এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাট ঠাকুর

    Sandip Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৪০ বার পঠিত
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
    তৃতীয়  পর্ব
     
    চৈত্রের শেষ দিকের দুপুরে আত্রাইয়ের বালুচর যেমন আগুন ছড়ায়, তেমনই সন্ধেবেলায় নদীর পাড়ে নামে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাতাসে সোঁদা গন্ধ, দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, আর মাঝে মাঝে বেলপাতা নড়ে ওঠার মৃদু আওয়াজ।
    রতন এখন প্রায় প্রতিদিন সন্ধেয় বাড়ির পাশের বেলগাছটার নিচে গিয়ে বসে। 
    উমা কয়েকদিন লক্ষ্য করে অবশেষে জিজ্ঞেস করল, “ওখানে কী করিস রে?”
    রতন বলল, “শুনি।”
    “কী শুনিস?”
    রতন একটু ভেবে বলল, “কে যেন ডাকতেসে…”
    উমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
    এদিকে পরেশের মনে অস্থিরতা বাড়ছে। সে বুঝতে পারছে—রতনের সঙ্গে এই টান কাকতালীয় নয়। কিন্তু কীভাবে বলবে? কীভাবে বুঝবে? একদিন সে একাই সুবলের বাড়িতে এল, গাজনের সময় নয়, একেবারে সাধারণ দিনে। সুবল অবাক, “এই সময়? সব ঠিক তো?”
    পরেশ বলল, “রতন কোথায়?”
    রতন তখন বেলগাছের নিচে। পরেশ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখল—ছেলেটা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। বাতাস নেই, তবু বেলপাতা কাঁপছে। পরেশের গা শিরশির করে উঠল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রতনের কাঁধে হাত রাখল।
    রতন চোখ খুলে বলল, “আসলা?”
    পরেশ থমকে গেল।
    “তুই জানতিস আমি আসব?”
    রতন মাথা নাড়ল, “আজ সকাল থেকে মনে হচ্ছিল তুমি আসবা।”
    সেই সন্ধ্যায় পরেশ, সুবল আর উমাকে সব কথা খুলে বলল। তার বাবার কথা, ঝড়ের রাতের কথা, পাট ঠাকুর ডোবার কথা, আর সেই অদ্ভুত হাওয়ার মিল। 
    সব শুনে উমা চুপ করে রইল। তার চোখে ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্তি।
    সুবল বলল, “তুমি কি বলতে চাইতেস, রতন…”
    পরেশ থামাল, “আমি কিছু বলতে চাই না। আমি শুধু বলতাসি—ঠাকুর মানুষ বাইছা নেন।”
    এরপরের দিনগুলোতে রতনের আচরণ বদলাতে লাগল। সে ঢাক বাজায়, কিন্তু কখনও কখনও এমন তাল তোলে যা হরু ঢাকীও ধরতে পারে না। রাতে ঘুমের মধ্যে সে মন্ত্রের মতো কিছু বলে।
    একদিন উমা কান পেতে শুনল—“হর হর মহাদেব… দেবের-দেব-মহাদেব ”
    সে তো রতনকে এসব শেখায়নি।
    এর কিছুদিন পর এক রাতে  প্রবল কালবৈশাখী উঠল। বজ্রপাত, ঝড়, বৃষ্টি। প্রচন্ড ঝরে চারিদিকে তান্ডব  যেন মহাদেবের বীরভদ্র রূপ। সেই ঝড়ের মধ্যেই রতন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।
    উমা আঁকড়ে ধরল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
    রতন বলল, “নদীর কাছে যাইতে হবে। ঠাকুর ডাকতেছে।”
    সুবল আর উমা কোনোমতে তাকে থামাল।
    সেই রাতে পরেশও ঘুমোতে পারেনি। সে স্বপ্নে দেখল—আত্রাই নদী ফুলে উঠেছে, আর পাট ঠাকুর জলের উপর ভাসছে। তার বাবা দাঁড়িয়ে বলছে, “সময় আসতেছে ।”
    পরদিন ভোরে পরেশ ছুটে গেল সুবলের বাড়ি। দেখল রতন উঠোনে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে। দুজনের চোখাচোখি হতেই পরেশ বুঝল—এখন আর সন্দেহ নেই।
    রতন ধীরে বলল, “আমাকে শিখায় দিবা না ?”
    পরেশ জিজ্ঞেস করল, “কী শিখবি?”
    রতন বলল, “ঠাকুর কাঁধে নেওয়া।”
    পরেশের চোখ ভিজে উঠল। সে জানত, এই দিন আসবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি?
    সে বলল, “এটা খেলা নয় রে। এটা ভার। বিশ্বাসের ভার।”
    রতন শান্ত গলায় বলল, “আমি ভয় পাই না।”
    গাজনের সময় এল।
    এইবার পরেশ সিদ্ধান্ত নিল—রতনকে সঙ্গে নেবে। গ্রামের লোকজন অবাক। এত ছোট ছেলেকে?
    পরেশ শুধু বলল, “ঠাকুরের ইচ্ছা।”
    প্রথম দিন রতন শুধু ঢাক বাজাল। দ্বিতীয় দিন ঠাকুরের সামনে বসে রইল। তৃতীয় দিন পরেশ তাকে ঠাকুর ছুঁতে দিল। রতনের হাত ঠাকুরের কাঠে ছোঁয়া মাত্র তার শরীর কেঁপে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। পরেশের মনে হল—যেন বহুদিনের চেনা স্পর্শ।
    সেদিন রাতে আবার সেই ঝোড়ো হাওয়া উঠল। ধূপের ধোঁয়া একদিকে বেঁকে গেল। প্রদীপের শিখা কেঁপে উঠল। 
    রতন চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। হঠাৎ সে ধীরে ধীরে বলল—“বাবা আসতেসেন …”
    সবাই স্তব্ধ।
    পরেশ কাঁপা গলায় বলল, “কে বাবা?”
    রতন বলল, “যিনি জলে ডুবছিল…”
    পরেশের বুকের ভেতর বজ্রপাত হল। এই কথা তো সে কাউকে বলেনি!
    সেই মুহূর্তে পরেশ বুঝল—পাট ঠাকুর শুধু ইতিহাস নয়, এটা এক প্রবাহ। একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনের মধ্যে বয়ে যায়, সময়ের স্রোতের মতো। রতন এখন সেই স্রোতে পা দিয়েছে। আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই। রাতের শেষে আত্রাইয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে পরেশ মনে মনে বলল—“বাবা, তুমি যেমন আমাকে বাছছিলা , তেমনি ওকেও বাছছ?”
    দূরে নদীর জলে ভোরের আলো পড়ছিল। জল ঝিলমিল করে উঠল। পরেশের মনে হল—উত্তর সে পেয়ে গেছে। পাট ঠাকুরের ডাকা শুরু হয়েছে। আর সেই ডাকা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • . | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৩738609
  • অদ্ভুত রকমের গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্প।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন