অনির্বাণ এখন বালিশে মুখ ঠেকিয়ে শুয়ে আছে। ঘুম পাচ্ছে না, কিন্তু সে বড়ো ক্লান্ত। নানারকম চিন্তাস্রোত পর্যুদস্ত করে রেখেছে তাকে। অফিসে এখন তিনদিন ছুটি। লং উইকেন্ড। অতএব অবসাদকে প্রশ্রয় দেওয়া চলে।
অনির্বাণ এদেশে ভিসা নিয়ে আছে। তার কোম্পানি তার ওয়ার্ক ভিসা স্পনসর করছে, কিন্তু এও বলে রেখেছে তারা এখন পরিস্থিতি অনিশ্চিত। যদি গ্রীনকার্ড পেয়ে যেত অনির্বাণ, তাহলে তার আর কোনো চিন্তা থাকতো না। গ্রীনকার্ড ভারতীয়রা আজকাল আর পায়না। স্বপ্নেও ভাবে না অনির্বাণ সে গ্রীনকার্ড পাবে।
চাকরিটা চলে গেলে অনির্বাণ কি করবে? তাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। কলকাতায় অনির্বাণ ফিরে গিয়ে চাকরি করবে? হয়ত ব্যাঙ্গালোর বা দিল্লি। দেশে ফেরার কথা ভাবতেই দিল্লি এয়ারপোর্টের পুলিশগুলোর ছবি অনির্বাণের চোখে ভেসে ওঠে। ও সেই সূত্র ধরে সামগ্রিক ব্যুরোক্রেসি। একবার আধারে ফোন নম্বর লিংক করাতে গিয়ে অনির্বাণকে এত ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল যে তার মনে হয়েছিল গোটা সিস্টেমটা নাগরিকদের হ্যারাসমেন্টের জন্য তৈরী। অথচ সে তো ওই দেশটার নাগরিক। এ দেশে নাগরিক শব্দটার পিছনে কত আরাম কত নিশ্চিন্তি লুকিয়ে আছে।
দেশে ফেরার কথা ভাবলেই তার মনটা ফাঁকা হয়ে যায়, যেন সে ধরা পড়ে যাবার আগের মুহূর্তের কয়েদী। পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে এদেশে ইল্লিগ্যাল হয়ে ভিড়ে মিশে গেলে কেমন হয়? তা সে পারবে না। বরাবর সে সিস্টেমের ভেতরে থেকে মেধার জোরে কেরিয়ার তৈরী করেছে। সিস্টেমের বাইরে কী আছে সে জানে না। তার সাহস নেই সারাজীবনের জন্য অপরাধী হয়ে যাবার।
কলকাতার কথা মনে পড়ে তার। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। বাইরে ঝুপঝুপ অবিরাম বরফ পড়ছে। ভেতরে বৃষ্টি নাবে। ঝেঁপে বৃষ্টি। মাছওলা কলকাতার ডুবন্ত গলিতে চেঁচিয়ে বলে, ভালো ট্যাংরা আছে দিদিভাই। বাবা জানলাগুলো বন্ধ করছে। পিন্টু আলোটা নিয়ে আয়, বাবা গলা তুলে বলে। পিন্টু তো দেশপ্রিয় পার্কে গেছে, মা উত্তর দেয়, আজ তুতুলের জন্মদিন।
কোথা থেকে কৌশিকী চক্রবর্তীর গলা ভেসে আসে অনির্বাণ সহসা শুনতে পায়। বাতাস তখন বইতে গিয়েও দেখায় অভিমান, অ-ভি-মা-ন, এ লাইনটা লুপে ঘুরতে থাকে তার মগজে। দাদুভাই বলে শাখাপ্রশাখার বুড়ো একগাল হাসে। তুতুলের বিয়ের দিনটা অনির্বাণের মনে পড়ে। কি আনন্দ হয়েছিল তুতুলের বিয়েতে। অতগুলো ভাইবোন একজায়গায় জড়ো হওয়া। তুতুল বলেছিল গেলে সবাইকে নিয়ে হনিমুনে যাবে। হঠাৎ ভাললাগার অনুভূতি অনির্বাণের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কতদিন তাদের ভাইবোনদের যোগাযোগ নেই। সবাই ছড়িয়েছিটিয়ে বেঁচে আছে। তা হোক, তবু এই মুহূর্তে অনির্বাণের লোনলিনেস কমে যায়।
শীতশীত করায় পায়ের কাছ থেকে ব্ল্যাংকেটটা টেনে নেয় অনির্বাণ। কি হলো জীবনটা তার? যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, তারপর এদেশে এসে পিএইচডি। ফাইনাল থিসিস জমা দেবার পর তার সুপারভাইজার হ্যান্ডশেক করে বলেছিল, আর ইউ শিওর ইউ ওয়ান্ট টু গো টু দি ইন্ডাস্ট্রি? ততদিনে অনির্বাণ ছকে নিয়েছে। অনেক পয়সা কামাতে চায় সে। অনেক পয়সা। এআই ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিটা পেতে বিশেষ কষ্ট হয়নি। তার প্রেস্টিজিয়াস পাবলিকেশনের লিস্ট আর কোয়ালিফিকেশন দেখে কোম্পানি তাকে লুফে নিয়েছিল। স্যালারি নেগোশিয়েট করার পর নিজেকে পাক্কা সাদা আমেরিকান মনে হয়েছিল তার। ইন্ডিয়ান আমেরিকানরা সাদাদের তুলনায় এদেশে বেশি রোজগার করে, এই স্ট্যাটিস্টিক্সটা কোথায় যেন তাকে তৃপ্তি দেয়।
