অষ্টম এবং অন্তিম পর্ব গাজন শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন।ঢাকের শব্দ থেমেছে, আলপনার রঙ মুছে গেছে, গ্রাম আবার ফিরে গেছে তার চেনা ছন্দে—মাঠে চাষ, নদীতে জাল, উঠোনে রোদে শুকোতে দেওয়া ধান, সন্ধ্যায় ধূপের গন্ধ আর শঙ্খধ্বনি।সবকিছু আগের মতোই।তবু, সবকিছু আর আগের মতো নেই।এই স্বাভাবিকতার আড়ালে অদৃশ্য এক পরিবর্তন নিঃশব্দে বসে আছে।মানুষ যখনই রতনকে দেখে, একটু থেমে তাকায়।কেউ আশীর্বাদ করে মাথায় হাত তোলে, কেউ মৃদু হাসে, কেউ আবার দূর থেকেই নীরবে হাত জোড় করে প্রণাম জানায়। যেন সে আর শুধুই গ্রামের এক সাধারণ ছেলে নয়—সে এখন এক নীরব আস্থার প্রতীক।কিন্তু রতন নিজে বদলায়নি।সে আগের মতোই দৌড়োয়, হেসে ওঠে, উমার বকুনি খেয়ে চুপ করে ... ...
সপ্তম পর্ব গাজনের প্রথম সকাল। গ্রাম যেন এক অলৌকিক আলোর আবরণে মোড়া। উঠোন জুড়ে সাদা আলপনার নকশা, বেলপাতা ভেজানো কলসের পাশে ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠছে। দূরে ঢাকের তাল প্রথমে নরম, তারপর ক্রমে চড়া—যেন সময় নিজেই উৎসবের ছন্দে জেগে উঠছে। বাতাসে কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত পবিত্রতা।আজ পরেশ খুব ভোরে উঠে পাটঠাকুরের কাঠ মুছে দিচ্ছিল যত্ন করে, যেন সন্তানের মুখ স্পর্শ করছে। সিঁদুরের লাল রঙ আঙুলের ডগা থেকে ছড়িয়ে পড়ল ঠাকুরের গায়ে। তার চোখে আজ এক গভীর নিবেদন।রতন পাশে বসে নিঃশব্দে সব দেখছিল।পরেশ মৃদু গলায় বলল,“আজ তুই আমার পাশে থাকবি, সবসময়।”রতন শুধু মাথা নাড়ল। কিন্তু ... ...
ষষ্ঠ পর্ব গাজনের আর মাত্র তিন দিন বাকি।কিন্তু গ্রামের আকাশে যেন উৎসবের রঙ নয়—জমে উঠেছে অদ্ভুত এক অশনি-সংকেত। কয়েকদিন ধরেই কালো মেঘ ঘিরে আছে আকাশকে। চৈত্রের শেষ প্রহরে এমন ভারী, নীচু মেঘ সচরাচর দেখা যায় না। বাতাসে চাপা গুমোট, যেন নিঃশব্দে জমে উঠছে কোনো অদৃশ্য অপেক্ষা।পরেশের বুকের ভিতর কেমন অকারণ অস্বস্তি।সে বুঝতে পারছিল—শুধু গাজন নয়, তার থেকেও বড় কিছু আসন্ন।সেই রাতেই আকাশ ফেটে নামল ঝড়।ভয়ংকর কালবৈশাখী।বজ্রপাতের ঝলকে আত্রাই নদী বারবার সাদা হয়ে উঠছিল, যেন অন্ধকারের বুক চিরে কেউ আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে। বাতাসে বেলপাতা ছিঁড়ে উড়ছে, খড়ের চাল কাঁপছে, দরজা-জানালা উন্মত্তের মতো ঠকঠক করে কাঁপছে। ধূপ, মাটি আর ভেজা বাতাসের গন্ধে ভরে ... ...
পঞ্চম পর্ব রতনের কাঁধে ঠাকুর তোলার সেই দৃশ্য গ্রামের মানুষ ভুলতে পারল না। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে ভক্তি—কিন্তু সবার চোখে একই প্রশ্ন। এত ছোট ছেলে? নিশ্চই দেবংশী। পরেশের ওপর কারও সরাসরি আপত্তি ছিল না, কিন্তু ফিসফাস শুরু হল। চণ্ডী মণ্ডলের দোকানে আড্ডা জমল।“ওসব ঠিক হইতেসে না রে।” “ঠাকুর কাঁধে নেওয়া কি ছেলের খেলা?” “পরেশ বুড়া হচ্ছে, তাই ছেলেটাকে টানতেসে।” “নাকি কিছু অলৌকিক?”এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সুবলের কানে পৌঁছাল। সুবল ভিতরে ভিতরে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সে ভক্ত মানুষ, কিন্তু সে বাবা-ও। সে রাতে উমাকে বলল, “আমরা কি ভুল করতিসি?”উমা শান্ত গলায় বলল, “যা হচ্ছে, তা আমরা করতিসি না গো। নিজে নিজেই হইতেসে।”এরই মধ্যে অদ্ভুত ... ...
চতুর্থ পর্ব গাজনের সপ্তম দিন। সকাল থেকেই আকাশ অদ্ভুত পরিষ্কার। রোদ চড়া, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের স্বচ্ছতা। যেন প্রকৃতি নিজেই কিছু দেখার অপেক্ষায়। পরেশ আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ। রতন তার পাশে বসে ঢাকের চামড়া টানটান করছে। তার মুখে ভয় নেই, উত্তেজনাও নেই—আছে গভীর মনোযোগ। আজ পরেশ ঠিক করেছে—রতনকে প্রথমবার ঠাকুরের ভার অনুভব করাবে। পরেশের দল আত্রাই নদীতে নামল স্নানের জন্য। সবাই স্নান সেরে উঠল। শেষবারের মতো পরেশ ঠাকুর কাঁধে নিয়ে জলে নামল। নিয়মমতো স্নান করাল। তারপর সে রতনকে ডাকল।“আয়।”সবাই অবাক হয়ে তাকাল। পরেশ ধীরে ধীরে পাটঠাকুর নিজের কাঁধ থেকে নামাল। দুই হাতে ধরে রতনের সামনে দাঁড়াল।“দুই হাত বাড়া।”রতন হাত বাড়াল।পরেশ ঠাকুরের এক পাশ তার হাতে দিল—পুরো ... ...
তৃতীয় পর্ব চৈত্রের শেষ দিকের দুপুরে আত্রাইয়ের বালুচর যেমন আগুন ছড়ায়, তেমনই সন্ধেবেলায় নদীর পাড়ে নামে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাতাসে সোঁদা গন্ধ, দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, আর মাঝে মাঝে বেলপাতা নড়ে ওঠার মৃদু আওয়াজ।রতন এখন প্রায় প্রতিদিন সন্ধেয় বাড়ির পাশের বেলগাছটার নিচে গিয়ে বসে। উমা কয়েকদিন লক্ষ্য করে অবশেষে জিজ্ঞেস করল, “ওখানে কী করিস রে?”রতন বলল, “শুনি।”“কী শুনিস?”রতন একটু ভেবে বলল, “কে যেন ডাকতেসে…”উমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।এদিকে পরেশের মনে অস্থিরতা বাড়ছে। সে বুঝতে পারছে—রতনের সঙ্গে এই টান কাকতালীয় নয়। কিন্তু কীভাবে বলবে? কীভাবে বুঝবে? একদিন সে একাই সুবলের বাড়িতে এল, গাজনের সময় নয়, একেবারে সাধারণ দিনে। সুবল অবাক, “এই ... ...
দ্বিতীয় পর্ব আত্রাই নদীর জল ভোরবেলা অন্য রকম লাগে। যেন রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে সে আবার নতুন করে জন্ম নেয়। কুয়াশার হালকা পর্দা জলের উপর ভাসে, আর দূরে কোথাও এক-আধটা বকের ডাক শোনা যায়। এই সময়টাতেই পরেশ মাঝি একা বসে থাকে নৌকার ধারে। গাজনের দিন না থাকলেও, ভোরবেলার এই নদী তাকে টানে। তার মনে হয়, নদীই একমাত্র জানে পাট ঠাকুরের আসল ইতিহাস। কারণ পাট ঠাকুরের শুরু এই নদী থেকেই। পরেশ তখন কিশোর। তার বাবা ছিল এই দলের সর্দার। গাজনের সময় পাট ঠাকুর কাঁধে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার বাবার। পরেশ তখন ঢাক বাজাত। এক বছর চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন ভয়ানক ঝড় উঠল। আত্রাই ... ...
প্রথম পর্ব দুপুরের চড়া রোদে আত্রাই নদীর পারের বালুচর একেবারে গরমের তাওয়া হয়ে আছে। চৈত্র মাসের ভরা দুপুর। বাতাস নেই, যেন আকাশের নীলচে আগুন সরাসরি বালুর উপর নেমে এসেছে। সেই উত্তপ্ত বালুর উপর পায়ের ছাপ পড়ছে, আর মুহূর্তেই মুছে যাচ্ছে—যেন সময় নিজেই হাঁপিয়ে উঠেছে। এই বালুচরের সঙ্গে পরেশ মাঝির চেনাজানা বহু দিনের। বছরভর সে এই নদীতেই নৌকা বায়, জাল ফেলে, মাছ ধরে। কিন্তু গাজনের এই পনেরো দিন সে আর শুধু মাঝি থাকে না—সে হয়ে ওঠে শিবের বাহক। পাট ঠাকুর কাঁধে নেওয়ার পর মানুষ বদলে যায়—এ কথা সে বহুবার শুনেছে তার বাবার কাছে। আজ সে নিজেই সেই কথার প্রমাণ। পাট ঠাকুর সারা বছর ... ...