চতুর্থ পর্ব
গাজনের সপ্তম দিন। সকাল থেকেই আকাশ অদ্ভুত পরিষ্কার। রোদ চড়া, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের স্বচ্ছতা। যেন প্রকৃতি নিজেই কিছু দেখার অপেক্ষায়।
পরেশ আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ।
রতন তার পাশে বসে ঢাকের চামড়া টানটান করছে। তার মুখে ভয় নেই, উত্তেজনাও নেই—আছে গভীর মনোযোগ। আজ পরেশ ঠিক করেছে—রতনকে প্রথমবার ঠাকুরের ভার অনুভব করাবে।
পরেশের দল আত্রাই নদীতে নামল স্নানের জন্য। সবাই স্নান সেরে উঠল। শেষবারের মতো পরেশ ঠাকুর কাঁধে নিয়ে জলে নামল। নিয়মমতো স্নান করাল। তারপর সে রতনকে ডাকল।
“আয়।”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল। পরেশ ধীরে ধীরে পাটঠাকুর নিজের কাঁধ থেকে নামাল। দুই হাতে ধরে রতনের সামনে দাঁড়াল।
“দুই হাত বাড়া।”
রতন হাত বাড়াল।
পরেশ ঠাকুরের এক পাশ তার হাতে দিল—পুরো ভার নয়, শুধু স্পর্শ। কিন্তু সেই স্পর্শেই রতনের শরীর কেঁপে উঠল। তার শ্বাস ভারী হয়ে গেল। চোখ বন্ধ হয়ে এল। সে যেন অন্য কোথাও চলে গেল। রতনের চোখের সামনে ভেসে উঠল জল… ঝড়… বিদ্যুৎ… আর এক বৃদ্ধ মানুষ জলের তলা থেকে ঠাকুর তুলে আনছে। সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলছে—“কাঁধে নে… বিশ্বাস কাঁধে নে…”
রতনের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। সে অজান্তেই বলে উঠল—“আমি নিব…”
পরেশের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। দলের বাকিরা স্তব্ধ।
হঠাৎ নদীর উপর দিয়ে এক দমকা হাওয়া বয়ে গেল। এতক্ষণ যে জল স্থির ছিল, তা কেঁপে উঠল। পরেশ দ্রুত ঠাকুর নিজের কাঁধে তুলে নিল।
রতন ধপ করে বসে পড়ল জলে।
সুবল ছুটে এল, “কি হল?”
পরেশ বলল, “কিছু হয়নি… শুরু হইতেছে।”
হটাৎ করে নদীর ওপর দিয়ে যেন একটা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেলো। দূরে কোথাও একটা অস্পষ্ট আওয়াজ যেন ভেসে আসছিলো "দেবের দেব ......মহা দেব"
সেদিনের পুজোয় রতন অদ্ভুত চুপচাপ ছিল। ঢাক বাজালেও তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল ঠাকুরের দিকে।
উমা দূর থেকে দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল—ছেলেটা যেন আর পুরোপুরি তার নেই।
রাতে নাটক চলছিল। সবাই হাসছে, ছড়া কাটছে। রতন এক কোণে বসে আছে।
পরেশ গিয়ে পাশে বসল। “ভয় পাইছিস?”
রতন মাথা নাড়ল, “না। কিন্তু মনে হল, আমি ওনাকে আগে থেকে চিনি।”
পরেশের গলা শুকিয়ে গেল, “কাকে?”
রতন বলল, “যিনি জলে ডুবছিলেন।”
পরেশ জানত—এখন আর কিছু লুকোনোর নেই। সে রতনের মাথায় হাত রেখে বলল, “সবাই ঠাকুর দেখে কাঠ। কেউ কেউ দেখে স্মৃতি। খুব কম মানুষ দেখে সত্যি।”
রতন বলল, “আমি সত্যি দেকসি।”
পরদিন সকালে পরেশ সিদ্ধান্ত নিল—রতনকে নিয়ে যাবে সেই জায়গায়, যেখানে তার বাবা মারা গিয়েছিল। আত্রাইয়ের এক নির্জন বাঁক। বালুচর, কাদামাটি, আর নিস্তব্ধতা।
পরেশ বলল, “এখানে নৌকা উলটে গেসিল।”
রতন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ সে হাঁটু গেড়ে বসে মাটি ছুঁয়ে দিল। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
সে ফিসফিস করে বলল, “আমি দেরি করে ফেলসি…”
পরেশের বুক ভেঙে গেল। এই কথা তো তার বাবার শেষ কথার মতো!
সেই দিন থেকে রতন বদলে গেল আরও। সে খেলাধুলো করে, হাসে, খায়—সবই করে। কিন্তু তার মধ্যে এক গভীরতা চলে এসেছে।
গ্রামের বয়স্ক লোকেরা বলতে লাগল, “ছেলেটার চোখে অন্য রকম চাহনি।”
উমা মাঝে মাঝে ভয় পায়। আবার গর্বও হয়।
গাজনের শেষ দিন। চৈত্র সংক্রান্তি। সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রা। পরেশ জানে—আজ তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শোভাযাত্রা শুরু হল। ঢাক, কাঁসর, শঙ্খ, ধ্বনি। পরেশ ঠাকুর কাঁধে নিয়ে হাঁটছে। তার পাশে রতন।
মাঝপথে হঠাৎ পরেশ থামল। সবাই অবাক। সে ধীরে ধীরে ঠাকুর নামাল। রতনের দিকে তাকাল।
“কাঁধ দে।”
চারদিক নিস্তব্ধ। রতন এগিয়ে এল।
পরেশ নিজের হাতে ঠাকুরের ভার রতনের কাঁধে তুলে দিল। মাত্র কয়েক পা। কিন্তু সেই কয়েক পা হাঁটার সময় পুরো গ্রাম নিঃশব্দ। রতনের মুখে কোনো কষ্ট নেই। তার চোখ সোজা সামনে। মনে হচ্ছিল—এই দৃশ্য বহু বছর আগে কোথাও ঘটেছিল। পরেশের চোখ ভিজে গেল। সে বুঝল—তার দায়িত্ব শেষের পথে। পাট ঠাকুর নতুন কাঁধ খুঁজে পেয়েছে। আত্রাইয়ের বালুচরে রোদ আজও তীব্র। কিন্তু সেই রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বাসের নতুন অধ্যায় লেখা হল। রতন আজ প্রথমবার ভার নিল। আর ভার একবার নিলে, তা আর কখনও নামানো যায় না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।