এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পাট ঠাকুর 

    Sandip Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৫ বার পঠিত
  • ষষ্ঠ পর্ব 
     
    গাজনের আর মাত্র তিন দিন বাকি।
    কিন্তু গ্রামের আকাশে যেন উৎসবের রঙ নয়—জমে উঠেছে অদ্ভুত এক অশনি-সংকেত। কয়েকদিন ধরেই কালো মেঘ ঘিরে আছে আকাশকে। চৈত্রের শেষ প্রহরে এমন ভারী, নীচু মেঘ সচরাচর দেখা যায় না। বাতাসে চাপা গুমোট, যেন নিঃশব্দে জমে উঠছে কোনো অদৃশ্য অপেক্ষা।
    পরেশের বুকের ভিতর কেমন অকারণ অস্বস্তি।
    সে বুঝতে পারছিল—শুধু গাজন নয়, তার থেকেও বড় কিছু আসন্ন।
    সেই রাতেই আকাশ ফেটে নামল ঝড়।
    ভয়ংকর কালবৈশাখী।
    বজ্রপাতের ঝলকে আত্রাই নদী বারবার সাদা হয়ে উঠছিল, যেন অন্ধকারের বুক চিরে কেউ আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে। বাতাসে বেলপাতা ছিঁড়ে উড়ছে, খড়ের চাল কাঁপছে, দরজা-জানালা উন্মত্তের মতো ঠকঠক করে কাঁপছে। ধূপ, মাটি আর ভেজা বাতাসের গন্ধে ভরে উঠেছে চারদিক।
    হঠাৎ রতন উঠে বসল।
    চোখ দু’টি খোলা—কিন্তু দৃষ্টি যেন এই জগতের নয়।
    সে ধীরে, অদ্ভুত নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলল,
    “নদীতে যাতে  হবে।”
    উমা আঁকড়ে ধরল তাকে, কাঁপা গলায়,
    “না রে! এখন নয়! এই ঝড়ে নয়!”
    রতন শান্ত স্বরে বলল,
    “উনি ডাকতেসেন। আজ আবার ঝড়ের রাত।”
    এই একই সময়ে, নিজের ঘরে বসে পরেশের শরীর কাঁপছিল।
    তার কানে যেন স্পষ্ট ভেসে আসছিল সেই বহু বছরের পুরোনো, পরিচিত ফিসফিস—
    “ঠাকুর জলে পরসে… ঠাকুর জলে পরসে…”
    আর নিজেকে আটকাতে পারল না সে।
    ঝড়, বৃষ্টি, বজ্র—সব উপেক্ষা করে ছুটে গেল সুবলের বাড়ির দিকে।
    ঝড়ের তীব্রতা যেন সাধারণ ঝড় নয়—
    মনে হচ্ছিল, মহাদেবের অদৃশ্য বাহিনী কৈলাশ থেকে নেমে এসে আত্রাইয়ের পবিত্র তীরে দেব-আগতির বার্তা বহন করছে। প্রকৃতির প্রতিটি শব্দে যেন ছিল এক অলৌকিক আহ্বান।
    রতনের বাড়ির দরজায় পৌঁছে পরেশ দেখল—
    রতন বেরোতে চাইছে, আর সুবল ও উমা তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
    পরেশ গর্জে উঠল,
    “ওকে ছাড়!”
    সুবল হতভম্ব,
    “এই ঝড়ে? পাগল হইছিস নাকি?”
    পরেশের চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা,
    “আজ যা হওয়ার, তা আর আটকানো যাবে না।”
    অবশেষে তিনজন মিলে রতনকে নিয়ে ছুটল আত্রাইয়ের দিকে।
    বজ্রের আলোয় ক্ষণিকের জন্য পথ দেখা যাচ্ছে, আবার অন্ধকার গিলে ফেলছে সব। বৃষ্টি কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে, কাদা ছিটকে উঠছে পায়ের তলায়, তবু থামার উপায় নেই।
    নদীর ধারে পৌঁছেই রতন হঠাৎ থেমে গেল।
    সে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
    দু’হাত বাড়িয়ে জলের স্পর্শ নিল—যেন বহুদিনের চেনা কারও সান্নিধ্যে এসেছে।
    চোখ বন্ধ করে সে ফিসফিস করে বলল,
    “আমি আসতিছি…”
    ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে এক প্রচণ্ড বজ্রপাত।
    দিগন্ত কেঁপে উঠল।
    নদীর মাঝখানে যেন মুহূর্তের জন্য কিছু একটা ভেসে উঠল।
    পরেশের শ্বাস আটকে গেল।
    তার চোখ বিস্ফারিত—
    সে যেন দেখল, পাট ঠাকুর জলের উপর ভাসছেন!
    অন্ধকার আর আলোর মাঝখানে, সময়ের সীমানা ভেঙে ওঠা এক অলৌকিক উপস্থিতি।
    রতন ধীরে ধীরে জলের মধ্যে নামতে লাগল।
    পরেশ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাকে ধরে রাখতে।
    কিন্তু রতনের শরীর অদ্ভুত দৃঢ়, যেন অদৃশ্য শক্তি তাকে ধারণ করে আছে।
    রতন মৃদু স্বরে বলল,
    “ভয় পাবেন না… উনি আর ডুববেন না।”
    অলৌকিকভাবে, ঠিক তখনই ঝড়ের বেগ কমতে শুরু করল।
    বৃষ্টি হালকা হয়ে এল।
    আকাশের গর্জন স্তিমিত হয়ে নেমে এল গভীর নীরবতা।
    রতন জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে, দু’হাত জোড় করে, চোখ বন্ধ।
    তার ঠোঁটে ধ্বনিত হল মন্ত্র—
    “হর হর মহাদেব…”
    পরেশের চোখ ভিজে উঠল।
    সে বুঝল—কিশোর বয়সে যে দৃশ্য সে দেখেছিল, আজ তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
    কিন্তু এ পুনরাবৃত্তি ভিন্ন।
    এইবার কেউ ডুবছে না।
    এইবার কাউকে বাঁচাতে কেউ ছুটে আসেনি।
    এইবার আহ্বান নিজেই পূর্ণতা পেয়েছে।
    কিছুক্ষণ পর রতন ধীরে ধীরে জলের ভিতর থেকে উঠে এল।
    তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি—গভীর, অটল, অলৌকিক।
    সে ধীরে বলল,
    “এবার উনি নিশ্চিন্ত।”
    পরেশ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
    “কে?”
    রতনের উত্তর—
    “যিনি ঠাকুর বাঁচাতে চায়ে চলে গেসিলেন।”
    পরদিন সকালে খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে।
    ভয়ংকর ঝড়ের পরও আত্রাইয়ের জল আশ্চর্য রকম শান্ত ছিল।
    চারপাশে গাছ উপড়ে পড়েছে, ঘরের চাল উড়ে গেছে, অথচ সুবলের বাড়ির বেলগাছ একটুও নড়ে নি—অক্ষত, অবিচল, যেন নীরব সাক্ষী।
    গ্রামের মানুষ এসে বেলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
    কেউ কিছু বলল না।
    শুধু তাকিয়ে রইল—শ্রদ্ধা, বিস্ময় আর অজানা ভয়ের মিশ্র নীরবতায়।
    পরেশ জানত—
    গত রাত ছিল সত্যের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার রাত।
    পাট ঠাকুরের ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায় অবশেষে সম্পূর্ণ হয়েছে।
    তার বাবার অপূর্ণ দায়িত্ব, বহু বছরের প্রতীক্ষা—আজ পূর্ণতা পেয়েছে।
    আর রতন, নিজের অজান্তেই, সেই উত্তরাধিকার গ্রহণ করেছে।
    সন্ধ্যায় পরেশ রতনের মাথায় হাত রেখে ধীরে বলল,
    “আজ থেকে তুই শুধু শিখছিস না… তুই বহন করছিস।”
    রতন নীরব রইল।
    তার চোখে আর কোনো ভয় নেই।
    শুধু গভীর স্থিরতা—যেন সে নিজের পথ চিনে নিয়েছে।
    আত্রাই নদী আবার শান্ত।
    কিন্তু সেই শান্ত জলের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস, আর আত্মত্যাগের অমর কাহিনি।
    গাজন আসছে।
    আর এই গাজনে, পুরো গ্রাম প্রত্যক্ষ করবে—
    পাট ঠাকুর শেষমেশ কাকে তাঁর বাহক হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন