এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাট ঠাকুর 

    Sandip Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • অষ্টম এবং অন্তিম পর্ব
     
    গাজন শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন।
    ঢাকের শব্দ থেমেছে, আলপনার রঙ মুছে গেছে, গ্রাম আবার ফিরে গেছে তার চেনা ছন্দে—মাঠে চাষ, নদীতে জাল, উঠোনে রোদে শুকোতে দেওয়া ধান, সন্ধ্যায় ধূপের গন্ধ আর শঙ্খধ্বনি।
    সবকিছু আগের মতোই।
    তবু, সবকিছু আর আগের মতো নেই।
    এই স্বাভাবিকতার আড়ালে অদৃশ্য এক পরিবর্তন নিঃশব্দে বসে আছে।
    মানুষ যখনই রতনকে দেখে, একটু থেমে তাকায়।
    কেউ আশীর্বাদ করে মাথায় হাত তোলে, কেউ মৃদু হাসে, কেউ আবার দূর থেকেই নীরবে হাত জোড় করে প্রণাম জানায়। যেন সে আর শুধুই গ্রামের এক সাধারণ ছেলে নয়—সে এখন এক নীরব আস্থার প্রতীক।
    কিন্তু রতন নিজে বদলায়নি।
    সে আগের মতোই দৌড়োয়, হেসে ওঠে, উমার বকুনি খেয়ে চুপ করে থাকে, নদীর ধারে বসে পাথর ছোঁড়ে।
    তবু তার চোখের গভীরতায় এখন এক অদ্ভুত স্থিরতা—যা আর শিশুসুলভ নয়, বরং সময়ের ছোঁয়ায় পরিণত।
    পরেশও বদলে গেছে।
    সে এখন আগের মতো জোরে হাঁটে না, বেশি কথা বলে না।
    প্রায়ই বিকেলের আলো নিভে আসার সময় বেলগাছের নিচে বসে থাকে—চুপ করে, স্থির হয়ে, যেন অদৃশ্য কারও সঙ্গে নীরব আলাপে মগ্ন।
    একদিন সন্ধ্যায়, আকাশে লালচে আলো ঝিমিয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই রতন এসে তার পাশে বসে।
    দীর্ঘ নীরবতার পর পরেশ ধীরে বলল,
    “জানিস, গাছেরা আগে থেকেই বুঝতে পারে—কোন পাতা কবে ঝরবে।”
    রতন কিছু বলল না। শুধু শুনতে লাগল।
    পরেশ মাটির দিকে তাকিয়ে, খুব শান্ত স্বরে বলল,
    “আমার সময় আসতেসে রে…”
    রতনের বুক হঠাৎ চেপে ধরল।
    সে তাড়াতাড়ি বলল,
    “এইসব বলবা না।”
    পরেশ মৃদু হাসল—সেই পরিচিত, আশ্বাসের হাসি।
    “ভয় পাবি না। এটা নিয়ম।
    যেমন ঠাকুর এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধে যায়, তেমনি মানুষও যায়… শুধু পথ বদলায়।”
    এর কিছুদিন পর থেকেই পরেশের শরীর আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে শুরু করল।
    কোনো বড় অসুখ নয়, তবু শক্তি যেন নিঃশব্দে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
    হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠে, রাতে কাশি বাড়ে, কণ্ঠে ক্লান্তির ভার।
    গ্রামের মানুষ একে একে দেখতে আসতে লাগল।
    সবাই জানে—এই মানুষটাই বছরের পর বছর পাটঠাকুর বহন করেছে, ঝড়-বাদল, ভয়-অবিশ্বাস সবকিছুর ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে।
    রতন প্রায় রোজই আসে।
    চুপ করে বসে থাকে, কখনও জল দেয়, কখনও শুধু হাত ধরে থাকে।
    একদিন পরেশ তাকে ডেকে বলল,
    “ঠাকুরঘরে নিয়ে চল।”
    রতন নিঃশব্দে তাকে ধরে নিয়ে গেল।
    পাটঠাকুরের সামনে বসে পরেশ দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।
    ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছিল, আলো-ছায়ার মাঝে তার মুখ যেন আরও শান্ত হয়ে উঠেছিল।
    অবশেষে সে বলল,
    “আজ তোকে একটা কথা বলব… যা আমি কাউকে কোনোদিন বলিনি।”
    রতনের শ্বাস ধীরে আটকে গেল।
    পরেশ বলল,
    “যেদিন আমার বাবা জলে ডুবছিল, সেদিন সে আমাকে বলছিল—ঠাকুরকে কখনও মাটিতে ফেলিস না।
    কিন্তু আরেকটা কথা বলছিল… যা আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম এতদিন।”
    নীরবতা আরও ঘন হল।
    “সে বলছিল—
    একদিন তুই বুঝবি, ঠাকুর কাঁধে নেওয়া মানে নিজের জীবন কাঁধে নেওয়া নয়…
    অন্যের জীবন, অন্যের বিশ্বাস, আর একটা গ্রামের আস্থা কাঁধে নেওয়া।”
    রতনের চোখ ভিজে উঠল।
    সে মাথা নিচু করে বসে রইল।
    সেই রাতে পরেশ রতনকে পাশে শুইয়ে গল্প করছিল—শৈশবের, নদীর, গাজনের, আর পুরনো দিনের স্মৃতি।
    হঠাৎ খুব শান্ত গলায় বলল,
    “যদি কখনও খুব ভয় পাস… আত্রাইয়ের জলে পা ডুবায় দাঁড়াবি।
    সব ভয় জলের সঙ্গে ভেসে চলে যাবে।”
    রতন তার হাত শক্ত করে ধরল—যেন ছেড়ে দিতে চাইছে না।
    দুই দিন পর ভোরবেলা পরেশের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
    উমা, সুবল, আর গ্রামের মানুষ একে একে জড়ো হল।
    ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা—শুধু কাশি আর ধূপের গন্ধ।
    রতন দৌড়ে এসে তার মাথার পাশে বসল।
    পরেশ ধীরে চোখ খুলে তাকে দেখল।
    চোখে কোনো ভয় নেই, শুধু গভীর শান্তি।
    তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
    ফিসফিস করে বলল—
    “ভয় পাবি না…”
    এই তিনটি শব্দই ছিল তার শেষ কথা।
    গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল।
    পাটঠাকুরের বাহক চলে গেল—নিঃশব্দে, শান্তভাবে, নিজের দায়িত্ব পূর্ণ করে।
    চকভৃগু শ্মশানের আগুন জ্বলতে জ্বলতে আত্রাইয়ের আকাশ লাল হয়ে উঠল।
    ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল, যেন এক যুগের অবসান লিখে দিচ্ছে।
    রতন দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
    তার চোখে জল ছিল, কিন্তু মুখে ছিল অদ্ভুত স্থিরতা—দুঃখের মাঝেও এক অনিবার্য গ্রহণযোগ্যতা।
    সেই রাতেই রতন স্বপ্ন দেখল—
    আত্রাইয়ের বালুচরে পরেশ দাঁড়িয়ে আছে।
    তার কাঁধে আর ঠাকুর নেই।
    মুখে প্রশান্ত হাসি।
    সে বলছে,
    “এবার তোর পালা।”
    ভোরে ঘুম ভেঙেই রতন একা চলে গেল আত্রাইয়ের পাড়ে।
    নদীর জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেমন পরেশ বলেছিল।
    শীতল জল ধীরে ধীরে তার পায়ের কাছে বয়ে যেতে লাগল।
    তার বুকের ভার, অজানা ভয়, নিঃশব্দ শোক—সব যেন জলের স্রোতে গলে গেল।
    সে বুঝল—
    বিদায় মানে শেষ নয়।
    বিদায় মানে দায়িত্বের হস্তান্তর।
    এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধে বিশ্বাসের যাত্রা।
    কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রামের মানুষ একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিল—
    এবার থেকে গাজনের সর্দার হবে রতন।
    কেউ প্রশ্ন করল না।
    কেউ আপত্তি জানাল না।
    কারণ সবাই জানত—
    এই সিদ্ধান্ত মানুষের নয়, নিয়তির।
    সেদিন বিকেলে বেলগাছের পাতা খুব আস্তে আস্তে ঝরছিল।
    প্রতিটি ঝরা পাতার শব্দ যেন এক নীরব প্রণাম, এক বিদায়ের মন্ত্র।
    আর সেই মৃদু ঝরার শব্দের ভেতর দিয়েই শোনা যাচ্ছিল নতুন কিছুর সূচনা।
    পাট ঠাকুরের কাঁধ বদলেছে—
    কিন্তু বিশ্বাসের পথ, ভক্তির শপথ, আর আত্রাইয়ের জলের মতোই চিরন্তন থেকে গেছে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন