প্রেম বিষয়ক ছোটখাটো রিপোর্টঅয়ন মুখোপাধ্যায় তোমার সঙ্গে দেখা হলে আজকাল খুব ভদ্র হয়ে যাই,যেন পাড়ার লাইব্রেরিতে হঠাৎ প্রধান শিক্ষক ঢুকেছেন।হাসতে গিয়েও মাপজোক করে ফেলি—কোথাও বেশি হয়ে গেলে আমার প্রেম ধরা পড়ে যেতে পারে।তুমি বলেছিলে, “চা খাবে?”আমি সেই থেকে জীবনের সমস্ত তৃষ্ণাকেএকটা কাপের মধ্যে ভরে দেখতে শিখেছি।চায়ের দোকানদারও বিষয়টা বুঝে গেছে বোধহয়।তোমার ওড়না হাওয়ায় একদিন খুব উড়েছিল,আর আমি সেদিন থেকে আবহাওয়া দফতরের উপর কোনো আস্থা রাখতে পারি না।কারণ তারা ঝড়বৃষ্টির খবর দিলেওএই ধরনের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কথা বলে না।তুমি কাছে এলে পৃথিবী খুব সাধারণ লাগে,আর সাধারণ বলেই তুমি এতো প্রিয় —যেন তোমাকে ভালোবেসে ফেলাই আমার জীবনের সবচাইতে স্বাভাবিক ভুল। ... ...
গণতন্ত্রের খুন্তি অয়ন মুখোপাধ্যায় আমাদের পাড়ায় হরিপদবাবু বলে এক ভদ্রলোক আছেন। ভদ্রলোক বলছি, কারণ তিনি নিজেই নিজেকে ভদ্রলোক বলে পরিচয় দেন। অন্যেরা কী বলে, তা নিয়ে তিনি বিশেষ একটা কিছু ভাবেন বলে মনে হয় না। সকালে দাঁত মাজতে মাজতেই দেশ বাঁচান, দুপুরে ভাত খেতে খেতেই গণতন্ত্র কে সরিয়ে দেন, আবার সন্ধেবেলায় চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে সরকার বদলে ফেলেন। পরেরদিন আবার নতুন করে সরকার বসিয়ে দেন। এহ্যানো হরিপদবাবুর একটা বিশেষ গুণ আছে। পৃথিবীর যে-কোনও জটিল ঘটনার তিনি সহজ ব্যাখ্যা করে দিতে পারেন। পাড়ার মুদি দোকানে চিনি নেই—বিশ্বপুঁজির চক্রান্ত। পাশের বাড়ির বিড়াল তিনদিন ধরে ডাকছে—বন্যপ্রাণী সঙ্কট। একদিন নিজের ছাতা হারালেন। বললেন, “এটা নিছক ছাতা চুরি ... ...
সেকেন্ড হ্যান্ড অস্তিত্ব অয়ন মুখোপাধ্যায় কলকাতায় শীত খুব বেশি নামে না, তবু কিছু কিছু সন্ধ্যা আছে, যেগুলোকে শীত বলতেই হয়। বাতাসে নয়, মানুষের গলায়। জানলার কাচে নয়, চোখের নীচে। সেই রকম এক সন্ধ্যায় মেঘলা আমাকে প্রথম বলেছিল, “দেখো, এসব সম্পর্ক আমাদের মধ্যে না রাখাই ভালো।”আমরা তখন কলেজ স্ট্রিটের ভিড় এড়িয়ে একটা পুরোনো কফিশপের দোতলায় বসে আছি। নীচে বইয়ের দোকান গুটোচ্ছে, ভাঙা রিকশার ঘণ্টা কাঁপছে, আর টেবিলের ওপর রাখা দুটো চায়ের কাপ অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমাদের কথাবার্তাও সেই চায়ের মতোই—গরম থাকতে যতটা সহজ, ঠান্ডা হলে ততটাই তিক্ত। আমি চুপ করে ... ...
কিস্তির জলছাপঅয়ন মুখোপাধ্যায় শালিকাপুরে ভোর আসে চোরের মতো, খুব সাবধানে। অন্ধকার প্রথমে সরে বাঁশবাগান থেকে, তারপর রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলোর চোখের মণি থেকে। নির্মল সর্দার যখন সেকেন্ড শিফট সেরে ফেরেন, আলো তখনও পাড়ায় ঢোকার পারমিশন পায়নি। এ পাড়ায় সকালের একটা নিজস্ব গিল্ট কমপ্লেক্স আছে। যেন সে জানে, এই জানলাগুলোর ওপারে একদিন মানুষ মুঠো মুঠো স্বপ্ন গুনেছিল, আর আজ সেখানে শুধু শূন্যতা ঝুলে থাকে। নির্মলের বয়স বাহান্ন। কিন্তু শরীরটা একটা পাবলিক নোটিশ বোর্ড। যেখানে রাগ, সন্দেহ আর প্রতারণার দাগগুলো নীল হয়ে আছে। মার খেলে মানুষের শরীর নিজের থাকে না, সেটা হয়ে যায় পাবলিক প্রোপার্টি। বাড়ির সামনে রাখা নীল বালতিতে বৃষ্টির জল জমেছে। সেই জলে ভাঙা আকাশের ... ...
অফলাইনে বসন্তের খসড়া অয়ন মুখোপাধ্যায় ১. সিগন্যাল লস্ট আকাশের রঙটা আজ ঠিক আইফোনের রিটিনা ডিসপ্লের মতো ঝকঝকে নীল। অনিমেষ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের এই কাঁচঘেরা অফিসটাতে সময় যেন থমকে থাকে। ঘড়িতে বিকেল সাড়ে চারটে। কফিশপে যাওয়ার সময় হয়েছে।আজকাল কার প্রেম গুলো ঠিক ক্লাউড স্টোরেজের মতো। অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। অনিমেষ আর তিতিরের সম্পর্কটাও তেমনই। তিন বছরের সম্পর্ক, যার অর্ধেকের বেশি কেটেছে হোয়াটসঅ্যাপের ভিডিও কলে আর ইনস্টাগ্রামের রিল শেয়ার করে। তিতির এখন ব্যাঙ্গালোরে একটা মাল্টিন্যাশনাল সংস্থায় কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট। আর অনিমেষ কলকাতায় সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট।ফোনের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। তিতিরের মেসেজ— "অনি, আজকের দিনটার কথা মনে ... ...
নাগরিক যাচাইয়ের ছোট ছোট গল্পঅয়ন মুখোপাধ্যায় ১. সন্দেহআজ রাষ্ট্র আমার দিকে তাকিয়ে বলল—আপনি কে?আমি একটু অবাক হলাম। কারণ গত নির্বাচনেএই রাষ্ট্রই আমাকে খুঁজে বের করেছিল।আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছিল।চা খেয়েছিল।হাত জোড় করে বলেছিল—ভোটটা কিন্তু দেবেন। আজ সে বলছে—প্রমাণ দিন আপনি আছেন। রাষ্ট্রের স্মৃতিমাঝে মাঝে খুবই দুর্বল হয়। ২. লাইন ব্লকের সামনে আজ লম্বা লাইন।একজন বললেন—এই লাইনে দাঁড়ালে কি নাগরিক হওয়া যায়? পিছন থেকে আরেকজন বললেন—না, এই লাইনে দাঁড়ালে শুধু বোঝা যায়রাষ্ট্র আপনার ওপর একটু সন্দেহ করছে। ৩. কাগজ রাষ্ট্র কাগজ খুব ভালোবাসে। সে বলে—আপনার জন্মের কাগজ আছে?আপনার বাবার জন্মের কাগজ আছে?আপনার দাদুর জন্মের কাগজ আছে? আমি বললাম—আমার দাদু তখন চাষ করতেন।কাগজ নয়। রাষ্ট্র একটু ভেবে বলল—তাহলে সমস্যা আছে। ৪. অফিসার অফিসার খুব শান্তভাবে বললেন—ভয় পাবেন না। এটা ... ...
কবিতা সিরিজ: কর্কশ রাতের নোটবই অয়ন মুখোপাধ্যায় ১. দু’কানে বালিশআজকের রাতটা যেন কোনো মানুষের নয়,বরং একটা ভাঙা মাইকের গলায় আটকে থাকা জ্বর।চোখ বুজলেই কানের ভিতর উঠে আসে রামনবমীর কর্কশ স্লোগান,যেন অন্ধকার নিজেই আজ লাঠিচার্জের ভাষা শিখেছে।আমি দু’কানের ভেতর বালিশ চেপে ধরি—তবু শব্দ ঢুকে পড়ে হাড়ের ফাঁক দিয়ে।রামনবমীর মিছিলের ডিজের আওয়াজ,কিংবা ড্রামের চিৎকার,আর মিছিলের নিঃশ্বাসগুলো—মিলেমিশে এক অদ্ভুত পশুর মতোআমার বিছানার চারদিকে ঘুরে বেড়ায়।আমি ভাবি,মানুষ কি কেবল তার ঘুমকে হারিয়ে ফেললেইপ্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে? ২. আত্মপক্ষসারারাত আমি নিজেই নিজের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দিয়েছি।বলেছি— তুমি কি ভয় পাচ্ছ?তোমার মন কি তবে পিছিয়ে পড়া মন?তুমি কি এই সব শোরগোলের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে,নিজেরই আদালতে নিজেকেই অভিযুক্ত করেছ?তার উত্তরে ... ...
যে চিহ্নের উপরে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে অয়ন মুখোপাধ্যায় ১আজকে জানলাম, আমাদের জানালার সামনে যে নিমগাছটা আছে,সেটা আসলে আমার মায়ের পুরোনো চিরুনি।ঝড় উঠলেই সে চুল আঁচড়ায়, আর ধুলোর ভেতরপড়ে থাকে বিকেলের মিহি গন্ধ। ২পুকুরের জল তখন আর কোনো কাঁচ নয়, এক বৃদ্ধ অন্ধকার—তার ভিতরে বসে আছে যেখানে মাছেরা নীরবে সেলাই করে যাচ্ছে।আমি বসে আছি, অথচ আমার ছায়া রয়েছে অনেক দূরে,আম গাছের নিচে ... ...
একটি ব্যবহৃত জীবনের খসড়া অয়ন মুখোপাধ্যায় আজকাল আমি আলো কে খুব একটা বিশ্বাস করি না সে খুব সহজেই রং বদলায়।বরং অন্ধকারের পাশে এসে বসি—সেখানে মদ গন্ধমাখা, পুরোনো,কিন্তু বিশ্বস্ত। আমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন মনে হয়,আমি নই, অন্য কারও ব্যবহৃত অবয়ব পরে বসে আছি। তখন মনে হয় এই জীবনটা যেনো একটা ছেঁড়া প্যাকেটযা ছিল, একে একে সব কিছু পড়ে গেছে রাস্তায়। এখানে তাই ভালোবাসা আমার কাছে একটা ভাঙা সিঁড়ির মতন, কখন ওপরে উঠতে উঠতে হঠাৎ কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে। আমি জানতে পারিনি, তারপর শুধু বাতাস আর বাতাস,আর নীচে পড়ে থাকে অনেক পুরোনো ডাক। রাত নামলেই আমি টের পাই,শূন্যতাও আসলে একটা নেশা।একবার গলায় ঢাললেমানুষ আর সহজে সকাল বলতে পারে না। ... ...
নামহীন কোনো অন্ধকারের কাছেঅয়ন মুখোপাধ্যায়আমি আজকাল দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্যকে বেশি বিশ্বাস করি।যে চেয়ারটায় কেউ বসে নেই, সেখানেই সবচেয়ে বেশি শরীরের উষ্ণতা থাকে।জানালার বাইরে যে গাছ, সে আসলে গাছ নয়—একটা দীর্ঘশ্বাস, মাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভিতরে প্রতিদিন একটু একটু করে সন্ধ্যা নামে,যা কেউ দেখতে পায় না, শুধু পুরোনো শব্দেরা কাকের মতো জীবন থেকে উড়ে যায়।আমি তাদের ডাকি না, তবু তারা ফিরে আসে—যেন আমারই ভাঙা ছায়া, অন্য কারও উঠোনে জুড়ে পড়ে আছে।এই জীবনে খুব সম্ভবত আমার জন্য কেউ কোনও স্পষ্ট বাক্য লিখে রেখে যায়নি,বরং মুছে যাওয়া কালির ওপর হাত বোলালে যে অন্ধকার উঠে আসে,আমি হলাম তাই। ভালোবাসা আমার কাছে বহুদিন হলো এক দরজাহীন বাড়ি,ভিতরে ... ...