সেই কবে থেকে অনির্বাণ সাদা হতে চেয়েছে। যাদবপুরে পড়ার সময় সে গাঁজা মাত্র দুয়েকবার টেনেছে, পলিটিক্সে কখনও জড়িয়ে পড়েনি। একমাত্র মনীষার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল সে। মনে হয়েছিল মনীষাকে ছেড়ে সে বাঁচতে পারবে না। ক্যাম্পাসে মনীষার কোমর জড়িয়ে ঘুরতে ঘুরতে সে একদিন টের পেয়েছিল একটা সমস্যা আছে। তুই ইউএস গিয়ে সেটল করতে চাস? মনীষা পাখির নীড়ের মতন চোখে জানতে চেয়েছিল। সেই একবারই অনির্বাণ ইউএস ভুলে মনীষাকে পেতে চেয়েছিল।
ভাবলে হাসি পায় এখন। পর্ন দেখতে দেখতে সে সাদা মেয়েদের ধারালো সৌন্দর্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সে শরীর চায়, প্রেম অত দরকারি কিছু বলে মনে হয়না তার। তবুও পর্নে সাদা মেয়েদের উদ্ধত বুক দেখতে দেখতে মনীষার সঙ্গে দুপুরগুলো মনে পড়ে। প্রথমবার সেক্সের স্মৃতি এত তীব্র মনে থাকে যে অনির্বাণ আস্তে আস্তে পর্ন ভিডিওটা বন্ধ করে দেয়। স্টিমুলেশন সরে যেতেই বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে তার শরীরে।
বালিশে মাথা গুঁজেই সে পডকাস্ট চালু করে। মিনিয়াপোলিশের ঘটনা নিয়ে দুজন আমেরিকান সাংবাদিক কথা বলছে। ট্রাম্পের মতলবটা কী বলত ভাই? একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে। অনির্বাণ বালিশে ডুবে যেতে থাকে। আবার ভবিষ্যতের কথা নেড়েচেড়ে দেখে। ফায়ার শব্দটা আজকাল খুব উঠেছে। ফায়ার অর্থাৎ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স, রিটায়ার আর্লি। এগ্রেসিভলি টাকা জমিয়ে নিরাপদ ইনভেস্টমেন্টে রেখে তিরিশ-চল্লিশেই চাকরি ছেড়ে অবসর জীবন কাটানো। অনির্বাণ ভাবে তার ব্যাঙ্কে যা আছে, দেশে ফিরে গিয়ে এফডি বানিয়ে সে বাকি জীবন শামুকের মতো কাটিয়ে দিতে পারে। তার বাবা সপ্তাহে পাঁচদিন ফুল ও শনিবার হাফ অফিস করে সারাজীবন যা মাইনে পেত, অনির্বাণ অ্যাসেট থেকে তার চেয়ে বেশি ইনকাম করবে। তবুও কোথাও যেন দ্বিধা থেকে যায়। ঐ জীবন কি তার ভালো লাগবে?
হঠাৎ তার কৌতূহল জাগে গরীব লোকেরা কি করে জীবন কাটায়? একদম হদ্দ গরীব যারা, কলকাতার রাস্তাঘাটে যাদের দেখতে পাওয়া যায়। অনির্বাণের কোম্পানি কত যত্ন করে খেটেখুটে মানুষের নকল এলএলএম বানায়, অথচ পৃথিবীতে কত আসল লোক পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে কেউ কেয়ারও করে না। এরা কি করে বেঁচে থাকে?
অনির্বাণের কিয়ের্কেগার্দের মত হাসি পায়। পডকাস্ট শেষ হয়ে গেলে টেলর সুইফটের লেটেস্ট ট্যুর চলে আসে। দূরে কোথাও আইসবার্গ ভেঙে পড়ে, হামিংবার্ড গান গায়। অনির্বাণ দমকে দমকে হাসে। একচুয়ালি হয়েছে কি, তার জীবনের প্রতি টান সম্পূর্ণ চলে গেছে। সাইন আউট করারও ইচ্ছে নেই। গ্রীনকার্ড পেলে বা না পেলেও তার কিছু আসবে যাবে না। আইদার/অর সে তো স্ক্রিনের দিকে মাছের মতন চোখে তাকিয়ে থাকবে।