দ্বিতীয় পর্ব
আত্রাই নদীর জল ভোরবেলা অন্য রকম লাগে। যেন রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে সে আবার নতুন করে জন্ম নেয়। কুয়াশার হালকা পর্দা জলের উপর ভাসে, আর দূরে কোথাও এক-আধটা বকের ডাক শোনা যায়। এই সময়টাতেই পরেশ মাঝি একা বসে থাকে নৌকার ধারে। গাজনের দিন না থাকলেও, ভোরবেলার এই নদী তাকে টানে। তার মনে হয়, নদীই একমাত্র জানে পাট ঠাকুরের আসল ইতিহাস। কারণ পাট ঠাকুরের শুরু এই নদী থেকেই।
পরেশ তখন কিশোর। তার বাবা ছিল এই দলের সর্দার। গাজনের সময় পাট ঠাকুর কাঁধে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার বাবার। পরেশ তখন ঢাক বাজাত। এক বছর চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন ভয়ানক ঝড় উঠল। আত্রাই নদী ফুলে-ফেঁপে উঠল। বৃষ্টি, ঝড়, বজ্রপাত—চারদিক অন্ধকার। সেদিন পাট ঠাকুর নিয়ে তারা ফিরছিল অন্য এক গ্রাম থেকে। হঠাৎ মাঝনদীতে নৌকা উলটে গেল। সবাই সাঁতরে উঠল, কিন্তু পাট ঠাকুর ডুবে গেল জলের তলায়। পরেশের বাবা তখন পাগলের মতো জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। “ঠাকুর ছাড়া ফিরব না!” সেই উত্তাল জলে, বিদ্যুতের আলোয়, পরেশ দেখেছিল—তার বাবা জলের তলা থেকে পাট ঠাকুর তুলে আনছে। কিন্তু ততক্ষণে তার শরীর নিস্তেজ। নদীর পাড়ে উঠিয়ে রাখার পর তার বাবা শেষবার বলেছিল—“ঠাকুরকে কখনও মাটিতে ফেলিস না… ঠাকুর কাঁধে মানে বিশ্বাস কাঁধে…” সেই রাতেই সে মারা যায়। তারপর থেকে পরেশ পাট ঠাকুর কাঁধে নেয়। এই ইতিহাস গ্রামের খুব কম মানুষ জানে। কারণ পাট ঠাকুর শুধু মূর্তি নয়—এটা এক বংশের দায়িত্ব, এক বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা। পরেশ জানে, ঠাকুরের মধ্যে নদীর জল আছে, তার বাবার প্রাণ আছে। তাই যখন সে সুবলের বাড়িতে সেই ঝোড়ো হাওয়া টের পেয়েছিল, তার বুক কেঁপে উঠেছিল। কারণ এমন হাওয়া সে আগে দেখেছে—সেই ঝড়ের রাতে।
এদিকে সুবলের বাড়িতে পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হতে লাগল। উমা লক্ষ্য করল, রতন আগের মতো চঞ্চল নেই। সে চুপচাপ বসে থাকে। কখনও উঠোনে, কখনও ঠাকুরঘরের সামনে। একদিন উমা জিজ্ঞেস করল, “কী রে, খেলতে যাচ্ছিস না ক্যান?”
রতন বলল, “মা, ঢাক শিখব।”
উমা অবাক। তাদের বংশে কেউ ঢাক বাজায় না। কিন্তু রতনের চোখে এক অদ্ভুত জেদ। সুবল বলল, “শিখতে চাচ্ছে শিখুক।”
গ্রামের ঢাকী হরু তাকে শেখাতে রাজি হল। ঢাকের তালে তালে রতনের শরীর দুলতে লাগল। যেন সে বহুদিন ধরেই এই তাল জানে। এক রাতে রতন স্বপ্ন দেখল—বালুচরের উপর দাঁড়িয়ে আছে পরেশ। তার কাঁধে ঠাকুর। সে রতনকে ডাকছে। “আয়… সময় হলে তোকে নিতে আসব…” রতন ঘুম ভেঙে উঠে বসে রইল। তার মনে হল, এটা শুধু স্বপ্ন নয়।
এদিকে পরেশের দল গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরছে। কিন্তু এবার পরেশের মনে অদ্ভুত টান—সুবলের বাড়ির দিকে। সে বুঝতে পারছে না কেন।
একদিন সন্ধ্যায় বেলগাছের তলায় বসে সে দলের এক বৃদ্ধ সদস্যকে বলল, “তুই কি লক্ষ্য করছিস, এই বছর হাওয়া-টাওয়া কেমন অদ্ভুত লাগতেছে?” বৃদ্ধ বলল, “যেখানে বিশ্বাস জাগে, সেখানে ঠাকুর নিজের চিহ্ন রেখে দেন।” পরেশ চুপ করে গেল।
মাস কয়েক পর গাজন আবার এল। এবার পতিতের তালিকা করার সময় গ্রামের লোকজন নিজেরাই বলল—“আগে সুবল মহন্তের বাড়ি।” পরেশের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে জানত, এ বছর কিছু ঘটবে। সেদিন যখন তারা সুবলের বাড়ির উঠোনে ঢুকল, রতন ছুটে এসে দাঁড়াল। তার চোখে আর সেই বিস্ময় নেই—আছে এক অদ্ভুত স্থিরতা। পরেশ তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। মনে হল, সে যেন নিজের ছোটবেলাকে দেখছে। পুজোর সময় ঢাক বাজাতে রতন এগিয়ে এল। হরু ঢাকী অবাক হয়ে বলল, “এই বয়সে এমন তাল! এ তো জন্মের শেখা!” পরেশের শরীরে কাঁটা দিল।
পুজোর মাঝখানে আবার সেই ঝোড়ো হাওয়া উঠল। ধূপের ধোঁয়া একদিকে বেঁকে গেল। প্রদীপের শিখা লম্বা হয়ে উঠল। পরেশের চোখে জল এসে গেল। সে মনে মনে বলল— “বাবা, তুমি আসো?” ঠিক তখন রতন ঢাকের এমন এক তাল দিল, যা পরেশ শেষ শুনেছিল সেই ঝড়ের রাতে। তার হাত কেঁপে উঠল। সে বুঝল—সময় এগোচ্ছে।
সেই রাতে পরেশ সুবলকে একা ডেকে বলল, “তোর ছেলেকে চোখে চোখে রাখিস। ওর ভিতরে ঠাকুরের টান আসে।”
সুবল অবাক, “মানে?”
পরেশ বলল না সব কথা।
শুধু বলল, “সবাই ঠাকুর কাঁধে নিতে পারে না। ঠাকুর নিজে মানুষ বাইছা নেন।”
সুবলের বুক হালকা কেঁপে উঠল।
রাতে রতন আবার স্বপ্ন দেখল। এইবার সে দেখল—আত্রাই নদী ফুলে উঠেছে। মাঝখানে পরেশ দাঁড়িয়ে। তার পাশে এক বৃদ্ধ—যাকে রতন কখনও দেখেনি। বৃদ্ধ বলল, “ভয় পাস না। তুই পারবি।” রতন ঘুম ভেঙে বুঝল—এটা স্বপ্ন নয়, এটা ডাকা।
ভোরবেলা আত্রাইয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে পরেশ বুঝতে পারল—পাট ঠাকুরের ইতিহাস নতুন করে লেখা শুরু হয়েছে। আর সেই ইতিহাসে এবার রতনের নাম জুড়তে চলেছে। চৈত্রের রোদ যেমন একই থাকে, তেমনি বিশ্বাসের ধারাও থেমে থাকে না। একজনের কাঁধ থেকে আরেকজনের কাঁধে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, পাট ঠাকুরের ভার এভাবেই চলে যায়। পরেশ জানত—তার সময় ফুরোচ্ছে। আর রতনের সময় শুরু হচ্ছে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।