্ত্বের দুর্বল অংশ বলে বুঝেছিলেন। এবার উনি বললেন যে হিন্দুর জন্যে পিতৃভূ কোন ভৌগলিক সীমা বা নির্ণায়ক বাধা নয়। ডাক দিলেন-- হিন্দুস্থানের এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসা নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ুক উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, গড়ে তুলুক হিন্দু উপনিবেশ; সমগ্র বিশ্বই তাদের ভৌগলিক সীমা।
তবে হিন্দুত্ব (১৯২৩) বইটির কোথাও বৃটিশ উপনিবেশ বা ইংরেজদের ভারত অধিকার নিয়ে একটি পংক্তিও নেই। আর বইটি নিজের নামে নয়, লেখা হয়েছে ‘এ মারাঠা’ নামে এবং গোপনে ছাপা হয়েছিল।
(শেষ)
কালনিমে | 43.25.***.*** | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩৭737735
হীরেন সিংহরায় | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১১737736
বর্ণনা হালদার | 223.223.***.*** | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৭737737
হীরেন সিংহরায় | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩৫737740