এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাট ঠাকুর 

    Sandip Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  • সপ্তম পর্ব 

    গাজনের প্রথম সকাল। গ্রাম যেন এক অলৌকিক আলোর আবরণে মোড়া। উঠোন জুড়ে সাদা আলপনার নকশা, বেলপাতা ভেজানো কলসের পাশে ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠছে। দূরে ঢাকের তাল প্রথমে নরম, তারপর ক্রমে চড়া—যেন সময় নিজেই উৎসবের ছন্দে জেগে উঠছে। বাতাসে কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত পবিত্রতা।
    আজ পরেশ খুব ভোরে উঠে পাটঠাকুরের কাঠ মুছে দিচ্ছিল যত্ন করে, যেন সন্তানের মুখ স্পর্শ করছে। সিঁদুরের লাল রঙ আঙুলের ডগা থেকে ছড়িয়ে পড়ল ঠাকুরের গায়ে। তার চোখে আজ এক গভীর নিবেদন।
    রতন পাশে বসে নিঃশব্দে সব দেখছিল।
    পরেশ মৃদু গলায় বলল,
    “আজ তুই আমার পাশে থাকবি, সবসময়।”
    রতন শুধু মাথা নাড়ল। কিন্তু সেই নীরব সম্মতিতে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা।
    দল নিয়মমতো আত্রাইয়ের জলে নামল। স্নান, মন্ত্র, প্রণাম—সবই আগের মতো।
    তবু আজকের সকালের মধ্যে ছিল এক অনির্বচনীয় অপেক্ষা, যেন অদৃশ্য কিছু ঘটবার প্রতিশ্রুতি ভেসে আছে বাতাসে।
    পরেশ ঠাকুর কাঁধে তুলে উঠতেই রতন তার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়াল। রোদের ঝিলিক জলের উপর পড়ে দু’জনের ছায়া একসঙ্গে লম্বা হয়ে গেল বালুচরের বুকে—দুটি ছায়া, অথচ যেন এক পথ।
    কেউ কথা বলল না।
    শুধু নীরবতা, আর ঢাকের গভীর তাল।
    সুবলের বাড়ির উঠোনে পৌঁছতেই উমার উলুধ্বনি আকাশ ভরিয়ে দিল। কিন্তু আজ সেই ধ্বনি একা রইল না—গ্রামের অসংখ্য নারীর উলুধ্বনি মিলিত হয়ে উঠল এক সম্মিলিত আরাধনায়। উঠোন ভরে গেছে মানুষে। প্রত্যেকের চোখে কৌতূহল, শ্রদ্ধা, আর এক অদ্ভুত টান।
    পুজো শুরু হল।
    আজ মহাদেব পূজিত হবেন অর্ধনারীশ্বর রূপে—পুরুষ ও প্রকৃতির মহামিলনের চিরন্তন প্রতীক।
    এই মিলনের সাক্ষী যেন শুধু মানুষ নয়, বাতাস, গাছ, পাখি—সমস্ত সৃষ্টিই।
    ধূপের ধোঁয়া, শঙ্খের ধ্বনি, ঢাকের গম্ভীর তাল—সব মিলিয়ে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল এক তীব্র আধ্যাত্মিক আবেশে।
    রতন ঢাক বাজাচ্ছিল।
    হঠাৎ তার তাল বদলে গেল।
    এই তাল গ্রামে কেউ কোনোদিন শোনেনি।
    কিন্তু পরেশের বুক ধক করে উঠল।
    এই তাল… সে শুনেছিল বহু বছর আগে, এক ঝড়ের রাতে।
    তার চোখ অজান্তেই ভিজে উঠল।
    ঠিক তখনই বাইরে হাওয়া জোরে বইতে শুরু করল। দরজার কাপড় দুলে উঠল, প্রদীপের শিখা লম্বা হয়ে উঠল, আর মানুষের মধ্যে ফিসফাস ছড়িয়ে পড়ল।
    রতন চোখ বন্ধ করে ঢাক বাজিয়ে চলেছে।
    তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মন্ত্র ভেসে উঠল—
    “হর হর মহাদেব…”
    পরেশ ধীরে ধীরে ঠাকুর নামাল।
    তার দৃষ্টি স্থির হল রতনের উপর।
    সমস্ত উঠোন নিস্তব্ধ।
    সে শান্ত গলায় বলল,
    “কাঁধ দে।”
    রতন এগিয়ে এল।
    এইবার শুধু কয়েক পা নয়—
    পরেশ নিজ হাতে পাটঠাকুরের সম্পূর্ণ ভার তুলে দিল রতনের কাঁধে।
    এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
    রতনের শরীর সোজা, চোখ স্থির, মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।
    সে এক পা এগোল।
    তারপর আরেক পা।
    উঠোনের মাঝখান দিয়ে ধীর, দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটতে লাগল।
    মানুষের চোখ ভিজে উঠল।
    কেউ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ অশ্রু সংবরণ করতে পারল না।
    উমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
    সুবল স্থির দাঁড়িয়ে—যেন স্বপ্ন দেখছে।
    পরেশের ঠোঁট কাঁপল। সে ফিসফিস করে বলল,
    “বাবা… তুই দেখে যা…”
    রতন ঠাকুর নিয়ে ঠাকুরঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
    অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ধীরে ধীরে বসাল।
    তারপর মাটিতে বসে প্রণাম করল সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে।
    এই দৃশ্য দেখে গ্রামের সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ মানুষটিও মাথা নত করল।
    সেদিন সন্ধ্যার পুজোয়, আত্রাই তীরবর্তী চকভৃগু গ্রামের শ্মশানে যখন রতন পাট ঠাকুর কাঁধে নিয়ে পৌঁছল, চারিদিকে জনসমুদ্র।
    আজ সবাই এক ঘটনার সাক্ষী হতে এসেছে—
    এক অলৌকিক নয়, এক গভীর বিশ্বাসের প্রকাশ।
    মনে হচ্ছিল, ঠাকুর যেন নিজেই এসেছেন নতুন বাহক বেছে নিয়ে।
    চারিদিকে ধ্বনি উঠল—
    “হর হর মহাদেব!”
    সেই ধ্বনি আত্রাই নদীর বুক ছুঁয়ে বহুদূর ছড়িয়ে গেল, যেন আকাশও তার প্রতিধ্বনি ধারণ করল।
    চরক ঘোরানো হল, গান হল, সব আচার-অনুষ্ঠান নিয়মমতো সম্পন্ন হল।
    তবু সবার মুখে একটাই বাক্য—
    “আজ আমরা কিছু দেখলাম।”
    কেউ তাকে অলৌকিক বলল না।
    কেউ কাকতালীয়ও বলল না।
    সবাই শুধু এক শব্দ উচ্চারণ করল—
    “বিশ্বাস।”
    রাত গভীর হলে, সবাই ফিরে যাওয়ার পর পরেশ ঠাকুর নিয়ে রতনের বাড়ির ঠাকুরঘরে রেখে বাইরে বেলগাছের নিচে এসে বসে রইল।
    আকাশ তখন নীরব, অথচ অদ্ভুত উজ্জ্বল।
    রতন এসে পাশে বসল।
    পরেশ ধীরে বলল,
    “আজ থেকে তুই আগায় থাকবি। আমি পিছনে থাকব।”
    রতন মৃদু স্বরে বলল,
    “তুমি থাকলে ভয় পাই না।”
    পরেশ হেসে উঠল, সেই হাসিতে ছিল স্নেহ আর এক অনিবার্য ভবিষ্যতের স্বীকৃতি—
    “একদিন আমিও থাকব না। কিন্তু ভয় পাবি না। কারণ তুই কখনো একা থাকবি না।”
    রতন আকাশের দিকে তাকাল।
    তার মনে হল—আজ আকাশ যেন অনেকটা নিচে নেমে এসেছে, খুব কাছাকাছি।
    গাজনের সেই দিন গ্রামটির ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে রইল।
    কারণ সেদিন মানুষ উপলব্ধি করেছিল—
    পাটঠাকুর কেবল কাঠ নন, তিনি বিশ্বাসের প্রতিমূর্তি।
    তিনি নিজেই তাঁর বাহক বেছে নেন।
    আর যখন বেছে নেন, তখন সেই মানুষ আর সাধারণ থাকে না—
    সে হয়ে ওঠে আস্থার ধারক, বিশ্বাসের পথিক।
    সেদিন থেকেই রতনের পথচলা শুরু হল—
    একজন মানুষ থেকে বিশ্বাসের বাহকে রূপান্তরের পথ।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন