পঞ্চম পর্ব
রতনের কাঁধে ঠাকুর তোলার সেই দৃশ্য গ্রামের মানুষ ভুলতে পারল না। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে ভক্তি—কিন্তু সবার চোখে একই প্রশ্ন। এত ছোট ছেলে? নিশ্চই দেবংশী।
পরেশের ওপর কারও সরাসরি আপত্তি ছিল না, কিন্তু ফিসফাস শুরু হল। চণ্ডী মণ্ডলের দোকানে আড্ডা জমল।
“ওসব ঠিক হইতেসে না রে।” “ঠাকুর কাঁধে নেওয়া কি ছেলের খেলা?” “পরেশ বুড়া হচ্ছে, তাই ছেলেটাকে টানতেসে।” “নাকি কিছু অলৌকিক?”
এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সুবলের কানে পৌঁছাল। সুবল ভিতরে ভিতরে দুশ্চিন্তায় পড়ল। সে ভক্ত মানুষ, কিন্তু সে বাবা-ও।
সে রাতে উমাকে বলল, “আমরা কি ভুল করতিসি?”
উমা শান্ত গলায় বলল, “যা হচ্ছে, তা আমরা করতিসি না গো। নিজে নিজেই হইতেসে।”
এরই মধ্যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। গ্রামের হরিপদ মন্ডলের গোরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। অনেক ওঝা-ডাক্তারেও কাজ হল না। একেবারে যায় যায় অবস্থা। গরীব কৃষক গোরু টাই একমাত্র সম্বল দুধ বেঁচে যা আয় হয়, সংসারে কিছুটা সুরাহা।
কেউ একজন বলল, “রতনকে ডেকে আনো।”
হরিপদ প্রথমে রেগে উঠল, “ওই ছেলে আবার কি করবে!”
কিন্তু শেষমেশ হতাশ হয়ে সুবলের বাড়িতে এল। রতন তখন উঠোনে বসে ঢাকের চামড়া মেরামত করছে।
হরিপদ বলল, “একবার চল তো রে বাবা।”
রতন গেল। গোরুর গায়ে হাত রাখল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
তারপর বলল, “ওকে বেলপাতা ছিড়ে জল দিয়ে খাওয়ান।”
সবাই অবাক।
কিন্তু হরিপদ আর উপায় না দেখে তাই করল।
সবাই কে অবাক করে, পরদিন গোরু উঠে দাঁড়াল।
খবর ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মতো। যারা সন্দেহ করছিল, তারাও চুপ হয়ে গেল। কিন্তু পরেশ চিন্তিত হল। সে জানত—এইসব ঘটনা মানুষকে যেমন বিশ্বাসী করে, তেমনই ভয়ও জাগায়।
সেই রাতেই পরেশ রতনকে ডেকে বলল, “শোন, মানুষ তোকে অনেক কিছু ভাববে। কিন্তু তুই কিছু ভাববি না। তুই শুধু ঠাকুরের কথা ভাববি।”
রতন বলল, “আমি কিছু করি না কাকা। নিজের থেকেই হয়ে যায়।”
পরেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “সেটাই ভয়।”
এরপর একদিন বিকেলে রতন হঠাৎ নিখোঁজ। উমা পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। পরেশ ও সাথে ছিল।
শেষমেশ দেখা গেল—সে আত্রাইয়ের সেই বাঁকে বসে আছে, যেখানে পরেশের বাবা মারা গিয়েছিল।
সূর্য ডুবছে, জল লাল হয়ে আছে।
রতন জলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ উনি খুব কাছে আসছিলেন।”
পরেশ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে?”
রতন বলল, “যিনি ঠাকুর বাঁচাতে গেসিলেন।”
পরেশের আর সন্দেহ রইল না। এটা শুধু কাকতালীয় নয়। এটা প্রবাহ—যা সময়ের স্রোতের মতো। কিন্তু সবার বিশ্বাস এমন নয়।
গ্রামের কয়েকজন বলল, “এই ছেলেটা ঠিক নয়। বেশি বাড়তেসে।”
একদিন রাতের অন্ধকারে কেউ সুবলের বাড়ির বেলগাছের ডাল ভেঙে দিল। উমা সকালে দেখে কেঁদে ফেলল।
রতন শুধু বলল, “ওরা ভয় পাইসে।”
পরেশ শুনে রেগে উঠল।
কিন্তু রতন তাকে থামাল, “ওদের কিছু বলবেন না। সময় হলে ওরাই বুঝবে।”
পরেশ অবাক। এই বয়সে এমন কথা!
কয়েকদিন পর গ্রামের এক বৃদ্ধা মারা গেলেন। শেষ সময় তিনি শুধু বলছিলেন, “ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছি…” কেউ ঢাক বাজাচ্ছিল না। শুধু রতন দূরে বসে ছিল।
এইসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। সন্দেহ কমল, ভক্তি বাড়ল।
কিন্তু পরেশ জানত—এটা বিশ্বাসের পরীক্ষা। যেখানে বিশ্বাস আছে, সেখানে ভয়ও থাকে। আর ভয় পেরিয়ে তবেই বিশ্বাস পূর্ণ হয়। গাজন আসতে তখনও কয়েক দিন বাকি। কিন্তু গ্রাম যেন অপেক্ষা করছে। সবাই জানে—এইবার গাজনে কিছু ঘটবে। কারণ এবার পাট ঠাকুর শুধু এক গৃহস্থের উঠোনে যাবে না। এবার সে নতুন কাঁধ খুঁজে পেয়েছে। আর সেই কাঁধকে সবাই দেখবে। পরীক্ষা করবে। মানবে—অথবা ভয় পাবে।
রতন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, কেউ তাকে দেখছে। সে জানে না কেন, কিন্তু সে প্রস্তুত। কারণ সে বুঝে গেছে—ঠাকুর কাঁধে নেওয়া মানে শুধু ভার নেওয়া নয়, মানুষের ভয়, সন্দেহ, আর বিশ্বাস—সব কাঁধে নেওয়া।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।