এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বরণের ভাষা শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্যে ও বাংলার প্রথম আত্মসমর্পণ অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩২ বার পঠিত
  • বরণের ভাষা: শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য ও বাংলার প্রথম আত্মসমর্পণ।
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    বাংলা সাহিত্যের ভেতর ভক্তি আন্দোলনের যে স্রোত একদিন নীরবে ঢুকে পড়েছিল, তার একটি বড় ফলাফল মালাধর বসুর লেখা শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য। কাব্যগ্রন্থটি কে আমরা শুধুমাত্র অনুবাদ কাব্য বলবো না বরং বইটি ছিল সেই যুগের মানসিকতার দলিল বাংলা ভাষার বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায় ।এক সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন। এক ধর্মীয় জাগরণের নতুন ভাষ্য। বলা যেতে পারে বাংলা ভাষা যখন নিজস্ব ভঙ্গিতে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে, সেই নতুন পরিবর্তনের বাঁকেই এই কাব্যর জন্ম । সুতরাং শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্যগ্রন্থের একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে।
     
    পঞ্চদশ শতক। বাংলার সমাজ বদলাচ্ছে। গ্রাম বাড়ছে। বাজার তৈরি হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষা শক্ত হচ্ছে। সংস্কৃত পুঁথি তখনও পণ্ডিতের ঘরে। সাধারণ মানুষের কাছে তা দূরের জিনিস। ধর্ম আছে। ভক্তি আছে। কিন্তু ভাষা আলাদা। সেই দূরত্ব ভেঙে দেয় ভক্তি আন্দোলন। দক্ষিণ ভারত থেকে যে ভক্তিধারা উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে পূর্বভারতে পৌঁছয়। ভক্তি বলে, ঈশ্বরকে পেতে পাণ্ডিতের দরকার নেই। দরকার প্রেম। দরকার নাম। দরকার বিশ্বাস।
     
    এই আবহের মধ্যেই আবির্ভাব মালাধর বসু। তিনি কেবল অনুবাদক নন। তিনি নির্মাতা। তিনি বেছে নেন কৃষ্ণকথা। উৎস হিসেবে নেন শ্রীমদ্ভাগবত। কিন্তু তিনি অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ করেন না। তিনি নির্বাচন করেন। প্রয়োজন মতন সংক্ষিপ্ত করেন। বদলান। যোগ করেন লোককথা। নেন মহাভারত, হরিবংশ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ-এর উপাদান। কিন্তু সবটাই সাজান নিজের ভাষায়। নিজস্ব কৌশলে।
     
    ভক্তি আন্দোলনের মূল কথা ছিল সহজ পথ। নাম সংকীর্তন। কীর্তন। পাঁচালি। শ্রুতি ও গানের ভেতর দিয়ে ধর্মচর্চা। বাংলায় এই ধারাকে পরে প্রবলভাবে সামনে আনেন চৈতন্যদেব। তবে তারও আগে কৃষ্ণভক্তির বীজ ছড়িয়ে পড়ছিল বাংলায় সুতরাং ক্ষেত্রে ছিল প্রস্তুত তবে অনেক গবেষকের মতে, মাধবেন্দ্র পুরী বাংলায় ভাগবত ভাবনার একটি ধারা নিয়ে আসেন। আবার ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন মনে করেছিলেন, ভাগবত চর্চা চৈতন্যের আগেই বাংলায় শুরু হয়। এই পটভূমি বুঝলে শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের তাৎপর্য আরো স্পষ্ট হয়।
     
    মালাধর বসু তাঁর কাব্যকে পাঁচালি আকারে লিখলেন। কারণ তিনি জানতেন, শ্লোকের ভাষা সাধারণ মানুষ ধরতে পারবে না। কিন্তু পাঁচালি শুনতে পারবে। গাইতে পারবে। মনে রাখতে পারবে। ভক্তি আন্দোলন ধর্মকে মন্দির থেকে উঠিয়ে আনল উঠোনে। কৃষ্ণকে আনল গৃহে। দেবতাকে করল আপনজন। শ্রীকৃষ্ণবিজয় সেই প্রক্রিয়ার সাহিত্যরূপ।
     
    এই কাব্যে মূলত শ্রীমদ্ভগবত-এর দশম ও একাদশ স্কন্ধের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ এই অংশে কৃষ্ণলীলার রস বেশি। জন্ম। বাল্যলীলা। বৃন্দাবন। কংসবধ। ভক্তি আন্দোলন তত্ত্বের চেয়ে রসকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দর্শনের চেয়ে আবেগ। যুক্তির চেয়ে প্রেম। তাই মালাধর বসু দার্শনিক তর্ক কমিয়ে লীলাকথা বাড়িয়েছেন। এতে কাব্যটি পাঠযোগ্য হয়েছে। গেয়েছে। ছড়িয়েছে।
     
    সুতরাং শ্রীকৃষ্ণবিজয় নিছক ধর্মগ্রন্থ নয়। এটি হয়ে উঠেছে একটি সামাজিক দলিল। তৎকালীন বাংলার চিত্র এখানে ধরা পড়ে। লোকাচার আছে। গ্রামীণ শব্দ আছে। স্থানীয় উপমা আছে। কৃষ্ণ এখানে শুধু পুরাণের চরিত্র নন। তিনি বাঙালির ঘরের ছেলে। দেবকীর শোক যেন গ্রামের মায়ের কান্না। ভাষা বাংলার মাটি ছুঁয়ে থাকে। এই স্থানীয়করণই শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্যের প্রধান শক্তি।
     
    একজন সামাজ বিশ্লেষকের চোখে শ্রীকৃষ্ণবিজয় শুধু ধর্মীয় আখ্যান নয়। এটি জ্ঞানের বিকেন্দ্রীকরণের দলিল। সংস্কৃতের একাধিকার ভেঙে আঞ্চলিক ভাষার উত্থান এখানে স্পষ্ট। ইতিহাসবিদ দের মতে শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলার সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের সূচনা। ঈশ্বরকে মানুষের ভাষায় নামিয়ে আনার মধ্যেই ছিল সেই দুঃসাহস। আর এইখানেই মনে পড়ে রবি ঠাকুরের সেই অমোঘ উচ্চারণ
    —“ভুবন বলে, তোমার তরে আছে বরণমালা।”
     
    যেভাবে সমগ্র ভুবন এক সত্তাকে বরণ করে, ঠিক তেমনি শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য বাংলার ভাষায় কৃষ্ণ কথাকে বরণ করেছিল। ফলে এটা কেবল অনুবাদ ছিল না। এটি ছিল একাধারে আত্মসমর্পণ। সম্মান। ও আত্মীকরণ।
     
    মধ্যযুগে লোকভাষা ঈশ্বরকে বরণ করেছে। আধুনিক যুগে মানুষ নিজেই ঈশ্বরচেতনার ধারক বাহক হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের তাই ভাবতে পারেন—“সাগর বলে, কূল মিলেছে, আমি তো আর নাই”—এইখানে আমাদের ভক্তির গভীর সত্যকে মনে করায়। আর এখন থেকেই সেই  বড় আমি’ টা সরে যায়। বৃহত্তর সত্তা জেগে ওঠে। শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের কাব্যগ্রন্থে র ভেতরের বিনয় সামনে চলে আসে। যার মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষার সাথে জনগণের সাথে সংযোগের ভাষা তৈরি হয়।
     
    ফলে আমরা দেখতে পাই শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্যগ্রন্থের হাত ধরেই সংস্কৃত ভাষার একক আধিপত্য সরে যায়। লোকভাষা সামনে আসে। ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্য পেছনে চলে যায়। সেইখানে জায়গা করে নেয় সমবেত কণ্ঠ । সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে মালাধর বসুর হাত ধরে বাংলা ভাষা যেনো রবীন্দ্র দর্শনের মতন বলতে চেয়েছিল—"আমি তো আর নাই " আর আজকের জায়গায় দাঁড়িয়ে নতুন করে এই কথা  বলার দায় আমাদের ।ভুবন আজও বরণ করে, তবে সেই সরলতার আলো আর তত নির্মল নয়। কারণ আমরা এখন কম জানি বেশি বলি তার চাইতেও কম অনুভব করি, প্রকাশ করি বেশি। আর এই কারণেই আমাদের তাই বারে বারে ফিরে তাকাতে হয় পঞ্চদশ শতকের দিকের মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যগ্রন্থের দিকে ঐতিহাসিক বিচারে যেখানে ভাষা প্রথমবার কাঁপা কাঁপা হাতে ঈশ্বরকে ছুঁয়েছিল। ভক্তি দর্শনে মানুষ যেখানে ভগবান।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন