এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাট ঠাকুর 

    Sandip Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৫ বার পঠিত
  • পর্ব ৫
    পঞ্চম পর্ব 
     
    রতনের কাঁধে ঠাকুর তোলার সেই দৃশ্য গ্রামের মানুষ ভুলতে পারল না। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে ভক্তি—কিন্তু সবার চোখে একই প্রশ্ন। এত ছোট ছেলে? নিশ্চই দেবংশী। 
    পরেশের ওপর কারও সরাসরি আপত্তি ছিল না, কিন্তু ফিসফাস শুরু হল। চণ্ডী মণ্ডলের দোকানে আড্ডা জমল।
    “ওসব ঠিক হইতেসে না রে।” “ঠাকুর কাঁধে নেওয়া কি ছেলের খেলা?” “পরেশ বুড়া হচ্ছে, তাই ছেলেটাকে টানতেসে।” “নাকি কিছু অলৌকিক?”
    এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সুবলের কানে পৌঁছাল। সুবল ভিতরে ভিতরে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সে ভক্ত মানুষ, কিন্তু সে বাবা-ও। 
    সে রাতে উমাকে বলল, “আমরা কি ভুল করতিসি?”
    উমা শান্ত গলায় বলল, “যা হচ্ছে, তা আমরা করতিসি না গো। নিজে নিজেই হইতেসে।”

    এরই মধ্যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। গ্রামের হরিপদ মন্ডলের  গোরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। অনেক ওঝা-ডাক্তারেও কাজ হল না। একেবারে যায় যায় অবস্থা। গরীব কৃষক  গোরু টাই একমাত্র সম্বল দুধ বেঁচে যা আয় হয়, সংসারে কিছুটা সুরাহা। 
    কেউ একজন বলল, “রতনকে ডেকে আনো।”
    হরিপদ প্রথমে রেগে উঠল, “ওই ছেলে আবার কি করবে!”
    কিন্তু শেষমেশ হতাশ হয়ে সুবলের বাড়িতে এল। রতন তখন উঠোনে বসে ঢাকের চামড়া মেরামত করছে।
    হরিপদ বলল, “একবার চল তো রে বাবা।”
    রতন গেল। গোরুর গায়ে হাত রাখল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
    তারপর বলল, “ওকে বেলপাতা ছিড়ে  জল দিয়ে খাওয়ান।”
    সবাই অবাক। 
    কিন্তু হরিপদ আর উপায় না দেখে তাই করল। 
    সবাই কে অবাক করে, পরদিন গোরু উঠে দাঁড়াল।
    খবর ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মতো। যারা সন্দেহ করছিল, তারাও চুপ হয়ে গেল। কিন্তু পরেশ চিন্তিত হল। সে জানত—এইসব ঘটনা মানুষকে যেমন বিশ্বাসী করে, তেমনই ভয়ও জাগায়।
    সেই রাতেই পরেশ রতনকে ডেকে বলল, “শোন, মানুষ তোকে অনেক কিছু ভাববে। কিন্তু তুই কিছু ভাববি না। তুই শুধু ঠাকুরের কথা ভাববি।”
    রতন বলল, “আমি কিছু করি না কাকা। নিজের থেকেই হয়ে যায়।”
    পরেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “সেটাই ভয়।”

    এরপর একদিন বিকেলে রতন হঠাৎ নিখোঁজ। উমা পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। পরেশ ও সাথে ছিল। 
    শেষমেশ দেখা গেল—সে আত্রাইয়ের সেই বাঁকে বসে আছে, যেখানে পরেশের বাবা মারা গিয়েছিল।
    সূর্য ডুবছে, জল লাল হয়ে আছে।
    রতন জলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ উনি খুব কাছে আসছিলেন।”
    পরেশ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে?”
    রতন বলল, “যিনি ঠাকুর বাঁচাতে গেসিলেন।”
    পরেশের আর সন্দেহ রইল না। এটা শুধু কাকতালীয় নয়। এটা প্রবাহ—যা সময়ের স্রোতের মতো। কিন্তু সবার বিশ্বাস এমন নয়। 
    গ্রামের কয়েকজন বলল, “এই ছেলেটা ঠিক নয়। বেশি বাড়তেসে।” 
    একদিন রাতের অন্ধকারে কেউ সুবলের বাড়ির বেলগাছের ডাল ভেঙে দিল। উমা সকালে দেখে কেঁদে ফেলল। 
    রতন শুধু বলল, “ওরা ভয় পাইসে।”
    পরেশ শুনে রেগে উঠল।
    কিন্তু রতন তাকে থামাল, “ওদের কিছু বলবেন না। সময় হলে ওরাই বুঝবে।” 
    পরেশ অবাক। এই বয়সে এমন কথা!
    কয়েকদিন পর গ্রামের এক বৃদ্ধা মারা গেলেন। শেষ সময় তিনি শুধু বলছিলেন, “ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছি…” কেউ ঢাক বাজাচ্ছিল না। শুধু রতন দূরে বসে ছিল।  
    এইসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। সন্দেহ কমল, ভক্তি বাড়ল।
    কিন্তু পরেশ জানত—এটা বিশ্বাসের পরীক্ষা। যেখানে বিশ্বাস আছে, সেখানে ভয়ও থাকে। আর ভয় পেরিয়ে তবেই বিশ্বাস পূর্ণ হয়। গাজন আসতে তখনও কয়েক দিন বাকি।  কিন্তু গ্রাম যেন অপেক্ষা করছে। সবাই জানে—এইবার গাজনে কিছু ঘটবে। কারণ এবার পাট ঠাকুর শুধু এক গৃহস্থের উঠোনে যাবে না। এবার সে নতুন কাঁধ খুঁজে পেয়েছে। আর সেই কাঁধকে সবাই দেখবে। পরীক্ষা করবে। মানবে—অথবা ভয় পাবে। 
    রতন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, কেউ তাকে দেখছে। সে জানে না কেন, কিন্তু সে প্রস্তুত। কারণ সে বুঝে গেছে—ঠাকুর কাঁধে নেওয়া মানে শুধু ভার নেওয়া নয়, মানুষের ভয়, সন্দেহ, আর বিশ্বাস—সব কাঁধে নেওয়া।
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ৫
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন